সম্পাদকীয়
মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ভারতের ভাষাতাত্ত্বিক মানচিত্রে বাংলাভাষী জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। অপরদিকে ১৯৭১ সালে হিন্দিভাষীর সংখ্যা ছিল ৩৬.৯৯ শতাংশ, ২০১১ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৪৬.৬৩ শতাংশ-তে। আমাদের অবশ্য দেড় দশক আগের উপাত্ত নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে; কোভিড ইত্যাদি কারণে তারপরের জনশুমারি এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০ কোটিরও বেশি মানুষ হিন্দি-তে কথা বলেন। এর মধ্যে মাতৃভাষী এবং দ্বিতীয় ভাষার বক্তা মিলিয়ে হিন্দি বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক কথ্য ভাষা। হিন্দিভাষী মানুষের সংখ্যা উল্কাগতিতে বেড়ে চলেছে।
অথচ বিশ্বের সপ্তম সর্বাধিক কথ্য ভাষা এবং ভারতের দ্বিতীয় সর্বাধিক কথ্য ভাষা বাংলা ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে। ১৯৯১ সালে বাংলাভাষী মানুষের শতাংশ ভারতের জনসংখ্যার ৮.৩ শতাংশ বলে গণনা করা হয়েছে, ২০১১ সালে বাংলাভাষী রয়েছেন ৮.০৩ শতাংশ। তবে মাতৃভাষী হিসেবে ৯.৭২ কোটি জনসংখ্যার অধিকারী বাংলা এখনও ভারতের দ্বিতীয় সর্বাধিক কথ্য ভাষা।
নতুন প্রজন্মের বাঙালি দিব্বি হিন্দি বলছেন, তা এখন তাদের প্রথম ভাষা নাকি দ্বিতীয় ভাষা তা বোঝা মুশকিল। অনুধাবন করা দরকার কেন এই প্রবণতা বাড়ছে।
১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আক্রমণের আগে বাংলা ছিল উপমহাদেশের অন্যতম বর্ধিষ্ণু অঞ্চল। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক ক্ষমতা ও একচেটিয়া শাসনের পথ প্রশস্ত হয়। কোম্পানি শাসনের মূল লক্ষ্য ছিল মুনাফা অর্জন হলেও দেশীয় মানুষকে নিয়ন্ত্রণের জন্যই তাদের ইংরেজি ও বাংলা ভাষা শিক্ষা দানের প্রয়োজন ছিল। ভারতে ব্রিটিশদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রথম ছাপাখানাটি ১৭৭৮ সালে কলকাতায় স্থাপিত হয়েছিল—এটি ছিল ইংরেজিতে। তবে ১৮০০ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ মিশনারি উইলিয়াম কেরি ও অন্যান্যরা শ্রীরামপুরে প্রথম বাংলা ছাপাখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন। ‘শ্রীরামপুর মিশন প্রেস’ নামে পরিচিত এই ছাপাখানাটি বাংলা প্রকাশনা জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণির উত্থান ও ইংরেজি শেখার মাধ্যমে বাঙালি ভদ্রলোকেরা প্রশাসনের উচ্চপদ, ওকালতি, ডাক্তারি ও শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ উনিশ শতক ও বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
স্বাধীনতার পরে দ্রুত পট পরিবর্তন হল—বাংলা বিভাজিত হল। কলকাতা শহরের গুরুত্ব কমল। ভারতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আর্থ-সামাজিক অবদান ও গুরুত্ব ক্রমাগত হ্রাস পেল। বাংলা ভাগের পর ও পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় নীতিগুলোর কারণে বাংলায় শিল্পের মন্দা দেখা দিল; রাজ্যের সামগ্রিক পুনর্গঠন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ ব্যাহত হল।
ধীরে ধীরে শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত নির্বিশেষে বাঙালিরা রাজ্যের বাইরে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়। তাই আগে শুধু বাংলা জানলে চলত, এখন সঙ্গে হিন্দি জানতে হয়। ইংরেজি জানলে আরও ভালো। আজকের ছেলে মেয়েরা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার ক্রমাগত হিন্দিকে উৎসাহ দিচ্ছে , দেশের সর্বজনীন ভাষা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে চলেছে ।
শুধু অর্থনীতি নয়, বাংলাভাষা বিকাশের প্রচেষ্টাও এক সময়ে থমকে গেল। আজও বাংলায় উচ্চশিক্ষার উপযোগী বই হল না। আজও প্রকাশকরা বলেন, বাংলায় বিজ্ঞান, অর্থনীতি, কারিগরি ইত্যাদি বিষয়ের উপরে বিশ্লেষণাত্মক বইয়ের সংখ্যা স্বল্প। ফলে যারা বাংলায় পড়তে চান তারাও বাধ্য হন ইংরেজিতে পড়তে। পাড়ায় পাড়ায় ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের প্রসার, ইংরেজি বইয়ের মান ও বণ্টনের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে বাংলা বইয়ের পাঠক দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে বাংলায় প্রকাশনা ব্যবসা ছোটো—পশ্চিমবঙ্গে মাঝারি ও ছোটো প্রকাশকদের বণ্টন ব্যবস্থা দুর্বল। অধিকাংশ প্রকাশক সব জেলাতে তাদের বই পাঠাতে পারেন না। সরকার বই প্রকাশনাকে একটা ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবেও গণ্য করে না। প্রকাশনা অধিকাংশ সময়েই একটি পারিবারিক ব্যবসা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রকাশকের ব্যক্তিগত যোগ্যতার উপরে নির্ভর করে প্রকাশনার মান, বণ্টন ও ব্যবসা। ভারতে বই বাজারের ৫৫ শতাংশ হল ইংরেজি বই। ভারতীয় ভাষাগুলোর মধ্যে ৩৫ শতাংশ হিন্দিতে প্রকাশিত বইয়ের বাজার। বাকিটা অন্যান্য সমস্ত আঞ্চলিক ভারতীয় ভাষার মধ্যে বিভক্ত। আবার এই প্রকাশকদের অধিকাংশই শুধুমাত্র স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বই প্রকাশ করেন।
বাংলা বইয়ের বাজার নিয়ে আবেগ রয়েছে প্রচুর তবে বাস্তব পদক্ষেপ কম। আঞ্চলিক ভাষাগুলির মধ্যে ভারতবর্ষে তামিল বইয়ের বাজার ইংরেজি ও হিন্দির পরে। মোট প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে তামিলের ৯ শতাংশ, বাংলার ও মারাঠি ৭ শতাংশ করে এবং মালয়ালম ৪ শতাংশ। পাঠ্যবই-বহির্ভূত বইয়ের বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে সামাজিক উপন্যাস, রহস্য উপন্যাস, ভূত প্রেত ইত্যাদি অপবিজ্ঞান। আবার সঙ্গে রয়েছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, নতুন ব্যবসা বা কর্ম প্রচেষ্টার বই; আছে আধ্যাত্মিকতা বিষয়ক বিপুল বইয়ের ভাণ্ডার।
বাংলা ট্রেড বইয়ের মূল বাজার বইমেলাগুলি। বই বিক্রি হয় ঋতু ভিত্তিক, উৎসব ও মেলা-কেন্দ্রিক। শুধুমাত্র দুইতিনটি প্রকাশন সংস্থা বাংলা বই বন্টনের শ্রীহীনতাকে চাপা দিতে পারে না। জেলা স্তরে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত বইয়ের আউটলেটের সংখ্যা ভীষণ কম।
আর সংবাদপত্র? ‘ইন্ডিয়ান রিডারশিপ সার্ভে ২০১৯ (চতুর্থ ত্রৈমাসিক)’-এর তথ্য অনুযায়ী সংবাদপত্র পাঠের হার বা পাঠকসংখ্যার ক্ষেত্রেও আঞ্চলিক পার্থক্য লক্ষ করা যায় । এক্ষেত্রে সর্বভারতীয় গড় হার হল ৩৪.৫ শতাংশ। কেরালায় এই হার ৮৩.১ শতাংশ, গোয়ায় ৫৬.৫ শতাংশ, হিমাচল প্রদেশে ৫৪.৫ শতাংশ এবং তামিলনাড়ু ও পুদুচেরিতে ৫২.৩ শতাংশ; অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে এই হার ২৫.৯ শতাংশ। দেশের গড়ের থেকেও নিচে। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে ৫ হাজারের বেশি গ্রন্থাগার থাকলেও, তীব্র কর্মী সংকট ও পরিকাঠামোগত অবহেলার কারণে এর অর্ধেকের বেশি তালাবন্ধ বা আংশিকভাবে খোলা থাকে। অনেক জায়গায় একজন কর্মীকে ৩-৪টি গ্রন্থাগারের দায়িত্ব সামলাতে হয়
আমাদের অর্থনীতির ক্রমাবনতি, চাকরির বাজার, বাবা-মায়েদের বাংলা সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব—এই যুগের ছেলেমেয়েদের বাংলা ভাষা সম্পর্কে কিছুটা আবেগহীন করে দিয়েছে। আমরা উদাসীন হয়ে বাংলাকে দূরে ঠেলে দিলাম। ভুলে গেলাম বাংলা সাহিত্য একসময়ে বিশ্বমানের ছিল। বাংলা ভাষায় কথা বলবার অধিকার রক্ষায় বারবার রক্তপাত হয়েছে।
আমাদের উত্তরসূরি পড়বে তো?
আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে- এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় – হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে,
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায়।