সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

নির্বাণ: সাধনক্রম ও বিশ্লেষণ

নির্বাণ: সাধনক্রম ও বিশ্লেষণ

কৌশিক সরকার

মে ১, ২০২৬ ৬৬ 3

শ্রাবস্তীর জেতবনে অনাথপিন্ডক কর্তৃক নির্মিত বিহারে পরিব্রাজক বচ্ছগোত্ত করজোড়ে ভগবান তথাগতকে প্রশ্ন করলেন, “হে ভগবান গৌতম, মৃত্যুর পর নির্বাণপ্রাপ্ত ব্যক্তি কোথায় যান বা তাঁর অবস্থা কেমন হয়?”

সম্ভবত সেটা শীতকাল, কারণ সেই সময় সেই স্থানে শুষ্ক তৃণ ও কাষ্ঠ দ্বারা অগ্নি প্রজ্বলিত ছিল। তথাগত মৃদু হাসলেন। তারপর সেই অগ্নির দিকে নির্দেশ করে বললেন, “অগ্নি দেখতে পাচ্ছো বচ্ছগোত্ত?”

– “হ্যাঁ ভান্তে।” বচ্ছগোত্ত মাথা নাড়িয়ে সম্মতিজ্ঞাপক উত্তর দিলেন।

তথাগত বচ্ছগোত্তকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “তোমার সামনে জ্বলতে থাকা এই অগ্নি যদি নিভে যায়, তবে তুমি কি বলতে পারবে যে আগুনটি পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর না দক্ষিণ—কোন দিকে চলে গেল?”

বচ্ছগোত্ত উত্তর দিলেন, “না, তা বলা যায় না। জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে বলে আগুনটি নিভে শান্ত হয়ে গেছে মাত্র।”

তথাগত বুদ্ধ তখন বললেন, “নির্বাণও ঠিক সেরূপ। রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান—যাকে আঁকড়ে ধরে মানুষের জন্ম-মৃত্যুর চক্র চলে, সেই জ্বালানি বা তৃষ্ণা যখন শেষ হয়ে যায়, তখন মানুষ নিভে যাওয়া আগুনের মতোই পরম শান্ত ও মুক্ত হয়। তাকে কোনো স্থান বা দিক দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় না।”

বৌদ্ধ সাধনমার্গে সাধকগণ এই নির্বাণের জন্য সাধনা করেন। এই মতে নির্বাণ হচ্ছে পরমপ্রাপ্তি, যা পেলে ভবচক্র (জন্ম-মৃত্যুর চক্র) থেকে মুক্ত হওয়া যায় ও পরম শান্তি লাভ করা যায়। কিন্তু সাধনা করলে সহজেই এই ফল প্রাপ্ত হওয়া যায় না। বৌদ্ধ মতে সাধনায় অগ্রগতির ক্রম অনুসারে সাধকগণ চারটি ধাপ অতিক্রম করেন। স্রোতাপন্ন, সকৃদাগামী, অনাগামী ও অরহত।

স্রোতাপন্ন বা পালি ‘সোতাপন্ন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে স্রোতের দ্বারা সম্পন্ন। এই ফল লাভ হওয়া মানে সাধক ধর্মের মূল স্রোতে প্রবিষ্ট হলেন। এরপর তাঁর আর সাধনমার্গ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা থাকলো না। সাগর অভিমুখী নদীর স্রোতের টানে নৌকা যেমন সাগরের দিকে এগিয়ে চলে এবং সেই নৌকা কোনো না কোনো একদিন সাগরে গিয়ে পড়বেই, সাধকের তেমনই অবস্থা উৎপন্ন হয়। এই অবস্থায় সাধককে ‘প্রথম আর্য পুদ্গল’ বা আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রথম স্তরে উত্তীর্ণ ব্যক্তি বলা হয়। সহজ কথায়, যিনি নির্বাণের পথে বা মুক্তির স্রোতে প্রবেশ করেছেন, তিনিই স্রোতাপন্ন। এই স্তরে প্রবেশ করলে মানব মনের প্রধান দশটি বন্ধনের মধ্যে সাধকের প্রথম তিনটি বন্ধন চিরতরে ছিন্ন হয়। এই তিন বন্ধন মুক্তির ফলে সাধক ‘আমি’ বা ‘আমার’ এই ভুল ধারণা বা আত্মভ্রম থেকে মুক্ত হন। বুদ্ধের শিক্ষা, ধর্ম এবং সঙ্ঘের প্রতি তাঁর আর কোনো সংশয় থাকে না। তার শ্রদ্ধা হয় অটল। কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান বা অন্ধ সংস্কার পালনের মাধ্যমে মুক্তি সম্ভব—এই ভ্রান্ত ধারণা থেকেও তিনি মুক্ত হন। ফলত ধর্মের মূল স্রোত থেকে তাঁর সরে যাওয়ার আর কোন সম্ভাবনা থাকে না। বৌদ্ধ শাস্ত্রে বলা হয় একজন স্রোতাপন্ন ব্যক্তি সর্বোচ্চ সাতটি জন্মের মধ্যে অবশ্যই নির্বাণ বা পূর্ণ মুক্তি লাভ করবেন। এবং এই জন্মগুলির মধ্যে তিনি কখনোই নিচুকুলে বা অপায় (নরক, প্রেতলোক, পশু বা অসুর লোক) জন্মান না। তার পরবর্তী প্রতিটি জন্ম কেবল মনুষ্য বা দেবলোকে হয়।

স্রোতাপন্ন অবস্থা থেকে সাধনা করতে করতে সাধনায় আরও অগ্রগতি হলে সাধক একসময় সাধনার দ্বিতীয় স্তর সকৃদাগামী বা সকদাগামী অবস্থায় পৌঁছান। এর আক্ষরিক অর্থ হল একবার ফিরে আসা। এই অবস্থায় পৌঁছানোর পর যদি সাধক দেহত্যাগ করেন তবে বাকি সাধনা সম্পন্ন করার জন্য তাঁকে একবার মাত্র মনুষ্য বা দেবলোকে আসতে হবে এবং সেই জন্মেই তিনি সম্পূর্ণ সাধনা সমাপ্ত করে জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্ত হন। এই স্তরের সাধকের প্রথম তিনটি বন্ধন তো থাকেই না, সেই সঙ্গে পরের দুটি বন্ধনও বহুলাংশে ক্ষয় হয়। তিনি ইন্দ্রিয়সুখের আকাঙ্ক্ষা এবং ক্রোধ বা বিদ্বেষ সম্পূর্ণ নির্মূল করতে না পারলেও অত্যন্ত শিথিল বা দুর্বল করে ফেলেন।

এর পরের ধাপ অনাগামী। নাম থেকেই অনুমান করা যায় যে এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পর দেহত্যাগ করলে সাধককে আর মনুষ্য বা দেবলোকে ফিরে আসতে হয় না। দেহত্যাগের পর তিনি উচ্চতর স্বর্গীয় লোক বা ‘শুদ্ধাবাস’ নামক ব্রহ্মলোকে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখান থেকেই সরাসরি নির্বাণ বা পূর্ণ মুক্তি লাভ করেন। একজন অনাগামী স্তরের সাধক প্রথম পাঁচটি বন্ধন সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন করতে সক্ষম হন। তিনি আর এই মনুষ্যলোক বা দেবলোকের মোহমায়ায় আবদ্ধ হন না। যে কারণে এই জগতে আর ফিরেও আসেন না।

বৌদ্ধ সাধনমার্গের শেষ ও সর্বোচ্চ ধাপ অরহত বা অরহন্ত। অরহন্ত শব্দের অর্থ হচ্ছে অরি বা শত্রুকে যিনি হত্যা করেছেন। এখানে শত্রু বলতে বাইরের কোন শত্রুকে বোঝানো হয়নি। অন্তরের অন্তস্থল থেকে উৎপন্ন কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ও অহংকার – এই পাঁচ রিপুকেই শত্রু রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে। একজন অরহত পর্যায়ের সাধক সম্পূর্ণ রূপে আসবক্ষয় (মানসিক কলুষতা থেকে মুক্তি) করে ত্রিবিধ তৃষ্ণা যেমন কামতৃষ্ণা, ভবতৃষ্ণা ও বিভবতৃষ্ণা থেকে মুক্ত হয়ে নির্বাণ প্রত্যক্ষ (অনুভব) করে চতুষ্কোটি বিনির্মুক্ত হন।

এই ত্রিবিধ তৃষ্ণার মধ্যে কামতৃষ্ণা হচ্ছে আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক) এবং মন দ্বারা জাগতিক ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বিষয়ের (রূপ, রস, শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ) প্রতি যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা আসক্তি তৈরি হয়, তাকেই কাম-তৃষ্ণা বলে। ‘ভব’ শব্দের অর্থ হল সত্তা বা অস্তিত্ব। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা বারবার জন্মগ্রহণ করার ইচ্ছাকে ভবতৃষ্ণা বলে। এই তৃষ্ণা ‘শাশ্বতবাদ’-এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অর্থাৎ, মৃত্যুর পরেও আমি থাকব এবং সুখ ভোগ করব—এই ধরনের বাসনা। এছাড়া, জাগতিক জীবনে যশ, খ্যাতি, ক্ষমতা লাভ করা বা কোনো বিশেষ অবস্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার যে নিরন্তর আকাঙ্ক্ষা, তা-ও ভবতৃষ্ণার মধ্যে পড়ে। ভবতৃষ্ণার ঠিক উল্টোটা হল ‘বিভবতৃষ্ণা’। জীবনের প্রতি চরম বিতৃষ্ণা, হতাশা বা দুঃখ-কষ্ট থেকে বাঁচতে গিয়ে নিজের অস্তিত্বকেই সম্পূর্ণ মুছে ফেলার যে আকাঙ্ক্ষা, তাকে বিভবতৃষ্ণা বলে। এটি মূলত ‘উচ্ছেদবাদ’-এর সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ, “মৃত্যুর পরেই সব শেষ, এরপরে আর কোনো অস্তিত্ব বা কর্মফল নেই”—এই ধারণা পোষণ করে বর্তমান জীবনকে ধ্বংস করার বা আত্মবিনাশের আকাঙ্ক্ষাই হল বিভবতৃষ্ণা।

এবার আসা যাক ‘চতুষ্কোটি বিনির্মুক্ত’ প্রসঙ্গে। এর অর্থ সাধক চার ধরনের যৌক্তিক বা তাত্ত্বিক সীমা থেকে মুক্ত হলেন। এমন এক অবস্থায় পৌঁছালেন যাকে অস্তিত্ব (আছে), নাস্তিত্ব (নেই), উভয়ই (আছে ও নেই) অথবা কোনোটিই নয় (নেই ও নেই)—এই চারটি মতবাদের কোনোটির দ্বারাই প্রকাশ করা যায় না। উদাহরণ স্বরূপ এই লেখার শুরুতেই যাঁর কথা বলেছি সেই পরিব্রাজক বচ্ছগোত্ত ও তথাগত বুদ্ধের আরও কিছু কথোপকথন তুলে ধরা যেতে পারে –

বচ্ছগোত্ত প্রশ্ন করলেন, “হে গৌতম, তথাগত মৃত্যুর পর থাকে… মতবাদী?”

“বচ্ছ!… না : ‘তথাগত মৃত্যুর পর থাকে, … মিথ্যা।”

“হে গৌতম, তথাগত মৃত্যুর পর থাকে না… মতবাদী?”

“বচ্ছ!… না : ‘তথাগত মৃত্যুর পর থাকে না, … মিথ্যা।’”

“হে গৌতম, তথাগত মৃত্যুর পর থাকেও, না থাকেও… মতবাদী?”

“বচ্ছ!… না-তথাগত মৃত্যুর পর থাকেও, না থাকেও, … মিথ্যা।’”

“হে গৌতম, তথাগত মৃত্যুর পর থাকেও না, না থাকেও না, … মতবাদী?”

“বচ্ছ!… না : ‘তথাগত মৃত্যুর পর থাকেও না, না থাকেও না;… মিথ্যা।’”

এরপর বচ্ছগোত্ত আবারও প্রশ্ন করলেন –

হে গৌতম, এ প্রকারে বিমুক্ত-চিত্ত ভিক্ষু কোথায় উৎপন্ন হয়?”

“বচ্ছ, ‘উৎপন্ন হয়’, ইহা বলা চলে না।”

“তবে হে গৌতম, উৎপন্ন হয় না?”

“বচ্ছ, ‘উৎপন্ন হয় না’, ইহাও বলা চলে না।”

“তবে হে গৌতম, উৎপন্ন হয়, নাও হয়?”

“বচ্ছ, ‘উৎপন্ন হয়, নাও হয়’, ইহাও বলা চলে না।”

“তবে হে গৌতম, উৎপন্ন হয় না, নাও হয় না?”

“বচ্ছ, ‘উৎপন্ন হয় না, নাও হয় না’, ইহাও বলা চলে না।”

অর্থাৎ চার ধরনের যৌক্তিক বা তাত্ত্বিক সীমা দ্বারা একে ব্যাখ্যা করা যায় না। বস্তুত ত্রিপিটকে নির্বাণকে কোনো ভৌগোলিক স্থান (স্বর্গ) হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি, আবার লুপ্ত হয়ে যাওয়া বা শূন্য বলেও বর্ণনা করা হয়নি। তথাগত বুদ্ধকে যখনই এটি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, তিনি প্রধানত নেতিবাচক ‘ক্ষয়’ অর্থে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অনুরূপ ব্যাখ্যা তথাগত বুদ্ধের অগ্রশ্রাবক (প্রধান শিষ্য) সারিপুত্তের মুখ থেকেও শোনা যায়। বৌদ্ধ জগতে ভিক্ষু সারিপুত্তের বাণী বুদ্ধ-বাণীর সমতুল্য বলে মনে করা হয়। তাই নির্বাণ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। একবার আনন্দের প্রশ্নের উত্তরে সারিপুত্ত বলেছিলেন –

“যো খো আবহুসো রাগক্খয়ো, দোসক্খয়ো, মোহক্খয়ো—ইদং বুচ্চতি নিব্বানং।”

অর্থাৎ: “বন্ধু, রাগের (অনুরাগ বা লোভ) ক্ষয়, দ্বেষের (হিংসা বা ক্রোধ) ক্ষয় এবং মোহের (অবিদ্যা বা অজ্ঞানতা) ক্ষয়কেই নির্বাণ বলা হয়।”

এখানে বলে রাখা ভালো যে তথাগত বুদ্ধ স্বয়ং একজন অরহত, সেই সঙ্গে তিনি সম্যক সম্বুদ্ধ। অরহত পর্যায়ের সাধকের সঙ্গে তাঁর কিছু পার্থক্য থাকে। একজন অরহত কখনোই ধর্মের প্রবর্তক নন, বরং সম্যক সম্বুদ্ধের প্রবর্তিত ধর্মের একজন অনুসারী এবং সংরক্ষক। তিনি বিদ্যমান ধর্মকে বহন ও প্রচার করেন। অরহত সম্পূর্ণরূপে তৃষ্ণামুক্ত ও বুদ্ধের মতন নির্বাণ প্রাপ্ত হলেও তিনি সম্যক সম্বুদ্ধের মতন সর্বজ্ঞ নন। তাঁর কিছু ঋদ্ধিশক্তি থাকলেও তিনি সম্যক সম্বুদ্ধের সমকক্ষ নন। অপরদিকে সম্যক সম্বুদ্ধগণের শিক্ষাদানের এক অসীম ও নিখুঁত ক্ষমতা থাকে। তিনি যেকোনো ব্যক্তির পূর্বজন্মের কর্ম, মানসিক প্রবণতা এবং স্বভাব (আধার) নিখুঁতভাবে বুঝতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী তাকে সঠিক উপদেশ দিতে পারেন, যাতে সেই ব্যক্তি দ্রুত নির্বাণ লাভ করতে পারে। সম্যক সম্বুদ্ধগণ নিজের রাস্তা নিজেই তৈরি করেন। তাঁর যোগ্য শিষ্যগণ সেই পথ অনুসরণ করে নির্বাণ প্রাপ্ত হন।

এতক্ষণ নির্বাণ সাধনার স্তর জানতে গিয়ে আমরা জানলাম তৃষ্ণা, রাগ, দ্বেষ ও মোহ এর সম্পূর্ণ ক্ষয় হলে নির্বাণ লাভ হয়। কিন্তু নির্বাণ লাভ হলে ভবচক্র বা পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তিলাভ হয় কেমন করে? সে বিষয়ে জানতে গেলে আমাদের তথাগত বুদ্ধ নির্দেশিত প্রতীত্যসমুৎপাদ সূত্র বুঝতে হবে। তথাগত বুদ্ধের শিক্ষায় এই জগত কার্যকারণ সম্পর্কহেতু চলমান। অর্থাৎ প্রতিটি কার্যেরই নির্দিষ্ট হেতু (কারণ) ও প্রত্যয় (সহায়ক শক্তি) বিদ্যমান। জগতের সমস্ত বস্তুই প্রতীত্য-সমুৎপন্ন বা হেতু সমুদ্ভূত। প্রত্যেক উৎপাদের কোন না কোন প্রত্যয় বিদ্যমান। প্রতীত্যসমুৎপাদ কার্য কারণ সম্পর্কের বিচ্ছিন্ন প্রবাহ বোঝায়।

“ইমস্মিং সতি ইদং হোতি

ইমসস উপ্পদা ইদং উপজ্জতি

ইমস্মিং অসতি ইদং ন হোতি

ইমসস নিরোধা, ইদং নিরুজ্জতি”

অর্থাৎ “ইহার বিদ্যমানতায় উহা ঘটে, ইহার উৎপত্তি হেতুই উহার উৎপত্তি হয়। ইহার অবিদ্যমানতায় উহা ঘটে না, ইহার নিরোধ হেতু উহা নিরুদ্ধ হয়।”

জন্ম হলেই জরা ও মরণ অবশ্যম্ভাবী। তাহলে জরা ও মরণের কারণ হিসেবে আমরা জন্মকে নির্দেশ করতে পারি। এবার প্রশ্ন আসে, জন্মের কারণ কি? এইভাবে দেখতে দেখতে তথাগত ঘটনা শৃঙ্খলের বারোটি মূল কারণ বা নিদানকে নির্দেশ করেছেন। এই দ্বাদশ নিদান হচ্ছে অবিদ্যা, সংস্কার, চেতনা বা বিজ্ঞান, নামরূপ, ষড়ায়তন, স্পর্শ, বেদনা, তৃষ্ণা, উপাদান, ভব, জাতি ও জরামরণ। এর প্রত্যেকটি আগেরটির কারণে উদ্ভূত ও চক্রাকারে আবর্তিত এবং আমাদের পূর্ববর্তী জীবন, বর্তমান জীবন ও পরবর্তী জীবনকে নির্দেশ করে।

এই দ্বাদশ নিদানের প্রথম দুটি পূর্ব জন্মকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ পূর্ব জন্মের অবিদ্যা (সত্যকে না জানার অজ্ঞতা) থেকে তৈরি হয় সংস্কার (মানসিক গঠন)। এই সংস্কার থেকেই সৃষ্টি হয় বর্তমান জন্মের বিজ্ঞান (চেতনা বা মাতৃগর্ভে নতুন চেতনার সঞ্চার)। এই বিজ্ঞানের কারণে উৎপন্ন হয় নামরূপ (মন ও শরীরের গঠন)। নামরূপণ-এর কারণে ষড়ায়তন (পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও মন)। ষড়ায়তন এর কারণে স্পর্শ (ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বাইরের জগতের সংযোগ)। এই স্পর্শ সৃষ্টি করে বেদনা (সংবেদনা- সুখ, দুঃখ ও নিরপেক্ষ)। বেদনার কারণে তৃষ্ণার (বিষয়ের প্রতি আসক্তি বা আকাঙ্ক্ষা উৎপত্তি হয়)। অষ্টম নিদান ‘তৃষ্ণা’-এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে আমাদের ভবিষ্যৎ জন্মের বীজ। এই তৃষ্ণার কারণেই একের পর এক সৃষ্টি হয় উপাদান (আসক্তি থেকে আঁকড়ে ধরার প্রবণতা), তা থেকে ভব (পুনর্জন্মের প্রক্রিয়া বা হওয়ার প্রবণতা) এবং তা থেকে জাতি (পুনরায় জন্মগ্রহণ করা)। আর জন্ম হলেই যে জরা ও মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী সে তো সকলের জানা। তাই দ্বাদশ নিদান ‘জরামরণ’, যা জন্মের কারণে সৃষ্ট।

তাই তৃষ্ণা নিরোধের ফলে উপাদান (আসক্তি) নিরুদ্ধ হয়, উপাদান নিরুদ্ধ হলে ভব (কর্ম) নিরুদ্ধ হয়, ভব নিরুদ্ধ হলে জন্ম নিরুদ্ধ হয়, জন্ম নিরোধ হলে জরা, মরণ, শোক, পরিবেদন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও মনস্তাপ নিরুদ্ধ হয়। মানুষ যদি গভীর প্রজ্ঞা ও অভ্যাসের দ্বারা সর্বপ্রকার অস্তিত্বকে অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্ম রূপে উপলব্ধি করতে সমর্থ হয় তখন কোন কিছুতেই তাঁর আর আসক্তি বা তৃষ্ণা থাকে না এবং এর ফলস্বরূপ অবিদ্যা, সংস্কার, তৃষ্ণা ও উপাদান এই পুনরুৎপত্তির কারণ সমূহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। হেতুর অভাবে আর জন্মগ্রহণ করতে হয় না। এইরূপে একজন সাধক তাঁর তৃষ্ণার নিরোধ সাধন করে পরজন্ম থেকে মুক্তিলাভ করেন। একারণেই নিরুদ্ধ হওয়াই নির্বাণ।

নির্বাণ আবার দুই প্রকার। সোপাদিশেষ নির্বাণ ও অনুপাদিশেষ নির্বাণ বা পরিনির্বাণ। সাধক যখন সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করে ‘অরহত’ হয়ে অন্তরে নির্বাণ কে প্রত্যক্ষ বা অনুভব করেন তখন তাকে সোপাদিশেষ নির্বাণ বলে। তথাগত বুদ্ধ উরুবেলায় (বর্তমান বুদ্ধগয়া) বোধিবৃক্ষের নিচে বোধিজ্ঞান লাভ করে যে নির্বাণ অনুভব করেছিলেন তা হল সোপাদিশেষ নির্বাণ। তিনি মানসিক দুঃখ বা তৃষ্ণা থেকে মুক্ত হলেও, জীবনের বাকি পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে লোককল্যাণে ধর্ম প্রচার করে গেছেন এবং বার্ধক্য ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্য দিয়েও গেছেন। এ অবস্থায় সাধকের ভৌতিক শরীর বিনষ্ট হয় না। সেই কারণে শারীরিক অনুভূতি থাকলেও মানসিক কোন দুঃখ তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। আর নির্বাণপ্রাপ্ত বা অরহত সাধকের মৃত্যুর পর যখন ভৌতিক শরীরের পতন হয় তখন পঞ্চস্কন্ধেরও (রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান) সম্পূর্ণ বিনাশ ঘটে। এটি কোনো ‘উচ্ছেদ’ বা ‘ধ্বংস’ নয়, বরং এটি হল পুনর্জন্মের ‘সমাপ্তি’ বা ‘নির্বাপণ’। এই অবস্থায় দেহ, মন বা চেতনার আর কোনো অবশিষ্টাংশ থাকে না এবং জন্ম-মৃত্যুর চক্র চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়, তখন তাকে অনুপাদিশেষ নির্বাণ বা পরিনির্বাণ বলে।

বৌদ্ধ দর্শন সবসময় দুই চরমপন্থা বর্জন করে মধ্যপন্থাকে অবলম্বন করেছে। তাই নির্বাণ কোনও স্বর্গ বা অনুরূপ কোনও স্থানে অনন্ত সুখভোগের প্রতিশ্রুতি নয়। আবার নির্বাণ কোনও নেতিবাচক শূন্যতা বা বিনাশও নয়। নির্বাণের মতো লোকোত্তর বা অতীন্দ্রিয় অবস্থাকে ভাষায় ইতিবাচকভাবে বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। এই কারণেই তথাগত বুদ্ধ নির্বাণকে অধিকাংশ সময় ‘দুঃখের অবসান’, ‘তৃষ্ণার ক্ষয়’, বা ‘ভবচক্রের মুক্তি’ ইত্যাদি নেতিবাচক শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। একবার ‘রাধ’ নামক এক ব্যক্তি তথাগত বুদ্ধকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, “হে তথাগত, নির্বাণ, নির্বাণ বলা হয়। এই নির্বাণ কী?”

তথাগত উত্তরে বলেছিলেন  –

“তণহক্খয়ো হি রাধ নিব্বানং”

অর্থাৎ: “হে রাধ, তৃষ্ণার সম্পূর্ণ ক্ষয় বা বিনাশই হল নির্বাণ।”

তথ্যসূত্র :-

ত্রিপিটকের মধ্যম নিকায়, সংযুক্ত নিকায় ও উদান।

ডঃ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বৌদ্ধ বিদ্যা, পূর্ব্বাশা লিমিটেড, কলকাতা, ১৩৫৫ (বং)।

পণ্ডিত শ্রীমৎ ধর্মাধার মহাস্থবির (বঙ্গানুবাদ), মিলিন্দ প্রশ্ন, ধর্মাধার বৌদ্ধ গ্রন্থ প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৭৭।

ডঃ সুকোমল চৌধুরী (সম্পা:) গৌতম বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শন, মহাবোধি বুক এজেন্সী, ১৯৯৭ ।

কৌশিক সরকার, নমো তস্স, মণিকর্ণিকা প্রকাশনী, কলকাতা, ২০২১।

ছেলেবেলায় বীরভূম আর বর্তমানে কৃষ্ণনগরের স্থায়ী বাসিন্দা কৌশিক সরকারের লেখালেখির বাইরে আগ্রহের মূল বিষয় ডাকটিকিট সংগ্রহ, গান শোনা, বেড়ানো ও বই পড়া। বুদ্ধের জীবন ও বাণী বিষয়ে তার গ্রন্থ ‘নমো তস্স’ বিশেষভাবে প্রশংসিত।

মন্তব্য তালিকা - “নির্বাণ: সাধনক্রম ও বিশ্লেষণ”

  1. অসাধারণ তথ্য বহুল আলোচনা করেছেন।
    পড়ে বেশ সমৃদ্ধ হলাম।
    মূল বিষয়বস্তু নিয়মিত হলেও লেখক বিষয়টাকে অসাধারণ ভাবে ব্যাখ্যার মাধ্যমে সহজভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করি।
    বুদ্ধ পূর্ণিমার শুভেচ্ছা রইল

  2. পড়লাম। যথেষ্ঠ তথ্য ও তত্ত্ব সমৃদ্ধ লেখা। ভালো লাগল। অনেক বলার আছে। WA এ লিখব।
    একটু বলি, চতুস্কোটি বিনির্মুক্ত এর logic বা বৌদ্ধ ন্যায় , আমার কাছে অস্পষ্ট রইল। তা বাদে অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় ভালো আলোচনা। প্রতীত্য সমুত্পাদ আলোচনায় , ক্ষণিকত্ব আলোচনা করলে ভালো হত। আর সম্যক অষ্টাঙ্গিক মার্গ বিষয়ে সংক্ষিপ্তাকারে স্পর্শ করে গেলে , মনে হয় আরও ভালো হত। শুভেচ্ছা রইল।

  3. ” প্রতীত্য-সমুৎপাদ সূত্র অর্থাৎ এই জগর্ৎ কার্যকারণ সম্পর্ক হেতু চলমান। অর্থাৎ প্রত্যক কার্যেরই নির্দিষ্ট হেতু (কারণ) ও প্রত্যয় (সহায়ক শক্তি) বিদ্যমান। জগতের সমস্ত বস্তুই প্রতীত্য সমুৎপন্ন বা হেতু সমদ্ভূত।” কত শতাব্দী আগে বুদ্ধদেব এই সূত্র আবিস্কার করেছিলেন, ভাবলে অবাক হই।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।