প্রগতিপথিক নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত
‘তিনি যে জাতীয়তার জন্য প্রাণপণ করিয়াছেন, সে জাতীয়তার প্রকৃত নাম হিন্দুয়ানি।’
এই বাক্যটি লিখেছিলেন প্রগতি লেখক সংঘের প্রথম সভাপতি সাহিত্যিক নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত আজ থেকে একশ বছর আগে, ‘বঙ্গবাণী’ (ভাদ্র, ১৩৩৩) সাময়িকপত্রের ‘সাহিত্যে জাতীয়তা’ নামক প্রবন্ধে—জাতীয়তার ধ্বজাধারী এক সাহিত্য আলোচকের দ্বিধাহীন ভাষায় সমালোচনা করতে গিয়ে। আজ যখন হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান মন্ত্রে দেশভক্তির পাঠ পড়ানোর আয়োজনটি সুপ্রতিষ্ঠিত, তখন তাঁর রচনা ফিরে পড়লে বিস্ময় জাগে। ওই একই প্রবন্ধের অন্যত্র তিনি লিখেছেন,
‘আমার সনাতনপন্থী স্বদেশবাসীকে বলিতে চাই … বিলাত বা কোনও বিশিষ্ট দেশের অনুকরণ আমরা চাই না। কিন্তু চার পাঁচশত বৎসরের পুরাতন ভারতবর্ষের ভিতর বসিয়া চারিদিক দিয়া পরিবর্ত্তনের পথে পাষাণ প্রাচীর গড়িয়া থাকিতেও আমরা চাই না। আমরা চাই ঠিক আজকার ভারতবাসী হইতে—আজকার বিশ্বের সমস্ত culture-স্রোতের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করিয়া সজীবভাবে অগ্রসর হইতে, এক কথায় modern হইতে। … আজকালকার যে culture বা সামাজিক সংস্কার ও আচার তাহার বেশীর ভাগই কোনও জাতি বিশেষের বিশেষ সম্পদ নয়। আজ যেসব নূতন আদর্শ নূতন ভাব বা চিন্তা গড়িয়া ওঠে, তাহা জাতীয়তার গণ্ডী ছাড়াইয়া বিদ্যুদ্বেগে সমস্ত বিশ্বে ছড়াইয়া পড়ে, সমস্ত বিশ্ব তাহা আপনার জীবন-ধারার সঙ্গে সমীকৃত করিয়া লইবার চেষ্টা করে। তাহার ফলে আজকার মানবসমাজ সমস্ত জাতীয় গণ্ডী অতিক্রম করিয়া culture-এর দিক হইতে এক বিরাট সমাজ রূপে গঠিত হইয়াছে…।’
আজকের নিরিখেও প্রবল ভাবে প্রাসঙ্গিক এই উদ্ধৃতি যাঁর লেখা থেকে পাচ্ছি তাঁর জন্ম উনিশ শতকের শেষের দিকে [৩ মে ১৮৮২–১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪]। অথচ তাঁর স্বদেশ ও বিশ্ব, আধুনিকতা ও ঐতিহ্য সম্পর্কে এমন স্বচ্ছ এমন আধুনিক ভাবনা ছিল। তাঁকে তাই সেই সময়ের মুষ্টিমেয় বাঙালি বা ভারতীয়দের মধ্যে একজন বলে চিনে নেওয়া যায়—সহজেই যারা সময়ের চেয়ে এগিয়ে ভাবতে পারতেন। তাঁর সাহিত্য শুধু নয়, তাঁর জীবন সম্পর্কেও জানা আজ আমাদের প্রয়োজন। সেই সময়ের প্রগতিবাদী সুচিন্তকরা কীভাবে প্রতিহত করার চেষ্টা করতেন সমসাময়িক পশ্চাৎগামী বাতাসের টান তা আমাদের বোঝা দরকার।
তাঁর সময়ে তিনি ছিলেন একইসঙ্গে জনপ্রিয় এবং বিতর্কিত কথাসাহিত্যিক। বিশ শতকের বিশ-তিরিশের দশকের বাংলা কথাসাহিত্য, বাংলা উপন্যাসে মানুষী সম্পর্কের নির্মম বাস্তবতার প্রয়োগ, সর্বোপরি বাংলা কথাসাহিত্যের মোড় বদল প্রসঙ্গে আলোচনা করতে বসলে নরেশচন্দ্রকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর সাহিত্য ও জীবন সম্পর্কে লিখিত তথ্যাদি অনুসন্ধান করতে গিয়ে ভুলে যাওয়া বিস্ময়কর বুদ্ধিজীবী মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া যায়। বিস্মৃতপ্রায় সেই কথাসাহিত্যিকের কথা সংক্ষেপে জানাতে চেয়েই বর্তমান লেখার অবতারণা।
২
নরেশচন্দ্রের কর্মজীবন ছিল ত্রিমুখী—আইন, রাজনীতি এবং সাহিত্য। এই তিনটি ক্ষেত্রেই তিনি সমান্তরালভাবে বিশিষ্টতা অর্জন করেছিলেন৷ শুধু তাই নয়, তিনি একটি ক্ষেত্র থেকে আহৃত প্রেরণা থেকে অন্য ক্ষেত্রে রসসঞ্চার করতে পারতেন। এটাই ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। তাঁর বাস্তবমুখী আধুনিক সাহিত্যিক সত্তায় নিজস্ব পেশা থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক বোধ চমৎকারভাবে মিশিয়ে দিতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক সত্তাটিও প্রবলভাবে সাম্যবাদী ভাবনায় প্রভাবিত ছিল। ফলে বিত্ত বা সামজিক পরিচয়ে যারা ‘অপর’ আজীবন তাঁদের পক্ষ নিয়েছেন।
পেশাগত পরিচয়ে তিনি ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী, আইনের অধ্যাপক এবং আইন বিশেষজ্ঞ। ১৯৫০ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রসন্ন কুমার ঠাকুর আইন অধ্যাপক হন। ১৯৫২ সালের ইন্টারন্যাশনাল কপিরাইট কনভেনশনের আগের বছর আমেরিকায় তার খসড়া তৈরির জন্য ইউনেস্কো যে বিশেষ অধিবেশন করে তাতে তিনি ভারতীয় আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমন্ত্রিত হন। আর ১৯৫৬ সালে তিনি ভারতীয় আইন কমিশনের সদস্য মনোনীত হন। অর্থাৎ আইন বিষয়টিতে তাঁর অধীত বিদ্যা চূড়ান্ত পর্যায়ের ছিল।
অন্যদিকে ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি রাজনীতি সচেতন ছিলেন। প্রথম জীবনে কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন; তবে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব তাঁর ভাবনাচিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে- পরবর্তী সময়ে তাঁর বামপন্থায় আগ্রহ জন্মায়। ১৯২৫-২৬ সালে সদ্য গঠিত ‘ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজ্যান্টস্ পার্টি’-র তিনি সভাপতি হন। আরও পরে ১৯৩৪ সালে ‘লেবার পার্টি অব ইন্ডিয়ার’ সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সাহিত্যিক হিসেবে তিনি ছিলেন ছকভাঙা এবং ছুৎমার্গহীন। রাজনীতিবোধ ও সমাজসচেতনতার কারণে তাঁর সাহিত্যদর্শনও ছিল ভিন্ন। মনস্তত্ত্বের বিভিন্ন দিক—নর-নারীর যৌনতা, অপরাধ-প্রবণতা ইত্যাদি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এসেছে তাঁর লেখায়। তাঁর গল্পের নারী চরিত্রেরা মানুষ ছিল, মেয়েমানুষ নয়। তারা মানুষের মতোই দোষে গুণে ভরা এবং অনুতাপহীন। এইসব কারণে তাঁর দুঃসাহসিক সাহিত্যিকের পরিচয়টিই সর্বাধিক পরিচিতি পায়। সুকুমার সেন তাঁকেই কল্লোল যুগের ভগীরথ আখ্যা দিয়ে গিয়েছেন। ‘ঠানদিদি’ ‘শুভা’, ‘পাপের ছাপ’, ‘রাজগী’, ‘রূপের অভিশাপ’, ‘অভয়ের বিয়ে’, ‘রবীন মাস্টার’ ইত্যাদি নরেশচন্দ্রের উল্লেখযোগ্য রচনা। তাঁর বহু উপন্যাস হিন্দি, গুজরাটি প্রভৃতি অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। এমনকী তাঁর কাহিনি থেকে নির্মিত হয়েছিল একাধিক চলচ্চিত্র, নাটক ইত্যাদি।
আইনজ্ঞ, রাজনীতিবিদ ও সাহিত্যিক নরেশচন্দ্রকে পরিচালনা করত উদার, নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও সর্বাত্মক প্রগতিবাদী একটি মন। তাঁর নরেশচন্দ্র হয়ে ওঠার পর্বটি বিস্তারিত করা যাক।
৩
১৯০৩-৫ কাল পর্বে যখন তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শন শাস্ত্রে গবেষণা করছিলেন তখনই তাঁর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ছাত্রনেতা রূপে উত্থান। ১৯০২ সালে ‘মেন্টাল ও মরাল সায়েন্স’ নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হয়ে তিনি প্রসিডেন্সি কলেজ থেকে এমএ পাশ করেন । অতঃপর গবেষণার জন্য বৃত্তির আবেদন করেছিলেন। এদিকে তাঁর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পিতা মহেশচন্দ্র সেনগুপ্তের ইচ্ছে পুত্র তাঁর পথই অনুসরণ করুক। কিন্তু নরেশচন্দ্রের ডেপুটিগিরির সরকারি পদ একেবারে নাপসন্দ ছিল। তাঁর আগ্রহ ছিল গবেষণা ও অধ্যাপনার দিকে। পিতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিরোধে না গিয়ে তিনি ঘোষণা করেন যে, তাঁর ইচ্ছে ওকালতির স্বাধীন জীবিকা। সেই মতো তিনি রিপন কলেজে আইন পড়া শুরু করেন, ১৯০৪ সালে আইনে স্নাতক হন। অন্যদিকে যথাসময়ে বৃত্তি মঞ্জুর হতে তিনি ছাত্র-গবেষক হিসেবে প্রেসিডেন্সি কলেজে গবেষণার কাজ শুরু করেন। বিষয় ছিল—’নব্য জার্মান এবং প্রাচীন ভারতীয় দর্শন’।
১৯০৩ থেকে বাংলা ভাগের কথা কান পাতলে শোনা যাচ্ছিল, ফলে চাপা অস্থিরতা ছিলই। ১৯০৫ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘনঘোর হয়ে ওঠে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার খবর প্রকাশ্যে এলে। নরেশচন্দ্র তখন দুইভাবে প্রতিবাদে সক্রিয় হয়ে ওঠেন; একদিকে নানা সর্বভারতীয় পত্রপত্রিকায় রাজনৈতিক প্রবন্ধ লেখেন, অন্যদিকে ছাত্রদের সংঠিত করে অজস্র প্রতিবাদী সভা করেন। পৃথ্বিশচন্দ্র রায় সম্পাদিত ‘The Indian World’ পত্রিকায় তাঁর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। W.T. Stead-এর Review of Reviews পত্রিকা প্রায়ই তাঁর লেখার চুম্বক প্রকাশ করত। ফলে নরেশচন্দ্র দ্রুত সর্বভারতীয় বৌদ্ধিক জগতে একটি পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন।
সরকার ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে অক্টোবর মাসে কুখ্যাত ‘কার্লাইল সার্কুলার’ জারি করে। অবিলম্বে ছাত্ররা ‘অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি’ গঠন করে; সভাপতি নির্বাচিত হন নরেশচন্দ্র। তিনি সারা বাংলা ঘুরে ছাত্রদের সঙ্গে মিলিত হন, আলোচনা-সভা-সমিতি ইত্যাদি চলতে থাকে। ১৯০৫ সালের ৪ নভেম্বর কলেজ স্কোয়ারে এক বিরাট ছাত্র জমায়েতের বিবরণ পাওয়া যায় যেখানে তিনি প্রতিবাদী ভাষণ দেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের জোয়ারে তখন সারা বাংলা উত্তাল। প্রেসিডেন্সির তৃতীয় বর্ষের ছাত্রদের পত্রিকায় নরেশচন্দ্র ইংরেজ সরকারের ভেদনীতির তীব্র সমালোচনা করে ‘Muslims in Bengal’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধটি নিয়ে তোলপাড় হয় এবং শিক্ষা দপ্তরের কানে যায়। কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে কাগজটির প্রতিটা কপি বাজেয়াপ্ত করে এবং নরেশচন্দ্রকে বহিষ্কার করার প্রস্তাব নেয়। যদিও তা বাস্তবায়িত করা হয়নি, হয়তো ছাত্র-যুব-শক্তির প্রবল রোষে আর ঘৃতাহুতি দিতে চায়নি ইংরেজ সরকার। কিন্তু নরেশচন্দ্র সরকারি গবেষক বৃত্তি ত্যাগ করেন। ফলে সেই গবেষণা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নরেশচন্দ্র ততদিনে ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন। এবং হয়ে উঠেছেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, আশুতোষ চৌধুরী প্রমুখ বাংলার নেতাদের আস্থাভাজন যুবনেতা।
১৯০৫ সালের ডিসেম্বরে নরেশচন্দ্র ছাত্র প্রতিনিধি মনোনীত হয়ে বেনারস কংগ্রেস অধিবেশনে যোগ দেন এবং পরিচয় হয় লোকমান্য তিলক, লালা লাজপত রায়, গোপালকৃষ্ণ গোখলে প্রমুখের সঙ্গে। অন্যদিকে ১৯০৬ সালে আংশিক অধ্যাপনার কাজ করতে করতে হাইকোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। একই সময়ে সর্বভারতীয় পাঠকের কথা ভেবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। নাম দিয়েছিলেন ‘Abbey of Bliss’। সেই গ্রন্থের ‘বন্দেমাতরম’ গানের ইংরেজি অনুবাদটি আলাদা করে ‘The Indian World’ পত্রিকার ১৯০৬ অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
কংগ্রেসের সদস্য থাকাকালীন তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হল পার্টির সংবিধানের খসড়া তৈরি। কংগ্রেসের প্রথম সংবিধানের খসড়ায় যে ‘ব্রিটিশ শাসনাধীনে স্বাধীনতা’ লাভের প্রস্তাব ছিল তার সমালোচনা করে নরেশচন্দ্র ‘The Indian World’ পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রসঙ্গটি ১৯০৭ সালের সুরাট অধিবেশনে ওঠে, বাদানুবাদ হয়। নরেশচন্দ্রের মতো আরও অনেকেরই আপত্তি থাকায় কংগ্রেস তখন প্রতিটি প্রাদেশিক কমিটিকে খসড়া তৈরি করতে বলে। বাংলা প্রাদেশিক কমিটির খসড়া তৈরির ভার নরেশচন্দ্রকে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে কিছু পরিবর্তন করে যে খসড়াটির ভিত্তিতে কংগ্রেসের সংবিধান রচিত হয় সেটি ছিল নরেশচন্দ্রেরটিই।
ছাত্রজীবন তখনও শেষ হয়নি নরেশচন্দ্রের। দর্শনের গবেষণা অসম্পূর্ণ থেকে গেলেও ১৯১১ সালে তিনি আইন নিয়ে গবেষণার লক্ষ্যে নন-কলেজিয়েট ছাত্র হিসেব এমএল পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পান। আর ১৯১৩ সালে হন ‘ডক্টরেট অব ল’—বিষয় ছিল ‘প্রাচীন ভারতের ব্যবহার ও সমাজনীতির উৎপত্তি’, Sources of Law and Society in Ancient India। এই গবেষণাভিত্তিক গ্রন্থটি আজও ভারতীয় আইনের বেদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা উল্লেখ করা দরকার। তিনি ১৯১১ সালে একক ভাবে জমিদারি প্রথা বিলোপের প্রস্তাব করেন। যদিও সেই সময় এই প্রস্তাব কোনো সক্রিয় জনমত গড়তে পারেনি , কিন্তু তিনি দমে না গিয়ে তখন থেকেই কৃষকের দুর্দশার বর্ণনা করে এবং জমিদারি প্রথার সমালোচনা করে পত্রপত্রিকায় বহু প্রবন্ধ লেখেন। লেখক জীবনে জমিদারি প্রথার কুফল বিষয়টি তাঁর সাহিত্যে গুরুত্ব পায়। এই জন্যই পরের দশকে কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় রাজনৈতিক সংগঠন গড়তে সক্রিয় ভূমিকা নিতে এগিয়ে আসতেও দেখা যায় তাঁকে।
৪
নানা কারণে যখন নরেশচন্দ্র কংগ্রেসের রাজনীতিতে আস্থা হারিয়ে ফেলছিলেন, সেই সময়ে রুশ বিপ্লব তাঁকে দারুণভাবে আলোড়িত করে তোলে । ১৯২২ সালের সারা ভারত জুড়ে চলতে থাকা কৃষক আন্দোলনকে তিনি সমর্থন জানান । ১৯২৫ সালের ১ নভেম্বর নজরুল ইসলাম, মুজফফর আহমদ প্রমুখের উদ্যোগে কলকাতায় শ্রমিক প্রজা স্বরাজ দল গঠিত হয় যা কারো কারো মতে ভারতে গঠিত অন্যতম প্রথম সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার রাজনৈতিক গোষ্ঠী। নরেশচন্দ্র এঁদের ঘনিষ্ট ছিলেন। দলটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের বিতাড়নের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে জমিদার, মহাজন ও পুঁজিপতিদের হাত থেকে কৃষক ও শ্রমিকদের মুক্ত করা। এদের আরেক উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষকে এক মঞ্চে এনে আন্দোলন গড়ে তোলা। দলের পরিসর বাড়তে থাকলে ১৯২৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে দলের নাম বদলে রাখা হয় বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল। নরেশচন্দ্র এই দলের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে এই দলই সর্বভারতীয় স্তরে ‘কীর্তি কিশান দল’ ইত্যাদি প্রাদেশিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে Workers and Peasants Party হিসেবে আত্মপ্রকাশ। অবশ্য ১৯২৯ সালে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার পর দলটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
তিরিশের দশকেও নরেশচন্দ্র নানা সাম্যবাদী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে, সভা সমিতিতে অংশ নিয়েছেন—কৃষক সভায় বক্তৃতা করেছেন, শ্রমিক আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। নীহারেন্দু দত্ত মজুমদারের তিনি ছিলেন ঘনিষ্ট সহযোগী। নীহারেন্দুর মতে ১৯৩২ সালে বেঙ্গল লেবার পার্টির প্রতিষ্ঠাতা নরেশচন্দ্রই, পরে তিনি তাতে যোগ দেন। যদিও এনিয়ে দ্বিমত আছে। অন্য দিকে ফজলুল হকের ‘কৃষক প্রজা পার্টি’কে তিনি কৃষকের স্বার্থের কথা ভেবেই সমর্থন করেছিলেন। তারপরের ঘটনা নরেশচন্দ্রের বয়ানে এইরকম;
‘এঁরা মুসলিম লীগের সঙ্গে মিতালি করে যে সব কাজ করেন তাতে আমি তাঁদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ত্যাগ করি এবং সম্পূর্ণভাবে পলিটিক্স থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করি।’
৫
‘পরিচয়’ পত্রিকার ১৩৭১ কার্তিক সংখ্যায় গোপাল হালদার ‘নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত’ নামে এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন,
‘জমিদারতন্ত্রী বাঙালী সমাজের কৃষক সমস্যার স্বরূপ যাঁরা নির্ভুল ও নির্ভীকভাবে নির্ণয় করেছিলেন, ব্যক্তিগত বা শ্রেণীগত লাভ-ক্ষতির কথা মনে না রেখে কৃষক আন্দোলনের পুরোভাগে স্থান করে নিতে দ্বিধা করেননি, তাঁদের মধ্যে নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
সক্রিয় রাজনীতি ছেড়ে দিলেও জীবনের শেষ পর্বেও কিন্তু তিনি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছেন। সাহিত্যে সর্বস্তরের জীবন এবং জীবনের সর্বস্তরকে তিনিই প্রথম গুরুত্ব সহকারে স্থান দিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যে ফ্রয়েড ও মার্ক্সের তত্ত্বের প্রয়োগ তাঁর রচনাতেই প্রথম দেখা গেছে। সেদিক থেকে নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত হলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা জগদীশ গুপ্তের আত্মীয়। নরেশচন্দ্র নারীমুক্তি ও নারী স্বাধীনতার বিষয়গুলি যে দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতেন তা তাঁর সমসাময়িক শরৎচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শত যোজন দূরের। কপট রক্ষণশীলতা বর্জিত তাঁর কলম জীবনের কোনদিককেই সাহিত্য থেকে বাদ দেওয়ার কথা ভাবেনি। মানুষের অতি তুচ্ছ অথবা আপাত নিন্দার যোগ্য দিকগুলিকেও তিনি সাহিত্যের উপাদান করতে দ্বিধা করেননি। শুধু এই একটি কারণেও অর্থাৎ বাংলা সাহিত্যের বিষয়সীমাকে বিস্তৃত করার জন্যও তিনি বাংলা কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
স্বাভাবিকভাবেই ১৯৩৬ সালে বাংলায় ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রগতি লেখক সংঘ’-এর শাখা প্রতিষ্ঠা হলে নরেশচন্দ্র তাঁর প্রথম সভাপতি হন। ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’-এর দ্বিতীয় সর্বভারতীয় সম্মেলনে দেওয়া নরেশচন্দ্রের বক্তৃতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে লেখায় ইতি টানছি –
‘সমগ্র বিশ্ব আজ দাঁতে দাঁত চেপে অস্ত্রসজ্জিত হচ্ছে। বিপদকে রুখে দেবার এর চেয়ে ভালো কোনো উপায় তাদের জানা নেই। কিন্তু শুধু অস্ত্রশস্ত্রই সমস্ত মানবিক গুণগুলিকে চিরকাল রক্ষা করতে পারবে না; বরং পৃথিবীর সমস্ত নৈতিক শক্তিকে সুসংহত করাই হবে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
‘বিশ্ব ফ্যাসিবাদের যুদ্ধাস্ত্র ভয়ানক। কিন্তু ফ্যাসিবাদের যে মতাদর্শ সমস্ত নৈতিকতাকে এবং ন্যায়বিচারকে বিদ্রূপ করে এবং শুধুমাত্র শক্তিদম্ভের জয়গান করে তাকে প্রতিহত করা আরও কঠিন। এই ক্রমবর্ধমান অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধও তখন দুর্বলতর হয়ে পড়ে। …
‘অস্ত্রের সাফল্য নৈতিক বিজয়ের সম্মান লাভ করলে তা অধিকতর ক্ষতিকর। কারণ এর পরিণামে বিজিতের মনে অক্ষমতাবোধ ও স্বেচ্ছায় নতি স্বীকারের মানসিকতা জন্মে। ফ্যাসিবাদ যদি বিশ্বব্যাপী প্রাধান্য বিস্তার করে তবে তা হবে ভয়ঙ্কর, মানুষের নৈতিক মেরুদণ্ড চূর্ণ-বিচুর্ণ হবে। মনুষত্ববোধ প্রগতি ও প্রকৃত সভ্যতার পথ থেকে দীর্ঘদিনের জন্য বিপথগামী হবে। কেবলমাত্র মানসিক শক্তিতে বলিয়ান হয়েই এই অনিবার্য পরিণতির গতিপথ থেকে মানবতাকে উদ্ধার করা যেতে পারে। এটাই হবে পৃথিবীর প্রগতিধর্মী লেখকদের বিশেষ আহ্বান।’
তথ্যসূত্র
- নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, আত্মকথা, যুগপরিক্রমা, প্রথম খণ্ড (ফারমা কে এল এম, ১৯৫৯)।
- শ্যামাপ্রসাদ দাস, নরেশচন্দ্র: জীবন ও সাহিত্য (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ১৯৮২)।
- স্বস্তি মণ্ডল, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত (তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ১৯৯২)।
- Naresh Chandra Sengupta, The reform of the Indian Congress, Vol. IV, The Indian World (June 1906).
- Naresh Chandra Sengupta, A constitution for the National Congress, Volume IV, The Indian World, (Oct 1907).
- Naresh Chandra Sengupta, Swaraj, Vol. IV, The Indian World, (Oct 1907).
- সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান, প্রধান সম্পাদক সুবোধ দাশগুপ্ত, সাহিত্য সংসদ, প্রথম সংস্করণ (১৯৭৬)।
- সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, চতুর্থ খণ্ড। ৩ সংস্করণ (১৯৭১)।
- সুস্নাত দাশ, ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংগ্রামে অবিভক্ত বাঙলা, (প্রাইমা পাবলিকেশনস, ১৯৬১)।
- বিশ্বজিৎ ঘোষ, আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন, প্রগতি লেখক সঙ্ঘ এবং রবীন্দ্রনাথ, সাহিত্য পত্রিকা, ঢাবি, বাংলা বিভাগ, তেত্রিশ বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা (১৯৯০)।