বাংলার প্রত্ন-প্রযুক্তি: প্রসঙ্গ চুন উৎপাদন
ভূমিকা
বর্তমানের মতো নিকট অতীতে বা দূর অতীতেও বাংলা অঞ্চলে চুনের নানাবিধ ব্যবহার লক্ষ করা যায়। কিন্তু এই চুন কি বাংলায় উৎপাদিত হতো? স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলে তার প্রক্রিয়া কী ছিল? সমাজ-কাঠামোয় উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়ার সংশ্লিষ্ট মানুষের ভূমিকা কেমন ছিল? উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত জ্ঞান-প্রযুক্তি ও কাচামাল স্থানীয় না আমদানিকৃত প্রভৃতি প্রশ্নের উত্তর বা ব্যাখ্যা বাংলার ইতিহাসে পাওয়া যায় না। বাংলার ইতিহাসে স্থাপত্য-পুরানিদর্শন ও সামাজিক আচার বিষয়ক আলোচনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘চুন’ শব্দের ব্যবহার পরিলক্ষিত হলেও আলোচনার বিষয় হিসেবে চুন গুরুত্ব পায়নি। সংশ্লিষ্ট তথ্যের অভাব এবং ইতিহাসের রক্ষণশীল সংজ্ঞায়নের কারণেই সম্ভবত অন্যান্য সনাতন উৎপাদন ব্যবস্থার মতো চুন উৎপাদন প্রযুক্তিও ঐতিহাসিকগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়নি। অথচ সামাজিক ইতিহাস চর্চায় সমাজের বৈষয়িক ভিত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সম্পর্কে জানতে হলে উৎপাদনের বাস্তব কৃৎকৌশলগুলির অধ্যয়নের তাত্ত্বিক গুরুত্ব অনেক। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রযুক্তির ইতিহাস-চর্চা বরাবরই গুরুত্ব পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম, বিশ শতকের শেষ দশকে প্রযুক্তির ইতিহাস চর্চার যে সূত্রপাত হয়েছিল (তরফদার ১৯৯৩, খান ১৯৯৫), তা আর অগ্রসর হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান প্রবন্ধে বাংলা অঞ্চলে চুন উৎপাদন প্রযুক্তির ইতিহাস অন্বেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার প্রয়োজনীয়তা
সামাজিক ইতিহাস চর্চায় সমাজিক-উৎপাদন প্রযুক্তির অধ্যয়নের গুরুত্ব প্রায় সকলের নিকট স্বীকৃত (হাবিব ২০০৭)। কেননা অধীত এই জ্ঞান ব্যতীত সমাজের বর্ণ ও শ্রেণি, সমাজে ও রাষ্ট্রে তাদের স্থান, তাদের দায় ও অধিকার, বর্ণের সাথে শ্রেণি ও রাষ্ট্রের সম্বন্ধ, রাষ্ট্রের সাথে সমাজের সম্বন্ধ, সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক, সংস্কৃতির বিভিন্ন রূপ ও প্রকৃতি অর্থাৎ সমাজবিন্যাস সম্পর্কে অবগত হওয়া যায় না। মূলত এই কারণেই বাংলার চুন সংশ্লিষ্ট বৃত্তিজীবীদের বর্ণ এবং সমাজবিন্যাসে তাদের স্থান, তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা, উৎপাদন ব্যবস্থার প্রকৃতি, উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্ঞান-প্রযুক্তির উৎস, সমাজে উৎপাদন ব্যবস্থার প্রভাব প্রভৃতির আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
গবেষণা-পদ্ধতি
আলোচ্য প্রবন্ধে প্রথমে চুন উৎপাদনে ব্যবহৃত সনাতন পদ্ধতির সাধারণ পরিচিত এবং ব্যবহৃত উপকরণ ও যন্ত্রপাতি বা হাতিয়ারে প্রযুক্ত প্রযুক্তির প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে। এরপর সে-প্রযুক্তির ইতিহাস অন্বেষণ করা হয়েছে। তবে তা নিকট অতীত থেকে ক্রমান্বয়ে দূর অতীতে বিস্তৃত হয়েছে।১ এর বাইরে অন্য কোনো তত্ত্ব অনুসরণ করে বাংলার চুন উৎপাদন-প্রযুক্তির ইতিহাস অন্বেষণ করা হয়নি। উক্ত প্রযুক্তিকে উপরিতল থেকে পর্যবেক্ষণও করা হয়নি, বরং স্থানীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উৎপাদক যেমন কোনো তত্ত্ব অনুসরণ বা বাস্তবায়ন করার জন্য প্রযুক্তি-চর্চা করেননি, তেমনি এ প্রবন্ধেও তা অনুসৃত হয়নি। কার্যত কোনো তত্ত্বের পরিবর্তে মাঠপর্যায়ে উৎপাদকের ব্যবহৃত পদ্ধতি ও ব্যবহৃত প্রযুক্তির বিবরণ, ব্যাখ্যা ও ইতিহাস রচনায় ঐতিহাসিক গবেষণারীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
চুনের রাসায়নিক পরিচয়
চুন এক প্রকার পদার্থ। এর উৎস ক্যালসিয়াম কার্বনেট (CaCO3), যা জৈব বা অজৈব হতে পারে। ক্যালসিয়াম কার্বনেটকে (CaCO3) উত্তপ্ত করলে তা দুইটি পদার্থে রূপান্তরিত হয়। এক. ক্যালসিয়াম অক্সাইড (CaO) এবং দুই. কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2) গ্যাস। এই ক্যালসিয়াম অক্সাইড কুইক লাইম (quick-lime) বা স্ল্যাকড লাইম (slaked lime) নামে পরিচিত। এটি সাদা রঙের এবং শুষ্ক। তবে প্রকৃত পক্ষে কুইক লাইম বা স্ল্যাকড লাইম-এর সাথে পানির (H2O) মিশ্রণ করলে যা পাওয়া যায় তাই চুন। এই চুনের রাসায়নিক নাম ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড {Ca(0H)2}। ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড বা চুন হাইড্রেটেড লাইম (Hydrated lime) নামেও পরিচিত (Lazell 1915: 14 & 15)।
চুনের উৎস বা উপকরণ
বিজ্ঞানের ভাষায় চুনের উৎস ক্যালসিয়াম কার্বনেট সমৃদ্ধ চুনাপাথর (limestone), জলজ প্রাণীর শক্ত খোলস- বিশেষত ঝিনুক, শামুক, শঙ্খ, কড়ি প্রভৃতি। পাথর হলো চুনের অজৈব এবং জলজ প্রাণীর শক্ত খোলস হলো চুনের জৈব উৎস। পৃথিবীর সর্বত্রই এগুলো চুনের মুখ্য উৎস। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে উন্নতমানের চুনাপাথর পাওয়া গেলেও বাংলা অঞ্চলে তেমন পাওয়া যায় না। বর্তমানে দেশজ-প্রযুক্তিতে যে-চুন উৎপাদিত হয় তার উৎস ঝিনুক-শামুক। মানভূমসহ সিংহভূম, হাজারীবাগ ও লোহারডাঙ্গায় যে চুনাপাথর পাওয়া যায় তা চুন উৎপাদনের জন্য অধিক উপযোগী নয়। তবে ব্রহ্মপুত্রের উপত্যকায় খুব উন্নতমানের না হলেও খাসিয়া ও জন্তিয়া পাহাড়ে চুনাপাথরের অফুরন্ত উৎস ছিল। সেই চুনাপাথর থেকে উৎপাদিত চুন ‘সিলেট চুন’ নামে পরিচিত ছিল। এই চুনই কলকাতা ও দক্ষিণ বাংলার চাহিদা পূরণ করত (Watt 1889: 145 & 146)। Materia Indica তে উল্লিখিত হয়েছে ভারতে ঝিনুক, শামুক, কড়ি, শঙ্খের খোলস থেকে চুন তৈরি করা হতো (Ainslie 1826a:195)। বাংলার অভ্যন্তরের জলাভূমি এবং উপকূলে বিশেষ করে সুন্দরবন থেকে পাওয়া শামুক-ঝিনুক পুড়িয়ে প্রতি বছর অনেক পরিমাণের চুন উৎপাদিত হতো। শামুক-ঝিনুকসমূহ দেশীয় নৌকা দ্বারা সরবরাহ করা হতো। সমতল থেকে সংগৃহীত শামুকের পাতলা খোলস থেকে উৎপন্ন চুন অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের, তাই এসব চুন দরিদ্ররা নির্মাণ কাজে ব্যবহার করত। তবে সামুদ্রিক ঝিনুক থেকে উৎপাদিত চুন উৎকৃষ্ট মানের (Watt 1889: 147)। এই চুন নির্মাণ কাজের জন্য চুনাপাথর হতে উৎপন্ন চুন থেকেও অধিক কার্যকরী এবং মূল্যও অধিক (Mukharji 1883: 147)।
চুন ব্যবহারের বিশ্ব-প্রেক্ষাপট
বিশ্বব্যাপী চুনের বহুবিধ ব্যবহার লক্ষ করা যায়। নির্মাণ, চিকিৎসা, নানান পণ্য উৎপাদন, নেশা প্রভৃতিতে চুন ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে চুনের ব্যবহার আরো সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে অতীতে ভারতীয় উপমহাদেশ ব্যতীত বিশ্বের অন্যত্র সম্ভবত নির্মাণ কাজেই চুন অধিক ব্যবহৃত হয়েছে। চুনের সর্বপ্রাচীন ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে পূর্ব তুরস্কে। সেখানে খ্রিস্টপূর্ব ১২০০০ থেকে ৫০০০ অব্দে নির্মিত মেঝেতে চুন ব্যবহৃত হয়েছে (Elsen 2006: 1417)। প্রায় একই সময়ের নির্মাণে চুন ব্যবহৃত হয়েছে প্যালেস্টাইনেও (Elert 2002: 62)। যুগোশ্লাভিয়াতে ৬ হাজার বছর পূর্বের এক মেঝে নির্মাণেও চুনের ব্যবহার লক্ষণীয়। তিব্বতেও ৫ হাজার বছর পূর্বের নির্মাণে চুন ব্যবহৃত হয়েছে। মেসোপটেমিয়াতে খ্রিস্টপূর্ব ২৪৫০ অব্দের চুন উৎপাদনের চুল্লি আবিস্কৃত হয়েছে। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দের মধ্যেই প্রায় সকল সভ্যতা, যেমন- মিশরীয়, গ্রীক, রোমান, ইনকা, মায়া, চৈনিক প্রভৃতি সভ্যতার নির্মাণ কার্যে চুনের ব্যবহার ব্যাপক হারে বিস্তার লাভ করে (Oates 1998: 3)। গ্রীকরা উন্নতমানের সাদা চুনের স্ট্যাকো দ্বারা দেওয়ালে প্লাস্টার ও অলঙ্করণ করত (Lazell 1915: 10)। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকেই রোমান লেখক, স্থপতি ও সমর-প্রকৌশলী মার্কাস ভিট্রুভিয়াস পোলিও (Marcus Vitruvius Pollio c.80-70 BC- c. 15 BC) স্থাপত্যের নির্মাণ-উপাদান ও স্টাকোর (stucco) জন্য চুনের ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন Vitruvius 1914: 45, 203 & 204)। তবে আরব ও মুরদের হাতেই মধ্যযুগে চুন মিশ্রিত প্লাস্টারের কাজ উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল (Lazell 1915: 10)।
বাংলা ব্যতীত ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে চুন ব্যবহার
ভারতীয় উপমহাদেশে চুন মিশ্রিত পলেস্তারা ব্যবহারের ইতিহাসও অনেক প্রাচীন। মোহেনজো-দাড়োতে চুন ব্যবহৃত হয়েছে। ড্রেনের অভ্যন্তর ভাগ আস্তরণ করার সময় যে জিপসাম ব্যবহৃত হয়েছে তাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চুনের ব্যবহার লক্ষ করা গেছে। তবে প্রকৃত চুনের প্লাস্টার করা হয়েছে বড়ো বাথরুমে এবং অন্যত্র (Marshall 1931: 15 & 126)। এছাড়া কোসাম্বি, নাগার্জুনকোন্ডা ইত্যাদি প্রত্নক্ষেত্রে চুন মিশ্রিত পলেস্তারা ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে (Ghosh 1996: 5-10, 95)। তক্ষশীলায় পাওয়া গেছে অনেক স্টাকো মূর্তি ও মূর্তির ভগ্নাংশ। এসব স্টাকো তৈরি করা হয়েছে নদীর মোটা বালি বা ছোট নুড়ি পাথরের সাথে চুন মিশ্রণ করে (Marshall 1951: 179)। উল্লেখ্য চুন-বালির সাথে পানি মিশ্রিত মণ্ডই স্টাকো (stucco)। যদিও আধুনিক স্টাকোতে চুন-বালির সাথে সিমেন্টও মিশ্রিত হয় (Harris 2006: 959)।
সুলতানি যুগে ভারতে চুন-সুরকির প্রয়োগের ফলে ছাদ তৈরিতে নতুন ধারা সূচিত হয় (রায় ১৯৯৭: ২৯)। এ সময় সমগ্র ভারতে গাঁথুনির মিশ্রণ হিসেবে চুন ও জিপস্যাম দুই-ই ইন্দো-মুসলিম রীতির আওতায় নির্মাণকর্মে অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে (Habib 2009: 56)। মুঘল নির্মাণকর্মেই গাঁথুনির মিশ্রণ হিসেবে চুন ও জিপস্যামের সর্বাধিক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে আবুল ফজল গাঁথুনির মিশ্রণ হিসেবে বিভিন্ন প্রকারের চুনের উল্লেখ করেছেন। যেমন চুনাপাথরের চুন, শামুক চুন, চুনা বা কলিচুন। তিনি এসব পণ্যের দামও উল্লেখ করেছেন। যেমন, চুনাপাথরের চুন মণপ্রতি মূল্য ৫ দাম ও ৫ জিতল, শামুক চুন মণপ্রতি মূল্য ৫ দাম এবং চুনা বা কলিচুন মণপ্রতি মূল্য ২ দাম। কলিচুন প্রধানত প্রস্তরবৎ এক ধরনের শক্ত মাটি ‘কংকর’ জলে ফুটিয়ে আহরণ করা হয় (Fazl ‘Allami 1873: 223)। সম্রাট আকবর যে-সব পণ্য বা খাতের কর রহিত করেন তার মধ্যে চুন উৎপাদনও রয়েছে (Fazal-I-‘Allami 1949: 73)।
বাংলা অঞ্চলে চুনের প্রত্ন-ব্যবহার
ঔপনিবেশিক যুগের নানান উৎসে চুন সংশ্লিষ্ট তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। উনিশ শতকে তৈরি রাজশাহী জেলার পুঠিয়ার মন্দিরসমূহের দেয়ালগাত্রে ব্যবহৃত পলেস্তারায় যে চুন সুরকির ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে শামুক ঝিনুকের চূর্ণ পরিলক্ষিত হয়। ফলে অনুমিত হয় যে চুন প্রাকৃতিক কংকর থেকে সংগ্রহ করা হয়নি (মাহাবুব-উল-আলম ও সুলতানা ২০০৮: ৯৯)। একই শতকের শেষদিকে ঢাকার সিভিল সার্জন ও লেখক জেমস ওয়াইজ (১৮৩৫-১৮৮৬) লিখেছেন চুনের ব্যবসায়ী কিংবা চুনওয়ালা হতো যে কোন বর্ণ বা গোত্রের লোক। তাঁর মতে রাজমিস্ত্রি সামাজিক স্তর-বিন্যাসে যদিও উচ্চ শ্রেণির নয়, তবুও তাঁরা চুন-সুরকি মিশ্রণের কাজ নিজেরা করেন না। যাঁরা এ কাজ করেন তাঁরা যোগারিয়া এবং যাঁরা মিশ্রিত চুন-সুরকি বহন করেন তাঁরা তাঘারিয়া নামে পরিচিত। তিনি আরো লিখেছেন চুনের ব্যবসায়ী কিংবা চুনাওয়ালা হতো যে কোন ধর্ম বা বর্ণের লোক। চুন আনা হতো সিলেট থেকে। জেমস ওয়াইজ চুনের আর এক ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। কাগজ তৈরিতে মেস্তার আঁশ চুনের পানিতে কয়েক ঘন্টা ভিজিয়ে রাখা হয় (Wise 1883: 104 & 81)। চুনের পানিতে কাগজ তৈরির মণ্ড ডুবিয়ে রাখাও আবশ্যক ছিল (Habib 2009: 64)। ঔপনিবেশিক যুগে চুনের উৎপাদন ও বাণিজ্য প্রসার লাভ করে। তার প্রমাণ পাওয়া যায় আঠারো শতকের মাঝামাঝি কিছু বাণিজ্য দলিলে। সেই দলিলে ঢাকার বাণিজ্য পণ্যের তালিকায় চুনের নাম রয়েছে (ইব্রাহীম ২০০৩: ১৭৯)। কারুশিল্পের এক আলোচনায় বলা হয়েছে ঝিনুকের কাজ শঙ্খের সমগোত্রের একটি শিল্প। প্রভেদ এই যে, শঙ্খের কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে আর ঝিনুক পাওয়া যায় এদেশের পুকুর নদী ও খাল-বিলে (আহমদ ২০০৩: ২৯৯)। জেমস্ টেইলর (১৮৩৯ খ্রি.) উল্লেখ করেছেন ঢাকায় ক্রয় বিক্রয়ের সময় চুন সেরে বিক্রয় হতো। এক সের চুনের মূল্য ছিল ৯০ সিক্কা। ঐ সময় ঢাকা শহরের অধিবাসীদের পেশাজীবীদের মধ্যে চুনবিক্রেতাও অন্যতম ছিল (Taylor 1840:185 &183)। সতেরো শতকে ডাচ বনিক ফ্রান্সিসকো পেলসার্ট সাদা প্লাস্টারের কথা উল্লেখ করেছেন; যা তাঁর দেশ হল্যান্ডের যে-কোন প্লাস্টারের চেয়ে অনেক উন্নতমানের। এই প্লাস্টার জলে ঢেলে ফোটানো নয় এমন চুন, দুধ, আঠা ও চিনি মিশিয়ে বানানো হতো (Moreland & Geyl 1925: 66 & 67)।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য নিদর্শনেও চুন, পান, চুনারির তথ্য পাওয়া যায়। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অগ্রদূত ভারতচন্দ্র রায় (১৭১২-১৭৬০ খ্রি.)-এর রচনাতেও চুনের উল্লেখ পাওয়া যায়।২ তাঁর পূর্ববর্তী লেখক ষোল শতকের কবি ‘কবিকঙ্কন’ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর (আনু. ১৫৪০-১৬০০) রচনাতেও চুনের উল্লেখ আছে। তাঁর বিখ্যাত পাঁচালি কাব্য চণ্ডীমঙ্গল-এর আখেটিক খণ্ডে চুন রাখার পাত্র ‘চুণা-বাটা’ এবং চুন উৎপাদক ‘চুণারী’র উল্লেখ রয়েছে (চক্রবর্তী ২০১৩: ৮২ ও ৮৩)। আরো পূর্বে চৌদ্দ শতকের কবি বড়ু চণ্ডীদাস রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন-এর একটি ভাগের নামই ‘তাম্বুলখণ্ড’। এর নানান শ্লোকে চুনসহযোগে পান খাওয়া (কার পান চুন নাহিঁ খাওঁ/ কাহারো পাস নাহিঁ জাওঁ॥ দানখণ্ড), পানের সাথে কর্পুর (কর্পুর বাসিত তাম্বুলে/ আর। কস্তুরী ভরাআাঁ কপোলে॥; কথা খানি খানি কহিল বড়ায়ি/ বসিআঁ রাধার পাশে।/ কর্পুর তাম্বুল দিআঁ রাধাক/ বিমুখ বদনে হাসে॥ ল বড়ায়ি॥ তাম্বুলখণ্ড), পান-সুপারি (এহা গুআ পান তোহ্মে আপণেই খাহা। আপণাক চিহ্নিআঁ কাহ্নে থান যাহা॥ তাম্বুলখণ্ড) প্রভৃতির উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া বিয়ের সময় কন্যার মুখমণ্ডল সাজাতে চুনের রেখা ব্যবহৃত হতো — সে তথ্যও বড়ু চণ্ডীদাস সূত্রে জানা যায় (চণ্ডীদাস ১৩২৩: ৬৪, ১৬, ১৮, ২৪ ও ৭)। সংস্কৃত-সাহিত্য সূত্রেও চুনের ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। যেমন ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থিত সদুক্তিকর্ণামৃত-র ৭৬৫ নম্বর শ্লোকে চুনকাম করা গৃহের উল্লেখ রয়েছে (হোসেন ২০০৭: ৪৮)।
নির্মাণ-উপকরণ ছাড়াও চুন নেশার সহযোগী হিসাবেও ব্যবহৃত হয়। চুন সহযোগে পান-সুপারি চিবিয়ে মুখ রাঙ্গা করা বা নেশা করা বাংলার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ অংশ এবং পান-সুপারি বাংলার অর্থকারী৩ ফসলও বটে। প্রাচীনযুগের অনেক লিপিতে৪ পান ও সুপারি চাষের তথ্য পাওয়া গেলেও চুনের কোন উল্লেখ নাই। তবে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও পানের ব্যাপক ব্যবহার ছিল তা রাজতরঙ্গিণী সূত্রে জানা য়ায় (Stein 1800: 160, 161, 237, 284, 311, 330, 341, 350, 358, 389)। বাৎস্যায়নও লিখেছেন পানের পাতা চর্বণ করে মুখ সুবাসিত করা হতো (The Kama Sutra of Vatsyayana 1925: 18, 74, 75, 116 & 152)। একাদশ শতকে শেষ দিকে হরিবর্মদেবের মন্ত্রী ভট্টভবদেব রচিত প্রায়শ্চিত্ত-প্রকরণ৫-সূত্রেও জানা যায় গুবাক, খদির, চুন ও কর্পূর সহযোগে মানুষ পান খেত (মজুমদার ২০১০: ৭২)। বরাহমিহির তাঁর বৃহৎসংহিতা-য় জানিয়েছেন তখন মানুষ চুনসহযোগে পান খেত। তিনি চুনের নতুন এক ব্যবহারের খবর দিয়েছেন, তিনি জানিয়েছেন তখন পাথর ভাঙ্গার কাজে চুনের পানি ব্যবহৃত হতো (Shastri, 1969: 247 & 310)। করমণ্ডল অঞ্চলে সাবান প্রস্তুতে চুন ব্যবহৃত হতো (Ainslie 1826b: 229)। চুন বা চুনের পানি চিকিৎসাতেও ব্যবহৃত হতো (Dutt 1877: 82 & 83, Ainslie 1826a: 195)।
বাংলা অঞ্চলে আদি-মধ্যযুগের নানান নির্মাণেও চুনের ব্যবহার নিশ্চিত করে জানা যায়। নওগাঁ জেলার জগদ্দল বিহারের পিছনের দেয়ালে এবং ২৭ নম্বর কক্ষের অভ্যন্তরের দেয়ালে চুন-সুরকির প্লাস্টার ব্যবহৃত হয়েছে (Mahabub-ul Alom 2018: 208)। পুণ্ড্রনগর বা মহাস্থানগড় থেকে ৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বিহারধাপ মন্দিরের দেওয়ালে ৮/৯ শতকের ব্রজলেপের আস্তরণ চিহ্নিত করা হয়েছে (মাহাবুব-উল-আলম ও সুলতানা ২০০৮: ৯৭-১০০)। যদিও অন্যান্য ব্রজলেপের মতো এখানে সম্ভবত চুন ব্যবহৃত হয়নি। ঢাকার পার্শ্ববর্তী সাভারস্থ রাজা হরিশচন্দ্রের স্তূপের তৃতীয় পর্যায়ের নির্মাণের সময় দেওয়ালে ইটের গুড়ার সাথে চুন মিশিয়ে প্লাস্টার করা হয়েছিল (হক ২০১৯: ৪৬৮)। মেদিনীপুর জেলার মোঘলমারী প্রত্ন-স্থাপনাতেও স্টাকোয় তৈরি নকশা, চুন দিয়ে প্লাস্টার করা স্বল্প গভীর কুলুঙ্গি চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে স্টাকোয় তৈরি জম্ভল/কুবের-এর এবং নৃত্যরত নর-নারীর মূর্তিও পাওয়া গেছে (সান্যাল ২০১৯: ৪৫২-৪৫৪ ও ৪৫৭)। যশোর জেলার ভরত ভায়নার বাইরের দিকের উঁচু দেওয়াল সংলগ্ন প্রদক্ষিণ পথের মেঝের ওপর পুরু চুন-বালির প্লাস্টারের প্রমাণ পাওয়া গেছে (মিতা ও রহমান ২০১৯: ২৭৫)। খ্রিস্টীয় আট-নয় শতকের প্রত্নক্ষেত্র ইটাখোলা মুড়া মন্দিরে চুন-বালুজাত উপকরণে তৈরি একটি বড়ো আকারের লোকোত্তর বুদ্ধমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে (মাহাবুব-উল-আলম ও সুলতানা ২০০৮: ৯৯)। পাহাড়পুরে ১৯ ও ২০ নম্বর ঘরের মেঝের ২য় পর্বের নির্মাণে চুন ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে স্টাকোর তৈরি কিছু বৌদ্ধ মূর্তির মাথাও আবিষ্কৃত হয়েছে। পাহাড়পুরে মুসলিমযুগের নির্মাণেও যে চুনের ব্যবহার অব্যাহত ছিল তা জানা যায় (Dikshit 1938: 22, 25, 76, 77 & 81)। স্টাকো ছাড়াও ইট, কাঠ, পাথর প্রভৃতি জোড়া ও প্লাস্টার হিসাবে যে ব্রজলেপ৬ ব্যবহৃত হতো তাতেও সম্ভবত শঙ্খের চুন ব্যবহৃত হতো। স্টেলা ক্রামরিশ মনে করেন ব্রজলেপে অন্যান্য উপাদানের সাথে শঙ্খের চূর্ণ মিশ্রণ করা হতো (Kramrisch 1946: 121)।
বাংলা অঞ্চলে আরো প্রাচীন প্রত্ন-বসতির নির্মাণেও চুন ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া গেছে। চুন-সুরকির মেঝে আরো আবিষ্কৃত হয়েছে উয়ারী-বটেশ্বরে (রহমান ও পাঠান ২০১২: ৩২ ও ১০৩) ও পশ্চিমবঙ্গের মঙ্গলকোটে (Ray 1990: 137)। উয়ারী-বটেশ্বরের একটি সড়কেও চুন-সুরকির ব্যবহার করা হয়েছে (রহমান ও পাঠান ২০১২: ১০৩)। বানগড়েও চুনের ব্যবহারের দৃষ্টান্ত লক্ষণীয়। সেখানে মৌর্যযুগের ঘরের মেঝে তৈরি করা হয়েছে চুন-সুরকি দ্বারা (Goswami 1948: 10 & 35)। জ্ঞাত তথ্য মতে চুনের সর্ব প্রাচীন ব্যবহারের নজির পাওযা যায় পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে। সেখানে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের উৎখননে প্রাক্-ঐতিহাসিক যুগের চুন-প্লাস্টারকৃত ঘরের মেঝে আবিষ্কৃত হয়েছে (Gupta 1962: 16)।
উপর্যুক্ত আলোচনায় এটা সুস্পষ্ট যে, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় ভারত উপমহাদেশে তথা বাংলা অঞ্চলেও নির্মাণ, শিল্পকলা, চিকিৎসা, নেশা, কাগজ উৎপাদন প্রভৃতি কাজে চুনের ব্যাপক ব্যবহার প্রচলিত ছিল এবং চুনের প্রাচীনত্ব বাংলা অঞ্চলে সর্বাতীত খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত প্রমাণিত হয়। জ্ঞাত তথ্যমতে চুন বিষয়ে এর চেয়ে প্রাচীন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে চুন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতির আরো অতীতের ইতিহাস অন্বেষণ করা অসম্ভব নয়। সাধারণভাবে ভৌত-প্রত্ন নিদর্শন ও সমকালীন সাহিত্য (কাব্য, দিনলিপি, ভ্রমণকাহিনী, চিঠি, নথিপত্র প্রভৃতি) ব্যতীত অন্য কোনো উৎসের তথ্য বাংলার ইতিহাস রচনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবহৃত হয়নি। তবে ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় ‘অন্য উৎস’ ব্যবহার করে বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নতুন দিক উন্মোচনের দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন।৭ সে ভিন্ন উৎসের অন্যতম হলো প্রত্ন-শব্দ (Archaeo-word)।৮ বাংলা ভাষার প্রত্ন-শব্দ বা শব্দের ব্যুৎপত্তি (Etymology) চর্চার তথ্য ব্যবহার করে বাংলার সনাতন প্রযুক্তির ইতিহাস পুনর্গঠন করা অসম্ভব নয়।৯ এ বিষয়ে চুন, চুন-উৎপাদন ও চুন সংশ্লিষ্ট বাংলা শব্দের প্রত্নতাত্ত্বিক (etymologycal) তথ্য ও তাদের সামাজিক ব্যাখ্যা বিশেষ সাহায্য করতে পারে। সংশ্লিষ্ট শব্দ নির্বাচনের জন্য প্রথমে চুন-উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে পরিচিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
চুন উৎপাদনের সনাতন-পদ্ধতি
স্থানীয় ও ব্যক্তি পর্যায়ে এখনও ঝিনুক ও শামুক পুড়িয়ে চুন উৎপাদিত হয়। উপকরণ সংগ্রহ, উপকরণ প্রক্রিয়াকরণ, পোড়ানো এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপুর্ণ অঙ্গ। প্রথমে খাল, বিল, নদী, নালা বা যে কোনো জলাশয় থেকে শামুক বা ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। শামুকের তুলনায় ঝিনুক থেকে অধিক পরিমাণে চুন পাওয়া যায় বিধায় ঝিনুককে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। সংগৃহীত জীবিত ঝিনুক ও শামুক হতে মাংস বের করে খোল পরিস্কার করে রৌদ্রে শুকাতে হয়। শুকানো ঝিনুক চুল্লিতে পোড়া হয়।১০ চুল্লি স্থানীয়ভাবে ভাটি নামে পরিচিত। ভাটি ছোট পরিসরের এবং বৃত্তাকার। ভাটির বেষ্টনীর নিম্নাংশে একটি ছিদ্র রাখা হয়, এই ছিদ্রই চুল্লির মুখ। চুল্লির ১ম স্তরে ছোট মাটির পাত্র সজ্জিত করা হয় (চিত্র ১ ও চিত্র ২)। এই মাটির পাত্রের উপর জ্বালানী হিসাবে কাঠের ছোট টুকরা, এর পর ঝিনাই (ঝিনুকের আঞ্চলিক নাম) এই ক্রমে কাঠ আর ঝিনাই স্তরে স্তরে সাজিয়ে ভর্তি করা হয়। এর পর পূর্বোক্ত সরু মুখে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। উল্লেখ, আগুন যত ধীরে জ্বলবে তত উন্নত ও পরিমানে বেশি চুন পাওয়া যায়।

চিত্র ১

চিত্র ২
ধীরে ধীরে জ্বলে বলে জ্বালানী মিহি ছায়ে পরিণত হয় তবে ঝিনাই আকারে অক্ষত থাকে এবং উপরের কালচে আবরণ পুড়ে শুভ্র রূপ ধারণ করে। এবার চালুনি (চিত্র ৩) দিয়ে ঝিনাই ও ছাই পৃথক করা হয়। এই ছাই চালুনির নিচে পড়ে যা, ভুরাই নামে পরিচত। এটা কৃষি জমিতে প্রয়োগ করা হয়। চালুনির উপরে থাকে ঝিনুকের পোড়া শুভ্র খোল। এই শুভ্র খোল থেকে দুই ভাবে চুন উৎপাদিত হয়। ১. শুভ্র খোল প্রথমে বড়ো পাত্রে যা হদ নামে পরিচিত সেখানে রেখে পানি দেওয়া হলে ভড়কে উঠে এবং গুড়া হয়ে যায় (চিত্র ৪)। ভড়কে ওঠা গুড়া মোথা দিয়ে বার বার আঘাত করে এবং নাকড়ি দিয়ে উলটিয়ে গুড়াকে আরো মিহি করা হয় (চিত্র ৫)। শেষে আরো পানি দিয়ে তরল করে পাতলা কাপড় দিয়ে ছেকে নিতে হয়। এবং তা অপর হদে রেখে দিলে চুন নিচের স্তরে আর উপর স্তরে পানি জমা হয়। নীচের এই চুনই নেশা, চিকিৎসা ও প্রসাধনে ব্যবহত হয়। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে পানি ছাড়া শুভ্র পোড়া খোল চূর্ণ করা হয়। চুর্ণ করতে মোথা বা ঢেঁকি ব্যবহার করা হয়। মূলত এই চূর্ণই মূলত কুইক লাইম নামে পরিচিত। যা পরবর্তীতে পানি মিশিয়ে চুন তৈরি কর হয় বা নির্মাণ ও অন্যান্য কাজে ব্যহৃত হয়।

চিত্র ৩

চিত্র ৪

চিত্র ৫
শব্দের প্রত্মতাত্ত্বিক (etymology) ও ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা
উপর্যুক্ত আলোচনায় প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক সূত্র থেকে প্রমাণিত হয়েছে বাংলা অঞ্চলে চুনের ব্যবহার খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত প্রমাণিত। এর পূর্বে প্রচলিত ছিল কিনা তা যাচাই করা প্রয়োজন। চুন এবং চুন-উৎপাদন সংশ্লিষ্ট শব্দের প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগৃহীত হতে পারে। বাংলা অভিধানে চুন শব্দকে সংস্কৃত চূর্ণজাত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ক্ষুদিরাম দাশ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে চুন তৈরি উৎপাদনে যে ঘুটিং ব্যবহৃত হয় তা সাঁওতালি ‘গৗঠি’ নামে পরিচিত এবং উক্ত চুন সাঁওতালি ভাষায় ‘গৗঠি চুন’-এর উল্লেখ রয়েছে। দ্রাবিড় ভাষার পণ্ডিতদের মতে চুন তামিল, মলয়ালম, কন্নড়; তেলেগু সুন্নমু সমার্থক। এছাড়া উপকরণ বিষয়ক শব্দ শামুক-এর আঞ্চলিক শব্দ গুগলি ও গেঁড়ি দেশী শব্দ। ঝিনুক সাঁওতালি থেকে বাংলা এসেছে। আবার উৎপাদন বিষয়ক শব্দ ভড়ক/ভড়কানো/ ভড়ং – বাংলা দেশী শব্দ। ভাটা/ভাটি: সাঁওতলি থেকে বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছে। ভুরাই দেশী শব্দ। মোথা/মুদ্গর/ মুষল শব্দটি দ্রাবিড় শব্দজাত। ঢেঁকি শব্দটি সম্ভবত দ্রাবিড় শব্দ ঢেঁকু থেকে বুৎপন্ন। কেননা দ্রাবিড় ঢেঁকু শব্দের অর্থ লাফানো যা ঢেঁকির কাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ঢেঁকির গড় সাঁওতালি অর্থাৎ কোল-মুণ্ডা জাত (দাশ ১৯৯৮: ৭৯ ও ১২৪, Burrow and Emeneau 1984: 160 & 258, দাশ ১৯৯৩: ৭০ ও ১৫১, ইসলাম ১৪০২: ৬৩, সরকার ২০১৩: ৯০ ও ৯৪, মৈত্রী ২০০১: ৫৩ ও ১২৩)। উপর্যুক্ত ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা শব্দসমূহের প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে। শব্দগুলোর সাথে আর্যপূর্ব অস্ট্রিক-দ্রাবিড় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান তাতে কোন সন্দেহ নাই। আর যেহেতু চুন ও চুন-উৎপাদন সংশ্লিষ্ট সনাতন সংস্কৃতির অনেক শব্দ আর্যপূর্ব ভাষাগোষ্ঠী হতে আগত, তাই চুন উৎপাদনের সনাতন পদ্ধতি ও সংস্কৃতির সাথে আর্যপূর্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রগাঢ় সম্পর্ক থাকা অস্বাভাবিক নয়। এসব সম্পর্কের সূত্র ধরে এ অনুমান অমূলক নয়, যে প্রাচীন যুগে বা তারও পূর্বে থেকেই বাংলা অঞ্চলের মানুষ ঝিনুক, শামুক প্রভৃতি হতে চুন প্রস্তুত করতে কার্যকর প্রযুক্তির ব্যবহার জানত। উল্লেখ্য, এটা সর্বজন স্বীকৃত যে জ্ঞাত তথ্যমতে বাংলা অঞ্চলে প্রথম বসতি স্থাপনকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্ট্রিক-দ্রাবিড়রা ছিলেন প্রধান (চট্টোপাধ্যায় ১৯৩৪: ৭৬, মজুমদার ১৯৯২: ১৬, সুর ১৩৮৩: ২৪)। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের (ভট্টাচার্য ২০০৯: ১১, মজুমদার ১৪০৪: ৩) দিকে উত্তর ভারতে আগমনের অনেক পরে আর্য প্রভাব বাংলায় বিস্তৃত হয়। গুপ্তযুগের পূর্বে (মজুমদার ১৯৯২: ২৪) বাংলা অঞ্চলে অস্ট্রিক-দ্রাবিড়রাই ছিলেন প্রধান জনগোষ্ঠী (শহীদুল্লাহ ২০১০: ৫৮, চৌধুরী ২০১২: ৯৯)। এদের ভাষা যথাক্রমে অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় ভাষা নামে পরিচিত।
চুন উৎপাদন সংস্কৃতি বাংলা অঞ্চলে কতটা বিস্তৃত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় চুন সংশ্লিষ্ট স্থান নাম দৃষ্টে। বাগেরহাট জেলার চুনাখোলা (মসজিদ), ঝিনাইদহ জেলা, শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতি, হবিগঞ্চের চুনারঘাট, টাঙ্গাইল, নওগাঁ ও বগুড়া শহরের চুনাতিপাড়া, চট্টগ্রামের চুনতি ইউনিয়ন, কুমিল্লার চুনাতি (মন্দির) বা চুনাতী প্রভৃতি নাম চুন উৎপাদন, উপকরণ ও উৎপাদক শ্রেণির স্থানিক প্রাচীনত্ব, স্থায়িত্ব ও ব্যাপক প্রভাবের তথ্য প্রদান করে।
উপসংহার
বর্তমানে চুনের ব্যবহারের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে তবে অতীতেও সে ব্যবহারের পরিসর কম ছিল না। ভৌত প্রত্ন-সূত্র প্রমাণ করে বাংলা অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই নির্মাণ উপকরণ হিসাবে চুনের ব্যবহার ছিল। আর চুন ও চুন উপাদন বিষয়ক শব্দের প্রত্নতত্ত্ব বা ব্যুৎপত্তি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতদের অভিমত ও ব্যাখ্যা যথার্থ হিসাবে গ্রহণ করলে মনে হয় আর্যায়ানের পূর্ব থেকেই বাংলা অঞ্চলে চুনের ব্যবহার প্রচলিত ছিল এবং তার উৎপাদন স্থানীয় উপকরণ ও প্রযুক্তিতে সম্পন্ন হতো। তবে চুন মধ্যযুগের পূর্বে নির্মাণ কাজে সীমিতাকারে ব্যবহৃত হতো। কারণ প্রাচীন যুগের কাঠামো নির্মাণে মর্টার হিসাবে চুন-সুরকি ব্যবহার হয়েছে বলে প্রমাণ নাই। সীমিতাকারে কিছু প্লাস্টারে, অলঙ্করণে, মূর্তি তৈরিতে চুন ব্যবহৃত হয়েছে। তবে মনে হয় চিকিৎসা, প্রসাধনী বিশেষত নেশা দ্রব্য হিসাবে পানের সাথে চুন ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হতো। এর উপকরণ হিসাবে প্রধানত পাথর অপেক্ষা স্থানীয় ঝিনুক শামুক ব্যবহৃত হতো এবং স্থানীয় কারিগর ও কারিগরী প্রযুক্তিতে উৎপাদিত হয়ে এই চাহিদা পূরণ করত। বাইরে থেকে আমদানি করতে হতো না — সম্ভবত এই অভিমত অমূলক নয়। কেননা আঠারো শতকের শেষ পর্যন্ত বাংলায় উৎপাদন ব্যবস্থায় বাইরের কোনো প্রভাব পড়েনি (রায় ১৪০২: ৩০৬-৩০৭)। তৎকালে সমাজে একশ্রেণির পেশাজীবীর উদ্ভব হয়েছিল যাঁরা – চুন উৎপাদন ও বিপননে জড়িত ছিলেন। সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থায় নিশ্চয় তাঁরা ভূমিকা পালন করতেন। মধ্যযুগে নির্মাণ কাজে চুনের ব্যবহার ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। সম্ভবত তখন ঝিনুক ও শামুকের পাশাপাশি চুনাপাথর থেকে চুনের উৎপাদন বাণিজ্যিকভাবে প্রসার লাভ করে।
[প্রবন্ধটি ইতিপূর্বে Pratnatattva, Journal of the Dept. of Archaeology, Jahangirnagar University, Vol. 29, June 2023-এ প্রকাশিত]
চিত্র পরিচিতি
চিত্র ১: চুনের ভাটি (চুনাতা পাড়া/হিন্দুপাড়া, রাঙ্গামাটি, ধামইরহাট, নওগাঁ, বাংলাদেশ, ছবি: লেখক, ২০২১)
চিত্র ২: চুনের ভাটি অভ্যন্তরভাগ (চুনাতা পাড়া/হিন্দুপাড়া, রাঙ্গামাটি, ধামইরহাট, নওগাঁ, বাংলাদেশ, ছবি: লেখক, ২০২১)
চিত্র ৩: ছাই পৃথক করার চালুনি (চুনাতা পাড়া/হিন্দুপাড়া, রাঙ্গামাটি, ধামইরহাট, নওগাঁ, বাংলাদেশ, ছবি: লেখক, ২০২১)
চিত্র ৪: চুনের ভাটি অভ্যন্তরভাগ (চুনাতা পাড়া/হিন্দুপাড়া, রাঙ্গামাটি, ধামইরহাট, নওগাঁ, বাংলাদেশ, ছবি: লেখক, ২০২১)
চিত্র ৫: মোথা ও নাকড়ি (চুনাতা পাড়া/হিন্দুপাড়া, রাঙ্গামাটি, ধামইরহাট, নওগাঁ, বাংলাদেশ, ছবি: লেখক, ২০২১)
টীকা
১. ইতিহাস অনুসন্ধানে এ পদ্ধতি বহুল ব্যবহৃত না হলেও এ যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যাবে ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় রচিত ‘ইতিহাস রচনার সাম্প্রতিক একটি পদ্ধতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে (রায় ১৯৫০: ৭৭৯-৭৮৪)। ঐতিহাসিক রায় এক সাক্ষাৎকারেও বলেছেন যেহেতু নিকট বা দূর অতীতের সংস্কৃতি ভারতীয় সমাজে সবল বা দূর্বল অবস্থায় এখনও বিদ্যমান, এরূপ ঐতিহ্য অনুসারী দেশের ইতিহাস রচনার জন্য বর্তমান থেকে অতীতে ধাবিত হওয়া খুবই কার্যকর পদ্ধতি (Chattopadhyaya and Sanyal 1978: 619)। একই বিষয়ে প্রফেসর আবদুল মমিন চৌধুরী ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙ্গালীর ইতিহাস আদিপর্বে’র অনেক ক্ষেত্রে ইতিহাসের এ দৃষ্টিভঙ্গির ফলপ্রসু প্রয়োগ লক্ষ করেছেন। প্রফেসর চৌধুরী নিজেও বর্তমান হতে অতীতের দিকে ধাবিত হওয়ার রীতি প্রয়োগ করেছেন তাঁর প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি গ্রন্থে (চৌধুরী ২০১২: ৮৮, ৮৯ ও ৯৮)।
২. যেমন বলা হয়েছে— “খুন হয়ে ছিনু বাছা চুন চেয়ে চেয়ে/ শেষে না কুলায় কড়ি আনিমাল চেয়ে”। সূত্র: রায় ১৩০৯: ২৭৫।
৩. অর্থকরী ফসল হিসেবে পান-সুপারির ব্যাপক চাষ ও রপ্তানি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের জন্য দেখুন: Islam 1984: 36-38।
৪. অন্তত নয়টি লিপিতে সুপারি, পান বা পানের বরজ উল্লিখিত হয়েছে। সূত্র: Basak (nd): 43 & 142; Majumdar 1929: 8, 66, 79, 90, 98, 178 & 180; Laskar 1907: 89।
৫. প্রায়শ্চিত্তপ্রকরণ বর্মণ-রাজ হরিবর্মার সান্ধিবিগ্রহিক ভট্ট-ভবদেব কর্তৃক রচিত গ্রন্থ। সূত্র: রায় ১৪০২: ৪১৯।
৬. বরাহমিহির তাঁর বৃহৎসংহিতায় কয়েক ধরনের ব্রজলেপ এবং সেগুলোর প্রস্তুত-উপকরণের নামও উল্লেখ করেছেন। বিস্তারিত দেখুন: Shastri 1969: 391-392. ব্রজলেপ ও প্লাস্টার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন: Kramrisch 1946: 121-125 (Plaster), Coomaraswamy 1928: 250-275।
৭. তিনি প্রাচীন বাংলার গণনারীতি, বিভিন্ন ফসল ও তরিতরকারির নাম, স্থান-নাম, বাঙালীর প্রধান খাদ্য প্রভৃতির বর্ণনা দিয়েছেন ‘প্রাচীনতম ঐতিহাসিক’ ও ‘নির্ভরযোগ্য’ উপাদান অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠী ব্যবহৃত শব্দের ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে তিনি শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যুৎপত্তিগত (Etymology) তথ্য বা ব্যাখ্যা ব্যবহার করেছেন। দেখুন: রায় ১৪০২: ৪৩, ৪৯, ৫১, ৪৪৩ ও ৪৪৭।
৮. এ প্রসঙ্গে শব্দের ব্যুৎপত্তির বিশ্লেষণের প্রতি ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বিস্তারিত দেখুন: হাবিব ২০০৯: ১১২-১১৬।
৯. ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায় উল্লেখ করেছেন- “[বাংলার] দৈনন্দিন জীবনের প্রাচীনতম আভাস অষ্ট্রিক ও দ্রাবিড় ভাষার এমন সব শব্দের মধ্যে পাওয়া যাবে, যে-সব শব্দ ও শব্দ-নির্দিষ্ট বস্তু আজও আমাদের মধ্যে কোনও না কোনও রূপে বর্তমান। এ ধরনের কিছু শব্দে আমাদের আহার-বিহার, বসন-ভূষণ ইত্যাদি সম্বন্ধে কিছু ইঙ্গিত এ সুদীর্ঘ শব্দেতিহাসের মধ্যে পাওয়া যাবে। এ হিসাবে এ শব্দগুলিই আমাদের প্রাচীনতম ঐতিহাসিক উপাদান এবং নির্ভরযোগ্য উপাদানও বটে।” দেখুন: রায় ১৪০২: ৪৪২। শব্দ কিভাবে ‘source of clues’ হতে পারে সে বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন: Anthony 2007: 21-38. এ বিষয়ে Franklin C. Southworth রচিত গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ হলো Linguistic Archaeology of South Asia (London & New York: RoutledgeCurzon, 2005)।
১০. সমীক্ষাস্থল: মিলন মন্টুর বাড়ি, রাঙ্গামাটি (চুনাতা পাড়া/হিন্দুপাড়া), ধামইরহাট, নওগাঁ, বাংলাদেশ। তারিখ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১ খ্রি.। তথ্য দাতা: মিলন মন্টু (৫৫) এবং তদীয় পুত্র সাধন চন্দ্র মালি (১৮)। পারিবারিকভাবে এই পরিবার এখনও চুন উৎপাদন ও বিপনন করেন। এই পরিবার প্রধানত পার্শ্ববর্তী আত্রাই নদী থেকে মরা ঝিনুক সংগ্রহ করে। এছাড়া স্থানীয় সাঁওতালদের নিকট থেকেও ঝিনুকের খোল ক্রয় করে থাকে। উল্লেখ্য, ঝিনুকের মাংস সাঁওতালদের অন্যতম খাদ্য। পরিস্কার ২০ কেজি ঝিনুকের খোল পুড়ে প্রায় ৫ কেজিতে পরিণত হয়। যা থেকে ৩০ কেজি চুন পাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র
আহমদ, তোফায়েল (২০০৩) ‘ঢাকার কারুশিল্প’, ঐতিহাসিক ঢাকা মহানগরী: বিবর্তন ও সম্ভাবনা ইফতিখার-উল-আউয়াল (সম্পা.), ঢাকা: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, ২০০৩, পৃ. ২৮৬-৩১২।
ইব্রাহীম, মুহাম্মদ (২০০৩) ‘ইতিহাসের ঢাকা নগরী: প্রযুক্তি ও জনজীবন’, ঐতিহাসিক ঢাকা মহানগরী: বিবর্তন ও সম্ভাবনা ইফতিখার-উল-আউয়াল (সম্পা.), ঢাকা: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, ২০০৩, পৃ. ১৭৮-১৮৭।
ইসলাম, রফিকুল (১৪০২) ‘বাংলা ভাষায় অনার্য শব্দ’, সাহিত্য পত্রিকা, বর্ষ ৩৮, সংখ্যা ৩, আষাঢ় ১৪০২, ঢাকা, পৃ. ৫৫-৬৬।
খান, মুহম্মদ জাকারিয়া (১৯৯৫) ‘ঢাকাই মসলিনের বয়নশিল্পঃ ইতিহাস ও প্রযুক্তি’, ইতিহাস, সপ্তবিংশতি বর্ষ, বৈশাখ-চৈত্র ১৪০০, ঢাকা: বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, পৃ. ৩৩-৫৫।
চক্রবর্তী, মুকুন্দরাম (২০১৩) চণ্ডীমঙ্গল সেন, সুকুমার (সম্পা.), নতুন দিল্লি: সাহিত্য অকাদেমি।
চট্টোপাধ্যায়, সুনীতিকুমার (১৯৩৪) বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা, কলিকাতা: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
চণ্ডীদাস (১৩২৩), শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন রায়, বসন্তরঞ্জন (সম্পা.), কলিকাতা।
চৌধুরী, আবদুল মমিন (২০১২) প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০১২।
তরফদার, মমতাজুর রহমান (১৯৯৩) মধ্যযুগের বাংলায় প্রযুক্তি ও সমাজ বিবর্তন, ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩।
দাশ, ক্ষুদিরাম (১৯৯৮) সাঁওতালি বাংলা সমশব্দ অভিধান, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ১৯৯৮।
দাশ, সত্যনারায়ণ (১৯৯৩) বাংলায় দ্রাবিড় শব্দ (ব্যুৎপত্তিকোষ), কলিকাতা: পুস্তক বিপণি, ১৯৯৩।
ভট্টাচার্য, সুকুমারী (২০০৯) প্রাচীন ভারত, কলকাতা: ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রা. লি.।
মজুমদার, অতীন্দ্র (১৪০৪) মধ্য ভারতীয়-আর্য ভাষা ও সাহিত্য, কলিকাতা: নয়া প্রকাশ।
মজুমদার, রমেশচন্দ্র (১৯৯২) বাংলাদেশের ইতিহাস প্রথম খণ্ড [প্রাচীন যুগ], কলকাতা: জেনারেল প্রিন্টার্স য়্যান্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড।
মজুমদার, সুপ্তিকণা (২০১০) বাংলাদেশের প্রাচীন সমাজ, ঢাকা: বাংলা একডেমী।
মাহাবুব-উল-আলম, মোঃ ও সুলতানা, মোছাঃ নাহিদ (২০০৮) ‘বিহার ধাপে বজ্রলেপ’, প্রত্নচর্চা-২, ঢাকা: প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, পৃ. ৯৭-১০০।
মিতা, আফরোজা খান ও রহমান, এ কে এম সাইফুর (২০১৯) ‘ভরত ভায়নার স্থাপত্যিক ধ্বংসাবশেষ পুনর্বিবেচনা’, বাংলাদেশের ইতিহাস আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতে আদি বাংলা (আনু. ১২০০ সা. অব্দ পর্যন্ত), প্রথম খণ্ড, আবদুল মমিন চৌধুরী সম্পা.), ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, পৃ. ২৭৩-২৮১।
মৈত্রী, রবিশঙ্কর (সং. ও সম্পা.) (২০০১) দেশী বাংলা শব্দের অভিধান, ঢাকা: অনন্যা।
রহমান, সুফি মোস্তাফিজুর ও পাঠান, মুহাম্মদ হাবিবুল্লা (২০১২) উয়ারী-বটেশ্বর: শেকড়ের সন্ধানে, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন।
রায়, অনিরুদ্ধ (১৯৯৭) সুলতানী আমলের অর্থনৈতিক ইতিহাস: একটি সমীক্ষা, কলিকাতা: ফার্মা কেএলএম প্রা. লি.।
রায়, নীহাররঞ্জন (১৪০২) বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদিপর্ব, কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং।
রায়, নীহাররঞ্জন (১৯৫০) ‘ইতিহাস রচনার সাম্প্রতিক একটি পদ্ধতি’, ঘোষ, বিনয় পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, কলিকাতা: পুস্তক প্রকাশক, পৃ. ৭৭৯-৭৮৪।
রায়, ভারতচন্দ্র (১৩০৯) ‘বিদ্যাসুন্দর’, ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের গ্রন্থাবলী, কলিকাতা: দে ব্রাদার্স।
শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ (২০১০) বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স।
সরকার, তপতী রানী (২০১৩) বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার: অনার্যভাষী জনগোষ্ঠীর প্রভাব, ঢাকা: বাংলা একাডেমী।
সুর, অতুল (১৩৮৩) বাঙালীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, কলিকাতা: জিজ্ঞাসা।
সান্যাল, রজত (২০১৯) ‘মোঘলমারী’, বাংলাদেশের ইতিহাস আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতে আদি বাংলা (আনু. ১২০০ সা. অব্দ পর্যন্ত), প্রথম খণ্ড (আবদুল মমিন চৌধুরী সম্পা.), ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, পৃ. ৪৪৯-৪৫৮।
হক, মো. মোজাম্মেল (২০১৯) ‘সাভার’, বাংলাদেশের ইতিহাস আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতে আদি বাংলা (আনু. ১২০০ সা. অব্দ পর্যন্ত), প্রথম খণ্ড, আবদুল মমিন চৌধুরী (সম্পা.), ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, পৃ. ৪৫৯-৪৭৬।
হাবিব, ইরফান (২০০৭) ‘ইতিহাস-গবেষণায় প্রযুক্তি-চর্চার গুরুত্ব’, মধ্যকালীন ভারত হাবিব, ইরফান (সম্পা.) কলকাতা: কে পি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানী, পৃ. ১৪-৩৮।
হাবিব, ইরফান (২০০৯) সিন্ধু সভ্যতা (আনু. কাবেরী বসু), কলকাতা: ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রা. লি.।
হোসেন, এ. বি. এম. (সম্পা.) (২০০৭), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষা-২: স্থাপত্য, ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৭।
Ainslie, Whitelaw (1826a) Materia Indica, Vol. I, London: Longman, Rees, Orme, Brown and Green.
Ainslie, Whitelaw (1826b) Materia Indica, Vol. II, London: Longman, Rees, Orme, Brown and Green.
Anthony, David W. (2007) The Horse, the Wheel, and Language: How Bronze-Age Riders from the Eurasian Steppes Shaped the Modern World, Princeton and Oxford:Princeton University Press.
Basak, Radhagovinda (nd) ‘Belava Copper-Plate of Bhojavarmadeva, The Fifth Year’, in Sten Konow (ed.), Epigraphia Indica, Vol. XII (1913-14), Calcutta: Superintendent Government Printing, India, [nd], pp. 37-43.
_____. ‘Rampal Copper-Plate Grant of Srichandradeva’ in Sten Konow (ed.), Epigraphia Indica, Vol. XII (1913-14), Calcutta: Superintendent Government Printing, India, [nd] pp. 136-142.
Burrow, T. and Emeneau, M. B. (1984) A Dravidian Etymological Dictionary, Oxford: Clarendon Press, 1984, entry no. 1755 & 2971.
Chattopadhyaya, Debiprasad and Sanyal, Hitesranjan (1978) ‘An Interview with Niharranjan Ray’ in Chattopadhyaya, Debiprasad (ed.) History and Society (Essays in Honour of Professor Niharranjan Ray), Calcutta: K P Bagchi & Company, pp. 613-632.
Coomaraswamy, Ananda K. (1928) ‘Indian Architectural Terms’, Journal of the American Oriental Society, Vol. 48 (1928), pp. 250-275.
Dikshit, K. N. (1938) Memoirs of the Archaeological Survey of India No.55: Excavations at Paharpur, Bengal, Delhi: Manager of Publications.
Dutt, Udoy Chand (1877) Materia Medica of The Hindus: Compiled From Sanskrit Medical Works, Calcutta: Thacker, Spink & Co.
Elert, Kerstin et al. (2002) ‘Lime Mortars for the Conservation of Historic Buildings’, Studies in Conservation, Vol. 47, No. 1 (2002), pp. 62-75.
Elsen, J. (2006) ‘Microscopy of Historic Mortars- A Review’, Cement and Concrete Research, Vol. 36 (2006), pp.1416–1424.
Fazal-I-‘Allami, Abul (1949) Ain-I-Akbari, Vol-II (Trans. H.S. Jarrett corrected and further annotated by Jadu-Nath Sarkar), Calcutta: Royal Asiatic Socicty of Bengal, Second Edition.
Fazl ‘Allami, Abul (1873) The Ain I Akbari, Vol. I (Trans. H. Blochmann), Calcutta: G. H. Rouse.
Ghosh, A. (1996) Indian Archaeology 1959-60 A Review, New Delhi: Archaeological Survey of India.
Goswami, Kunja Gobinda (1948) Excavations at Bangarh (1938-41), Calcutta: University of Calcutta.
Gupta, Paresh Chandra Das (1962) The Excavations at Pandu Rajar Dhibi,Calcutta: Directorate of Archaeology, West Bengal.
Habib, Irfan (2009) Technology in Medieval India, c. 650-1750, New Delhi: Tulika Books.
Harris, Cyril M. (ed.) (2006) Dictionary of Architecture & Construction, New York: McGraw-Hill.
Islam, kamrunnasa (1984), Aspects of Economic History of Bengal, c. 400-1200 A.D, Dhaka: Asiatic Society of Bangladesh.
Kramrisch, Stella (1946) The Hindu Temple, Vol. I, Calcutta: University of Calcutta, 1946.
Laskar, Ganga Mohan (1907) ‘Ashrafpur Copper-Plate Grants of Devakhadga’, Memoirs of The Asiatic Society of Bengal (1905-1907), Vol. I, Calcutta: The Asiatic Society, pp. 85-91.
Lazell, E. W. (1915) Hydrated Lime: History, Manufacture and Uses in Plaster-Mortar-Concrete, Pittsburgh: Jackson-Remlinger Ptg. Co.
Mahabub-ul Alom, Md. (2018) ‘Jagaddala’. in Abdul Momin Chowdhury and Ranabir Chakravarti (ed.), History of Bangladesh: Early Bengal in Regional Perspectives (up to c. 1200 CE), Vol. 1, Dhaka: Asiatic Society of Bangladesh, 2018, pp. 194-210.
Majumdar, Nani Gopal (1929), ‘Rampal Copper-Plate of Srichandra’, Inscription of Bengal, Volume III, Rajshahi: The Varendra Research Society, pp. 1-9.
_____. ‘Barrackpur Copper-Plate of Vijayasena’, Inscription of Bengal, Volume III, Rajshahi: The Varendra Research Society, pp. 57-67.
_____. ‘Naihati Copper-Plate of Vallalasena’, Inscription of Bengal, Volume III, Rajshahi: The Varendra Research Society, pp. 68-80.
_____. ‘Anulia Copper Plate of Lakshmanasena’, Inscription of Bengal, Volume III, Rajshahi: The Varendra Research Society, pp. 81-91.
_____. ‘Govindapur Copper-Plate of Lakshmanasena’, Inscription of Bengal, Volume III, Rajshahi: The Varendra Research Society, pp. 92-98.
_____. ‘Calcutta Sahitya-Parishat Copper Plate of Visvarupasena’, Inscription of Bengal, Volume III, Rajshahi: The Varendra Research Society, pp. 177-180.
Marshall, John (1951) Taxila: An Illustrated Account of Archaeological Excavations, Vol. I, Cambridge: The University Press.
Marshall, John (ed.) (1931) Mohenjo-Daro and the Indus Civilization, Vol. I, London: Arthur Probsthain.
Moreland, W. H. & Geyl, P. (1925) Jahangir’s India the Remonstrantie of Francisco Pelsaert, Cambridge: W. Heffer & Sons Ltd.
Mukharji, Trailokya Nath (1883) A descriptive Catalogue of Indian Produce Contributed to the Amsterdam Exhibition, 1883, Calcutta: The Superintendent of Government Printing.
Oates, J.A.H. (1998) Lime and Limestone: Chemistry and Technology, Production and Uses, Weinheim-New York-Chichester-Brisbane-Singapore-Toronto: Wiley-Vch.
Ray, Amita (1990) ‘Archaeology of Mangalkot’, in Historical Archaeology of India: A Dialogue Between Archaeologists and Historians (ed. Amita Ray and Samir Mukherjee), New Delhi: Books & Bokks, 1990, pp. 131-140.
Shastri, Ajay Mitra (1969) India As Seen In The Brhatsamhita of Varahamihira, Delhi, Patna & Varanasi: Motilal Banarsidass, 1969.
Southworth, Franklin C. (2005) Linguistic Archaeology of South Asia, London & New York: RoutledgeCurzon, 2005.
Stein, M. A. (Trans.) (1800) Kalhana’s Rajatarangini: A Chronicle of The Kings of Kasmir, Vol. I (Introduction & Books I-VII), Westminster: Archi Bald Constable and Company, Ltd..
Taylor, James (1840) A Sketch of The Topography & Statistics of Dacca, Calcutta: G. H. Huttmann, Military Orphan Press.
The Kama Sutra of Vatsyayana (1925), Benares-New York: The Society of the Friends of India.
Vitruvius (1914) The Ten Books on Architecture (Translated by Morris Hicky Morgan), Cambridge: Harvard University Press.
Watt, George (1889) A Dictionary of The Economic Products of India, Volume II, Calcutta: The Superintendent of Government Printing, India.
Wise, James (1883) Notes on The Races, Castes, and Trades of Eastern Bengal, London: Harrison and Sons.