সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

চৈতন্যদেব ও বাংলার নারীমুক্তি

চৈতন্যদেব ও বাংলার নারীমুক্তি

অজয় কুমার দে

মে ৯, ২০২৬ ৫৬ 1

ভূমিকা

বাঙালি সংস্কৃতির মূল প্রোথিত রয়েছে তার লোকায়ত ঐতিহ্যে। মধ্যযুগীয় বাংলার সমাজ যখন শাস্ত্রীয় অনুশাসন ও পিতৃতান্ত্রিক কঠোরতায় আচ্ছন্ন ছিল, তখন কীর্তন এবং লোকসংস্কৃতি এক উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছিল যা নারীর আত্মপ্রকাশের পথ প্রশস্ত করে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় বিবর্তন ছিল না, বরং ছিল নারীর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক সমানাধিকারের প্রথম বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সমাজ: শাস্ত্রীয় নিগড় ও নারীর অবদমন

বাংলা তথা ভারতের সামাজিক ইতিহাসে নারীর অবস্থান সর্বদা একরৈখিক ছিল না। আজ থেকে ৩.৫-৩.০ হাজার বছর আগে ঋগ্বেদীয় যুগে অপালা, ঘোষা বা বিশ্ববারার ন্যায় বিদুষী নারী বেদের মন্ত্র রচনা করেছিলেন৷ তবে পরবর্তী সময়ে, এবং বিশেষ করে সংহিতা ও স্মৃতিশাস্ত্রের যুগে (আজ থেকে ২.৬ হাজার বছর আগে থেকে পরবর্তী সময়) নারীর অধিকার ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে।

আরও পরবর্তী সময়ে, হাজার বছর আগে, প্রাচীন বঙ্গদেশে পাল ও সেন রাজবংশের শাসনকালে এই শাস্ত্রীয় অনুশাসনগুলি এক কঠোর সামাজিক বিধানে পরিণত হয়।

স্মৃতিশাস্ত্রকারগণ নারীর জীবনকে পুরুষের অধীনে রাখবার জন্য কঠোর বিধান দিয়েছিলেন। মনুস্মৃতির একটি আলোচিত ও বিতর্কিত শ্লোক এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। এই গ্রন্থ রচিত হয়েছে আজ হেকে ২.২ থেকে ১.৮ হাজার বছর আগে।

‘বাল্যে পিতুর্বশে তিষ্ঠেৎ পাণিগ্রাহস্য যৌবনে।

পুত্রাণাং ভর্তরি প্রেতে ন ভজেৎ স্ত্রী স্বতন্ত্রতাম্॥’[১]

বাল্যকালে পিতার বশে, যৌবনে পতির বশে এবং পতির মৃত্যুর পর পুত্রের বশে থাকবে; নারী কখনো  স্বাধীনভাবে থাকবেন না। এই বিধান কেবল আধ্যাত্মিক ছিল না, এ ছিল নারীর সম্পত্তির অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার মূলে কুঠারাঘাত।

১৬শ শতকে মধ্যযুগের বঙ্গসমাজে নবদ্বীপের বাসিন্দা বাঙালি স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য রচিত ‘অষ্টবিংশতিতত্ত্ব’ এই নিয়মাবলীকে আরও কঠোর করে তোলে। রঘুনন্দনের মতে, স্বামীর মৃত্যুর পর সতীদাহ প্রথা ছিল নারীর কর্তব্য। খেয়াল রাখতে হবে তিনি ছিলেন চৈতন্যদেবের সমসাময়িক।

মনুস্মৃতির যুগ থেকেই সমাজপতিগণ কেবল সামাজিক নয়, নারীর পারমার্থিক অধিকারকেও শৃঙ্খলিত করেছিলেন। যজ্ঞ বা পূজা-পার্বণে নারীর একক অধিকার ছিল না। শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী:

নাস্তি স্ত্রীণাং পৃথগ্যজ্ঞো ন ব্রতং নাপ্যুপোষিতম্।

পতিং শুশ্রূষতে যেন তেন স্বর্গে মহীয়ত॥’ [২]

এই শ্লোকটি মনুস্মৃতির পঞ্চম অধ্যায়, ১৫৫ নম্বর শ্লোক, যেখানে পতিব্রতার গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। পতি ব্যতীত নারীর পৃথক কোনো যজ্ঞ, ব্রত বা উপবাসের প্রয়োজন নেই; কেবল পতিসেবার মাধ্যমেই তিনি স্বর্গলাভ করতে পারেন। এ ছিল নারীর স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক সত্তার চূড়ান্ত অস্বীকৃতি; পতির সেবাকেই নারীর একমাত্র মোক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ঐতিহ্যগতভাবে শাস্ত্রে বেদাধ্যয়ন ও উপনয়ন নিষিদ্ধ করে নারীর জ্ঞানার্জনের পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল। শিক্ষা ও জ্ঞানের পথ বন্ধ করে নারীকে অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত রাখার মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস ও চিন্তাশক্তিকে দমিয়ে রাখা হত। শাস্ত্রীয় বচন ছিল:

স্ত্রী’ শূদ্র দীয়তাম্’। [৩]

আক্ষরিক অর্থে ছিল ‘স্ত্রী এবং শূদ্রকে (স্বামী/উচ্চবর্ণের কাছে) দিয়ে দেওয়া হোক’; এ ধরনের অবজ্ঞাসূচক অর্থ তাদের স্বাধীন সত্তার অভাব নির্দেশ করে। এই ব্যবস্থার ফলে নারী কেবল গৃহকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকলেন।

বাংলায় আদি মধ্য যুগে বল্লাল সেনের ‘কৌলীন্য প্রথা’-র প্রভাবে কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে বহুবিবাহের প্রচলন হয়, তখন নারী কেবল বংশ রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হতেন। চরম নারীবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি মধ্যযুগীয় বঙ্গসমাজে কৌলীন্য প্রথা ও সতীদাহের ন্যায় অমানবিক প্রথাকে বৈধ করেছিল। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, সেন আমলের ব্রাহ্মণ্য পুনরুত্থান বাংলার লোকায়ত সহজ জীবনকে ধ্বংস করেছিল [৪]। পাল যুগে (আনুমানিক ৭৫০-১১৬১ সাধারণাব্দ) যে নারীরা শ্রম ও শিল্পে অংশ নিতেন, সেন যুগে (আনুমানিক ১০৭০-১২৩০ সাধারণাব্দ) তাদের পুরো ‘অবরোধবাসিনী’ করে তোলা হয়।

পাল যুগে বৌদ্ধ সহজযানের প্রাবল্যে নারীর একপ্রকার গূঢ় আধ্যাত্মিক অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। চর্যাপদের ‘ডোম্বী’ চরিত্রটি একদিকে সামাজিক বাস্তবতার (ডোম কন্যা) এবং অন্যদিকে তান্ত্রিক সাধনার প্রতীকী রূপ। ডোম্বী কেবল নারী নন, তিনি হলেন জ্ঞান বা ‘সহজ সুন্দরী’। কাহ্নপা তার ১০নং পদে ডোম্বীকে নাদ-বিন্দু হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যাকে বশ করে যোগী পরমজ্ঞান লাভ করেন।

‘ডোম্বী বিএ জলোঁ সাসু ঘরু।’ [৫]

এটি কাহ্নপাদের রচিত ১৯ নম্বর চর্যার অংশ। এখানে ‘ডোম্বী’ হল পরম জ্ঞান এবং ‘শাশুড়ি’ হল অবিদ্যারূপ মায়া। ‘ডোম্বী’ সেই সত্তা, যিনি সামাজিক গৃহের বন্ধন ছিন্ন করেছেন। এ ছিল উচ্চতর আধ্যাত্মিক সাধনার রূপক, লৌকিক সমাজে নারীর মর্যাদা ছিল নগণ্য। সেন আমলে ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থানে এই সহজিয়া নারী-মুক্তির পথও রুদ্ধ হয়ে যায়।

শুধু মধ্য যুগে নয়, এমনকী প্রাচীন যুগেও সমাজপতিগণ নারীর স্বভাবকে অবমাননা করবার জন্য বিবিধ শ্লোক উদ্ধৃত করতেন। চাণক্যনীতিতে বলা হয়েছে:

‘অনৃতং সাহসং মায়া মূর্খত্বমতিলোভতা।

অশৌচত্বং নির্দয়ত্বং স্ত্রীণাং দোষাঃ স্বভাবজাঃ॥’ [৬]

এটি চাণক্যর রচিত চাণক্য নীতি (সাধারণপূর্ব ৪র্থ-৩য় সাধারণাব্দে লিখিত) একটি শ্লোকের অংশ। মিথ্যাচার, হঠকারিতা, মায়া, মূর্খতা, লোভ, অপবিত্রতা ও নির্দয়তা—এইগুলি নারীর স্বভাবজাত দোষ। যুগ যুগ ধরে এরকম প্রচারের ফলে নারীর আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক প্রতিপত্তি একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। সতীদাহ প্রথার ন্যায় অমানবিক প্রথাকেও শাস্ত্রীয় অলঙ্কারে ভূষিত করা হয়।

তবে এই অন্ধকারের মাঝে চৈতন্যদেবের সাম্যবাদী দর্শন [৭] নারীর আধ্যাত্মিক সমানাধিকারের ক্ষীণ আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত রেখেছিল।

চৈতন্যদেবর আবির্ভাবকাল

চৈতন্যদেবর আবির্ভাবকাল (১৪৮৬ সাধারণাব্দ) বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক জটিল সময়। একদিকে সুলতানি শাসনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, অন্যদিকে রঘুনন্দনের স্মার্ত শাসনের কঠোর বিধান—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নারীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত শোচনীয়।

বল্লাল সেন প্রবর্তিত কৌলীন্য প্রথা পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে, চৈতন্যদেবর জন্মলগ্নে এসে এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছিল। কৌলিন্যের মর্যাদা রক্ষার্থে একজন বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ অনেক সময় শতাধিক কিশোরীকে বিবাহ করতেন। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব’ এবং দীনেশচন্দ্র সেনের ‘বৃহৎ বঙ্গ’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, এক একজন কুলীন ব্রাহ্মণ শতাধিক বিবাহ করতেন। এই নারীরা পিত্রালয়েই থাকতেন এবং স্বামী কেবল মাঝে মাঝে ‘দক্ষিণা’ আদায়ের জন্য আসতেন। একজন ৭০-৮০ বছরের বৃদ্ধ কুলীন ব্রাহ্মণের সাথে ৫-৬ বছরের কিশোরীর বিবাহ দেওয়া ছিল সাধারণ ঘটনা। এই অসম বিবাহের ফলে সমাজে বিধবাদের সংখ্যা ছিল বিপুল। বিধবা নারীদের জীবন ছিল কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ও লাঞ্ছনার ইতিহাস।

তৎকালীন সমাজে পতিহীন নারীর জীবন ছিল বেঁচে থেকেও মৃত্যুর সমান। স্মৃতিশাস্ত্রের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে সতীদাহ প্রথাকে উৎসাহিত করা হত। যাঁরা সহমরণে যেতেন না, তাঁদের জন্য রঘুনন্দন অত্যন্ত কঠোর নিরামিষ আহার, একাদশী ব্রত এবং মলিন বস্ত্র পরিধানের বিধান দিয়েছিলেন। জয়নন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ কাব্যে তৎকালীন সমাজের কঠোর বিধবা-আচারের বর্ণনা পাওয়া যায়।

চৈতন্যদেবর জন্মলগ্নে উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজে নারীদের ঘরের বাইরে আসা বা পরপুরুষের সম্মুখীন হওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ থেকে জানা যায়, অদ্বৈত আচার্যের পত্নী সীতা দেবী যখন নবজাতক নিমাইকে দেখতে গিয়েছিলেন, তখন তিনি অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। তৎকালীন সমাজপতি রঘুনন্দন ভট্টাচার্য তাঁর ‘অষ্টবিংশতিতত্ত্ব’ গ্রন্থে নারীর চলাফেরা ও আচরণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিলেন।

চিত্র ১ – নন্দলাল বসুর আঁকা চৈতন্যদেব, জাতীয় শিল্পকলা গ্যালারি, নয়াদিল্লি।

নারীর জন্য জ্ঞানার্জন বা শাস্ত্রপাঠ তখন মহাপাপ হিসেবে গণ্য হত। ‘চৈতন্যভাগবত’‘চৈতন্যচরিতামৃত’ পাঠ করলে দেখা যায়, তৎকালীন নবদ্বীপে শত শত টোল বা চতুষ্পাঠী থাকলেও সেখানে কোনো নারী শিক্ষার্থীর উল্লেখ নেই। চৈতন্যদেবর পত্নী বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী বিদুষী ছিলেন বলে জানা যায়, কিন্তু তা ছিল সম্পূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশে অর্জিত। সাধারণ নারর ও শূদ্রের জন্য শিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল।

ধর্মীয় বঞ্চনা ও লৌকিক ব্রতের উদ্ভব

শাস্ত্রীয় যজ্ঞ বা পূজায় নারীর স্বতন্ত্র অধিকার ছিল না। এই বঞ্চনা থেকেই জন্ম নিয়েছিল বিভিন্ন লৌকিক দেবী ও ব্রতকথা। ড. সুকুমার সেনের মতে, এই সময়েই ‘মঙ্গলকাব্য’-এর প্রসার ঘটে। নারীরা নিজেদের দুঃখ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে মনসা, চণ্ডী বা শীতলার ব্রত পালন শুরু করেন। স্বামীর মঙ্গলকামনা বা পুত্রসন্তান লাভের জন্য ‘ষষ্ঠী ব্রত’ বা ‘ইতু পূজা’-র মতো লৌকিক আচার ছিল নারীর প্রধান ধর্মীয় অবলম্বন।

চৈতন্যদেবর ভক্তি আন্দোলন: নারীর সামাজিক ও আধ্যাত্মিক মুক্তি

তৎকালীন স্মার্ত সমাজ মনে করত নারী ও শূদ্রের আধ্যাত্মিক অধিকার পুরুষের চেয়ে কম; চৈতন্যদেব এই ধারণাটি সমূলে উৎপাটন করেন। তাঁর মতে, ভক্তিপথে কোনো লৈঙ্গিক পরিচয় নেই; আত্মা চিরকালই পরমাত্মার অংশ। তিনি ঘোষণা করেন:

চণ্ডালোঽপি দ্বিজশ্রেষ্ঠঃ হরিভক্তিপরায়ণঃ।’ [৮]

হরিভক্তি থাকলে চণ্ডালও শ্রেষ্ঠ হতে পারে। এই একই ন্যায় তিনি নারীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেন, যার ফলে নারী প্রথমবারের মতো পুরুষের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি মোক্ষ বা আধ্যাত্মিক প্রগতির অধিকার লাভ করেন। চৈতন্যদেবর ভক্তি আন্দোলন নারীদের হাতে জপমালা ধরিয়ে কেবল পরকালের মুক্তির পথ দেখায়নি, বরং ইহকালে তাঁদের মানুষ হিসেবে মর্যাদা, শিক্ষার সুযোগ এবং নেতৃত্বের মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিল। তাই সমাজতাত্ত্বিক বিচারে শ্রীচৈতন্যদেব ছিলেন বাংলার নারী জাগরণের আদি পুরুষ।

চৈতন্যদেবর নিজের পরিবারেই নারীর এক নতুন রূপ দেখা যায় যা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়:

১) শচীমাতা: তিনি কেবল মা ছিলেন না, নিমাইয়ের সন্ন্যাস গ্রহণের পর নবদ্বীপের ভক্তসমাজের ‘মাতৃস্থানীয়’ অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন।

) বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী: নিমাইয়ের সন্ন্যাসের পর তিনি তপস্যা ও হরিনাম জপের মাধ্যমে দিনাতিপাত করতেন। পরবর্তীকালে বৈষ্ণব সমাজে বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর পূজা প্রচলিত হওয়া ছিল নারীর সামাজিক মর্যাদার এক উত্তরণ।

চিত্র ২ – চৈতন্য ও বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর বিগ্রহ, বিষ্ণুপ্রিয়া জন্মস্থান মন্দির,নবদ্বীপ

চৈতন্যদেবর প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম বাংলার সমাজ ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। বিশেষ করে নারীর ‘সেবাইত’ এবং ‘দীক্ষাগুরু’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ ছিল তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক স্মার্ত সমাজের মূলে এক আঘাত। চৈতন্যদেব প্রচার করেছিলেন, আত্মা জড় প্রকৃতির; নারী বা পুরুষের ঊর্ধ্বে। তাঁর দর্শনে ভক্তিই ছিল একমাত্র মাপকাঠি।

‘নাহং বিপ্রো ন চ নরপতির্নাপি বৈশ্যো ন শূদ্রো…’ ; বর্ণ ও লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে ভক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে শাস্ত্রীয় নিগড় ভেঙে নারী প্রথমবার সরাসরি কৃষ্ণের ‘সেবা’ করার অধিকার পায়, যা আগে কেবল ব্রাহ্মণ পুরুষদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। চৈতন্যদেবর সন্ন্যাস গ্রহণের পর নবদ্বীপে নারী জাগরণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন তাঁর পত্নী বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী।

চৈতন্যদেবর জীবদ্দশাতেই বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী তাঁর একটি দারুময় বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে সেবা শুরু করেন। এটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন নারী (এবং বিধবা বেশে থাকা বিরহিণী) বিগ্রহের প্রধান ‘সেবাইত’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর এই আদর্শ পরবর্তীকালে অসংখ্য বৈষ্ণব নারীকে মন্দিরের সেবার কাজে উৎসাহিত করে।

৩) জাহ্নবা দেবী-গৌড়ীয় বৈষ্ণব ইতিহাসে নারীর ‘দীক্ষাগুরু’ হিসেবে সর্বোচ্চ আসনে আরোহণের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলেন নিত্যানন্দ পত্নী জাহ্নবা দেবী। চৈতন্যদেব ও নিত্যানন্দ প্রভুর তিরোধানের পর যখন বৈষ্ণব সমাজ কিছুটা দিশেহারা, তখন জাহ্নবা দেবী শক্ত হাতে আন্দোলনের হাল ধরেন। তিনি কেবল নারী নয়, বহু প্রথিতযশা পুরুষ ভক্তকেও দীক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁর প্রধান শিষ্য ছিলেন নরোত্তম দাস ঠাকুরের মতো দিকপাল সাধক। খেতুরীর (১৫৮২ সাধারণাব্দ) বিশাল ধর্মসম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। যেখানে তৎকালীন রঘুনন্দনের বিধান অনুযায়ী নারীর ঘরের বাইরে আসাই দায় ছিল, সেখানে জাহ্নবা দেবী হাজার হাজার পণ্ডিত ও ভক্তের সামনে আচার্যের আসনে বসেন। এটি ছিল ‘দীক্ষাগুরু’ হিসেবে নারীর স্বীকৃতি।

৪) জাহ্নবা দেবীর পথ ধরে আরও অনেক নারী বৈষ্ণব সমাজে গুরু এবং সেবাইতের মর্যাদা পান৷ গঙ্গামাতা গোস্বামী ছিলেন রাজা নরেশের কন্যা, রাজকীয় সুখ ত্যাগ করে তিনি বৃন্দাবনে গিয়ে সাধনা করেন। পরবর্তীকালে তিনি পুরীতে গিয়ে শিষ্যদের দীক্ষা দেন। তাঁকে ‘গোস্বামী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়, যা সাধারণত পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। শ্রীনিবাস আচার্যের কন্যা হেমলতা দেবী ছিলেন বিদুষী এবং তেজস্বিনী গুরু। তিনি বহু ব্যক্তিকে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে এনেছিলেন।

নারী অধিকারের বিবর্তনের রূপরেখা

পর্যায়সময়কালনারীর অবস্থান ও ভূমিকা
আদি পর্যায়চৈতন্যদেবর সময় (১৪৮৬-১৫৩৩)নামসংকীর্তনে পরোক্ষ অংশগ্রহণ, গৃহে ভজন ও নাম জপ।
মধ্য পর্যায়১৬শ শতাব্দীর শেষার্ধজাহ্নবা দেবীর নেতৃত্বে প্রাতিষ্ঠানিক প্রধান ও দীক্ষাগুরু হিসেবে স্বীকৃতি।
বিবর্তিত রূপ১৭শ-১৮শ শতাব্দী‘মহান্ত’ বা ‘গোস্বামী’ হিসেবে নারী ভক্তদের মন্দির পরিচালনা ও শাস্ত্র ব্যাখ্যা।

এই বিবর্তন কেবল ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; দীক্ষাগুরু হওয়ার প্রয়োজনে নারী বৈষ্ণবদের মধ্যে সংস্কৃত ও বাংলা শাস্ত্র পড়ার চল শুরু হয়, যা নারী শিক্ষার এক অপ্রাতিষ্ঠানিক বিপ্লব। মন্দিরের ‘সেবাইত’ হওয়ার ফলে সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নারীর হাতে আসে। বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হয়ে অনেক বিধবা নারী মস্তক মুণ্ডন ও তিলক ধারণ করে স্বাধীনভাবে ভজন ও ভ্রমণের অধিকার পান, যা তৎকালীন সমাজে ছিল অকল্পনীয়।

চৈতন্যদেবর প্রবর্তিত এই ধারাটি ছিল একাধারে ধর্মীয় ও সামাজিক। তিনি এবং তাঁর উত্তরসূরিরা প্রমাণ করেছিলেন, আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও গুরুপদ কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। জাহ্নবা দেবী বা গঙ্গামাতা গোস্বামীরা কেবল ধর্ম প্রচার করেননি, তাঁরা মধ্যযুগীয় বাংলার অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে নারীর ক্ষমতায়নের পথপ্রদর্শক হয়েছিলেন।

বৈষ্ণব সাহিত্যে নারীর অবদান

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যেখানে নারীদের নাম প্রায় অনুপস্থিত, সেখানে বৈষ্ণব পদাবলীতে আমরা একঝাঁক প্রতিভাময়ী নারী কবির দেখা পাই। তাঁরা রাধাকৃষ্ণের প্রেমের আড়ালে নিজেদের বিরহ, তর্পণ এবং আধ্যাত্মিক আর্তি ব্যক্ত করেছেন।

মাধবী দাসী ছিলেন ওড়িশার রাজা প্রতাপরুদ্র দেবের আমত্য শিখি মাহিতির ভগিনী। চৈতন্যদেব তাঁকে ‘অর্ধপাত্র’ হিসেবে গণ্য করতেন। তাঁর রচিত পদগুলো উচ্চাঙ্গের এবং শাস্ত্রীয় গভীরতাসম্পন্ন। রসময়ী দাসী বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধার বিরহ বর্ণনায় মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। চন্দ্রাবলী ও অন্যান্য অন্তত ২০-২৫ জন নারী পদকর্তার নাম পাওয়া যায় (যেমন—রতনমণি, সোনামণি), যাঁরা ভণিতার মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় রেখে গেছেন।

তখন কীর্তন কেবল গান ছিল না, এটি ছিল একটি সামাজিক আন্দোলন। নারীরা কীর্তনের মাধ্যমে জনপরিসরে নিজেদের ভাব প্রকাশের সুযোগ পান। নবদ্বীপে চৈতন্যদেবর সন্ন্যাস গ্রহণের পর বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর নেতৃত্বে একদল নারী ভক্ত নিয়মিত কীর্তন ও নাম জপ করতেন। এটি ছিল অন্দরমহলের নারীদের প্রথম ‘সংগঠিত’ আধ্যাত্মিক প্রকাশ। চৈতন্যদেবর পরবর্তী সময়ে নারীরা কীর্তনের বিশেষ ঘরানা (যেমন, ময়মনসিংহ বা ঢপ কীর্তন) আয়ত্ত করেন। তাঁরা কেবল রাধাকৃষ্ণ লীলাই গাইতেন না, বরং কীর্তনের মাধ্যমে ‘গৌরচন্দ্রিকা’ বা চৈতন্যদেবর মাহাত্ম্য প্রচার করতেন।

বৈষ্ণব সাহিত্যে রাধা কেবল একটি চরিত্র নন, তিনি হলেন ‘হ্লাদিনী শক্তি’। নারী পদকর্তাগণ রাধার চরিত্রকে এমনভাবে চিত্রিত করেছেন যা তৎকালীন সাধারণ বাঙালি নারীর জীবনের সাথে মিলে যায়। শাশুড়ি-ননদীর গঞ্জনা, ভয় এবং কৃষ্ণের জন্য ব্যাকুলতা—এই বিষয়গুলো নারী কবিদের লেখনীতে অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তাঁরা রাধাকে কেবল একজন দেবী হিসেবে নয়, বরং একজন বিদ্রোহী প্রেমিকা হিসেবে তুলে ধরেছেন, যিনি সমাজের সব নিয়ম ভেঙে অজানার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে পারেন।

বৈষ্ণব শাস্ত্র চর্চায় এবং পদাবলী সংকলনেও নারীদের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ অবদান ছিল। জাহ্নবা দেবী পদাবলী কীর্তনের বিকাশে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। তাঁর নির্দেশে অনেক পদ সংকলিত হয়েছিল। খেতুরীর উৎসবে যখন বিভিন্ন কীর্তনের সুর (যেমন, গরাণহাটি, রেনেটি) সমন্বিত হয়, তখন জাহ্নবা দেবীর অনুমোদন ও রুচি তাতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। অনেক নারী বৈষ্ণব সহজিয়া বা মরমী দর্শনের গূঢ় তত্ত্বগুলো শিষ্যদের কাছে ব্যাখ্যা করতেন, যা পরবর্তীকালে পদাবলী সাহিত্যের ভাবধারাকে সমৃদ্ধ করেছে।

প্রভাব ও সামাজিক তাৎপর্য

অবদানের ক্ষেত্রনারীর ভূমিকা ও প্রভাব
ভাষা ও সাহিত্যসংস্কৃতের বদলে সহজ বাংলা ভাষায় গভীর দর্শন প্রকাশ।
আবেগীয় প্রকাশবিরহ ও বাৎসল্য রসের মাধ্যমে নারীর অন্তর্নিহিত বেদনার শৈল্পিক রূপদান।
সাংস্কৃতিক মুক্তিঅবরোধ প্রথা ভেঙে গান ও কবিতার মাধ্যমে আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা।
লোকজ সংযোগবাউল ও লোকজ গানের সাথে বৈষ্ণব পদাবলীর মেলবন্ধন ঘটানো।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্যে নারীর অবদান কেবল কিছু পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ছিল নারীর ‘বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি’। যেখানে শাস্ত্র নারীকে নীরব থাকতে বলেছিল, সেখানে পদাবলী কীর্তন তাকে কণ্ঠ দিয়েছিল। মাধবী দাসী বা রসময়ী দাসীদের কলমে যে প্রেম ও ভক্তি ফুটে উঠেছে, তা বাংলার সাহিত্যকে কেবল সমৃদ্ধই করেনি, বরং নারীকে সমাজের এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।

নিত্যানন্দ পত্নী জাহ্নবা দেবী শ্রীচৈতন্যের পরবর্তী সময়ে বৈষ্ণব সমাজের হাল ধরেন। ১৫৮২ সাধারণাব্দের খেতুরীর মহোৎসবে তাঁর সভাপতিত্ব ছিল বিশ্ব ইতিহাসে নারীর নেতৃত্বের এক অনন্য দলিল। জাহ্নবা দেবী ছিলেন একজন সার্থক দীক্ষাগুরু এবং তাত্ত্বিক নেতা। পুরুষশাসিত ধর্মীয় কাঠামোতে তাঁর এই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নারীজাগরণের এক আদি উদাহরণ। ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ মীরাবাঈ (৯) রাজকীয় বৈভব ও পিতৃতান্ত্রিক ‘কুল-মর্যাদা’র শৃঙ্খল ত্যাগ করে পথে নেমেছিলেন। তাঁর পদে সামাজিক বিদ্রোহের সুর ধ্বনিত হয়৷

অষ্টম শতাব্দীর প্রখ্যাত সুফি সাধিকা রাবেয়া বসরী ভয়ের ধর্মতত্ত্বকে অস্বীকার করে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার (ইশক-এ-হাকিকি) কথা বলেন। তিনি প্রচার করেন যে, স্রষ্টার সাথে মিলনে লিঙ্গ কোনো অন্তরায় নয়; বরং পবিত্র হৃদয়ই মিলনের একমাত্র পথ। [১০] এই সুফি মরমী ভাবধারা বাংলার সহজিয়া ও বাউল দর্শনে নারীর গুরুত্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছিল।

বাউল গান ও মৈমনসিংহগীতিকার মতো লোকায়ত ধারাগুলোতে নারীকে কেবল মানুষ হিসেবে নয়, বরং ‘শক্তি’ ও ‘প্রকৃতি’ রূপে আরাধনা করা হয়। লালন শাহের দর্শনে [১১] লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে গিয়ে ‘মানুষ ভজনা’র ডাক দেওয়া হয়েছে:

‘লিঙ্গ দেখে হয় না বিচার, ভক্তি দেখে হয় রে সারা।’ [১২]

একইভাবে মৈমনসিংহগীতিকার মলুয়া বা মহুয়ার মতো চরিত্রগুলো তৎকালীন সমাজের অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে নারীর মরণজয়ী সংগ্রামের সাক্ষ্য দেয়।

শীর্ষক চিত্র পরিচিতি: নবদ্বীপ শ্রীবাস অঙ্গনে স্ত্রী বসুধা দেবী ও জাহ্নবা দেবীর সঙ্গে নিত্যানন্দর বিগ্রহ

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা

  • ১. মনুস্মৃতি: অধ্যায় ৫, শ্লোক ১৪৮ (নারীর পরাধীনতা ও অভিভাবকত্ব প্রসঙ্গে)।
  • ২. মনুস্মৃতি: অধ্যায় ৫, শ্লোক ১৫৫ (পতিসেবার মাহাত্ম্য ও স্বতন্ত্র যজ্ঞের নিষেধ)।
  • ৩. স্মৃতিসংহিতা: লৌকিক আচার ও বেদাধ্যয়নে নারী-শূদ্রের অধিকার নিষেধ সংক্রান্ত সাধারণ বচন।
  • ৪. নীহাররঞ্জন রায়: বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), দে’জ পাবলিশিং (পাল ও সেন যুগের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ)।
  • ৫. চর্যাপদ: পদ নং ১০, ড. মহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত Buddhist Mystic Songs
  • ৬. চাণক্যনীতি: অধ্যায় ১৬, শ্লোক ১ (নারীর স্বভাবজাত দোষ বর্ণনা)।
  • ৭ শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত: মধ্যলীলা (চৈতন্যদেবর সাম্যবাদী ও ভক্তি দর্শনের আকর)।
  • ৮. শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ও অদ্বৈত প্রকাশ: জাহ্নবা দেবীর নেতৃত্ব ও খেতুরীর উৎসবের ঐতিহাসিক বিবরণ। (দীনেশচন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ)।
  • ৯ মীরাবাঈ কি পদাবলী: উত্তর ভারতের ভক্তি আন্দোলনের প্রধান আকর গ্রন্থ। (উদ্ধৃতি: লোকসংস্কৃতি ও নারীর স্বাধিকার প্রসঙ্গে)।
  • ১০. Sufi Women (Dr. Javad Nurbakhsh): সুফি সাধিকা রাবেয়া বসরীর জীবনী ও তাঁর ‘নিঃস্বার্থ প্রেম’ দর্শনের বিশ্লেষণ।
  • ১১ লালন সমগ্ৰ (ড. সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত): লালন শাহের গানে লৈঙ্গিক বৈষম্য নিরসন ও মানবতাবাদের জয়গান।
  • ১২ মৈমনসিংহগীতিকা (দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত): বাংলার লোকসংস্কৃতিতে নারীর তেজস্বিতা ও সমাজ-বিদ্রোহের সাহিত্যিক দলিল।

গ্রন্থতালিকা

১. ইতিহাস ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা গ্রন্থ:

  • রায়, নীহাররঞ্জন। (১৪১২ বঙ্গাব্দ; পুনর্মুদ্রণ)। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব)। কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং। (পৃষ্ঠা: ৫২৭-৫৩০; পাল ও সেন আমলের সমাজ ও নারীর অবরোধ প্রথা বিশ্লেষণ)।
  • সেন, দীনেশচন্দ্র। (১৯৩৫; প্রথম প্রকাশ)। বৃহৎ বঙ্গ (১ম ও ২য় খণ্ড)। কলকাতা: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। (পৃষ্ঠা: ৪৫০-৪৬০; কৌলীন্য প্রথা ও জাহ্নবা দেবীর নেতৃত্ব)।
  • সেন, ড. সুকুমার। (১৯৯১; সংস্করণ)। বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (১ম খণ্ড)। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স। (পৃষ্ঠা: ২৫৫-২৬০; মাধবী দাসী ও নারী পদকর্তাদের অবদান)।
  • ভট্টাচার্য, সুখময়। (১৯৯২; সংস্করণ)। মহাভারতের সমাজ। শান্তিনিকেতন: বিশ্বভারতী। (পৃষ্ঠা: ১৬০-১৮০; অনুশাসন পর্বে নারীর অবস্থান)।

২. শাস্ত্রীয় ও ভক্তি সাহিত্যের আকর গ্রন্থ:

  • কবিরাজ গোস্বামী, কৃষ্ণদাস। (২০০৩; সংস্করণ)। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত (রাধাগোবিন্দ নাথ সম্পাদিত)। কলকাতা: সাধনা প্রকাশনী। (মধ্যলীলা; পৃষ্ঠা: ২০০-২১৫; চৈতন্যদেবর সাম্যবাদী দর্শন ও নারী ভক্ত প্রসঙ্গ)।
  • ঠাকুর, বৃন্দাবন দাস। (২০০৫; সংস্করণ)। চৈতন্যভাগবত। কলকাতা: নবদ্বীপ গৌড়ীয় মঠ। (আদি খণ্ড; পৃষ্ঠা: ৫০-৬০; চৈতন্যদেবর জন্মলগ্নে নবদ্বীপের চিত্র)।
  • স্বামী, এ.সি. ভক্তিবেদান্ত। (১৯৭২; সংস্করণ)। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথার্থ। মুম্বই: ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট। (অধ্যায় ৯, শ্লোক ৩২; পৃষ্ঠা: ৪৪৫-৪৪৭)।
  • শহীদুল্লাহ, ড. মহম্মদ (সম্পাদিত)। (১৯৬০)। Buddhist Mystic Songs (চর্যাপদ)। ঢাকা: বাংলা একাডেমি। (পদ নং ১০; ডোম্বী ও সহজিয়া দর্শন)।

৩. লোকসংস্কৃতি ও সুফিবাদ:

  • সেন, দীনেশচন্দ্র (সম্পাদিত)। (১৯২৩; ১ম প্রকাশ)। মৈমনসিংহগীতিকা। কলকাতা: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। (মলুয়া ও মহুয়া পালা; পৃষ্ঠা: ৮০-১১০)।
  • চক্রবর্তী, ড. সুধীর (সম্পাদিত)। (২০০৩)। লালন সমগ্ৰ। কলকাতা: প্রতিভাস। (লালন শাহের দর্শনে লিঙ্গ সাম্য; পৃষ্ঠা: ১৫০-১৬০)।
  • Nurbakhsh, Dr. Javad. (1990). Sufi Women. New York: Khaniqahi Nimatullahi Publications. (Rabia al-Adawiyya; Pages: 15-35).
গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক, তিনি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক এবং আমুল ডেইরি সমবায়ে কর্মরত। পেশাগত পরিচয়ের বাইরে তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব তত্ত্ব, বিশেষ করে শ্রীগদাধর পণ্ডিত গোস্বামী এবং বৈষ্ণব পদাবলীর বিবর্তন নিয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য সুপরিচিত।

মন্তব্য তালিকা - “চৈতন্যদেব ও বাংলার নারীমুক্তি”

  1. বাংলার ইতিহাসে শ্রীচৈতন্যদেব ও নারী মুক্তি নিয়ে এমন সুশৃঙ্খল এবং গভীর বিশ্লেষণ সচরাচর দেখা যায় না। বৈষ্ণব পদাবলীতে নারীর যে উচ্চস্থান, তা চৈতন্যদেবের দর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ। দারুণ একটি লেখা উপহার দেওয়ার জন্য ‘ইতিহাস আড্ডা’-কে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।