সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

নীরবতার রাজনীতি ও জীবনের শাসন – সামাজিক মৃত্যুর নির্মাণ ও আম্বেদকরের বৌদ্ধ প্রতিরোধ

নীরবতার রাজনীতি ও জীবনের শাসন – সামাজিক মৃত্যুর নির্মাণ ও আম্বেদকরের বৌদ্ধ প্রতিরোধ

আয়ূষ দে

এপ্রিল ১৮, ২০২৬ ৭২ 7

ভারতীয় সমাজে বর্ণপ্রথা নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে—কখনও তা ইতিহাসের বিষয় হিসেবে, কখনও সমাজতত্ত্বের সমস্যা হিসেবে, আবার কখনও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে। তবু এই আলোচনাগুলির ভেতর একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর দিক প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়; বর্ণপ্রথা বা জাত প্রথা কি কেবলমাত্র একটি সামাজিক স্তরবিন্যাস, নাকি এটি এমন এক ক্ষমতার বিন্যাস যা মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে? এই প্রশ্ন থেকে আমাদের আজকের এই আলোচনার সূত্রপাত। এখানে বর্ণপ্রথাকে এমন এক শাসনব্যবস্থা হিসেবে ভাবা যেতে পারে, যা কেবল মানুষকে বিভক্ত করে না, বরং তাদের দেহ, অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক অস্তিত্বকে নির্দিষ্ট ছাঁচে নির্মাণ করে। এই প্রেক্ষিতে মিশেল ফুকো যে ‘জীবনের শাসন’-এর কথা বলেন, তা বর্ণপ্রথাকে বোঝার জন্য এক নতুন দৃষ্টিকোণ খুলে দেয়, যেখানে ক্ষমতা মানুষের জীবনকে কেবল সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত করে না, এমনকী তার সম্ভাবনাকেও নির্ধারণ করে।[1]

এই নিয়ন্ত্রণের প্রকৃতি কেবল বাহ্যিক নয়; এটি দেহের ভেতরেও প্রবেশ করে। স্পর্শ, খাদ্যাভ্যাস, বসবাসের স্থান, এমনকী দৃষ্টি বিনিময়—সবকিছুই জাতের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে দেহ আর নিছক জৈবিক সত্তা থাকে না; তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার বহনকারী ক্ষেত্র। এই দেহ-রাজনীতির মধ্যে আমরা দেখতে পাই কীভাবে কিছু মানুষকে ‘শুচি’ ও অন্যদের ‘অশুচি’ হিসেবে নির্মাণ করা হয়, এবং এই নির্মাণের মধ্য দিয়েই তাদের সামাজিক অবস্থান স্থির হয়ে যায়। এইভাবে বর্ণপ্রথা এমন এক প্রক্রিয়া তৈরি করে, যেখানে কিছু মানুষের জীবন পূর্ণতা পায়, আর অন্যদের জীবন ক্রমাগতভাবে অবমূল্যায়িত হতে থাকে—তাঁদের এক ধরনের ‘সামাজিক মৃত্যু’-র দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।[2]

কিন্তু এই ‘সামাজিক মৃত্যু’ কেবল শারীরিক বা অর্থনৈতিক বঞ্চনার ফল নয়; এটি এক গভীর নীরবতারও ফল। যারা বর্ণপ্রথার নিম্নস্তরে অবস্থান করে, তাদের কণ্ঠস্বর প্রায়শই অশ্রুত থেকে যায়, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে অগ্রাহ্য করা হয়। এবং এই নীরবতা কিন্তু স্বাভাবিক নয়; এটি উৎপাদিত এবং ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘সাবঅল্টার্ন কি কথা বলতে পারে?’—এই প্রশ্ন নতুন তাৎপর্য লাভ করে, কারণ বর্ণপ্রথার ভেতরে কণ্ঠস্বরের দমন কেবল রাজনৈতিক নয়, তা অস্তিত্বগতও বটে।[3]

এই জটিল বাস্তবতার ভেতরেই আম্বেদকরের চিন্তা এক মৌলিক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়। বর্ণপ্রথাকে তিনি কেবল সামাজিক অসাম্য হিসেবে দেখেননি; বরং এক গভীর মানবিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা মানুষের মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে। এই অস্বীকারের বিরুদ্ধে তাঁর বৌদ্ধধর্মে প্রত্যাবর্তনকে কেবল ধর্মীয় পরিবর্তন হিসেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বরং এটিকে তাঁর এক ধরনের রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রতিরোধ হিসেবে পড়া যেতে পারে—একটি বিকল্প জীবনদর্শন, যা দেহ, কণ্ঠস্বর এবং সামাজিক অস্তিত্বকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করতে চায়।[4]

আমরা আলোচনা করব, বর্ণপ্রথা কেবল অতীতের কোনো অবশেষ নয়; এটি বর্তমানেও সক্রিয়; এটি জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, নীরবতা তৈরি করে এবং সামাজিক মৃত্যুর প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখে। একই সঙ্গে, এই প্রক্রিয়ার ভেতর থেকেই প্রতিরোধের সম্ভাবনাও উদ্ভূত হয়—যা আম্বেদকরের বৌদ্ধচিন্তা এক নতুন রাজনৈতিক ও নৈতিক দিগন্তের ইঙ্গিত করে।

বর্ণপ্রথার কার্যপ্রণালীকে বোঝার জন্য আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুশীলনগুলির দিকে তাকাতে হবে যেখানে ক্ষমতা দৃশ্যমান নয়, অথচ সর্বব্যাপী। উত্তর ভারতের গ্রামের চা-দোকানে আলাদা কাঁচের গ্লাস, দক্ষিণ ভারতের বহু অঞ্চলে আজও দলিতদের মন্দিরে প্রবেশে বাধা, কিংবা ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং-এর মতো পেশার বংশানুক্রমিক হস্তান্তর—এই ঘটনাগুলি কেবল বিচ্ছিন্ন সামাজিক সমস্যা নয়; এগুলি এমন এক নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অংশ, যা জীবনের সম্ভাবনাকে পূর্বনির্ধারিত করে দেয়। এইভাবে বর্ণপ্রথা জীবনের উপর এক ধরনের সূক্ষ্ম শাসন প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে জন্মই হয়ে ওঠে ভাগ্যের নির্ধারক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘জীবনের শাসন’ কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং বাস্তব অভিজ্ঞতার গভীরে প্রোথিত এক সামাজিক সত্য।[5]

এই শাসনের কেন্দ্রে রয়েছে দেহ—একটি এমন ক্ষেত্র, যেখানে ক্ষমতা নিজেকে দৃশ্যমান করে তোলে। দেহের মাধ্যমে জাতকে চিহ্নিত করা হয়, নিয়ন্ত্রিত করা হয় এবং শাস্তি দেওয়া হয়। খাদ্যাভ্যাসের উপর নিষেধাজ্ঞা, স্পর্শের বিধিনিষেধ, বসবাসের আলাদা পরিসর—এসবই দেহকে নিয়ন্ত্রণের উপায়। অনেক ক্ষেত্রে এই নিয়ন্ত্রণ সরাসরি সহিংসতায় রূপ নেয়। যেমন, উত্তরপ্রদেশের হাথরাসের ঘটনা (২০২০) বা গুজরাটের উনা কাণ্ড (২০১৬) আমাদের দেখায় কীভাবে দলিত দেহকে শাস্তির ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই সহিংসতা শারীরিক তবে এর প্রতীকী অর্থও রয়েছে—এটি সমাজের সামনে এক ধরনের ‘বার্তা’ বহন করে, এই শাস্তিদান ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারণ করে। [6]

এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ‘সামাজিক মৃত্যুর নির্মাণ’ ঘটে। এখানে মৃত্যু মানে কিন্তু জৈবিক সমাপ্তি নয়; বরং এমন এক অবস্থান, যেখানে একজন ব্যক্তি সমাজের পূর্ণ সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। শিক্ষা, সম্পদ, সম্মান—সব ক্ষেত্রেই তার প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ থাকে। এই অবস্থাকে বোঝাতে অরল্যান্ডো প্যাটারসন ‘social death’ ধারণাটি ব্যবহার করেছিলেন; এটি দাসপ্রথার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও বর্ণপ্রথার ক্ষেত্রেও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।[7] ভারতীয় প্রেক্ষিতে দলিতদের অভিজ্ঞতা এই সামাজিক মৃত্যুর এক দীর্ঘস্থায়ী রূপ—যেখানে তাদের অস্তিত্বকে ক্রমাগত অস্বীকার করা হয়, কিংবা নিম্নতর বলে চিহ্নিত হয়।

তবে এই অস্বীকার কেবল বাহ্যিক নয়; এটি ভাষা ও জ্ঞানের স্তরেও কাজ করে। ‘নীরবতার রাজনীতি’ এইখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যখন কোনো গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, ইতিহাস বা কণ্ঠস্বর মূলধারার আলোচনায় স্থান পায় না, তখন সেই নীরবতা একটি রাজনৈতিক উৎপাদন হয়ে ওঠে। আসলে বর্ণপ্রথার মধ্যে কণ্ঠস্বরের দমন কেবল নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়, বরং এমন এক জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর মাধ্যমে ঘটে, যা কিছু কণ্ঠকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বা ‘অবিশ্বস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে দলিতদের অভিজ্ঞতা প্রায়শই ‘অশ্রুত’ থেকে যায়, যদিও তারা কথা বলে।

এই নীরবতার একটি সূক্ষ্ম দিক হল আত্ম-নিয়ন্ত্রণ। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও সামাজিক চাপের ফলে অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিজেই নিজের কণ্ঠস্বরকে দমন করতে শেখে। এটি ক্ষমতার সবচেয়ে কার্যকর রূপগুলির একটি, যেখানে বাহ্যিক দমন ছাড়াই নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে। এইভাবে বর্ণপ্রথা কেবল বাহ্যিক শাসন নয়; এটি অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলও তৈরি করে, যা মানুষের চিন্তা, ইচ্ছা এবং সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে।

এই সমস্ত প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আম্বেদকর-এর চিন্তা এক মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তিনি বর্ণপ্রথাকে কেবল সামাজিক অসাম্য হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে এমন এক ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন যা মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধকে ধ্বংস করে। তাঁর মতে, এই ব্যবস্থার ভেতরে থেকে মুক্তি সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি মৌলিক রূপান্তর।[8]

এই রূপান্তরের পথ হিসেবে তাঁর বৌদ্ধধর্ম গ্রহণকে নতুনভাবে ভাবা যেতে পারে। এটি কেবল ধর্মান্তর নয়; বরং এক ধরনের রাজনৈতিক ও নৈতিক পুনর্গঠন। বৌদ্ধধর্মের মাধ্যমে তিনি এমন এক সামাজিক দর্শন নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন যেখানে সমতা, যুক্তি এবং মানবিক মর্যাদা কেন্দ্রীয় স্থান পায়। এখানে দেহ আর অপবিত্রতার বাহক নয়; বরং তা সমান মর্যাদাসম্পন্ন মানবিক সত্তা। একইভাবে, কণ্ঠস্বর আর দমনযোগ্য নয়; বরং তা যুক্তির মাধ্যমে স্বীকৃতি পায়। এইভাবে বৌদ্ধধর্ম এক ধরনের ‘প্রতিরোধের প্রযুক্তি’ হিসেবে কাজ করে, যা বর্ণপ্রথার জৈব-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করে।[9]

এই প্রতিরোধ কেবল তাত্ত্বিক নয়; এর বাস্তব প্রভাবও রয়েছে। মহারাষ্ট্রে দলিত বৌদ্ধ আন্দোলন, বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে আম্বেদকরের চিন্তার পুনরুত্থান, কিংবা সমসাময়িক সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে দলিত কণ্ঠস্বরের উত্থান—এসবই এই প্রতিরোধের বহুমাত্রিক রূপ। এগুলি আমাদের দেখায়, সামাজিক মৃত্যু চূড়ান্ত নয়; এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম সম্ভব, এবং সেই সংগ্রাম নতুন জীবনদর্শনের জন্ম দিতে পারে।

এই আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, বর্ণপ্রথা কেবল অতীতের অবশেষ নয়; এটি বর্তমানেও সক্রিয়, জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, নীরবতা তৈরি করে এবং সামাজিক মৃত্যুর প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখে। একই সঙ্গে, এই ব্যবস্থার ভেতর থেকেই প্রতিরোধের সম্ভাবনাও জন্ম নেয়, যা আমাদের একটি বিকল্প ভবিষ্যতের কল্পনা করতে সাহায্য করে; যেখানে জীবন, কণ্ঠস্বর এবং মর্যাদা পুনর্গঠিত হতে পারে।

এই আলোচনার পরিসমাপ্তিতে আমরা বলতে পারি, বর্ণপ্রথাকে কেবলমাত্র সামাজিক বৈষম্যের ঐতিহাসিক রূপ হিসেবে বিবেচনা করলে তার প্রকৃত গভীরতা অনুধাবন করা যায় না। বরং এটি এমন এক সুসংবদ্ধ ক্ষমতাতন্ত্র, যা মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, দেহকে শাসনের অধীনস্থ করে এবং কণ্ঠস্বরকে নীরবতায় আবদ্ধ করে এক প্রকার ‘সামাজিক মৃত্যু’ নির্মাণ করে। এই নির্মাণ কোনো আকস্মিক ফল নয়; এটি দীর্ঘকাল ধরে প্রাতিষ্ঠানিক, সাংস্কৃতিক এবং দৈনন্দিন অনুশীলনের মাধ্যমে ক্রমাগত ফিরে আসে। ফুকো যে অর্থে ক্ষমতাকে জীবন-নিয়ন্ত্রণের এক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, সেই অর্থেই বর্ণপ্রথা জীবনের উপর এক সূক্ষ্ম কিন্তু কার্যকর শাসন প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে জীবন নিজেই ক্ষমতার এক ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।[10]

এই শাসনের সবচেয়ে গভীর দিকটি প্রকাশ পায় নীরবতার মধ্য দিয়ে। বর্ণপ্রথার প্রান্তিক অবস্থানে থাকা মানুষদের কণ্ঠস্বর কেবল উপেক্ষিত হয় না; বরং এমনভাবে প্রান্তিক করা হয় যে তা মূলধারার জ্ঞানতত্ত্বে স্থান পায় না। এইভাবে নীরবতা এক রাজনৈতিক উৎপাদনে পরিণত হয়, যা সামাজিক মৃত্যুকে আরও দৃঢ় করে তোলে।

একই সঙ্গে, এই সামাজিক মৃত্যু কেবল বঞ্চনার ফল নয়; এটি এক প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণ, যা মানুষের মর্যাদা, অধিকার এবং সামাজিক স্বীকৃতিকে অস্বীকার করে। অরল্যান্ডো প্যাটারসন যে ‘social death’ ধারণাটি দাসপ্রথার প্রেক্ষিতে ব্যবহার করেছিলেন, তা বর্ণপ্রথার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সমাজের পূর্ণ সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না।[11] এইভাবে বর্ণপ্রথা এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে জীবন আছে, কিন্তু সেই জীবনের সামাজিক মূল্য নেই—যা মৃত্যুর এক বিশেষ রূপ।

তবে এই সমগ্র প্রক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল প্রতিরোধের সম্ভাবনা। বৌদ্ধধর্মের এই পুনর্নির্মাণের মধ্যে আমরা এক বিকল্প জগৎ কল্পনার সন্ধান পাই যেখানে সমতা, যুক্তি এবং মানবিক মর্যাদা কেন্দ্রীয় স্থান অধিকার করে। এখানে দেহ আর অপমানের বাহক নয়, বরং মর্যাদার অধিকারী; কণ্ঠস্বর আর নীরবতার মধ্যে আবদ্ধ নয়, বরং তা স্বীকৃতি লাভ করে। এইভাবে আম্বেদকরের বৌদ্ধচিন্তা বর্ণপ্রথার দ্বারা নির্মিত নীরবতা ও সামাজিক মৃত্যুর বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধের ভাষা তৈরি করে।[12]

অতএব, আমাদের আলোচনার সারমর্ম হল—বর্ণপ্রথা একদিকে যেমন জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং সামাজিক মৃত্যুর প্রক্রিয়া তৈরি করে, অন্যদিকে তেমনি সেই প্রক্রিয়ার ভেতর থেকেই প্রতিরোধের সম্ভাবনাও জন্ম নেয়। এই দ্বৈততা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা কখনও সম্পূর্ণ নয়; তার ভেতরেই সর্বদা প্রতিরোধের সম্ভাবনা নিহিত থাকে।

শেষ পর্যন্ত, এই প্রশ্নটি আমাদের সামনে ফিরে আসে—আমরা কেমন সমাজ নির্মাণ করতে চাই?

এমন সমাজ, যেখানে জন্মই জীবনের সীমা নির্ধারণ করে দেয়, নাকি এমন সমাজ, যেখানে প্রতিটি মানুষ সমান মর্যাদা, কণ্ঠস্বর এবং সম্ভাবনার অধিকারী? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের ভবিষ্যৎ, এবং সেই ভবিষ্যতের কল্পনায় আম্বেদকর-এর চিন্তা আজও এক আলোকবর্তিকা হয়ে রয়ে গেছে।

শীর্ষক চিত্র পরিচিতি: Around the Corner, শিল্পী: শঙ্কর পিল্লাই

তথ্যসূত্র


[1] Michel Foucault, The History of Sexuality, Vol. 1: An Introduction, trans. Robert Hurley (New York: Vintage Books, 1978), 136–139

[2] Orlando Patterson, Slavery and Social Death: A Comparative Study (Cambridge, MA: Harvard University Press, 1982), 38–45

[3] Gayatri Chakravorty Spivak, ‘Can the Subaltern Speak?’ in Marxism and the Interpretation of Culture, ed. Cary Nelson and Lawrence Grossberg (Urbana: University of Illinois Press, 1988), 287–308

[4] B. R. Ambedkar, Annihilation of Caste (New Delhi: Navayana, 2014), 72–75

[5] Michel Foucault, Society Must Be Defended: Lectures at the Collège de France, 1975–76, trans. David Macey (New York: Picador, 2003), 241–243

[6] Anand Teltumbde, Republic of Caste: Thinking Equality in the Time of Neoliberal Hindutva (New Delhi: Navayana, 2018), 112–118

[7] Orlando Patterson, Slavery and Social Death, 5–9

[8] B. R. Ambedkar, Annihilation of Caste, 44–47

[9] B. R. Ambedkar, The Buddha and His Dhamma (New Delhi: Oxford University Press, 2011), 322–325

[10] Michel Foucault, The History of Sexuality, 140–145

[11] Orlando Patterson, Slavery and Social Death, 40–45

[12] B. R. Ambedkar, The Buddha and His Dhamma, 330–335

বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস বিভাগে গবেষণারত; তিনি উত্তর-পূর্ব পার্বত্য বিশ্ববিদ্যালয় (NEHU), শিলং-এর ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর এবং রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির, বেলুড় মঠ থেকে স্নাতক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। তাঁর গবেষণার আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত লিঙ্গ ইতিহাস, শ্রমজীবী ও কর্মজীবী শ্রেণির আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের ইতিহাস (Aspirations and Dreams), প্রান্তিক ও সাবঅল্টার্ন সম্প্রদায়ের ইতিহাস, মধ্যযুগীয় ভারতে সমকামিতার ইতিহাস, এবং ডাইনি-বিদ্যা ও ডাইনিবিদ্যার ইতিহাস। তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতা, প্রান্তিকতা ও পরিচয়ের জটিল আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ করে, ইতিহাসের নীরব ও উপেক্ষিত অভিজ্ঞতাগুলিকে নতুন আলোয় তুলে ধরা।

মন্তব্য তালিকা - “নীরবতার রাজনীতি ও জীবনের শাসন – সামাজিক মৃত্যুর নির্মাণ ও আম্বেদকরের বৌদ্ধ প্রতিরোধ”

  1. Sociology বা সমাজতত্ত্ব বিষয়ে একটি অসামান্য প্রবন্ধ এটি। ইতিহাস কিভাবে বর্তমানের ধারাকে প্রভাবিত করতে পারে এবং বর্তমানের ঘটনাবলি কিভাবে ভবিষ্যতে ইতিহাসের উপাদান রূপে গণ‍্য হতে পারে সে বিষয়ে ইঙ্গিতবাহী একটি রচনা।
    অনেকেই শাস্ত্রীয় বচন তুলে এনে প্রমাণ করতে চান যে ভারতে বর্ণপ্রথা ছিল না। কেবল গুণকর্মবিভাজন ছিল। কিন্তু কোনো প্রাচীন প্রয়োজন কিভাবে পরবর্তীকালে পরিবর্তিত হয়ে একটা নক্কারজনক প্রথায় রূপান্তরিত হতে পারে এবং তা বর্তমানেও কিভাবে প্রচলিত থাকতে পারে সে বিষয়ে কেউ বিশেষ কথা বলেন না।
    সোজা কথায় theory আর practice এর মধ্যের তফাৎটা অনেকে গুলিয়ে ফেলেন বা ইচ্ছে করে গুলিয়ে দেন।
    এই লেখাটি ঠিক সেই জায়গাটাকে সচেতনভাবে নির্দেশ করেছে। সুন্দর প্রবন্ধটির জন্য ধন্যবাদ লেখককে।

  2. খুব সুন্দর লেখা। অনেক নতুন ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে এই ছোট লেখায়। ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন লেখা পড়ার প্রত্যাশায় রইলাম।

  3. অনবদ্য একটি লেখা। নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে লেখক এই আলোচনা করেছেন। ধন্যবাদ লেখককে এই লেখা উপহার দেওয়ার জন্য ।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।