সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সম্পাদকীয়

এপ্রিল ১৪, ২০২২

‘বর্ষ গেল, বর্ষ এল’

আজ বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে ভারতীয় উপমহাদেশে বর্ষশুরুর দিনের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে উনিশ শতকের শেষ দশকে গিরিশ চন্দ্র তর্কালঙ্কার ও প্রাণ নাথ সরস্বতীর লেখা ‘ক্রনোলজিক্যাল টেবলস’ আর রবার্ট সিওয়েল ও শংকর বালকৃষ্ণ দীক্ষিতের লেখা ‘দ্য ইন্ডিয়ান ক্যালেন্ডার’ গ্রন্থদুটি থেকে প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকে প্রচলিত বেশ কয়েকটি সনের নামের সন্ধান পাওয়া গেল। এদের মধ্যে কলিযুগ, সপ্তর্ষি সংবৎ বা লৌকিক অব্দ, শকাব্দ বা শালিবাহন অব্দ, মালব সংবৎ বা বিক্রম সংবৎ, বৃহস্পতি চক্র বা বার্হস্পত্য সংবৎ, বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ, ফসলি সন, বিলায়তি সন, কোল্লম আণ্ডু, আমলি সন, নেওয়ার বা নেপাল সংবৎ, এবং মগী সন এই গ্রন্থদ্বয় প্রকাশের সময় প্রচলিত ছিল। এই সব প্রচলিত সনগুলির কালনির্ণয়ের জন্য বিগত কয়েক শতাব্দী যাবৎ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু সংখ্যক সৌর পঞ্জিকা বা চান্দ্র-সৌর পঞ্জিকা অনুসরণ করা হচ্ছে। এই পঞ্জিকাগুলিতে নববর্ষের সূচনার দিনগুলির ভিন্নতা থেকে অনুমান করা যায় বৈচিত্র্যময় এই উপমহাদেশে নববর্ষের দিনটি কখনওই এক ছিল না।

আদি মধ্যযুগে লেখা ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ গ্রন্থে মহাবিষুব সংক্রান্তি থেকে সৌর বছরের গণনা শুরু করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আনুমানিক দুই সহস্রাব্দ পূর্বে বাস্তবেই এই দিনটি ছিল মেষ সংক্রান্তি, অর্থাৎ সূর্য মেষ রাশিতে আপাত গমন করত, কিন্তু বর্তমানে এই দিনটিতে সূর্যের আপাত অবস্থান মীন রাশিতে। এই উপমহাদেশের যে সব অঞ্চলে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের মত সৌর পঞ্জিকার প্রচলন আছে, সেখানে জ্যোতিষ গ্রন্থের গণনা থেকে প্রাপ্ত মেষ সংক্রান্তির দিন থেকে সৌর বৈশাখ মাস ও নতুন বছর, উভয় শুরু হয়। ওড়িশায় প্রচলিত বিলায়তি সনের ক্ষেত্রে একই ভাবে জ্যোতিষ গণনা থেকে প্রাপ্ত কন্যা সংক্রান্তির দিন সৌর আশ্বিন মাস ও নতুন বছরের সূচনা হয়। ফসলি সনের সাল বাংলা সন আর বিলায়তি সনের সঙ্গে এক হলেও এই সনের নববর্ষ কিন্তু ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন দিনে পালিত হত।  

সাধারণ অব্দের প্রথম কয়েক শতকের মধ্যেই ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ এলাকায় শকাব্দ অথবা বিক্রম সংবৎ অনুসারী চান্দ্র-সৌর পঞ্জিকার প্রসার ঘটে। অন্ত মধ্যযুগ থেকে উত্তর ভারতে বিক্রম সংবৎ এবং দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে শকাব্দ অনুসরণের বেশি প্রচলন দেখা যায়। প্রাচীন কাল থেকেই শকাব্দ বা শালিবাহন অব্দের অনুসারীরা সৌর মেষ সংক্রান্তি যে চান্দ্র মাসের অন্তর্ভুক্ত সেই চান্দ্র মাসকে চৈত্র মাস এবং ঐ মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথিকে বর্ষের সূচনা বলে মানেন। প্রাচীন কালে বিক্রম সংবৎ অনুসারীদের চান্দ্র-সৌর পঞ্জিকার বর্ষের সূচনা হত চান্দ্র কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথি থেকে। কিন্তু, পরবর্তীকালে শকাব্দ অনুসারীদের প্রভাবে বিক্রম সংবৎ অনুসারীরাও ক্রমশ চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথিকে বর্ষের সূচনা বলে মেনে নিতে শুরু করেন। কিন্তু গুজরাতে প্রাচীন কালের মতই এখনও বিক্রম সংবৎ শুরু হয় কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথি থেকে। বিশ শতক পর্যন্ত গুজরাতের কাঠিয়াবাড়ের হালার এলাকায় বিক্রম সংবৎ শুরু হত আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথি থেকে। মুম্বাইয়ের স্টক এক্সচেঞ্জ আজও প্রত্যেক দীপাবলির দিন নতুন বিক্রম সংবৎ বছরকে স্বাগত জানায় মহরত ব্যবসায়ের মাধ্যমে। নেপাল অব্দের বছরেরও শুরু কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথি থেকে। কাশ্মীরের লৌকিক অব্দের বছর অবশ্য শুরু হয় চৈত্র শুক্লা প্রতিপদ তিথি থেকে।

প্রাচীন ভারতে বছর শুরুর দিনগুলির সঙ্গে অন্ত-মধ্যযুগ থেকে প্রচলিত বিভিন্ন পঞ্জিকার নববর্ষ সূচনার দিনগুলির বিশেষ মিল নেই। কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে আষাঢ় মাসের পূর্ণিমায় সরকারি আর্থিক বছরের সমাপ্তির কথা উল্লেখ করেছেন। লগধের বেদাঙ্গ জ্যোতিষ গ্রন্থ ও বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ অনুযায়ী নতুন বছরের শুরু মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথি থেকে। অন্যদিকে মহাভারতের অনুশাসন পর্বে দেখি বছরের শুরু মার্গশীর্ষ অর্থাৎ অগ্রহায়ণ মাস থেকে। অবশ্য একাদশ শতকে আল বিরুনি তত্কালীন উত্তর ও পশ্চিম ভারতে মার্গশীর্ষ মাসের শুক্লা প্রতিপদ ও চৈত্র মাসের শুক্লা প্রতিপদ – নতুন বছরের সূচনার উভয় দিনের কথাই জানিয়েছেন।

বিগত কয়েক দশক ধরে চৈত্র শুক্লা প্রতিপদের দিনটিকে ‘হিন্দু’ নববর্ষের দিন বলে প্রচার শুরু হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত বহুসংখ্যক বর্ষ প্রারম্ভের দিনের মধ্যে কেবল একটি বিশেষ দিনকে ‘হিন্দু’ বলে চিহ্নিতকরণ অত্যন্ত অযৌক্তিক বলে মনে হয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ভারতের মানুষ সূর্যের আপাত বার্ষিক গতি ও ঋতু পরিবর্তন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। কালের যাত্রাপথে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীরা নবীন বর্ষের সূচনার দিনটিকে নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে, ফসল পাকার সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে স্থির করেছেন, কোনও বিশেষ ধর্মের অনুসরণ করে নয়।

নববর্ষ নিয়ে ইতিহাস অনুসন্ধানের পালা এখানেই শেষ, এখন সৌজন্য বিনিময়ের সময়। আজ পয়লা বৈশাখ, বাংলা সনের প্রথম দিন, ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে শুভেচ্ছা জানানোর দিন। ১৪২৯ বঙ্গাব্দ সবার জীবনে সার্থকতা বহন করে আনবে এই আশা নিয়ে শুরু হোক আমাদের ‘ইতিহাস আড্ডা’র নববর্ষের যাত্রা।