প্রাচীন ভারতবর্ষে খাদ্যাভ্যাসের বিবর্তন
কিছুদিন আগেই ‘ইতিহাস তথ্য ও তর্ক’ ফেসবুক পেজ-এ প্রাচীনকালের খাওয়া-পরা নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন পেয়েছি। ভালো লেগেছিল, তাই ভারতবর্ষের প্রাচীনকালের আহার নিয়ে আরও কিছু কথা বলতে উদ্যোগী হয়েছি। সব জীবিত প্রাণীরই বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য গ্রহণ করা আবশ্যক। উপরন্তু জিভের স্বাদের জন্যও সুখাদ্যের অনুসন্ধান চলে বটে। তার জন্য লাগে পছন্দসই বিশেষ খাবার! তাই আদিম যুগ থেকেই খাদ্য সংগ্রহ করা এবং তা খাবার উপযুক্ত করে তোলা—এই দুটি মানুষের প্রথম ও প্রধান চিন্তা ছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষের আহার্য ছিল পশুপাখির মাংস, ফলমূল, বুনো শস্য ইত্যাদি। আদি প্রস্তর যুগেও এই দেশে পাথরের অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে, যেগুলি মূলত শিকারে ব্যবহার করা হলেও সম্ভবত সংঘর্ষেও ব্যবহৃত হত। ভারতবর্ষে বন্য ও গৃহপালিত পশুর হাড়ও পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকা গুহায় পশুপাখি ও শিকারিদের গুহাচিত্র দেখা যায়।
তবে এই নিবন্ধ মূলত প্রাচীন যুগে ভারতবর্ষের খাদ্যের ইতিহাস নিয়ে লিখতে চেষ্টা করেছি। প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাস জানার উপাদানগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: সাহিত্যিক উপাদান এবং প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান। তার মধ্যে বিশেষ করে বৈদিক সাহিত্যের পাঠোদ্ধার করা যায় বলে বিভিন্ন বিষয় অনুসন্ধানে সেগুলি আমাদের কাজে লাগে। বৈদিক সাহিত্যের প্রধান সংকলনগুলোকে বলা হয় ‘সংহিতা’, এই সাহিত্যে ব্যবহৃত আর্য শব্দটি কোনো নির্দিষ্ট জাতিগত গোষ্ঠী নয়; এটি মূলত প্রাচীন বৈদিক সংস্কৃতভাষী জনগোষ্ঠীর একটি আত্মপরিচায়ক শব্দ। ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে শব্দটি ‘সম্মানীয়’ অর্থ প্রকাশ করে। প্রাচীন বৈদিক সংস্কৃতভাষী জনগোষ্ঠীর জীবিকা ছিল প্রধানত পশুপালন, পরে প্রাগার্য সভ্যতার প্রভাবে এরা চাষবাস করতে শুরু করে।
এই জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্য ছিল ফলমূল, গোরু বা ছাগলের দুধ, দই, ঘি এবং আগুনে সেঁকা মাংস। পশুপালন তখন অন্যতম মূল জীবিকা। ঋগ্বেদে পূষণ নামে সূর্যদেবতা ছিলেন গৃহপালিত পশু এবং পশুপালকের আরাধ্য দেবতা। তিনি পশুদের পালন করতেন, কোনো পশু হারিয়ে গেলে খুঁজে আনতেন, হিংস্র প্রাণীদের থেকে রক্ষা করতেন।
তারা প্রাগার্যদের কাছ থেকে চাষবাসও শিখে নিয়েছিল। সেচের পদ্ধতির কথা ঋগ্বেদে পাওয়া যায়। দুই প্রকারের সেচের কথা বলা হয়েছে—খনিত্রিমা অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে মাটি খুঁড়ে নালার মাধ্যমে সেচ এবং অন্যটি স্বয়ংজা, অর্থাৎ স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট জলাশয় থেকে আসা জলসেচন (ঋগ্বেদ ৭.৪৯.২)।
এই সময় থেকে আহার্য নিয়ে কিছু ভাবনার উদাহরণ প্রাচীন সাহিত্যে দেখা যায়। সকলের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য সরবরাহ করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য, তবে সবার জন্য অত্যাবশ্যক খাদ্য কোনো সময়েই ছিল না। খাদ্য সামগ্রী বৃদ্ধি করতে কৃষিতে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করবার জন্য সেচব্যবস্থার উন্নতি করা, যারা খাদ্য উৎপাদন বা সংগ্রহে অপরকে বাধা দেয় তাদের নিবারণ করার চেষ্টা—এই সব প্রয়োজন হত।
আদি বৈদিক যুগে প্রিয় খাদ্য ছিল মাংস৷ যজ্ঞে পশুমাংস দিতে হত—পশুবলির পর তার মাংস যজ্ঞাগ্নিতে আহুতি দেওয়া হত। মাংস দেবতাদেরও প্রিয় খাদ্য, তাই তাঁদের তুষ্ট করার জন্য মাংস দেওয়া হত—দেবতারা তুষ্ট হলে তবেই না যজমানের সম্পদ বৃদ্ধি হবে! দেবতাদের দিয়ে বাকি মাংস খেতেন পুরোহিত ও যজমান৷ তৈত্তিরীয় আরণ্যকে বলা হয়েছে, পঞ্চ মহাযজ্ঞে আহুতি দেওয়া মাংস নদীর মতো বয়ে যেত (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ২/১০)। শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে, মাংসই শ্রেষ্ঠ খাদ্য (এতদু হ বৈ পরমমন্নাদ্যং যন্মাংসং সঃ পরমস্যৈবান্নাদ্যস্যাত্ত ভবতি—শতপথ ব্রাহ্মণ ১১/১/৬/১৯)৷ এই শ্লোকে মাংসকে সমস্ত খাদ্যের মধ্যে সবচেয়ে পুষ্টিকর ও প্রধান খাদ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে—যে ব্যক্তি এই সত্যটি অনুধাবন করে মাংস ভোজন করেন, তিনি নিজেই সমস্ত খাদ্যের শ্রেষ্ঠ ভোক্তা হয়ে ওঠেন।
মাংসের মধ্যে সেরা হল গোমাংস; সেই সময়ে এই মাংস সর্বশ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হত৷ অগ্নিসূক্তে বলা হয়েছে, অগ্নিকে ষাঁড়ের চর্বি নিবেদন করতে হবে (উক্ষণ ঋষভাস বশা উত—ঋগ্বেদ ৬.১৬.৪৭)। ইন্দ্র গর্ব করে বলেছেন, তিনি ১৫-২০টা ষাঁড়ের মাংস খেয়ে ভুঁড়ি ভরিয়েছেন (ঐ ১০.৮৬.৩)৷ ঋগ্বেদের ১০.৬৮.১৪ সূক্তে ‘অতিথিনি’ শব্দটি পাওয়া যায়। বিশেষ সম্মানানীয় অতিথিদের খাদ্য সবার সেরা হওয়া উচিত। সেই খাদ্য গোমাংস, তবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, শুধু বৃষ (উক্ষ) বা বন্ধ্যা গাভীর (বশা) মাংসই খাওয়া হত—এগুলিকে বলা হত উক্ষান্ন ও বশান্ন। বোঝা যায়, বৈদিক যুগের প্রথম পর্বে গোমাংস ভক্ষণের চল ছিল, অতিথি আপ্যায়নে বা যজ্ঞে নির্দিষ্ট কিছু গোরু ব্যবহৃত হত।
পাণিনির ব্যাকরণ ‘অষ্টাধ্যায়ী’-তে (আনুমানিক সাধারণপূর্ব ষষ্ঠ থেকে চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে) ‘গোঘ্ন’ শব্দটি পাওয়া যায়। এর অর্থ অতিথি (দাশগোঘ্নৌ সম্প্রদানে—পাণিনি ৩.৪.৭৩)। ‘আগত্য যস্মৈ দাতুং গৌঃ হন্যতে স গোঘ্নঃ’—যিনি বাড়িতে এলে গোরু কাটতে হয়, তিনিই গোঘ্ন। এই প্রথা দীর্ঘদিন প্রচলিত ছিল। এমনকী এর বহু পরে ভবভূতির ‘উত্তররামচরিত’ নাটকে দেখি, বাল্মীকির আশ্রমে বশিষ্ঠ ঋষি এলে তাঁর জন্য একটি ‘বৎসতরী’ (বকনা বাছুর) কাটা হয় (উত্তররামচরিত, ৪র্থ অঙ্ক, বিষ্কম্ভক)। দুগ্ধবতী গোরুকে হত্যা করা অবশ্য সবসময়েই নিষিদ্ধ ছিল।
এত সুখাদ্য হওয়া সত্ত্বেও কেন পরবর্তীকালে গোমাংস নিষিদ্ধ খাদ্য হয়ে উঠল?
গোরু হয়ে উঠল ‘অঘ্ন্যা’—অর্থাৎ যাকে বধ করা যায় না। বৃহদারণ্যক উপনিষদে পাঁচটি প্রাণীর মাংস ব্রাহ্মণদের অভক্ষ্য বলা হয়েছে—মানুষ, ঘোড়া, গোরু, মহিষ ও ছাগল। এগুলিকে বলি দেওয়াও চলে না (বৃহদারণ্যক উপনিষদ ০৭.৫.২.৩৭)। এর সময়কাল আনুমানিক ৯০০-৬০০ সাধারণ পূর্বাব্দ। এখানে মানুষের উল্লেখ বিস্ময় উদ্রেক করলেও প্রমাণ আছে, প্রাচীনকালে নরবলি দেওয়া হত। বিভিন্ন দেশেই তা দেওয়া হত। তবে গোমাংস অভক্ষ্য হবার পিছনে অনুমান করা যেতে পারে, হয়তো কোনো বড়োগোছের গোমড়ক দেখা দিয়েছিল, যার ফলে দুধ ও চাষবাসের প্রয়োজনে গোসম্পদ বাঁচিয়ে রাখতে এরকম নিয়ম চালু হয়েছিল। হয়তো আধুনিক কালের ‘ম্যাড কাউ ডিজিজ’-র মতো কোনো ব্যাধির প্রকোপ হয়েছিল, যা মানুষের পক্ষেও মারাত্মক ছিল!
ঘোড়ার মাংসও একসময় সুখাদ্য বলে গণ্য হত। অশ্বমেধ যজ্ঞে রাজারা ঘোড়ার মাংস আহুতি দিতেন। এই মাংস নাকি দেবভোগ্য! ঋগ্বেদেই বর্ণনা আছে (ঋগ্বেদে ১.১৬২.১১-১২) প্রচুর মানুষ ভিড় করে মাংস রান্না হল কিনা, ঠিকঠাক গন্ধ বেরিয়েছে কি-না, সে বিষয়ে জল্পনা করছে! তবে ঘোড়ার মাংস খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ব্যবহারিক কারণে। ঘোড়া পথে যাতায়াতের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়, যুদ্ধের জন্যও এর উপযোগিতা রয়েছে৷ এমন উপকারী জন্তুকে কেটে খেয়ে ফেললেই হল!
এছাড়া মহিষের মাংস পরবর্তীকালে পূজায় বলিতে লাগত, তবে সেই মাংস তথাকথিত উচ্চতর শ্রেণীর লোকেরা খেত না! ছাগমাংস আজকে যে গুরুত্ব পায়, বৈদিক যুগে তা পেত না। অবশ্য পূষণের উদ্দেশ্যে ছাগমাংস নিবেদিত হতে দেখা যায়। তাঁর রথটিও ছাগল টানত।
এই সময়ে শিকার করা পশু মাংসও খাওয়া হত। তাদের মধ্যে ছিল ঋষ্য, পৃষত ইত্যাদি জাতীয় হরিণ, বন্য মহিষ ও বন্য শূকর। তবে গৃহপালিত শূকর খাওয়া যেত না। ক্ষত্রিয়দের তো মৃগয়া অবশ্যকর্তব্য, শিকারের সময় তাঁরা এই পশুগুলি মারতে ও তাদের মাংস খেতে পারতেন। রামায়ণে বলা হয়েছে, ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়েরা ‘পঞ্চনখ বিশিষ্ট’ পাঁচটি মাত্র প্রাণীর মাংস খেতে পারতেন (রামায়ণ, কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড, ১৭.৩৯)। কাজেই আবারও প্রমাণ হচ্ছে, ব্রাহ্মণেরা দীর্ঘদিন নিরামিষাশী ছিলেন না। এই পাঁচটি প্রাণীর মধ্যে আছে কচ্ছপ, সজারু, গোসাপ, খরগোস এবং গণ্ডার৷ অবশ্য ধর্মসূত্রগুলিতে এই সব নামের কিছু হেরফের আছে।
এর থেকে আরও অর্বাচীন যুগে, যখন ধনুর্বিদ্যা আরও উন্নত হল, তখন পাখি শিকারের প্রতি দৃষ্টি গেল। অর্জুন তো দ্রোণাচার্যের শিক্ষায় পাখির চোখকেই টার্গেট করেছিলেন। শিকারের জন্য নানা প্রকারের পাখি ছিল, তার কয়েকটির মাংস খাওয়া যেত, কয়েকটির যেত না। যেমন গ্রাম্যকুক্কুট অভক্ষ্য, কিন্তু বন্য কুক্কুট খাওয়া যায়!। ময়ূরের মাংস তো অতি সুখাদ্য!
জলের ধারে যাদের বাস, তারা তো মাছ ধরবেই! প্রাচীন ভারতবর্ষে মাছ ধরার ব্যাপক প্রচলন ছিল। শতপথ ব্রাহ্মণে তো সেই বিশাল জলপ্লাবনের কথা পাই, যখন একটি মাছ মনুকে আগে থেকে সাবধান করে ছিল৷ এর থেকেই পুরাণের মৎস্য অবতারের গল্প এসেছে। রামায়ণ মহাভারতেও আমরা মৎস্যজীবী এবং নৌকাজীবী দাশ ও কৈবর্তদের পাই।
ক্রমশ দেখা যায় মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ঘটছে। মাংস বহুদিন পর্যন্ত ছিল শ্রেষ্ঠ খাদ্য—পরমং অন্নম্। কিন্তু মাংস খাবার অভ্যাসটা ক্রমশ সীমিত হয়ে আসে। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে যজ্ঞে পশুবলি ও রক্তপাত নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে। সম্রাট অশোক তাঁর অভিলেখগুলিতে যজ্ঞে পশুবলি বন্ধ করেন, এমনকী রাজমহানসে (রাজার পাকশালায়) যে হাজার হাজার পশুহত্যা হত, তার পরিবর্তে শুধুমাত্র দুটি ময়ূর ও একটি হরিণ দৈনন্দিন বরাদ্দ ধার্য করেন (রক এডিক্ট ৮)। পরে সেটুকুও বন্ধ হবে, এরকম আশ্বাস দেন! অবশ্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি-না, তা জানা যায় না৷ সম্ভবত পিয়দসি ময়ূর মাংসের লোভ সংবরণ করতে পারেননি!
আগেই বলেছি, বৈদিক যুগেও প্রাগার্য্যের থেকে শিখে চাষবাসের প্রচলন হচ্ছিল। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে, যব এবং ধান্য ক্ষুন্নিবৃত্তি করে। চালকে বলা হত ধান্যবীজ। সাধারণভাবে শস্য বোঝাতে ধান শব্দটিও পাওয়া যায়। ব্রীহি বলতে ফসল বোঝায়, আবার বিশেষ এক প্রকার ধানও বোঝায়। কৃষ্ণব্রীহীও বিশেষ এক প্রকার ধান। নীবার একপ্রকার বন্য ধান, যা চাষ করতে বিশেষ শ্রম ও সময় দিতে হয় না বলে মুনিঋষিরা এই ধানের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। কালিদাসের ‘অভিজ্ঞানশকুন্তল’ নাটকে নীবার ধান্যের কথা বারেবারে পাই। গোধূম অর্থাৎ গম প্রভূত পরিমাণে ব্যবহার করা হত (বাজসনেয়ী সংহিতা, ১৯.১২)। মনে হয়, এই সময়কালে, গোধূম, যব ও ধান্যের ব্যবহার বেশি ছিল। ডালের চাষও হত। প্রধানত মুদ্গ (মুগের ডাল) ও মাষ (মাষকলাই) খাওয়া হত। মৈত্রায়ণী সংহিতায় বিশেষ করে এগুলির কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ‘অনু’ নামে একটি ভুট্টাজাতীয় ফসলের কথা শোনা যায়।
তথাকথিত একটি নিম্নশ্রেণীর ফসলের কথা শোনা যায়, সেটিকে বলা হয় ‘কুল্মাষ’। এটি নেহাৎ খাদ্যাভাব না হলে কেউ খেত না! ছান্দোগ্য উপনিষদে এর উল্লেখ পাই (ছান্দোগ্য উপনিষদ ১.১০.১.২)। নিরুক্তকার যাস্ক বলেছেন, নিতান্ত দুর্দিনে লোকে কুল্মাষও খায়—কুল্মাষাংশ্চিদাহর। ইত্যবকুৎসিতে। কুল্মাষাঃ কুলেষু সীদন্তি (নিরুক্ত ১.৪)। মনে হয়, এটা খুদকুঁড়ো জাতীয় প্রায় অখাদ্য—যা কোনোরকমে প্রাণধারণ করার জন্য দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তিরা খেতে বাধ্য হত। সেদিক থেকে এটি খাদ্য না বলে কুখাদ্য বললেই ভালো হয়! বেশ বোঝা যায়, প্রাচীন ভারতবর্ষে সেই ‘স্বর্ণযুগ’ কোনোদিনই ছিল না, যেখানে সব মানুষ সর্বসুখী ছিল। সে সময়েও ক্ষুধা ছিল, ছিল অনাহার।
যখন থেকে রান্না করার সূত্রপাত হয়েছে, তখন থেকেই খাদ্য কতটা সুস্বাদু করা যায়, তারও প্রচেষ্টা চলেছে। তেল ব্যবহার করলে খাদ্যের স্বাদ বৃদ্ধি হয়। ‘তৈল’ শব্দটিই নিষ্পন্ন হয়েছে ‘তিল’ থেকে—তাতেই স্পষ্ট হয়, আদিতে তিলের তেলই ব্যবহার করা হত। রান্নায় তিলের প্রয়োগও হত (অ.বে. ২.৮.৩; তৈ.সং. ৭.২.১০.২ ইত্যাদি)। এছাড়া অভিজ্ঞানশকুন্তল নাটকে দেখি ইঙ্গুদীর তেলও ব্যবহার করা হত—বিশেষত মুনিঋষিরা এই তেল ব্যবহার করতেন। ইঙ্গুদী হল মরু অঞ্চলে জন্মানো একটি কাঁটাযুক্ত ঔষধি গাছ। সর্ষপ অর্থাৎ সর্ষে এবং তিল—দুইই রান্নায় তেল হিসেবে ব্যবহার করা হত। খাদ্য স্বাদু করতে নুন মরিচের ব্যবহারের কথা কল্পসূত্রে পাওয়া যায়।
দুধ ও দুগ্ধজাত সব রকম খাদ্যই জনপ্রিয় ছিল। এক বলকা (একবার মাত্র ফুটিয়ে নেওয়া) দুধ খুব জনপ্রিয়, তাকে বলা হত শৃত দুগ্ধ। দুধের সরকে ‘সর’ই বলা হত। ‘ক্ষীর’ বলতে দুধ ও ক্ষীর দুইই বোঝানো হত। দধি তো ছিলই, উপরন্তু আমীক্ষ্য বা পনীরও ছিল। নবনীত হল যাকে বলা হয়, ননী বা মাখন।
সবচেয়ে প্রিয় অবশ্যই ঘৃত বা হবিঃ। একে হবিঃ বলা হত, কারণ দেবতাদের উদ্দেশ্যে এটি দিয়ে ‘হবন’ করা হত—ঘৃত অগ্নির ঘনিষ্ঠ আত্মীয়৷ মানুষ ঘী খেতে ভালোবাসত, তাই এটি দেবতাদেরও প্রিয়। সব রকম যাগযজ্ঞে ঘৃত লাগবেই! এ না হলে যাগযজ্ঞ অসিদ্ধ! তাই চার্বাক ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘ধারদেনা করে হলেও ঘৃত খাও, যতদিন বাঁচবে, সুখে বাঁচবে!’ (ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ, যবজ্জীবেৎ সুখং জীবেৎ, সর্বদর্শনসংগ্রহ, পৃ ৬)
আবার আয়ুর্বেদ মতে আয়ুর্ঘৃতম্, অর্থাৎ ঘৃতই দীর্ঘায়ু—সব রকম রোগের চিকিৎসায় ঘৃত অবশ্য ব্যবহার্য (চরকসংহিতা, ১৩/১৪)।
আমাদের বিশ্বাস, প্রাচীন মুনিঋষিরা ফলমূল খেয়ে থাকতেন! কিন্তু ফলের নাম খুব কম পাওয়া যায়—অন্তত ঋগ্বেদ-এ, সামান্য কটির নাম পাওয়া যায়, যেমন উর্বারুক (শশা), উদুম্বর (ডুমুর), বিল্ব (বেল), প্লক্ষ (পাকুড়), অশ্বত্থ৷ পাওয়া যায় সহকার অর্থাৎ আমের উল্লেখ! রামায়ণে তো আমের কথা পাওয়া যায়ই, আরও পাওয়া যায় জম্বু, বিল্ব, ভল্লাতক (ভেলা—যা দিয়ে আগেকার দিনে ধোপারা কাপড় চিহ্নিত করত) ইত্যাদির উল্লেখ৷
এ তো গেল খাদ্যের কথা—আর পানীয়?
বৈদিক যুগে প্রিয়তম ও পবিত্র পানীয় ছিল সোমরস! সোমরস ছাড়া যাগযজ্ঞ হত না৷ এই সোমরসকে বিশেষ একটি লতার থেকে ‘সবন’ করা হত। সোম শুধু পানীয় বললে ভুল হবে, সোম একজন ঋগ্বেদীয় দেবতা৷ ঋগ্বেদ-এ ‘সোমমণ্ডল’ নামে একটি আলাদা মণ্ডল আছে, যেখানে আছে শুধু সোমের স্তুতিতে মন্ত্র। পরর্তীকালে চন্দ্রেরও নাম হয় সোম। তাঁকে ওষধিদের রাজাও বলা হয়। যজ্ঞে দেবতারা সোমরস পান করেন—অর্থাৎ তাঁদের উদ্দেশ্যে তা আহুতি দেওয়া হয়। তারপরে পুরোহিতেরা তা পান করেন। তবে এই স্বর্গীয় রস সবাই পান করার অধিকার পান না। এই সোমরস যে আসলে কী তা পরিষ্কার করে জানা যায় না। যেটুকু জানা যায়, এই সোমলতা হিন্দুকুশ পর্বত ও গৌরী নদীর সন্নিকটে পাওয়া যেত। পরে এটি দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে।
সোমরস দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হত, যাজক ব্রাহ্মণেরাও খেতেন। দেবতা আর ঋষি ছাড়া কেউ সোমরস খেতেন না। ইন্দ্র কলসী কলসী সোমরস পান করে মাতাল হতেন। অপরদিকে ‘অশ্বিদ্বয়’ অর্থাৎ পরে যাঁদের অশ্বিনীকুমার বলা হত—তাঁরা দীর্ঘকাল সোমরসে বঞ্চিত ছিলেন—কারণ তাঁরা দেবতাদের চিকিৎসক ছিলেন, রোগী এবং শবদেহ স্পর্শ করার কারণে তাঁদের ‘অপবিত্র’ বলে গণ্য করা হত৷ পরে তাঁরা সেই অধিকার পান—তবে সে অনেক বড়ো গল্প।
এছাড়া অবশ্য সুরা ছিল—যারা সোমপানের অধিকার পায়নি, প্রধানত তারা সুরা পান করতেন। সুরা নানারকম পদার্থ থেকে তৈরি করা হত—মধু থেকে মাধ্বী, গুড় থেকে গৌড়ী, ময়দা বা কোনো শস্যের গুঁড়ো (পিষ্ট) থেকে পৈষ্টী। যজ্ঞে সুরার ব্যবহার ছিল না—শুধুমাত্র সৌত্রামণি যাগে সুরা ব্যবহার করা হত। এটি সাধারণ মানুষের—বিশেষত রাক্ষসদের পানীয় ছিল। এই সময় থেকে দেখি, পানাহারে সামাজিক শ্রেণিবিভাগ এসেছিল।
প্রাচীন ভারতবর্ষেও খাদ্যরসিকের সংখ্যা নেহাৎ কম ছিল না। প্রথম দিকে রান্নার দুটি প্রকার ছিল—শূলপাক (শিক কাবাব জাতীয় রান্না) এবং স্থালীপাক অর্থাৎ হাঁড়িতে রান্না। সাধারণত মেয়েরা রান্না করলেও যাগযজ্ঞে পুরুষ পাচকদের দেখা যায়। আস্তে আস্তে নানারকম ব্যঞ্জন দিয়ে বিভিন্ন ধরনের রান্না হতে লাগল। মহাভারতে নলরাজা ও দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম ‘ফাইভ স্টার কুক’ ছিলেন বলে জানা যায়!
এখানে আর একটি প্রসঙ্গ আসে—খাওয়া মানে শুধু নিজে খাওয়া নয়, অপরকেও খাওয়ানো৷ মানুষ খাদ্য সংগ্রহ করে শুধু নিজে খাবার জন্য নয়, অপরেও যাতে যথেষ্ট খাদ্য পায়! ঋগ্বেদ-এ বলা হয়েছে, যে মানুষ অপরকে ভাগ না দিয়ে একা খায়, সে শুধু নিজের পাপই ভক্ষণ করে (কেবলাঘো ভবতি কেবলাদী, ঋগ্বেদ সংহিতা ১০.১১৭.৬)।
গ্রন্থসূচী
ঋগ্বেদ সংহিতা, সম্পাঃ এস ডি সাতবলেকর, স্বাধ্যায়মণ্ডল, ১৯৬৮৷
অথর্ববেদ সংহিতা সম্পাঃ এস ডি সাতবলেকর, স্বাধ্যায়মণ্ডল, ১৯৬৮৷
যজুর্বেদ তৈত্তিরীয় সংহিতা, সম্পাঃ এইচ এন আপ্তে, আনন্দাশ্রম মুদ্রণালয়, ১৯০০৷
যজুর্বেদ মৈত্রায়ণী সংহিতা, সম্পাঃ এস ডি সাতবলেকর, স্বাধ্যায়মণ্ডল, ১৯৬৮৷
যজুর্বেদ বাজসনেয়ী সংহিতা, সম্পাঃ জগদীশলাল শাস্ত্রী, মোতিলাল বানারসীদাস, দিল্লী, ১৯৭৮৷
শতপথব্রাহ্মণ, সম্পাঃ সত্যব্রত সামশ্রমী, কলকাতা, ১৯০৩৷
মহাভারত, গীতা প্রেস৷
রামায়ণ, গীতা প্রেস৷
নিরুক্ত, সম্পাঃ লক্ষ্মণ সরূপ, মোতিলাল বানারসীদাস৷
সর্বদর্শনসংগ্রহ, সম্পাঃ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর৷
Bibliotheca Indica, The Asiatic Society, 1986৷
চরকসংহিতা, সম্পাঃ লক্ষ্মীধর দ্বিবেদী, চৌখাম্বা সংস্কৃত সিরিজ, বারাণসী৷
উট্টঙ্কিত সংস্কৃত বিদ্যা অরণ্য শিলালেখ (২য় খণ্ড), সম্পাঃ কে জি কৃষ্ণান, উট্টঙ্কিত বিদ্যা অরণ্য ট্রাস্ট, ২০০৬৷
অসাধারণ লেখা, অনেক কিছুই জানলাম।
খুব সুন্দর লেখা, অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম। সোমরস মানে জানতাম সুরা, সেই ভুলটাও কেটে গেল।
তবে গন্ডারের মাংস যে খাওয়া হতো সেটা আগে কোথাও পড়িনি।
ধন্যবাদ
অনেক পরিশ্রম করে লেখা।লেখককে ধন্যবাদ। তবে DN Jha ‘ র ‘হিন্দু স্বত্বায়া গোমাংস’ পুস্তিকা থেকে তথ্যদি নিলে আরও ভালো হতো মনে হয়।