সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

আউলিকর, সোঁধনী বিজয়স্তম্ভ এবং ভীম কি চৌরি

আউলিকর, সোঁধনী বিজয়স্তম্ভ এবং ভীম কি চৌরি

শান্তনু ভৌমিক

নভেম্বর ১৫, ২০২৫ ১৫৫ 0

কয়েক বছর আগের কথা। বেড়াতে যাচ্ছি মুম্বাই থেকে রাজস্থানে; সড়কপথে; বড়দিনের ছুটিতে। তবে বরাবরের মত গুজরাত হয়ে নয়, মধ্যপ্রদেশ হয়ে। মধ্যপ্রদেশে-এ দু’রাত কাটিয়ে, চান্দবাসার কাছে ধামনার-এ পাথর কেটে বানানো প্রাচীন হিন্দু মন্দির আর বৌদ্ধ গুহা দেখে, চলেছি কোটার উদ্দেশ্যে; ন্যাশনাল হাইওয়ে ৫২ ধরে।

ন্যাশনাল হাইওয়ে ৫২ মধ্যপ্রদেশ থেকে রাজস্থানে ঢোকার একটু পরেই রাস্তায় পড়ে ‘মুকুন্দ্র হিলস ন্যাশনাল পার্ক’। পর্ণমোচী গাছের শুকনো পাথুরে জঙ্গল। এটি ন্যাশনাল পার্ক-এর মর্যাদা পেয়েছে ২০০৪ সালে। সেই জঙ্গলে ঢোকার পরই চওড়া এবং ডিভাইডার দেওয়া ন্যাশনাল হাইওয়ে ৫২ বদলে যায় চড়াই উৎরাই-এ ভরা সরু সঙ্কীর্ণ রাস্তা-এর আঁকাবাঁকা এক রাস্তাতে। দেখেশুনে ধীরেসুস্থে চালাতে হয় গাড়ি। মাথায় রাখতে হয় ‘স্পিড থ্রিলস, স্পিড কিলস’।

মুকুন্দ্র হিলস ন্যাশনাল পার্ক পেরিয়ে কোটার দিকের সমতলে নেমে এসে যেই গাড়ির স্পিড তুলতে শুরু করেছি, ঠিক তখনই দেখি রাস্তার ধারেই দাঁড়িয়ে আছে এক পুরানো কেল্লা। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি দাঁড় করালাম। গাড়ির বাকিরা চোখের ইশারায় গাড়ি থামানোর কারণ জিজ্ঞেস করলো। আমিও চোখ আর হাত দিয়ে কেল্লাটা দেখালাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, ‘দেখতে যাবে কি না’। দু’জনের কেউই মুখে কোনো উত্তর দিল না। তবে চোখের ভাষায় বুঝিয়ে দিল যে, পাগলামি সহ্য করতে রাজি থাকলেও, নিজেরা পাগল হতে একেবারেই তৈরি নয়। তাই কথা না বাড়িয়ে ‘পাঁচ মিনিট’ বলে আমি একাই হাঁটা দিলাম কেল্লার দিকে।

কেল্লায় ঢোকার মূল দরজাটা ছিল বিশাল, পেল্লায় উঁচু। আর তার পেটে ছিল আর একটা ছোট দরজা যার উচ্চতা একজন গড়পড়তা মানুষের উচ্চতার সমান। মূল দরজা বন্ধ থাকলেও ছোট দরজাটা খোলা ছিল। তাই দিয়ে কেল্লার ভিতরে ঢুকলাম।

ঢুকে বুঝলাম যে কেল্লার দুটো অংশ আছে। কেল্লায় ঢুকলেই যে অংশটা পড়ে সেইটা হচ্ছে এক উঠোন। উঠোনের মাঝখানে এক স্টেপওয়েল। কেল্লার অন্য অংশটা উঠোন থেকে দেয়াল দিয়ে আলাদা করা। উঠোন থেকে সেই অংশে যাওয়ার জন্য আছে দরজা। সেই অংশে ঢুকে বুঝলাম যে এই অংশটা বসবাসের জন্য ব্যবহার করা হত।  এই অংশে কেল্লার ভিতরের দেয়াল বরাবর আছে দালানযুক্ত ঘর। কোথাও একতলা, কোথাও দোতলা। আর এই দালানগুলোর মাঝের উঠোনে আছে এক কুয়ো।

ছোটো কেল্লা। ঘুরে দেখতে বেশি সময় লাগলো না। কিন্তু পুরো কেল্লাতে কোনো নোটিশ বোর্ড ছিল না যা থেকে জানবো যে এই কেল্লা কবে তৈরি হয়েছিল, কে বা কারা তৈরি করেছিলেন। কাউকে জিজ্ঞেস করব যে তারও কোনো উপায় ছিল না। কারণ আমি ছাড়া অন্য কোনো টুরিস্ট ছিল না কেল্লায়। থাকার মধ্যে ছিলেন দু-তিন জন রাজমিস্ত্রি। কেল্লার সারাইয়ের কাজ করছিলেন তাঁরা। অগত্যা কেল্লার ভিতরের কয়েকটা ফটো তুলে মূল দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়; বাইরে থেকে তুললাম কেল্লার কয়েকটা ফটো। তারপর হাঁটা লাগালাম গাড়ির দিকে। সেইসময় খেয়াল করলাম, এক স্থানীয় বয়স্ক ভদ্রলোক, যিনি অনেকক্ষণ ধরেই কেল্লার প্রবেশ দরজার পাশে বসে ছিলেন, আমাকে হাতের ইশারায় ডাকছেন।

“দেখ লিয়া কিলা?” কাছে পৌঁছতে জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক। মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম। তারপর বললাম ‘লেকিন কোই নোটিশ বোর্ড নেহি হ্যায়! পাতা নেহি লাগা ইয়ে কিলা কিসনে বানায়া, কব বানায়া!’ ‘ও তো হ্যায়’, অনেকটা স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন ভদ্রলোক। তারপর একটু হেসে বললেন ‘লেকিন ইধার কা সবসে মহতপূর্ণ স্ট্রাকচার নেহি দেখকে আপ ওয়াপস যা রাহা হ্যায়’। ‘কৌন সা?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। উত্তর পেলাম ‘ভীম কি চৌরি’।

ভদ্রলোকের বয়ান অনুযায়ী প্রচুর পুরানো এক মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ হল এই ‘ভীম কি চৌরি’। কত পুরানো মন্দির জিজ্ঞেস করাতে উত্তর দিলেন ‘ও পাতা নেহি’। তারপর হাত তুলে আমরা যে দিক থেকে গাড়ি চালিয়ে এসেছিলাম সেই দিক নির্দেশ করে বললেন “উস তরফ পয়দল চলে যাইয়ে। যাহাঁ ইয়ে কিলা কি দিওয়ার খতম হোতা হ্যায়, উধার হি হ্যায় ‘ভীম কি চৌরি’। দেখ কে আইয়ে। জাদা টাইম নেহি লাগে গা।’

‘জাদা টাইম নেহি লাগে গা’ মানে কম করে আরও দশ-পনেরো মিনিট। এইদিকে গাড়িতে মেয়ে-বৌ বসে আছে। তাই একটু  দোনোমোনো করছিলাম। আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে ভদ্রলোক বলে উঠলেন ‘বিবি সে মত ডরিয়ে। যব ইহাঁ পর আ হি গ্যায়ে হ্যায়, যাকে দেখ লিজিয়ে’। ভদ্রলোকের কথা শুনে ইগোতে আঘাত লাগলো। ‘ডরকে আগে জিত হ্যায়’ এই আপ্তবাক্য স্মরণ করে হাঁটা লাগালাম ‘ভীম কি চৌরি’র দিকে। কানে এল গাড়ি থেকে ভেসে আসা সজোর স্বগতোক্তি ‘কি পাগল রে বাবা! আবার কোথায় চলল ভাঙা ইটপাথর দেখতে!’

ভদ্রলোক ঠিকই বলেছিলেন। যেখানে কেল্লার দেওয়াল শেষ সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল ‘ভীম কি চৌরি’-এর চত্বর। তবে ‘ভীম কি চৌরি’-এর বর্তমান অবস্থায় একে মন্দির তো দূরস্থান, মন্দিরের ভগ্নাবশেষ বলাও বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। মন্দিরের দেওয়াল, ছাদ – কোনো কিছুই টিকে নেই। যা টিকে আছে তা হল পাথরের কয়েকটা স্তম্ভ আর সেই স্তম্ভগুলোর মাথায় পাথরের তৈরি ঝনকাঠ (লিন্টেল)।

পুরো কাঠামোটা দাঁড়িয়ে আছে পাথরের তৈরি ৭৪ ফুট লম্বা এবং ৪৪ ফুট চওড়া এক জাগতির উপর। মন্দিরের অক্ষ পূর্ব-পশ্চিম মুখী হলেও জাগতিতে ওঠার সিঁড়ি ডানদিক থেকে। মন্দিরের কাঠামো দেখে মনে হয় যে গর্ভগৃহ আর গর্ভগৃহের সামনে এক নন্দীমণ্ডপের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল এই মন্দিরটি। বর্গাকার গর্ভগৃহের চার কোণে আছে চারটে স্তম্ভ। স্তম্ভগুলোর উপরের দিকে আর ঝনকাঠ (লিন্টেল) -এর উপর আছে লতাপাতা, ফুল এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশার খোদিত প্রতিকৃতি।

বেশি সময় লাগলো না ‘ভীম কি চৌরি’ দেখতে, কারণ দেখার মত তেমন কিছুই ছিল না। গাড়ির দিকে ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম যে এই কেল্লা আর ‘ভীম কি চৌরি’ দেখতে আধা ঘন্টা-পয়ঁতাল্লিশ মিনিট সময় না নষ্ট করলেই হত। গাড়িতে ওঠার পর মেয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী কী দেখলাম। উত্তর না দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলাম কোটার উদ্দেশ্যে। কারণ উত্তর দিলেই শুনতে হত ‘উই ন্যু ইট’।

রাজস্থান ঘুরে আসার কিছুদিন পর ‘ভীম কি চৌরি’ আর কেল্লা সম্পর্কে আরও কিছু জানার জন্য দ্বারস্থ হয়েছিলাম গুগল-বাবার। প্রথমে সার্চ করেছিলাম কেল্লা সম্পর্কে। যে তথ্য পেয়েছিলাম তাতে কেল্লার নাম হল শিকারগড় দুর্গ আর এই কেল্লা তৈরি হয়েছিল মধ্যযুগের শেষের দিকে। তবে কে বা কারা এই কেল্লা বানিয়েছিলেন তা সম্পর্কে কোন তথ্য পাইনি।

তারপর পড়েছিলাম ‘ভীম কি চৌরি’-কে নিয়ে। জেনেছিলাম যে ‘ভীম কি চৌরি’ এই শব্দগুচ্ছের আক্ষরিক অর্থ হল ভীমের বিবাহ মণ্ডপ। তবে এই মন্দিরকে কেন ভীমের বিবাহ মণ্ডপ বলা হত, তা নিয়ে তথ্য ছিল না। আরও জেনেছিলাম যে এই মন্দিরের আর এক নাম হল ‘দ্বার মুকুন্দ্র মন্দির’। আধুনিক যুগে এর অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছিলেন জেমস টড, ১৮২০ সালে। তখন এই অঞ্চল ছিল জঙ্গলে ঢাকা।

ভীম কি চৌরির বর্তমান রূপের কারণও জানা গিয়েছিল একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে। টড-এর বয়ান অনুযায়ী সতের শতকে কোটার এক স্থানীয় শাসক এই মন্দিরের দেওয়ালের কিছু পাথর খুলে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের কোঠি বানানোর জন্য। পরবর্তীকালে মন্দিরের বাকি পাথরের সদগতি হয়েছিল ফরেস্ট রেস্ট হাউস, রাজস্থানি সরাই, কাছের এক পাহাড়ের উপর এক বারাদরি, স্থানীয় শাসকের এক রক্ষিতার বাসগৃহ এবং কিছুদূরের এক গ্রামের অধুনা পরিত্যক্ত এক মন্দির নির্মাণে। এত কিছুর পরেও মন্দির প্রাঙ্গণে প্রত্নতাত্ত্বিকরা খুঁজে পেয়েছিলেন দুটি মকরপ্রনালা, যা দিয়ে জল সরবরাহ করা হত শিবলিঙ্গকে স্নান করানোর জলাধারে এবং এক গণ বাদ্যবাদকের প্রতিকৃতি। এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি বর্তমানে সংরক্ষিত আছে কোটার মিউজিয়াম-এ।

ভীম কি চৌরির পাথরের খাদানে বিবর্তিত হয়ে ওঠার ইতিহাস পড়ে বেশ খারাপই লাগলো। তবে মনের এই বিষণ্ণতা কাটিয়ে দিল এই মন্দির সম্পর্কিত আর একটি তথ্য। তা হল এই মন্দিরের বয়স। মন্দিরের বয়স জেনে বুঝলাম যে ভুল করে ‘ভীম কি চৌরি’ দেখতে গিয়ে ভুল কিছু করিনি। কারণ এখনও পর্যন্ত ভারতের যত কাঠামোগত মন্দির বা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আমি দেখেছি তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হল এই ‘ভীম কি চৌরি’। এটি নির্মিত হয়েছিল আনুমানিক সাধারণ অব্দের পাঁচ শতকে। তখন এই অঞ্চল সহ পুরো উত্তর ভারতে রাজত্ব করছিলেন গুপ্তরা। অর্থাৎ গুপ্তযুগের মন্দির হল এই ‘ভীম কি চৌরি’। তবে গুপ্তযুগের এবং গুপ্ত শাসনাধীন অঞ্চলের মন্দির হলেও, গুপ্তরা কিন্তু ‘ভীম কি চৌরি’ নির্মাণ করেননি; বানিয়েছিলেন হূন হন্তারক আউলিকররা।

আউলিকর বংশ হল প্রাচীন ভারতের এক রাজবংশ, যাঁদের রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল আজকের মধ্যপ্রদেশের পশ্চিমভাগ, গুজরাতের উত্তর-পূর্ব অংশ এবং রাজস্থানের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ। এঁদের রাজধানী ছিল দাসপুর যা বর্তমানে পরিচিত মধ্যপ্রদেশের মান্দাসুর নামে। এঁদের রাজত্ব শুরু হয়েছিল সাধারণ অব্দের চার শতকের শেষভাগে, গুপ্তদের সামন্ত রাজা হিসাবে। সেই সময় গুপ্ত সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আসীন ছিলেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৭৫-৪১৫ সাধারণ অব্দ)। স্কন্দগুপ্তর (৪৫৫-৪৬৭ সাধারণ অব্দ) মৃত্যুর পর গুপ্তরা দুর্বল হয়ে পড়লে আউলিকররা স্বাধীন হয়ে গিয়েছিলেন। আউলিকরদের রাজত্ব টিকে ছিল সাধারণ অব্দের ছয় শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

আউলিকররা ছিলেন ‘মাল্লোই’ বা মালব্য জনগোষ্ঠীর মানুষ। ‘মাল্লোই’দের আদি বাসস্থান ছিল আজকের পাকিস্তান-আফগানিস্তান। ৩২৬ সাধারণ পূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের আগমনে এই অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। সেই রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বাঁচার জন্য ‘মাল্লোই’ সহ একাধিক জনগোষ্ঠী যেমন শিবাই অর্থাৎ শিবি, আগ্গালাসসি অর্থাৎ অর্জুনায়নাস ইত্যাদি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পরিযান করে ঢুকতে শুরু করে ভারতের ভিতরের দিকে এবং ছড়িয়ে পড়ে আজকের পাঞ্জাবে এবং রাজস্থানে।

এই সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘মাল্লোই’রা প্রথমে বসতি স্থাপন করেন পাঞ্জাবে। তারপর তাঁরা চলে আসেন আরও ভিতরের দিকে। থাকতে শুরু করেন করেন বিন্ধ্য পর্বতমালার উত্তরদিকের মালভূমিতে অর্থাৎ আজকের মধ্যপ্রদেশের পশ্চিম অংশে এবং তার সংলগ্ন আজকের রাজস্থানের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে। এই অঞ্চল ছিল প্রাচীন অবন্তীর অন্তর্গত। মালব্য জনগোষ্ঠীর নামেই এই অঞ্চল সাধারণ অব্দের দুই শতক থেকে পরিচিত হয়ে ওঠে মালব্য নামে। এই অঞ্চলেই উত্থান হয় আউলিকরদের সাধারণ অব্দের চার শতকের শেষ ভাগে।

আউলিকর রাজবংশের প্রথম শাসক ছিলেন নরবর্মণ। তাঁর সম্পর্কে আমরা জানতে পারি ৪০৩-৪০৫ সাধারণ অব্দের লেখা মান্দাসুর লেখ (আবিষ্কৃত হয়েছে ১৯১২ এবং ১৯২২ সালে), ৪১৭/৪১৮ সাধারণ অব্দে লেখা বিহার কোটরা শিলা লেখ (আবিষ্কৃত হয়েছে ১৯৩৮ সালে) এবং এবং একই সময়ে লেখা বিহার কোটরা গুহা লেখ (আবিষ্কৃত হয়েছে ১৯৮২ সালে) থেকে। এই লেখগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মনে করা হয় যে ৫১৫/৫২৫ সাধারণ অব্দ পর্যন্ত চলেছিল তাদের শাসন। এই লেখগুলো থেকে আরও জানা যায় যে নরবর্মণের বাবা এবং দাদু ছিলেন যথাক্রমে সিংহবর্মণ ও জয়বর্মণ।

অনুমান করা হয়ে যে আউলিকর বংশের রাজত্ব স্থাপনে গুপ্তসম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের ভূমিকা ছিল। শক দমনে নরবর্মণ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে সাহায্য করেছিলেন। তাঁরই প্রতিদানস্বরূপ, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নরবর্মণকে দিয়েছিলেন সামন্ত রাজার স্বীকৃতি।

নরবর্মণ পরবর্তী যে সমস্ত আউলিকর রাজাদের নাম আমরা পাই তাঁরা হলেন বিশ্ববর্মণ (গঙ্গাধরে প্রাপ্ত ৪৩১ সাধারণ অব্দে লেখা ময়ূরাক্ষের লেখ, আবিষ্কার হয় ১৮৮৩ সালে), বন্ধুবর্মণ (মান্দাসুরে প্রাপ্ত ৪৭৩ সাধারণ অব্দে লেখা রেশম তন্তুবায়দের লেখ, আবিষ্কার হয় ১৮৮৪ সালে) এবং প্রভাকর (মান্দাসুরে প্রাপ্ত ৪৬৭-৪৬৮ সাধারণ অব্দে লেখা দত্তভটের লেখ, আবিষ্কার হয় ১৯২৩ সালে)। এঁদের মধ্যে বিশ্ববর্মণ রাজত্ব করেছিলেন আনুমানিক ৪৩১ সাধারণ অব্দ নাগাদ, বন্ধুবর্মণ রাজত্ব করেছিলেন আনুমানিক ৪৩৬ সাধারণ অব্দ নাগাদ এবং প্রভাকর রাজত্ব করেছিলেন আনুমানিক ৪৬৭ সাধারণ অব্দ নাগাদ। ঐতিহাসিকদের মতে বন্ধুবর্মণ এবং প্রভাকরের মাঝে এক বা একাধিক আউলিকার রাজা ছিলেন।

এই সমস্ত রাজারা ছাড়া আর একজন আউলিকার শাসকের নাম পেয়েছিলেন ঐতিহাসিকরা। তিনি হলেন যশধর্মণ। ১৮৮৫ সালে মান্দাসুরের কাছে পাওয়া নিরোদসা-এর লেখতে উল্লিখিত ছিল তাঁর নাম। নিরোদসা ছিলেন যশধর্মণ-এর মন্ত্রী। নিরোদসার এই লেখ লেখা হয়েছিল ৫৩২-৫৩৩ সাধারণ অব্দে। ঐতিহাসিকরা যশধর্মণকে নরবর্মণের বংশের উত্তরাধিকারী বলে মনে করতেন।

আউলিকারদের বংশানুক্রম নিয়ে এই প্রাথমিক ধারণার পরিবর্তন ঘটে ১৯৮৩ সালে, রিস্থল লেখ আবিষ্কারের পর। রিস্থল লেখ লেখা হয়েছিল ৫১৫-৫১৬ সাধারণ অব্দে। এই লেখ লিখিয়েছিলেন প্রকাশধর্মণ। প্রকাশধর্মণ রাজত্ব করেছিলেন আনুমানিক ৫১৫ সাধারণ অব্দ নাগাদ। রিস্থল লেখ অনুযায়ী প্রকাশধর্মণের পূর্বপুরুষরা ছিলেন যথাক্রমে দ্রপবর্ধন, জয়বর্ধন, অজিতবর্ধন, বিভীষণবর্ধন এবং রাজ্যবর্ধন।

রিস্থল লেখ থেকে ঐতিহাসিকরা দু’টি সিদ্ধান্তে উপনীত হন। যেহেতু এতে উল্লিখিত প্রকাশধর্মণের পূর্বপুরুষদের নামের সাথে নরবর্মণের উত্তরপুরুষদের নাম কোনো মিল নেই, তাই হয়তো আউলিকর পরিবারের মধ্যেই দু’টি পৃথক রাজবংশ ছিল। তাঁরা নরবর্মণের বংশের নাম দেন আদি আউলিকর বংশ এবং প্রকাশধর্মণের বংশের নাম দেন পরবর্তী আউলিকর বংশ। এইটি হল ঐতিহাসিকদের প্রথম সিদ্ধান্ত। আর দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হল, যশধর্মণ আদি আউলিকর বংশের উত্তরসূরি ছিলেন না। তিনি ছিলেন পরবর্তী আউলিকর বংশের অংশ এবং খুব সম্ভব প্রকাশধর্মণ-এর সন্তান।

রিস্থল লেখ, যশধর্মণ-এর পূর্বসূরি কে ছিলেন সেই প্রশ্নের উত্তর দিলেও, নতুন একটি প্রশ্ন তুলে দেয়। নরবর্মণের উত্তরসূরি আর প্রকাশবর্মণের পূর্বপুরুষরা প্রায় সমসাময়িক। সুতরাং প্রশ্ন হল যে আউলিকরদের দু’টি বংশ কি করে একই সময়ে একই রাজধানীকে (মান্দাসুর) কেন্দ্র করে একই অঞ্চলে (মালব্য অঞ্চল) রাজত্ব করতে পারে? এই প্রশ্নের কোনো বিশ্বাসযোগ্য উত্তর এখনও ঐতিহাসিকরা খুঁজে পাননি।

এই বিষয়ে আমার একটি নিজস্ব মত আছে। রিস্থল লেখতে উল্লিখিত প্রকাশধর্মণ-এর পূর্বপুরুষরা আউলিকার রাজপরিবারের অংশ ছিলেন কিন্তু সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন না। নরবর্মণের বংশধরেরা সন্তানহীনতা বা অন্য কোনো কারণে উত্তরাধিকারীহীন হয়ে গেলে, প্রকাশধর্মণ-এর পূর্বপুরুষরা আউলিকার সিংহাসনে বসার সুযোগ পান। নিজের বংশের গৌরব বৃদ্ধির জন্য এবং নিজের সিংহাসনলাভের বৈধতা বাড়ানোর জন্য, প্রকাশধর্মণ রিস্থল লেখতে শুধু নিজের পূর্বপুরুষদের নাম লিখেছেন এবং নরবর্মণের উত্তরাধিকারীদের উল্লেখ করেননি।

যশধর্মণ-এর পরবর্তী কোনো আউলিকার রাজার নাম এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে ঐতিহাসিকরা যশধর্মণকেই আউলিকার বংশের শেষ রাজা বলে মনে করেন। ১৯৭৮ সালে মান্দাসুরে প্রাপ্ত জনৈক কুমারবর্মণের লেখ থেকে জানা যায় সাধারণ অব্দের ছয় শতকের শেষ দিকে এবং সাত শতকের শেষদিকে মান্দাসুরের সিংহাসনে আসীন ছিলেন কুমারবর্মণ। কিন্তু কুমারবর্মণের লেখতে তাঁর পূর্বপুরুষদের যে তালিকা পাওয়া যায়, তাতে প্রকাশধর্মণ এবং যশধর্মণ অনুপস্থিত। তাই ঐতিহাসিকরা কুমারবর্মণকে আউলিকারদের বংশধর বলে গণ্য করেন না।

ভারতবর্ষের ইতিহাসে আউলিকরদের যেটা অবদান তা হল স্কন্দগুপ্ত পরবর্তী উত্তর ভারতকে, বিশেষত গাঙ্গেয় উত্তর ভারতকে হুনদের হাত থেকে বাঁচাতে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন আউলিকার বংশের সবচেয়ে পরাক্রমশালী দুই রাজা প্রকাশধর্মণ এবং যশধর্মণ।

হূন রাজা তোরামনকে যুদ্ধে পরাজিত করেছিলেন প্রকাশধর্মণ। রিস্থল লেখতে লিপিবদ্ধ করা আছে প্রকাশধর্মণের এই হূন দমনের কাহিনী।

“……..By warfare he rendered false the Hun ruler’s title “emperor,” which had become established on earth by the time of King Toramāṇa, whose footstool was dappled by the effusion of light from the jewels in the crowns of kings……..”

“………..And after vehemently defeating him at the head of a battle, he overwhelmed the most seductive women in the harem of that same [Toramāṇa] and presented them to the bull-bannered lord [Śiva] in order to be a symbol of the prowess of his arms visible (prakasa) to the world……..”

আর হূনদের পাকাপাকিভাবে উত্তর ভারত থেকে তাড়িয়েছিলেন যশধর্মণ। ৫৩০/৫৩২ সাধারণ অব্দে চিতোরের কাছে হওয়া এক যুদ্ধে যশধর্মণের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তোরামান পুত্র মিহিরকুল। সেই যুদ্ধে যশধর্মণের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেছিলেন বেশ কয়েকজন দেশীয় রাজা যাঁদের মধ্যে ছিলেন গুপ্ত সম্রাট নরসিংহ গুপ্ত বলাদিত্য। যুদ্ধে হেরে মিহিরকুল চলে গিয়েছিলেন কাশ্মীরে। এরপর হূনরা আর কখনও উত্তর ভারতের সমতলে অভিযান করেনি।   

হূনদের বিরুদ্ধে তাঁর এই বিজয় কাহিনীকে স্মরণীয় করে রাখতে যশধর্মণ বানিয়েছিলেন দু’টি বিজয়স্তম্ভ। সেই বিজয়স্তম্ভের গায়ে লেখা হয়েছিল যশধর্মণের প্রশস্তি। প্রশস্তির রচয়িতা ছিলেন কাক্কা-এর পুত্র বাসুলা। পাথরের ওপর তা ফুটিয়ে তুলেছিলেন গোবিন্দ।

“…….[King Mihirakula,] who had never subjected his head to the ignominy of bowing except to Sthāṇu [Śiva] and the bulwark of whose arms gives the Snow Mountain [Himalaya] the conceited notion of being “inaccessible” – even that Mihirakula has abjectly worshipped [this man’s] feet with offerings of flowers from his turban, head aching as he was coerced into obeisance by the strength of his arm……”

১৮৭৯ সালে মান্দাসুরের কাছে খুঁজে পাওয়া যায় মনোলিথিক স্যান্ডস্টোনে বানানো সেই দু’টি বিজয়স্তম্ভের টুকরো টুকরো অংশ। এর মধ্যে যে বিজয়স্তম্ভটির সবগুলো টুকরো খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, ৮০’র দশকে এ.এস.আই, সেই টুকরোগুলোকে জুড়ে দাঁড় করায় একটি বিজয়স্তম্ভকে। মান্দাসুর শহর থেকে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে সোঁধনী গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে সেই বিজয়স্তম্ভ, অন্য বিজয়স্তম্ভের ভাঙা টুকরো আর অন্যান্য কিছু ভাঙা স্থাপত্যকে সাথে নিয়ে, আউলিকরদের স্মৃতি বহন করে।

প্রসঙ্গত পরের এক ট্রিপে ঢুঁ মেরেছিলাম সোঁধনী গ্রামে। দেখে এসেছিলাম আউলিকরদের বিজয়স্তম্ভ।

তথ্যসূত্রঃ

লেখক মুম্বাইতে স্বনিযুক্ত শান্তনু কারিগরিবিদ্যায় স্নাতক এবং ফিনান্স'এ এম.বি.এ। পেশার বাইরে শান্তনু'র শখ হলো নতুন জায়গা ঘুরে দেখা এবং ইতিহাসচর্চাকরা।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।