সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সুলতানি যুগের ইতিহাস চর্চা ও বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি

সুলতানি যুগের ইতিহাস চর্চা ও বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি

কুন্তল রায়

আগস্ট ২৯, ২০২০ ৭৯১

(গ্রন্থের নামঃ Muslim Rule in Medieval India: Power and Religion in the Delhi Sultanate; লেখকঃ Fouzia Farooq Ahmed; প্রকাশকঃ I.B. Tauris; প্রথম প্রকাশঃ ২০১৬)

ছাত্রজীবনে সুলতানি যুগের ইতিহাসের ওপর বাংলা পাঠ্যবই বলতে মিহির কুমার রায়, অসিত কুমার সেন- এদের লেখাই ছিল প্রধানত। অনিরুদ্ধ রায় ২০০৫ সালে লিখলেন ‘মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসঃ সুলতানী আমল’। ইংরেজি বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম ছিল সতীশ চন্দ্রের ‘মধ্য ভারতঃ প্রথম খণ্ড (১২০৬-১৫২৬)’। এই বইগুলিতে  সুলতানি যুগের ইতিহাস নিয়ে যে তথ্যের উল্লেখ ছিল  তার প্রথম পরিবর্তন আসে পিটার জ্যাকসনের লেখায়। সত্যি বলতে, ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তার বইটি (The Delhi Sultanate: A Political and Military History) আমাদের বাংলা বইয়ে পড়া অনেক ধারণাকে পাল্টে দিয়েছিল।

একবিংশ শতকের একেবারে গোড়ায় এমন একটি বই আসলে সুলতানি যুগকে নতুন করে দেখা কেবল নয়, ছাত্রজীবনে তৈরি হতে থাকা ইতিহাসের উপর ধারণাকে নতুনভাবে নির্মাণ করে। যারা  ইতিহাসে শোধনবাদী ধারাকে পছন্দ করেন না, তারাও হয়তো এই বইটির গুরুত্ব অস্বীকার করবেন বলে মনে হয় না। পিটার জ্যাকসন কি আশ্চর্যজনকভাবে ভারতবর্ষের সুলতানি যুগের ইতিহাস গবেষণায় জড়িয়ে পড়েন সেই ঘটনাটা সংক্ষেপে বলি। ১৯৭৭ সালে ভারতে মোঙ্গলদের ইতিহাস নিয়ে তার গবেষণাপত্রটি স্বীকৃতি পায়। ঠিক তার দু’বছর পর কিল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজ শুরু করলেও মোঙ্গল ইতিহাস নিয়ে নিজের অনুসন্ধিৎসাকে আরও বিস্তৃত করতে চেয়েছিলেন। এই কারণে ভারতীয় দলিল-দস্তাবেজ এবং ফারসি ভাষা জানাটা তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরই মাঝে তার সাথে পরিচয় হয় মধ্যযুগের ইতিহাস রচনার আরেক কিংবদন্তি সাইমন ডিগবির সাথে। ডিগবিকে সুলতানি যুগের ইতিহাসের শোধন ধারার পথিকৃৎ বলা যেতেই পারে। এই দুজনের ঘনিষ্ঠতা যত বাড়তে লাগলো, পিটার জ্যাকসন ততই ভারতের সুলতানি যুগ সম্বন্ধে আগ্রহী হয়ে উঠতে লাগলেন। অথচ গবেষণার জন্য তিনি যে ছাড়পত্র পেয়েছিলেন তা ছিল মোঙ্গলদের উপর। যাই হোক, জ্যাকসনের সুলতানি যুগ সম্বন্ধে লেখালেখি এতে বাধাপ্রাপ্ত হয়নি।

পিটার জ্যাকসনের দিল্লি সুলতানির উপর বইটি নিয়ে আরও আলোচনার অবকাশ অবশ্যই আছে। তবে সেসবে না গিয়ে একটা অন্য কথা উল্লেখ করছি। অনিরুদ্ধ রায় যখন ২০০৫ সালে তাঁর বইটি প্রকাশ করেন, গ্রন্থ তালিকায় আশ্চর্যজনকভাবে জ্যাকসন অনুল্লেখিত ছিলেন। কিন্তু সুলতানি ইতিহাস আলোচনায় জ্যাকসন বহু নতুন বক্তব্য ও আঙ্গিক এনেছিলেন। এই যুগ সম্বন্ধে যে ধরনের অস্পষ্টতা বা তথ্যগত বিভ্রান্তি ছিল, তা সমসাময়িক লেখাপত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তার গ্রন্থ সামরিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সমসাময়িক অর্থনৈতিক পরিকাঠামো, সমাজ ব্যবস্থা, নগরায়ন  প্রভৃতি দিকগুলি নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রথম প্রকাশের কুড়ি বছর পরে তাই আজও এই বইটি ইতিহাসের পাঠকের কাছে সমান আগ্রহের।

ভারতবর্ষে সুলতানি যুগের প্রতিষ্ঠা, প্রাথমিক রাষ্ট্রকাঠামো, খলজিদের ক্ষমতা দখল (ও খলজি বিপ্লব) এবং ফিরোজ শাহের রাজত্বের সংকট জ্যাকসন নতুন ভাবে বর্ণনা করেছেন। মোহাম্মদ বিন তুঘলককে নিয়ে তার আলোচনায় কেবল সমসাময়িক লেখাপত্র নয়, সমকালীন লেখকদের সুলতান সম্বন্ধে মানসিকতা, এমনকি সেইসময়কার লেখকদের  তথ্যগত  বিভ্রান্তি তার লেখনীর সজাগ দৃষ্টিতে  যথার্থভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে বইটি অনেক ভালোর মাঝেও সাধারণ পাঠকদের জন্য কিছু সমস্যা রেখে গিয়েছে। লেখার ভাষা খুব সুখপাঠ্য নয়। কখনো কখনো তথ্যের পাহাড়ে মূল বক্তব্য থেকে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়াও তিনি শুরু করেছেন ঘুরীর আক্রমণ থেকে। এর আগে থেকেই যে ভারতবর্ষে তুর্কি সাম্রাজ্য স্থাপনের একটি প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছিল তার হদিস পাওয়া যায় না। 

যাই হোক, গত কুড়ি বছরে সমগ্র সুলতানি যুগের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে দুই মলাটের মাঝে নতুন করে লেখালেখির প্রয়োজন দেখা গিয়েছিল। মাঝের সময়ে (২০১৫ সালে) আব্রাহাম এরলির গ্রন্থটি এই প্রয়োজনকে কতটা মেটাতে পেরেছিল, তা বলা শক্ত। তবে ফৌজিয়া ফারুক আহমেদ তার ‘Muslim Rule in Medieval India: Power and Religion in the Delhi Sultanate’ গ্রন্থটির মাধ্যমে এই প্রয়োজন অনেকটাই মেটাতে পেরেছেন বলে মনে করি। সরাসরি গ্রন্থটির আলোচনায় যাওয়ার আগে লেখক পরিচিতি হিসেবে দু-চার কথা বলা  প্রয়োজন। ফৌজিয়া বেশ কিছু বছর ধরে পাকিস্তানের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সাথে যুক্ত আছেন। দীর্ঘদিন ধরেই তার এই ডক্টরাল থিসিস পেপারটি তৈরি করেছেন এবং এর বিভিন্ন অংশ পাকিস্তান সহ নানা আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করেছেন। ২০১৬ সালে আই বি টওরিস গ্রন্থটি প্রকাশ করে।

ভূমিকা এবং উপসংহার বাদে মোট নয়টি অধ্যায়ে এই গ্রন্থটি বিভক্ত। প্রথম অধ্যায়ে বাণিজ্য, ভাগ্যান্বেষণ, জীবিকা ও সরাসরি ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে সপ্তম শতক থেকে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার নানা অঞ্চল হতে স্থলপথে এবং জলপথে কিভাবে উপমহাদেশের মূল ভূখণ্ডে মানুষের স্থানান্তর হয়েছে, তার আলোচনা রয়েছে। আজ পর্যন্ত পাঠ্যবই গুলিতে মুহাম্মদ বিন কাশিমের সিন্ধু বিজয় (৭১২ সাল) থেকে মাহমুদ গজনভির ভারত আক্রমণ (১০০১-১০৩০ সাল) পর্যন্ত সময়ের ভারত ও তার পশ্চিম দিকের অঞ্চলগুলির সাথে সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফৌজিয়া  এই মাঝের সময়টাকে তাই আলাদা করে দেখার চেষ্টা করেছেন ভারতবর্ষে ইসলাম শাসন প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট হিসেবে। তিনি সিন্ধ অঞ্চলে উম্মাইদ এবং আব্বাসী শাসকদের ইতিহাস যেমন বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, সেই সাথে সাঞ্ঝ অঞ্চলে (বর্তমানে মহারাষ্ট্র) মহানিয়া সাম্রাজ্য (সময়কাল ৮১৩-৮৪১ সাল) , সিন্ধের মন্সুরা অঞ্চলে হিবারিয়া সাম্রাজ্য (সময়কাল ৮৬১-১০২৫ সাল), মুলতানের বানু সামা সাম্রাজ্য (সময়কাল ৮৯৩-৯৮০ সাল), মাকরানের মদানীয়া সাম্রাজ্য (সময়কাল ৯৫১-১০৭৮ সাল) প্রভৃতির  উৎপত্তি, বিস্তার, ক্ষমতা দখল ও পতন নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, কাশিম এবং মাহমুদের আগমনের মধ্যবর্তী প্রায় তিন’শ বছরে একটু একটু ক’রে তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইসলাম সাম্রাজ্য থেকে কি করে তা উত্তর ভারতের উন্নত কৃষি অঞ্চলের দিকে আসছিল এবং দিল্লিকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছিল।

দ্বিতীয় অধ্যায়টিও আলাদা উল্লেখের দাবী রাখে। কারণ এতে মামুদের ভারত আক্রমণ, তার কারণ এবং ঘটনাক্রমের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত বলি, আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন আটের দশকে সোমনাথ মন্দির এবং মাহমুদের আক্রমণ নিয়ে ভারতবর্ষের পার্লামেন্টে কিছু বিতর্ক হয় এবং সে সময় ইতিহাস রচয়িতাদের মধ্যে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়েছিল। এতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন রমিলা থাপার। ফৌজিয়ার গ্রন্থের এই অংশটিকে তাই আমরা সেই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা হিসেবে ধরতে পারি। এ বিষয়ে বিস্তারিত না গিয়ে, সরাসরি চলে যাব তৃতীয় অধ্যায়ের বিষয়বস্তুতে। এখানে তিনি মুহম্মদ ঘোরীর সাম্রাজ্য বিস্তার, দিল্লি  দখল, এবং ভারতবর্ষে নবগঠিত তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রশাসনের গঠনগত চরিত্রকে তুলে ধরেছেন। জ্যাকসনের একান্ত তথ্যনির্ভর গবেষণার পাশে এই অধ্যায়টি থাকলে এই বিষয়ে সম্যক ইতিহাস ধারণা তৈরিতে সাহায্য করে।

দাস ব্যবস্থা নিয়ে ফৌজিয়ার আগের কিছু প্রবন্ধ বেশ সমাদৃত। এই গ্রন্থে তিনি দাস ব্যবস্থাকে আরও বিস্তারিত ভাবে দেখেছেন এবং তৃতীয় এবং চতুর্থ অধ্যায় কিভাবে ঘোরী থেকে ইলতুৎমিশে ক্ষমতার পরিবর্তন হলো তা নিপুণতার সাথে ব্যাখ্যা করেছেন। ইলতুৎমিশের ওপর রচিত এই অধ্যায়টি আধুনিক গবেষণাগুলির সংস্পর্শে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হিসেবে উঠে এসেছে। পঞ্চম অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাই ইলতুৎমিশ পরবর্তী সুলতানি সাম্রাজ্যের অচলাবস্থা, রাজিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ এবং এখানে লেখিকা বিশেষভাবে অভিজাতদের উপস্থিতির (বন্দেগান-ই-চিহলগানি) বর্ণনা করেছেন।

ষষ্ঠ অধ্যায়ে খুব স্বাভাবিক ভাবেই একটি দৃঢ় এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্য তৈরির চেষ্টার কথা জানতে পারি যা ছিল বলবনের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং ‘চল্লিশ চক্র’র ক্রমাগত ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ও তৈরি হওয়া নতুন নতুন সমীকরণে সুলতানি যুগের ভবিষ্যতকে কতটা পাল্টে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সপ্তম অধ্যায়ে রয়েছে খলজিদের উত্থান এবং পতনের ইতিহাস এবং অষ্টম অধ্যায়ে তুঘলকদের। মুহাম্মদ বিন তুঘলক সম্বন্ধে পিটার জ্যাকসনের যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা, তা লেখক স্বীকার করেও সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং মোঙ্গল আক্রমণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সৈয়দ ও লোদী বংশের শাসনকাল আলোচিত হয়েছে নবম অধ্যায়ে। খুব সংক্ষেপে গ্রন্থ পরিক্রমা বলতে এটুকুই।

এবার যে বিষয়টা আলোচনা করতে চাই তা হল, এই বইয়ের অনন্যতা কি? সুলতানি যুগের ইতিহাস রচনায়  উপনিবেশিক কালের ঐতিহাসিক থেকে শুরু করে কিশোরী শরণ লাল, আশীর্বাদী লাল শ্রীবাস্তব যেমন ছিলেন, সেই সাথে মোহাম্মদ হাবিব থেকে শুরু করে সমগ্র আলীগড় স্কুল তাদের বহু রচনায় আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন। এখানে আমরা ফৌজিয়ার লেখার মূল ভাবনা বোঝার চেষ্টা করব। ভারতবর্ষে প্রথম ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময়ে আমাদের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু ছিল শাসক, ধর্মীয় প্রধান এবং প্রজা। ফৌজিয়া আলাদা করে ক্ষমতার প্রত্যেকটি স্তরকে আলোর কাছে আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি সুলতান, পার্শ্ববর্তী অভিজাত (আমীর ও উলেমা), স্থানীয় শাসক, প্রজা – এই পর্যায়ক্রম ধরে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক যে প্রবাহ তাকে খুব সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এমনকি একেবারে ভূমিকায় তিনি সুলতানি সাম্রাজ্যের প্রকৃতি, সাম্রাজ্যে সুলতানের স্বার্থের বিপরীত গতি যা সর্বদা শাসককে ভারসাম্য রক্ষা করতে বাধা দিয়েছিল, এইসব নিয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা করেছেন। তিনি প্রতিটি সময়ে সুলতান ও আলিমদের পারস্পরিক সম্পর্ক পরিবর্তনকে দেখিয়েছেন। শাসকের দুর্বলতার সময় (তয়াইফ উল মুলুকিয়াৎ উল্লেখ করে) তিনি দেখিয়েছেন শাসকশ্রেণীর ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের ক্ষেত্রে উলেমা কি ধরনের অন্তরায় ছিল।

বহু বছর আগে পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ থেকে প্রকাশিত একটি বই ‘মধ্যযুগের ইতিহাস’ যারা পড়েছেন, তাদের হয়তো মনে থাকবে ডঃ নুরুল হাসান সুলতানি যুগের এই রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় সম্পর্ককে নিয়ে ইলতুৎমিশের সময়কার একটি বেশ অন্যরকম গল্প শুনিয়েছিলেন। ফৌজিয়ার লেখা সেই ঘরানার একটি ধারাবাহিকতা এবং আধুনিকতম রূপ বলা চলে। এখানে কেবল সুলতান নন, সুলতানি সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে যে স্থানীয় শাসকদের অবদান ছিল তাও তিনি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছে‌। একেই বইটির মূল প্রাণকেন্দ্র বলা যেতে পারে।

 শেষ করার আগে অন্য দু’কথা বলি। আমাদের দুই দেশের মধ্যের গুলি বিনিময়, আমরা-ওরা, হিন্দু-মুসলমান ইত্যাদি বৈরিতার সত্যি কতটা প্রয়োজন আছে তা বুঝতে পারি না, কারণ দু’দেশেই বাস করে লাখে লাখে নিরন্ন গরীব মানুষরা যাদের এসবে কোন প্রাপ্তি নেই। সমস্ত বৈরিতার মাঝেও যেন সারস্বত চর্চার এমনই পারস্পরিক বিনিময় নিরন্তর চলতে থাকে। আর, প্রকাশক টওরিস প্রতিবারের ন্যায় এবং প্রতি বইয়ের ন্যায় এই বইটির হার্ডকভারের মূল্য যথেষ্ট বেশি রেখেছেন (ভারতীয় মুদ্রায় ৬৫০০ টাকা মত)। তাই আগ্রহী মধ্যবিত্ত পাঠকের তাকে বা শিক্ষার্থীর পাঠে বইটিকে পৌঁছে দিতে হলে, হয় পেপারব্যাকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে অথবা কিনতে হবে ই-বুক।

মন্তব্য তালিকা - “সুলতানি যুগের ইতিহাস চর্চা ও বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি”

  1. ইতিহাস আলোচনা করতে করতে হটাৎ ধর্মীয় বিদ্বেষ এর কথা কি এখানে প্রাসঙ্গিক? আমার
    মনে হয় এ ধরণের অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য না করলেই ভালো হয়।

    1. ইতিহাস তো ইতিহাস , সেখানে ধর্মীয় বিদ্বেষ থাকা বা না থাকা বড় কথা নয়। প্রাসঙ্গিক সেটাই যেটি সত্য।

    2. আপনি যথার্থ বলেছেন। তবে বৃহত্তর সমাজে রাষ্ট্র নির্ধারিত কিছু বিদ্বেষ আমাদের বর্তমান প্রজন্ম বহন করে যাচ্ছে, এটাও সত্য। আমরা কতটা সেই মানসিকতা ত্যাগ করতে পারি সেটাই মূল বিবেচ্য। আর সেখানে এই ধরনের পারস্পরিক ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব কতটা সেটা বোঝাতেই মূলত এর উল্লেখ।

      আর একটা বিষয় দেখুন। প্রায় ১৭০০ শব্দের এই লেখায় আপনি মন্তব্যের জন্য কেবল দুটো বাক্য বেছে নিলেন। বাকি কথাগুলি আপনার মন্তব্যে অধরা রয়ে গেল। কোথাও কি বিদ্বেষের পক্ষের বা বিপক্ষের আমরা ইতিহাস চর্চার থেকে এইদিকটাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলছি না তো? প্রশ্ন রইল।

  2. ওরিয়েন্টাল ডেস্পটিজম বলে একটা শব্দবন্ধ ইংরেজরা তৈরি করেছিল–মূলত ভারতের রাজা-রাজড়া নিয়ে, এবং বাই ন্যাচারাল এক্সটেনশন / ইন্টারপ্রিটিশন / এক্সট্রাপোলেশন, অন্য প্রাচ্যদেশের শাসনের বৈশিষ্ট্য বোঝাতে।

    সে সময় টিপিক্যাল ইংরেজ ঐতিহাসিকের বক্তব্য ছিল, সুসভ্য ইংরাজ জাতি যেরূপ পার্লিয়ামেন্ট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নাগরিক (অর্থাৎ অর্থবান ও ক্ষমতাবানের) দের সুবিচার পাইবার ও সুকর্ম করিবার অধিকার কায়েম করিয়াছেন, অসভ্য প্রাচ্যদেশীয়গণ তাহার মর্ম বুঝিবার উপযুক্ত হয়েক নাই। তাহাদিগের জন্য একখান বাদশা বা রাজা, যিনি দণ্ডমুণ্ডের মালিক ও মাঝেমধ্যে মেজাজ উত্তপ্ত হইলেই অন্যের মুণ্ড ঘচাং ফু করিয়া থাকেন, ইচ্ছেমত প্রজাদিগের সম্পদ পকেটে ভরিয়া সুরাদি সেবন করিয়া অকথ্য যৌন কদাচার করেন, এবং কিস্যুমাত্র রাজকার্য না জানিয়া বৃহৎ সাম্রাজ্য চালাইয়া থাকেন, যাহাদের নিয়ন্ত্রণ করিবার কেহ নাই, তাহাই যথেষ্ট হইয়া থাকিবেক। রাজা-প্রজার দ্বন্দ্ব-সমাসে মধ্যপদে থাকিলেও তাহারা কর্মধারয় নহে, পরন্তু রাজা বাদশা অপেক্ষা অধিকতর বজ্জাত হইয়া থাকিবেক।

    ওমরাহ ও স্থানীয় শাসকের ভূমিকা, এই ধরনের ওরিয়েন্টালিস্ট শাসনের কল্পনার চাইতে অন্যরকম ছিল, সেটা আমরা এখন কষ্টেসৃষ্টে, মানে ঐ ইংরেজি ঘরানার নতুন পাঠক্রমে পড়াইতেছে বলিয়াই, আবিষ্কার করিতে বাধ্য হইতেছি। এখন আমাদিগকে সুলতানগণ ধর্ম, আল্লাহু আকবর, কাফেরদিগকে মার, ধর্ষণ কর, ইত্যাদির ছকের বাইরে দেখিতে বাধ্য করিতে কেহ পারিলেও পারিতে পারে। তবে সে সময়ের পাশ্চাত্য সভ্যতার শাসন ব্যবস্থার ধারেকাছে তাহাদের, ওরিয়েন্তাল ডেস্পটদের, শাসনযন্ত্র ছিল, এরূপ কথা আমাদের নিকট এখনও উন্মাদের পাঠক্রম বলিয়া প্রতিভাত হয়।

    দেখি পিটার জ্যাকসন বা নুরুল হাসান যে জগদ্দল নাড়াইতে পারেন নাই, ‘পাকি’ ফৌজিয়া ফারুক আহমেদ সেটিকে আরও দৃঢ়প্রোথিত করেন কিনা।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।