স্টোনহেঞ্জ – প্রস্তরযুগের মাঝে একটি দিন
সূর্যের শীতকালীন অয়নান্ত বা উইন্টার সলস্টিস হল বছরের ক্ষুদ্রতম দিন – তিন দিন এক জায়গায় থেমে থাকার পর আবার সূর্যের উত্তরমুখী চলন শুরু হয়। সূর্যের উদয়স্থান একটু একটু করে উত্তর দিকে এগোতে থাকে, আর দিনের দৈর্ঘ্যও বাড়তে থাকে। সূর্যের এই উত্তরায়ণকে বিভিন্ন ভাবে উদযাপন করত মানুষ। বাঙালির ইতুপূজা উৎসব বা অতীতের বৈদিক গবাময়ন যজ্ঞ – মোটামুটি এই দিনটারই আশেপাশে। মকর সংক্রান্তি অতীতে এই দিনই হত- একুশে ডিসেম্বরের আশেপাশে। জার্মানদের ইউলটাইড বা রোমানদের সূর্যপূজা – সোল ইনভিক্টাস উৎসবও এই উত্তরায়ণের উদযাপন আর ক্রিসমাসের উৎস এই সোল ইনভিক্টাস উৎসব থেকেই। কিন্তু এইসব উৎসবের অনেক আগে, আজ থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগে, ব্যাবিলন-মিশরের জ্যোতির্বিদ্যা ইংল্যান্ডে তখনও পৌঁছায়নি – স্টোনহেঞ্জে নব্যপ্রস্তর যুগের মানুষ তৈরি করেছিল গ্রীষ্ম ও শীতকালীন অয়নান্ত মাপার ব্যবস্থা- কয়েকটি পাথরের স্তম্ভ ব্যবহার করে।
এই স্টোনহেঞ্জ দেখতে দূর ভারতবর্ষ থেকে ইংল্যান্ডে আসা। লণ্ডনে আমরা ছিলাম শহরের একদম পুবদিকে – অল্ডগেট ইস্ট স্টেশনের কাছে। সেখান থেকে দুটো টিউব রেল বদলে ওয়াটারলু স্টেশন – তারপর সেখান থেকে দূরপাল্লার ট্রেন ধরে সালসবারি (Salisbury) স্টেশন – ঘন্টা দেড়েকের যাত্রা। সালসবারি স্টেশন থেকে বাস আগে থেকেই বুক করা ছিল। বাসের চালকই স্টোনহেঞ্জে ঢোকার টিকিট দেন। দোতলা বাস- একটু দৌড়ঝাঁপ করে উপরতলার জানালার সীট পেলে যাত্রাপথের দৃশ্য ভালোভাবে দেখা যায়। এই সালসবেরি শহরটার নিজেরই একটা ইতিহাস আছে, অন্তত আটশো বছর পুরোনো অনেক বাড়ি এখানে আছে – এগুলো দেখতে দেখতে চলে এলাম কৃষিজমির মাঝে। আধ ঘন্টা যাত্রার পর বাস এসে থামলো স্টোনহেঞ্জ ভিজিটর সেন্টারে। এখান থেকে স্টোনহেঞ্জ দেখা শুরু – অথচ দূর দূরান্তে কোনো পাথর নেই। চারদিক সবুজে ঢাকা। এর মধ্যে কী করে স্টোনহেঞ্জ হতে পারে? তবে এই আশ্চর্য লাগাটা অস্বাভাবিক নয় – সেটা পরে টের পেয়েছিলাম। কারণ বাস্তবেই স্টোনহেঞ্জের পাথরগুলো স্থানীয় নয়। কিছু এসেছে কুড়ি কিলোমিটার দূর থেকে, কিছু এসেছে কয়েকশো কিলোমিটার দূর থেকে সমুদ্র পেরিয়ে। প্রস্তরযুগের অসভ্য প্রযুক্তিহীন মানুষ এরকম কাজ করল কী করে? এটা সত্যিই ভাবায়।
ভিজিটর সেন্টার থেকে কিন্তু স্টোনহেঞ্জ দেখা যায় না, স্টোনহেঞ্জের মূল অংশটা ভিজিটর সেন্টার থেকে আরো দুই কিলোমিটার মতো – হেঁটে যাওয়া যায়, শাটল বাসও আছে। আমরা শাটলেই উঠলাম। শাটল থেকে নেমে প্রথম দেখা দিল স্টোনহেঞ্জের পাথরগুলো। একবার মনে হল, এ তো শুধু ডজনখানেক পাথর, খুব সুবিন্যস্ত ভাবে বসিয়েছে তাও নয়, অথচ সেই নিয়ে এত মাতামাতি! কিন্তু পিরামিড কী? সেও তো একগুচ্ছ পাথরের স্তূপ। তাহলে পিরামিড নিয়ে আমাদের এত উৎসাহ কেন? কারণ ষাট লক্ষ টন পাথর দূর দূর থেকে, এমনকি আটশো কিলোমিটার দূর থেকে এনে, সাড়ে চারশো ফুট উচ্চতা অবধি তুলে গিজা পিরামিড তৈরি করা হয়েছিল। প্রযুক্তি আর পরিকল্পনার ঔৎকর্ষ আর বিপুল পরিশ্রম পিরামিডের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। তাই আমরা বিস্ময়ভরে তাকে দেখি। স্টোনহেঞ্জ এত বড় কর্মযজ্ঞ নয়, কিন্তু পিরামিড যে যে কারণে আমাদের বিস্মিত করে, স্টোনহেঞ্জও সেই সেই কারণেই বিস্মিত করতে পারে। স্টোনহেঞ্জের কর্মকাণ্ড বোঝার আগে, স্টোনহেঞ্জ দেখা শুরু করা যাক।
সবার প্রথমে পাথরের সুবিশাল স্তম্ভগুলো হাতছানি দিলেও, স্টোনহেঞ্জ দেখা শুরু করতে হয় চোখটাকে একটু নামিয়ে মাটির দিকে রেখে। মাটির দিকে তাকালে দেখতে পাবেন স্টোনহেঞ্জের চারদিকে গোল করে তৈরি একটা পরিখা। এখন পরিখাটা ঘাসে ঢেকে গেলেও স্পষ্ট বোঝা যায় যে একটা বিশাল বৃত্তাকার পরিখা বানানো হয়েছিল। এই পরিখা কিন্তু স্টোনহেঞ্জের থেকেও পাঁচশো বছর পুরোনো – ৩০০০ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ তৈরি। কেন খোঁড়া হয়েছিল এই পরিখা? এই পরিখা আসলে জীবিত আর মৃতের দুই জগতের সীমারেখা। এই পরিখার ভিতরে সমাধিস্থ করা হত শবদাহের পর থেকে যাওয়া অস্থিভস্মকে। ছোটো ছোটো গর্ত খুঁড়ে এই ভস্মগুলিকে তার মধ্যে ভরে সমাধিস্থ করা হত, এই পরিখার ভেতরে।
কিন্তু এই পরিখার ভিতরেই কেন? জানা নেই, পরিখার ভিতরের অংশটা প্রাকৃতিকভাবেই একটু উঁচু ঢিবি, তাই হয়তো মানুষ ভাবত ঐ জায়গাটার কোনো আধ্যাত্মিক শক্তি আছে। এখনও এরকম কয়েকটা গর্তকে সংরক্ষণ করা হয়েছে – কাঁচ দিয়ে ঢাকা। এরকম ভস্মসমাধির গর্ত শ-দেড়েক এখানে পাওয়া গেছে – মোটামুটি পাঁচশো বছরে মাত্র দেড়শো জন মানুষ সুযোগ পেয়েছে এই পরিখার গণ্ডির ভিতরে সমাধিস্থ হওয়ার – তাদের সিংহভাগই পুরুষ। তাই অনুমেয় যে সমাজের সবচাইতে প্রভাবশালী অংশই সুযোগ পেত এখানে সমাহিত হবার।

চিত্র ১
যাই হোক, পরিখা পেরিয়ে এবার মূল স্টোনহেঞ্জ দেখার পালা। অনেকগুলি উল্লম্ব পাথর, সেগুলোর উপর আনুভূমিক পাথর। একেকটা পাথর তেরো ফুট উঁচু, সাত ফুট চওড়া, অর্থাৎ আড়াই মানুষ সমান উচ্চতা, আর কমপক্ষে এক মানুষ সমান প্রসার। উল্লম্ব পাথরের অবলম্বনের উপর আনুভূমিক পাথর বসিয়ে একটা বিশাল বৃত্তাকার বেদি মতোন বানানো হয়েছিল – এখনও তার আকার কিছুটা বোঝা যায়। লেখা দেখে জানতে পারলাম তিরিশ টন করে একেকটা পাথরের ওজন। এই পাথরগুলো হল ‘সারসেন’ নামক এক ধরনের বেলেপাথর। এদের আনা হয়েছিল পঁচিশ কিমি দূরের উইল্টশায়ার থেকে – সম্ভবত স্লেজে করে, কাঠের স্লেজের নিচে রোলার জাতীয় চাকা লাগিয়ে। তখনও ওখানকার মানুষ প্রকৃত চাকার ব্যবহার জানত না।
এ তো ছিল সারসেন পাথর – যা দিয়ে বাইরের বৃত্তের নির্মাণ হয়েছিল। ভেতরের বৃত্তে আছে আরেকটু ছোটো কিন্তু শৌখিন পাথর – এদেরকে ব্লু স্টোন বলা হয়। এগুলোর আলাদাই কদর ছিল – এদের আনা হয়েছিল তিনশো কিমি দূরে ওয়েলশ উপদ্বীপের প্রেসেলি হিল থেকে। সম্ভবত সমুদ্রপথে নৌকায় করে, বাকিটা নদীপথে এবং স্লেজে। এই ব্লু স্টোন হল বিভিন্ন রকমের আগ্নেয় শিলা – এখন রং ফ্যাকাসে হয়ে গেলেও, কখনও তাদের রং নীল ছিল। কেন আনা হয়েছিল এদের অত দূর থেকে, এত পরিশ্রম করে? হয়তো এখানকার মানুষ ভাবত এই পাথরগুলোর জাদুশক্তি আছে, অথবা প্রেসেলি হিলে তাদের পূর্বপুরুষের বসত ছিল।
এই পাথর পরিবহনের গল্পের মাঝে স্টোনহেঞ্জের সময়কালের দিকে একবার তাকানো যাক। স্টোনহেঞ্জ মিশরের পিরামিডের যুগের সমসাময়িক, আর গিজা পিরামিডের তুলনায় সামান্য অর্বাচীন। কিন্তু মনে রাখতে হবে প্রযুক্তিগত ভাবে এরা সম্পূর্ণ দুই যুগের। মিশরের মানুষ ততো দিনে নবীন প্রস্তর যুগের পর তাম্রপ্রস্তর যুগ পেরিয়ে ব্রোঞ্জ যুগে উত্তীর্ণ হয়েছে, অন্যদিকে ইংল্যান্ডের মানুষ তখনও নবীন প্রস্তর যুগেই বাস করছে – সেই বিচারে দেখলে এরকম নির্মাণকার্য বিস্ময়কর। ততোধিক বিস্ময়কর হল তিনশো কিমি দূর থেকে কিছু পাথরকে বিশেষ ভাবে চয়ন করে, বিপুল পরিশ্রম করে নিয়ে আসা।

চিত্র ২
এবার আমরা স্টোনহেঞ্জকে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে অর্ধেক পরিক্রমা করে এসে উপস্থিত হলাম একটা ত্রিকোণাকার বিশাল পাথরের সামনে – এই পাথরের স্থানীয় প্রচলিত নাম হল হীল স্টোন। হীল, অর্থাৎ গোড়ালি। এটাও সারসেন পাথর – চল্লিশ টন ওজন – অনুমান করা হয় যে এই পাথরটা বাইরে থেকে আনা নয়, এখানে প্রাকৃতিকভাবেই ছিল। সম্ভবত এই পাথরের উপস্থিতি এখানে কিছুটা আশ্চর্যজনকই ছিল – তাই হয়তো এই পাথরটাকে মানুষ পুজো করত। এই পাথরটাকে মাথায় রেখেই ওরা ঐ পরিখা নির্মাণ করেছিল, অস্থিভস্মের সমাধিক্ষেত্র চয়ন করেছিল। এই পাথরটা যেমন ছিল তেমনই রাখা হয়েছিল, কোনো ঘষামাজা করে আয়তাকার বানানো হয়নি – অন্য পাথরগুলোর মতো।
যাই হোক, পাথরটার একটা অবস্থানগত গুরুত্ব আছে। এই পাথরটার সামনে দাঁড়িয়ে স্টোনহেঞ্জের কেন্দ্রের দিকে তাকালে আপনার চোখ সোজা চলে যায় দক্ষিণ পশ্চিম কোণে ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে উত্তরায়ণের প্রথম দিনের সূর্য ডোবে – অর্থাৎ ক্ষুদ্রতম দিনের সূর্য ডুবে দিন বড়ো হওয়ার সূচনা করে। আর তেমনই স্টোনহেঞ্জের কেন্দ্র থেকে এই পাথরের দিকে তাকালে চোখ যায় উত্তর-পূর্ব কোণে, দক্ষিণায়নের প্রথম দিন অর্থাৎ বছরের দীর্ঘতম দিনের সূর্যোদয়স্থানের দিকে।
এবার লক্ষ করুন স্টোনহেঞ্জের প্রস্তরযুগের মানুষের জ্যোতির্বিদ্যার মুন্সিয়ানা। পরিখাটা কিন্তু খুব সচেতনভাবে এমনভাবে খোঁড়া হয়েছিল যাতে তার কেন্দ্র আর হীল স্টোনের সংযোগকারী সরলরেখাকে বর্ধিত করলে সূর্যের উত্তরায়ণের দিনের অস্তবিন্দু আর দক্ষিণায়নের দিনের উদয়বিন্দুতে গিয়ে মিলিত হয়। ওরা তখনও ধাতুর ব্যবহার শেখেনি কিন্তু এই গণনাগুলো করতে পারত। সম্ভবত এই হীল স্টোনটাই ছিল প্রবেশপথ। এখন হীল স্টোন থেকে কেন্দ্রের দিকে তাকালে একটা তোরণ দেখা যায় – হীল স্টোন থেকে ঐ তোরণের দিকে তাকিয়ে, ঐ তোরণের ফাঁক দিয়ে বছরের শেষ সূর্যটা ওরা ডুবে যেতে দেখত। সূর্যাস্ত দেখে তারা নিশ্চিন্ত হত – সূর্য আবার ফিরে আসবে, কাল থেকে উত্তরায়ণ শুরু হবে, দিনের দৈর্ঘ্য বাড়বে। এই সমাধিক্ষেত্রে একদিকে যেমন জীবিত আর মৃতের মধ্যে সংযোগ স্থাপন হত, তেমনই হত পুরোনো বছরের সাথে নূতন বছরের। মানুষ মৃত পূর্বপুরুষের সঙ্গে দেখা করতে আসত, মৃত্যু পরবর্তী জীবনের উদযাপন করত, আহ্বান জানাতো নূতন সূর্য আর নূতন বছরকেও।
শুধু স্টোনহেঞ্জ নয়, মিশরের কার্নাক মন্দির, আয়ারল্যান্ডে নিউগ্রাঞ্জ, স্কটল্যান্ডে মেজো – বহু প্রাচীন মন্দির এবং সমাধিক্ষেত্র নির্মাণ করা হয়েছিল অয়নান্তের দিনের সূর্যোদয়ের বা সূর্যাস্তের দিকে অভিমুখ রেখে।
স্টোনহেঞ্জে বছরের ঐ শেষ দিনটাতে বিশেষ উদযাপন হত – শূকরের মাংস দিয়ে মহাভোজ – যার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও পাওয়া গেছে। এছাড়া হীল স্টোন থেকে উত্তরপূর্ব অভিমুখে একটা পথ খোঁড়া হয়েছিল – তারও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ আছে – এই পথ দিয়ে ঢুকলে উত্তরায়ণের দিনের সূর্যাস্তবিন্দু একদম চোখের সামনে থাকবে – হয়তো ঐ দিনটাতে শোভাযাত্রা করার জন্যই এই পথের নির্মাণ। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে এটাও জানা যায় যে এই পথে খুঁটি বসানো হত, খুঁটি বসিয়ে পথের প্রস্থ কমানো বাড়ানো হত – ভীড়ের নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রবেশাধিকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল উদ্দেশ্য।

চিত্র ৩

চিত্র ৪
উত্তরায়ণের মহাভোজের নজির হিসাবে যে শূকরদের হাড়গোড় পাওয়া গেছে, তাদের অস্থি আর দাঁতের আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে – এদের আনা হত ইংল্যান্ডের দূর দূরান্তের বিভিন্ন জায়গা থেকে। অর্থাৎ অনেক দূরের মানুষও এখানে এসে নববর্ষ উদযাপন করত, পশুবলি দিত। অথবা স্টোনহেঞ্জের বণিকরা দূর দূর জায়গায় গিয়ে সেখানকার শূকর তুলে বা কিনে নিয়ে আসত।
আচ্ছা, নব্য প্রস্তর যুগের মানুষ কি বাণিজ্য করত? হ্যাঁ করত, পরে সেটা প্রত্যক্ষ করেছি ইংল্যান্ড আর স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন মিউজিয়াম ঘুরে। ইংল্যান্ডের ভেতরে বাণিজ্যযাত্রার প্রমাণ রয়েছে – ফ্লিন্টের মতো মূল্যবান পাথর, যা দিয়ে উচ্চমানের অস্ত্র – যেমন ধারালো ছুরি, কুঠার ইত্যাদি তৈরি হত – সেই ফ্লিন্ট সর্বত্র পাওয়া যেত না। বিশেষ বিশেষ জায়গায় তার খনি ছিল। অতএব এই ফ্লিন্টের পরিবহণ ও বাণিজ্যিক আদানপ্রদান এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় হত। তখন মুদ্রা ছিল না, তাই বিনিময় প্রথা চলত।
ফিরে আসা যাক স্টোনহেঞ্জে। স্টোনহেঞ্জের পাথরগুলো নেহাতই তুলে এনে বসিয়ে দেয়া পাথর নয়। সেগুলোকে পিটিয়ে পিটিয়ে মসৃণ ও আয়তাকার বানানো হয়েছিল। কী দিয়ে পেটানো হয়েছিল – হ্যামারস্টোন – এগুলো কয়েক কেজি ওজনের একেকটা পাথর। সবচেয়ে বড় হাতুড়ি ছিল ১১ কেজি ওজনের। এগুলো পাথরকে প্রাথমিকভাবে সমান করার জন্য ব্যবহার হয়। আর সূক্ষ্ম কাজের জন্য ছিল ফ্লিন্টের হাতুড়ি। পাথরগুলোকে সঠিক আকৃতিতে আনার পর তাদের জোড়া লাগানো হয়েছিল – প্লাস্টার দিয়ে নয়- কাঠের তৈরি পাটাতন যেভাবে একে অপরের সঙ্গে গুঁজে জোড়া লাগানো হয়, সেভাবে – মর্টিস অ্যান্ড টেনন পদ্ধতিতে। হয়তো পাথরের স্টোনহেঞ্জের আগে একটা কাঠের স্টোনহেঞ্জ ছিল – থাকাটা খুবই স্বাভাবিক- সেটারই সম্ভবত অনুকরণ করা হয়েছিল।
এই হ্যামারস্টোনগুলো দেখা যায় স্টোনহেঞ্জ ভিজিটর সেন্টারের একটা ছোটোখাটো মিউজিয়ামে। সেখানে আরো অনেক কৌতুহলোদ্দীপক জিনিস আছে। হরিণের বিশাল বিশাল শিং – সেগুলোকে কোদাল হিসেবে ব্যবহার করে পরিখার জন্য মাটি খনন করা হয়েছিল। প্রস্তর যুগের মানুষের সাজসরঞ্জাম যে আমাদের পরিচিত প্রযুক্তির চেয়ে অনেক আলাদা – সেটা এই মিউজিয়াম দেখে বোঝা যায়। খুব স্বাভাবিক, তখনও ধাতু আবিষ্কার হয়নি।
একই কারণে পোশাক-আশাকও ছিল অন্যরকম – উত্তরীয় বাঁধার পিন তৈরি হত পশুর হাড় থেকে – এরকম পিনের নিদর্শনও সেখানে আছে।
যাই হোক, স্টোনহেঞ্জের মূল অংশ দেখার পর এবার উত্তর দিকে আমরা হাঁটা শুরু করলাম, স্টোনহেঞ্জের থেকে প্রাচীনতর ও নবীনতর কিছু নিদর্শন দেখার জন্য।
স্টোনহেঞ্জের মূল অংশ দেখার সময়ই অনেকগুলো ঢিবি চোখে পড়েছিল। ঘাসে ঢাকা হলেও, এগুলো যে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ঢিবি নয় সেটা দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল- বেশিরভাগেরই আকার আয়তন প্রায় সমান সমান, পৃষ্ঠভাগ সমতল। হেঁটে হেঁটে আমরা এলাম ঢিবিগুলোকে কাছ থেকে দেখতে। এগুলি আসলে সমাধিস্তূপ। পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন, কিংবা বৌদ্ধ স্তূপের সাথে – উদ্দেশ্য একই – প্রয়াত জনের দেহাবশেষ ধরে রাখা, তাদের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা। তবে পিরামিড বা বৌদ্ধ স্তূপের সঙ্গে পার্থক্য হলো, এই ঢিবি পুরোটাই মাটি দিয়ে তৈরি।
স্টোনহেঞ্জে পাথরের কাঠামোগুলো নির্মাণ হবার পর পরিখার ভিতরে অস্থিভস্ম সমাধিস্থ করা প্রায় বন্ধই হয়ে যায় – তবে অন্ত্যেষ্টিস্থান হিসাবে স্টোনহেঞ্জের গুরুত্ব অক্ষুণ্ন থাকে। অভিজাত পুরুষরা চিরকালই স্টোনহেঞ্জের কাছেই সমাধিস্থ হতে চাইত। আগে পরিখার ভেতরে, পরবর্তীকালে পরিখার বাইরে।
পরিখার বাইরে অবস্থিত ব্রোঞ্জযুগের এই ঢিবি বা সমাধিস্তূপগুলো আকারে বেশ বড়ো – পঞ্চাশ থেকে একশো ফুট মতো প্রসার, আর অন্তত এক মানুষ সমান উচ্চতা। এই সমাধিস্তূপগুলির সঙ্গে পরিখার ভেতরের অস্থিভস্মসমাধিগুলির পার্থক্য কোথায়? অন্তত দুটো বড়ো পার্থক্য আছে। এক, সময়কাল – এই স্তূপগুলো ব্রোঞ্জ যুগের, অর্থাৎ স্টোনহেঞ্জের মূল অংশ তৈরির কয়েকশো বছর পরবর্তীকালের। ততদিনে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ গভীরতর হয়েছে। যার ফলে, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হয়েছে। আগে শবদাহ করে অস্থিভস্মের সমাধি দেয়া হত, এখন দেহসমাধির প্রচলন হয়েছে – অর্থাৎ পুরো দেহটাকে সরাসরি কবর দেওয়া। এটা দ্বিতীয় পার্থক্য। আরেকটা পার্থক্য লক্ষণীয়। পুরোনো ভস্মসমাধিগুলো ছোটো ছোটো গর্তের মধ্যে থাকত – মৃতকে কোনো বিদায় উপহার দেয়া হত না। মৃতের ব্যবহৃত কিছু কিছু জিনিস যদিও সেখানে পাওয়া গেছে, কারণ সেগুলিকে দেহের সাথে পোড়ানো হত – যেমন উত্তরীয় বাঁধার পিন – পশুর হাড় থেকে তৈরি। উত্তরীয় পরিয়ে দাহ করা হত, আর হাড় সহজে পোড়ে না, তাই হাড়ের পিন রয়ে গেছে। কিন্তু এটা কোনো বিদায় উপহার নয় – মৃতের পোশাক মাত্র। যে চকমকি পাথর দিয়ে চিতার আগুন জ্বালানো হয়েছিল সেরকম চকমকি পাথরও পাওয়া গেছে, আর একমাত্র আভিজাত্যসূচক বস্তু বলতে পাওয়া গেছে পাথরের গদার শীর্ষদেশ। অন্যদিকে এখানকার ব্রোঞ্জ যুগের স্তূপসমাধিতে সোনার গয়না, ব্রোঞ্জের ছুরি আর মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে। স্বাভাবিক ভাবেই ব্রোঞ্জ যুগের নূতন সমাজে আরো কিছুটা বৈষম্য এসেছে – তাই কিছু মানুষ সমাধিস্থ হয়েছে তার আভিজাত্যকে সঙ্গে নিয়েই। সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, সবচাইতে অভিজাত পুরুষরাই স্টোনহেঞ্জের পবিত্রস্থলের কাছাকাছি সমাধিস্থ হবার সুযোগ পেত – বড়ো বড়ো স্তূপ ও বিদায় উপহারের আয়োজন তাদের জন্যই হত। নারীর অবস্থান কেমন ছিল? নব্যপ্রস্তর যুগের ভস্মসমাধি হোক বা ব্রোঞ্জযুগের স্তূপ সমাধি- দু’ জায়গাতেই প্রায় সব সমাধি পুরুষের। তবে, অল্প কিছু নারী সমাধি দুই যুগেই পাওয়া গেছে।

চিত্র ৫
এ তো ছিল স্টোনহেঞ্জের পরবর্তী যুগ – এবার আরো অতীতে যাওয়ার পালা। আরেকটু উত্তরে এলে দেখা যায় একটা আয়তাকার জমি- তিন কিলোমিটার লম্বা – পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তার। একশো-দেড়শো মিটার চওড়া, আর পরিখা দিয়ে ঘেরা। এটাকে ‘কার্সাস’ নাম দেয়া হয়েছে – নির্মাণের পিছনে কী উদ্দেশ্য ছিল জানা নেই – তবে স্টোনহেঞ্জের মূল বৃত্তাকার পরিখা নির্মাণের অন্তত শ তিনেক বছর আগে এই জমিটি খোঁড়া হয়। এর পূর্ব-পশ্চিম অভিমুখ দেখে অনুমান করা হয় বিষুবের দিনগুলির সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের বিন্দুগুলিকে যোগ করে এই পথের নির্মাণ করা হয়- হয়তো এই দিনগুলিতে এই পথের উপর শোভাযাত্রা হত। তবে এগুলো অনুমানমাত্র।
সবশেষে আমরা হেঁটে এসে পৌঁছালাম ভিজিটর সেন্টারে – এখানে মিউজিয়াম আছে – যার অনেক প্রত্নবস্তুর কথা আগেই বলেছি। প্রস্তর যুগের এগারো কেজি ওজনের হাতুড়ি-পাথর, ফ্লিন্টের ছুরি আর তীরের ফলা, নানারকম সমাধি-উপহার, অস্থিভস্মের মধ্যে পাওয়া হাড়ের তৈরি উত্তরীয় বাঁধার পিন, কোদাল হিসেবে ব্যবহৃত হরিণের শিং- এগুলি বিশেষ ভাবে দর্শনীয়। হ্যামারস্টোন দেখে একটাই কথা মনে হল- যারা এই এগারো কেজি ওজনের পাথরটা নিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে সারসেন পাথরগুলোকে সমান করত, কী পরিমাণ পরিশ্রম তারা করেছিল। এই পরিশ্রমের বিনিময়ে তারা কী পেত? মুদ্রাব্যবস্থা তো ছিল না, সোনাদানার ব্যাপারও ছিল না- কীসের বিনিময়ে তারা শ্রম দিত? খাদ্য-বস্ত্র-অলংকার? সমাজে যে উঁচু নীচুর ভেদ ছিল সেটা আমরা এখানকার সমাধির মধ্যেই দেখেছি। প্রশ্ন জাগে- যারা পাথর টানত, পাথর পেটাতো তারা কি সুযোগ পেতো মৃত্যুর পর স্টোনহেঞ্জের আশেপাশে সমাধিস্তূপগুলিতে সমাহিত হবার?

চিত্র ৬
এবার ফিরতি বাসে ওঠার সময়। বাসে উঠে একটা লেখার খসড়া বানাতে বসলাম। কিন্তু যে কোনো লেখা শুরু করার আগে নিজেকে একটা প্রশ্ন করতে হয় – এই লেখাটা কি সত্যিই জরুরি? স্টোনহেঞ্জ নিয়ে লেখার কোনো প্রয়োজন আছে? অনেক বিচার বিবেচনা করার পর মনে হল, হ্যাঁ, এটা জরুরি, কারণ আমরা সভ্যতা বলতে ব্রোঞ্জ যুগ আর তার পরবর্তী যুগকে বোঝাই – মিশর, মেসোপটেমিয়া, হরপ্পা – সবই ব্রোঞ্জ যুগের। ব্রোঞ্জ, লৌহ আর লৌহোত্তর যুগের প্রত্নতত্ত্ব আর ইতিহাসে অনেক সময় চাপা পড়ে যায় প্রস্তর যুগ – অন্তত আমার মতো সাধারণ ইতিহাসপ্রেমীর কাছে। ধাতু আবিষ্কারের আগেও মানুষ বড়ো মাপের শিল্পকৃতি বানাতো, দূর দূরান্তে নৌযাত্রা করত, ব্যবসা বাণিজ্য করত, এমনকি জ্যোতির্বিদ্যার গণনায়ও সড়গড় হতে শুরু করেছিল – এই সবকিছুর প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্টোনহেঞ্জ – তাই তাকে অবজ্ঞা করা যায় না। সমাজের মধ্যে উঁচু নীচুর বৈষম্য, নারীপুরুষের ভেদও যে ততোদিনে গড়ে উঠেছিল, সেটাও এই স্টোনহেঞ্জেই দেখা যায়। সভ্যতার যাত্রাপথে স্টোনহেঞ্জ এমনি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যে তাকে অবহেলা করা যায় না।
চিত্র পরিচিতি:
চিত্র ১: পরিখা।
চিত্র ২: স্টোনহেঞ্জের মূল অংশ।
চিত্র ৩: হীল স্টোন আর উত্তরায়ণের দিনের সূর্যাস্তের দিকনির্দেশ।
চিত্র ৪: আকাশ থেকে স্টোনহেঞ্জ যেমন দেখায়, সাইনবোর্ডের ছবি।
চিত্র ৫: স্তূপসমাধি।
চিত্র ৬: এগারো কেজি ওজনের হ্যামারস্টোন।
তথ্যসূত্র:
সিংহভাগ তথ্যই স্টোনহেঞ্জের সাইনবোর্ড এবং ভিজিটর সেন্টারের মিউজিয়াম থেকে সংগৃহীত, যেগুলি নিম্নোক্ত সাইটেও পাওয়া যায়:
https://www.english-heritage.org.uk/visit/places/stonehenge/history-and-stories/history