সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

স্বাধীনতা আন্দোলন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি

স্বাধীনতা আন্দোলন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি

সৌভিক ঘোষাল

জুন ২০, ২০২৬ ৩৩ 1

ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলি (১৯৩৫ – ১৯৪১)

১৯৩৫ সালে পি. সি. যোশী যে সময়ে সম্পাদক হন সেই সময়ে কমিন্টার্নের সপ্তম কংগ্রেস থেকে আসে দিমিত্রভের থিসিসের পরামর্শ। এতে বলা হয় যে ভারতবর্ষে কমিউনিস্টদের কাজ সবরকম সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণ আন্দোলনকে সমর্থন করা। এগুলিতে কমিউনিস্ট কর্মীদের অংশগ্রহণ করতে হবে। যে সব আন্দোলন জাতীয় সংস্কারবাদী নেতাদের অধীনে রয়েছে সেগুলিকেও বাদ দেওয়া চলবে না কমিউনিস্টদের। নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক স্বাধীনতা বজায় রেখে যে সমস্ত সংগঠনে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস কাজ করে, কমিউনিস্টদেরও সেই সব সংগঠনে সামিল হবার পরামর্শ দেয় কমিন্টার্নের দিমিত্রভ থিসিস। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতের জনসাধারণের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে আরো বাড়িয়ে তোলার জন্য নানা উদ্যোগে সামিল হওয়া ও তার মধ্যে দিয়ে একটা জাতীয় বিপ্লবী অংশকে দানা বাঁধানোর কাজ করার পরামর্শ দিমিত্রভ থিসিসের মাধ্যমে ভারতীয় কমিউনিস্টদের দেওয়া হয়েছিল কমিন্টার্নের তরফে। এই সময়ে ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির দুই সামনের সারির নেতা রজনী পাম দত্ত এবং ব্রেন ব্রাডলি ভারতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণ-ফ্রন্ট গড়ে তোলার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে এক দলিল পেশ করেন, যা দত্ত ব্রাডলি থিসিস নামে পরিচিত। গণকাজকে প্রসারিত করার জন্য ১৯৩৬ সালে নতুন কয়েকটি গণসংগঠন খোলা হয় কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে। এর মধ্যে প্রধান হল কৃষক সংগঠন অখিল ভারতীয় কিষাণ সভা (এ আই কে এস)। ১৯৩৬ সালে আরো যে সব গণ সংগঠন তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশন’ (এ. আই. এস. এফ.) ও নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সঙ্ঘ। ১৯৪২ সাল অবধি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশ বিরোধী গণসংগ্রামে পূর্ণ উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেছিল ও নিজেদের প্রভাবকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

১৯৩৫ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যবর্তী পর্বে বাংলায় যুক্তফ্রন্ট তত্ত্বের বাস্তব অনুশীলনে জোয়ার আসে। কমিউনিস্টরা এইসময় জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে প্রবলভাবে সামিল হলেন। এর ফলে বাংলায় জাতীয় মুক্তি আন্দোলন শক্তিশালী হল। আন্দামান ফেরত জেল ফেরত বাঙালি বিপ্লবীরা এই সময় দলে দলে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। এর ফলে সমাজে কমিউনিস্ট পার্টির মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। বিভিন্ন ছোট ছোট স্বাধীন কমিউনিস্ট গোষ্ঠীগুলিও এই সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে মিশে যায়। বেঙ্গল লেবার পার্টির অধিকাংশ সদস্যও এই সময় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। তবে এই পার্টিটি বিলুপ্ত না করে এর আড়ালে তখন কমিউনিস্টরা কাজ করতে থাকেন, কারণ নিষিদ্ধ থাকায় কমিউনিস্ট পার্টির নামে খোলাভাবে কাজ করা সম্ভব ছিল না। সব মিলিয়ে এই পর্বটা ছিল বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি ও আন্দোলনের বিকাশের উল্লেখযোগ্য পর্ব। বাংলার বিভিন্ন জেলায় এইসময়ে কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব ও সংগঠন ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়েই তৈরি হয় বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশন, বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভা ইত্যাদি গণ সংগঠন। এই যুগে বঙ্গীয় প্রাদেশিক ট্রেড ইউনিয়নের কাজের পরিসরও অনেকটা বিস্তৃত হয়।

কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা অনেকেই জাতীয় কংগ্রেস ও কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টিতে যোগ দেন ও তার মধ্যে কাজ করতে থাকেন। এর ফলে অনেক বড় পরিসরে কমিউনিস্ট কর্মীদের জনসংযোগের সুযোগ মেলে। কমিউনিস্ট পার্টি ও কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে বেশ কিছু বোঝাপড়ায় আসেন। এই বোঝাপড়ার ভিত্তিতে দুজন কমিউনিস্ট নেতা – হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও নৃপেন চক্রবর্তী – কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টির বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হন। ১৯৩৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের হরিপুরা সম্মেলনে বেশ কয়েকজন কমিউনিস্ট নেতা অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি (এ. আই. সি. সি.) তে নির্বাচিত হন। এঁরা হলেন বঙ্কিম মুখার্জী, নীহারেন্দু দত্ত মজুমদার, মুজফফর আহমেদ, সোমনাথ লাহিড়ী, পাঁচুগোপাল ভাদুড়ী, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। বঙ্কিম মুখার্জী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সহ সভাপতি এবং পাঁচুগোপাল ভাদুড়ী ও কমল সরকার এর সহ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

এই পর্বে বাংলায় শ্রমিক আন্দোলনে জোয়ার আসে। ১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস অবধি টানা চুয়াত্তর দিন চটকলগুলিতে একটানা ধর্মঘট ছিল এই পর্বের শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। কৃষক আন্দোলন ও ছাত্র যুব আন্দোলনেও এইসময় জোয়ার দেখা যায়।

১৯৩৯ সালে জাতীয় কংগ্রেসের ত্রিপুরী কংগ্রেসে আসে ‘পন্থ প্রস্তাব’ যার জেরে নির্বাচিত সভাপতি সুভাষচন্দ্রকে পদত্যাগ করতে হয়। পন্থ প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কে বাংলার কমিউনিস্টরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট নেতারা পার্টির পলিটব্যুরোর বৈঠকে প্রথমে কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টির মতোই এই বিতর্কে নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলার কমিউনিস্ট নেতাদের চাপে তড়িঘড়ি কেন্দ্রীয় কমিটির সভা ডেকে এই সিদ্ধান্তকে বদলে পন্থ প্রস্তাবের তুমুল বিরোধিতা করা হয়। এক্ষেত্রে অজয় ঘোষ, সোমনাথ লাহিড়ী, নীহারেন্দু দত্ত মজুমদার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট নেতারা বিতর্কে দলীয় লাইন মেনে পন্থ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বললেও ঐক্যবদ্ধ জাতীয় নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন। অন্যদিকে বঙ্কিম মুখার্জী ও নীহারেন্দু দত্ত মজুমদারের মতো বাংলার কমিউনিস্ট নেতারা বামপন্থী ঐক্যের ওপর জোর দেন এবং কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নেতৃত্বকে তীব্র আক্রমণ করেন। কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বাংলার নেতৃত্বের এই আক্রমণকে ভালোভাবে নেন নি এবং তাঁরা একে ‘বাম সংকীর্ণতাবাদ’ বা ‘লেফট সেক্টেরিয়ানইজম’ বলে অভিহিত করেন। কংগ্রেসের ভেতরে থেকে দক্ষিণপন্থী অংশের বিরুদ্ধে সুভাষচন্দ্র বসু তথা লেফটব্লকের লড়াইকে কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থন করলেও কংগ্রেস থেকে অপমানিত হয়ে প্রায় বহিষ্কৃত সুভাষচন্দ্রের ফরওয়ার্ড ব্লক নামে আলাদা দল খোলা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থন করেনি। তবে সুভাষচন্দ্রকে দক্ষিণপন্থীদের অপমানের তীব্র বিরোধিতা কমিউনিস্ট পার্টি করেছিল।

যতদিন পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন জার্মান আক্রমণের মুখে পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েনি, ততদিন পর্যন্ত যুদ্ধ সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান ছিল – “এই যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কোনও সহযোগিতা নয়।” একে সেকেন্ড ইমপিরিয়ালিস্ট ওয়ার আখ্যা দিয়ে এই নামে বই লেখেন সি. পি. আই.-এর অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক গঙ্গাধর অধিকারী। অধিকারী এই বইতে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণ সংগ্রামের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান রাখেন। বইটি প্রকাশিত হবার পরেই ব্রিটিশ সরকারের আদেশে বইটি নিষিদ্ধও বাজেয়াপ্ত হয়। কমিউনিস্ট পার্টির তরফে বিভিন্ন যুদ্ধবিরোধী পুস্তিকা, পত্রপত্রিকা ও ইস্তাহার প্রকাশ করা হতে থাকে নিয়মিতভাবে।

ফ্যাসিবিরোধী জনযুদ্ধ নীতি

১৯৪১ সালের শেষের দিকে সালে নাজি জার্মানি সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণ করে। তারপরে সোভিয়েত রাশিয়া ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকার মতো মিত্রশক্তির সঙ্গে জাপান, জার্মান, ইতালির সমন্বয়ে তৈরি অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধের নীতি গ্রহণ করে এবং ফ্যাসিবাদ নাজিবাদ বিরোধী লড়াইকেই পাখির চোখ করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর্বে ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রবলভাবে সক্রিয় ছিল৷ লেখক শিল্পী সাহিত্যিকদের নিয়ে ১৯৪৩ সালে তৈরি হয় ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ বা IPTA ও সেটি বিশেষ সাড়া ফেলে। বাংলা তথা ভারতের অনেক অগ্রগণ্য শিল্পী সাহিত্যিক এর মধ্যে কাজ করেছিলেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন পৃথ্বীরাজ কাপুর, বিজন ভট্টাচার্য, বলরাজ সাহনী, ঋত্বিক ঘটক, শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, খাজা আহমেদ আব্বাস, সলিল চৌধুরী, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র প্রমুখ। বাংলায় ৪৩ সালে দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও কমিউনিস্ট নেতা কর্মীরা সে সময় ত্রাণকার্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।

সোভিয়েত রাশিয়া ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকার মতো মিত্রশক্তির সহযোগী হিসেবে জাপান, জার্মান, ইতালির সমন্বয়ে তৈরি অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধের নীতি গ্রহণ করে এবং ফ্যাসিবাদ নাজিবাদ বিরোধী লড়াইকেই পাখির চোখ করে। কারণ ফ্যাসিবাদ ও নাজিবাদ ব্রিটিশ বা ফরাসী ঔপনিবেশিক শাসনের চেয়েও অনেক মারাত্মক এক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক আগ্রাসন।

ফ্যাসিবাদ কী তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দিমিত্রভ থিসিস জানিয়েছিল যে ফ্যাসিবাদ হল লগ্নি পুঁজির সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শাসন। ফ্যাসিবাদী শাসকেরা, যেমন ইতালির মুসোলিনি বা জার্মানির হিটলার সবচেয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং সবচেয়ে আগ্রাসী ও উন্মত্ত একনায়ক। ফ্যাসিবাদ হিটলার বা মুসোলিনির বা ইতালির ফ্যাসিস্ট পার্টি ও জার্মানির নাজি পার্টির নামের সঙ্গে একাকার হয়ে থাকলেও এটা কেবলমাত্র কোনও ব্যক্তি বা দলের শাসন নয়, একে বলা যেতে পারে বৃহৎ পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি দমনমূলক শাসনব্যবস্থা।

ফ্যাসিবাদী শাসন শ্রমিকদের অধিকার কাড়ে, ট্রেড ইউনিয়ন নিষিদ্ধ করে এবং বিপ্লবী আন্দোলনকে নির্মমভাবে দমন করে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ধ্বংস করে একঢালা এক শাসনকে সর্বাত্মক করে তোলাই তার লক্ষ্য। সেই সময়ে ইউরোপ ও দুনিয়া জুড়ে সমাজতন্ত্রের জনপ্রিয়তা ঠেকাতে ফ্যাসিবাদকে ব্যবহার করা হয়েছিল। জনগণের মধ্যে একদিকে ছড়ানো হয়েছিল কমিউনিজমের ভীতি, অন্যদিকে সমাজতন্ত্রর জনপ্রিয়তাকে আত্মসাৎ করতে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে মিশিয়ে একে ন্যাশানাল সোশালিজমের নামে চালানোর চেষ্টাও হয়েছিল। হিটলার নিজের পার্টির নাম দিয়েছিলেন ন্যাশানাল সোশালিস্ট পার্টি।

ফ্যাসিবাদ শুধু সামরিক দমননীতিই চালায় নি, অর্থনৈতিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যবিত্ত জনগণের সমর্থনও পেয়েছিল। ব্রিটিশ বিরোধী মানসিকতাকে আশ্রয় করে ভারতে ফ্যাসিবাদী নাজিবাদীদের অক্ষশক্তির প্রতি একটা সমর্থনও সে সময় বিস্তারলাভ করেছিল। ফলে কমিউনিস্টদের কর্তব্য ছিল ফ্যাসিবাদের বিপদকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সৃষ্টিশীল ও জনপ্রিয়ভাবে জনগণের কাছে তুলে ধরা।

ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইতে কমিউনিস্টরা সামনের সারিতে থাকলেও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এই সময়ে এই লড়াইয়ের সঙ্গে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা বিরোধী আন্দোলনকে মেলাতে ব্যর্থ হয়। ভারত ছাড় আন্দোলনের দিনগুলিতে সি. পি. আই.-এর এই আন্দোলন থেকে দূরে থাকা পার্টি সম্পর্কে জনগণের বড় অংশের মধ্যে প্রশ্নচিহ্নের জন্ম দেয়।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির মতো আরো কিছু বামপন্থী দল – যেমন মানবেন্দ্রনাথ রায়ের নেতৃত্বাধীন ‘রাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি’, বিশ্বনাথ দুবে, শিশির রায়, প্রমোদ সেন, মনোরঞ্জন রায়, হাফিজ জালালউদ্দিন প্রমুখের নেতৃত্বাধীন ‘বলশেভিক পার্টি’ও জনযুদ্ধ নীতির সমর্থক ছিল এবং তারাও ৪২ এর আন্দোলন থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে অন্য অনেক বাম শক্তিই সক্রিয়ভাবে ৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সামিল হয়।

কমিউনিস্ট পার্টি ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক লড়াইয়ের কারণে এই আন্দোলনে পার্টিগত সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকলেও অনেক কমিউনিস্ট কর্মী ব্যক্তিগতভাবে পার্টি সিদ্ধান্তের প্রতি সহমত ছিলেন না। অনেকেই সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন।

সি. পি. আই.-এর তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অরুণ বসু জানিয়েছেন তিনি ও প্রখ্যাত নেতা বঙ্কিম মুখার্জী এই আন্দোলন থেকে পার্টির দূরে থাকার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান তাঁদের মতামত সে সময়ে খারিজ করে দিয়েছিল। ১৯৪৩ এর মার্চ মাসে কমিউনিস্ট পার্টির তৃতীয় প্রাদেশিক সম্মেলন হয়েছিল। ভবানী সেন এর পেশ করা রাজনৈতিক সাংগঠনিক প্রতিবেদন এ ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের “সংগ্রামপন্থী” হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

পার্টির ওপরের স্তরের নেতারা সেভাবে এই আন্দোলনে স্বাভাবিকভাবেই সক্রিয় হতে পারেন নি। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের ত্রাণকার্যে তাঁরা সর্বতোভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কমিউনিস্ট কর্মীরা কিন্তু বাংলার নানা জায়গায় ৪২ এর আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। জলপাইগুড়ি, বীরভূম, নদীয়া, ফরিদপুর, পাবনা ইত্যাদি জেলায় কমিউনিস্ট কর্মীদের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সামিল হবার কথা ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক রিপোর্টে উল্লিখিত হয়েছে। মালদহে কমিউনিস্ট কর্মীরা পিকেটিং ও বিক্ষোভে সামিল হন।

মেদিনীপুরে কমিউনিস্ট কর্মীরা ভালোমাত্রাতেই আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। এখানকার নেতৃবৃন্দের মধ্যে রবি মিত্র, ভূপাল পাণ্ডা, হরেন মিত্র আন্দোলনে যোগ দেন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বরিশালে বীরেন দাশগুপ্ত, নয়নরঞ্জন দাশগুপ্ত ও দিনাজপুরে শুচিন্দু চক্রবর্তীর মত স্থানীয় স্তরের নেতারা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

১৯৪২, ভারত ছাড়ো আন্দোলন ও বামশক্তি –

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও জাতীয় রাজনীতির মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ৪২ এ কিছু দুর্বলতা থাকলেও বাংলার নানা বাম শক্তি এই আন্দোলনে সর্বাত্মক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

১) সোশালিস্ট পার্টির ভূমিকা

অবিভক্ত বাংলার বেশ কয়েকটি জেলায় সোশালিস্ট পার্টির সংগঠন ছিল। গুজরাতের সোশালিস্ট নেতা ছোটুভাই পুরানি বাংলায় গণ আন্দোলনকে শক্তিশালী রূপ দিতে সোশালিস্ট সদস্য এবং কর্মীদের বোমা তৈরি ও অন্তর্ঘাতের কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেন। বিশিষ্ট নেত্রী অরুণা আসফ আলিও কিছুদিন হাওড়া জেলার একটি গ্রামে আত্মগোপন করে থেকে রাজনৈতিক কাজকর্ম চালিয়ে যান। সোশালিস্টদের উদ্যোগে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে সফল অন্তর্ঘাতমূলক কাজকর্মগুলি চলতে থাকে। মেদিনীপুরে ভারত ছাড়ো আন্দোলন সবথেকে শক্তিশালী চেহারায় আত্মপ্রকাশ করেছিল। এইখানের সহিংস আন্দোলনে সোশালিস্ট পার্টির নেতা কর্মীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

২) ফরওয়ার্ড ব্লক নেতৃবৃন্দের ভূমিকা

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ফরওয়ার্ড ব্লক নিষিদ্ধ ছিল। দলের অনেক সদস্যই ছিলেন কারারুদ্ধ। তবে আত্মগোপন করে থাকা বহু কর্মী ও নেতা এই আন্দোলন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিশেষ করে মেদিনীপুরের গণসংগ্রামে তাঁদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ফরওয়ার্ড ব্লক নেতাদের মধ্যে ছিলেন জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষ, হেমচন্দ্র ঘোষ, সত্যরঞ্জন বক্সী, লীলা রায়, অনিল রায়, হেমন্ত বসু, পঞ্চানন চক্রবর্তী প্রমুখ। বিদেশ থেকে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর পাঠানো নির্দেশনা তাঁদের দিশা দিত, উদ্বুদ্ধ করত।

৩) রিভোলিউশনারি সোশালিস্ট পার্টি (আর. এস. পি.)-র ভূমিকা

আর. এস. পি. তৈরি হয়েছিল বিপ্লবী দল অনুশীলন সমিতি থেকে। অবিভক্ত বাংলার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের গোপন প্রতিবেদনগুলি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে কলকাতা, ঢাকা, ফরিদপুর, হাওড়া, মুর্শিদাবাদ, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর প্রভৃতি জেলায় ভারত ছাড়ো আন্দোলন সহিংস চেহারা পেয়েছিল আর এস পির এইসব জায়গায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে। ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরুর আগেই এই দলের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, কিন্তু দলের অপেক্ষাকৃত তরুণেরা এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। ‘আর. এস. পি.’র বহু কর্মী সমর্থক গ্রেপ্তার হন, নির্যাতন ভোগ করেন এবং শহীদ হন।

৪) রেভেলিউশনারি কমিউনিস্ট পার্টি বা আর. সি. পি. আই.-এর ভূমিকা

আর সি. পি. আই.-এর প্রধান নেতা ছিলেন সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের তীব্র সমালোচক হলেও আর সি. পি. আই. কমিউনিস্ট পার্টির জনযুদ্ধ কেন্দ্রিক ভাবনার প্রেক্ষিতে ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে সরে থাকার সিদ্ধান্তকে অন্যান্য বাম দলগুলির মতোই ভুল বলে মনে করেছিল। আর সি. পি. আই. অন্যান্য দলের সঙ্গে মিলে মিশে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য আর. সি. পি. আই তীব্র কংগ্রেস বিরোধী ছিল। তাও কংগ্রেস নেতৃত্বের ডাকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে কেন তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ তার ব্যাখ্যা দিয়ে আর সি. পি. আই. নেতৃত্ব জানিয়েছিলেন যে ভারত ছাড়ো আন্দোলন জাতীয় কংগ্রেস আহূত হলেও তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণবিস্ফোরণের চেহারা পেয়েছে বলেই আর সি. পি. আই. তাতে যোগ দিয়েছে। বিশেষ করে নদীয়া জেলায় আর সি. পি. আই.-এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সক্রিয়।

৫) বলশেভিক লেনিনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া বা বি. এল. পি. আই.

বলশেভিক পার্টিও কমিউনিস্ট পার্টির মতোই জনযুদ্ধ অবস্থান নেয় ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করে। নীহারেন্দু দত্ত মজুমদারও ছিলেন বলশেভিক পার্টির অন্যতম নেতা। তিনি বলশেভিক পার্টির এই অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে আন্দোলনে যোগ দিলে পার্টি তাঁকে বহিষ্কার করে। তখন নীহারেন্দু দত্ত মজুমদার ও তাঁর অনুগামীরা ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে বলশেভিক লেনিনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা ছিলেন ট্রটস্কিপন্থী চতুর্থ আন্তর্জাতিকের অংশ। বলশেভিক লেনিনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া কমিউনিস্ট পার্টির জনযুদ্ধ তত্ত্বায়নের বিরোধী ছিল এবং তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করে। তাঁদের অভিমত ছিল বিশ্বযুদ্ধকে বিপ্লবী প্রয়োজনে ব্যবহার করা উচিত। জাতীয় কংগ্রেসের প্রবল বিরোধী হলেও আর. সি. পি. আই. এর মতো তারাও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দেয়।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সম্মেলন (১৯৪৩)

১৯২৫ সালের পরের অনেকগুলো বছর দমন পীড়ন ও নিষিদ্ধকরণের কারণে কমিউনিস্ট পার্টি খোলাভাবে কাজ করার সুযোগ পায়নি, কোনও সম্মেলনও তারা করতে পারেনি। ১৯৪২ সালে বিশ্ব পরিস্থিতি ও  বিশ্বযুদ্ধ নয়া মোড় নেয় ও সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকেরা বিশ্ব পরিস্থিতির নিরিখে অতীতের নীতি বদলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে খোলাভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিতে বাধ্য হয়। ১৯৪২ সালে প্রকাশ্যে কাজ শুরু করার পর ১৯৪৩ সালের ২৩ মে থেকে ১ জুন মুম্বাইতে সি. পি. আই.-এর প্রথম সম্মেলন হয়।

সি. পি. আই.-এর প্রথম সম্মেলনে ১৫,৫৬৩ জন পার্টি সদস্যের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির ছিলেন ১৩৯ জন প্রতিনিধি। এই পার্টি সদস্যদের মধ্যে ২৬৩৭ জন ছিলেন সর্বক্ষণের কর্মী। সদস্যপদ ছাড়াও পার্টি ঘনিষ্ঠদের মধ্যে ছিলেন ৩২,১৬৬ জন স্বেচ্ছা সেবক। কিশোর বাহিনীর সদস্য ছিলেন ৯০০০ জন। মহিলা সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ছিল ৪১,১০০ আর ছাত্র সংগঠনে ছিলেন ৩৯,১৫৫ জন। কিষাণ সভার সদস্য ছিলেন ৩,৮৫, ৩৭০ জন। ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা ছিল ৩,০১,৪০০।

এই সমস্ত গণ সংগঠন ও আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে থেকে ৮৬ জন উপস্থিত ছিলেন প্রথম পার্টি কংগ্রেসে। এছাড়াও সম্মেলনে শ্রমিক শ্রেণি থেকে ২২ জন, কৃষকদের থেকে ২৫ জন  উপস্থিত ছিলেন প্রতিনিধি হিসেবে। ১৯২৯ সালের আগে পার্টিতে যুক্ত হয়েছেন, এমন আটজন প্রতিনিধি সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে তরুণদের আধিক্য ছিল। আটষট্টি শতাংশ প্রতিনিধির বয়েস ছিল ৩৫ বছরের কম। সম্মেলনে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে তেরজন মুসলিম, আটজন শিখ, দুজন পার্শি, একজন জৈন, তিনজন দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। সম্মেলনে উপস্থিত মহিলাদের সংখ্যা ছিল তের। এঁদের দুজন কল্পনা দত্ত ও কমলা চট্টোপাধ্যায় সাড়ে সাত বছর কারাবরণ করেছিলেন।

কমিউনিস্ট পার্টি এই সময়ে খোলাভাবে কাজ করার সুযোগ পেলেও অনেক পার্টি সদস্যই এই সময়ে কারাবন্দী ছিলেন। ৬৯৫ জন কারাবন্দী সদস্যের মধ্যে ১০৫ জন ছিলেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। সম্মেলনের প্রতিনিধিদের সত্তর শতাংশ অন্তত এক বছর বা তার বেশি সময়ে কারাবরণ করেছিলেন।

সম্মেলনের শুরুতে লাল পতাকা উত্তোলন করেন বঙ্কিম মুখার্জী। সম্মেলনের প্রকাশ্য অধিবেশনে হাজির ছিলেন পঁচিশ হাজার সদস্য ও সমর্থক।

এই সময়ে ১১টি ভাষায় কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন মুখপত্র প্রকাশিত হত, যার মোট প্রচারসংখ্যা ছিল ষাট হাজার। এই সম্মেলনের আগে পরে কমিউনিস্ট পার্টির বাইরে থাকা বিভিন্ন কমিউনিস্ট সংগঠন ও ব্যক্তি পার্টিতে সামিল হন। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল গদর কীর্তি গ্রুপ। এর নেতা বাবা সোহন সিং ভাখনা প্রতিনিধি হিসেবে সি. পি. আই.-এর এই প্রথম সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

এই সম্মেলনের সময় এবং তার আগে পরে পি. সি. যোশী ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ১৯২৫ থেকে ১৯৩৩ পর্যন্ত এস. ভি. ঘাটে, ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত সময়কালের ধরপাকড়ের পর্বে ক্রমপর্যায়ে মিরাজকর, গঙ্গাধর অধিকারী ও সোমনাথ লাহিড়ী এবং ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত পি. সি. যোশী সি. পি. আই.-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ অবধি সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বি. টি. রণদিভে। ১৯৫০ – ৫১ সালে অল্প কিছুদিনের জন্য সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন রাজেশ্বর রাও। ১৯৫২ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত ভারতের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অজয় ঘোষ। ১৯৬২ সালে অজয় ঘোষের মৃত্যুর পর নেতৃত্বের প্রশ্ন নিয়ে পার্টির মধ্যে আগে থেকেই চলমান দুই লাইনের তীব্র দ্বন্দ্ব তীব্রতর হয়ে ওঠে। ডাঙ্গেকে চেয়ারম্যান ও ই. এম. এস. নাম্বুদিরিপাদকে সাধারণ সম্পাদক করে আপোষ মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদী হয়নি।

উত্তাল চল্লিশ : তেভাগা, তেলেঙ্গানা ও অন্যান্য গণবিদ্রোহ

এইসময় ভারতের নানা প্রান্তে যে সব বিদ্রোহ হয়েছিল – যেমন মালাবারের কায়ুর বিদ্রোহ (১৯৪১), ত্রিপুরার রিয়াং বিদ্রোহ (১৯৪২),  মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি আদিবাসী অভ্যুত্থান (১৯৪৫-৪৬), ময়মনসিংহের হাজং বিদ্রোহ (১৯৪৫-৪৭), ত্রিবাঙ্কুরের পুন্নপ্রা-ভায়লার বিদ্রোহ (১৯৪৬), তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬-৪৭), তেলেঙ্গানা আন্দোলন (১৯৪৬ – ৫১) ইত্যাদি – সেখানে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বকারী ভূমিকা ছিল। আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনানীদের সাজার বিরুদ্ধে লড়াই ও নৌ বিদ্রোহ (১৯৪৫)-তেও কমিউনিস্টরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।

মালাবারের কায়ুর আন্দোলন (১৯৪১ – ১৯৪৩)

বিশ শতকের চল্লিশের দশকের শুরুতে কেরালার কাসারগোড় জেলার কায়ুর গ্রামে কৃষকরা এক শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টি প্রভাবিত এই আন্দোলন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে জনযুদ্ধ করে তুলতে চেয়েছিল। স্লোগান তুলেছিল – “ব্রিটিশ শোষণ ও জমিদারতন্ত্র ধ্বংস হোক। কৃষক সমাজ বাঁচুক। শ্রমিক-কৃষকের গড়া সোভিয়েত ইউনিয়নের জয় হোক। খাজনা দেব না। সেনাবাহিনীতে যোগ দেব না, যুদ্ধের জন্য অর্থও দেব না।”

আন্দোলনকারীরা মোরাজা ও মাট্টানুর ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া কৃষক ও কমিউনিস্ট কর্মীদের মুক্তির দাবি জানায়। আন্দোলন দমন করার জন্য ব্রিটিশ সরকার বহু লোককে গ্রেপ্তার করে। এই গ্রেপ্তারী কায়ুরের আন্দোলনকারী কৃষকদের আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং পুলিশি জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়। এক মহিলার সঙ্গে দুর্ব্যবহারকারী জনৈক পুলিশ অফিসারকে ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা পাথর ছুঁড়ে হত্যা করে।

এই ঘটনায় চার তরুণ কৃষকনেতা, যাদের ‘কায়ুর কমিউনিস্ট’ বলা হয় — মাদাথিল আপ্পু, কুনহম্বু নায়ার, চিরুকন্দন ও আবু বকরকে ১৯৪৩ সালের ২৯ মার্চ কান্নুর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি দেওয়া হয়।

ত্রিপুরার রিয়াং বিদ্রোহ (১৯৪২)

ত্রিপুরার সামন্তরাজ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশের নির্দেশে জোর করে যুবকদের সৈন্যদলে সামিল করছিলেন। সামন্ত শাসনের নানা জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে আগে থেকেই তেতে থাকা আদিবাসী রিয়াংরা এই জবরদস্তি মেনে নেয় নি। রতনমণি নামের একজনের নেতৃত্বে তারা ত্রিপুরা রাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, আলাদা এক রিয়াং রাজ্যেরও ঘোষণা করে। তাদের বিদ্রোহের কেন্দ্র ছিল উদয়পুর। ত্রিপুরারাজ বিরাট সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে বিদ্রোহ দমন করেন। প্রায় বাইশ হাজার রিয়াং এই বিদ্রোহে সামিল হয়েছিল। তিরিশের দশকে গঠিত প্রজামণ্ডলের মধ্যে দিয়ে কমিউনিস্টরা ত্রিপুরায় সাংগঠনিক কাজ করা শুরু করেছিলেন। রিয়াং বিদ্রোহে তার মতাদর্শগত প্রভাব ছিল।

ওয়ারলি বিদ্রোহ (১৯৪৫)

যে সমস্ত আদিবাসী বিদ্রোহে কমিউনিস্টরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তার মধ্যে ত্রিপুরার রিয়াং বিদ্রোহের মতোই উল্লেখযোগ্য হল মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি আদিবাসীদের বিদ্রোহ। এখানকার আদিবাসীদের প্রায় বেগার খাটানো হত ও তাদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত করা ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এর বিরুদ্ধে ওয়ারলি আদিবাসীরা প্রতিবাদ জানায়, দাবি করে রোজকার মজুরী অন্তত বারো আনা করতে হবে। ওয়ারলি আদিবাসীদের এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট নেত্রী গোদাবরী পারুলেকর। তিনি ওয়ারলি আদিবাসীদের ঘরের মেয়ের মতো আপন হয়ে গিয়েছিলেন। তাকে সবাই ডাকত বড়দিদি বলে।

ময়মনসিংহের টঙ্ক প্রথা বিরোধী আন্দোলন ও হাজং বিদ্রোহ (১৯৪৬ – ১৯৫০)

১৯৪৬-৫০ সাল জুড়ে বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার উত্তরাংশে সামন্ততান্ত্রিক টঙ্ক প্রথা বিরোধী আন্দোলন প্রভূত প্রভাব বিস্তার করে। টঙ্ক শব্দটি জমিতে উৎপাদিত পণ্যের আকারে প্রদেয় খাজনাকে বোঝায়। এই অঞ্চলের কৃষকরা ধানে তাদের খাজনা পরিশোধ করত। প্রথাগতভাবে টঙ্ক রায়তরা প্রতি ১.২৫ একর জমির জন্য ১০ থেকে ১৫ মন ধান খাজনা দিত। টাকার হিসাবে এটি ছিল নগদ খাজনা হারের দ্বিগুণেরও বেশি। এ জন্য টঙ্ক এলাকার চাষিরা খাজনা কমানোর আন্দোলন শুরু করেছিল। কিন্তু জমিদাররা টঙ্ক চাষিদের কৃষিপণ্যের বদলে নগদ টাকায় খাজনা দেওয়ার দাবিকে অগ্রাহ্য করে। এর ফলে এই আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে এবং তা সংযুক্ত হয়ে যায় সমকালীন বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টিকারী তেভাগা আন্দোলনের সঙ্গে।

কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভা সেই সময়ে তেভাগা, নানকার, নাচোলের কৃষক আন্দোলনসহ অনেকগুলি কৃষক আন্দোলন পরিচালনা করেছিল। কৃষক সভার ময়মনসিংহ জেলার কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহ টঙ্ক আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। উত্তর ময়মনসিংহ জেলায় বিশেষ করে কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ি ও শ্রীবর্দি থানাগুলিতে টঙ্ক ভোগদখল সবচেয়ে বেশি ছিল। এ জায়গাগুলিতে প্রধানত গারো ও হাজং গোষ্ঠীর চাষিরা চাষাবাদ করত। কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে টঙ্ক কৃষকরা ছয়দফা দাবিনামা প্রস্তুত করে। তাদের দাবিগুলি ছিল টঙ্ক প্রথার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি, টঙ্ক কৃষকদের ভূমির অধিকারের স্বীকৃতি, পরগণায় নগদ টাকায় দেয় হারের নিরিখে খাজনা নির্ধারণ, টঙ্ক খাজনার বকেয়া দাবি না করা, জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি এবং সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদ। আন্দোলনকারীদের গ্রামগুলোতে পুলিশ চড়াও হলে গ্রামের মানুষ ও কম্যুনিস্ট স্বেচ্ছাসেবীরা একজোট হয়ে তাদের প্রতিরোধ করে। পুলিশ অনেককে গ্রেফতার করে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর কিছুকালের জন্য কৃষকদের আন্দোলন স্তিমিত থাকে। কিন্তু ১৯৪৮ সালের টঙ্ক আন্দোলন আবার জোরদার হয়ে উঠে এবং ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথার বিলোপ সাধন পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।

টঙ্ক আন্দোলনের সমান্তরালভাবে চলেছিল উত্তর ময়মনসিংহের হাজং বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বীরাঙ্গনা রাসমণি। বারো বছর বয়েসে রাসমণির বিবাহ হয়। বিয়ের অল্প কিছুদিন পরেই তার স্বামী মারা যান। পরের জমিতে কৃষি মজুরের কাজ করে রাসমণি গ্রাসাচ্ছাদন চালাতেন। পাশাপাশি দক্ষ হাতে নির্বাহ করতেন দাই এর দায়িত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন যে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি জনপ্রিয় হয়েছিল, রাসমণি তাতে সামিল হয়েছিলেন। লঙ্গরখানা খুলে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তিনি তিনটি গ্রামের মানুষকে সে সময় রক্ষা করেছিলেন। জমিদারী, তালুকদারী ও মহাজনী প্রথার বিরুদ্ধে তিনি হাজংদের সংঘবদ্ধ করেন। হাজং চাষিদের সুশিক্ষিত করার জন্য তিনি একদিকে স্থাপন করেন নৈশ বিদ্যালয় ও অন্যদিকে আয়োজন করেন রাজনৈতিক আলোচনার পাঠচক্র। হাজং বিদ্রোহ ক্রমেই উত্‌তুঙ্গ হয়ে ওঠে আর সামনের সারিতে থেকে এর নেতৃত্ব দেন রাসমণি। ১৯৪৬ সালের গোড়ায় ইস্টার্ণ ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনী পূর্ণ শক্তি নিয়ে হাজংদের ওপর আক্রমণ চালায়। হাজংরাও সাহসী প্রত্যুত্তর দেয়। তবে এই অসম যুদ্ধে বেশিদিন তারা লড়াই চালাতে পারে নি। যুদ্ধক্ষেত্রেই বুলেট এফোঁড় ওফোড় করে দেয় রাসমণি সহ তার সঙ্গী সাথীদের। তবে হাজং বিদ্রোহকে সম্পূর্ণ থামানো যায় নি। টঙ্ক বিদ্রোহ শেষপর্যন্ত ১৯৫০ সালে সফল হয় ও টঙ্ক চাষিরা নিজেদের রায়তী সত্ত্ব হাসিল করতে সক্ষম হন।

১০

কেরালার ত্রিবাঙ্কুরের পুন্নাপ্রা ভায়লারের বিদ্রোহ (১৯৪৬)

কেরালার ত্রিবাঙ্কুর ছিল ব্রিটিশ ভারতের এক দেশীয় রাজ্য। রাজার বকলমে মূল শাসনকার্য চালাতেন দেওয়ান সি. পি. রামস্বামী আয়ার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেখানে মুদ্রাস্ফীতির চাপ মারাত্মক হয়ে ওঠে ও জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়। আশঙ্কা দেখা দেয় এক ভয়ংকর দুর্ভিক্ষের। এই অঞ্চলে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বাধীন শ্রমিক আন্দোলন আগে থেকেই শক্তি সঞ্চয় করেছিল। মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত শ্রমিক আন্দোলন সুষ্ঠ রেশনিং ব্যবস্থা ও মজুরী বৃদ্ধির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে। শুরু হয়ে যায় সর্বাত্মক শ্রমিক ধর্মঘট। শ্রমিক ও কৃষিমজুররা প্রচুর সংখ্যায় ধর্মঘটে সামিল হলে মিলের উৎপাদন ও কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে যায়। রামস্বামী আয়ার শ্রমিক আন্দোলনের চাপে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা ও বোনাস দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। আংশিক সাফল্যের পর কমিউনিস্ট ও শ্রমিক সংগঠন আরো উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। আম্বালা পুঝা ও শেরতলাই অঞ্চলের জমিদার ও মালিকগোষ্ঠী শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনলে শ্রমিকরা পাল্টা আঘাত দেবার জন্য ধর্মঘট ডাকে। ১৯৪৬ সালের ২২ অক্টোবর এই ধর্মঘটের দিন নিখিল ত্রিবাঙ্কুর ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস এর আহ্বানে বিরাট ধর্মঘট হয়। ২৪ অক্টোবর শ্রমিকদের বিরাট মিছিল বেরোয় আলেপ্পি শহরের নানা প্রান্ত থেকে। আন্দোলন ধর্মঘট রুখতে থানা থেকে মিছিলের ওপর গুলি বর্ষণ করা হয়। মিছিল থেকেও শ্রমিকরা ঘরোয়া অস্ত্র নিয়ে প্রত্যুত্তর দেয়। দারোগাকে হত্যা করা হয়। বিরাট পুলিশ বাহিনী এরপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে কয়েক শো শ্রমিককে হত্যা করে।

ভায়লার দ্বীপে সে সময় অনেক শ্রমিক অত্যাচারের ভয়ে বাধ্য হয়ে আশ্রয় নেন। ২৭ অক্টোবর সেখানেও একদল সৈন্য প্রবেশ করে শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ শানায় এবং অসংখ্য শ্রমিককে হত্যা করে। ত্রিবাঙ্কুরের শ্রমিক বিদ্রোহকে রক্তে রঞ্জিত করে নির্মমভাবে দমন করা হয়।

১১

তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬ – ৪৭)

কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষকসভার নেতৃত্বে সংগঠিত ১৯৪৬ – ৪৭ সালের তেভাগা আন্দোলন প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বাংলায় এর মধ্যে দিয়ে কমিউনিস্টদের জনভিত্তি অনেক পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ভাগচাষীদের ফসলের ওপর অর্ধেকের বদলে দুই তৃতীয়াংশের অধিকারের দাবিতে। মূল স্লোগান ছিল ‘আধি নয়, তেভাগা চাই’।

১৯৪৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এই আন্দোলন শুরু হয়ে। ভূমিমালিক এবং ভাগচাষিদের মধ্যে উৎপাদিত শস্য সমান দুই ভাগ করার পদ্ধতির বিরুদ্ধে বর্গাদাররা প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলে। তারা দাবি করে যে, অর্ধেক ভাগাভাগির পদ্ধতি অন্যায়। উৎপাদনে যাবতীয় শ্রম এবং অন্যান্য বিনিয়োগ করে বর্গাচাষি; উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পুঁজি বিনিয়োগ, শ্রম এবং চাষের উন্নতিতে ভূমি মালিকের অবদান অতি নগণ্য। তাই মালিকরা ফসলের অর্ধেক নয়, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পেতে পারেন। বর্গাচাষিরা দাবি করেন উৎপাদিত শস্যের সংগ্রহ এরপর থেকে আর মালিকদের দালানে রাখা হবে না, সংগৃহীত ফসল থাকবে বর্গচাষিদের বাড়িতে। খড়ের ভাগবিন্যাস নিয়েও নতুন দাবি সামনে আসে। বলা হয় ভূমিমালিক খড়ের কোনো ভাগ পাবেন না। পুরোটাই পাবেন বর্গাচাষি।

ভূমি মালিকরা ভাগচাষিদের সমস্ত দাবি প্রত্যাখ্যান করে। তারা পুলিশ দিয়ে আন্দোলনকারীদের অনেককে গ্রেফতার করায় এবং দীর্ঘদিন জেলে আটকে রাখে। কিন্তু পুলিশ ও জমিদারদের দমন-পীড়ন আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পারে নি। তেভাগা আন্দোলন বাংলার ১৯টি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, খুলনা, ময়মনসিংহ, যশোর এবং চব্বিশ পরগনা জেলায় আন্দোলনটি তীব্র আকার ধারণ করে। এই আন্দোলন থেকে জমিদারি প্রথা বিলোপের স্লোগানও তোলা হয়েছিল।

তেভাগা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ছিলেন দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার  তালপুকুর গ্রামের সমির উদ্দিন ও শিবরাম মাঝি। সমির উদ্দিন ছিলেন মুসলমান এবং শিবরাম মাঝি ছিলেন আদিবাসী হাসদা সম্প্রদায়ের। বালুরঘাটে তেভাগা আন্দোলন বিশেষ শক্তি অর্জন করে। ১৯৪৭ এর২০ ফেব্রুয়ারি এখানকার কৃষক নেতাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করে। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষজন সহ অন্যান্য কৃষকেরা তীর, ধনুক, দা ও টাঙ্গি নিয়ে পুলিশি ধরপাকড়ের প্রতিরোধ করেন। পুলিশ গুলি চালায়। ২২ জন শহীদ হন। এঁদের মধ্যে ছিলেন যশোদারানি সরকার, চিয়ারসাই শেখ, কৌশল্যা কামারনী,  গুরুচরণ বর্মণ, কমরেড হোপন মার্ডি, মাঝি সরেন, দুখনা কোলকামার, পুরণা  কোলকামার, ফাগুয়া কোলকামার, ভোলানাথ কোলকামার, কৈলাশ ভুঁইমালী, থোতো  হেমরম, ভাদু বর্মণ, আশু বর্মণ, মঙ্গল বর্মণ, শ্যামাচরণ বর্মণ, নগেন বর্মণ,  ভুবন বর্মণ, ভবানী বর্মণ, জ্ঞান বর্মণ, নারায়ণ মুর্মু এবং গহুনিয়া  মাহাতো। 

এই আন্দোলনের প্রধান নেতাদের মধ্যে হাজী দানেশ, দেবপ্রসাদ ঘোষ (পটল ঘোষ), অজিত বসু, বিষ্ণু চট্টোপাধ্যায়, ইলা মিত্র, কংসারী হালদার, সুশীল সেন, নুর জালাল, গণেশ দাস, কৃষ্ণবিনোদ রায়, ভূপাল পান্ডা, রূপনারায়ণ রায়, ডা.গণেন্দ্রনাথ সরকার, বিমল দাশগুপ্ত, কালী সরকার প্রমুখ। তেভাগা আন্দোলনে মহিলাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ঘটে।

তেভাগা আন্দোলন দাবি আদায়ে সফল হয়। শতকরা ৪০ ভাগ বর্গাচাষি ভূমিমালিকদের কাছ থেকে ফসলের তিনভাগের দুই ভাগ আদায় করে নেন। তেভাগা আন্দোলনের ফলেই জোর করে অর্থ আদায়ের আবওয়াব নামের প্রথাটি অনেকটা সীমিত হয়ে যায়। তেভাগা আন্দোলনের ফলেই সরকার বাধ্য হয় ভাগচাষীদের দাবিকে খানিকটা খণ্ডিতভাবে হলেও আইনী স্বীকৃতি দিতে। ১৯৪৭ সালের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত হয় বেঙ্গল বর্গাদারস টেম্পোরারি রেগুলেশন বিল।

১২

তেলেঙ্গানা আন্দোলন (১৯৪৬ – ১৯৫১)

কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে চলা কৃষক আন্দোলনগুলির মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক, গভীর ও বিপ্লবী চরিত্রের ছিল তেলেঙ্গানার আন্দোলন। এই বিদ্রোহ দমনে সরকার সবচেয়ে বেশি বলপ্রয়োগ করেছিল। তেলেঙ্গানা অভ্যুত্থানে অন্তত চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। দশ হাজারের বেশি মানুষকে জেল ও বন্দী শিবিরগুলিতে আটকে রাখা হয়েছিল। এছাড়াও পুলিশ ও সেনা শিবিরে নানাভাবে নিগৃহীত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার।

তেলেঙ্গানা আন্দোলন শুরু হয় হায়দ্রাবাদের নিজাম রাজের চালানো সামন্তী জমিদারী রাজের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ কৃষক ও কৃষিমজুরদের ব্যাপক সংখ্যায় ঐক্যবদ্ধ করে। গ্রামের পর গ্রাম এই আন্দোলনের সূত্র ধরে বিপ্লবী কৃষক ও কৃষিমজুর কমিটির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। নিজামের বিরাট রাজাকার বাহিনী এই আন্দোলনকে সশস্ত্রভাবে গুঁড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হলে কমিউনিস্টরাও পালটা অস্ত্র ধারণ করে। জমিদারদের হাজার হাজার একর জমি দখল করে বিপ্লবী কৃষক ও কৃষিমজুর কমিটি তা ভূমিহীনদের মধ্যে বন্টন করে দেয়। গোটা আন্দোলনপর্বে পি. সুন্দরাইয়া সহ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব আন্দোলনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দৃঢ় রেখেছিল। ভারত রাষ্ট্রের হাতে নিজামশাহীর পরাজয়ের পরেও এই আন্দোলন জারি ছিল।

তেলেঙ্গানার জনগণের আর্থ-সামাজিক জীবনকে সে সময় তছনছ করে দিচ্ছিল লাগামহীন সামন্ততান্ত্রিক শোষণ। রাজ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ জমি ছিল সরকারি আর প্রায় ১০ শতাংশ ছিল নিজামের নিজস্ব সম্পত্তি। জায়গির এলাকাগুলি ছিল মোট রাজ্যের ৩০ শতাংশ। জায়গিরদাররা ছিল সামন্ততান্ত্রিক, প্রবল অত্যাচারী। এখানে, সেচসেবিত জমির উপর ভূমি কর ছিল সরকারি জমি থেকে আদায় করা করের দশগুণ। বিভিন্ন ধরণের অবৈধ আদায় এবং জোরপূর্বক শ্রম ছিল স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। এই জায়গিরদারদের মধ্যে কিছুর নিজস্ব পৃথক পুলিশ, রাজস্ব, দেওয়ানি এবং ফৌজদারি ব্যবস্থা ছিল।

জায়গীরদার ছাড়াও, দেশমুখ এবং দেশপাণ্ডেরা, যারা আগে সরকারের কর আদায়কারী ছিলেন এবং পরে জমিদারে পরিণত হন, হাজার হাজার একর উর্বর, চাষযোগ্য জমি অন্যায়ভাবে দখল করে নেন। এই জমি চাষকারী কৃষকদের ইচ্ছামত প্রজা হিসেবে নিয়োগ করা হত। এমনকি কৃষকদের দখলে থাকা জমিও অর্থনৈতিক সংকটের সময় জমিদাররা বাজেয়াপ্ত করে, যখন কৃষকরা কর দিতে অক্ষম ছিল।

তেলেঙ্গানায় শোষণ দমনের আর একটি হাতিয়ার ছিল বিনা মজুরীতে শ্রম দেবার ভেট্টি ব্যবস্থা। প্রতিটি দলিত পরিবারকে ভেট্টি করার জন্য অর্থাৎ বেগার খাটার জন্য পরিবারের একজনকে পাঠাতে হত। তাদের দৈনন্দিন কাজ ছিল জমিদারের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ করা এবং তাদের বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করা। দলিতরা, যারা জুতা সেলাই করত বা কৃষিকাজের জন্য চামড়ার জিনিসপত্র তৈরি করত, তাদের জমিদারদের বিনামূল্যে এগুলো সরবরাহ করতে বাধ্য করা হত। তাড়ি-কাটা শ্রমিকদের তাড়ি সরবরাহ করতে হত; রাখালদের, তাদের ভেড়াদের; তাঁতিদের, কাপড়ের কাজ; ছুতোর ও কামারদের, সমস্ত কৃষি সরঞ্জাম এবং কুমোরদের, হাঁড়ি, বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হত। ধোপাদের কাপড় ও বাসনপত্র ধুতে বাধ্য করা হত এবং নাপিতদের দিনে জমিদার বাড়িতে গিয়ে কারোর না কারো চুল দাড়ি কেটে দিয়ে আসতে হত রাতে জমিদারের পা টিপে তার শরীর মালিশ করতে হত। অন্যান্য কিছু অনগ্রসর সম্প্রদায়কে জমিদার পরিবারের পুরুষ ও মহিলাদের পালকিতে করে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে নিয়ে যেতে বাধ্য করা হত।

কৃষকরাও ভেট্টি থেকে রেহাই পায়নি। নিজেদের জমিতে কাজ করার আগে তাদের জমিদারের জমি চাষ করতে হত। জমিদারদের জমিতে জল না দেওয়া পর্যন্ত, কৃষকরা তাদের জমির জন্য জল পেত না। কৃষি শ্রমিকদের কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই জমিদারদের জমিতে কাজ করতে হত এবং তারপরেই তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য কৃষকদের কাজে যেতে হত। এই বিভিন্ন ধরণের জোরপূর্বক শ্রম এবং জোরপূর্বক আদায় কেবল জমিদারদের দ্বারাই নয়, বরং ক্ষুদ্র বা উচ্চপদস্থ সকল কর্মকর্তা দ্বারাও করা হত।

এই সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক নির্যাতনের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ছিল মেয়েদের ‘দাসী’ হিসেবে রাখার প্রচলন। জমিদাররা যখন তাদের মেয়েদের বিয়ে দিত তখন তারা তাদের বিবাহিত মেয়েদের সাথে এই দাসীদের তাদের শ্বশুরবাড়িতে নানারকম কাজ করার জন্য পাঠাত। জমিদাররা এই দাসীদের উপপত্নী হিসেবে ব্যবহার করত। ভেট্টি ব্যবস্থা তেলেঙ্গানার জনগণের জীবনকে সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত করেছিল এবং তাদের আত্মসম্মান নষ্ট করেছিল। এই ইস্যুতেই ১৯৪০ এর দশকের শুরুতে কৃষকরা সামন্ত প্রভুদের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। সে সময় প্রতিবাদ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি তেলেঙ্গানা অঞ্চলে একটি শক্তিশালী জনভিত্তি সম্পন্নশক্তিতে পরিণত হয়েছিল এবং নিপীড়িত প্রজা এবং গ্রামীণ দরিদ্রদের সাথে নিজেকে একীভূত করতে সক্ষম হয়েছিল।

কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে বামপন্থীরা ভেট্টি বিলোপ, কৃষিতে বিনা মজুরিতে কাজ নিষিদ্ধ, প্রজাদের উচ্ছেদ বন্ধ এবং তাদের চাষ করা জমির মালিকানা দলিল নিশ্চিতকরণ, কর ও খাজনার ব্যাপক হ্রাস, বাধ্যতামূলক জরিপ বন্দোবস্ত, তাড়ি গাছের উপর কর বিলোপ, জায়গিরদারি বিলোপ এবং পূর্ণ দায়িত্বশীল সরকার দাবি করেছিল এবং এই দাবিগুলির পিছনে জনগণকে একত্রিত করেছিল। গড়ে উঠেছিল অসংখ্য সংঘ।

তেলঙ্গানার জনগণের অসন্তোষ এবং উত্থান এতটাই গভীর এবং তীব্র ছিল যে তারা ভেট্টি, অবৈধ আদায়, বাধ্যতামূলক শস্য শুল্ক বন্ধ করে দেয় এবং জমিদারদের দ্বারা পূর্বে দখল করা জমিগুলি পুনরায় দখল করতে শুরু করে। জনগণ জমিদারদের সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধ করতে শুরু করে, সশস্ত্র পুলিশ এমনকি নিজামের সামরিক বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। মহিলারা সম্ভাব্য সকল উপায়ে প্রতিরোধে যোগ দেন। সংগ্রামী গান, লোকশিল্পের একটি গণ সাংস্কৃতিক উত্থান ঘটে তেলেঙ্গানা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। 

প্রতিরোধ আন্দোলনের অংশ হিসাবে, পার্টি আদালতের সমন এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অমান্য করার আহ্বান জানায়। জনগণ উৎসাহের সাথে সাড়া দেয় এবং এই সব নির্দেশাবলী অক্ষরে অক্ষরে পালন করে, প্রতিরোধের নতুন নতুন রূপ তৈরি করে। জনগণ কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের তাদের চোখের মণির মতো দেখত, ভালোবাসত, শ্রদ্ধা করত, সব বিপদ থেকে আগলে রাখার চেষ্টা করত।

কংগ্রেস রাজের বিরুদ্ধে সদ্য স্বাধীন ভারতে আন্দোলনকে একই মাত্রায় চালিয়ে যাওয়াতে কিছু জটিল সমস্যা দেখা দেয়। নেহরু সরকারের সঙ্গে আলাপ আলোচনার পর ১৯৫১ সালের অক্টোবরে এই আন্দোলনকে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় কমিউনিস্ট পার্টি।

স্বাধীনতার আগে পরে দাঙ্গাবিরোধী উদ্যোগ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কমিউনিস্ট কর্মীদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। পশ্চিম বাংলায় এই সময় পূর্ব বাংলা থেকে উদ্বাস্তু মানুষের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল। তাঁদের সুযোগ সুবিধার নানাদিকে কমিউনিস্ট কর্মীরা সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন। এই বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু জনতার মধ্যে কমিউনিস্টদের প্রভাব এর ফলে বৃদ্ধি পায়।

১৩

আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনানীদের সাজার প্রতিবাদ ও নৌ বিদ্রোহ (১৯৪৫ – ৪৭)

বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর ফ্যাসিবাদের মেঘ কেটে গেলে কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশ বিরোধী গণসংগ্রামে পরিপূর্ণ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ নৌ বিদ্রোহ, আজাদ হিন্দ সেনানীদের বিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টি বিরাট ভূমিকা নেয়। ১৯৪৫ সালের নভেম্বরে ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল আর্মির সেনাপতি শাহনওয়াজ, ধীলন ও সেগলের বিচার ও কারাদণ্ডের প্রতিবাদে কলকাতায় যে সাধারণ ধর্মঘট হয় কমিউনিস্টরা ছিলেন তার প্রথম সারিতে। ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশ ও সেনার সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। ২১ থেকে ২৫ নভেম্বর এই সংঘর্ষ তীব্র আকার নেয়। বোম্বে ও অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৪৬ এর ফেব্রুয়ারি মাসে ক্যাপ্টেন রশিদ আলির বিচারকে কেন্দ্র করে আন্দোলন আবার তীব্রতর হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ ও সারা ভারত ছাত্র ফেডারেশনের ডাকে ছাত্র ঘর্মঘট হয়। ওয়েলিংটন স্কোয়ারে ৫০০০ ছাত্র জমায়েতের ওপর পুলিশি আক্রমণ নামার খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্রই গোটা কলকাতা বিক্ষোভে স্তব্ধ হয়ে যায়। হাজারে হাজারে মানুষ পথে নেমে আসেন। ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি গোটা কলকাতা জুড়ে আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে খণ্ডযুদ্ধ চলে। ১২ ফেব্রুয়ারি সমস্ত ট্রাম, বাস, রিক্সা শ্রমিকরা তাঁদের ইউনিয়নের ডাকে সাড়া দিয়ে ধর্মঘট পালন করেন। এ. আই. টি. ইউ. সি.-র ডাকে উত্তরে কাঁকিনাড়া থেকে দক্ষিণে বজবজ পর্যন্ত বৃহত্তর কলকাতার শিল্পাঞ্চল ধর্মঘটে স্তব্ধ হয়ে যায়। ১২, ১৩, ১৪ তারিখ বিদ্রোহী কলকাতা ব্রিটিশ ফৌজকে পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখে। প্রতি আক্রমণে সেনা ও পুলিশ দুই শতাধিক তরুণ তরুণীকে হত্যা করে। গোটা ভারত এরপর প্রতিবাদে জ্বলে ওঠে। বম্বে, করাচী, লাহোর, অমৃতসর, দিল্লী, আগ্রা, কানপুর, পুনা, মাদ্রাজ, নাগপুর সহ ভারতের নানা শহরে যে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে তাতে কমিউনিস্ট পার্টি সামনের সারিতে ছিল। ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি শহরগুলিতে হরতাল পালিত হয়।

১৮ ফেব্রুয়ারি করাচী ও বোম্বের নৌ সেনারা বিদ্রোহ করেন। কলকাতা ও অন্যান্য অঞ্চলের নৌ সেনারা তাঁদের সমর্থন করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি বোম্বের তলোয়ার জাহাজে প্রথম বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল খারাপ খাদ্য, বর্ণবিদ্বেষী ব্যবহার ও সাম্প্রতিক দেশীয় পরিস্থিতিকে সামনে রেখে। পরদিন বোম্বের আরো প্রায় দু ডজন জাহাজে এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ২২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেশের সমস্ত নৌ ঘাঁটিতে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ৭৮ টি জাহাজ, ডাঙ্গার ২০ টি ঘাঁটি এবং ২০,০০০ নাবিক এই বিদ্রোহে সামিল হন। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ সহ অন্যান্যদের দ্বিধা দোদুল্যমানতার বিপরীতে কমিউনিস্ট পার্টি এই নৌ বিদ্রোহে সবচেয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।

নৌ বিদ্রোহের সময় যে বিরাট শ্রমিক আন্দোলন ও ধর্মঘটগুলি হয়েছিল, সেগুলি সংগঠনে কমিউনিস্টদের বিরাট ভূমিকা ছিল। মুম্বাই, কোচিন, করাচি, কোলকাতা, বিশাখাপত্তনম প্রভৃতি বড় বড় বন্দর শহরগুলিতে যে সব ধর্মঘট হয়েছিল তাতে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক অংশগ্রহণ করে। মুম্বাই ও তার শহরতলী মিলিয়ে যে ধর্মঘট হয়েছিল, সেখানে প্রায় তিন লক্ষ শ্রমিক অংশগ্রহণ করেছিল। আন্দোলন দমনে পুলিশি নির্যাতন ছিল লাগামছাড়া। পুলিশের গুলিতে সরকারী মতেই ২২৮ জন, বেসরকারি মতে পাঁচ শতাধিক শ্রমিক মারা গিয়েছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ এর বন্দী সেনানীদের মুক্তির দাবিতে ১৯৪৫ সালে কোলকাতায় যে ব্যাপক ছাত্র যুব বিক্ষোভ সংগঠিত করেছিলেন কমিউনিস্টরা, সেখানেও পুলিশ গুলি চালিয়েছিল। ১৯৪৬ সালে কমিউনিস্টরা সারা দেশের ডাক, তার ও টেলিকম বিভাগের কর্মীদের সংগঠিত করে বড় মাপের ধর্মঘটে সামিল হয়।

১৪

কমিউনিস্ট পার্টি ও সামাজিক আন্দোলন এবং দলিত প্রশ্ন –

বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা আর বি মোরে ছিলেন আম্বেদকরের অনুগামী এবং এই ধারা থেকেই ১৯৩০ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে এসেছিলেন। তার আগেই জাতীয়তাবাদী কমিউনিস্ট নেতা সিংঘরাভেলু চেট্টিয়ার তামিলনাড়ুতে শ্রমিক আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও জাতপাতবিরোধী আন্দোলনকে মিলিয়েছিলেন, কাজ করেছিলেন রামস্বামী পেরিয়ারের সঙ্গে। পরবর্তীকালে জাত পাতের প্রশ্নে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভেতর থেকে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ লড়াই করেছেন তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলেন পি. রামমূর্তি ও পি. জীবনানন্দন। জীবনানন্দন ছিলেন পেরিয়ারের অনুগামী আর পি. রামমূর্তি তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন ভগৎ সিং-এর অনুগামী হিসেবে। রামমূর্তি প্রথমে ছিলেন নওজোয়ান সভার সদস্য। তারপর তিনি চলে আসেন জাত পাত তোড়ক সমিতির কাজে। মন্দিরে দলিতদের প্রবেশাধিকারের আন্দোলনকে তিনি বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। দলিতদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কেরালার দুই বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা এ. কে. গোপালন এবং ই. এম. এস. নাম্বুদিরিপ্পাদেরও বিশেষ অবদান রয়েছে। অন্ধ্রের কমিউনিস্ট আন্দোলনের দুই বিশিষ্ট নেতা পি. সুন্দরাইয়া ও এম. বাসবপুন্নাইয়া দলিত কৃষিশ্রমিকদের সংগঠিত করে আন্দোলনে এমন জোয়ার সৃষ্টি করেন যে অন্ধ্রে কমিউনিস্ট পার্টিকে দলিতদের পার্টিও বলা হত।

১৫

সংবিধান সভা ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি

স্বাধীন হতে চলা ভারতের রাষ্ট্র চরিত্রের বুনিয়াদ নির্মাণের জন্য ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত সংবিধান লেখার যে পর্ব চলছিল, তাতে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন সোমনাথ লাহিড়ী। তিনি সংবিধান সভায় জনগণের সিংহভাগ অংশ শ্রমিক ও কৃষকের যথার্থ প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন। সংবিধান লেখার পদ্ধতির সমালোচনা করে তিনি বলেন এই সংবিধান অনেকাংশেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিন্যাসকে অনুসরণ করে লেখা হচ্ছে। এটা বদলে তিনি এমনভাবে স্বাধীন ভারতের সংবিধান লেখার ওপর জোর দেন যেখানে ঔপনিবেশিক প্রভাবগুলিকে সমূলে বাতিল করা হবে।

সোমনাথ লাহিড়ীর সংবিধান সভার বক্তৃতায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ রক্ষা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের বিশেষ অধিকার প্রদানের কথা। আর্থিক ও সামাজিক ন্যায়কে সুনিশ্চিত করার জন্য সংবিধানের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক নীতিমালাকে নিয়ে আসা দরকার বলে সোমনাথ লাহিড়ী তাঁর বক্তৃতায় অভিমত প্রকাশ করেন।

সংবিধান সভার বক্তৃতায় সোমনাথ লাহিড়ী যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। লাহিড়ী দাবি করেন সংবিধানে ক্ষমতার ভাগবিন্যাস এমন হওয়া চাই যেখানে কেন্দ্রের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হয়ে রাজ্য এবং স্থানীয় স্তরের জনপ্রতিনিধিদের হাতে বেশি ক্ষমতা আসবে।

সোমনাথ লাহিড়ী তাঁর সংবিধান সভার ভাষণে শ্রমিক ও কৃষকদের অধিকারের বিষয়গুলির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন।

শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরী, কাজের সুষ্ঠ পরিবেশ, ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার সুনিশ্চিত করার দাবি তিনি জোরের সঙ্গে তোলেন।

সংবিধান সভায় সোমনাথ লাহিড়ীর বক্তৃতায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান দাবি আমূল ভূমিসংস্কারের বিষয়টি। গ্রামীণ ভারতের তীব্র অসাম্য দূর করার জন্য ভূমিহীন কৃষকের হাতে জমির পুনর্বন্টনের মাধ্যমে জমি তুলে দেবার জোরালো দাবি তিনি তোলেন।

সোমনাথ লাহিড়ী কমিউনিস্ট আদর্শের যথার্থ প্রতিনিধিত্ব সংবিধান সভায় রাখতে পেরেছিলেন কিন্তু তিনি ছিলেন কমিউনিস্টদের একমাত্র প্রতিনিধি। দেশভাগের ফলে তাঁর আসনটিও বাদ চলে যায় এবং প্রথমদিকে সংবিধান সভায় থাকলেও পরের দিকে তিনি সংবিধান সভায় প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাননি। ফলে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আদল থেকে বের করে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দিকে সংবিধানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া তাঁর বা কমিউনিস্টদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে আম্বেদকর, কংগ্রেসের মধ্যেকার বামপন্থী অংশ, সোশালিস্ট শিবির ও গণ আন্দোলনের মধ্যে থেকে উঠে আসা বেশ কিছু প্রতিনিধির চাপে সংবিধান খানিকটা প্রগতিশীল চেহারা পেয়েছিল ও কিছু কিছু প্রশ্নে প্রবল আপত্তিজনক হলেও অনেক প্রশ্নে জনগণের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছিল।

আকর –

১) ডকুমেন্টস অব দ্য হিস্ট্রি অব দ্য কমিউনিস্ট মুভমেন্ট – ভল্যুম ওয়ান টু এইট – গঙ্গাধর অধিকারী ও অন্যান্য (সম্পাদিত) – পিপলস পাবলিশিং হাউস

২) ডকুমেন্টস অব দ্য কমিউনিস্ট মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া – ভল্যুম ওয়ান টু টোয়েন্টি ফাইভ – জ্যোতি বসু ও অন্যান্য (সম্পাদিত) ন্যাশানাল বুক এজেন্সি

৩) কমিউনিস্ট মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া – অরিন্দম সেন ও পার্থ ঘোষ – সি. পি. আই. (এম. এল.) লিবারেশন

৪) বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস অনুসন্ধান – খণ্ড ১ থেকে ১৫ – ভানুদেব দত্ত ও অন্যান্য (সম্পাদিত) – মনীষা পাবলিকেশন

৫) বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন দলিল ও প্রাথমিক তথ্য – খণ্ড ১ থেকে ৫ – অনিল বিশ্বাস ও অন্যান্য (সম্পাদিত) – এন. বি. এ.

মন্তব্য তালিকা - “স্বাধীনতা আন্দোলন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি”

  1. লেখাটি বিস্তৃত। অনেক তথ্য -উপাত্তে পুর্ন। তবে কিছু ত্রুটি আছে। যেমন, নাচোলের তেভাগা সংগ্রাম ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান হবার পর চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার। দ্বিতীয়ত, তালপুকুর গ্রামের শিবুরাম মাঝি সাঁওতালও নন, হাসদা পদবীধারীও নন। তাঁরা ছিলেন রায় ঘাটোয়াল। শিবুরাম অসুস্থ হলে, তাঁকে পিঠে করে, তাঁর পিতা শনিচর ঘাটোয়াল বিরল থেকে তালপুকুরের পাশে রামদেবপুরে নিয়ে আসেন। তালপুকুরের লড়াইয়ে তিনি শহীদ হন। আর দ্বিতীয় শহীদ সমিরুদ্দিন নন, সামিরুদ্দিন। তাঁদের পরিবার চাঁপাই নবাবগঞ্জ থেকে তালপুকুর, রামদেবপুর যেখানে অবস্থিত, সেই ভিঁয়াইল ইউনিয়ন বোর্ডের আত্রেয়ী নদীর পাশে একটি গ্রামে এসে বাড়ি করেছিলেন। আমার এলাকাগুলি ঘুরে ঘুরে লেখা এন বি এ প্রকাশিত ‘তেভাগার পথ ধরে’ বইটি পড়তে অনুরোধ করি।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।