সিল্ক রুট ও ডুয়ার্স পথ ধরে অনুসন্ধান
‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো ….’
পথ নিয়ে বই-পুঁথি ঘাঁটাঘাঁটির মাঝেই একদিন সহযাত্রীর চালানো গান কানে ঢুকলো। বেয়ারা মগজে সরল সমাধান ছেড়ে (আমার মতো পাথর আর জঙ্গলের কারবারিদের যা স্বাভাবিক) চিন্তা এল, পথ তাদের কাছে প্রিয় কেন? উত্তর এল, এ পথ তাদের কাছে পিচ ঢালা এক সরলরেখা নয়। বরং তাদের মন দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্র, যার প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে অনেক গল্প, অনেক স্মৃতি। এ পথ তাই কেবল অস্তিত্ব নয়, বহুস্তরের চেতনাযুক্ত এক সত্তা। পথকে শুধু পিচ ঢালা বা মাটির সরলরেখা হিসেবে না দেখে, প্রতিটি খাঁজে-ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অজস্র গল্পকে চিনতে সাহায্য করেছে যে তিনটি বই- আজ সেই তিন বইয়ের আলোয় আপনাদের শোনাবো সিল্ক রুট ও ডুয়ার্স পথের কথা।
১
পথের আকর্ষণ কদিন বেড়েছে। আকর্ষণ বেড়েছে মূলত পৃথিবীর সর্বাধিক আলোচিত পথ সিল্ক রোড নিয়ে। গোটা পৃথিবীর কোনো একটি পথকে ঘিরে যদি সর্বাধিক চর্চা হয়ে থাকে তাঁর মধ্যে অন্যতম প্রধান এই সিল্ক রোড। দশকের পর দশক ধরে একাধিক মহাদেশ ঘিরে এই পথের চর্চা জনপ্রিয় থেকেছে। জাপানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘ইনস্টিটিউট অফ সিল্ক রোড স্টাডিস’। গত শতাব্দীর নয়ের দশক থেকে এই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জার্নাল প্রকাশিত হয় যা সিল্ক রোড সম্বন্ধীয় বিভিন্ন গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এই গবেষণাগুলির মাধ্যমে সিল্ক রুটের অবস্থান ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব সম্পর্কে চিরাচরিত ধ্যান ধারণাগুলি ক্রমশ বদলাচ্ছে। সিল্ক রুট নিয়ে জানা-শোনা এগোতে থাকে একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাথায় বাড়তে থাকে কিছু অসম্পূর্ণ প্রশ্ন।
প্রথমত, মনে করা হয় এটি এশিয়ার চীন এবং ইউরোপ মহাদেশের রোম সাম্রাজ্যের মধ্যেকার একটি বহুল ব্যবহৃত বাণিজ্য পথ যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত থেকেছে। ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা’ সহ আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমন্বিত যেকোনো সার্চ ইঞ্জিনও এই বিষয়টিকেই প্রধান বিবেচ্য বলে তুলে ধরে। কিন্তু এই বক্তব্য যেমন একরৈখিক তেমনই অর্ধসত্য। চীন এবং রোমের মধ্যে বাণিজ্যের পথ হল সিল্ক রুট এই ধারণা প্রথম আমাদের সামনে উপস্থিত করেন ভৌগলিক, পর্যটক ব্যারন ফার্দিনান্দ রিখটোফেন। কয়লাখনি জরিপ এবং বন্দর খোঁজার কাজে ১৮৬৮-১৮৭২ চীনে ছিলেন এই জার্মান ভূগোলবিদ। পশ্চিম চীন উপকূলবর্তী জার্মান প্রভাবিত শহর শানডং থেকে জিয়ান অঞ্চলের কয়লাখনিগুলি ছুঁয়ে জার্মানি পর্যন্ত রেলপথের নকশা তৈরি করার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। ১৮৭৭-১৯১২, পাঁচ খণ্ডে প্রকাশ পায় তাঁর অসম্পূর্ণ রিপোর্ট, যা তিনি দেখে যাননি। ওই পাঁচ খণ্ডের রিপোর্টে Die Seidenstrasse বা ‘সিল্ক রোড’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন রিকটোফেন। তাঁর মানচিত্রের সিল্ক রোড ইউরেশিয়ার বুক চিরে যাওয়া সোজা রেললাইনের মত। আর এই সরলরৈখিক ভাবনাই মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। সিল্ক রোড দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে শুধু বাণিজ্য যোগাযোগ ঘটিয়েছে, এ পথের দাবী শুধুই অর্থনীতির—এই অর্ধসত্য আড়াল করে দেয় ভারতসহ প্রাচ্যের বিরাট ভূমিকাকে, এশিয়ার প্রতিভূ চীন—ইউরোপের প্রতিভূ রোমের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক আড়াল করে রাখে ভারত সহ দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার ভূগোল, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে। আর এখানেই হাতে আসে এমন এক চমৎকার বই যা নিজের শিকড়কে খুঁজে পেতে সাহায্য করে। সিল্ক রোড পড়তে বসে তাই অবশ্যপাঠ্য উইলিয়াম ডালরিম্পল লিখিত ‘দ্য গোল্ডেন রোড’।
যীশুখ্রিষ্টের জন্মের কয়েক শতাব্দী আগে থেকে মৌর্য সম্রাটরা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আজকের আফগানিস্তান-ইরান পর্যন্ত। প্রশাসনিক-অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক ধারা প্রসারিত হয়েছিল বহু প্রাচীনকাল থেকে। মৌর্যযুগে উত্তর ভারতের সমভূমির অন্তর্গত পাটলিপুত্র, গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চলে অবস্থিত মগধ, পঞ্চনদ বিধৌত অঞ্চলের গান্ধার-তক্ষশীলা হয়ে আজকের ইরান পর্যন্ত ছড়ানো পথের কোনো উল্লেখ থাকে না সিল্ক রোডের একরৈখিক নকশায়। চীনের সঙ্গে রোমের বাণিজ্য সম্পর্ক প্রকাশের অবকাশে আড়াল হয়ে যায় বহির্বিশ্বের সঙ্গে ভারতের সুপ্রাচীন বাণিজ্য সম্পর্ক, যার প্রাচীনতম প্রমাণ পাওয়া যায় সিন্ধুসভ্যতার সময় থেকেই। সিন্ধুসভ্যতার সময় থেকে হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর অধিবাসীরা ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে। নিবিড় বাণিজ্য সংযোগ, অতি ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল দুই দেশের মধ্যে। বাণিজ্য প্রয়োজনে এমনকি মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে বণিক মেলুহাদের জন্য তৈরি করে দেওয়া নগর বসতিরও প্রমাণ পাওয়া যায় অনেকটা আজকের সময়ের special economic zone (SEZ) অনুকরণে। আজ থেকে প্রায় ৪.৫ হাজার বছরেরও আগে উত্তর-পশ্চিম ভারতের পাকিস্তান-আফগানিস্তানের ল্যাপিসলাজুলি, কর্ণেলিয়াম, খনিজ লবণ সহ বিভিন্ন দামি রত্ন রপ্তানি হত মধ্যপ্রাচ্যে অন্তমহাদেশীয় স্থল ও জলপথ ব্যবহার করে। অনুল্লেখিত থেকে যায় এই বিষয়গুলি।

চিত্র ১ – উইলিয়াম ডালরিম্পল লিখিত ‘দ্য গোল্ডেন রোড’ বইয়ের প্রচ্ছদ।
সিল্ক রোড এই নামকরণের মধ্যে দিয়েই প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয় নির্ধারণকারী মানসিকতার, বলা হয়ে থাকে চীনের রেশম ছিল ইউরোপের কাছে মহার্ঘ্য এবং এই রেশমের আকর্ষণে সিল্ক রুটের প্রাচুর্য। বলা হয়ে থাকে, রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ান দুই সন্ত দূতকে ষষ্ঠ শতকে গোপনে চীন থেকে রেশম কীট চালান করতে প্রেরণ করেছিলেন। আশ্চর্যের যা, তা হল প্রত্নতাত্ত্বিক, পুঁথিগত সাক্ষ্য যা কিছু রয়েছে সেগুলিতে হান আমলের চীনের সঙ্গে রোমের সরাসরি বাণিজ্যিক যোগের কোনো প্রামাণ্য নথি নেই। জানা যায় তখন পাশ্চাত্যে এবং ভারতে অনেক বেশি চাহিদা চীনা কাগজ, কাঁচের বাসন, চীনামাটির বাসনপত্রের।
আর সিল্ক বাণিজ্যের এই ঢক্কানিনাদের পেছনে চাপা পড়ে যায় আমাদের বাংলার কথা, চাপা পড়ে যায় মসলিনের কথা। হেলেনীয় যুগের যত ভাস্কর্য এখনও পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই সেগুলিতে ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় স্বচ্ছ মসলিন পোশাক—সিল্ক নয়। রোমের অভিজাত মহিলা এবং পুরুষ উভয়ের কাছেই আকর্ষণের বস্তু ছিল এই মসলিন; সিল্ক নয়। রোমান ইতিহাসবিদ প্লিনি, স্ট্রাবো প্রমুখরা যেভাবে বহির্বাণিজ্যের জন্য রোমের স্বর্ণমুদ্রা ভাণ্ডার শেষ হয়ে যাবার আর্তনাদ করছেন তা যদি সিল্কের জন্য হত তবে আজকের চীনে আবিষ্কৃত হত বিপুল রোমান স্বর্ণমুদ্রা; তা কিন্তু আজও পাওয়া যায়নি।
অন্য দিকে রোমের পরেই যে দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি রোমান স্বর্ণমুদ্রা ভাণ্ডারের অস্তিত্ব মিলেছে তা হল ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রগুলিতে। এ থেকে পরিষ্কার হয় রোমের বাণিজ্য প্রাচীন ভারতের সঙ্গে চীনের তুলনায় অনেক বেশি ছিল এবং এই বাণিজ্যে সর্বপ্রধান ভূমিকা নিত মসলিন উৎপাদনকারী বাংলা।
সিল্ক রোড সংযুক্ত করে চীন এবং রোমকে; এই আধিপত্যকারী মতবাদে প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হয় চীনের তাকলামাকান মরুভূমি পার হয়ে আসা তিয়েনসান পর্বতমালা, হিন্দুকুশ পর্বতমালা এবং মধ্যবর্তী প্রধান কয়েকটি গিরিপথের উপর। খাইবার, জোজিলা ইত্যাদি কয়েকটি গিরিপথের উপর আলোচনা করা হয়, তবে অন্ধকারে থাকে শিবালিক হিমালয়ে জুড়ে অবস্থানকারী আরও বহু বহু গিরিপথ এবং তাদের ভৌগোলিক গুরুত্বকে। অথচ মানচিত্র অনুসরণ করলে দেখা যায় চীন ও তিব্বত থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে স্থল ও জলপথের অনুসন্ধানে প্রধান পথ হচ্ছে হিমালয় পর্বতমালা অতিক্রম করা শত শত গিরিপথ বা দুয়ার।
প্রকৃতপক্ষে ৩২৭ সাধারণ পূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ ইউরোপ ও এশিয়ার স্থল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করে। সৈন্যবহরের সঙ্গে সঙ্গে আলেকজান্ডার এনেছিলেন কয়েকশত ইতিহাসবিদ, লেখক, শিল্পী ও চিত্রকরকেও। তাঁদের লেখা ও রেখায় ম্যাসিডোনিয়া থেকে হরপ্পীয় সভ্যতা পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চল, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মানব সভ্যতার যাপনচিত্র লিপিবদ্ধ হয়। একই সঙ্গে মহাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য মহাদেশ পর্যন্ত যাতায়াতের নতুন নতুন পথ প্রসারিত হয়। হরপ্পীয় সভ্যতার সঙ্গে মেসোপটেমিয়ার স্থলবাণিজ্য পথও এসময় পুনরুজ্জীবিত হয়। সেলুকাসের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের কূটনৈতিক সম্পর্ক যেমন এই অঞ্চলে মৌর্য সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটায় তেমনি বাণিজ্য ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটায়। অশোকের সময় ধম্ম সংস্কৃতি তাজিকিস্থান, কিরঘিজস্থান বা ট্রান্স-অক্সিয়ানা হয়ে পৌঁছে যায় ইউরল পর্বতের পাদদেশ পর্যন্ত। ধর্মসংস্কৃতি এবং বাণিজ্য একই পথ ধরে পাড়ি দেয় এক সভ্যতা কেন্দ্র থেকে আরেক সভ্যতার দিকে। উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা বাণিজ্য সম্ভাবনাকে বহুগুণ প্রসারিত করে। এজন্য আমরা মৌর্য শাসনামলে দেখি গোটা উত্তর ভারতীয় সমভূমিকে সংযুক্ত করে রাখা অপর বিখ্যাত পথ ‘মৌর্য উত্তরাপথ’ যা আজকের চট্টগ্রাম থেকে শুরু হয়ে পাকিস্তানের পেশোয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রসঙ্গত ষোড়শ শতাব্দীতে এই পথটিকেই সংস্কার করে ও সরাইখানা প্রভৃতির প্রবর্তন করে শের শাহ বাণিজ্য সম্ভাবনাকে সুগম করেন। প্রসঙ্গত ভারতের পূর্ব অংশ তথা আজকের বাংলাদেশ থেকে পাওয়া মহাস্থানগড় লিপি প্রমাণ করে তৎকালীন মৌর্য শাসন এই অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল—ডুয়ার্স পথগুলি মৌর্য উত্তরাপথের সঙ্গে সম্পর্করহিত ছিল এমনটা ভাবা কষ্টকর বটে। এই সংযুক্ত জালিকাকার পথবিন্যাসের কোনো ধারনা আমাদের দিতে পারে না চিরাচরিত সিল্ক রোড। অনুল্লেখিত থাকে ‘দুয়ার’ পথগুলির অবস্থান আর তাদের সম্ভাবনা।
সিল্ক রুটের চিরাচরিত ধারণা এমন চিত্র উপস্থিত করে যেখানে সিল্ক রোড শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবস্থানকারী একটি শাশ্বত মঞ্চ; যেখানে অবিরাম ব্যবসায়িক প্রবাহ চলছে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে। এখানেই সিল্ক রোডের দৈশিক অবস্থানগত ব্যাখ্যার দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
আদতে ৩১ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ, রোমান সম্রাট অগস্টাসের মিশর বিজয়ের মধ্যে দিয়ে ভূরাজনীতি এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। এর মাধ্যমে রোম সাম্রাজ্য সরাসরি যুক্ত হয় আফ্রিকা মহাদেশের উত্তরাংশ এবং পর্যায়ক্রমে ইউরোপের সুদূর পূর্ব তথা এশিয়া মহাদেশের পূর্ব প্রান্তের সঙ্গে। তাৎক্ষণিক ফল হিসেবে লোহিতসাগর-পারস্য উপসাগর হয়ে, আরবের মরুভূমি পার হয়ে মৌসুমী বায়ুর পথ ধরে সামুদ্রিক পথে বাণিজ্য দ্রুত বাড়তে থাকে। ভূমধ্যসাগর ধীরে ধীরে রোমান সাম্রাজ্যের হ্রদে পরিণত হয়। বাণিজ্যতরীগুলিও উল্লেখিত পথ ধরে ভারতের দিকে অধিক সংখ্যক আসতে থাকে। এজন্যই এ সময়কালে আমরা পাই পেরিপ্লাস গ্রন্থে অজ্ঞাত নাবিকের বিবরণ, দেখি টলেমি বর্ণনা করেছেন বাংলায়-গঙ্গে নৌ-সমুদ্র বন্দরের মোহনা। আবার ৪০ সাধারণাব্দ নাগাদ চীন থেকে আসা কুষাণ রাজারা তাঁদের রাজধানী স্থাপন করেন গান্ধার অঞ্চলে। হিন্দুকুশ কারাকোরাম এবং ইরানের মালভূমির সংযোগস্থলে এই রাজবংশ দ্রুত প্রভাব বাড়াতে থাকে ভারতের সমভূমির দিকে। উপস্থিত হয়ে মথুরা অঞ্চলে পাল্লা দিয়ে এই অঞ্চলে তাই বাড়তে থাকে স্থল বাণিজ্য। জোরদার হয় সিল্ক রুটের কারবার। তবে একি ছিল শুধুমাত্র বাণিজ্যিক যোগাযোগ?
২

সিল্ক রুটের চিরাচরিত বর্ণনা যেমন এর বহুমাত্রিক উপস্থিতিকে এবং বিভিন্ন অংশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয় তেমনি ব্যর্থ হয় অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গে ধর্ম সংস্কৃতির ব্যাপনের ধারণা প্রদানেও। প্রচলিত ধারণা ব্যর্থ হয় ‘দুয়ার’ পথগুলির ধারণা দিতে। উত্তর ভারতের সমভূমি, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং হিমালয়ের পাদদেশের ‘দুয়ার’ পথগুলি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য পথ হিসেবে শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে উজ্জ্বল করে রেখেছে ভারত-চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জীবনপ্রবাহ ও সংস্কৃতিকে। আর এখানেই পাওয়া যায় আর এক মহাগ্রন্থের সন্ধান। তানসেন সেনের লেখা ‘Buddhism, Diplomacy, and Trade’। অসাধারণ এই গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে তথাকথিত সিল্ক রুটের অংশ না হয়েও নেপাল-তিব্বত-কামরূপের ‘দুয়ার’ পথগুলি ধরে বাণিজ্যের সঙ্গে ধর্ম-সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে দেশ থেকে দেশান্তরে। দেখিয়েছেন, ভারত ও চীনের যোগাযোগ সাধারণাব্দের প্রথম শতাব্দী পর্যন্ত ছিল মূলত সামরিক ও বাণিজ্যিক—ধর্মীয় নয়। কুষাণকালে গান্ধার অঞ্চল দিয়েই প্রধানত যোগাযোগ রক্ষিত হত। কুষাণরাজ কনিষ্কের আমলে বৌদ্ধ সংহিতির অনুষ্ঠান এবং বৌদ্ধধর্মের বিকাশ হয়। তখন চীনে বাণিজ্যের পথ ধরে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে ধর্মীয় প্রচার। কুষাণ অধিকারে মথুরা যাবার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সমভূমির এক বৃহৎ অংশ, তিব্বত-পথ, পূর্ব হিমালয় সংলগ্ন মায়ানমার-ইউনান পথ ক্রমশ উজ্জীবিত হতে থাকে। মরুভূমির মধ্যে দিয়ে যাওয়া সিল্ক রুটের প্রচলিত পথের সাথে এই পথগুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকে।
চতুর্থ শতাব্দীতে রোম সাম্রাজ্যের পতন, পরবর্তীকালে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজশক্তি হিসেবে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর সিল্ক রুট প্রবাহ অনেকাংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে চীনের তাং সাম্রাজ্য, উত্তর ভারতে হর্ষবর্ধনের রাজত্ব, পূর্ব হিমালয় অঞ্চলে কামরূপে ভাস্করবর্মার রাজত্ব এবং তিব্বতে ত্রং-ৎসেন-গাম্পোর রাজত্ব এক নতুন রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক সমীকরণ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, পশ্চিমে আরব শক্তির উত্থান মরুভূমি পথকে অনেকাংশে বিপদসংকুল ও অনিশ্চিত করে তোলে। ফলে পশ্চিমমুখী পথের তুলনায় পূর্ব হিমালয় হয়ে ভারত-চীনের মধ্যেকার পরস্পরিক সম্পর্ক অগ্রসর হতে থাকে। হর্ষবর্ধন চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন, একই সঙ্গে কামরূপ রাজ ভাস্করবর্মার সঙ্গেও শক্তিজোট অক্ষুন্ন রাখেন। ফলে চীনের সঙ্গে উত্তর ভারত ও পূর্ব ভারতের সম্পর্ক বিকশিত হতে থাকে। পূর্ব হিমালয়ের বিভিন্ন গিরিপথ এবং ‘দুয়ার’ পথগুলির ক্রমশ গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই সময়কালে ভারত-চীনের মধ্যেকার সম্পর্কের প্রতিফলন দেখা যায় চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাংয়ের ভারতভ্রমণে। হর্ষবর্ধনের রাজত্ব পরিদর্শনের পাশাপাশি তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন কামরূপ রাজ ভাস্করবর্মার রাজত্বেও। মরুভূমির মধ্যে দিয়ে বিস্তৃত মধ্য এশিয়ার সিল্ক রুটের প্রভাব এই সময় যেমন কমতে শুরু করে পক্ষান্তরে নেপাল-তিব্বত পথ, পূর্ব হিমালয়, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার পথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। সপ্তম শতকে বহু বৌদ্ধ তিব্বতের পথ ধরে সংক্ষেপে ভারতে আসতেন। এই পথে যাতায়াতই ছিল সহজতর।
তিনি দেখান, সপ্তম শতকের পর থেকে নেপাল এবং পূর্ব হিমালয়ের পথে তিব্বতের সঙ্গে যোগাযোগ দুর্বল হতে থাকে। এর মধ্যে প্রথম ও প্রধান কারণটি ছিল শক্তিশালী সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে তিব্বতের উত্থান। তিব্বতের রাজার নেতৃত্বে তিব্বত দ্রুত একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে যার ফলে তিব্বতের পথ ধরে ভারত ও চীনের মধ্যেকার যোগাযোগ হ্রাস পায়। একই সঙ্গে নবম-দশম শতক থেকে চীনে বৌদ্ধধর্ম স্থানীয় সংস্কৃতি ও বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করে নিজস্ব চৈনিক ঘরানা লাভ করে। ফলে ভারত থেকে বৌদ্ধধর্মের আদানপ্রদান কমে যায়।
বলা যেতে পারে এই সময়কার বিশ্বে বৌদ্ধধর্মের তিনটি ভরকেন্দ্র তিনটি পৃথক বৈশিষ্ট্যসহ বিরাজমান ছিল। একটি বাংলার বৌদ্ধধর্ম যা বজ্রযান-মন্ত্রযান-সহজযান প্রভৃতি ধারায় স্বতন্ত্রভাবে বিকশিত হতে থাকে, অন্যটি চীনের বৌদ্ধধর্ম যা চীনের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিকশিত হতে থাকে, অপর ভরকেন্দ্র ছিল জাপান।
অন্যদিকে একই সময়ে মধ্যে এশিয়ায় আরব শক্তির উত্থান, তুর্কি শক্তির উত্থান, তাদের মধ্যকার রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বন্দ্ব ট্রান্স-অক্সিয়ানা পথ ধরে চীন ও ভারতের পশ্চিমমুখী বাণিজ্য সংস্কৃতির প্রবাহকে অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। পক্ষান্তরে তুর্কি শাসকদের এই সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক শক্তির চালিকাশক্তি হিসেবে উপনীত হতে দেখা যায়। দাস বংশ ও খলজি বংশের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তুর্কি সাম্রাজ্য পদ্মানদীর সীমানা পর্যন্ত উপস্থিত হয়—ত্রয়োদশ শতাব্দীর একেবারে প্রথম প্রান্তে তুর্কি শাসক বক্তিয়ার খিলজি বাংলার পথ ধরই তিব্বত অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এই সময়ই তিনি দেখেছিলেন বাংলা-কামরূপ ও তিব্বতের মধ্যে পঁয়ত্রিশটি ‘দুয়ার’ পথের অস্তিত্ব।
উপরিক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় মধ্য ও পূর্ব হিমালয়ের ‘দুয়ার’ পথগুলি ধরে চীনের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সম্পর্ক বিশ্লেষণে সিল্ক রোডের চিরায়ত ধারণা যেমন বহুলাংশে অপ্রকাশিত থেকেছে তেমনি এই ‘দুয়ার’ পথগুলির সম্যক প্রকৃতি বিশ্লেষণেও যথেষ্ট গবেষণার অভাব রয়েছে। ‘দুয়ার’ পথগুলির প্রাকৃতিক অবস্থান বিবেচনা করলে বা ‘দুয়ার’ পথগুলিকে পর্বত এবং সমভূমির মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে গ্রহণ করলে পথগুলির সামগ্রিক প্রকৃতি অনুসন্ধানে আমরা অসমর্থ হব। প্রকৃতপক্ষে এই ‘দুয়ার’ পথগুলি শুধুমাত্র বাণিজ্য পথ নয়, বাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে এই পথগুলি ধর্মের যোগাযোগ-সংস্কৃতির যোগাযোগ গড়ে তুলেছে; যে যোগাযোগের মধ্যে দিয়ে আলাদা আলাদা ভৌগোলিক অঞ্চলের জনসমাজ পরস্পরের সঙ্গে সভ্যতার সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটিয়েছে, ধর্মীয় সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটিয়েছে, পথগুলির মাধ্যমে গঠিত হয়েছে এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ভূমিক্ষেত্র—’দুয়ার’ পথগুলির নিকটবর্তী জনপদগুলি সাংস্কৃতিক ব্যাপন কেন্দ্র হিসেবে যেমন ভূমিকা পালন করেছে তেমনি সীমান্ত বাজার হিসাবেও ভূমিকা পালন করেছে।
৩
সিল্ক রোড সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার সীমাবদ্ধতা আরও একবার প্রকাশ করে দেয় প্রাকৃতিক উপাদান যেমন পাহাড়, নদী এবং মানবীয় উপাদান যেমন নগর বা সড়ক পথ শুধুমাত্র অস্তিত্ব নির্ভর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পারস্পরিক আদান-প্রদানের গল্প। আর এখানেই পরিষ্কার ফুটে ওঠে ভৌগলিক ডোরিন ম্যাসি-র সম্পর্কিত স্থানের (relational space) ধারণা।

চিত্র ৩ – ডোরিন ম্যাসি-র ‘ফর স্পেস’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ।
দুয়ার পথের নিরিখে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যের সম্যক বিশ্লেষণে প্রাকৃতিক অবস্থান এবং মানবীয় কার্যাবলী, যার মধ্যে রয়েছে, বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক আদান-প্রদান, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান—সমস্ত কিছুকেই পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ডুয়ার্স পথগুলির অবস্থান শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নয়, শুধুমাত্র উচ্চতা, উষ্ণতা বা দৈর্ঘ্য প্রস্থের হিসাবজ্ঞাপক সংখ্যা নয় বরং এই পথগুলির গুরুত্ব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলাচল করা বণিক-তীর্থযাত্রী-জনসমষ্টির যোগাযোগরক্ষাকারী প্রক্রিয়া রূপে। ‘দুয়ার’পথের অবস্থান কোনো নির্দিষ্ট মঞ্চ নয় বরং এই ‘দুয়ার’পথের প্রকৃতি নির্ধারিত হয় প্রাকৃতিক এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ফলে। দৈশিক অবস্থান সর্বদাই পারস্পরিক আদান-প্রদানের ওপরে নির্ভর করেই তাঁর নিজস্ব প্রকৃতিকে নির্ধারণ করে। লেখক বলেছেন—
Space (location) is constituted through interactions।
‘দুয়ার’ পথগুলির অবস্থান শুধুমাত্র পর্বত সমভূমি মধ্যবর্তী ফাঁকা অংশ নয়, এগুলি চীন-তিব্বত-কামরূপ-বঙ্গের মধ্যে যোগাযোগের, আদানপ্রদানের চলমান প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে তিব্বতের মালভূমি-ভারতের বৃহৎ সমভূমি-মায়ানমার এর পার্বত্য পথ; এগুলির মাধ্যমে উন্মুক্ত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্র উপকূল। এই সমগ্র প্রাকৃতিক পরিবেশকে সচল রেখেছে পথগুলির মধ্যে দিয়ে চলা সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান। প্রাকৃতিক উপাদানগুলিকে বস্তুগত দৈশিক অবস্থান রূপে চিহ্নিত করে যদি আমরা এর মধ্যবর্তী ক্রিয়াকলাপগুলিকে চিহ্নিত করতে পারি তাহলে দেখব, ডুয়ার্সের প্রাকৃতিক পরিবেশ এখানে সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার আধার হিসেবে কাজ করছে। এটির গুরুত্ব ‘সম্পর্কিত স্থান’ হিসাবে। বিবিধ পরিসংখ্যান বা জিপিএস ম্যাপ প্রজেকশন এই ধরনের space এর আংশিক পরিচয় নির্ধারণে সহায়ক কিন্তু প্রয়োজন এই ‘সম্পর্কিত স্থান’-কে সামগ্রিক প্রক্রিয়া রূপে চিহ্নিত করা। আবার এই ‘সম্পর্কিত স্থান’-র ধারণার সঙ্গে ‘স্থানিক অভিজ্ঞতা’কে সংযুক্ত করাও প্রয়োজন।
ডুয়ার্স পথের আলাদা আলাদা ভৌগোলিক অংশের জনসমাজ তাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী ডুয়ার্সকে দেখেছে, তিব্বতি বণিকের দল তাদের অভিজ্ঞতায় ডুয়ার্সকে একরকম দেখেছেন, আবার চীন থেকে আগত ভ্রাম্যমান তীর্থযাত্রী বণিকের দল ডুয়ার্সকে আলাদা সম্পর্কের ভিত্তিতে দেখেছেন৷ একই রকম ভাবে বাংলা বা ভারতের বণিকেরাও ডুয়ার্সকে দেখেছেন তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। এখানে আলাদা জনসমষ্টির কাছে, নিজস্ব সংস্কৃতির কাছে দুয়ার কিভাবে প্রতিনিধিত্ব করেছে তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
৪
পরিশেষে বলা যায়, সামগ্রিকভাবে বণিক দল, তীর্থযাত্রী, পণ্য উপাদান, আদানপ্রদান সবই এই ডুয়ার্সের পথের উপাদান। এগুলি সম্মিলিতভাবে গঠন করেছে এক স্থানিক প্রক্রিয়া। সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যের ধারণায় তাই ডুয়ার্স শুধু অঞ্চল বা অঞ্চল মধ্যবর্তী পথ নয়; পণ্য আদানপ্রদান, ধর্মের গতায়ত, সংস্কৃতির আদান-প্রদান, বণিক ও তীর্থযাত্রীদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এক সম্মিলিত প্রক্রিয়া। আগামী দিনে আলোচনায়, এই সামগ্রিকতাই কাম্য।
তথ্যসূত্র
১) Wlliam Dalrymple, The Golden Road: How Ancient India Transformed the World, Bloomsbury, 2024.
২) Tansen Sen, Buddhism, Diplomacy, and Trade—The Realignment of Sino-Indian Relations, 600-1400, Manohar, 2004.
৩) Doreen Massey, For Space, SAGE Publications Ltd, 2005.