সেই সোনার আংটি, দ্বারাবতী সভ্যতা ও থাইল্যান্ডের হিন্দু-বৌদ্ধ প্রভাব
দিন কয়েক আগে এক সকাল অভ্যাসবশে চায়ের কাপ হাতে খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলাম। চোখ আটকে গেল এক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের খবরে। ইতিহাসের খবর তো রোজ রোজ কাগজের শিরোনাম হয় না, স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল চেপে রাখতে পারলাম না। খবরটা এইরকম, থাইল্যান্ডের ফেতচাবুরি প্রদেশের দন-ইয়াই-থং প্রত্নক্ষেত্রের এক সমাধিস্থল থেকে পাওয়া গেছে হাজার দুই বছরের পুরোনো অক্ষত এক সোনার আংটি। আপাত অলংকরণবিহীন সেই আংটির উপরের দিকে ব্রাহ্মী হরফে ‘পুসরখিতস’ শব্দটি খোদাই করা রয়েছে। অর্থাৎ এই আংটির মালিকের নাম ছিল পুষ্যরক্ষিত! সংস্কৃত পুষ্যরক্ষিত শব্দটির অর্থ যিনি পুষ্যা নক্ষত্র দ্বারা সুরক্ষিত। নিশ্চিতভাবেই আংটির মালিক প্রাচীন ভারতীয় কোনো বণিক বা সমুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন, যিনি সুদূর শ্যামদেশে ব্যবসায়িক কাজে গিয়ে থেকে যান এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এই সমাধিক্ষেত্র থেকে আংটি ছাড়াও ব্রোঞ্জ ও সোনার অন্য অলঙ্কার, রঙিন কাচের পুঁতি, মূল্যবান মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে, যা নির্দেশ করে, এই জায়গায় সমাজের অত্যন্ত ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমাহিত করা হত। অর্থাৎ এই সময় ভারতীয় বণিকরা এসব অঞ্চলে রীতিমত প্রভাব বিস্তার করার মত অবস্থায় চলে গিয়েছিলেন বলা চলে। ঘটনার সময়কাল লক্ষ্যণীয়। ভারতে মৌর্য পরবর্তী যুগ অথবা কুষাণ বা সাতবাহন রাজাদের উত্থানকাল এবং শ্যামদেশের (থাইল্যান্ড) প্রাক-দ্বারাবতী যুগ। পড়ার জন্য আরেক নতুন বিষয়বস্তু নজরে এল। সে যুগের সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে দ্বারাবতী নামে সভ্যতা! যে নাম আবার দ্বারকা থেকে প্রভাবিত! উৎসাহের আতিশয্যে গড়গড় করে পড়ে ফেললাম এ বিষয়ের উপর লেখা কয়েকটা বই।

দ্বারাবতী সভ্যতা একক কোনো রাজ্য বা রাজবংশ নয়, বরং ছিল অনেকগুলি নগর রাষ্ট্রের সন্নিবেশ। সাধারণ অব্দের ছয় থেকে এগারো শতক পর্যন্ত থাইল্যান্ডের চাও ফ্রেয়া নদী উপত্যকায় গড়ে ওঠা এক প্রাচীন বৌদ্ধ সংস্কৃতি আর নগর রাষ্ট্রের সমন্বিত রূপ ছিল এই দ্বারাবতী সভ্যতা। সহজ কথায়, একই ভাষা-সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের বন্ধনে বাঁধা কতগুলি স্বাধীন শহর নিয়ে তৈরি এক শিথিল রাজনৈতিক জোট ছিল দ্বারাবতী। নাখোন পাথোম, লোপবুরি, উ থং, রাত চাবুরি নামে শহরগুলি এই তালিকায় ছিল।
দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন জনগোষ্ঠী ‘মন’ জাতির মানুষেরা দ্বারাবতী সভ্যতা গড়ে তুলেছিলেন। দ্বারাবতী শব্দটির অর্থ হল, অনেক দরজা বিশিষ্ট নগরী। শ্রীকৃষ্ণের পৌরাণিক দ্বারকা নগরীর নামের দ্বারা প্রভাবিত দ্বারাবতীতে পাওয়া প্রাচীন মুদ্রায় “শ্রী দ্বারাবতীশ্বরপূণ্য” কথাটি খোদাই অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা সভ্যতাটির নামকরণ নিশ্চিত করে।
দ্বারাবতীর শহরগুলি ডিম্বাকার বা বৃত্তাকারে তৈরি হত, বাইরে থাকত মাটির প্রাচীর আর পরিখা। অষ্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবারভুক্ত ‘মন’-রা রাজকীয় ও ধর্মীয় কাজে সংস্কৃত ও পালি ভাষাই ব্যবহার করতেন।
সিংহলী মহাবংশ বইয়ের তথ্য অনুসারে, সম্রাট অশোক তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতির পরে বিভিন্ন দেশে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে যেসব দূত পাঠিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সোণ এবং উত্তর নামে দুই অর্হৎ-কে সুবর্ণভূমিতে পাঠানো হয়েছিল। প্রাচীন সুবর্ণভূমির এক প্রান্তিক কেন্দ্র ছিল বর্তমান থাইল্যান্ডের নাখোন পাথোম অঞ্চল, যেটা দ্বারাবতীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগর রাষ্ট্র ছিল। যদিও অশোকের দূতেরা গেলেন, দেখলেন, জয় করলেন এমনটা মোটেই হয়নি, তবে থেরবাদ বা সাবেক বিভাজ্যবাদ অথবা স্থবিরবাদী বৌদ্ধধর্মের বীজ যে এই সময়ই রোপিত হয়েছিল তা মোটামুটি নিশ্চিত। আসলে থাইল্যান্ডে থেরবাদী বৌদ্ধধর্মের প্রচার কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়, এটি ছিল কয়েক শতাব্দী ধরে চলা সমুদ্র বাণিজ্য, রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং দূরদর্শী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সংগঠিত প্রচারণার সমন্বিত ফল। থাইল্যান্ড বলছি বটে, তবে সেদিন থাইল্যান্ড নামে কোনো একক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না। শ্যামদেশের মধ্যাঞ্চলে লাভো আর লোপবুরি, পাশাপাশি দ্বারাবতীর উত্তরসূরি মন সাংস্কৃতিক অঞ্চল, পূর্বদিকে ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠা খামের বা আঙ্কোর রাজ্য, উত্তর দিকে মন ও তাই রাজনৈতিক কেন্দ্রসমূহ আর দক্ষিণ দিকে মালয় উপদ্বীপ এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র। এই রাজনৈতিক মোজাইকের মাঝে যে প্রাচীন দ্বারাবতী সভ্যতা, তাতে লক্ষণীয়ভাবে ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রভাব দেখা যায়। গুপ্ত শিল্পরীতির সঙ্গে স্থানীয় শিল্পরীতির মিশ্রণে দ্বারাবতী শিল্পরীতি তৈরি হয় যা বিভিন্ন বুদ্ধমূর্তি, ধর্মচক্র, স্তূপ ইত্যাদিতে চোখে পড়ে। দ্বারাবতীর কিছু শিলালিপিতে সংস্কৃতের সাথে প্রাচীন মন ভাষা ব্যবহৃত হয়েছিল, আর লিখন পদ্ধতি ছিল দক্ষিণ ভারতীয় পল্লব অক্ষর প্রভাবিত। থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্মের সাথে সাথে মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম এবং শিব, বিষ্ণু, ব্রহ্মা, গণেশ প্রভৃতি হিন্দু দেবতাদের ধারণা স্থানীয় লোক-বিশ্বাস মিশে এক মিশ্র সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সৃষ্টি করে। দ্বারাবতীর নগর রাষ্ট্রগুলি ভারত ও চিনের মধ্যবর্তী যে বিশাল বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক তার সুফল ভোগ করত। মায়ে-ক্লং, থা-চিন ইত্যাদি নদীপথগুলির মাধ্যমে এই সভ্যতা দক্ষিণ চিন সাগর ও আন্দামান সাগরের সঙ্গে যুক্ত ছিল যা তাদের শ্রীবিজয় সাম্রাজ্যের সমুদ্র বাণিজ্যের প্রভাব বলয়ের অংশীদার করে তোলে। নাখোন পাথোম নগরের সঙ্গে শ্রীবিজয়ের বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও মেলে। দ্বারাবতীর বণিক মালয় উপদ্বীপ হয়ে মালাক্কা প্রণালী পার করে আসতেন সুমাত্রায়, সেখান থেকে সরাসরি শ্রীবিজয়। দ্বারাবতী ও শ্রীবিজয় উভয়ই বৌদ্ধ রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও দ্বারাবতীর বৌদ্ধ ধর্ম কিন্তু শ্রীবিজয়ের বৌদ্ধ ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিল না, বরং ভারত-শ্রীলঙ্কা থেকে থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্ম দ্বারাবতীতে গিয়েছিল, তার উল্লেখ আগেই করা হয়েছে।
সাধারণ অব্দ এগারো শতকের মাঝামাঝি। কালের নিয়মে দ্বারাবতীর নগরগুলি দুর্বল হচ্ছে। এই দুর্বলতার সুযোগে ইতিমধ্যে মধ্য থাইল্যান্ডে লাভো বা লোপবুরি রাজ্য শক্তি বাড়াতে শুরু করেছে। এতে কিন্তু মন সংস্কৃতির উত্তরাধিকার শেষ হয়ে গেল না, বরং তাতে নতুন রক্ত সঞ্চার হওয়ার উপক্রম হল। লোপবুরি রাজ্য হঠাৎ গজিয়ে ওঠা রাজ্য নয়, এর শিকড়ও শ্যামদেশে অত্যন্ত পুরোনো। ফলে দুই প্রাচীন সংস্কৃতির মেলবন্ধনে দেরি হল না। অন্যদিকে নবম থেকে এগারো শতকের মধ্যে বর্তমান কম্বোডিয়ায় অঙ্কোরকে কেন্দ্র করে খেমের শক্তি দ্রুত বেড়ে উঠছিল। এরা দ্রুততার সাথে লোপবুরি, ফিমাই তো বটেই, দক্ষিণ থাইল্যান্ডের নাখোম সি থাম্মারাতেও প্রভাব বিস্তার করে ফেলে। ফলে লোপবুরির পরিপূর্ণ উত্থানের আগেই তা খেমের প্রভাবে চলে যায়। এসব রাজনৈতিক পালাবদল সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে কোনো বাধা হচ্ছিল না। দ্বারাবতী-লোপবুরি শিল্প বৈশিষ্ট্যে এবারে খেমের-অঙ্কোরীয় শিল্প বৈশিষ্ট্য যোগ হয়। বড়ো পাথরের মূর্তি, বিশাল বিশাল ধর্মীয় স্থাপত্য, প্রাং ধরণের বড় মিনার, বোধিসত্ত্ব মূর্তি বা মন্দিরের অলঙ্করণ সবেতেই দ্বারাবতী-লোপবুরি-খেমের শিল্প বৈশিষ্ট্যের মেলবন্ধন এক উঁচু মাত্রার শৈল্পিক সত্ত্বার বিকাশ ঘটায়। এ প্রসঙ্গে যে কথা না বললেই নয়, খেমের রাজারা নবম থেকে দ্বাদশ শতকের শুরু পর্যন্ত প্রথম দিকে শৈব এবং পরের দিকে বিষ্ণু উপাসক থাকলেও দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে মহাযানী এবং তার পর থেকে থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্ম পালন ও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ফলে তাদের শিল্প-স্থাপত্য-ভাস্কর্যে খুব সাবলীলভাবে এই ভিন্ন ধারাগুলির মেলবন্ধন ঘটেছিল। যৌথ হিন্দু-বৌদ্ধ পরম্পরার উত্তরাধিকার খেমেরদের কাছ থেকে শ্যামদেশে বিকশিত হওয়ার পথ খুলে যায়।

বুদ্ধের বিতর্কমুদ্রা; মন-দ্বারাবতী
যাইহোক, বৌদ্ধ বিহারগুলি এসময় প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা নিতে থাকে। বিহার আর মন্দির মাত্র ছিল না, ভিক্ষুদের আবাসস্থল, শিক্ষাকেন্দ্র, গ্রন্থাগার, শিল্পপীঠ, চিকিৎসা ও যোগকেন্দ্র মিলে সামাজিক মিলনক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছিল। বৌদ্ধ বিহারে-মন্দিরে দান ধ্যান যেহেতু ধর্মপ্রাণ মানুষের এক আবশ্যিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ফলে নিষ্কর জমি, খাদ্য, শ্রম ও সম্পদের সাথে যুক্ত হয়ে বিহারগুলি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক একক হয়ে ওঠে। এতে রাজা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এক পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হয়। রাজার দানে একদিকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি সমৃদ্ধ হয়, আবার অন্যদিকে রাজার গ্রহণযোগ্যতা ও ধর্মীয় মর্যাদা বাড়ে। এই পারস্পরিক সমন্বয়ে বিহারগুলি সমাজে নৈতিক কর্তৃত্ব পেত, আবার রাজা ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র রূপে নিজেকে জাহির করার সুযোগ পান। ধীরে ধীরে দ্বারাবতী থেরবাদী বৌদ্ধ ঐতিহ্য এবং খেমের হিন্দু-মহাযান ঐতিহ্য মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
ইতিমধ্যে উত্তর ও পশ্চিম থাইল্যান্ডে বিভিন্ন তাই রাজনৈতিক কেন্দ্র তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে। ১২৩৮ সাধারণাব্দ নাগাদ সি ইনথ্রাথিত-এর নেতৃত্বে সুখোথাই রাজ্য তাই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই সময় সিংহলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ার পাশাপাশি সিংহলি থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম সুখোথাইতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মরূপে বিকশিত হওয়া শুরু হয়।

সুখোথাই তাই জনগোষ্ঠীর একমাত্র প্রতিনিধি ছিল না, কাছাকাছি সময় উত্তরে মাঙ্গরাই প্রতিদ্বন্দ্বী তাই গোষ্ঠীগুলিকে একত্রিত করে লান না শক্তির ভিত্তি প্রস্তুত করেন। মধ্য-উত্তর থাইল্যান্ডে সুখোথাই এবং উত্তর থাইল্যান্ডে লান না দুটিই একই জাতিগত ও ভাষিক জনগোষ্ঠী হলেও আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে পথ চলা শুরু করে। এই সময় এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। প্রাচীন মন গোষ্ঠীর শক্তিশালী কেন্দ্র হরিপুঞ্জায়া মাঙ্গরাই এর হাত ধরে লান না-দের রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে চলে আসে। তাই রাজারা মন-দের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র জয় করলেন বটে, তবে মন সংস্কৃতিকে মোটেই ধ্বংস করলেন না, বরং মন সংস্কৃতির বহু উপাদান লান না সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠল।
সুখোথাই এবং লান না দুটোই একই জাতিগোষ্ঠীর রাজ্য হলেও যেহেতু তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ আলাদা ছিল, তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন চলত, খেমের বা অন্য শক্তির কূটনৈতিক- রাজনৈতিক চাপ এলে সহযোগিতাও বিরল ছিল না। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বহিরাক্রমণের হাত থেকে বাঁচার তাগিদে ধীরে ধীরে সুখোথাই-এর রাজনৈতিক বলয়ে এক সময় লান না বিলীন হয়ে গেল।

ওয়াত ফ্রা সিং; লান না
১৩৫১ সাধারণাব্দ নাগাদ চাও ফ্রায়া নদী অববাহিকা অঞ্চলে আয়ুত্থায়া (অযোধ্যা??) নামে এক নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্ভবত রামাধিবোদি-I (রামাধিপতি??) এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। শুরু থেকেই আয়ুত্থায়া রাজ্যটি অন্যান্য শ্যাম রাজ্য থেকে আলাদা ছিল তার অবস্থানগত সুবিধার জন্য। অনেকগুলি নদীর সংযোগস্থল এবং সমুদ্র বন্দর একে যেমন বাণিজ্যিক সুবিধা দিয়েছিল, ঊর্বর কৃষিজমি তেমনি অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে সাহায্য করেছিল। ফলে দ্রুত আয়ুত্থায়া নৌবাণিজ্যের এক বড়ো অংশ নিজের দখলে এনে দৃঢ় অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি হয়ে উঠছিল। শক্ত আর্থিক বুনিয়াদের উপর দাঁড়িয়ে আয়ুত্থায়ার উত্থান এত দ্রুত হচ্ছিল যে, প্রতিবেশী শক্তি সুখোথাই এর সাথে তাল মেলাতে পারছিল না। ফলে একসময় সুখোথাইয়ের মত শক্তিশালী রাজ্য আয়ুত্থায়ার প্রভাব বলয়ে মিশে গেল। থাইল্যান্ড বা শ্যামদেশ জুড়ে অবশেষে একটি শক্তিই টিকে রইল—আয়ুত্থায়া। প্রতিবেশী পুরোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খেমের রাজ্যের সাথে প্রতিযোগিতা যেন আয়ুত্থায়ার ভবিতব্য হয়ে দাঁড়াল। টিকে থাকার লড়াইয়ে এই দুই শক্তিকে কোনো না কোনো দিন মুখোমুখি দাঁড়াতেই হত।
১৪৩১ সাধারণাব্দে আয়ুত্থায়ার অঙ্কোর অভিযান যেন সেই ভবিতব্যে সিলমোহর দিল। আর্থিক ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান নব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর সামনে ক্ষয়িষ্ণু শক্তি খেমের নতি স্বীকারে বাধ্য হয়েছিল। এই ঘটনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্যে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে। খুব সংক্ষেপে আর দ্রুততার সাথে কয়েক’শ বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের যে বর্ণনা পেলাম, তাতে সাংস্কৃতিক বিবর্তনের বিবরণ যোগ করা উচিত বলে মনে করি। শেষ থেকেই বরং শুরু করি।
খেমের যেহেতু এই অঞ্চলের টিকে যাওয়া অতি পুরোনো শক্তি, রাজনৈতিকভাবে তারা আয়ুত্থায়ার কাছে পরাজিত হলেও আয়ুত্থায়া অঙ্কোর রাজদরবারের আচার, রাজকীয় প্রতীক-জাঁক জমক, তাদের স্থাপত্য, তাদের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অথবা দৈব রাজতন্ত্রের প্রতীকী ধারণা সবকিছুই নির্বিচারে গ্রহণ করেছিল। আবার মন-রা যখন থাইল্যান্ডে প্রথম এল, দ্বারাবতীর ঐতিহ্য-ধর্ম-ঘরানা সমস্ত আত্মস্থ করে তারা লান না এবং সুখোথাই সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল। সুখোথাই এবং মন-রা আবার খেমেরদের থেকে মহাযানী এবং হিন্দু ঐতিহ্য ধার করতে দ্বিধা করেনি। ফলে থেরবাদী-মহাযানী-হিন্দু-স্থানিক সমস্ত ঐতিহ্য মিলেমিশে এক অভিন্ন থাই সংস্কৃতির জন্ম হতে পেরেছিল। যেকোনো সভ্যতার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ধারা এভাবেই বয়ে চলে। রাজনৈতিক উত্থান পতনের বিপরীতে সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের বহমানতা নতুন সভ্যতা সৃষ্টি করে, জন্ম দেয় নতুনতর মিশ্র সংস্কৃতির, যা মানুষকে উত্তরণের পথে এগিয়ে নিয়ে চলে।
মিশ্র সংস্কৃতির চমৎকার উদাহরণ ফেতচাবুন অঞ্চলের সি-থেপের মহাকায় শিবলিঙ্গ এবং একই চত্বরের বৌদ্ধ নিদর্শন। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, থাই দেশের আন্তঃসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের অনেক উদাহরণের মাঝে আরেক উদাহরণ মাত্র।
হিন্দু মন্দির স্থাপত্যের এক বিশেষ দার্শনিক চিন্তন হল, তাকে মহাজাগতিক প্রতীকরূপে তুলে ধরা। এই কারণে মন্দিরের চূড়া আকাশগামী হয়। আর সেই মহাজাগতিক প্রতীকের কেন্দ্রে অর্থাৎ গর্ভগৃহে অবস্থান করেন সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রতিভূ কোনো দেবমূর্তি। এই বিশেষ কসমোলজিক্যাল আর্কিটেকচারকে খেমেররা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে জারিয়ে নিয়ে এক অসাধারণ শৈলীতে উন্নীত করে, যা হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় মন্দির স্থাপত্যে সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল। আবার মিশ্র সংস্কৃতির স্বাভাবিক সহাবস্থানের কারণে শিব, বিষ্ণু, গণেশ, বিভিন্ন দেবীমূর্তির পাশাপাশি বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্ব এসব মন্দিরে নির্বিরোধে পাশাপাশি স্থান করে নিয়েছেন।

লোপবুরির প্রাং সাম ইয়ট
লোপবুরির প্রাং সাম ইয়টে মন-দ্বারাবতী ঐতিহ্যের সাথে খেমের শৈলীর এক অসাধারণ মিশ্রণ ঘটেছে, যা হিন্দু বা বৌদ্ধ বৈশিষ্ট্যের ঊর্ধ্বে কোথায় যেন শুধুমাত্র থাই শৈলী হয়ে রয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে এই অঞ্চলের এক রাজকীয় মনস্তত্ত্বের কথা না বললেই নয়। রাজারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও শিব বা বিষ্ণুমূর্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেদের রাজশক্তির বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন। তারা মহাজাগতিক ঐশ্বরিক শক্তির সাথে নিজেদের নৈকট্য প্রমাণের মাধ্যম রূপে বিশালকায় শিবলিঙ্গ অথবা বিষ্ণুমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতেন, তা বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সাথে খাপ খায় কিনা তা নিয়ে বড়ো একটা মাথা না ঘামিয়েই। বৌদ্ধ রাজাদের আরেক বৈশিষ্ট্যও কথা প্রসঙ্গে বলা যায়, বুদ্ধ উপাসক হলেও রাজদরবারের বিভিন্ন ধর্মীয় আচার, রাজ্যাভিষেক, জ্যোতিষ ইত্যাদি শুভাশুভের ভার ন্যস্ত ছিল একচেটিয়াভাবে ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের উপরে।
ফিরে আসি স্থানীয় স্থাপত্য ও মূর্তি ভাস্কর্যে। ভারতের গুপ্ত ভাস্কর্যের রেশ এবং মন-দ্বারাবতী বৈশিষ্ট্যের মিশেলে এক অনিন্দ্যসুন্দর বুদ্ধমূর্তি তৈরি হয়েছিল, যার দুইহাতেই বিতর্কমুদ্রা। এই বুদ্ধমূর্তি দ্বারাবতী বুদ্ধ নামে পরিচিতি পায়। এদিকে মহাযানী বৈশিষ্ট্য সমন্বিত অবলোকিতেশ্বর মূর্তিতেও স্থানীয় বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে দৃশ্যমান। আবার সুখোথাই ও সিংহলী থেরবাদের মিশ্রণে এমন এক জীবন্ত মূর্তি বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়েছিল, যা দেখে মনে হয় বুদ্ধ যেন হাঁটছেন। লান-না প্রভাবিত চিয়াং মাইয়ের মূর্তিগুলি মন, সুখোথাই, সিংহলী ও বর্মার বাগান ঐতিহ্যের সারাৎসার।

বুদ্ধ যেন হাঁটছেন, সুখোথাই
এই যে ভিন্ন ভিন্ন স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের ধারাস্রোত, আয়ুত্থায়াতে এসে সমস্ত ধারা মিলিত সঙ্গম সৃষ্টি করেছিল। এখানে উপরে বলা তাবৎ শিল্পধারার সাথে খেমের, ভারতীয়, চৈনিক ও মালয় শিল্পধারার সংমিশ্রণ এমন এক দক্ষিণ পূর্ব এশীয় শিল্পধারা নির্মাণ করল যার জুড়ি মেলা ভার। বিশেষ করে আয়ুত্থায়ার মন্দির স্থাপত্যে প্র্যাং খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানকার অদ্ভুতদর্শন বিশালকায় মন্দির কাঠামো, সঙ্গে মন ভাল করা নান্দনিক কমনীয়তা ভারতীয় বা সিংহলী বৈশিষ্ট্য নয়, খেমের বা চৈনিক শিল্পধারার সাথেও যার মিল নেই, এই নান্দনিকতা একান্তই থাই নন্দনতত্ত্ব রূপে চিহ্নিত হয়ে আছে। বিশ্বকর্মা এবং ময়দানবের ভিন্নতার মিলনের মত সমগ্র এশীয় শিল্পতত্ত্ব থাইভূমে এসে মিলিত হয়ে এক অভিনব থাই শিল্পকলার রূপ নিয়েছিল যা বিশ্ব শিল্প ইতিহাসের এক অনন্য উদাহরণ। কিমাশ্চর্যম।
তথ্যসূত্রঃ
- Hiram W. Woodward, The Art and Architecture of Thailand: From Prehistoric Times through the Thirteenth Century. Brill, 2018
- Hiram W. Woodward, The Sacred Sculpture of Thailand. The Gallery, Baltimore,1997
- Chris Baker & Pasuk Phongpaichit, A History of Thailand. Cambridge University Press, 4th ed., 2022
- George Coedes, The Indianized States of Southeast Asia. University of Hawai’I Press, English ed. 1975
কি অসাধারণ সুন্দর লেখা। মন ভরে গেল পড়ে।
অনেকটা পরিশ্রমের ফসল। ভাল লেগেছে জেনে সুখী হলাম। ধন্যবাদ।