সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

বাস্তিল দিবস — সেকাল ও একাল

বাস্তিল দিবস — সেকাল ও একাল

নবাঙ্কুর মজুমদার

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২১ ২২৯ ১০

২০০৯ সালের ৫ই জুলাই। অল ইংল্যান্ড ক্লাবের ঘাসের কোর্টে চলছে উইম্বলডনের মেন্স সিঙ্গলসের ফাইনাল ম্যাচ। গ্র্যান্ড স্ল্যাম ইতিহাসের দ্বিতীয় দীর্ঘতম ম্যাচ এটা। ঘটনাচক্রে আমি মাঠে উপস্থিত। ৪ ঘন্টা ১৭ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে জয়ী আমার সবচেয়ে পছন্দের প্লেয়ার রজার ফেডেরার। দীর্ঘতম ফিফথ সেট শেষ হতেই লেগেছে ৯৫ মিনিট। চোখের সামনে ইতিহাস সৃষ্টি হতে দেখে আনন্দে উত্তেজনায় তখন মাঠে বসে থরথর করে কাঁপছি। পুরো গ্যালারি জুড়ে চলছে মেক্সিকান ওয়েভ। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গলাব্যথা হয়ে গেছে। সঙ্গী পুষ্পেন্দুরও একই অবস্থা।  হঠাৎ পকেটের ফোনটা বেজে উঠলো। বের করে দেখি গ্যাব্রিয়েল। প্যারিস থেকে। ও টিভিতে খেলা দেখছিল। বেচারী অ্যান্ডি রডিকের হারে মুষড়ে পড়েছে।  তবু ফরাসি ভদ্রতায় শুভেচ্ছা জানালো।  আমি তখন অন্য জগতে। তাই পাত্তা না দিয়ে বাঙালিসুলভ দুষ্টুবুদ্ধিতে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে ছাড়লাম না। প্রত্যুত্তরে পাল্টা রাগ তো দেখালই না বরং দারুন আর একটা সুখবর দিল।  প্যারিসের এবারের চৌদ্দই জুলাই বাস্তিল ডে প্যারেডে নাকি গেস্ট অফ অনার ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। ইন্ডিয়ান আর্মি, নেভি, এয়ারফোর্সও নাকি এবারকার প্যারেডে অংশ নেবে। এই প্রথম। আমি যেন এই সুযোগ মিস না করি, সোজা প্যারিসে গিয়ে হাজির হই, বাকি ব্যবস্থা গ্যাব্রিয়েলই করবে।

আমি একটু কিন্তু কিন্তু করছিলাম বটে কিন্তু ল্যুভরের লোভ আর বাস্তিল ডে প্যারেড দেখার নিমন্ত্রণ কোনটাই ছাড়তে না পেরে আট তারিখে লন্ডন থেকে ট্রেনে চেপে বসলাম। সঙ্গী পুষ্পেন্দু আমার অফিসের সহকর্মী। বিদ্যের জাহাজ। ঘটনাচক্রে দুজনেই অফিসের কাজে মাস তিনেকের জন্য লন্ডনে এসেছি। পুষ্পেন্দুকে পটিয়ে দুজনে কয়েকদিনের ছুটি ম্যানেজ করে প্যারিসে পালাচ্ছি।  জার্নি বেশি নয়। ৩৪২ কিলোমিটার যেতে সময় লাগে মাত্র ২ ঘন্টা ১৬ মিনিট। আরামের যাত্রা। আর এ যাত্রায় সঙ্গী যদি পুষ্পেন্দুর মত চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া হয় আনন্দ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। 

ট্রেন যখন ইংলিশ চ্যানেলের নিচের টানেলে ঢুকলো ততক্ষণে আমাদের আড্ডা অবধারিতভাবে উইম্বলডন ফাইনাল ম্যাচটা হয়ে ফরাসি বিপ্লবের ঢুকে পড়েছে। বাস্তিল ডে প্যারেড দেখতে যাচ্ছি, ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস একটু-আধটু না জানলে চলে! 

আমি পুষ্পেন্দুকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ফরাসি বিপ্লব ১৭৮৯ সাল থেকে অনেকটা সময় নিয়ে হয়েছিল।  বিপ্লবের এই লম্বা সময় জুড়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন থাকতেও ফরাসিরা শুধুমাত্র বাস্তিল ধ্বংসের দিনকে এত গুরুত্ব দেয় কেন?”

প্রশ্ন শুনে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে পুষ্পেন্দু বলল, “সেটা জানতে গেলে বাস্তিল পতনের আগের ঘটনাগুলো একটু জেনে নিতে হবে”।

“সেটা ১৭৮৯ সাল। ফ্রান্সের বড় অস্থির সময়। দেশের অর্থনীতি একেবারে বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত।  সিংহাসনে আসীন দোদুল্যমান চিত্তের ও দুর্বল চরিত্রের সম্রাট ষোড়শ লুই। ভ্রান্ত অর্থনীতির জাদুঘরে তিনি একের পর এক অর্থমন্ত্রী বদল করে চলেছেন—টুর্গো, নেকার, ক্যালোন্নে, ব্রিয়‍্যাঁ।  আর একের পর এক অর্থমন্ত্রীর কর সংস্কার প্রক্রিয়া দায়িত্ব নিয়ে বানচাল করে চলেছে অভিজাতদের সংগঠন প্যারিস পার্লেম‍্যঁ। দৈব রাজতন্ত্রের ধারণাকে কফিন বন্দী করে অভিজাত তন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় মশগুল রাজতন্ত্রেরই ধারক ও বাহক অভিজাতকুল। নতুন যুগের পদধ্বনি শুনতে ব্যর্থ এই মধ্যযুগীয় সামন্তকুলের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি। কর কাঠামোর সংস্কার না হলে দেশের সর্বনাশ বুঝেও পাছে নিজেদের বিশেষাধিকারে হাত পড়ে তাই তারা রাজতন্ত্রকে পর্যুদস্ত করতেও পিছপা হলেন না। এদিকে ভাঁড়ে মা ভবানী।  উপায়ান্তর না দেখে সম্রাট বহু বছর বাদে স্টেটস জেনারেল পুনরুজ্জীবিত করতে বাধ্য হলেন”।

পুষ্পেন্দুকে মাঝপথে থামিয়ে আমি প্রশ্ন করলাম, “অভিজাতরা নিশ্চয় জানতো, রাজতন্ত্র যতদিন তাদের রমরমাও ততদিন। তা সত্ত্বেও রাজাকে বিপদে ফেলে অভিজাত শ্রেণী নিজেদের পায়ে কুড়ুল মারতে গেল কেন”? 

পুষ্পেন্দু হেসে বলল, “শিক্ষার অভাবে। বহু বছরের বিশেষাধিকার, অর্থবান হয়েও কর না দেওয়া, বংশানুক্রমিক অভিজাত হওয়ায় শিক্ষাগত বা বৌদ্ধিক উন্নতির কোনো চেষ্টা না করা এদেরকে এক বিলাসী অকর্মণ্য সম্প্রদায়ে পরিণত করেছিল। পাশের দেশ ইংল্যান্ডের থেকেও কোনো শিক্ষা নেয়নি এরা। যাই হোক পরের ঘটনা টা শোন”।

“সেকালের ফ্রান্সের জনগণ ছিল তিনটে এস্টেট বা শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রথম দুটো শ্রেণী অর্থাৎ যাজক ও অভিজাতরাই ছিলেন ফরাসি রাজতন্ত্রের প্রাণ ভোমরা।  দেশের বাকি জনগণ অর্থাৎ প্রফেসর, ব্যাংকার থেকে পথের ভিখারি পর্যন্ত সকলে বঞ্চিত তৃতীয় সম্প্রদায়ভুক্ত। উচ্চ শিক্ষিত ও অর্থবান বুর্জোয়া শ্রেণীও থার্ড এস্টেটের অন্তর্গত হওয়ায় দেশ পরিচালনায় তারাও ছিলেন ব্রাত্য।  এতদিনে সুযোগ এসেছে। এবারে বহুদিনের বঞ্চনায় পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে কাজে লাগানোর পালা।  স্টেটস জেনারেল আহ্বানের অর্থই যে পুরাতন তন্ত্রের শিকড় আলগা হয়ে যাওয়া তা শিক্ষিত বুর্জোয়া শ্রেণী ঠিকই বুঝতে পারছিলেন।  তাই এবারে তারা সম্প্রদায় পিছু ভোটাধিকারের বদলে মাথাপিছু ভোটাধিকারের দাবিতে অনড় রইলেন।  সম্প্রদায় পিছু ভোট মেনে নেয়ার অর্থ ছিল যাজক ও অভিজাতদের সম্মিলিত চক্রান্তের কাছে নতি স্বীকার করা।  তৃতীয় শ্রেণী তা কোনোমতেই হতে দিতে রাজি ছিলেন না।  ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিবেশ ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠতে লাগলো।  সভায় বহু অবমাননাকর প্রথা জিইয়ে রাখা, জাতীয় সভার অধিবেশন জোর করে বন্ধ করে দেয়া, টেনিস কোর্টের শপথ— শ্যেন নদী দিয়ে অনেক জলই গড়িয়ে চললো”।

পুষ্পেন্দুকে খানিকটা বাধ্য হয়েই এখানে থামাতে হল। গল্প করতে করতে কখন যে প্যারিসে পৌঁছে গেছি টের পাইনি।  গাহ দ্যু নহ (Gare du Nord) স্টেশনে নেমে দেখি এক্সিট গেটের সামনে গ্যাব্রিয়েল হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে, সঙ্গে এক সুন্দরী ফরাসিনী। আলাপ হল। গ্যাব্রিয়েলের বান্ধবী শার্লট।  দুজনেই লা সরবনের ছাত্র। লা সরবন বা ইউনিভার্সিটি অফ প্যারিস ইউরোপের অন্যতম পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়। এখানকার ইন্ডোলজি ডিপার্টমেন্টের সাথে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির চুক্তি আছে। সেই মোতাবেক গ্যাব্রিয়েল কলকাতায় আমার বাড়িতে কিছুদিন ছিল, ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হতে।  তখন থেকে আমার সাথে ওর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।  ও বলল শার্লটের বাড়িতে নাকি আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেছে। থাকা মানে শুধু রাতটা।  সারাদিন তো টোটো কোম্পানি করবো। আইফেল টাওয়ারে চড়বো, লুভ্যর মিউজিয়াম দেখবো, কনকর্ড ব্রিজকে ছুঁয়ে দেখবো। এছাড়াও আর্ক দে ট্রায়োম্ফে, নতরদাম চার্চ, সেন্ট চ্যাপেল কিচ্ছু  ছাড়বো না। সেইমতো যেতে যেতে ট্যুর প্রোগ্রাম হয়ে গেল। 

আমি গ্যাব্রিয়েলকে বললাম, “লুভ্যরের জন্য আমার অন্তত তিনটে দিন চাই”।

শার্লট আমার দিকে ফিরে হেসে বলল, “মাত্র তিনদিন? তুমি এক সপ্তাহেও লুভ্যর শেষ করতে পারবে না”।

পরদিন থেকে আমার স্বপ্নের প্যারিস ভ্রমণ। সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি।  মাঝে মাঝে ফরাসি ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে টুকিটাকি আড্ডা। লুভ্যর দেখে একেবারে ভেবলে গেছিলাম, মিউজিয়াম সম্বন্ধে ধারনাটাই বদলে গেল।  আর দেখলাম বাস্তিল ধ্বংসের পরে তার ধ্বংসস্তূপ দিয়ে তৈরি কনকর্ড ব্রিজ, শ্যেন নদীর ওপরে।  ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে অনুভব করতে চেষ্টা করলাম সেদিনের কত শত দুঃখ, যন্ত্রণা, ষড়যন্ত্রের সাক্ষী বাস্তিলের শরীরের অংশ মূক পাথরের টুকরোগুলিকে।  ইতিহাসের স্পর্শ সুখ। বাস্তিল ডে-র আগের দিন, অর্থাৎ ১৩ই জুলাই সেন্ট পিয়েরেঁ দে মমার্তেঁর সামনে আড্ডা বসল। ওখানে উৎসবের পরিবেশ যেন।  গান-বাজনা চলছে।  কেউ আপন-মনে ছবি আঁকছে।  গ্যাব্রিয়েল আর শার্লটের তিন-চারজন বন্ধু এসেছে।  সকলেই দেখলাম নিজের দেশের ইতিহাসের প্রতি চূড়ান্ত শ্রদ্ধাশীল।

আমি কথায় কথায় গ্যাব্রিয়েলকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে সাতাশে জুন তারিখটাও তো বেশ গুরুত্বপূর্ণ তাই না”?

গ্যাব্রিয়েল সম্মতি জানিয়ে বললো, “গুরুত্বপূর্ণ তো হবেই! ১৭৮৯ সালের ২৭শে জুন স্টেটস জেনারেলের ব্যাপারে তৃতীয় শ্রেণীর প্রতিনিধি বুর্জোয়াদের চূড়ান্ত চাপের কাছে নতি স্বীকার করলেন সম্রাট।  মাথাপিছু ভোটের অধিকার স্বীকৃত হল। সাথে সাথে যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত যাজক ও অভিজাতদের বিশেষ অধিকারের অচলায়তন যেন তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়েছিল।  জাতীয় সভা পরিণত হল সংবিধান সভায়। নতুন সংবিধান রচনার দায়িত্ব এই প্রথম তৃতীয় শ্রেণীর ওপর বর্তালো।  ফলে আপাতভাবে জয়ী হল বুর্জোয়া বিপ্লব। জানো, সেদিন এই প্যারিস নগরী সেজে উঠেছিল আলোক মালায়, তোমাদের দীপাবলির মত। আনন্দ উৎসবের লহর বয়ে গিয়েছিল।  কিন্তু ষোড়শ লুই এই পরাজয় মেনে নিতে পারলেন না। অভিজাতদের প্ররোচনায় তিনি গোপনে  সেনা বাহিনী তলব করলেন”।

 এতক্ষণ গ্যাব্রিয়েলের আরেক বন্ধু অ্যালডেরিক মনোযোগ দিয়ে ওর কথা শুনছিল। এবারে গ্যাব্রিয়েলের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল,

“গ্যাব্রিয়েল পরের ঘটনাগুলিতে  যাবার  আগে একটু পেছনে ফিরি চলো।  এদের বুঝতে সুবিধা হবে”।

“পরপর দুবছরের অজন্মা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, খাবারের দামে অন্তত ষাট শতাংশ বৃদ্ধি এসব কারণে ফ্রান্সে সঁ কুলোৎ ও দরিদ্র কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হাজার হাজার বুভুক্ষু জনতা এক টুকরো রুটির আশায় প্যারিসের রাস্তায় ভিড় জমাতে থাকে। শহর জুড়ে এক বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়।  এই পরিস্থিতিতে তারা যখন শোনে জাতীয় সভার অধিবেশনের কথা, স্বভাবতই তাদের মনে আশার সঞ্চার হয়। ভবিষ্যৎ সুদিনের আশা।  তারা মনে করতে থাকে রাজার অযোগ্যতায় তাদের এই দুর্দশা, এবারে নিশ্চয় জাতীয় সভা সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে!  ক্ষুধাতুর মানুষ পাবে অন্ন, শ্রমিক পাবে উপযুক্ত মজুরি, কৃষক পাবে নিজের এক টুকরো কৃষি জমি”।

পুষ্পেন্দু এতক্ষণের নীরবতা ভেঙে মুখ খুললো, “সাধারণ মানুষের এই যে মানসিকতার পরিবর্তন, ‘ঈশ্বরের মনোনীত’ রাজাকে দোষারোপ করা বা জাতীয় সভা তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবে এমন উচ্চাকাঙ্খা—এসব বিশ্বাসের উৎস কি ছিল? কোনভাবে কি সে যুগের দার্শনিকদের লেখা এদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পেরেছিল?  তোমাদের কি মনে হয়”?

– “খুব ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন করলে তুমি। দার্শনিকদের প্রভাব তো ছিলই। কিন্তু কতটা প্রভাব তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত থাকলেও আমার মনে হয়, ভলতেয়ার ও ভলতেরিয়ান লেখক গোষ্ঠীর সরাসরি চার্চকে আক্রমণ, রুশোর কন্ত্রাক্টস সোশ্যিয়েলে রাষ্ট্রের উৎপত্তি ব্যাখ্যা, মন্টেস্কুর স্পিরিট অফ লজএ সেযুগের সমাজব্যবস্থার তুমুল সমালোচনা, বা অন্যান্য দার্শনিকদের ক্ষুরধার যুক্তিবাদ এগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা বড় প্রভাব ফেলেছিল”। – বলল অ্যালডেরিক।

“কিন্তু সে যুগে শিক্ষার হার কি তেমন কিছু বেশি ছিল যে ব্যাপক হারে সাধারণ মানুষ দার্শনিকদের লেখা পড়ে প্রভাবিত হবে”?  -আমি জিজ্ঞাসা করি।

শার্লট সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়, “দার্শনিকদের লেখায় প্রভাবিত হবার জন্য লেখাপড়া জানার খুব একটা প্রয়োজন ছিল না, এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা নেয় প্যারিসের কফিশপ আর পাবগুলি।  তোমাদের কলকাতায় যেমন কফি হাউস সমাজ-সংস্কৃতিতে একটা বড় জায়গা করে নিয়েছিল, তেমনি আমাদের এখানে সেই ভূমিকাটা ছিল সাধারণ কফিশপগুলির। শিক্ষিত লোকেরা কফিশপের টেবিলে দার্শনিকদের বিখ্যাত লেখাগুলো পড়ে শোনাতেন, আলোচনা হত, আর সাধারণ মানুষ এসব যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ শুনে ভীষণভাবে প্রভাবিত হত। সে যুগের কিছু বুর্জোয়া নেতা ছিলেন অত্যন্ত বাগ্মী, তাঁরাই মূলত জন-সাধারণের মধ্যে চেতনা বিস্তারের এই কাজগুলি করতেন”।

এবারে গ্যাব্রিয়েল বলে ওঠে, “যা হোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি”।

“ভবিষ্যৎ সুদিনের স্বপ্নে মশগুল জনতা দেখে, রাজা ২৭শে জুনের পরাজয় মেনে নিতে না পেরে সেনা তলব করেছেন, এবারে সংবিধান সভা ভেঙে দেয়া শুধুই সময়ের অপেক্ষা। সংবিধান সভা ভেঙে গেলে সেই সঙ্গে ভেঙে যাবে অনাগত ভবিষ্যতের সুখস্বপ্ন, রুটির স্বপ্ন, কাজের স্বপ্ন, কৃষি জমির স্বপ্ন। সাধারণ জনগণ আবার সেসব বঞ্চনার, শোষণের, অন্ধকারের দিনগুলিতে ফিরে যেতে রাজি ছিল না, ফলত চারিদিকে বিক্ষোভ শুরু হয়ে গেল। ক্রোধে উন্মত্ত জনতা অস্ত্রের কারখানা, দোকান সমস্ত লুঠ করে অস্ত্র জমা করতে থাকে। গির্জার ঘণ্টাগুলি বাজিয়ে লোক জড়ো করা হয়, রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড করে রাজকীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়।  পাশাপাশি চলতে থাকে নিরন্ন জনতার অবাধ লুঠতরাজ। রাজকীয় প্রশাসন একেবারে ভেঙে পড়ে।  দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চল্লিশটি শুল্ক ঘাঁটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, সাঁ লাজার মঠ সহ বহু জায়গা লুন্ঠিত হয়। প্যারিস সমেত সমগ্র দেশের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় উন্মত্ত জনতার হাতে।

১৪ই জুলাই।  বিক্ষুব্ধ সশস্ত্র জনতা রওনা দেয় বাস্তিল অভিমুখে।  বাস্তিল দুর্গ ছিল স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের প্রতীক।  ল্যেতর দ্য ক্যাশে আইনের দ্বারা বিনা বিচারে সেখানে বহু মানুষকে বন্দী করে রাখা হত। যদিও ঘটনার দিনে সামান্য কিছু সংখ্যক মানুষই বাস্তিলে বন্দী ছিলেন, সঙ্গে ছিল অস্ত্রের বিপুল ভাণ্ডার।  বাস্তিলের গভর্নর দ্য লেনির কাছে কয়েকজন রাজনৈতিক বন্দির মুক্তির দাবি করা হয়।  তিনি তা অস্বীকার করে প্রহরীদের গুলি চালানোর আদেশ দিলে ক্রোধে উন্মত্ত জনতা দ্য লেনি সহ সকল প্রহরীদের হত্যা করে বাস্তিলের দখল নেয়। সমস্ত বন্দীদের মুক্ত করে দেওয়া হয়, অস্ত্র ভাণ্ডার লুঠ হয় আর সেই সাথে ধূলিসাৎ হয় রাজকীয় অহমিকার প্রতীক বাস্তিল দুর্গ”।

— “তারপর”?  পুষ্পেন্দু সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকায় গ্যাব্রিয়েলের দিকে।

“সম্রাট ষোড়শ লুই ঘাবড়ে গেলেন। জনতার রোষের ভয়ে তিনি জোর করে জাতীয় সভা ভেঙে দেবার ইচ্ছা পরিত্যাগ করেন। বুর্জোয়াদের চাপে তিনি অর্থমন্ত্রী পদে নেকারকে আবার ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হলেন।  সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে গেল। বাস্তিল ধ্বংসে বুরবোঁ রাজতন্ত্রের পতনের সুনিশ্চিত পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। বিপ্লবের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি জনগণের হাতে চলে গেল।  এ ঘটনার রেশ ধরে বহুদিনের সঞ্চিত অন্যায়, বৈষম্য, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সমগ্র দেশ একযোগে উঠে দাঁড়ালো, হাতে হাত ধরে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ফরাসি দেশের শিশু গণতন্ত্র যাত্রা করলো সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার পথে, আধুনিকতার পথে। বাস্তিলের পতনের অভিঘাত সমগ্র ইউরোপের জনমানসে এমন প্রভাব ফেলেছিল যে, দিকে দিকে যেন রাজতন্ত্রের বিদায় সংগীত শোনা যেতে লাগলো”।

বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছি। গ্যাব্রিয়েলের কথার রেশ মিলিয়ে যাবার আগেই কানে এলো, মমার্তেঁর একপাশে গিটার হাতে একটা ছেলে আনমনা হয়ে গেয়ে চলেছে:

“Many years ago

They stormed the Bastille

Two hundred and one lost their lives

The tennis court oath however survived……..”

একটা জমাটি আড্ডা শেষে পরিপূর্ণ মন নিয়ে ডেরায় ফিরলাম।

পরদিন বাস্তিল ডে তে আমরা সবাই হাজির চ্যাম্পস এলিসিস এর রাস্তায়।  দূরে প্লেস দে লা কনকর্ডে ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজির পাশে বসে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং।  অদ্ভুত দৃশ্য।  আজ ফ্রান্সের জাতীয় উৎসবের দিন, ফেৎ নাসিওনাল।  আজ চোদ্দই জুলাই, ল্য ক্যাতৌযে জুইয়ে।  প্যারিসের রাজপথ অ্যভিনিউ দেস চ্যাম্পস এলিসিস আজ উৎসব মুখর।  গণতন্ত্রের শক্তি প্রদর্শনের দিন আজ। ব্যান্ডে বেজে চলেছে ‘অ্যালোনস এনফ্যানটস দে লা পাত্রিয়েঁ’।  ফরাসি বাহিনীর কুচকাওয়াজ চলছে।  আমার চোখ কিন্তু খুঁজে চলেছে ভারতীয় বাহিনীকে।  খানিক পরে বিজাতীয় গানের মাঝে হঠাৎ শুনতে পেলাম “কদম কদম বাঢ়ায়ে যা, খুশিকে গীত গায়ে যা…”, আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো।  ধীরে ধীরে আজকের কুচকাওয়াজের দৃশ্যপট ঝাপসা হয়ে আমার চেতনা যেন ফিরে গেল দুই শতাব্দী আগের বাস্তিল ধ্বংসের সেই অনন্ত যাত্রা পথে।  আর সেই সাথে স্থান-কাল-পাত্র সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।  মনে মনে আউড়ে উঠলাম জীবনানন্দকে—

“মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে

আজকের আগে যেই জীবনের ভিড় জমে ছিল

তারা ম’রে গেছে;

প্রতিটি মানুষ তার নিজের স্বতন্ত্র সত্ত্বা নিয়ে

অন্ধকারে হারায়েছে;

তবু তা’রা আজকের আলোর ভিতরে সঞ্চারিত হ’য়ে উঠে আজকের মানুষের সুরে

যখন প্রেমের কথা বলে

অথবা জ্ঞানের কথা—

অনন্ত যাত্রার কথা মনে হয়

সে-সময়

দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের;

 চলেছে- চলেছে-”

তথ্যসূত্র:

১. John Hardman, French Politics 1774-1789; from the accession of Louis XVI to the fall of Bastille, Addison-Wesley, 1995

২. Simon Schama, Citizens: A Chronicle Of The French Revolution, Penguin books Ltd, 2004

৩.  https://diplomatie. Gouv.fr

মন্তব্য তালিকা - “বাস্তিল দিবস — সেকাল ও একাল”

  1. এটা তো সেই টেনিস ইতিহাস ভ্রমণ সব এককার করে দেওয়া অসাধারণ লেখাটা। আগেও পড়েছি। আবার পড়লাম। নতুন করে ঋদ্ধ হলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।