সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

প্রাগৈতিহাসিক কালের নারী ভাস্কর্য

প্রাগৈতিহাসিক কালের নারী ভাস্কর্য

মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

জুন ৬, ২০২৬ ২৭ 0

প্রাগৈতিহাসিক প্রথম ভেনাস তবে মানুষী নয়, তারা মানবী

আগ্নেয় শিলার এই ক্ষুদ্র টুকরোটিকে দেখলে কী মনে হয়? প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি অস্পষ্ট এক নারী মূর্তির মতো দেখতে লাগে? তবে মাইক্রোস্কোপের নিচে, ঘাড়ের চারপাশে এবং দেহের পাশের খাঁজগুলি দেখলে বোঝা যায় শুধু প্রাকৃতিক উপায়ে নয় — ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ধারালো যন্ত্র দিয়ে পাথরের টুকরোকে কিছুটা নারীর আকারে পরিবর্তন করা হয়েছে। সম্ভবত শুরুতে পাথরটির স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা মানব আকৃতি ছিল, সেটা আবার পরে খোদাই করে স্পষ্ট করা হয়েছে।

চিত্র ১

ইজরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী অংশে অবস্থিত, ‘গোলান হাইটস’-এর কাছে, ‘বেরখাত রাম’ লেক-এর ধারে ১৯৮১ সালে আবিষ্কৃত ‘বেরখাত রাম’ মূর্তিটিকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা প্রাগৈতিহাসিক ভাস্কর্যের প্রাচীনতম এক নিদর্শন বলে মনে করেন (চিত্র ১)।

প্রাথমিকভাবে ‘বেরখাত রাম’ মূর্তিটিকে নিয়ে বিতর্ক হয়েছে — কিছু প্রত্নতত্ত্ববিদ তখন মনে করেছেন, এটি প্রাকৃতিক ক্ষয়ের জন্য বর্তমান চেহারা নিয়েছে। অবশেষে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে আলেকজান্ডার মার্শ্যাক-এর আণুবীক্ষণিক বিশ্লেষণ নিশ্চিত করেছে যে ‘বেরখাত রাম’ মূর্তি তৈরিতে মানবের হাত আছে। তিনি বলেছেন, মূর্তিটি আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের দুটি স্তরের মধ্যে পাওয়া গেছে, যার উপরের স্তরটি প্রায় ২.৩ লক্ষ বছর আগের; আর নিচেরটি ছিল ৭ লক্ষ বছর আগের — পাথরটি এই দুটি সময়কালের মধ্যে কোনো এক সময়ে খোদাই করা হয়েছিল। শুনে অবাক হবেন না, চমকে উঠবেন না — যদিও চমকে ওঠার মতোই এই তথ্য। এই ডেটিং যে সময়কালকে ইঙ্গিত করছে তা তাজ্জব করে দেয়; কারণ তখনও ‘হোমো সেপিয়েন্স’ বা মানুষের উদ্ভবই হয়নি।

তবে কারা পাথরের ছিলকা তুলে তৈরি করল এই মূর্তি! সম্ভবত ‘হোমো ইরেক্টাস’-এর মতো প্রাচীন কোনো মানব প্রজাতি এই মূর্তি তৈরিতে হাত লাগিয়েছিল। এদেরই এক শাখা থেকে ‘হোমো সেপিয়েন্স’ বা মানুষ উদ্ভুত হয়েছে। ‘হোমো ইরেক্টাস’-রা ছিল প্রথম শিকারি ও সংগ্রহকারী মানব প্রজাতি। এরা পাথরের হাতিয়ারের দু’দিকের পাথরের আঁশ উঠিয়ে নিখুঁতভাবে ধারালো করতে পারত। এই ধরনের হাতিয়ার দিয়ে তাদের পক্ষে পাথর কেটে মানবী মূর্তির সামান্য আদল আনা সম্ভব। এদের সঙ্গে আদিম মানুষের চেহারারও বেশ মিল ছিল।

‘বেরখাত রাম’-এর ভেনাস মূর্তি মাত্র ৩.৫ সেমি লম্বা—আমাদের তর্জনীর দৈর্ঘের প্রায় অর্ধেক। ঝামা পাথরের উপরে একটি ধারালো পাথর দিয়ে কমপক্ষে তিনটি খাঁজের মতো তৈরি করা হয়েছিল।

‘বেরখাত রাম’ আবিষ্কারের পরে উত্তর আফ্রিকার মরক্কোতে একই রকমের আরেকটি বস্তুর সন্ধান পাওয়া গেছে। তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ট্যান-ট্যান’-এর ‘ভেনাস’, এটি আবার ৫ থেকে ২ লক্ষ বছর আগের মাটির দুটি স্তরের মধ্যে স্যান্ডউইচ অবস্থায় ছিল।

এই মূর্তি দুটির অবস্থান ও আবিষ্কার যেন পরস্পরকে প্রমাণিত করছে। এগুলি শুধু প্রাথমিক শিল্পবস্তু ও ভাস্কর্য নয়, সম্ভবত প্রাথমিক মাতৃমূর্তিও বটে।

এ’ দুটি ছাড়াও পরবর্তী সময়ে পাওয়া গেছে বিভিন্ন নারীমূর্তি বা সম্ভাব্য মাতৃমূর্তি। ৩০ থেকে ২০ হাজার বছর আগে এই ধরনের মূর্তির প্রবল আবির্ভাব দেখা যায়। অবশ্য এই মূর্তিগুলি, সেই প্রাগৈতিহাসিক কালে, তৈরি করেছে —মানুষ, ‘হোমো সেপিয়েন্স’ — আমাদের পূর্বপুরুষ৷ পাথর বা ম্যামথ-এর দাঁত দিয়ে তৈরি স্থূল ‘ভেনাস’ মূর্তি শেষ প্রস্তরযুগে ইউরোপের দক্ষিণ দিকে প্রচুর পাওয়া গেছে — মোটের উপরে ১৫০টি গুহায় ২০০টি মূর্তি মিলেছে।

মানুষের তৈরি প্রাগৈতিহাসিক কালের কয়েকটি সম্ভাব্য মাতৃমূর্তি উলি ম্যামথের দাঁতের উপরে খোদাই করে তোলা ছোট্ট মূর্তিটির দিকে তাকিয়ে দেখুন (চিত্র ২)। ২০০৮ সালে জার্মানিতে এক গুহায় পুরু আস্তরণের নিচে এক আঙ্গুল সমান মূর্তিটি পাওয়া গেছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভেনাস অফ হোল ফেল্স’। বড়ো প্রাচীন এই মূর্তি — ৪০-৩৫ হাজার বছর আগের মূর্তিটিকে রূপক শিল্পের প্রাচীনতম উদাহরণগুলির মধ্যে একটি বলা যায়। স্পষ্টতই মূর্তিটি একজন নারীর। মূর্তিটি দেখে আজকের সুন্দরী রমণীর ছিমছাম চেহারা অবশ্য মনে পড়ে না — তার সম্পদ স্থূলকায়, ভারি, বেলুনের মতো স্তন এবং বিস্তৃতভাবে খোদাই করা যৌনাঙ্গ।

চিত্র ২

এই ‘ভেনাস’ মূর্তিটির মাথা নেই — মাথা এবং মুখ ম্যামথ-এর দাঁতের একটি ছোটো লুপ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। হয়তো মূর্তিটি গলায় ঝুলিয়ে রাখা হত। মূর্তিতে কোনো হাত বা পা দেখানো হয়নি, বড়ো স্তনগুলি শরীর থেকে যেন বেরিয়ে গেছে। যদিও প্রস্তর যুগের ভেনাস নিয়ে বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তবে তাদের স্পষ্ট যৌন বৈশিষ্ট্যগুলি ইঙ্গিত করে যে তারা উর্বরতার প্রতীক।

৪০ হাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকে ইজরায়েল ও পূর্ব ইউরোপ হয়ে মানুষ সবে এসেছে তুষারাবৃত জার্মানিতে। লড়াই করছে ম্যামথ, গুহা সিংহ, গুহা ভাল্লুকের সঙ্গে। শিকার করছে বুনো ঘোড়া, হরিণ। সেই সময়ে দীর্ঘ অবসর সময় বের করে এই মূর্তি তৈরি করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, এই মূর্তি ফলবতী হবার তীব্র আকাঙ্খার প্রতীক — মূর্তিগুলি ধর্মীয় বা শামানীয় কাজের সঙ্গে যুক্ত। কিছু বিশেষজ্ঞ এই ধরনের টুকরোগুলিকে ‘শিকারের জাদু’ হিসেবে দেখেছেন।

প্রাগৈতিহাসিক ও বর্তমান শিকারি-সংগ্রাহক সমাজের জগৎ ও আধ্যাত্মিক জগতের মধ্যে মধ্যস্থতাকারিকে শামান বলে। শামানরা সাধারণত পুরুষ, কিন্তু, নারীরাও শামানবাদ অনুশীলন করতে পারেন। প্রাগৈতিহাসিক এবং বর্তমান শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে শামানবাদ প্রায় সমস্ত জনজাতি সমাজের মধ্যে বিদ্যমান।

মূর্তিগুলি শুধু শিল্পকাজ নয়—সম্ভবত এই মূর্তি বেঁচে থাকার জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল।

কয়েক হাজার বছরের মধ্যে, এই অদম্য উদ্ভাবনী শক্তি প্রস্তর যুগের ফ্রান্স এবং স্পেন-এ শিল্পের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

চিত্র ৩

অস্ট্রিয়ার দানিউব নদীর তীরে উইলেনডর্ফ অঞ্চল থেকে ৩০ হাজার বছরের পুরানো ‘ভেনাস’ মূর্তিটি ১৯০৮ সালে আবিষ্কৃত হয়। একটি চা চামচের থেকে সামান্য ছোটো এই মূর্তি। অত্যাধুনিক উষ্ণীষ সহ প্রাপ্তবয়স্ক মুখবিহীন এই নারীর মূর্তিতেও আছে অতিরঞ্জিত যৌনাঙ্গ, উঠে আসা নিতম্ব, প্রসারিত পেট, ভারি স্তন। তখন ইউরোপে তুষার যুগ চলছে, জলবায়ু ছিল মনুষ্য বসবাসের পক্ষে প্রতিকূল। খাদ্য সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। হয়তো সেই বিরুদ্ধ পরিবেশে শরীরে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত নারী প্রশংসার পাত্র ছিল। তার মাংসল নিতম্ব এবং প্রশস্ত পেট হয়তো ছিল তখনকার মহিলাদের জন্য ঈপ্সিত শারীরিক মান। মূর্তিটিকে গিরিমাটি দিয়ে লাল রঙ করা হয়েছিল। লাল গিরিমাটি দিয়ে মূর্তিটিকে রং করানোর প্রক্রিয়ার নিশ্চিত কোনো ধর্মীয় তাৎপর্য ছিল, কারণ ওই সময়ে মৃতদের নিয়মিতভাবে লাল গিরিমাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হত।

ফ্রান্স-এর লুসেল গুহাতে যে নগ্ন নারী মূর্তি পাওয়া গেছে তা প্রায় ২০ হাজার বছরের পুরানো। ভাস্কর্যটি প্রাচীরের একটি অংশে খোদাই করা হয়েছে। চুনাপাথরের উপরে খোদাই করা এক হাত সমান এই মূর্তিকে দেখে মনে হয় তিনি সন্তানসম্ভবা। পুরো মূর্তি লাল গিরিমাটি দিয়ে রং করা ছিল৷ প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলেছেন — ’এই রং রক্তের বিকল্প।’ তার ডান হাতে সম্ভবত আছে একটি বাইসন-এর শিং। বাঁ হাত পেটের উপর রাখা। পণ্ডিতরা মূর্তিটিকে উর্বরতা দেবী বা শামান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। হাতের বাইসন-এর শিং নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। অনেকে বলেছেন, এটি শিং নয়, এটি হল চাঁদের কলা। অর্ধচন্দ্রাকার লম্বা দাগগুলিকে এক প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার এক বছরের মাসিক চক্রের সংখ্যা বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

চিত্র ৪

‘নির্লজ্জ ভেনাস’

প্রাগৈতিহাসিক যুগে প্রাথমিক যে মূর্তিগুলি পাওয়া গেছে তাদের আকৃতি মোটেই আজকের সুন্দর নারীর দেহের মাপ মতো নয়। ঊনবিংশ শতক থেকে এই সব মূর্তি উদ্ধারের পরে তাদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভেনাস’। রোমক যুগের সৌন্দর্যের দেবীকে বলা হত ‘ভেনাস’ — ‘ভেনাস’ হল আজকের ইউরোপীয় নারী-সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি। তাই আধুনিক ইউরোপীয় সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি অনুযায়ী প্রস্তর যুগের নারী মূর্তিকেও আবিষ্কারের পরে বলা হত ‘ভেনাস’। তবে মূর্তিগুলির বেলুনের মতো স্তন এবং বিস্তৃতভাবে খোদাই করা যৌনাঙ্গ দেখে তাদের বলা হত ‘নির্লজ্জ ভেনাস’।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ঐতিহাসিক কালে পুরুষের তথা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী কতটা পাল্টে গেছে এই বক্রোক্তি তার প্রমাণ — পুরাতত্ববিদদের মনের মধ্যে আছে রোমক যুগের সুন্দরী রমণীর ‘বালি ঘড়ি’-র মতো ছিমছাম চেহারার প্রতিমূর্তি।

চিত্র ৫

প্রাগৈতিহাসিক লিঙ্গ ভাস্কর্য

প্রস্তর যুগে পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্য তুলনামূলকভাবে দুষ্প্রাপ্য৷ সেই সময়ে মাতৃমূর্তি পুরুষের মূর্তির তুলনায় অনেক বেশি পাওয়া গেছে। আবার পুরুষ মূর্তির তুলনায় তার যৌনাঙ্গের মূর্তি বেশি পাওয়া যায়। বেশির ভাগ পুংজননেন্দ্রি়য়র লিঙ্গাগ্রের ত্বক কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেই সময়ে প্রস্তুত শিং, হাড় বা পাথরে খোদাই করা অল্প সংখ্যক লিঙ্গ মূর্তি এখনও টিকে আছে। সাধারণভাবে এই ভাস্কর্য সর্বাধিক পাওয়া গেছে পশ্চিম ইউরোপে—আনুমানিক ৪০-১২ হাজার বছর আগে।

প্রস্তর যুগের বিভিন্ন ভাস্কর্যে পুরুষাঙ্গের উত্থান স্পষ্টভাবে দেখানো পুরুষাঙ্গের উত্থানকে জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে শামানীয় ক্রান্তিকালের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনা হিসেবে বোঝা যেতে পারে।

চিত্র ৬

ফ্রান্সের দক্ষিণে একটি প্রত্নস্থল থেকে গবেষকরা দাবি করেছেন, নারী যৌনাঙ্গের খোদাই করা পাথর পাওয়া গেছে। ৩৭ থেকে ৩৬ হাজার বছর আগের এই খোদাই শিল্প সম্ভবত বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন৷

প্রাগৈতিহাসিক মানুষের মাতৃমূর্তি ও লিঙ্গ তৈরির তাত্পর্য

নারীদের সন্তানের জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা সেই সময়ের পুরোহিত তথা শামানদের চমৎকৃত করত। শুধুমাত্র সন্তানের জন্ম নয়, তাদের স্তনদান করা, এমনকি নারীর রজঃস্বলা হওয়াও তাদের বিস্মিত করত। ঋতুস্রাব প্রাণিজগতে বিরল ঘটনা, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যেও এই ঘটনা বিরল। কিছু প্রাইমেটদের ঋতুস্রাব হয়, যদিও মানুষের মতো পরিমাণে এত বেশি নয়।

প্রাগৈতিহাসিক মানুষ সন্তানের জন্মের অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়া বুঝতে পারত না। যৌনমিলনের পরে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হবার ফলে সন্তানের জন্ম হয়, তাই যৌনমিলনের সঙ্গে সন্তান ধারণকে যুক্ত করা প্রাথমিকভাবে সম্ভব হয়নি। পুরুষ সন্তানের জন্ম দিতে পারে না, স্তনদান করতেও পারে না। নারীর সন্তান ধারণ ও পালন ছিল সেই সব প্রাগৈতিহাসিক মানুষের কাছে এক বিস্ময়।

আবার কোনো আঘাত ছাড়া প্রতি মাসে নারীদের নিয়মিত রক্তমোক্ষণ তাদের কাছে ছিল ভীতিপ্রদ। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে রহস্যময় নারীরক্ত ও নারীর উর্বরতাশক্তি পুরুষদের বিস্ময় উদ্রেক করেছে। এইসব কারণে গর্ভবতী নারী তাদের ভয়ার্ত করত। আসন্নপ্রসবা নারীর মূর্তি তৈরি করে সম্ভবত তারা নারীর এই ক্ষমতাকে পূজা করত।

শেষ প্রস্তর যুগের লিঙ্গমূর্তি ও নারী যোনি থেকে মনে করা যায় যে, এগুলিকে তারা ঐশ্বরিক বলে মনে করত। মাতৃমূর্তি ও তার প্রতীক সম্ভবত প্রাথমিক দেবতা ছিল। এই মূর্তি নব্যপ্রস্তরযুগে ও তার পরবর্তীকালেও ফার্টাইল ক্রিসেন্ট, রাশিয়ার স্তেপভূমি, মেহেরগড়, হরপ্পীয় সভ্যতা, এমনকী ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে গিয়েছিল। কৃষি ও পশুপালনের পরে একই স্থানে থাকবার ফলে সন্তান ধারনের প্রক্রিয়া আরও পরিষ্কার হয়।

সন্তান উৎপাদনে লিঙ্গ ও যোনির তাৎপর্য ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়। এরা হয় উর্বরতার প্রতীক। সম্ভবত এই সব মূর্তিকে তাবিজ করেও পরা হত। পরে নারী ও পুরুষ দেবতার মূর্তি আসে। ঠিক কবে থেকে মূর্তি পূজার প্রচলন হল বলা মুশকিল। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে বোঝা যায় যে, অন্ততপক্ষে ৬ হাজার বছর আগে থেকে মূর্তিপূজা পুরাতন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। সাধারণপূর্ব চতুর্থ ও তৃতীয় সহস্রাব্দের নব্যপ্রস্তরযুগীয় এজিয়ান সাগরের বুকে বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জে গ্রিকমূর্তি, সাধারণপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে হরপ্পীয় সভ্যতা থেকে পাওয়া মূর্তি কিছু উদাহরণ মাত্র —তবে এগুলি প্রাচীনতম নয়।

চিত্র পরিচিতি

চিত্র ১ – প্রস্তর যুগের ‘বেরখাত রাম’, চিত্র ঋণ – www.donsmaps.com

চিত্র ২ – ‘ভেনাস অফ হোল ফেল্স’, চিত্র ঋণ – এইচ জেনসেন, ইউনিভার্সিটি টিউবিনজেন।

চিত্র ৩ – উইলেনডর্ফ-এর ‘ভেনাস’, চিত্র ঋণ – Naturhistorisches Museum in Vienna, Austria, পাবলিক ডোমেইন।

চিত্র ৪ – ফ্রান্স-এর লুসেল গুহার নারী মূর্তি, চিত্র ঋণ – বোর্দো জাদুঘর, ফ্রান্স, উইকিপিডিয়া, পাবলিক ডোমেইন।

চিত্র ৫ – রোমক যুগের সৌন্দর্যের দেবীকে বলা হত ‘ভেনাস’, চিত্র ঋণ – পাবলিক ডোমেইন।

চিত্র ৬ – জার্মানির ‘হোল ফেল্স’ গুহায় পাওয়া পুরুষ লিঙ্গ, চিত্র ঋণ – জে লিপটাক, ব্ল্যাবিউরেন মিউজিয়াম।

তথ্যসূত্র

১. A. Marshack, The Berekhat Ram figurine: a late Acheulean carving from the Middle East. Antiquity 71, 327–37 (1997).

২. Don Hitchcock, The Tan-Tan Venus. https://donsmaps.com/tantanvenus.html.

৩. N. J Conard, A Female figurine from the basal Aurignacian of Hohle Fels Cave in southwestern Germany. Nature 459, 248–252 (2009).

৪. GW Weber, The microstructure and the origin of the Venus from Willendorf. Sci Rep. 28, 12(1), 2926. (2022).

৫. E. O. James, The Cult of the Mother Goddess, 15 (Thames and Hudson, 1959).

৬. Susi and Ruedi on tour, The Ochre Pits, (2008).

schoensleben.ch/sur/content/journeys/oceania/australia/2008/trip_04/detail_sheets/ochre_pits_e.shtml

৭. Lynne Hume, Australian Aboriginal Shamanism, in Shamanism: An Encyclopedia of World Beliefs, Practices and Culture. Edited by Mariko Namba Walter and Eva Jane Neumann Fridman, 863-865 (ABC-Clio, 2004).

৮. Dilip Chakrabarty, The Archeology of Hinduism. Ed. Timothy Insoll, Archaeology and World Religion. 36 (Routledge, 2001).

৯. J. M.; Kenoyer, et al, An upper Palaeolithic shrine in India? Antiquity. 57(220) 88–94 (1983). doi:10.1017/S0003598X00055253.

১০. Sheeren Ratnagar, Understanding Harappa: Civilization in the Greater Indus Valley. (Tulika Book, 2002).

১১. Ranabir Chakravarti, Exploring Early India- up to c.AD 1300, 35 (Primas Books, 2016).

১২. মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, ধর্মের সূচনা ও দেবতার জন্ম, (সাহিত্য সংসদ, ২০২৬)।

বিজ্ঞান ও ইতিহাস বিষয়ক লেখক।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।