বেরিম্বাও
একটি পাঁচ ফুটের কাছাকাছি বাঁশের লাঠি, তার সাথে ধাতুর স্ট্রিং দিয়ে বাঁধা, দেখতে অনেকটা ধনুকের মত। আর লাঠির ইঞ্চি চারেক উপরে একটি লাউ শক্ত করে আটকানো। বাদ্যযন্ত্রের বর্ণনা হিসেবে এর বেশি আর কিছু নেই। কিন্তু এর অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট থেকে শুরু করে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান উল্লেখযোগ্য মার্শাল আর্ট, যা জানতে আপনাকে বাকি লেখাটুকু পড়তে হবেই।
পঞ্চদশ শতক থেকে হঠাৎ উপনিবেশ পত্তনের প্রয়োজন কেন হয়েছিল, এই প্রশ্ন যদি তোলা হয়, অধিকাংশ মানুষ উত্তর দেবেন, সম্পদের লুটপাট, একচেটিয়া ব্যবসা-বাণিজ্যের অধিকার ইত্যাদিকেই। আপনাকে যদি সে সময়ের আফ্রিকায় নিয়ে যেতে পারতাম, তাহলে দেখতে পেতেন ‘সভ্য জাতি’ সেখানকার মানুষের উপর কি ভয়ঙ্কর নির্যাতন করছেন! তাদের ধরে পশুর মত বেঁধে নিয়ে যাওয়া হত ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার দাস-বাজারে। এদের অধিকাংশই অর্ধাহারে-অনাহারে বা পথের ক্লান্তিতেই মৃত্যুবরণ করতেন। আর যারা এই দুর্ভাগ্যের জীবনে বেঁচে থাকতেন, তাদের ভাগ্যে ছিল ভয়ঙ্করতম অত্যাচারের নির্মমতা।
বাদ্যযন্ত্র আসলে মানুষের মনের এক ধরনের সাংস্কৃতিক চাহিদা। যন্ত্রের প্রয়োজন হয় মানুষের মধ্যে চাহিদা থেকে। আর শৈল্পিক প্রকাশের পথ হিসেবে বাদ্যযন্ত্র নিজে থেকেই তৈরি হয়ে যায়। আফ্রিকার ক্রীতদাসরা যখন ইউরোপে বা লাতিন আমেরিকায় আসেন, তখন তাঁরা সেখানটায় সহজে উপলব্ধ, সাধারণ কিছু জিনিস দিয়ে বেশ কিছু বাদ্যযন্ত্র তৈরি করার কৃতিত্ব অর্জন করেন। এর মধ্যে একটি উদাহরণ হল মারিম্বা, আর এই যন্ত্রটির নাম বেরিম্বাও।
বেরিম্বাও নিয়ে বলার আগে আসুন সংক্ষেপে ইউরোপের একটা বিশেষ সময়ের কথা জানি। ঊনবিংশ শতকের প্রথম দশক, নেপোলিয়ন তখন ফ্রান্স থেকে ক্রমশ সমগ্র পশ্চিম ইউরোপের নিয়ন্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন। ১৮০৭ সালে আক্রমণ করলেন পর্তুগাল। সে সময়ের রাজধানী লিসবনে সৈন্য পাঠানো হল। আক্রমণের কথা জানতে পেরে পোর্তুগিজ রাজা ষষ্ঠ জন তার পরিবার নিয়ে পালিয়ে এলেন দক্ষিণ আমেরিকার উপনিবেশ ও নিশ্চিন্ত আস্তানা ব্রাজিলে।
এই ব্রাজিল কিন্তু আজকের ব্রাজিলের মতো নয়। সে সময় ব্রাজিলের শহর ছিল ইউরোপীয়দের চোখে নানা ধরনের ‘কুচক্রী কালো মানুষ আর তামাটে মানুষদের (creoles) বাসস্থান’। রাজার নিরাপত্তার জন্য তাই এই ধরণের মানুষদের শহরে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করা হল। গোয়েন্দা দপ্তরের অনুসন্ধান শুরু হল রিও ডি জেনেরিও শহরে। কারা দাঙ্গা-হাঙ্গামা করতে পারে, সেই সমস্ত গোপন নথি তৈরি হল। এতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান উঠে আসে।
ব্রাজিলে বেরিম্বাও-এর ব্যবহারের প্রথম নিদর্শন ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। যদিও এটি অনস্বীকার্য যে আফ্রিকান ক্রীতদাসরাই এই বাদ্যযন্ত্রটি সেখানে নিয়ে এসেছিল, তবুও ঠিক কোন নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী থেকে এর উৎপত্তি হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, মোজাম্বিক এবং অ্যাঙ্গোলায় প্রায় হুবহু একই গঠনের ‘মিউজিক্যাল বো’ বা ধনুক-সদৃশ বাদ্যযন্ত্রের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া সাব-সাহারান অঞ্চলের অন্যান্য দেশে, বিশেষ করে পশ্চিম আফ্রিকায় এর অনুরূপ নকশার বাদ্যযন্ত্র দেখা যায়। বস্তুত, বেরিম্বাও-এর উৎস কোনো একটি নির্দিষ্ট আফ্রিকান সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ — এমনটা মনে করার কারণ কম; বরং সম্ভবত বিভিন্ন আফ্রিকান ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে ব্রাজিলে এর এক অনন্য রূপ গড়ে উঠেছিল। তাছাড়া, শুরুর দিকে বেরিম্বাও-এর সঙ্গে ক্যাপয়েরা-র কোনো সম্পর্ক ছিল না; বরং পরবর্তীকালে এই মার্শাল আর্ট বা যুদ্ধকলাকে নৃত্যের ছদ্মবেশ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এর সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রটি যুক্ত করা হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরেই রিও ডি জেনেরিও শহরে এমন কিছু দাসদের কথা জানা যাচ্ছিল, যাঁরা এমন এক অদ্ভুত নাচ করেন যা অত্যন্ত বিপদজনক। কারণ এই নাচের মধ্য দিয়ে আসলে দুজনের মধ্যে লড়াই হয়। ১৮১০ সালে একটি পুলিশি রিপোর্টের ভিত্তিতে জানা যায়, দাসেরা এমন সব গোপন খেলা এবং নাচের সঙ্গে যুক্ত যা শহরে অশান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। সেই মোতাবেক এদের ৩০০ ঘা চাবুকের শাস্তি ঘোষণা হলেও আইন করে তখনও কোনো ব্যবস্থা তৈরি হয়নি।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে সে সময়ের ব্রাজিলের দাস ব্যবস্থা নিয়ে কয়েকটা কথা বলে রাখা দরকার। শুরুতে এখানে সবচেয়ে বেশি দাস নিয়োগ হয়েছিল আখের খেতগুলিতে। এরপর কফি চাষ ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকায় বিপুল সংখ্যায় দাসদের সেই কাজে নিয়োগ করা হয়। তবে এই দাসদের মূল বাসস্থান হয়ে উঠেছিল ক্ষেত-খামার ঘেরা গ্রামীণ অঞ্চলগুলি। নগরের দাসরা প্রধানত নাগরিক শ্রমের চাহিদাগুলি মেটাতো, এছাড়াও কখনো কখনো প্রয়োজনে দাস মালিকরা তাদের দাসদের কৃষি ও কৃষি নির্ভর শিল্পগুলিতে ভাড়া খাটিয়ে উপার্জন করতেন। এই ভাড়া খাটার সময় গ্রামীণ দাস এবং শহুরে দাসদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হত। যে ‘ভয়ঙ্কর নাচ-গানের’ কথা আমরা আগে উল্লেখ করেছি সেটা ব্রাজিলের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে এই পরিযায়ী দাসদের মাধ্যমে।
ক্যারাটে, কুংফু বা জুডো – এসবের নাম তো আমরা অনেকেই শুনেছি। দক্ষিণ আমেরিকায় সবচেয়ে প্রচলিত যে মার্শাল আর্ট অর্থাৎ ক্যাপয়েরা (পোর্তুগিজ ভাষায় ক্যাপয়িয়েরা) হল সেই অদ্ভুত নাচ-গান, যার কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। এই লড়াই হয় দুজনের মধ্যে, সাধারণত এই যুদ্ধে পায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। ক্যাপয়েরার উদ্ভব আফ্রিকায়, নাকি দক্ষিণ আমেরিকায় – এ নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে এটাকে এখন সাধারণত অ্যাফ্রো-ল্যাটিন আমেরিকান সংস্কৃতির অংশ বলা হয়।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, ক্যাপয়েরার কোনো ধরনের ঐতিহ্য আফ্রিকায় ছিল না কেন? তাহলে এর উৎস যে লাতিন আমেরিকার স্থানীয় মানুষদের মধ্যে থেকে হয়নি, সে সম্ভাবনা বাদ দেই কি করে? এই প্রশ্নটা খুব সঙ্গত। এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন মাতিয়াস ররিগ অ্যাসানসাও তার একটি গবেষণাপত্রে।
ঊনবিংশ শতকের শুরুতে ব্রাজিলে কতটা জনপ্রিয় ছিল এই ক্যাপয়েরা? তিনি দেখিয়েছেন, ১৮১০ থেকে ১৮২০ পর্যন্ত এই দশ বছরে নিষিদ্ধ ক্যাপয়েরা খেলতে গিয়ে রিও ডি জেনেরিও-তে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ৪৩৮ জন। এই সংখ্যাটা সেই সময়ের মোট গ্রেফতারির ৯% ছিল। দাসদের পালিয়ে যাওয়ার অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া মানুষদের সংখ্যার পরেই এ বাবদে গ্রেফতার হওয়া লোকের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ছিল। মাতিয়াস ররিগ অ্যাসানসাও এখানে দুটো খুব গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান দিয়েছেন। একটি হল যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ৯১ শতাংশ মানুষ ছিলেন দাস। এমনকি এদের মধ্যে আফ্রিকা থেকে আগত লোকের সংখ্যা ছিল ৭১ শতাংশ আর স্থানীয় রেড ইন্ডিয়ান মাত্র ১০ শতাংশ। বোঝা যায় যে ক্যাপয়েরা আফ্রিকা থেকে আগত আদিবাসীদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয় ছিল। বিত্তার মেলনস্ ১৯৭১ সালে আফ্রিকার কালাহারি অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে একটি ডকুফ্লিম তৈরি করেন যেখানে তিনি ক্যাপয়েরার আদিম উৎসের কথা বলেন।
এখন প্রশ্ন হল, বেরিম্বাও-এর মতো বাদ্যযন্ত্র আলোচনা করতে গিয়ে আমরা হঠাৎ ক্যাপয়েরা নিয়ে শব্দ খরচ করছি কেন? আগেই বলেছি দাসদের পরাধীন জীবনে নিজেদের জন্য খুব বেশি জটিল বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা, শেখা এবং তা নিয়মিত চর্চা করার উপায় ছিল না। বাদ্যযন্ত্র ছিল তাঁদের জীবন-যন্ত্রণাকে খানিকটা ভুলে থাকার একটা চেষ্টা। যন্ত্রণাকে ভুলে থাকা এবং দাস অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক ধরনের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবাদ ছিল ক্যাপয়েরার লড়াই। যদিও পরবর্তীতে তাঁরা নিজেদের স্বাধীনতা লাভের লড়াইয়ে একে যুক্ত করেন। আসল কথা হল, ক্যাপয়েরা অনুশীলন করার একটি অবশ্যম্ভাবী অনুষঙ্গ ছিল বারিম্বাও। বারিম্বাও বাজিয়ে, তার তালে তালে এই লড়াইটি করা হত। তাই বেরিম্বাও ও ক্যাপয়েরা পরস্পর পরিপূরক।

বেরিম্বাও দেখতে সাধারণ বাদ্য হলেও বাজানো কিন্তু খুব সহজ হবে বলে মনে হয় নয়। একটি ধাতুর বা কাঠের লাঠি দিয়ে তারের উপর আঘাত করা হয়, এবং তারে সৃষ্ট কম্পন থেকেই আওয়াজ উৎপন্ন হয়। এই দণ্ডটি থাকে বাদকের ডান হাতে আর সঙ্গে একটা বাঁশের তৈরি ঝুনঝুনি (ক্যাক্সিক্সি)। বামহাতে ধরা থাকে পুরো যন্ত্রটা। যন্ত্রটি ধরতে ও বাজাতে বামহাতের আঙ্গুলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। লাঠির ঠিক ইঞ্চি দুই উপরে একটা আলাদা শক্ত দড়ি দিয়ে তার ও লাঠি বাঁধা থাকে লাউ (কাবাকা) দিয়ে। সেই বাঁধনের উপর কেনো আঙুল ভর দিয়ে ধরে রাখতে হয়। বাকি তিন আঙুল এবং বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ধনুকের দণ্ডটি শক্ত করে ধরে যন্ত্রটির ব্যালেন্স বজায় রাখা ছাড়াও এই আঙুল একটি ধাতব বা শক্ত জিনিস (সাধারণত পয়সা ব্যবহার করা হয় যাকে বলে মোয়েদা) তারের কম্পাঙ্ককে নিয়ন্ত্রণ করে। যন্ত্রের পেছনের লাউয়ের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কাঁপতে থাকা বাতাস যখন লাউয়ের ভেতর দিয়ে বাইরে বের হতে থাকে তখন তা বাদকের পেটের সঙ্গে দূরত্ব কম-বেশি করে আওয়াজকে ভারী বা হালকা করতে সাহায্য করে।
এই যন্ত্রটি দেখতে সরল হলেও এক তারের অন্য কোনো যন্ত্র এবং তার উপর এত ধরনের অ্যামপ্লিফায়ার খুব কম দেখা যায়। আফ্রিকায় ঠিক এই ধরণের দেখতে বেশ কিছু যন্ত্র আছে। তবে তাদের বাদনরীতি আলাদা আলাদা। যেমন মাউথ বো-এর কথা বলা যায়। এটি বাজানো হয় লাঠি ও শ্বাসবায়ু দিয়ে। দেখতে তীরের মতো হলেও আসলে এটার কাজ অনেকটা মাউথ-অর্গানের মতো।
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বেরিম্বাওকে বিভিন্ন রকম নামে ডাকা হয়। আজ ক্যাপয়েরা মার্শাল আর্ট ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত দেশে আর তার অনুষঙ্গ হিসেবে এই সরল বাদ্যযন্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
সহায়ক গ্রন্থ
১. Eric A. Galm, The Berimbau: Soul of Brazilian Music, University Press of Mississippi, 2010.
২. Matthias Röhrig Assunção, Capoeira: From Slave Combat Game to Global Martial Art, Oxford Research Encyclopedia of Latin American History, 2019.
‘ইতিহাস আড্ডা’র ‘বেরিমবাউ’ আর্টিকেলটি বিশ্ব সংস্কৃতির একটি দুর্লভ উপাদান সম্পর্কে জানার চমৎকার একটি মাধ্যম। প্রাচীন আফ্রিকান শেকড় থেকে শুরু করে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ‘ক্যাপোয়েরা’ মার্শাল আর্টের সাথে এই একক তারের বাদ্যযন্ত্রটির ঐতিহাসিক সংযোগ খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সাবলীল বাংলায় উপস্থাপিত এই লেখাটি ইতিহাস ও ভিন্ন সংস্কৃতির বাদ্যযন্ত্রপ্রেমীদের জন্য বেশ তথ্যবহুল ও উপভোগ্য একটি পাঠ।
বহুদিন পরে আপনার লেখা পেলাম। এবং যথারীতি অসাধারণ সুন্দর একটা রচনা একটা অজানা বিষয়ে। ক্যাপয়েরা মার্শাল আর্টটার কথা অবশ্য জানা ছিল একটা ভিডিও গেমের সুবাদে। তবে তার সঙ্গে এই বাদ্যযন্ত্রের সম্পর্ক জানা ছিল না।
একতারা অর্থাৎ single string instrument with so many kind of amplifiers সত্যিই বোধহয় আর নেই। তার ওপর এটা আবার pluck string type নয় বরং struck string type instrument. একতারা যন্ত্র কিন্তু সেটা আবার struck string এরকম আরও কিছু আছে কিনা জানার ইচ্ছা রইল।