সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

শতাব্দীর সেরা দ্বৈরথ (দ্বিতীয় পর্ব)

শতাব্দীর সেরা দ্বৈরথ (দ্বিতীয় পর্ব)

আগস্ট ১১, ২০২০ ৩০২

পূর্ববর্তী পর্বের লিংক : শতাব্দীর সেরা দ্বৈরথ (প্রথম পর্ব)

১৯৭০ সালের নভেম্বর আর ডিসেম্বর মাসে স্পেনে ইন্টারজোনাল টুর্নামেন্টের আসর বসে। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্যে পয়েন্টের বিচারে সারা পৃথিবীর দাবা খেলিয়ে দেশগুলোর সেরা চব্বিশজন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। এইবার কিন্তু আমেরিকা থেকে ববি ফিশার অংশ নিলেন। শুধু তাই নয় সাড়ে আঠেরো পয়েন্ট পেয়ে তালিকায় সবার শীর্ষে রইলেন তিনি। নিয়মমতো এই টুর্নামেন্টের প্রথম ছয় জন সুযোগ পেলেন ১৯৭১ সালের ক্যান্ডিডেটস টুর্নামেন্টে। সাথে পূর্ববর্তী মানে ১৯৬৮ সালের ক্যান্ডিডেটস টুর্নামেন্টের দুই ফাইনালিস্টের সুযোগ পাওয়ার কথা। কিন্তু যেহেতু বরিস স্প্যাসকি আগেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান হয়ে গেছেন তাই এইবার রানার্স আপ ভিক্টর করশনয় আর তৃতীয় স্থান অধিকারী মিখায়েল তাল-এর নাম নথিভুক্ত করা হলো। মোট আটজনকে নিয়ে মে মাসে শুরু হলো ক্যান্ডিডেটস টুর্নামেন্ট। নক আউট প্রতিযোগিতার প্রথম কোয়ার্টার ফাইনাল আর সেমিফাইনালে ববি ফিশার প্রতিপক্ষদের দাঁড়াতেই দিলেন না। দশ রাউন্ডের দুটো ম্যাচেই সরাসরি প্রথম ছটা করে গেম জিতে সবাইকে চমকে দিলেন তিনি। শেষে সেই বছরের সেপ্টেম্বর আর অক্টোবর মাস জুড়ে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনোস আইরেস-এ আয়োজিত ফাইনালে দুবারের প্রাক্তন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান টাইগ্রেন পেট্রোসিয়ানকে হেলায় হারালেন ববি ফিশার। সেখানে নয় রাউন্ড খেলায় ফিশার জেতেন পাঁচটা। পেট্রোসিয়ান মাত্র একটা। তিনটে গেম ড্র হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ক্যান্ডিডেটস টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ান হিসাবে ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক চেস ফেডারেশন ববি ফিশারকে সেই সময় দাবায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান বরিস স্প্যাসকির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জার হিসাবে মনোনীত করে। এছাড়াও ১৯৭০ আর ৭১ সালে পরপর কুড়িটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ জিতে পয়েন্টের হিসাবে ইন্টারন্যাশনাল চেস ফেডারেশনের তালিকায় একেবারে শীর্ষে উঠে আসেন ববি ফিশার।

১৯৭২ সালের জুলাই মাসে আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকিয়াভিক শহরে আয়োজন করা হলো ২৪ রাউন্ডের চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচের। শতাব্দীর অন্যতম সেরা এই প্রতিযোগিতায় মুখোমুখি হবেন বরিস স্প্যাসকি আর ববি ফিশার। তবে এমন নয় যে আগে কখনো তাঁরা দু’জন মুখোমুখি হননি। ১৯৬৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মোনিকায় আয়োজিত একটা প্রদর্শনী ম্যাচে সমান সমান লড়েও শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে ববি ফিশার হেরেছিলেন বরিস স্প্যাসকির কাছে। এরপর ১৯৭০ সালে পশ্চিম জার্মানির সিগেন শহরে আয়োজিত ১৯-তম চেস অলিম্পিয়াডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য হিসাবে এসেছিলেন ববি ফিশার। সেখানে একটা পাঁচ রাউন্ডের ম্যাচে ববি ফিশার মুখোমুখি হয়েছিলেন বরিস স্প্যাসকির। দীর্ঘস্থায়ী সেই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে শেষ পর্যন্ত হেরে যান ফিশার। তিন রাউন্ড জিতেছিলেন স্প্যাসকি। দু’বার ড্র হয়। মনে রাখতে হবে সেই সময় স্প্যাসকি ছিলেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ান। তবুও একজন রাশিয়ান দাবাড়ুর কাছে হেরে যাওয়াটা ফিশার মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। তাই ১৯৭২ সালের চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচ ববি ফিশারের কাছে শুধু খেতাব ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই ছিল না। প্রতিশোধ নেওয়ার একটা সুযোগও চলে এলো তাঁর হাতে।

এর অনেক আগে ববি ফিশার ১৯৬২ সালে সোভিয়েত রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ইন্টারজোনাল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে মাঝপথে প্রতিযোগিতা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। রাশিয়ান দাবাড়ুদের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ আনেন তিনি। তিনি নাকি পাশের টেবিলগুলোয় লক্ষ্য করে দেখেছিলেন যে রাশিয়ান গ্রান্ড মাস্টাররা এমন ভাবে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে কিছু ম্যাচ ড্র করে দিতেন যাতে পয়েন্টের গেরোয় পড়ে অন্য দেশের খেলোয়াড়রা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যান। যদিও অনেক পরে ব্যাপারটা অনেকাংশে সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল তবুও রাশিয়ান চেস প্লেয়ারদের সম্পর্কে ক্রমাগত বাজে মন্তব্য করার জন্যে সোভিয়েত রাশিয়া বেশ কিছুদিনের জন্যে ববি ফিশারের ভিসা বাতিল করে দেয়। কিন্তু রাশিয়ান প্লেয়ারদের উপর রাগ ফিশারের কোনোদিন কমেনি। তাই কোনো টুর্নামেন্টে কোনো রাশিয়ান গ্রান্ড মাস্টারকে প্রতিপক্ষ হিসাবে পেলে তিনি খুব হেনস্থা করে হারাতেন। এমনকি এই ব্যাপারে বাদ যাননি সোভিয়েত রাশিয়ার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান টাইগ্রেন পেট্রোসিয়ান আর মার্ক তাইমানোভ। নাচিয়ে ছেড়েছিলেন তাঁদের।

সারা মার্কিন মুলুকে সোনালী চুলের দীর্ঘদেহী ববি ফিশারের জনপ্রিয়তা ছিল সেই সময়ের হলিউডের যে কোনো নায়কের থেকে বেশি। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। শুধু আমেরিকাই বা কেন সারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকেও প্রতিদিন অসংখ্য ফ্যান লেটার আসতো ফিশারের ঠিকানায়। কিন্তু খুব ছোটবেলা থেকেই আশ্চর্য প্রতিভার অধিকারী হলেও ববি ফিশার ছিলেন ভীষণ রকম জেদি আর একরোখা। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সম্পর্কে প্রায়ই বেফাঁস মন্তব্য করে বসতেন। খানিকটা দাম্ভিক আর অহংকারীও বটে। তবে ইতিহাস সাক্ষী আছে সত্যিকারের প্রতিভার সাথে দম্ভের মিশেল বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো চরিত্রকে বর্ণময় আর রঙ্গীন করে তোলে। ববি ফিশারও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। প্রচণ্ড জনপ্রিয় ববি ফিশার কোনো প্রতিযোগিতায় প্রাইজ মানি বেশি না থাকলে অংশ নিতে চাইতেন না। তবে এটাও স্বীকার করতে হবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চেস কম্পিটিশনে বিরাট অংকের প্রাইজ-মানি ঘোষণার পিছনে ববি ফিশারের বিরাট অবদান আছে। কারণ সেই সময় ফর্মুলা ওয়ান কার রেস আর বক্সিং ছাড়া ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের অন্য কোনো খেলায় প্রতিযোগীরা পুরস্কার হিসাবে বিশেষ কিছু অর্থমূল্য পেতেন না।

১৯৭২ সালের চেস চ্যাম্পিয়ানশিপেও এর কোনো ব্যতিক্রম হলো না। ববি ফিশার প্রাইজ মানি বাড়ানোর জন্যে জেদ ধরে বসলেন। এর আগে ১৯৬৯ সালের বিশ্ব খেতাব জয়ের লড়াইয়ে টাইগ্রেন পেট্রোসিয়ানকে হারিয়ে বরিস স্প্যাসকি মাত্র ১৪০০ মার্কিন ডলার প্রাইজ মানি পেয়েছিলেন। কিন্তু ববি ফিশার ওই সামান্য অংকের জন্যে খেলতে রাজি ছিলেন না। বাধ্য হয়ে আয়োজক দেশ আইসল্যান্ড সরকার প্রথমে আরো ৬২৫০০ ডলার আর পরে সেটাও বাড়িয়ে ১২৫০০০ ডলার দিতে রাজি হলো। এগিয়ে এলো যুগোশ্লোভিয়া। প্রথমে অতিরিক্ত ৭৬০০০ ডলার পুরস্কারমূল্য ঘোষণা করলেও পরে সেটা বাড়িয়ে ১৫২০০০ ডলার দিতে রাজি হয় তারা। পিছিয়ে রইলো না আর্জেন্টিনা। রাজধানী বুয়েনোস আইরেস থেকে খবর আসে তারাও ১০০০০০ ডলার দিতে রাজি। সবচাইতে চমকপ্রদ ঘটনা ঘটলো যখন জিম স্লেটার নামে গ্রেট ব্রিটেনের একজন দাবাপ্রেমী শিল্পপতি পুরস্কার হিসাবে আলাদা ভাবে ১২৫০০০ ডলার দেওয়ার কথা ঘোষণা করে বসলেন। ফলে সব মিলিয়ে প্রাইজ মানির অংকটা গিয়ে দাঁড়ালো ১৮৮৬ সাল থেকে আয়োজিত আগের সাতাশটা দাবা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের মোট পুরস্কার মূল্যের চেয়ে অনেকটাই বেশি।

বিভিন্ন দেশ থেকে এতো প্রাইজ-মানি ঘোষণা করার পিছনে অবশ্যই একটা কারণ ছিল। আগেই বলেছি যে এই লড়াইকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশ তখন দুই শিবিরে বিভক্ত। পুঁজিবাদ বনাম সাম্যবাদ। ক্যাপিটালিস্ট দেশগুলো ববি ফিশারকে দিয়ে যেন কম্যুনিস্ট দুনিয়ার প্রতিভূ বরিস স্প্যাসকিকে টাইট দিতে চাইছে। আবার উল্টো দিক থেকেও দেখলে ব্যাপারটা একই। অথচ বরিস স্প্যাসকি বা ববি ফিশার দুজনেই এইসব নিয়ে বিশেষ কিছু ভাবনা-চিন্তা করেছিলেন বলে মনে হয় না।

যাই হোক, ববি ফিশার আইসল্যান্ড চেস ফেডারেশনের (ICF) কাছে টিভি সম্প্রসারণ স্বত্ব থেকে পাওয়া অর্থের একটা অংশ ছাড়াও গ্যারান্টি ফি হিসাবে ম্যাচের আগে তাঁর ব্যাংক একাউন্টে বিজিত পক্ষের প্রাপ্য ন্যূনতম প্রাইজ মানির অর্ধেক অর্থাৎ ৪৬৮৭৫ মার্কিন ডলার জমা করার দাবি জানিয়ে বসলেন। বলাবাহুল্য ববি ফিশারের প্রস্তাব নাকচ করে ‘আই সি এফ’। এমনিতে চ্যাম্পিয়নশিপের এই খেতাবি লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করার জন্যে লিখিত ভাবে ফিশার কোনো সম্মতি পত্রে সই-সাবুদ করেননি। ফলে আইসল্যান্ডে ববি ফিশার আসবেন কিনা সেটা নিয়ে সংশয় রয়েই গেলো।

এদিকে সোভিয়েত রাশিয়া আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গরম গরম বিবৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ছেদ পড়লো না। এমনকি দেশের প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের প্রচ্ছন্ন সম্মতিতে সোভিয়েত চেস স্পোর্টস কমিটির প্রধান ভিক্টর বতুরিনস্কি সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করে দিলেন যে বস্তুত পক্ষে এই মুহূর্তে আমেরিকান দাবাড়ু ববি ফিশারকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান হতে না দেওয়াটাই সোভিয়েত রাশিয়ার একমাত্র লক্ষ্য।

এডলফ হিটলারের কর্মকাণ্ড নিয়ে অবশ্যই সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যে দূরদ্রষ্টা ছিলেন সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকার কথা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মুখে তিনি বলেছিলেন শুধুমাত্র জার্মানিকে হারানোর জন্যে পুঁজিবাদী দেশগুলো সাথে একটা সাম্যবাদী দেশের অশুভ আঁতাত তৈরী হয়েছে। তাই যুদ্ধে জার্মানি হারলেও এই দুই বিপরীত মতাবলম্বী দেশগুলোর মধ্যে সংঘাত অবশ্যম্ভাবী। হিটলারের ভবিষ্যৎবাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান আত্মসমর্পণ করার প্রায় সাথেসাথেই বাকি বিশ্বে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত রাশিয়া। এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি ছিল না কোনো পক্ষ। তখন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ছিল বিশ্বের মধ্যে একমাত্র পরমাণু শক্তিধর দে। কিন্তু ১৯৪৯ সালেই সোভিয়েত রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র তৈরী করে এই ব্যাপারে আমেরিকার একাধিপত্যকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিতে সক্ষম হলো। কে বেশি শক্তিধর সেটা প্রমাণ করার জন্যে কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ইসরায়েলের মতো এশিয়ার বহু দেশের অভ্যন্তরীণ বিবাদে অবাঞ্ছিত ভাবে নাক গলাতে তৎপর হয়ে উঠলো পরমাণু শক্তিতে বলীয়ান দুই দেশ। ১৯৪৭ সালের ১৮-ই সেপ্টেম্বর আমেরিকার গোপন গোয়েন্দা এজেন্সি ‘সি আই এ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আবার তার পাল্টা হিসাবে ১৯৫৪ সালের ১৩-ই মার্চ সোভিয়েত ইউনিয়নে জন্ম নিলো তাদের সিক্রেট এজেন্সি ‘কে জি বি’। ১৯৯১ সালের ২৬-শে ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগে পর্যন্ত এই দুই গুপ্ত সংগঠনের ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী রেষারেষি দেখেছে সারা বিশ্বের মানুষ। এই সময়ের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বের বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশের অসংখ্য বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রপ্রধান, বিজ্ঞানী, সংস্কৃতি ও খেলার জগতের ব্যক্তিত্ব খুন বা চিরকালের মতো বেমালুম গায়েব হয়ে গেলেন তার কোনো সঠিক হিসাব আজ পর্যন্ত করে ওঠা যায়নি। এই ব্যাপারে বাদ যায়নি ভারতবর্ষও।

তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রসঙ্গ বাদ দিলে দুই দেশের এই ভয়ংকর প্রতিযোগিতার ভালো কিছু দিকও ছিল। চিকিৎসা শাস্ত্র, মহাকাশ গবেষণা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, খেলাধূলা ইত্যাদির ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা ছিল তুল্যমূল্য। তার ফলে বহু কল্যাণ সাধন হয়েছে বিশ্বের। চাঁদে প্রথম মানুষ পাঠানোর ব্যাপারে ক্রমাগত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপোলো আর সোভিয়েত রাশিয়ার ভোস্তক সিরিজের মহাকাশযান উৎক্ষেপণের রুদ্ধশ্বাস প্রতিযোগিতা চাক্ষুষ করেছে সারা পৃথিবী।

আসলে সোভিয়েত রাশিয়ার ইউরি গ্যাগারিন ১৯৬১ সালের ১২-ই এপ্রিল মহাকাশে বিশ্বের প্রথম মানুষ হিসাবে কিংবা ১৯৬৩ সালের ১৩-ই জুন ভ্যালেন্টিনা তেরেস্কোভা প্রথম মহিলা নভশ্চর হিসাবে মহাকাশে এক পাক চক্কর কেটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিলেও শেষ পর্যন্ত মার্কিন নাগরিক নীল আর্মস্ট্রঙ আর এডুউইন অলড্রিনকে ১৯৬৯ সালের ২০-শে জুলাই চাঁদের মাটিতে হাঁটিয়ে শেষ হাসিটা কিন্তু হেসেছিলো আমেরিকা। শুধু তাই নয় সেখানে আমেরিকার জাতীয় পতাকা পুঁতে পুরো চাঁদটাই যেন কব্জা করে ফেললো তারা। বায়ুমণ্ডলহীন একটা সুনসান উপগ্রহে কোনো পতাকার পতপত করে ওড়াটা সম্ভব কিনা, কম্যুনিস্ট দুনিয়া থেকে এইরকম কিছু বেয়াড়া প্রশ্ন উঠলেও সেগুলো ধোপে টিকলো না। তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ১৯৭২ সালের ওয়ার্ল্ড চেস চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচটা শুধু দাবায় রাশিয়ার আধিপত্য কায়েম রাখার লড়াই ছিল না। সেটা ছিল তাঁদের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার সংগ্রাম। তাই কোনো মূল্যেই তারা এই যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তেও রাজি ছিল না আমেরিকাকে।

‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ ম্যাগাজিনে হেডলাইন |

জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে বরিস স্প্যাসকি আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকিয়াভিকে এসে গেলেন। ববি ফিশারের দিক থেকে কিন্তু কোনোরকম নিশ্চিত খবর পাওয়া গেলো না। আইসল্যান্ড চেস ফেডারেশন সিদ্ধান্ত নিলো যদি নির্ধারিত দিনে ববি ফিশার সময় মতো টুর্নামেন্ট হলে হাজিরা না দেন তাহলে স্প্যাসকিকেই জয়ী ঘোষণা করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেইসব কিছুই হলো না। মাকিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নির্দেশে স্টেট সেক্রেটারি হেনরি কিসিঞ্জারের কাছ থেকে একটা জরুরি টেলিগ্রাম পেয়ে শেষ পর্যন্ত ববি ফিশার টুর্নামেন্টের ঠিক আগের দিন আইসল্যান্ডের রাজধানীতে এসে পৌঁছালেন। সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।

নিয়ম অনুযায়ী চ্যাম্পিয়ান আর চ্যালেঞ্জারের মধ্যে সর্বাধিক মোট চব্বিশ রাউন্ডের এই ম্যাচে জিতলে এক আর ড্র হলে হাফ পয়েন্ট হিসাবে কেউ মোট সাড়ে বারো পয়েন্ট পেয়ে গেলেই তাকে জয়ী ঘোষণা করে বাকি গেমগুলো বাতিল করা হবে। যদি ম্যাচ চব্বিশ রাউন্ড পর্যন্ত গড়ায় আর দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর পয়েন্ট বারো অর্থাৎ সমান সমান দাঁড়ায় তাহলে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ান তাঁর খেতাব ধরে রাখতে পারবেন। খেলা হবে সপ্তাহের তিনদিন। রবিবার, মঙ্গলবার আর বৃহস্পতিবার। প্রথম আড়াই ঘণ্টায় বাধ্যতামূলক ভাবে চল্লিশটা চাল দিতেই হবে। বিরতির সময় ধরে প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত খেলা চলতে পারে। কোনো খেলার নিষ্পত্তি একদিনে না হলে বাকিটা পরের দিন ঠিক সেই অবস্থা থেকেই আরম্ভ করতে হবে।দু’দিনে কোনো রাউন্ড শেষ না হলে গেম ড্র বলে ধরা হবে। প্রত্যেক পক্ষই শারীরিক অসুবিধার কারণ দেখিয়ে সর্বাধিক তিন বার খেলা মুলতুবি রাখার আবেদন জানাতে পারবেন।সাপ্তাহিক ছুটির দিন হবে শনিবার। সপ্তাহে তিন রাউন্ড হিসাবে মোট আট সপ্তাহে ম্যাচ শেষ করতে হবে।

যথারীতি ১৯৭২ সালের ১১-ই জুলাই আইসল্যান্ড চেস ফেডারেশনের সেন্ট্রাল হলে সকাল সাড়ে ন’টার সময় মার্কিন মিডিয়ার কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু আর সহায়ক বিল লোম্বার্ডি-কে সাথে নিয়ে সদলবলে ঢুকলেন ববি ফিশার। নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক প্লেয়ার ম্যাচ চলাকালীন শলা পরামর্শ করার জন্যে সাথে একজন সহায়ক রাখতে পারবেন। খেলার পরিভাষায় তাঁদের সেকেন্ডস বলা হয়। বরিস স্প্যাসকি অবশ্য তাঁর সেকেন্ডস এফিম গেলার-কে নিয়ে অনেক আগেই এসে গেছেন। বিরাট হলের চারদিকে দেয়াল ঘেঁষে অনেক টিভি ক্যামেরা বসানো। এই প্রথমবার টেলিভিশনে লাইভ সম্প্রচার করা হবে চেস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচ। ববি ফিশারের দাবী অনুযায়ী চিরাচরিত দাবা খেলার বোর্ডের বদলে ‘জ্যাকুইস অফ লন্ডন’ কোম্পানির তৈরী অত্যন্ত দামি বিশেষ চেস বোর্ড আর ঘুঁটি আনানো হয়েছে। এছাড়াও তাঁর ইচ্ছানুযায়ী আইসল্যান্ড চেস ফেডারেশনের প্লেয়ারদের বসার প্রচলিত হাতল দেওয়া ফিক্সড চেয়ারের বদলে নিউইয়র্ক থেকে আনা এক জোড়া বিশাল সুইং চেয়ার বসানো হয়েছে চেস বোর্ডের দুপাশে। স্প্যাসকি প্রথমে এই চেয়ার বদলের ব্যাপারে মৃদু আপত্তি জানালেও পরে রাজি হয়ে যান। হলে ঢুকে ববি ফিশার টিভি ক্যামেরার উপস্থিতি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করলেও সেগুলো চালু রইলো। মাঝখানে সেন্টার টেবিল থেকে বেশ খানিকটা দূরে সারি দিয়ে বসে দেশ বিদেশের প্রচুর অভ্যাগত আর সাংবাদিক। শব্দ নিরোধক কাঁচের ঘরের মধ্যে বিভিন্ন দেশের টিভি আর রেডিওর ধারাভাষ্যকারেরা বসে আছেন।

১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড চেস চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচে মুখোমুখি ববি ফিশার আর বরিস স্প্যাসকি।

ঠিক দশটার সময় গত শতাব্দীর সবচাইতে সেরা আর চাঞ্চল্যকর দ্বৈরথ শুরু হয়ে গেলো। ‘ম্যাচ অফ দ্য সেঞ্চুরি’। ৩৫ বছর বয়সী বরিস স্প্যাসকির মুখোমুখি হলেন ২৯ বছরের ববি ফিশার। সাদা ঘুঁটি দিয়ে খেলা শুরু করলেন স্প্যাসকি। সারা দুনিয়া জুড়ে যেন যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। সমস্ত পৃথিবীর কয়েক কোটি মানুষের মনোযোগ তখন কেন্দ্রীভূত রেডিও আর টিভির পর্দায়। উত্তেজনার পারদ চড়ছে ধাপে ধাপে। ফিশারের চল্লিশতম চাল পর্যন্ত লড়াই সমানে সমানে চললো। বিশেষজ্ঞরা বুঝে গেলেন এই রাউন্ড ড্র-এর দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে ফিশার অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে একচল্লিশতম চালটা ভুল দিয়ে বসলেন। গেমটার ভবিতব্য পাল্টে গেলো। স্প্যাসকি ভুলের সুযোগটা সদ্ব্যবহার করতে ভুল করলেন না। ছাপান্ন চালের শেষে ববি ফিশার বোর্ড ছেড়ে উঠে গম্ভীর মুখে হোটেলের পথে রওয়ানা দিলেন। বরিস স্প্যাসকির পকেটে এক পয়েন্ট চলে এলো। সোভিয়েত রাশিয়ার সমর্থক দেশগুলোয় তখন উচ্ছ্বাসের বন্যা বইছে।

মঙ্গলবার মানে ১৩-ই জুলাই দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলা আরম্ভ হওয়ার অল্প কিছুক্ষণ আগে গম্ভীর মুখে সেন্ট্রাল হলে সদলবলে ঢুকলেন ববি ফিশার। কিন্তু টেবিলে বসার আগেই আয়োজক ফেডারেশনের প্রতিনিধিদের সাথে মারাত্মক বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়লেন তিনি। টিভি ক্যামেরার আওয়াজে তাঁর মনোসংযোগে বিঘ্ন ঘটছে বলে সাফ জানিয়ে দিলেন যে সেগুলো না সরালে তিনি খেলতে রাজি নন। উদ্যোক্তারা কিছুতেই রাজি না হওয়ায় ফিশার সেই যে হল ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন আর এলেনই না। বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর জাজরা ওয়াকওভার দিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে জয়ী ঘোষণা করে দিলেন বরিস স্প্যাসকিকে। তাঁর মানে দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষে স্প্যাসকির পয়েন্ট গিয়ে দাঁড়ালো দুই আর ববি ফিশারের শূন্য।

সবাই বুঝে গেলেন প্রথমেই দু’পয়েন্টে পিছিয়ে থেকে ফিশারের পক্ষে এই ম্যাচ জেতার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। ববি ফিশারের ললাট লিখন তখন স্পষ্ট। কান পাতলে একমাত্র সোভিয়েত রাশিয়া বাদে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েক কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ তখন পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে।

এদিকে আয়োজক সংস্থা বেশ ভালোই বুঝতে পারছিলো যে ববি ফিশারের টিভি ক্যামেরা বন্ধ রাখার দাবি না মানলে হয়তো ম্যাচটাই বন্ধ হয়ে যাবে। আর্থিক দিক থেকে ক্ষতির পরিমাণ হবে বিশাল। তাই বরিস স্প্যাসকির অনুমতি নিয়ে তৃতীয় রাউন্ড সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো সেন্ট্রাল হলের গায়ে লাগানো অপেক্ষাকৃত ছোট একটা টেবিল টেনিস খেলার ঘরে। সেখানে কোনো ক্যামেরা থাকবে না। প্রবেশাধিকার থাকবে না কোনো সাংবাদিকের। শুধুমাত্র দুজন জাজ আর খেলোয়াড়রা তাঁদের সেকেন্ডসদের নিয়ে সেখানে ঢুকবেন। শুধু মাঝে মাঝে একজন বিচারক বাইরে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের খেলার শেষ অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করবেন। বরিস স্প্যাসকি সামান্য অসন্তোষ প্রকাশ করলেও অন্তত একটা রাউন্ডের জন্যে মেনে নিলেন এই নতুন ব্যবস্থা।

১৫-ই জুলাই বৃহস্পতিবার যথারীতি সেই ছোট ঘরটায় তৃতীয় রাউন্ডে মুখোমুখি বসলেন ববি ফিশার আর বরিস স্প্যাসকি। সাদা ঘুঁটি নিয়ে শুরু করলেও ১৮-তম চালে এই প্রথম সামান্য ভুল করে বসলেন স্প্যাসকি। দু’পক্ষের চল্লিশ চালের শেষে সেদিনের মতো খেলা মুলতুবি রাখা হলো। পরদিন সকালে ববি ফিশারের সেদিনের প্রথম আর গেমের ৪১-তম চালটা দেখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে সেই রাউন্ডে হার স্বীকার করে নিলেন স্প্যাসকি। বরিস স্প্যাসকির বিরুদ্ধে যে কোনো আন্তর্জাতিক মঞ্চে এটাই ছিল ববি ফিশারের প্রথম জয়।

১৮-ই জুলাই রবিবার সকাল ঠিক দশটায় শুরু হলো ম্যাচের চতুর্থ রাউন্ড। তবে স্পাসকির অনুরোধে এবার খেলা ফিরিয়ে আনা হয়েছে সেন্ট্রাল হলে। আর সাংবাদিকদের ভিতরে প্রবেশের অনুমতি থাকলেও ফিশারের দাবি মতো টিভি ক্যামেরাগুলো সরিয়ে নিয়েছে ফেডারেশন। সাদা ঘুঁটি নিয়ে খেলা শুরু করে সতেরোতম চাল পর্যন্ত খানিকটা এগিয়ে থেকেও ববি ফিশার ভাঙতে পারলেন না স্প্যাসকির সিসিলিয়ান ডিফেন্স। ৪৫ নম্বর চালের শেষে খেলা ড্র মেনে নিলেন দুজনে। ফলে চতুর্থ রাউন্ডের শেষে বরিস স্প্যাসকির পয়েন্ট দাঁড়ালো আড়াই আর দেড় পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ববি ফিশার।

মঙ্গলবার ২০-শে জুলাই শুরু হলো ম্যাচের পঞ্চম রাউন্ড। সেন্টাল হলে মুখোমুখি হলেন দুজন। দুজনের ১৫ নম্বর চাল পর্যন্ত খেলা ড্র হওয়ার দিকে এগোলেও নিজের ২৭-তম চালে বাজিমাত করে দিলেন ববি ফিশার। থমথমে মুখে বোর্ড ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন বরিস স্প্যাসকি। এই রাউন্ডের শেষে ববি ফিশার আর বরিস স্প্যাসকি দুজনেই আড়াই পয়েন্ট পেয়ে তখন সমান সমান। নিজের সেকেন্ডস লোম্বার্ডির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে ববি ফিশার বলে গেলেন এর পরের রাউন্ডে একটা চমক দেবেন বিশ্বকে।

নির্ধারিত দিনের এক দিন পরে মানে ২৩-শে জুলাই শুরু হলো ষষ্ঠ রাউন্ড। সত্যি ভেলকি দেখালেন ববি ফিশার। সাদা ঘুঁটি নিয়ে দাবা খেলার প্রথম চালের সম্ভাব্য সব ব্যাকরণ ভেঙে বাঁ দিকের তৃতীয় বোড়েকে এগিয়ে দিলেন দু’ ঘর।অথচ এর আগে জীবনে কোনো খেলায় এই ভাবে শুরুই করেননি তিনি। চালটা আঁচ করতে পারেননি বরিস স্প্যাসকি। তিনি ‘টারটাকোয়ার্স ডিফেন্স’ খেলে রাউন্ডটা ড্র করার চেষ্টা করতে লাগলেন। টারটাকোয়ার্স ডিফেন্স হলো রক্ষণাত্মক খেলার একটা বিশেষ কৌশল। এই বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করে এর আগে কোথাও কোনো গেমে কোনোদিনই হারেননি স্প্যাসকি। কিন্তু নিজের ছাব্বিশতম চালে স্প্যাসকির ডিফেন্স ভেঙে ফেললেন ববি ফিশার। এরপর সেই রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক ভাবে খেলে একচল্লিশতম চালে কিস্তিমাত করে দিলেন তিনি। উপস্থিত সাংবাদিক ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা তখন উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছেন। চেয়ার ছেড়ে উঠে তাদের সাথে যোগ দিলেন বরিস স্প্যাসকি। সবার সামনে ববি ফিশারকে একজন জিনিয়াস বলে ঘোষণা করলেন তিনি। অভিভূত ফিশার করমর্দন করে ধন্যবাদ জানালেন স্প্যাসকিকে। এক পয়েন্টে এগিয়ে গেলেন ববি ফিশার। তাঁর পয়েন্ট তখন সাড়ে তিন আর স্প্যাসকির আড়াই।

বাইরের দুনিয়ার অবস্থা তখন ঠিক কি রকম? প্রথম বিশ্বের দেশগুলোয় তখন উৎসব পালন চলছে। সাম্যবাদী দেশগুলো খানিকটা যেন মুষড়ে পড়লো। ববি ফিশারকে দিয়ে সোভিয়েত রাশিয়াকে খানিকটা টাইট দিতে পেরে হোয়াইট হাউস খুব উৎফুল্ল। অভিনন্দন জানিয়ে ববি ফিশারের কাছে টেলিগ্রাম পাঠালেন মার্কিন স্টেট সেক্রেটারি হেনরি কিসিঞ্জার। তৃতীয় বিশ্বের জনসাধারণের মধ্যে এই খেলা ঘিরে স্বতঃস্ফূর্ত প্রবল উন্মাদনা থাকলেও তাতে আমেরিকা আর রাশিয়ার শৈত্য-যুদ্ধের বিশেষ কোনো প্রভাব ছিল না। বরং বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ নিরপেক্ষভাবে এই দ্বৈরথ উপভোগ করছিলেন। দাবার দুনিয়ায় একচেটিয়া সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন ববি ফিশার। তাই এক প্রতিবাদী চরিত্র হিসাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ববি ফিশারের অনুকূলে কোথাও যেন প্রচ্ছন্ন একটা সমর্থন ছিল।

পরবর্তী পর্বের লিংক : শতাব্দীর সেরা দ্বৈরথ (তৃতীয় পর্ব)

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।