সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

বঙ্গে গণপতি

বঙ্গে গণপতি

কুণালকান্তি সিংহ রায়

নভেম্বর ৮, ২০২৫ ২১৪ 3

‘হে ব্রহ্মণস্পতি! তুমি দেবগণের মধ্যে গণপতি, কবিগণের মধ্যে কবি, তোমার অন্ন সর্বোৎকৃষ্ট ও উপমানভূত। তুমি প্রশংসনীয়দের মধ্যে রাজা এবং মন্ত্রসমূহের স্বামী। আমরা তোমাকে আহ্বান করি, তুমি আমাদের স্তুতি শ্রবণ করে আশ্রয় প্রদানার্থে যজ্ঞগৃহে উপবেশন কর।’

—ঋগ্বেদ সংহিতা (২/২৩/১)

ভারতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে গণপতি বা গণেশের পূজার্চনা অনুষ্ঠিত হয় সাধারণত মহারাষ্ট্র, গোয়া, কর্নাটক, গুজরাট, তেলেঙ্গানা প্রভৃতি রাজ্যে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বাংলাতেও প্রতিমা নির্মাণ করে গণেশ চতুর্থী পালনের বেশ ধুমধাম দেখা গেছে। স্বাভাবিকভাবেই অনেকের প্রশ্ন জেগেছে, গণেশ কি বহিরাগত? বিষয়টি ভারি কৌতূহলোদ্দীপক। আমরা বিষয়টিকে মুর্শিদাবাদের কান্দির প্রেক্ষিতে আলোচনা করার চেষ্টা করব।

কান্দি মহকুমার উত্তর-পূর্ব দিকে একটি সমৃদ্ধিশালী গ্রাম হল মহালন্দী। মুঘল যুগের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আবুল ফজলের ‘আইন ই আকবরী’ গ্রন্থে মহালন্দীর উল্লেখ রয়েছে। সম্রাট আকবরের আমলে (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রি.) মহালন্দী পরগণার (কর্নেল জারেট ‘Mahland’ লিখেছেন) রাজস্ব ছিল ১৮,৩১,৮৯০ দাম। সেই সময়ে ৪০ দাম (তাম্র মুদ্রা) ছিল এক টাকার সমতুল্য।

এই গ্রামের ঋষিব্রত বাগদীর বাড়িতে একটি হাজার বছরের প্রাচীন গণপতির প্রস্তরমূর্তি রয়েছে। ক্ষেত্রসমীক্ষায় জানা যায় যে, কয়েক বছর আগে একশ দিনের কাজে স্থানীয় পুষ্করিণীর খননকাজের সময় মূর্তিটি পাওয়া গেছিল। বোঝা যায়, সহস্র বছর আগে এই অঞ্চলে গণপতির উপাসনা প্রচলিত ছিল। তাহলে সেই উপাসনা বিলুপ্ত হল কেন? এই আলোচনায় প্রবেশ করার আগে ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতিতে গণপতির অবস্থানটা একবার দেখা যাক।

গণপতির কথা

ভারতীয় ধর্ম-সংস্কৃতি ও মূর্তিশাস্ত্রে এক জটিল ও প্রহেলিকাময় চরিত্র হলেন গণপতি বা গণেশ। ‘গণপতি’ শব্দের প্রকৃত অর্থ হল গণের পতি— ‘জনজাতি প্রধান’। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর বিখ্যাত গ্রন্থ ঋগ্বেদে (২/২৩/১) ‘গণপতি’ শব্দটির উল্লেখ থাকলেও সেটি গণেশ নয়, বৃহস্পতিকে বোঝানো হয়েছে (চলমান প্রবন্ধের প্রথম উদ্ধৃতি)। ফরাসি ভারততত্ত্ববিদ লুই রেন্যু থেকে অ্যলিস জেটি, অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ প্রমুখ পণ্ডিতের বক্তব্য হল, গণেশ প্রথমে ছিলেন অনার্য দেবতা, পরবর্তীকালে পঞ্চোপাসনার সর্বশেষ গোষ্ঠী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। পঞ্চোপাসনা হল হিন্দু ধর্মের উপাসনার একটি পদ্ধতি, এখানে প্রধান পাঁচজন দেবতা হলেন বিষ্ণু, শিব, শক্তি, সূর্য এবং গণপতি।

দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘লোকায়ত দর্শন’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে গণপতি সম্পর্কে এক মূল্যবান আলোচনা করেছেন, এই লোকায়ত ও যৌগিক দেবতাটির সত্যিই দুটি দেহ, দুটি স্বতন্ত্র জন্ম এবং দুটি স্বতন্ত্র স্বত্তা—বিঘ্নরাজ ও সিদ্ধিদাতা। প্রকৃতপক্ষে অতীতে গণেশ বিঘ্নরাজ বা অমঙ্গলের দেবতা ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে বিঘ্নরাজ থেকে গণেশের সিদ্ধিদাতায় রূপান্তর ঘটে। অর্থাৎ লোকায়ত দেবতা থেকে শিব-পার্বতীর তনয় হিসাবে ব্রাহ্মণ্য ধর্মব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি ঘটে। শিবপুরাণ, লিঙ্গপুরাণ, বরাহপুরাণ, স্কন্দপুরাণ প্রভৃতি পৌরাণিক সাহিত্যে গণেশের আবির্ভাবের ভিন্ন ভিন্ন উপকথা পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আনুমানিক ৪০০ থেকে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পুরাণগুলি রচিত হয়েছিল।

খ্রিস্টিয় ষষ্ঠ শতকে রচিত ‘অমরকোশ’ গ্রন্থে গণেশের ৮টি নাম পাওয়া যায়, যথা, বিনায়ক, বিঘ্নরাজ, দ্বৈমাতুর, গণাধিপ, একদন্ত, হেরম্ব, লম্বোদর ও গজানন। আবার দশম-একাদশ শতকে রচিত ‘শারদাতিলক’-এ গণেশের ৫০টি নামের তালিকা পাওয়া যায়।

চিত্র ১-নৃত্যরত গণপতি। সময়কাল: খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতক। উপাদান: ব্যাসাল্ট পাথর। প্রাপ্তিস্থান: উত্তরবঙ্গ। বর্তমানে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।

প্রশ্ন জাগে, ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে গণেশের আত্মপ্রকাশ কোন সময়ে হয়েছিল? এ বিষয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আনন্দ কুমারস্বামী, অ্যালিস গেটি, পি. ভি. কানে, এ. এল. ব্যাসাম, পি. বি. কোর্টরাইট প্রমুখ দেশী-বিদেশী পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদদের মতে, খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতকে অর্থাৎ গুপ্তযুগে (৩০০-৬০০ খ্রি.) গণেশের নাটকীয় আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। অন্যদিকে রবার্ট এল. ব্রাউন ও এম. কে. ধাবালিকর গণপতির আবির্ভাবের কালপর্বকে আরও প্রাচীনত্বের দিকে নিয়ে যাবার পক্ষপাতী। তাঁদের অভিমত হল, খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতকেই গণেশের আবির্ভাব ঘটেছিল। তবে ভারতীয় সাহিত্যে গণেশের উত্থান ঘটেছে পঞ্চম শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে। কারণ চতুর্থ শতকে মহাকবি কালিদাসের বিভিন্ন কাব্য ও নাটকে এবং পঞ্চম শতকে কিরাতার্জুনীয়ম’ প্রণেতা ভারবির কাব্যে গণেশ অনুপস্থিত। আবার আনুমানিক চতুর্থ শতকে রচিত ভরতের নাট্যশাস্ত্রে কার্তিকেয় দেবতার উল্লেখ থাকলেও গণেশ উপেক্ষিত।

অন্যদিকে সপ্তম শতকে হর্ষবর্ধনের সভাপতি বাণভট্ট রচিত ‘কাদম্বরী’ কাব্যে গজানন যুক্ত গণপতির উল্লেখ রয়েছে। আদি মধ্যযুগের প্রারম্ভে মহারাষ্ট্রীয় প্রাকৃত ভাষায় রচিত ‘গাথা সপ্তশতী’ কাব্যে (৪।৭২) গণেশ বিদ্যমান। এমনকি ‘মহাভারতে’ লিপিকাররূপে গণেশের অন্তর্ভুক্তি হয়েছে খ্রিস্টিয় অষ্টম শতকে। সুতরাং পঞ্চম শতাব্দীর আগে ভারতবর্ষে গণেশ পূজার নিদর্শন প্রায় অনুপস্থিত বলা চলে।

চিত্র ২-আসন মুদ্রায় গণপতি। সময়কাল: খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতক। উপাদান: লাল বেলেপাথর। প্রাপ্তিস্থান: ভূমারা, মধ্যপ্রদেশ। বর্তমানে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।

শুধুমাত্র ভারতীয় উপমহাদেশেই নয়; চীন, জাপান, কম্বোডিয়া, লাউস, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশেও গণপতির অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রা চলেছে। সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত রবার্ট ব্রাউন তাঁর ‘Ganesh Studies of an Asian God’ গ্রন্থে লিখেছেন—

‘সবচেয়ে মজার বিষয় হল, গণেশ শুধুমাত্র ভারতের দেবতা বা ভারতে একমাত্র উপাস্য নন। ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে চীনে এবং সম্ভবত তারও আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে গণেশ উপাস্য ছিলেন। সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীর প্রারম্ভে গণেশ সংক্রান্ত ভারতীয় পুথিগুলি চীনের বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা চীনা ভাষায় অনুবাদ করেন। অনুরূপভাবে দশম-একাদশ শতকে তিব্বতের বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও এই অনুবাদের কাজ সম্পূর্ণ করেন। ভারতীয় গ্রন্থ ও শিল্পের উপর ভিত্তি করে বহির্ভারতে গণেশের এক অনন্য রূপের বিকাশ ঘটেছিল, যেমন, চীনে দ্বৈত গণেশের উদ্ভব যা জাপানেও সমান জনপ্রিয়।’

ব্রাউনের মতে, ভারতবর্ষের বাইরে তান্ত্রিকরূপী গণেশ সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করেছিল। বর্মি ভাষায় গণপতি ‘মহাপেইন্নে’, থাইল্যান্ডে ‘ফ্রা ফিখানেত’, চিনে ‘কু অন্-শিতি এন’, জাপানে ‘শো-তেন’, ‘বিনায়ক্স’ ইত্যাদি নামে প্রসিদ্ধ।

বিংশ শতকের শুরু থেকে গণপতি সংক্রান্ত বহু মূল্যবান রচনা প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম গবেষক হলেন গোপীনাথ রাও (১৯১৪ খ্রি.), আনন্দ কুমার স্বামী (১৯২৮ খ্রি.), পি. ভি. কানে (১৯৩০ খ্রি.), অ্যালিস জেটি (১৯৩৮ খ্রি.), ফাদার হেরাস (১৯৫৪ খ্রি.), অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ (১৯৬৩ খ্রি.) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। গণেশকে কেন্দ্র করে সুপ্রাচীন ভারতীয় ধর্মাচার ও আচার-অনুষ্ঠানের গভীর অনুসন্ধান করেছেন প্রখ্যাত দার্শনিক ও সমাজ বিজ্ঞানী দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (১৯৫৬ খ্রি.)। বিংশ শতকের শেষ দুটি দশকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণে গণপতিকে বিশ্লেষণ করেছেন পি. বি. কোর্টরাইট (১৯৮৫ খ্রি.), রবার্ট এল. ব্রাউন (১৯৯১ খ্রি.) ও অনিতা রাইনা থাপান (১৯৯৫ খ্রিঃ)। গণেশ সম্পর্কিত সর্বাধুনিক গবেষণা গ্রন্থ হল এম.কে. ধাবালিকারের ‘Ganasa: The God of Asia’ (2016) I

বঙ্গে গণপতি

বাংলায় গাণপত্য সম্প্রদায় কোন সময়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে পাল নৃপতিদের শাসনকালে (৭৫০-১১৭৫/৭৬ খ্রিস্টাব্দে) ‘বিঘ্ননাশক ও সিদ্ধিদাতা’ রূপে গণপতির অসংখ্য মূর্তি নির্মিত হয়েছিল। ‘Bengal Sculptures: Hindu Iconography upto 1250 A.D.’ নামক গ্রন্থে গবেষক এনামূল হক বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে সর্বমোট ৭৩টি গণপতির প্রাচীন ভাস্কর্যের নিদর্শনের তথ্য উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে ৬০টি হল প্রস্তর মূর্তি, ১১টি ব্রোঞ্জ মূর্তি ও দুটি টেরাকোটা ফলকে উৎকীর্ণ। গণপতির এইসমস্ত বিগ্রহকে মূর্তিতাত্ত্বিক দিক থেকে তিনি তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন—স্থানক বা দণ্ডায়মান, উপবিষ্ট বা আসন এবং নৃত্যরত।

পাশাপাশি তিনি হাতের সংখ্যানুসারেও গণপতির মূর্তিগুলিকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করেছেন—

(১) দ্বিহস্ত বিশিষ্ট গণেশ: মহারাজালীলাসনে উপবিষ্ট একটি মাত্র গণপতির মূর্তির সন্ধান মিলেছে।

(২) চতুর্ভুজ গণেশ: এই ধরনের মূর্তির সংখ্যাই সর্বাধিক (প্রায় ৩৭টি)।

(৩) ষড়ভুজ গণেশ: মাত্র তিনটি নৃত্যরত মূর্তির সন্ধান মিলেছে।

(৪) অষ্টভুজ গণেশ: সংখ্যার দিক থেকে চতুর্ভুজ গণপতির পরেই স্থান। তবে সব মূর্তিই নৃত্যরত।

(৫) দশভুজ গণেশ: ঢাকার কাছে রামপালে প্রাপ্ত হেরম্বগণপতির একমাত্র মূর্তিটি সম্ভবত এখন করাচিতে (পাকিস্তান) রয়েছে।

গণপতির উপরোক্ত সকল মূর্তিগুলির মধ্যে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দৃশ্যমান, যথা—

১) গণপতির হস্তি সদৃশ মস্তক,

২) খর্বাকৃতি স্থূলাকার শরীর,

৩) অর্ধবৃত্তাকার স্ফীতোদর, এবং

৪) প্রতিকৃতির নিচে মুষিকের উপস্থিতি।

কান্দিতে গণপতি

মুর্শিদাবাদ জেলায় চারটি গণপতির প্রস্তর মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া পার্শ্বচরিত্ররূপে গণপতির আরও ৫টি মূর্তির সন্ধান মিলেছে। এই পার্শ্বচরিত্রে গণেশ মূর্তিগুলি সাধারণত উমা বা ললিতা মূর্তিতে দণ্ডায়মান ভঙ্গিতে দেখতে পাওয়া যায়। এখানে দৃষ্টান্তস্বরূপ কান্দি মহকুমায় প্রাপ্ত গণপতির একক মূর্তিটি নিয়ে আলোচনা করা যাক।

কান্দি মহকুমার অন্তর্গত মহালন্দী গ্রামে প্রাপ্ত গণপতির মূর্তিটি অনবদ্য। এখানকার গণপতির বিগ্রহটি হল নৃত্যরত অষ্টভুজ। বিগ্রহটির ভূমি প্রায় ১ ফুট এবং উচ্চতা প্রায় ২ ফুট। এখানে গণপতির সামনের দক্ষিণ হস্ত অভয় মুদ্রায় বিন্যস্ত। অবশ্য দক্ষিণ হস্তের অঙ্কুশ ও অক্ষমালা ব্যতীত অন্যান্য আয়ুধগুলি ততটা সুস্পষ্ট নয়। ‘অঙ্কুশ’ বলতে বোঝায় আঁকশি বা হস্তিতাড়ন দণ্ড। বিগ্রহটির সামনের বামহস্ত এবং বামদিকে বাঁকানো হস্তি শুঁড়ের নিম্নাংশ একেবারে ভগ্ন। মস্তকের দুই পার্শ্বে অর্থাৎ শিল্পীর কল্পনায় মেঘমালায় উড়ন্ত দুই বিদ্যাধর মালা হাতে উৎকীর্ণ রয়েছেন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এ. এল. ব্যাসাম এই বিদ্যাধরদের ‘স্বর্গের জাদুকর’ আখ্যা দিয়েছেন। মূলত স্বর্গীয় সৌন্দর্য প্রকাশের জন্যই তাদের সৃষ্টি। ভাস্কর্যের একেবারে ঊর্ধ্বে কীর্তিমুখ বা The face of glory-র পরিবর্তে সপল্লব আম্রগুচ্ছ বিদ্যমান, যা গণপতির সিদ্ধি ও সুফলের প্রতীক বহন করে।

ব্যাসাল্ট পাথরে নির্মিত মূর্তিটির আনুমানিক সময়কাল হল একাদশ-দ্বাদশ শতক। অর্থাৎ পালনৃপতিদের শাসনকালে (৭৫০-১১৭৫-‘৭৬ খ্রি.) এই ধরনের ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছিল। এই ধরনের কৃষ্ণপ্রস্তরের (ব্যাসাল্ট বা কষ্টিপাথর) উৎপত্তিস্থল ছিল রাজমহল পাহাড়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ভাস্কর্যটির সময়কাল নির্ণয় করার কোনো বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষার কথা জানা যায়নি।

এই শিল্পকর্মে শিল্পীর কোনো নামোল্লেখ নেই। খ্যাতি বা আত্মপ্রচারের অভিলাষী তিনি ছিলেন না। কিন্তু তাঁর অতুলনীয় শিল্পকীর্তি থেকে একথা স্পষ্ট প্রতীয়মান যে, শিল্পীর উপলব্ধির গভীরতা ছিল অসীম। তিনি শুধুমাত্র শিল্পী নন; শিল্পের অন্তরালে তিনি যেন ভারতীয় ধর্ম-সংস্কৃতির ক্রমবিবর্তনের এক পারঙ্গম বিদ্যোৎসাহী দার্শনিক। বস্তুতপক্ষে তিনি তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জিত সাধনলব্ধ জ্ঞানের অনপনেয় স্পর্শ রেখে গেছেন ভাস্কর্যের প্রতিটি নকশায় ও রূপকল্পে।

বঙ্গে গণপতির জনপ্রিয়তা ম্লান হল কেন?

অতীতে ক্ষীণভাবে হলেও গাণপত্য সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব বঙ্গে ছিল। কিন্তু আদি মধ্যযুগ বা তার পরবর্তীকালে অবিভক্ত বাংলায় গণপতির উপাসনা ততটা জনপ্রিয় হয়নি। কারণ অবশ্যই রাজপৃষ্ঠপোষকতার অভাব—গৌড়রাজ শশাঙ্ক ছিলেন শৈব, পালনৃপতিগণ ছিলেন বৌদ্ধ এবং সেন রাজন্যবর্গ ছিলেন বৈষ্ণব ধর্মের অনুরাগী। শুধু তাই নয়, সেন আমলেই অবিভক্ত বঙ্গে সর্বাধিক সংখ্যায় বিষ্ণুমূর্তি নির্মিত হয়েছিল, যা আদি মধ্যযুগে ভারতবর্ষের যেকোনো অঞ্চলে বিরল। স্বাভাবিকভাবেই রাজপৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফল সেদিন গাণপত্য সম্প্রদায়ের পক্ষে সুখকর হয়নি। দ্বিতীয়ত, পূর্ব-ভারতে মাতৃ-উপাসনার বাড়বাড়ন্ত গণপতির জনপ্রিয়তাকে তমসাবৃত করেছিল।

১২০৪-৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় তুর্কি আক্রমণের পরবর্তী সময়ে লৌকিক দেবদেবীদের জনপ্রিয়তা প্রভূত বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হল মঙ্গলকাব্যগুলি। সর্বোপরি, ষোড়শ শতকে চৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫৩৪ খ্রি.) গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রাবল্যে শেষপর্যন্ত গণপতির উপাসনাকে বঙ্গে ম্লান করেছিল।

তথ্যসূত্র 

১) রমেশচন্দ্র দত্ত অনুদিত, ঋগ্বেদ সংহিতা (১ম খণ্ড), হরফ প্রকাশনী, ১৩৮৫ বঙ্গাব্দ

২) পণ্ডিত শ্রীসতীশচন্দ্র শীল, দেবদেবীতত্ত্ব (প্রথম খণ্ড), ভারতী পাবলিশিং, ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ

৩) জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পঞ্চোপাসনা, ফার্মা কে এল এম, ১৯৬০ সাল

৪) নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ধর্ম ও সংস্কৃতি : প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৫ সাল

৫) পণ্ডিতবর অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, লক্ষ্মী ও গণেশ, পুরোগামী প্রকাশনী, ১৯৬৩ সাল

৬) হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য, হিন্দুদের দেবদেবী : উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ (২য় খণ্ড), ফার্মা কে এল এম, ২০১৫ সাল

৭) কল্যাণকুমার দাশগুপ্ত, প্রতিমা শিল্পে হিন্দু দেবদেবী, পঃ বঃ বাংলা আকাদেমি, ২০১৬ সাল

৮) দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, লোকায়ত দর্শন (২য় খণ্ড), নিজ এজ, ১৩৬৩ বঙ্গাব্দ

৯) অরিন্দম রায় সম্পাদিত, মুর্শিদাবাদ অনুসন্ধান (৬ষ্ঠ খণ্ড), মূল প্রবন্ধ : ইতিহাস ও মূর্তিতত্ত্বের আলোকে গণেশ এবং মুর্শিদাবাদে গণেশ মূর্তির অনুসন্ধান, মুর্শিদাবাদ জেলা ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র, ২০২২৷

১০) লুই রেনু, রিলিজিয়াস অব অ্যানসেন্ট ইন্ডিয়া , ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, ১৯৫৩৷

১১) টি. এ. গোপীনাথ রাও, এলিমেন্টস অব হিন্দু আইকোনোগ্রাফি (ভল্যুম ১, পার্ট ১), মতিলাল বানার্সিদাস, নতুন দিল্লি, ২০১৭৷

১২) অ্যালিস গেট্টি, গণেশ: এ মনোগ্রাফ অন দি এলিফ্যান্ট ফেসড গড, পিলগ্রিম পাবলিশিং, ২০০৬৷

১৩) রবার্ট এল. ব্রাউন, গণেশ: স্টাডিজ অব অ্যন এশিয়ান গড, শ্রীসতগুরু পাবলিকেশন, ১৯৯৭৷

১৪) পি. ভি. কানে, হিস্ট্রি অব ধর্মাশাস্ত্র (ভল্যুম ২, পার্ট ১), পুনা, ১৯৪১৷

১৫) এনামূল হক, বেঙ্গল স্কাল্পচারস: হিন্দু আইকোনোগ্রাফি আপটু ১২৫০ এ. ডি., বাংলাদেশ জাতীয় মিউজিয়াম, ঢাকা, ১৯৯২৷

১৬) এ. এল. ব্যাশাম, দ্য ওয়ান্ডার দ্যাট ওয়াজ ইন্ডিয়া, পিকাডোর, লন্ডন, ২০০৪৷

১৭) কর্নেল এইচ. এস. জারেট কর্তৃক অনূদিত, আইন-ই-আকবরী অব আবুল ফজল (ভল্যুম ২), রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল, ১৯৪৯৷

শীর্ষক চিত্র পরিচিতিঃ মহালন্দী গ্রামে প্রাপ্ত গণপতির প্রাচীন মূর্তি

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

শক্তিনাথ ঝা (বহরমপুর), সুভাষ পাণ্ডে (জিয়াগঞ্জ), আবরার হোসেন (মহালন্দী) ও মুর্শিদাবাদ বীক্ষণ।

ইতিহাসের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, দুই বন্ধু মিলে ‘অঙ্গাঙ্গি’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন কান্দি থেকে

মন্তব্য তালিকা - “বঙ্গে গণপতি”

  1. কিছুদিন পূর্বে মথুরা মিউজিয়াম ঘুরে আসার পর থেকে গণেশ এর দেবত্বলাভ সংক্রান্ত ব্যাপারে কৌতূহলী হয়েছিলাম।ধন্যবাদ আপনাকে, এই প্রবন্ধে তার নিরসন হল।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।