সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

নিয়োগ প্রথা ও নারীর অবস্থান

নিয়োগ প্রথা ও নারীর অবস্থান

সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়

জুলাই ২৬, ২০২৫ ৭০৬ 2

প্রথম পর্ব

আমাদের প্রাচীন সাহিত্যগুলি পাঠ করলে বোঝা যায় যে সন্তানের জন্মদান মানব মানবী উভয়ের ক্ষেত্রেই ছিল একটি ধর্মীয় ও সামাজিক কর্তব্য। প্রায় ৩.৫ হাজার বছর আগের ঋগ্বেদ-এর স্তোত্রে বলা হয়েছে, বংশধারাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নরনারীর দৈহিক মিলন আবশ্যিক কর্তব্য। বিবাহের উদ্দেশ্য ছিল কুলরক্ষা অর্থাৎ সন্তান উৎপাদন। ঋগ্বেদ দশম মন্ডল-এর সূর্যা বিবাহ স্তোত্রে প্রজাপতিকে আহ্বান করা হয়েছিল এই বলে যে, সন্তান উৎপাদনের দ্বারা আমরা যেন এগিয়ে যেতে পারি। প্রায় ২ হাজার বছর আগের মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে, নারীর জন্ম সন্তান উৎপাদনের জন্য ও পুরুষের বংশগতি রক্ষা করার জন্য। স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নৈতিক ও ব্যবহারিক আদর্শ এটাই।

বংশ রক্ষার জন্য কাঙ্ক্ষিত ছিল পুত্র সন্তান। আদিম সমাজ যত জটিল হতে থাকে, ব্যক্তিগত সম্পদের উদ্ভব ঘটতে থাকে, ততই পুত্র সন্তানের আকাঙ্ক্ষা বাড়তে থাকে। কারণ তারাই হল কুলরক্ষক, সম্পত্তির উত্তরাধিকারী এবং কৌলিক ও পারলৌকিক নিয়মাদি পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত। ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনে পুত্র সন্তান না থাকা যেহেতু একটি গুরুতর বিপদ, তাই পুত্রসন্তানের অভাব মেটাতে বিকল্প উপায় খোঁজার দরকার হয়েছিল। নিয়োগ প্রথা হল এইরকম একটি পরিবর্ত উপায়। এক্ষেত্রে একজন সদ্যবিধবা বা একজন সন্তান উৎপাদনে অক্ষম পুরুষের স্ত্রীকে, ‘মনোনীত’ কোনো ব্যক্তির সংসর্গ করতে হত। শাস্ত্রে একে আপদ্ধর্ম বলে অভিহিত করা হয়েছে। প্রাচীন সাহিত্যে বিশেষ করে সংস্কৃত সাহিত্যে এই ধরনের ঘটনার অজস্র উদাহরণ আছে এবং এসব ক্ষেত্রে যদি অন্য কোনো কারণ দেখানোও হয় তবুও বলা যায় এর মূল উদ্দেশ্যই ছিল বংশগতি রক্ষা।

কিছু প্রশ্ন 

এই নিয়োগ প্রথা কি সমাজের কোনো একটি শ্রেণীর সুবিধার্থে নাকি সমাজের সকল স্তরের মানুষের সুবিধার ভাবনা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল? এই প্রথা নারীর মানসিক স্বস্তি এনেছিল নাকি যৌন শোষণের রাস্তা খুলে দিয়েছিল? তাদের কি এটা প্রত্যাখ্যান করার কোনো অধিকার ছিল—নাকি তাদের সম্মতি ব্যতিরেকেই তাদেরকে এই প্রথায় নিয়োজিত করা হত? এক্ষেত্রে ক্ষত্রিয়রা যতটা উৎসাহী ছিল, ব্রাহ্মণ বা অন্য সম্প্রদায়ের উৎসাহ কি ততটাই ছিল? আবার এই ধরনের মিলনে যদি কন্যাসন্তানের জন্ম হত, তাহলে তাদের সামাজিক অবস্থানই বা কেমন হত? নারীরা কি এই প্রথাকে স্বাভাবিক সামাজিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিতেন নাকি সমাজের কোনো স্তরের কোনো মহিলা এটির প্রতিবাদের প্রয়াস পেয়েছিলেন?

এইভাবে এই প্রথা আমাদের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন করে দেয়।

বলে নেওয়া ভালো, যদিও লেখার শিরোনামে ‘নারীর অবস্থান’ কথাটি রয়েছে তবুও এক্ষেত্রে যতদূর সম্ভব নারীবাদকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ, ওই ধারণার প্রতি দায়বদ্ধতা, ধারণার কিছু সীমাবদ্ধতা, সামগ্রিকভাবে মানবজাতির ও অংশত নারীর, আলোচ্য বিষয় সম্পর্কিত আলোচনাকে কিছুটা হলেও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারে। আরও কারণ আছে—এটা ইচ্ছাকৃতভাবে এই চিন্তাধারার দিকে ধাবিত করে যে নারী সমাজের পৃথক একটি অংশ যাদের বিশেষ একটি কার্য সাধনের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ বৃহত্তর প্রেক্ষিতটি, বিশেষ করে এই ক্ষেত্রে, খণ্ডিত  হয়ে যেতে পারে এবং হয়তো  একমাত্র নারীবাদকেই সামনে রাখা হতে পারে।

প্রায় সমস্ত জাতি (cast) পরিবারে জন্ম থেকে মেয়েদের  শেখানো হত যে পুত্রবতী হওয়া তাদের সবচেয়ে বড়ো  সৌভাগ্যের প্রতীক। এই সন্তান (এক্ষেত্রে পুত্র ) জন্মদানের ক্ষমতার জন্য একদিকে যেমন তারা এক প্রকার সম্পদ (asset)-এর মর্যাদা পেত তেমনি পুত্রের অভাবে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের কাছে তাদের অভিভাবকত্ব ক্ষুন্ন হত। আবার সেই যুগের পরিপ্রেক্ষিতে এই নিয়োগপদ্ধতির প্রতিবাদ অনেক ক্ষেত্রে না হবার অন্য একটি জোরালো কারণ ছিল। তখনকার পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থায় সর্বদাই নারীদের ছোটবেলা থেকে পুরুষের প্রতি নির্ভরশীল মনোভাব গড়ে তোলা হত। কাজেই আলোচ্য প্রথাটির মাধ্যমে নারী পুত্রবতী হবার মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তা ও বিশেষ অধিকারের স্বাদ পেত। এছাড়া নিঃসন্তান অর্থাৎ নিপুত্র হয়ে কঠোর বৈধব্যকে (যখন সদ্য বিধবার ক্ষেত্রে এই প্রথাটি প্রযোজ্য হত) আরও কঠোরতর করার চাইতে পুত্রবতী হওয়া কাঙ্খিত ছিল। পরবর্তীকালে তো অনেক সময়ে সতী হতে বাধ্য করা হত—তার চাইতে পুত্রবতী হওয়া কাঙ্খিত ছিল। কারণ অপুত্রক নারীর সতী করার সম্ভাবনা বেশি থাকত। অবশ্য পুত্র থাকলেই সতী হতে হবে না এমন কোনো নিশ্চয়তাও তো ছিল না। সম্ভবত ব্যতিক্রম ছিল গর্ভবতী নারী। যাইহোক, সে অন্য প্রসঙ্গ।

স্বামী, স্ত্রীর যৌন শুদ্ধতাকে অত্যন্ত বেশি গুরুত্ব দিত, যেহেতু এর সঙ্গে তার সঠিক বংশধরের নিশ্চিতকরণের প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকতো। এই ধরনের নিয়ম কানুন ও ঐতিহ্যের ধারণার মধ্যে দিয়ে নারীকে বড়ো করা হত; ফলে যৌনতা বিষয়ে তো বটেই, অন্য সব ক্ষেত্রেই তাদের জীবনের স্বাভাবিক চলমানতা পদে পদে বাধা প্রাপ্ত হত।

কিন্তু বিস্ময়ের কথা এই যে, সে ই সমাজই নিয়োগ প্রথার মতো  অদ্ভুত দ্বিচারিতার আশ্রয় নিতে দ্বিধা বোধ করত না – এবং সেটাও করা হত ওই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অঙ্গুলিহেলনে। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারের বয়স্কা মহিলারাও এ বিষয়ে ভূমিকা নিতেন । যেমন সত্যবতীর উদাহরণ। এখন বলা যেতে পারে,সত্যবতী মহাকাব্যের চরিত্র। তাই সত্যবতী ‘সত্য’ না হতেও পারেন। কারণ ‘মহা’ হলেও মহাভারত কাব্যই। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে মহাভারত, সেকেন্ডারি সোর্স হলেও ইতিহাসের উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।  তাছাড়া সাহিত্য তো সমাজের দর্পণ। তাই সত্যবতীর মতো চরিত্রের অস্তিত্ব যে সমাজে ছিল, সে সম্পর্কে সন্দিহান হবার জোরালো কারণ নেই। বিশেষ করে রাজা হবার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষার মতোই রানী/রাজমাতা/ রাজনিয়ন্ত্রিকা হবার ইচ্ছাও মোটেই দুর্লভ কিছু ছিল না।

দ্বিতীয় পর্ব

নিয়োগ প্রথা সম্পর্কিত উপাদানগুলি মূলত সংস্কৃত সাহিত্য থেকে পাওয়া গেছে। এবং সেগুলিতে উচ্চ বর্গীয় পরিবারের কাহিনী বেশি উল্লেখিত। যথারীতি এসব গ্রন্থ পুরুষ লিখিত। ফলে এ বিষয়ে নারীর মনোভাব ঠিক কেমন ছিল তার প্রকৃত প্রতিফলন পাওয়া দুষ্কর। তবে সরাসরি ভাবে না হলেও বিভিন্ন উপাখ্যানের মাধ্যমে তাদের কণ্ঠস্বর আমাদের কানে এসে পৌঁছায়।

যেটুকু জানতে পারা যায় তাতে দেখা যায় যে, সব নারী বিনা প্রতিবাদে এই প্রথাকে মেনে নেননি। হতে পারে সেসব প্রতিবাদ ছিল পরোক্ষ—তবু ছিল। যেমন কুন্তী যখন সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হয়ে যাওয়া পান্ডুর কাছ থেকে এই প্রস্তাব পেলেন তখন তিনি সহজে রাজি হননি। তাঁর যুক্তি ছিল, নারী কেবলমাত্র স্বামীকেই ভালোবাসে এবং মিলনের আনন্দ একমাত্র স্বামীর কাজ থেকেই পেতে ইচ্ছুক। সে কেন অন্যের সঙ্গে এই সম্পর্ক গড়বে! শেষপর্যন্ত অবশ্য কুন্তী পান্ডুর  একান্ত অনুরোধে কেবল দেবতাদের সঙ্গে সঙ্গমে রাজি হন। পার্থিব সংসারের কোনো মানুষের সঙ্গে নয়। এখানে এই ‘দেবতা’ র স্বরূপ নিয়ে নানা প্রশ্ন বা সন্দেহ থাকতেইপারে। কিন্তু তা আমাদের বর্তমান আলোচনার বিষয়বস্তু নয় । এরও আগে ধৃতরাষ্ট ও পান্ডুর মাতা অম্বিকা এবং অম্বালিকাও কিন্তু পরোক্ষে এই নিয়োগ প্রথাতে তাঁদের বিরোধিতা জানিয়ে ছিলেন। স্বামী বিচিত্রবীর্য মারা যাবার ঠিক পরেই শশ্রুমাতা সত্যবতীর আদেশে ব্যাসদেবের সঙ্গে মিলনের সময়ে প্রথম জন চোখ বন্ধ করে নিয়েছিলেন, পরেরজন ভয়ে পান্ডুবর্ণ ধারণ করেছিলেন। এই দুটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে তাঁদের পরোক্ষ অসম্মতিও কি প্রকাশ পায় না?

রানী সুদেষ্ণার ক্ষেত্রেও এইরকম ঘটনা ঘটেছিল। রাক্ষসরাজ বলি ছিলেন নিঃসন্তান তাই তিনি রানীকে ঋষি দীর্ঘতমার বীর্যে সন্তান উৎপাদনের প্রস্তাব দেন। অন্ধ বৃদ্ধ এবং জনশ্রুতি মতে বিকৃতকাম এক ঋষির সঙ্গে মিলনে নিতান্ত অনিচ্ছুক সুদেষ্ণা গোপনে এক দাসীকে দীর্ঘতমার কাছে পাঠান। কিন্তু বলি তা জানতে পারেন; ফলে স্বামীর আজ্ঞা সুদেষ্ণাকে পালন করতে হয়।

সুতরাং নিয়োগ প্রথা যে অনেক নারীর কাছে কাঙ্খিত ছিল না তা বোঝা যায়। এই ঘটনা গুলিকে কেবলমাত্র প্রাচীন বা পৌরাণিক কাহিনী বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। এই ঘটনাগুলি বোঝায় নারীকে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র বানানো প্রচেষ্টা ছিল। তাকে অজানা পর-পুরুষের সঙ্গে এমনকী মিলনে উৎসাহ দেওয়া বা বলা ভালো,বাধ্য করার চিহ্ন তো বটেই ।

এই বিষয়ে আরও এক ধরনের ঘটনা বিভিন্ন পরিবারে দেখা যেত। তা হল স্বামীর মৃত্যুর পরেই দেবরের সঙ্গে মিলন। যতই দেবর কথার অর্থ ‘দ্বিতীয় বর’ করা হোক না কেন, এতদিন যাকে ওই নারী স্বামীর অনুসরণে ভাইয়ের দৃষ্টিতে দেখেছে, তার সঙ্গে সংসর্গে কি তাদের সকলের রুচি থাকত? আনুমানিক ১ম-২য় শতাব্দীর একটি প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যকর্ম ‘গাথাসপ্তশতী’। এটি মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত ভাষায় রচিত—এটি মূলত প্রেম এবং প্রকৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে রচিত। এই বিষয়ে ‘গাথাসপ্তশতী’ আমাদের দুরকম চিত্রই অবশ্য দেয়। একটি গাথায় দেখা যায় ভ্রাতৃবধূ দেবরকে তার সম্পর্কে আপত্তিজনক মনোভাব থেকে বিরত হতে বলছে। সে এই বিষয়ে লক্ষণের উদাহরণ দিচ্ছে। অন্যটিতে ভ্রাতৃবধূই আবার দেবরকে প্রলোভিত করছে। গাথাসপ্তশতীতে যেহেতু এই উদাহরণ পাওয়া গেল, সেহেতু মনে হয় এই প্রথা সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রচলিত ছিল।

আলোচিত বিষয় একটি কাহিনী তুলে ধরা দরকার। এটি মাধবীর করুণ জীবনচিত্র। ঋষি গালবকে দেওয়া পিতা যযাতির প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য কন্যা মাধবী চার চার বার ভিন্ন ভিন্ন রাজার শয্যাসঙ্গী হতে বাধ্য হয়েছিলেন ও তাদের মনোমত পুত্র প্রদান করে গালবকে এক বিশেষ ঘোড়া পাইয়ে দিয়েছিলেন। গালব আবার এই বিশেষ ঘোড়া গুরুদক্ষিণা হিসেবে প্রদানে প্রতিশ্রুত ছিলেন। মাধবীর উদাহরণ যেন একপ্রকার ‘নিয়োগ’ প্রথা!

আবার বাধ্য হয়েও অনেকে এই প্রথার শরন নিতেন। পরশুরাম যখন পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়শূন্য করার প্রতিজ্ঞা করলেন ও কিছুটা তাই করলেনও, তখন অনেক ক্ষত্রিয় বধূ স্বামীর বংশরক্ষার তথা রাজ্যপাট রক্ষার জন্য স্বেচ্ছায় নিয়োগ প্রথার আশ্রয় নিয়েছিলেন।

অন্যদিকে তখনকার সাধারণ নিয়ম ছিল এই যে একজন পুরুষ নারীর সঙ্গে তার উর্বর সময়ে বা ঋতুর আগমনের সময়ে মিলিত হবে। এমন অনেক কাহিনী আছে যেখানে দেখা যায় স্বামীর নির্দেশ না থাকা সত্ত্বেও নারী ওই বিশেষ সময়ের দোহাই দিয়ে অন্য পুরুষের  সঙ্গ আকাঙ্ক্ষা করেছে। মহাভারতে বর্ণিত উতঙ্কের কাহিনী এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কোনো কারণে উতঙ্কের গুরুর  কিছুদিন আশ্রমে অনুপস্থিত থাকার প্রয়োজন ঘটেছিল। তিনি শিষ্য উতঙ্কের উপর ভার দিয়েছিলেন তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর পরিবার ও আশ্রমের দায়িত্ব নেবার। উতঙ্ক অত্যন্ত নিষ্ঠাভরে আশ্রম ও গুরুর পরিবারের দেখাশোনা করছিলেন। এই  সময়ে একদিন গুরুপত্নী তাকে মিলনের আহ্বান জানান নিজের ঋতু সমাগমের দোহাই দিয়ে। কারণ তা না হলে স্বামীর অনুপস্থিতিতে উক্ত সময় বিনষ্ট হয়ে যাবে। উতঙ্ক এই প্রস্তাব পাপজ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করে। প্রায় এমনই আরেকটি কাহিনী রয়েছে মহাভারতেই উলুপী সম্পর্কে। সে অর্জুনকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তার ঋতুরক্ষার আহ্বান জানায়। অর্জুন সে সময় ১২ বছরের জন্য বনবাসী ছিলেন ও ব্রহ্মচর্য ব্রত (!) নিয়েছিলেন। কিন্তু সে কথা বলা সত্বেও উলুপীকে নিরস্ত করা যায়নি। এদের পুত্র ইরাবান। সুরুচি জাতকেও মহিলার তরফ থেকে একই প্রকার আহ্বানের নজির আমরা পাই। সুতরাং কোনো গল্পই পুরো সাদা বা পুরো কালো হয় না।

শেষ প্রশ্ন, নিয়োগ প্রথায় জন্ম নেওয়া কন্যাগুলির গতি কী হত! সেই আলোচনায় আসা যাবে শেষ পর্বে।

শেষ পর্ব

নিয়োগ প্রথা সম্পর্কে দুই পর্বের আলোচনার পর, শেষ প্রশ্ন ছিল, এই প্রথা জাত কন্যাসন্তানদের অবস্থান নিয়ে। নিয়োগ প্রথা প্রয়োগ করলেও পুত্রই যে হবে সে নিশ্চয়তা থাকতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রেই কন্যা সন্তান জন্ম নিত। তাদের বিষয়ে সমাজের দৃষ্টি কেমন ছিল বা তাদের গতিই বা কী হত এই কৌতুহল মনে আসে। যতদূর জানা যায় সামাজিক আইনবিধি প্রণেতাগণ পুত্র সন্তান বিষয়ে এত বেশি আবেশিত ছিলেন যে এভাবে জাত কন্যা সন্তানদের সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য তারা রেখে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। এই বিষয়ে তারা নীরব। তবু সামান্য কিছু তথ্য পাওয়া যায়।

মেধাতিথি হল মনুস্মৃতির প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে বিখ্যাত ভাষ্যকারদের একজন, যা সাধারণত মনুর আইন নামে পরিচিত৷ মেধাতিথি তাদের সম্পর্কে ‘নিয়োগউৎপন্না’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তিনি এইভাবে জাত কন্যাদের বিবাহ করা উচিত কাজ নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন। বিবাহযোগ্যা মেয়েদের যেসব গুণ/চিহ্ন থাকা উচিত (যেমন জাত-গোত্র), এরা তার বহির্ভূত নারী। এমনকী এদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, এরা নারী পুরুষের নিয়মবিরুদ্ধ মিলনে সৃষ্ট। তাই এদের বিবাহ না করাই ভালো। এই প্রবণতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। এরা সমাজের অনভিপ্রেত আলাদা গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। এই সঙ্গে এই ‘নিয়োগউৎপন্না’ বা ‘অমৈথুনী’-দের সঙ্গে তাদের পিতা বা পিতার পরিবারের কোনো সম্পর্ক থাকত না। অন্তত থাকা উচিত নয় বলেই ভাষ্যগুলিতে মত প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ সম্ভবত, তার জন্মই পিতার বংশধারা ও সম্পত্তি রক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত।

নির্ণয়সিন্ধু নামক অন্য এক গ্রন্থে এদের বলা হয়েছে ‘নিয়োগক্ষেত্রজা’। কাত্যায়নের মতে এদের যদি বিবাহ হয়ও সেক্ষেত্রে কন্যাদান করবে মাতুল, মাতামহ বা মায়ের কাকা জ্যাঠা স্থানীয় ব্যক্তিরা। নিয়োজিত পিতা অথবা যার স্ত্রীর প্রতি নিয়োগ কার্য সাধিত হয়েছিল তাদের কোনো সংশ্রব এক্ষেত্রে থাকবে না। অর্থাৎ এদের স্বীকৃত সম্পর্ক একমাত্র মাতৃকুলের সঙ্গে। সম্ভবত নারীরা সন্তান জন্ম দেবার সময় অনেক ক্ষেত্রেই সাময়িক ভাবে পিতৃগৃহে থাকত, যে রেওয়াজ এখনো আছে, এবং এই ধরনের সন্তানের ক্ষেত্রে কন্যা হলে তাকে সেখানে রেখেই মাতাকে ফিরে আসতে হত। শ্বশুর বাড়িতে জন্মালেও কন্যা সন্তানকে মাতার বাপের বাড়িতে দিয়ে আসা হত। সে সেখানেই প্রতিপালিত হত। তবে সেটাও যে খুব যত্নের সঙ্গে হত না,তা নিশ্চয় বলা যায়। বীরমিত্রোদয় নামক অপর এক গ্ৰন্থেও একই বিধান পাওয়া যায়। বীরমিত্রোদয় হল একটি বিখ্যাত হিন্দু ধর্মশাস্ত্র এবং এটি মিতাক্ষরা ধারার অন্তর্গত। এটি মিত্র মিশ্র দ্বারা সম্রাট জাহাঙ্গীরের (১৬০৫-১৬২৭) পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত হয়েছিল। অদ্ভুত ব্যাপার এই যে, কোথাও কোথাও আবার এদের ধর্মজা বলে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গেই পিতৃসংসর্গ থেকে বিচ্যুত রাখার বিধান দেওয়া হয়েছে। এ এক বিচিত্র বৈপরীত্য!

এটাও স্পষ্ট নয় যে তারা ‘পুত্রিকা’ র মর্যাদা পেতো কিনা। পুত্রিকা হল পুত্রহীন পিতার কন্যার পুত্র, যে মাতামহের পারলৌকিক কাজ করতে পারত। সম্পত্তির ভাগও কিছু পেত। অবশ্য পুত্রিকারাও যে খুব সম্মানীয়া ছিলেন এমনটা নয়। মহাভারতে ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দিয়েছেন; যে নারীর ভ্রাতা নেই অর্থাৎ যার পিতা কেবল কন্যাসন্তান উৎপাদন করেছেন সেই ধরনের পরিবারে বিবাহ না করাই ভালো।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নিয়োগ জাতা কন্যার মর্যাদা ছিল নিকৃষ্ট। যদিও এই বিষয়টি আরও গবেষণার দাবি রাখে।

এই লেখার প্রথম পর্বে লিখেছিলাম যে আলোচনার মধ্যে নারীবাদী ধারণাকে না আনাই শ্রেয়। কিন্তু সমগ্র আলোচনার শেষে একটি প্রশ্ন মনে আসছে। আজ আমরা মুখে বলি পুত্র কন্যা দুই-ই সমান। অনেকেই কন্যা সন্তান কামনা করি। আজ পুত্র কন্যা সমান ভাবে শিক্ষার সুযোগ পায়। দুজনেই বৃদ্ধ-অথর্ব পিতা-মাতার দায়িত্ব নেয়। অথবা উভয়ের কেউই নেয় না। যাই হোক, তবুও সমাজে, এমনকি সব পিতামাতার কাছেও কন্যা সন্তান কি অতটাই অভিপ্রেত যতটা পুত্র সন্তান? এক পুত্রের শিক্ষিতা মাকে দ্বিতীয়বারের গর্ভাবস্থায় বলতে শুনেছি, ‘আর তো ভয়ের কিছু নেই। আমার তো ছেলেই হয়েছে প্রথমে।’ অবশ্য এই ধরণের উক্তি, বিশেষত জনসমক্ষে উচ্চারিত হয় কম। মানসিকতা অনেক উন্নত হয়েছে তা অনস্বীকার্য। নিয়োগ প্রথার মতো রীতিও নেই, অন্তত প্রকাশ্যে। তার একটা বড়ো কারণ বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে। কিন্তু আমরা সমষ্টিগতভাবে কতটা এগিয়েছি? যদি এগিয়েই থাকি তবে আজও সমাজে কন্যাভ্রুণ হত্যার প্রচলন কেন? ‘কন্যাদায়’-এর মতো শব্দবন্ধ, মাঝেমাঝে হলেও ব্যবহৃত হয় কেন?

প্রচ্ছদ চিত্র পরিচিতি: কুন্তী ও পাণ্ডব। সকলেই নিয়োগ প্রথাতে জন্মলাভ করেছেন। কোনো মেয়ে সন্তান অবশ্য হয়নি। চিত্রাঙ্কণ-নন্দলাল বসু

তথ্যসূত্র

  • মহাভারত, মনুস্মৃতি, মেধাতিথি ও অন্যান্য লেখকদের ভাষ্য, আপস্তম্ভ বৌধায়ন ধর্মশাস্ত্র ইত্যাদি।
  • A.S. Altekar, The position of women in Hindu civilization: From Prehistory times to the Present Day. (Motilal Banarsidass,2016).
  • Uma Chakraborty, Women, men and beasts: The Jataka as popular tradition. Sage journals, 9(1), (1993).
  • Smitha Sahgal. Niyoga Alternative Mechanism to Lineage Perpetuation in Early India A Socio-Historical Enquiry. Social Scientist, 47(5/6) (2019).

মন্তব্য তালিকা - “নিয়োগ প্রথা ও নারীর অবস্থান”

  1. “হুতোম প্যাঁচার নকশা” কালীপ্রসন্ন সিংহ ‘হুতম প্যাঁচা’ ছদ্মনাম নিয়ে রচনা করেন। এই নকশাটি উনিশ শতকের কলকাতার সমাজ ও জীবনকে তুলে ধরেছে। এতে তৎকালীন সমাজের নানা অসঙ্গতি ও রীতিনীতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
    “হুতোম প্যাঁচার নকশা” ১৮৬৩ ও ১৮৬৪ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ আকারে প্রকাশিত হয়।
    কলকাতার কথ্য ভাষাকে সাহিত্যে প্রথম স্থান দেওয়া হয়েছে এই পুস্তকে। এতে তৎকালীন কলকাতার সমাজ, রীতিনীতি, উৎসব, মেলা, অলঙ্কার, পল্লীচিত্র ইত্যাদি নানা বিষয় স্থান পেয়েছে। লেখক সমাজের নানা অসঙ্গতি ও কুসংস্কারকে বিদ্রূপ ও হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এই পুস্তকের একটি অধ্যায়ে ‘নিয়োগ প্রথা’ তখনকার কলকাতার সামাজে ক্যামন ছিল, তা নিয়ে আলোচনা আছে। তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দুর বিবাহিত স্ত্রীকে প্রথমে ভোগ করছে উচ্চবর্নীয় কোন হিন্দু – সেই কুপ্রথার বর্ননা আছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।