আচার্য সুকুমার সেনের চর্চা ও সৃষ্টিতে গোয়েন্দাকাহিনি
গোয়েন্দাকাহিনির গোঁড়া অনুসন্ধান করতে হলে আমাদের অনেক গভীরে ডুব দিতে হবে। ‘ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি’ বইতে আচার্য সুকুমার সেন দেখিয়েছেন গোয়েন্দাকাহিনি হল এক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের প্রাচীনতম শাখা। তিনি লিখেছেন, ‘পৃথিবীতে মানবসংস্কৃতির ধারাবাহিক ইতিহাসে জীবনচর্যার দ্রষ্টব্য ও শ্রোতব্য শিল্প-কল্পনাকে যদি বৃক্ষের উপমা দিই তবে সে বৃক্ষের প্রথম উদগত শাখাগুলির অন্যতম হবে শিকারচিত্র ও গোয়েন্দা গল্প। শিকারির কাজ ও গোয়েন্দাগিরি দুই-ই এক ব্যাপার ― গোপনে অনুসন্ধান করে ফাঁদ পেতে অথবা আঘাত করে আয়ত্ত করা। চিত্রকর্মে শিকারের ব্যাপার বেশি দূর এগোয়নি, কিন্তু গোয়েন্দা গল্প আজ পর্যন্ত একটানা চলে এসেছে।’ কিশোর বয়স থেকে তাঁর গোয়েন্দা কাহিনি পড়ায় গভীর আগ্রহ। স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে ‘ইংরেজি ডিটেকটিভ গল্পের স্বর্গে প্রথম প্রবেশ’। গোয়েন্দা গল্পের প্রতি তাঁর সেই ভালোলাগা আজীবন ছিল। ইংরেজ ঔপন্যাসিক উইলকি কলিন্স ও ফরাসী গোয়েন্দাকাহিনি লেখক এমিল গ্যাবোরিয়ো থেকে শুরু করে স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, আগাথা ক্রিস্টি এবং বাংলায় পাঁচকড়ি দে থেকে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিটেকটিভ গল্প-উপন্যাসের অত্যন্ত সমঝদার পাঠক ছিলেন তিনি। গোয়েন্দাকাহিনির দিক থেকে শার্লক হোমস ও ব্যোমকেশ বক্সী তাঁর সবচেয়ে প্রিয় দুই গোয়েন্দা চরিত্র। তিনি ও তাঁর কয়েকজন ‘ডিটেকটিভ গল্পখোর বন্ধু’ মিলে ‘হোমসিয়ানা’ (হোমস প্রীতি থেকে) নামে এক বৈঠকি আড্ডা প্রবর্তন করেন। ‘হোমসিয়ানা’ সম্মিলনীর বেজায় গোয়েন্দাকাহিনির ভক্ত সদস্যরা এর অধিবেশনগুলোয় অত্যন্ত উঁচুদরের গোয়েন্দাকাহিনি চর্চায় মনোনিবেশ করতেন। এই আড্ডার আলোচনা থেকে সুকুমার সেনের মনে এ বিষয়ে একটি বই লেখার আগ্রহ তৈরি হয়। ফলস্বরূপ কিছুটা স্মৃতি ও কিছুটা গবেষণা মিলিয়ে ‘ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি’ নামে গোয়েন্দাকাহিনির একটি ধারাবাহিক ইতিহাসের মতো চমৎকার বই লেখা হল। বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, ‘সুদীর্ঘকাল ধরে আমি অনেক লেখা লিখে এসেছি, তা কমবেশি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই উদ্দেশ্য হয় জ্ঞানের বিস্তার নয় আনন্দের যোগান। প্রস্তুত বইটি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা হয়নি। আশৈশব অহেতুক আনন্দ পেয়ে এসেছি সময়-অসময়ে গোয়েন্দা কাহিনি পড়ে পড়ে। আমার আনন্দের সঞ্চয় আমার দিন শেষে আজ এই রচনায় উপচে পড়ল। আশা করি সমধর্মী পাঠকের কাছে আমার এই উপচিত আনন্দরস উপেক্ষিত হবে না।’
সুকুমার সেন ইংরেজি গোয়েন্দা কাহিনির সঙ্গে সঙ্গে বাংলা গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাসেরও একনিষ্ঠ ভক্তপাঠক ছিলেন। তাঁর মতে, শার্লক হোমস, লর্ড পিটার উইমসি, এরকুল পোয়ারো, ফাদার ব্রাউন, ডাক্তার থ্রনডাইক, মিস পারপল, ইন্সপেক্টর ফ্রেঞ্চ, ডাক্তার গিডিয়ন ফেল, এ্যাপলবি, জজ ডী, নিরো উলফ, এলেরি কুইন, টিকামসে ফকস, ইন্সপেক্টর চাফিক, এলবার্ট ক্যাম্পিয়ন প্রমুখদের মেলায় বাঙালি গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সীর স্থান। বাংলা গোয়েন্দাকাহিনির ক্ষেত্রে তিনি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্ট ডিটেকটিভ চরিত্র ‘সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী’কে অত্যন্ত উচ্চদৃষ্টিতে দেখতেন। ‘ব্যোমকেশের ধরন-ধারণ সাধারণ বাঙালি ভদ্রলোকের মতোই। তাঁর অসামান্যতার পরিচয় সহজে পাওয়া যেত না।’ ব্যোমকেশ কাহিনির সামাজিক প্রেক্ষাপট, ব্যোমকেশের বাঙালিত্ব এবং তাঁর সাধারণের মধ্যে অসাধারণত্বের পরিচয়; সত্যান্বেষী কাহিনির পাঠক ও বিশ্লেষক সুকুমার সেনকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল। অজিতকে তিনি ওয়াটসনের বাংলা সংস্করণ বলে মনে করতেন না। অজিতের সহযোগিতায় ব্যোমকেশ কাহিনিগুলো তরতর করে এগিয়ে যায়। অজিতকে ছাড়া শেষের দিকের ব্যোমকেশের নিজের জবানিতে বলা কাহিনিগুলো সুকুমারের তেমন পছন্দ ছিল না। তাঁর মতে, ‘হোমস আর ওয়াটসন যেন কৃষ্ণ আর উদ্ধব, ব্যোমকেশ আর অজিত যেন কৃষ্ণ আর সুবল।’
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুকুমার সেনের শ্রদ্ধাপূর্ণ সখ্যতা ছিল। তা মূলত শরদিন্দুর ঐতিহাসিক, ভৌতিক ও গোয়েন্দাকাহিনিগুলোর সূত্র ধরে। সুকুমারের দৃষ্টিতে শরদিন্দু ছিলেন; ‘আকারে শালপ্রাংশু মহাভুজ, সদবংশজাত, সৌম্য, বিনয়ী, সদালাপী, শিক্ষিত, বিচক্ষণ, সহৃদয় বাঙালির শেষ নিখুঁত নিদর্শন।’ শরদিন্দুর আদলে গড়া তাঁর গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশের সম্বন্ধেও সেই একই কথা প্রযোজ্য। ব্যোমকেশ স্রষ্টার প্রতি গুণমুগ্ধ সুকুমার লেখেন, ‘গল্প-লেখক এবং ডিটেকটিভ-কাহিনী লেখকরূপে শরদিন্দুবাবুর দক্ষতা প্রথম গল্পটিতেই প্রকটিত এবং সে দক্ষতা পরে একটুও খর্ব অথবা ম্লান হয়নি। একঘেয়েমি কাটিয়ে ডিটেকটিভ গল্প লেখা বেশ দুরূহ ব্যাপার। এবং তার ওপর আরও একটা কথা আছে। যাঁর প্রথম গল্প, কবিতা বা উপন্যাস উৎকৃষ্ট হয়েছে, এমন অনেক বাঙালি লেখকের নাম করা যায়। কিন্তু প্রথমবার ভালো লেখার উচ্চমান পরবর্তী রচনা পরম্পরায় অব্যাহত রাখতে পেরেছেন এমন লেখকের সংখ্যা আমাদের দেশে খুবই কম। শরদিন্দুবাবু সেই খুব কম লেখকদের একজন।’ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার বহুগুণিত ভাষাশৈলীর প্রতি পাঠক সুকুমার সেন আজীবন সশ্রদ্ধচিত্ত ছিলেন।
যোগ্য প্রশংসায় কৃতজ্ঞ শরদিন্দু সুকুমারকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি, আমার ভাষার প্রতি আপনার দৃষ্টিপ্রসাদে “স্বচ্ছ, পরিমিত, অনায়াস-সুন্দর” ―এর চেয়ে উচ্চ বিশেষণ বোধহয় আর কারোর ভাষা লাভ করেনি।’
গোয়েন্দাকাহিনির প্লট নির্মাণ, গল্পের শ্রেণিবিন্যাস ও বিস্তার, গোয়েন্দা চরিত্র সম্বন্ধে সুকুমার সেনের নিজস্ব বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বের দাবিদার। তিনি এ বিষয়ে লেখেন, ‘ক্রাইম কাহিনীর দুটি শ্রেণী। প্রথম শ্রেণীতে পড়ে খাঁটি ডিটেকটিভ কাহিনী, যাকে বাংলায় বলতে পারি হুনুরি কাহিনী। এখানে অপরাধ ও অপরাধী নির্ণয় করেন ডিটেকটিভ সমস্ত তথ্যাদি একসঙ্গে পেয়ে বা নিজে সংগ্রহ করে নিজের বুদ্ধিবলে। দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে ইনভেস্টিগেশন কাহিনী, যাকে বাংলায় নাম দিতে পারি ‘জাসুসি কাহিনী’ অর্থাৎ যেখানে পুলিশ অথবা ডিটেকটিভ দলবল নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে তথ্যাদি সংগ্রহ করে, তারপর সেসব বিশ্লেষণ করে অপরাধ ও অপরাধী নির্ণয় করে।’ অনুসন্ধানী গোয়েন্দা গল্পের মূল কথা হিসেবে তিনি বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা দেখানো অথবা অপরাধীর সঙ্গে বুদ্ধির প্রতিযোগিতায় জেতাকে (অর্থাৎ এতে বুদ্ধির খেলায় প্রধান ভূমিকায়) গুরুত্ব দিয়েছেন। সুকুমার এক্ষেত্রে গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, সেই উপদেশকেই ডিটেকটিভ গল্পের নায়কের দীক্ষামন্ত্র বলেছেন।
“বুদ্ধৌ শরণম্ অন্বিচ্ছ”
সুকুমারের ব্যাখ্যায়, ‘যেকোনো ক্রাইম কাহিনীর প্রধান আকর্ষণ যে গল্পের কাহিনীতে―তার ঘটনার অভিনবত্বে, তার প্লটের প্যাঁচে, তার ভূমিকাগুলির স্বভাবসঙ্গতিতে, ঘটনা পরম্পরার অনপেক্ষিততায় এবং সব মিলিয়ে অনন্যতায় অথচ সম্ভাব্যতায়। আর গৌণ আকর্ষণ থাকে ডিটেকটিভের ব্যক্তিত্বে―তার আচরণে, বুদ্ধির প্রাখর্যে এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে।’ এইসব মুখ্য ও গৌণ গুণাবলী ছাড়া আদর্শ গোয়েন্দা গল্প দাঁড়াতে পারে না বলে তিনি মনে করতেন। তাঁর এই ব্যাখ্যা যে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও সুবিবেচিত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
সুকুমার আধুনিক ডিটেকটিভ কাহিনির যে তিনটি মূল লক্ষণ নির্দেশ করেছেন তা হল ― সমস্যা, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যক্ষ সমাধান। এই লক্ষণগুলি থাকলেই যেকোনো অপরাধের গল্প রহস্যঘন অনুসন্ধানী কাহিনি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার উপযুক্ত হবে। তিনি দেখিয়েছেন বৈদিক সাহিত্যের গোড়াতে ঋগ্বেদেই অপরাধ ও রহস্য যুক্ত বেশ কিছু শব্দের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ভারতবর্ষে প্রাচীনকাল থেকে অনুসন্ধানী কাহিনির অঙ্কুরোদগম থেকে আজকের অবস্থায় জনপ্রিয় ডিটেকটিভ সাহিত্যে পরিণত হওয়ার এক দীর্ঘ ধারাবাহিক পরম্পরা ছিল এবং তা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। তিনি লেখেন, ‘আগে যদি ডিটেকটিভ গল্পের চলন থাকত তবে আমাদের দেশে ভালো ডিটেকটিভ কাহিনী সেকাল থেকেই পাওয়া যেত।’
তিনি ডিটেকটিভ গল্পের ছয়টি থাক নির্ণয় করেছেন। তা তাঁর লেখা থেকে এখানে উদ্ধৃত করা হল ― ১) নীতিকথা (এখানে বক্তার বুদ্ধির প্রখরতা গল্পে, নীতি উপদেশের ছলে অভিব্যক্ত); ২) সমস্যাপূরণ (এতে দুটি বুদ্ধির বিরোধ প্রকটিত); ৩) রহস্যভেদ (এতে জটিল সমস্যার সমাধান তীক্ষ্ণবুদ্ধির দ্বারা সম্ভাবিত); ৪) অপরাধ নির্ণয় (এতে সমস্যার বা রহস্যের বিশ্লেষণ এবং ক্ষতি নিরূপণ); ৫) অপরাধী-নির্দেশ (আধুনিক ডিটেকটিভ গল্পের প্রধান লক্ষণ); এবং ৬) বুদ্ধির লড়াই (সমস্যাপূরণেরই আধুনিক জের, তবে এমন রচনা বেশি মেলে না)।
শুধুমাত্র ক্রাইম কাহিনির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে সুকুমার সুদক্ষ ছিলেন এমন নয়। জীবন সায়াহ্নে নিজেই গোয়েন্দা গল্প রচনায় অনায়াস-স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ডিটেকটিভ গল্প লেখার ভাবনা সম্পর্কে তিনি লেখেন, ‘ডিটেকটিভ গল্প লেখায় আমার প্রবৃত্তি জেগেছিল সপ্তম দশকের (১৯৭০ পরবর্তী) একেবারে শেষের দিকে যখন আমি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পাবলীর ভূমিকা (১৩.৬.৭০) লিখি। তাঁর ডিটেকটিভ গল্পগুলি নতুন করে পড়ে আমার মনে ডিটেকটিভ গল্প লেখার বাসনা অঙ্কুরিত হয়েছিল।’ শরদিন্দুর মতো তাঁরও অত্যন্ত প্রিয় কবি ছিলেন কালিদাস। মহাকবির কাব্য থেকে সে সময়কার দেশ-কালের যে ধারণা তিনি সংগ্রহ করেছিলেন, সেই তথ্য ভাণ্ডারের সাহায্যে তিনি তাঁর অনুসন্ধানী কাহিনির প্রধান চরিত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কালিদাসকে। তাঁর রচিত কালিদাস আখ্যানমালা ৫টি গল্পগ্রন্থে মোট ৫০টি গল্পে বিস্তৃত। বিদেশি গোয়েন্দা গল্পের অনুসরণ না করে সম্পূর্ণ নিজস্ব স্টাইলে তিনি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে লেখা তাঁর কালিদাসী কাহিনিগুলি ব্যতিক্রমীভাবে পাঠকের দরবারে উপস্থাপন করেছিলেন। তার লেখা গোয়েন্দা গল্পগুলিতে রহস্যের পাশাপাশি রয়েছে সংস্কৃত কাব্য সাহিত্য-পুরাণ-ইতিহাস-ভূগোলের অভিনব উপস্থিতি। ভারতবর্ষের প্রাচীন দেশ-কাল-মাটির গন্ধ মিশে আছে এই গল্পগুলিতে; যা একে আলাদা বিশেষত্ব প্রদান করেছে।
নিজের গোয়েন্দা গল্পের নায়ক হিসেবে তিনি কেন কালিদাসের প্রাচীন প্রেক্ষাপটকে বেছে নিয়েছিলেন সে বিষয়ে লেখেন, ‘আমার কল্পনায় স্বভাবতই কালিদাসের কথা মনে জেগেছিল। স্বভাবত বলছি এইজন্যে যে আমাদের দেশে অর্থাৎ ভারতবর্ষে―মায় সিংহল পর্যন্ত―লোকপরম্পরা প্রচলিত গল্পকথায় কবি কালিদাস অথবা তাঁর পৃষ্ঠপোষক রাজা বিক্রমাদিত্য বা ভোজ নায়ক হুনুররূপে কল্পিত হয়ে এসেছে।’ ব্যক্তিগত প্রীতিবোধ ও দেশজ প্রাচীন লোকপরম্পরাকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি কবি কালিদাসকে তাঁর লেখা গোয়েন্দা গল্পের নায়ক রূপে নির্বাচিত করেছিলেন।
“নেই তাই খাচ্ছ থাকলে কোথায় পেতে
কহেন কবি কালিদাস পথে যেতে যেতে”
খ্রিস্টীয় প্রথম দু’শতাব্দীকে সময়কাল হিসেবে ধরে গল্পের ভূমিকা ও পরিমণ্ডল যথাসম্ভব সেকালের অনুযায়ী করতে তাঁর কোনো ত্রুটি ছিল না। কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই শুধুমাত্র আনন্দের জন্য তিনি এই গল্পগুলি লিখেছিলেন। এতে তাঁর প্রাণের ছোঁয়া ও মনের আনন্দ মিশে আছে। চার-পাঁচ বছরের মধ্যে বেশ কয়েকটি গল্প লেখা হলে ‘কালিদাস তাঁর কালে’ নামে ১৯৭৬-এ গল্পগুলি প্রথম বই আকারে ছাপা হয়। গল্প লেখার প্রথম দিকে সুকুমারের মনে সংশয় ছিল যে পেশাদার সাহিত্যিকরা হয়তো তাঁর মতো পেশাদার ব্যাকরণবিদের গল্প লেখার প্রয়াসকে অনধিকার চেষ্টা হিসেবে গণ্য করবেন। কিন্তু গল্পগুলি বিশিষ্টজনদের কাছে সমাদৃত হওয়ায় এবং পাঠকদের ভালোলাগায় এ ব্যাপারে তাঁর সংশয় দূর হয়। নতুন উৎসাহে তিনি পরপর লেখেন ‘যিনি সকল কাজের কাজি’, ‘সত্য মিথ্যা কে করেছে ভাগ’, ‘যেখানে পড়বে সেথায় দেখবে আলো’, ‘আছে তো হাতখানি’ নামে কয়েকটি গল্পগ্রন্থ। আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে তিনি তাঁর রচিত গল্পগুলি সম্বন্ধে লেখেন, ‘তবে যাঁরা ডিটেকটিভ গল্পের রসিক তাদের ভালো লাগবে বলেই আমার বিশ্বাস। কোনো কোনো শব্দে পাঠক হোঁচট খেতে পারেন। এ সব শব্দ আমি ইচ্ছে করেই দিয়েছি কাহিনীগুলি কালরসে জমিয়ে তোলার জন্য। সে কালের বলা বাহুল্য এ কোনো ‘Ancient History of India’ গ্রন্থে বর্ণিত শকাব্দ-খ্রিস্টাব্দের বেড়াঘেড়া কালখণ্ড নয়, সাহিত্য ও ইতিহাস পাঠে সাধারণ শিক্ষিত ব্যক্তির মনে কালিদাসের কাল বলতে যে সে কালের ধারণা জেগে ওঠে সেই কালের―রঙ ও রস বুলিয়ে দেওয়া আবশ্যক মনে করেই কঠিন ও অপরিচিত শব্দ কিছু কিছু ব্যবহার করেছি।’
সুকুমার নিজের গোয়েন্দা কাহিনির রহস্য সমাধানে আধুনিক যুগের মতো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই শুধুমাত্র কালিদাসের উপস্থিত বুদ্ধি ও তথ্য বিচারের উপর নির্ভর করে রহস্য সমাধান করেছেন। কালিদাসের গোয়েন্দাগিরিতে তাঁর দুই সহায়কের ভূমিকায় দেখা যায় অগ্নি শর্মা ও বেতাল ভট্টকে। এঁরা দুজন কালিদাসের হয়ে দূর দূরান্তে ছুটে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। বিক্রমাদিত্যের রাজধানী উজ্জয়িনী, বিদিশা, কর্ণাট ইত্যাদি নগরের কথা বারবার উঠে এসেছে বিভিন্ন গল্পে। স্থান-কাল-পাত্র বিচার করে কালিদাস অনেক সময় রহস্য স্থানে না পৌঁছেও, শুধুমাত্র হাতে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে সেইসব রহস্যের সমাধান করেছেন। গল্পগুলিতে কাহিনির নামে (যেমন হারামণি, শ্লোক-চুরি, রাজসভায় ষড়যন্ত্র, নতুন পুরোনো, পাষাণ-পিহিত, কণে-হরণ, বধূকন্টকী, ঘাই হরিণী, ভালবাসার ঘায়ে, দেবতার দায়ে, খণ্ডপানা ইত্যাদি) এবং প্রেক্ষাপটে এক সহজ সাবলীল সাধারণত্ব রয়েছে। এই অকৃত্রিম অভিনবত্ব পাঠককে মুগ্ধ করে।
সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা যখন নিজেই সাহিত্য রচনায় আত্মনিয়োগ করলেন তখন তাঁর রচিত কালিদাসী কড়চাগুলি পাঠকের দরবারে স্বতন্ত্র স্বাদে গন্ধে ভরে উপস্থিত হয়েছিল। সুকুমারের এই গল্পগুলি আর দশটি গোয়েন্দা কাহিনির চেয়ে বেশ কিছুটা আলাদা ধরণের। তাই তিনি পাঠককে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘আমার এই কালিদাসের গল্পগুলি সম্বন্ধে একটা কথা বলা এখন আবশ্যক মনে করছি। সে কালে এখনকার New Scotland Yard, Surete বা Crime Squad-এর মতো কিছু ছিল না। সুতরাং আমার কালিদাসকে বিলিতি গল্পের ডিটেকটিভের সঙ্গে তুলনা করা অনুচিত। আমার গল্পের সমস্যা সম্বন্ধেও সেই কথা।’
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সুকুমার সেন গোয়েন্দা গল্প লিখে যেমন আনন্দ পেয়েছেন, তাঁর এই স্বতন্ত্র সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের মতো রহস্য সাহিত্যের পাঠকেরা এক বিশেষ সম্পদ লাভ করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তথ্যসূত্র:
১) সুকুমার সেন, ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ২০১৫
২) সুকুমার সেন, দিনের পরে দিন যে গেল, আনন্দ, ২০১৬
৩) সুকুমার সেন, গল্প সংগ্রহ, আনন্দ, ২০১২
৪) অলোক রায়, সুকুমার সেন (১৯০০-১৯৯২), পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ২০০৩, পরিমার্জিত সংস্করণ ২০১৬
৫) শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্যোমকেশ সমগ্র, আনন্দ, প্রথম সংস্করণ ১৯৯৫।