পশ্চিমবঙ্গে মন্দির স্থাপত্যের বিবর্তন
ভাঙা দেউলের দেবতা,
তব বন্দনা রচিতে ছিন্ন বীণার তন্ত্রী বিরতা—
সন্ধ্যাগগনে ঘোষে না শঙ্খ তোমার আরতিবারতা
তব মন্দির স্থিরগম্ভীর ভাঙা দেউলের দেবতা
—ভগ্ন মন্দির, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রাককথন
পশ্চিমবঙ্গে মন্দির তৈরির ইতিহাস প্রায় দেড় হাজার বছর; তবে নদীবিধৌত পাললিক সমভূমির মাটিতে প্রাচীন স্থাপত্যের প্রায় কিছুই টিকে থাকতে পারেনি। যেটুকু নিদর্শন টিকে গেছে তা রয়েছে মূলত বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুরে; এখানকার অপেক্ষাকৃত শুষ্ক জলবায়ু এবং সুকঠিন ভূ-প্রকৃতি এই প্রাচীন স্থাপত্যগুলোর স্থায়িত্ব বর্ধনে সহায়ক হয়েছে। কালের প্রভাবে এই প্রাচীন স্থাপত্যসৌধগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়লেও এখনও যা রয়ে গেছে তার থেকে প্রাচীন বাঙালি জাতির বহু শতাব্দীর জীবন ও সংস্কৃতির স্পন্দন টের পাওয়া যায়।
পশ্চিমবঙ্গের মন্দির নির্মাণের পর্ব বিভাগ
পশ্চিমবঙ্গের (এবং বাংলাদেশেরও বটে তবে এই রচনায় শুধু পশ্চিমবঙ্গের মন্দির নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ) মন্দির তৈরির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় তা স্পষ্টত দুটো পর্বে বিভক্ত।
গুপ্তযুগের বহু আগে থেকেই এখানে ভাস্কর্যের নিদর্শন পাওয়া গেছে; বোঝা যায় বহু প্রাচীন কাল থেকে এখানে ধর্মীয় স্থাপত্য নির্মাণের চল ছিল। কিন্ত খড় বাঁশ কাঠ কিংবা ইটের তৈরি সেইসব নশ্বর স্থাপত্য বহুকাল আগে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম মন্দির বলতে যে নিদর্শনগুলো পাওয়া যায় তা গুপ্তযুগ বা তার পরবর্তী কালের। সেইসময় থেকে প্রায় ত্রয়োদশ শতক অবধি অবিচ্ছিন্নভাবে বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে যে বিপুল সংখ্যক মন্দির নির্মিত হয়েছিল তার অল্প কয়েকটা আজও টিকে আছে কালের প্রকোপ, মানুষের অত্যাচার ও অবহেলার হাত এড়িয়ে। এছাড়াও প্রচুর মন্দির নির্মিত হয়েছিল ,তার সাক্ষ্য রয়ে গেছে সেইসময়কার কিছু শিলালিপিতে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা মন্দিরের ভাঙা অংশগুলোতে। যেমন আমলকশিলা, দ্বারবাজু, চৌকাঠ বা ঝনকাঠ (লিণ্টেল) ইত্যাদি পাথুরে নিদর্শন এখনও রয়ে গেছে ।
সুলতানি আমলে মন্দির নির্মাণের পুনর্জাগরণ
রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় পটপরিবর্তনের ফলে ত্রয়োদশ শতকের পর পশ্চিমবঙ্গে মন্দির নির্মাণের একটা ছেদ আসে।
তবে প্রখ্যাত শিল্প- বিশারদ ঐতিহাসিক তারাপদ সাঁতরা দেখিয়েছেন, ত্রয়োদশ শতকে তুর্কী আক্রমণের ফলে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলে মন্দির নির্মাণের প্রক্রিয়ায় ছেদ পড়লেও রাঢ় বাংলার পশ্চিমপ্রান্তে মন্দির নির্মাণের প্রয়াস অব্যাহত থেকেছে। উদাহরণ হিসেবে পুরুলিয়ার তেলকুপির কথা বলা যায়, সেখানে মন্দির নির্মাণের ধারা অব্যাহত থেকেছে পঞ্চদশ শতক অবধি৷ বর্ধমান জেলার বরাকরের বেগুনিয়া মোড়ে অবস্থিত নির্মিত দেউলগুলোতে পাওয়া শিলালিপির সাক্ষ্য প্রমাণ করেছে পঞ্চদশ শতকে এই দেউলগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল।
মন্দির নির্মাণ শৈলী
ত্রয়োদশ শতকে তুর্কী আক্রমণের পর দেড়শো বছরের মধ্যেই অবিভক্ত বাংলা জুড়ে স্বাধীন সুলতানি শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। সুলতানি আমলে দরবারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রচুর ইসলামি স্থাপত্যের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। স্থানীয় কারিগরদের দ্বারা নির্মিত এই সব স্থাপত্যে উত্তর ভারতের ইসলামিক স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব তেমন পড়েনি৷ বরং বাংলার আবহমান কাল ধরে নির্মিত খোড়োচালের কুঁড়েঘরের আদল সেখানে অনুসৃত হয়েছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রাচীন হিন্দু-বৌদ্ধ স্থাপত্যে ব্যবহৃত পোড়ামাটির অলংকরণ। মধ্য এশিয়ার উদ্ভাবিত ইসলামিক শৈলীর জ্যামিতিক অলংকরণ মিশ্রিত অনবদ্য কিছু নকশাও এই মন্দিরগুলিতে পাওয়া গেছে।
তারাপদ সাঁতরা ও হিতেশ সান্যাল মশাই দেখিয়েছেন, মাটির বাড়ির খড়ের ঢালু চালকে ইটের ঢালু ছাদে পরিণত করতে কারিগরদের বিভিন্ন স্থাপত্য শৈলীর মিশ্রণ করতে হয়েছে। প্রাচীন হিন্দু-বৌদ্ধ স্থাপত্যের পাথর, ইট, কাঠের সোজা বীম, স্তম্ভ এবং করবেলিং পদ্ধতিতে ছাদ নির্মাণের পরিবর্তে মধ্য এশিয়ার শৈলী থেকে নেওয়া আকুয়েট (arcuate) শৈলীর খিলান ব্যবহার করা হয়। এই খিলানশৈলীর নির্মাণ পদ্ধতিতে কাঠামোর ছাদ, দরজা ও জানালার ভার বহনের জন্য খিলান, ভল্ট ও গম্বুজ ব্যবহার করা হয়; বন্ধনের উপাদান হিসেবে চুনের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। পেন্ডেন্টিভ বা স্কুইঞ্চ (pendentive বা squinch) ব্যবহার করে বর্গাকার বা আয়তাকার গর্ভগৃহ এবং তৎসংলগ্ন অলিন্দের ছাদ তৈরি করা হয়েছে। এই বিশেষ স্থাপত্য কৌশলের সাহায্যে বর্গাকার বা বহুভুজাকার ভিত্তি থেকে বৃত্তাকার গম্বুজে পরিবর্তন করা হয়।
এই পদ্ধতির বিপুল ব্যবহার দেখা যাবে আরও পরে হিন্দু মন্দির স্থাপত্যের নব পর্যায়ে।
প্রখ্যাত গবেষক ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী দেখিয়েছেন, সুলতানি আমলে বাংলার হিন্দু স্থাপত্যের নবজাগরণ ঘটে। আবহমান কালের ঢালু খড়-বাঁশ-কাদামাটির চালের সঙ্গে ইসলামধর্মীয় রীতির খিলান ও গম্বুজ যুক্ত হয়ে তৈরি হল বাংলার নিজস্ব এক অনন্য স্থাপত্যশৈলী—ঢালু ছাদের চালা মন্দির—পাল-সেন যুগ বা তারও আগের প্রচলিত সর্বভারতীয় নাগর রীতির আদলে নির্মিত শিখর মন্দিরের থেকে আলাদা।
আঠারো শতকের শেষ ভাগ থেকে আবার এই মিশ্রিত স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর কিছু মিশ্রণ ঘটতে থাকে যার প্রভাব দেখা যায় সেইসময়কার মন্দির গুলোতে।
অন্ত মধ্যযুগীয় বাংলার মন্দিরের নির্মাণ কৌশল বিশদভাবে আলোচনা করেছেন তারাপদ সাঁতরা। পনেরো ষোলো শতকের পর থেকে বাংলার মন্দির নির্মাণে প্রকৃত খিলান, ভল্ট এবং গম্বুজের ব্যবহার বিপুলভাবে ব্যবহার করা হয়। এইগুলোকে স্থায়িত্ব দিতে মূলত দেশী চুনের (শামুক ও ঝিনুকের খোলা পুড়িয়ে প্রস্তুত) সঙ্গে বালি বা সুরকি মিশিয়ে গাঁথনিতে ব্যবহার করা হত। গাঁথনিকে মজবুত করার জন্য গুড় বা গুড়ের গাদ এবং অন্যান্য উপকরণ যেমন, হরিতকী, খয়ের, মেথি ভেজানো জল মেশানোর চল ছিল।
মন্দিরের গর্ভগৃহের ছাদে গম্বুজ তৈরি করে সেই গম্বুজের গায়ে বা উপরের অংশে ইটের টুকরো সহ চুনবালি বা চুনসুরকির পলেস্তারা দিয়ে চারচালার আচ্ছাদন দেওয়া হত। দেওয়ালের উচ্চতার সঙ্গে উপরের চারচালা আচ্ছাদনের মাপের অনুপাত এমনভাবে রাখা হত যাতে স্থাপত্যটির আকৃতি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। আটচালার এবং বারোচালার ক্ষেত্রে নিচের চারচালাটি নির্মাণের পর যথাক্রমে উপরে একটি করে ছোটো শূন্যগর্ভ চারচালা নির্মিত হত। রত্নমন্দিরের ক্ষেত্রে একইভাবে গর্ভগৃহ এবং তৎসংলগ্ন অলিন্দের ছাদের উপর গম্বুজ নির্মাণ করে তার উপরে ইটের টুকরো, খোয়া ইত্যাদির সঙ্গে চুন-সুরকি মিশিয়ে চালা মন্দিরের মতো ঢালু ছাদ তৈরি হয়। এরপর সেই ছাদের প্রতিটি কোণে পরিকল্পনা মতো নির্দিষ্ট সংখ্যক চূড়া বসিয়ে তৈরি হয় রত্নমন্দির। এই মন্দিরগুলির ত্রিখিলান বিশিষ্ট প্রবেশপথের মধ্যে সমদূরত্বে অবস্থিত থাকে দুটি স্তম্ভ এবং দুদিকের দেওয়ালের গায়ে প্রোথিত থাকে দুটি অর্ধস্তম্ভ।

চিত্র ১ – আটচালা, দ্বারহাট্টা হুগলি।
বাংলার মন্দিরের এই অলংকৃত স্তম্ভগুলো ছিল মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। বত্রিশ থাক ইট বা পাথর দিয়ে এই ধরনের স্তম্ভ তৈরি হত যার উপর ও নিম্নাংশ বর্গাকৃতির হলেও, মধ্যাংশে নানা কৌণিক রূপের সমাহার লক্ষ্য করা যায়। কারিগর মহলে এই ধরনের স্তম্ভ প্রচলিত ছিল ‘ইমারতি থাম’ নামে যা সুলতানি আমলের ইসলামিক স্থাপত্যেও লক্ষ্য করা যায়।
তবে উনিশ শতক থেকে আরও এক ধরনের স্তম্ভের বহুল ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়; এর প্রচলিত নাম ছিল ‘কলাগাইছ্যা থাম’ যা ছিল একসাথে চার থেকে ষোলোটা কলাগাছের কাণ্ডের মতো গুচ্ছবদ্ধ। নানা রকমের আকৃতির এই স্তম্ভের সারির মধ্য দিয়ে মন্দিরের প্রবেশপথ এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য সৃষ্টি করত।
মন্দির নির্মাণ শিল্পের পুনর্জাগরণের সামাজিক প্রেক্ষাপট
প্রধানত ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি থেকেই বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী অনুসারে নতুনভাবে মন্দির নির্মাণের একটা জোয়ার আসে যার প্রভাব চলতে থাকে উনবিংশ এমনকী বিংশ শতকের প্রথমভাগ অবধি।
মূলত চৈতন্যদেব প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের আন্দোলনের প্রভাবই মন্দির স্থাপত্যের এই নবজাগরণের প্রধান কারণ৷ তবে গবেষক মৃণ্ময়ী রায় বলেছেন, শৈব এবং শাক্ত প্রভাবও সেই সময়ে ছিল যা তখনকার শিব মন্দিরের সংখ্যাধিক্য দেখে সহজেই অনুমান করা যায়। গবেষক হিতেশরঞ্জন সান্যাল এবং তারাপদ সাঁতরা মন্দিরের প্রতিষ্ঠালিপি,পারিবারিক দলিল দস্তাবেজ ইত্যাদি বিচার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, এই সব মন্দির প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ করেছিলেন বড়ো রাজবংশ থেকে স্থানীয় জমিদার, ব্যবসায়ী, ব্রাহ্মণ পরিবার কিংবা বিভিন্ন কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগর সম্প্রদায়। অন্ত মধ্যযুগীয় বঙ্গসমাজ প্রবলভাবে জাতিভেদ আক্রান্ত হলেও ব্রাহ্মণ থেকে তথাকথিত জল-অচল শুদ্র সবাই এই কর্মযজ্ঞে অংশীদার হয়েছেন। বিশেষত আঠারো-উনিশ শতকে ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিপুল উন্নত সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষজন উচ্চবর্গের মানুষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিষ্ঠা করছেন একের পর এক মন্দির যা তাঁদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক প্রতিপত্তি লাভের সহায়ক হয়ে উঠেছিল। এর এক উদাহরণ হলেন রাণী রাসমণি; জাতে কৈবর্ত হলেও তাঁর প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির সমাজের উচ্চবর্গের মানুষের কাছেও বিপুলভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল।
মন্দিরের শ্রেণিবিভাগ
নবপর্যায়ে নির্মিত এই মন্দিরগুলোর ছাউনি নির্মাণ কৌশলের উপর ভিত্তি করে এদের প্রকারভেদ করা যায়। এই ছাউনির গঠনরীতির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মন্দিরগুলোকে প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়, তা হল রেখা বা শিখর রীতি, ভদ্র বা পীঢ়া রীতি, চালা, রত্ন এবং দালান। এদের মধ্যে শিখর এবং ভদ্র রীতি প্রাচীন শিল্পশাস্ত্র অনুসারে নির্মিত হিন্দু মন্দিরের নাগর রীতির প্রকারভেদ। এই শৈলী বাংলায় মন্দির স্থাপত্যের নবজাগরণের বহু আগে থেকে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল এবং সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিশেষত ওড়িশায় এই শৈলীগুলোর বহু উৎকৃষ্ট নিদর্শন নির্মিত হয়েছে গুপ্তযুগের পর থেকে যার অনেকগুলো এখনও রয়ে গেছে। কিন্ত চালা, রত্ন ও দালান শৈলী একান্তভাবেই বাঙালি শিল্পীর উদ্ভাবনী শক্তির নিদর্শন।
সর্বভারতীয় রীতি অনুসরণে নির্মিত বাংলার মন্দির
গুপ্তযুগের পর থেকেই সর্বভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের নাগররীতির অনুসরণে নির্মিত উচ্চশিখর বিশিষ্ট মন্দির তৈরি শুরু হয় যা প্রধানত বর্গাকার গর্ভগৃহের উপর স্থাপিত ক্রমহ্রাসমান বক্ররেখাকৃতি শিখর স্থাপত্য বিশিষ্ট অথবা একইরকম ভাবে গর্ভগৃহের উপর পিরামিডাকৃতি শিখর বিশিষ্ট। প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার সঙ্গে দীর্ঘ সংযোগের জন্য পশ্চিমবঙ্গের এই প্রাচীন শিখর মন্দিরগুলো, ওড়িশার শিল্পশাস্ত্র অনুসারী নাগর রীতির এক বিশেষ আঞ্চলিক রূপ (যা কলিঙ্গরীতি নামে প্রচলিত) দ্বারা প্রভাবিত। অবশ্য একইভাবে ওড়িশার খিচিং অঞ্চল এবং বিহারের কঞ্চ বা দেও অঞ্চলের নাগর রীতির অনুসরণে নির্মিত অষ্টম-নবম শতকের মন্দিরগুলো বঙ্গের প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যকে প্রভাবিত করেছিল।
বর্গাকৃতির গর্ভগৃহের উপর বক্ররেখাকৃতি শিখর সমন্বিত এই মন্দিরগুলো ওড়িশি শিল্পশাস্ত্রে রেখা দেউল নামে পরিচিত। সাধারণাব্দ ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে এই রেখা দেউল শিল্পরীতির বিকাশ ঘটে। একাদশ শতকের রেখা দেউলের একটি অনবদ্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। রাজ্যের দক্ষিণে সুন্দরবনের জনবসতি অঞ্চলে মণি নদীর মোহনায় অবস্থিত জটার দেউল স্থাপত্যশৈলীতে অনেকটা ওড়িশার রেখা দেউলের অনুসারী। জটাধারী শিবের নামানুসারে এই দেউল পরিচিত।
মন্দিরের সামনে অবস্থিত বর্গাকৃতির আসনের উপর পিরামিডাকৃতি শিখর সমন্বিত মন্দিরগুলো পীঢ়া বা ভদ্র দেউল নামে পরিচিত। পাল-সেন যুগ বা তার পরেও ত্রয়োদশ চতুর্দশ এমনকী পঞ্চদশ শতক অবধি রেখা এবং পীঢ়া রীতির মন্দির বাংলায় প্রচুর নির্মিত হয়েছে। তবে সপ্তদশ শতকের পরবর্তী কালে নবপর্যায়ে নির্মিত মন্দিরগুলোয় শিখর মন্দিরগুলো পীঢ়ারীতির জগমোহন বর্জিত এক সরলীকৃত রূপ ধারণ করে যা তৎকালীন মন্দির স্থপতিদের কাছে দেউল নামে পরিচিত ছিল।

চিত্র ২ – জোড়া দেউল কালিকাপুর,বীরভূম।
মন্দিরের সামনে অবস্থিত বর্গাকৃতির আসনের উপর পিরামিডাকৃতি শিখর সমন্বিত মন্দিরগুলো পীঢ়া বা ভদ্র দেউল নামে পরিচিত (৫)। পাল-সেন যুগ বা তার পরেও ত্রয়োদশ চতুর্দশ এমনকী পঞ্চদশ শতক অবধি এই ধরনের মন্দির বাংলায় প্রচুর নির্মিত হয়েছে। তবে সপ্তদশ শতকের পরবর্তী কালে নবপর্যায়ে নির্মিত মন্দিরগুলোয় শিখর মন্দিরগুলো পীঢ়ারীতির জগমোহন বর্জিত এক সরলীকৃত রূপ ধারণ করে।

চিত্র ৩ – শিখর মন্দির, বাহুলাড়া বাঁকুড়া।
এই দেউলগুলোয় ওড়িশার পঞ্চাঙ্গ শিখরের বাঢ় আর গণ্ডী বিভাগ অনুসরণ করলেও, অংশগুলোর মধ্যে নামমাত্র তফাত লক্ষ্য করা যায়। যদিওবা মন্দির শীর্ষে আমলকের অবস্থান কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, তা ক্ষুদ্রাকৃতি। মূলত আঠারো শতক থেকে এইরকম স্থানীয় রীতিতে তৈরি দেউল মন্দিরের প্রাচুর্য লক্ষ্য করা যায়। অবশ্য আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য প্রবলভাবে বিভিন্নরকম গঠনরীতি সৃষ্টি করেছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় বীরভূমের ভাণ্ডিরবন কিংবা কবিলাসপুরের মন্দির যেখানে ভূমি থেকে সরাসরি সুষম বক্ররেখায় শিখর নির্মিত হয়ে শীর্ষে একটি বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। আবার বর্ধমান বীরভূমের সন্নিহিত অঞ্চলে অসংখ্য ঘন খাঁজকাটা সমান্তরাল বেষ্টনীযুক্ত শিখর দেউল দেখা যায়, বাংলার মন্দির গবেষণার অন্যতম অগ্রপথিক ডেভিড ম্যাকাচন একে বীরভূম-বর্ধমান শৈলী বলেছেন। এর এক পরিচিত উদাহরণ বর্ধমান জেলার কালনা কিংবা মৌখিরা কালিকাপুর গ্রামের দেউল মন্দিরগুলো। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতায় নির্মিত বিভিন্ন আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য সমন্বিত এই দেউলগুলো বাঙালির নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী যার তুলনা সর্বভারতীয় মন্দির স্থাপত্যে নেই।
ওড়িশার মূল শিখর দেউলের সংলগ্ন পিরামিডাকৃতি পীঢ়া দেউল যা জগমোহন নামে পরিচিত তা শিখর দেউলের মতো বর্গাকৃতি অংশের উপর পিরামিড আকৃতির খাঁজকাটা গণ্ডী ও আমলক, ঘণ্টা ইত্যাদি মস্তক অংশে শোভিত। পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত শিখর দেউল জগমোহন শোভিত থাকত না তবে মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া জেলায় এই শৈলীর জগমোহনের অস্তিত্ব দেখা যায়। এছাড়া মেদিনীপুর জেলায় শিখর ছাড়া শুধু একাকী অবস্থিত পীঢ়া দেউলের বেশ কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়। ওড়িশা সংলগ্ন ভৌগোলিক অবস্থান এবং ওড়িশা র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপুল প্রভাব সম্ভবত এই শৈলী ব্যবহারের কারণ।
চালা, রত্ন, দালান—বাংলার নিজস্ব রীতি

চিত্র ৪ – বাংলার মন্দির স্থাপত্যের প্রকারভেদ, কৃতজ্ঞতা গবেষক অরুণাভ সান্যাল৷
ভারতীয় স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাসে চালা মন্দির শৈলী যে বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান তা নিয়ে সন্দেহ নেই। প্রাচীন ভারতে ঢালু ছাদের স্থাপত্যের নিদর্শন পাওয়া যায় শিলালেখে উৎকীর্ণ শস্যভাণ্ডারের রিলিফে কিংবা বৌদ্ধ স্থাপত্যের গায়ে উৎকীর্ণ ভাস্কর্যে। মহাবলীপুরমের দ্রৌপদী রথ নামে মন্দিরের চারচালা পাথরের আচ্ছাদনটি তার বহু শতক পরে তৈরি হয়েছে—বাংলার ইটের চারচালা মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে এই শৈলী অনুরূপ। তবে চালা রীতির ঢালু ছাদযুক্ত মন্দির কীভাবে বাংলার স্থপতিদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য স্থপত্যরীতি হয়ে দাঁড়াল তার কারণ নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। প্রখ্যাত গবেষক হিতেশরঞ্জন সান্যালের মতে বাঙালি সর্বভারতীয় মন্দির শৈলীর বিশালত্বর প্রতি মোহকে পরিত্যাগ করে দেবালয়কে আপন গৃহের মতো করে বানাতে চেয়েছে। এই রীতির জনপ্রিয়তার একটা বড়ো কারণ সম্ভবত এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়ে গেছে। অবশ্যই এই অঞ্চলের বর্ষণমুখর জলবায়ুও ঢালু ছাদের প্রচলনের একটা কারণ হওয়া সম্ভব। তবে হিতেশবাবুর কথা ধার করেই বলি দেবতার মহিমা উপলব্ধি করার জন্য বাঙালি তাঁকে রাজরাজেশ্বর সম্রাট বলে দূর থেকে ভয়মিশ্রিত সম্ভ্রম করেনি বরং নিজ পরিজনের মতোই ভালোবেসেছে। তাই দেবতার গৃহ মানব গৃহের অনুকরণে তৈরি হয়েছে।
আগেই বলা হয়েছে সুলতানি আমল থেকেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত অর্ধবৃত্তাকার খিলান ও গম্বুজসমৃদ্ধ যে নির্মাণ কৌশল বাংলায় চালু হয়। পরবর্তী অনুচ্ছেদগুলোয় আমরা চালা মন্দির এবং বাকি স্থাপত্যশৈলী গুলির বিভিন্ন প্রকারভেদ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব।
- চালা মন্দিরের বিভিন্ন শৈলী যথাক্রমে দোচালা, জোড়বাংলা বা দুটি দোচালার সমষ্টি, চারচালা, আটচালা এবং বারোচালা বলে পরিচিত। বাংলার গ্রামেগঞ্জে অবস্থিত খড়ে ছাওয়া ঢালু চালের দোচালা কুঁড়েঘরের আদলটিকে অনুসরণ করে স্থপতিরা তৈরি করেছিলেন মন্দির। এই মন্দিরের ভিত্তিভূমি আয়তাকার। আয়তাকার ঘরের চার দেওয়ালের দুপাশে দুটো চাল নেমে আসে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই চালাগুলো হত বক্রাকৃতি, ফলে দুটো চালের সংযোগস্থল ধনুকের মতো ঢালু। ভিত্তিভূমি আয়তাকার হলেও প্রবেশপথ একদুয়ারি বা ত্রিখিলান বিশিষ্ট দুই স্তম্ভ যুক্ত হতে পারে। স্থপতি মহলে এই রীতি একবাংলা নামেও পরিচিত যা বাংলার বাইরেও বেশ খ্যাতি লাভ করে। মুঘল আমলের বাঙালি ছত্রী আর ব্রিটিশ আমলের বাংলো বা ডাকবাংলো নামের মধ্যে বাঙালির উদ্ভাবিত ঢালু ছাদের গৃহনির্মাণ শৈলীর পরিচয় রয়ে গেছে।
তবে দোচালা শৈলীর মন্দিরের উদাহরণ বাংলায় খুব বেশী নেই। মুর্শিদাবাদ জেলায় রাণী ভবানী প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত চারবাংলা মন্দির আসলে চারটে একবাংলা মন্দিরের সমষ্টি। এছাড়া দোচালা খোড়ো চালের চণ্ডীমণ্ডপ বাংলায় একদা খুবই প্রচলিত ছিল যা এখন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেলেও একটি অসামান্য উদাহরণ এখনও দেখা যায়। হুগলি জেলার আঁটপুরের মিত্রবাড়ির রাধাগোবিন্দ মন্দির চত্ত্বরে অবস্থিত কাঠের চণ্ডীমণ্ডপটিতে এই শৈলীর ব্যবহার হয়েছে।
- দোচালা রীতিরই আরেকটা উন্নততর ও পরিবর্ধিত রূপ হল জোড়বাংলা শৈলী যা আদতে দুটো দোচালা স্থাপত্যকে পাশাপাশি জুড়ে বানানো। দুটো আয়তক্ষেত্রের সমান্তরাল অবস্থানে মন্দিরের আসন বর্গাকৃতির হয়ে ওঠে। জোড়বাংলা মন্দিরের ভিতর দিকে সাধারণত দুটো ঘর থাকে। সামনের ঘরটা আদতে মণ্ডপ বা জগমোহন যা বাংলার মন্দিরে দালান হিসেবে পরিচিত এবং ভিতরের ঘরটি গর্ভগৃহ যেখানে দেবতা অবস্থান করেন। দুটো ঘরের মধ্যে থাকে বিভাজক দেওয়াল এবং দালান থেকে গর্ভগৃহে যাওয়ার পথ। দালানের সামনে প্রথাগত ভঙ্গিতে অবস্থান করে ত্রিখিলানবিশিষ্ট প্রবেশদ্বার। তারাপদ সাঁতরা দেখিয়েছেন কখনো চালের উপর স্থাপিত হত সমদূরবর্তী স্থানে অবস্থিত তিনটি ক্ষুদ্রাকার চূড়া আবার কখনো দুটি দোচালার মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপিত হত চারচালা বা আটচালা বা নবরত্নরীতির ক্ষুদ্রাকৃতির স্থাপত্যসৌধ। এই শ্রেণীর মন্দিরের শ্রেষ্ঠতম উদাহরণটি হল বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত জোড়বাংলা মন্দির যার দুটো চালের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপিত রয়েছে একটা ক্ষুদ্রাকৃতির চারচালা। এছাড়া হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়া, মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনা, বীরভূমের ইটণ্ডা গ্রামে এবং হুগলি জেলার বালি দেওয়ানগঞ্জ এ অবস্থিত জোড়বাংলা মন্দির (যার দুই চালের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপিত হয়েছে একটি নবরত্ন মন্দির!!) এই শৈলীর অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
- দোচালা ছাদের স্বাভাবিক পরিণতি যে যথাক্রমে চারচালা এবং আটচালা স্থাপত্যশৈলী তা সহজেই বোঝা যায়। দোচালা মন্দিরের আসন আয়তাকার কিন্ত চারচালা সাধারণত বর্গাকৃতির আসনের উপর অবস্থিত। চারদিকে চারটি দেওয়ালের প্রত্যেকটির উপর দিয়ে একটি করে চালা বক্রগতিতে ঊর্ধ্বগামী হয়ে একটি শীর্ষবিন্দুতে মিলিত হয়। দোচালা মন্দিরের মতোই এখানে চালের কার্নিশ ধনুকের মতো ঢালু। চারটি চালের সর্বাঙ্গীণ বক্ররেখার বন্ধনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে এই মন্দিরের সৌন্দর্যের চাবিকাঠি। সাধারণত এই বর্গাকৃতির মন্দিরের প্রবেশপথটি হয় একদুয়ারি; একটি দরজা বিশিষ্ট তবে ত্রিখিলান বিশিষ্ট প্রবেশপথ-এর উদাহরণও রয়েছে। এই স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম এবং প্রাচীনতম উদাহরণটি হল মেদিনীপুর জেলার ঘাটালের সিংহবাহিনীর চারচালা মন্দির৷ প্রতিষ্ঠালিপি অনুযায়ী এর নির্মাণকাল পঞ্চদশ শতকের প্রথম দিকে। এছাড়া অন্যতম বিশিষ্ট একটি উদাহরণ হল বীরভূম জেলার ঘুড়িষা গ্রামে অবস্থিত ষোড়শ শতকে স্থাপিত রঘুনাথ মন্দির (অধুনা শিব মন্দির)।
- আটচালা স্থাপত্যশৈলী হল চারচালার পরবর্তী ধাপ। স্থপতিকুল আটচালা বাসগৃহের আদলে মন্দির নির্মাণ করলেও দ্বিতীয় তলটির ব্যবহারিক প্রয়োজন নেই, শুধুমাত্র অলংকরণের উদ্দেশ্যেই এটি নির্মিত হয়েছে। চারচালা মন্দিরের নিচের চারটি ঢালু চালের উপর দ্বিতীয় তলে একটা অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকৃতির চারচালা স্থাপত্য সংযোজন করে আটচালা মন্দির গঠিত হয়েছে। উপরের চালগুলোর কার্নিশ নিচের চালগুলোর মতো ঢালু৷ এই শ্রেণীর অধিকাংশ মন্দিরের গর্ভগৃহের সামনে থাকে ত্রিখিলান প্রবেশপথ যুক্ত দালান। চালা রীতির মন্দিরের মধ্যে আটচালা শৈলীর মন্দির সবচেয়ে বেশী সংখ্যায় নির্মিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য আটচালা মন্দিরের উদাহরণ হল হুগলি জেলার মাহেশের বিখ্যাত রাধাবল্লভ মন্দির, আঁটপুরের রাধাগোবিন্দ মন্দির, নদীয়া জেলার শান্তিপুরের সুবৃহৎ শ্যামচাঁদ মন্দির, হাওড়া জেলার বাগনান-দেউলটি এলাকার মেল্লক গ্রামে অবস্থিত মদনগোপাল মন্দির, কলকাতার নন্দরাম সেন স্ট্রিটের রামেশ্বর শিবমন্দির প্রমুখ। এছাড়া পশ্চিমবাংলায় বহু অঞ্চলে আটচালা মন্দিরের গুচ্ছ লক্ষ্য করা যায় যা দুই থেকে একশো নয়টি পর্যন্ত হতে পারে। অন্যতম বিখ্যাত উদাহরণ হল দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির সংলগ্ন বারোটি আটচালা শিবমন্দির, কালনায় বর্ধমান রাজ প্রতিষ্ঠিত, পাশাপাশি একই সমকেন্দ্রে দুটো বৃত্তাকার গুচ্ছে অবস্থিত, একশো নয়টি আটচালা শিবমন্দির।
- বঙ্গীয় স্থপতিরা আটচালায় না থেমে থেকে আটচালার উপরে আরও একটি ছোটো চারচালা স্থাপত্য সংযুক্ত করে বারোচালার মন্দির নির্মাণেও ব্রতী হয়েছিল। এই শৈলীর মন্দিরের সংখ্যা অবশ্য খুবই সীমিত, উদাহরণগুলোর মধ্যে অন্যতম হুগলি জেলার ইলছোবা গ্রামের বারোচালাটি।
বাংলার নিজস্ব চালা মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে প্রচলিত শিখর রীতির মিশ্রণ ঘটিয়ে বঙ্গীয় স্থপতিকুল তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতার সর্বোত্তম নিদর্শনটি প্রয়োগ করলেন রত্ন শৈলীর মন্দির নির্মাণে৷ সংখ্যাধিক্যে এবং নির্মাণ কুশলতায় এই মন্দির শৈলী বাংলার অন্ত মধ্যযুগের মন্দির স্থাপত্যে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। রত্ন কথাটার অর্থ চূড়া; চালা মন্দিরের ঢালু ছাদের উপর ক্ষুদ্রাকৃতির শিখর বসিয়ে রত্ন শৈলীর মন্দির নির্মিত হয়। মন্দিরের ঢাকনা হিসেবে ঢালু ছাদগুলো থাকে আর চূড়াগুলো থাকে অলংকরণের জন্য। মন্দিরের শোভাবর্ধন করে বলে চূড়াগুলোকে রত্ন বলা হয়। শিখর বা রত্নের সংখ্যা অনুযায়ী মন্দিরে এক থেকে পঞ্চবিংশ রত্ন অবধি থাকতে পারে।
- বর্গাকার গর্ভগৃহের ঢালু ছাদের মাঝখানে শীর্ষবিন্দুতে অবস্থিত একটি ক্ষুদ্রাকৃতির শিখর স্থাপন করে নির্মাণ করা হয়েছে একরত্ন মন্দির।

চিত্র ৫ – একরত্ন মন্দির, বাঁশবেড়িয়া হুগলি।
- এরপর রত্নমন্দির শৈলীর বিবর্তন ঘটেছে শিখরের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। সেখানে কেন্দ্রের মূল রত্নটির আয়তন বৃদ্ধি করে, চারচালা ছাদের চারটি কোণ বরাবর বসানো হয়েছে চারটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকৃতির রত্ন। ফলে পাঁচটা চূড়া সমন্বিত এই মন্দির স্থাপত্যশৈলীর নাম দাঁড়িয়েছে পঞ্চরত্ন।এক থেকে পঞ্চরত্নের এই বিবর্তন থেকে বোঝা যায় রত্নের সংখ্যা চার করে বেড়েছে। মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনায় অবস্থিত রামেশ্বর মন্দিরের প্রতিষ্ঠালিপি থেকে জানা যায়, এই পঞ্চরত্ন শব্দটা মন্দির স্থপতিদের মধ্যে চালু ছিল (৫)। পঞ্চরত্ন বা সাধারণ ভাবে রত্নশৈলীর নির্মাণ কল্পনার আদিরূপ লুকিয়ে আছে কাঠের রথ নির্মাণ কৌশলের মধ্যে। মন্দির নির্মাণের কাজে যে সূত্রধর সম্প্রদায় নিযুক্ত হতেন তাদের মধ্যেই থাকতেন কাঠের কাজের শিল্পীরা।
চালা মন্দিরে উচ্চতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে চারচালা থেকে আটচালা এবং বারোচালা মন্দিরের নির্মাণের মাধ্যমে। তবে বাংলার মন্দির-স্থাপত্যে সর্বভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের মতো উচ্চতা লাভের প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল রত্ন মন্দির নির্মাণের মাধ্যমে। পঞ্চরত্ন থেকে নবরত্ন সেই প্রচেষ্টার প্রথম ধাপ।
- পঞ্চরত্ন মন্দিরের ছাদের ঠিক মাঝখানে একটা ক্ষুদ্রাকৃতির পঞ্চরত্ন কুঠুরি বানিয়ে, মন্দিরের উচ্চতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। পঞ্চরত্নের ছাদের চার কোণে চারটি রত্ন এবং কেন্দ্রীয় পঞ্চরত্নের পাঁচটি চূড়া; সব মিলিয়ে নটি চূড়া, তাই নাম নবরত্ন। ছাদের উপরে আর একটি কুঠুরি স্থাপনের ফলে মন্দির হয়ে দাঁড়ায় দ্বিতল।
- নবরত্নের পরিবর্ধিত রূপ হল ত্রয়োদশ রত্ন। তবে এখানে মন্দিরের তলের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি তাই উচ্চতাও একই রয়ে যায়। নবরত্নের কাঠামোর মধ্যে নিচের ছাদের কোণে আরও একটি করে রত্ন সংযোজন করা হয়। ফলে প্রথম তলের আটটা রত্ন এবং দ্বিতীয় তলের পাঁচটা রত্ন মিলে হয় ত্রয়োদশ রত্ন।
- এইভাবে তেরো থেকে সতেরো রত্ন করা হয়েছিল তবে তার সংখ্যা খুবই কম। এই মন্দিরেও ত্রয়োদশ রত্নের মতো তলের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি তবে তফাৎ হিসেবে দ্বিতীয় তলের আকৃতি করা হয়েছে আটকোণা আর তার প্রতিটিতে একটি করে রত্ন বসিয়ে মধ্যস্থলে মূল রত্নটিকে বসানো হয়েছে। ফলে সবমিলিয়ে রত্নের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সতেরোটি।
- রত্ন মন্দির শৈলীর বিবর্তনের অন্তিম রূপ তৈরি হয়েছিল পঁচিশ রত্ন মন্দির নির্মাণের মাধ্যমে। নবরত্নের পর আবার এই স্থাপত্য শৈলীতে মন্দিরের উচ্চতা বৃদ্ধি পেল কারণ এখানে দ্বিতীয় তলের উপর আরও একটি তল সংযুক্ত হল। প্রথম তলের ছাদে প্রতি কোণে রত্নের সংখ্যা বাড়িয়ে করা হল তিনটি এবং দ্বিতীয় তলের ছাদের প্রতি কোণে রত্ন রইল দুটি। সর্বশেষ তলটি একটি পঞ্চরত্ন কুঠুরি। ফলে তিনটি তল মিলিয়ে রত্নের সংখ্যা দাঁড়াল পঁচিশ (১২+৮+৫)। পঁচিশ রত্ন মন্দিরই হল রত্ন স্থাপত্য শৈলীর সুবিস্তৃত রূপ।

চিত্র ৬ – পঁচিশরত্ন মন্দির, সোনামুখী বাঁকুড়া৷
তবে পশ্চিমবঙ্গে এক, পাঁচ ও নয়টি রত্ন সমন্বিত মন্দির যত সংখ্যক নির্মিত হয়েছে, তেরো, সতেরো ও পঁচিশ রত্নের সংখ্যা সেই অনুযায়ী খুবই কম। একরত্ন, পঞ্চরত্ন এবং নবরত্ন মন্দিরের অসংখ্য উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেখা যায় সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে৷ একরত্নের উদাহরণ বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত মদনমোহন বা কালাচাঁদ মন্দির, হুগলির বাঁশবেড়িয়ার অনন্ত বাসুদেব মন্দির। পঞ্চরত্ন পাওয়া যায় বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত শ্যামরায়, গোকুলচাঁদ, বাঁকুড়ার বোদাই নদের তীরে অবস্থিত হদল-নারায়ণপুর গ্রামের মন্দিরে। নবরত্ন মন্দির অনেকেই দেখেছেন দক্ষিণেশ্বরের রাণী রাসমণি প্রতিষ্ঠিত ভবতারিণী কালী মন্দির বা বীরভূমের ইলামবাজারের লক্ষ্মী জর্নাদন মন্দিরে। ত্রয়োদশ রত্নশৈলীর মন্দির কিছু দেখা যায় মেদিনীপুর জেলায়, একটা উদাহরণ হল বিনপুরের কালাচাঁদ মন্দির। পঁচিশরত্ন মন্দিরের উদাহরণ দেখা যায় পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনায়, লালজী কৃষ্ণচন্দ্র আর গোপাল মন্দির। হুগলির সুখারিয়ার আনন্দভৈরবী মন্দিরও একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
চালা ও রত্নশৈলীর মন্দিরের নির্মাণ কৌশল উদ্ভাবন বাঙালি স্থপতির অমর কীর্তি সন্দেহ নেই, তবে এই দুই স্থাপত্যশৈলীর বাইরে আরও বিভিন্ন রকমের আকৃতির মন্দির নির্মিত হয়েছে অন্ত মধ্যযুগীয় বঙ্গভূমিতে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য এক ধারা হল দালান। সমতল ছাদ ও কার্নিশ এবং ত্রিখিলান অলিন্দ ও গুচ্ছবদ্ধ স্তম্ভযুক্ত এই স্থাপত্যরীতির মন্দিরের প্রচলন অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ থেকে শুরু হলেও উনিশ শতকে বাংলায় এই ধরনের মন্দিরের বহুল প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ দালান স্থাপত্য একতলা হলেও কখনো কখনো দোতলা দালান মন্দিরও দেখা যায়। এছাড়া দালানের সমতল ছাদের উপর চালা, রত্ন ও শিখর সমন্বিত মিশ্ররীতির মন্দিরের সংখ্যাও বিরল নয়।
ব্যতিক্রমী রীতির মন্দির
চালা, রত্ন, শিখর এবং দালান শৈলীর মন্দির ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের নানা অঞ্চলে কিছু অভিনব গঠনের মন্দির লক্ষ্য করা যায়। এদের মধ্যে অন্যতম হল গিরিগোবর্ধন মন্দির যেখানে বাংলার স্থপতিরা শ্রীকৃষ্ণের গিরিগোবর্ধনের কাহিনি অনুসরণে এই মন্দিরের ছাদ শিলাময় পাহাড়ের গড়নের মতো নির্মাণ করেছেন। তবে মন্দিরের বাকি গঠন শৈলী সাধারণত পঞ্চরত্ন শৈলীর অনুসরণে নির্মিত হত। এই শ্রেণির প্রাচীনতম নিদর্শনটি কালনা রাজবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অষ্টাদশ শতকে। এছাড়া বাঁকুড়ার সোনামুখীতে অবস্থিত উনিশ শতকে প্রতিষ্ঠিত বর্তমানে জীর্ণশীর্ণ দেবালয়টিও এক নিদর্শন।
ব্যতিক্রমী রীতির অন্যান্য মন্দিরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আটকোনা শিখর-মন্দির যার কিছু নিদর্শন মেদিনীপুর, বর্ধমান, বীরভূম জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে। বীরভূমের হেতমপুরের বিখ্যাত চন্দ্রনাথ মন্দির এবং ইলামবাজারের মহাপ্রভু মন্দির এর কয়েকটি উদাহরণ। সবশেষে বলা যায় গম্বুজাকৃতি ছাউনি যুক্ত বর্গাকৃতির মন্দিরের কথা যার প্রাচীনতম নিদর্শনটি রয়েছে উত্তর দিনাজপুর জেলার বিন্দোল গ্রামের ষোড়শ শতকের ভৈরবী মন্দিরে।
রাসমঞ্চ, দোলমঞ্চ ও তুলসীমঞ্চ

চিত্র ৭ – রাসমঞ্চ, হদল নারায়ণপুর বাঁকুড়া।

চিত্র ৮ – বাংলার মন্দিরের মঞ্চ স্থাপত্যের প্রকারভেদ, কৃতজ্ঞতা গবেষক অরুণাভ সান্যাল।
মন্দির ছাড়াও অন্ত মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে মন্দির সংলগ্ন রাসমঞ্চ, দোলমঞ্চ এবং তুলসী মঞ্চগুলো।

চিত্র ৯ – দোলমঞ্চ আঁটপুর।
এই মঞ্চগুলো নির্মিত হত রাস বা দোলের সময় মূল মন্দিরের বিগ্রহকে বাইরে এনে ভক্তসমাবেশের দর্শন করানোর জন্য, তাই এগুলো সবসময় উঁচুবেদির উপর নির্মিত হত। সেখান থেকেই এদের নামে মঞ্চ কথাটি এসেছে। রাসমঞ্চ সাধারণত আটকোনা, নয়টি চূড়া বিশিষ্ট তবে সতেরো চূড়া রাসমঞ্চেরও উদাহরণ বিরল নয়। অবশ্য বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত রাসমণ্ডপটি এক প্রথা বহির্ভূত স্থাপত্য যার তুল্য ইমারত পশ্চিমবঙ্গে আর কোথাও দেখা যায় না। দোলমঞ্চগুলো সাধারণত চতুষ্কোণ আকৃতির—চারচালা,পঞ্চরত্ন, নবরত্ন সদৃশ। রাসমঞ্চ ও দোলমঞ্চ ছাড়াও কিছু কিছু মন্দিরে উঁচুবেদির উপর নির্মিত চারদিক খোলা স্তম্ভযুক্ত তুলসী মঞ্চের নিদর্শন লক্ষ্য করা যায়। রাসমঞ্চ ও দোলমঞ্চের মতোই তুলসী মঞ্চগুলোর গায়েও টেরাকোটা অলংকরণের নিদর্শন পাওয়া যায়।
উপসংহার
এই প্রবন্ধে, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত, কালের প্রকোপ ও মানুষের অত্যাচার অবহেলা এড়িয়ে এখনও টিকে থাকা, অন্ত মধ্যযুগীয় মন্দিরগুলোর অনন্য স্থাপত্য কৌশলের বিভিন্ন দিকগুলো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছি। গত শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে এই মন্দিরগুলো সম্পর্কে বিদ্বজনদের আকর্ষণ বাড়তে থাকে, ফলশ্রুতিতে মন্দিরের স্থাপত্যরীতি ও টেরাকোটার অলংকরণ সম্পর্কে ক্ষেত্রসমীক্ষা ভিত্তিক বিস্তারিত আলোচনার সূত্রপাত হয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত বাংলার মন্দির নিয়ে এই গবেষকদের পরিশ্রম ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যেগুলো আমার এই লেখার ভিত্তিস্বরূপ। সঙ্গের গ্রন্থসূচীতে সেই বই এবং গবেষণা-সম্পর্কিত সূত্রগুলোর একটা তালিকা যুক্ত হল। এই লেখায় বাংলার মন্দিরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য—তাদের অলংকরণ, টেরাকোটা ও পঙ্খের কাজের কথা আলোচনা করতে পারিনি, তা স্বতন্ত্র প্রবন্ধের দাবি রাখে। ভবিষ্যতে এ নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।
প্রবন্ধের সঙ্গে আমার তোলা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শ্রেণির মন্দিরের কয়েকটি ছবি দেওয়া হল। এছাড়া স্থাপত্য বিদ্যার গবেষক অরুণাভ সান্যাল কৃত দুইটি অসাধারণ রেখাচিত্র সন্নিবিষ্ট হল যেখানে মন্দিরের শ্রেনীবিভাগটি স্পষ্ট করে বোঝা যাবে। এইটি প্রকাশের অনুমতি দিয়ে অরুণাভ বাবু আমার অসংখ্য কৃতজ্ঞতা ভাজন হয়েছেন।
শীর্ষক চিত্র পরিচিতি: রাসমঞ্চ বিষ্ণুপুর
সহায়ক গ্রন্থসূচী
১। হিতেশরঞ্জন সান্যাল, বাংলার মন্দির, কারিগর প্রকাশনা।
২। তারাপদ সাঁতরা, পশ্চিমবাংলার ধর্মীয় স্থাপত্য মন্দির ও মসজিদ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি৷
৩। ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী, সুলতানি আমলেই বাংলায় মন্দির তৈরিতে নবজাগরণ, (রবিবাসরীয়, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০)৷
৪। M Ray, The Road not Taken: An Alternative Understanding of Archival Data on Late Medieval Terracotta Temples of Bengal. Presented in the online international symposium entitled Terracotta Temple Artwork of Undivided Bengal organized by the Indira Gandhi National Centre for the Arts (Kala Nidhi Division), August 2022. Delhi.
৫। (Ed) George Michell, Brick Temple of Bengal-From the archives of David McCutchion, (Princeton University press, NJ, 1983).
৬। শম্ভু ভট্টাচার্য, পশ্চিমবঙ্গের মন্দির, মনন প্রকাশন (২০০০)৷
৭। প্রণব রায়, বাংলার মন্দির-স্থাপত্য ও ভাস্কর্য, পূর্বাদ্রী প্রকাশন (১৯৯৯)।
৮। রাঢ়কথা মন্দিরচর্চা সংখ্যা, (১৪৩০)৷
৯। Ajay Khare, Temple Architecture of Eastern India, Shubhi Publication, India.
অসাধারণ গবেষণাধর্মী লেখা। মন্দির-গবেষণার ক্ষেত্রে শৈলী বিষয়টি খুবই কম আলোচিত হয়। এই লেখায় সেই আক্ষেপটি অনেকাংশে মিটল। অনুরোধ করব, মন্দিরের শৈলীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও বিভিন্ন বিষয়গুলি এভাবেই আলোচনা করতে।
অনেক ধন্যবাদ। নিশ্চয়ই চেষ্টা করব।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী মন্দির স্থাপত্য শিল্পের বিষয়ে স্বল্প পরিসরে আপনার করা এই বিস্তৃত আলোচনার প্রবন্ধটি পড়ে সমৃদ্ধ হলাম। কিছু তথ্যের ক্ষেত্রে উপকৃত হলাম। সবচেয়ে ভালো লাগল আপনার সেই মন্তব্যটি। সত্যি বাংলার মানুষ তাঁদের দেবতাকে বাকি ভারতবর্ষের মতো রাজপ্রাসাদসম বিশাল বিশাল মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইনি। দেবতা এখানে রাজরাজেশ্বর না হয়ে খুব কাছের কেউ হয়েছেন। তাই বাংলার মন্দিরগুলো সাধারণ বাঙালি গৃহের শৈলীতে গড়ে উঠেছে। আমাদের মন্দির শিল্পে এও এক অসাধারণ বিশেষত্ব।
বাংলার নিজস্ব মন্দির স্থাপত্য অক্ষয় হোক।
যথাযথ সংরক্ষিত হোক।
অনেক ধন্যবাদ