বুদ্ধদেবের মৃত্যু পরবর্তী বৌদ্ধধর্মের বিভাজন
বৌদ্ধধর্মে বিভাজন ও দলাদলির ইতিহাস বিস্তৃত ও জটিল। এর সূচনা,ধরতে গেলে বুদ্ধদেবের মৃত্যুর হয়েছে। তারপর কালের ও মানবচরিত্রের নিয়মে তা বহু বিস্তৃত হয়ে যায়।
বুদ্ধদেবের মৃত্যুর ঠিক পরের দু-টি ঘটনা এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। চুল্লবগ্গের বিবরণ অনুযায়ী বুদ্ধের মহাশিষ্য মহাকশ্যপ বুদ্ধের মৃত্যস্থানে উপস্থিত ছিলেন না। তবে কুশীনগরের দিকে যাত্রা করেছিলেন এবং ওই যাত্রাপথেই এক সাধুর কাছ থেকে বুদ্ধের মৃত্যু সংবাদ পান। এই সময় সুভদ্র নামে এক ভিক্ষুক হতাশা বা ক্রন্দনের বদলে আনন্দ প্রকাশ করতে থাকেন। তিনি বলেন, এইবার যে যার নিজের খুশিমতো জীবন যাপন করতে পারবে। এটা করো না ওটা করো এই গুলি বলার আর কেউ রইল না।

ভাবতে অবাক লাগে, পরম করুণাময়ের এমন শিষ্যও ছিল! পরের ঘটনাটি এইরকম—বুদ্ধদেবের শরীর সাতদিন রেখে দেওয়া হয়েছিল। তারপর আটজন মল্লরাজা মুকুটবন্ধন নামে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে তাঁর দেহ অগ্নিতে সমর্পন করলেন। ক্রমে দেহের সমস্তটাই ভষ্মিভূত হল। পড়ে রইল শুধু কিছু অস্থি ও ভষ্ম। বুদ্ধের দেহধাতু সংগ্রহ করার জন্য আটটি রাজ্যের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়েছিলেন কিন্তু এদের মধ্যে বিরোধ উপস্থিত হয় কে দেহাবশেষ নেবেন তাই নিয়ে। তখন দ্রোন নামে এক ব্যক্তি অস্থি ভাগ করে দিয়ছিলেন। তারপর তিনি সকলের অনুমতিক্রমে যে পাত্রে অস্থি রক্ষিত হয়েছিল তা গ্রহণ করেন। সব শেষ হবার পর মৌর্যগন কুশিনগরে আগমন করে। তারা দেহধাতু না পেয়ে চিতাস্থলের ভষ্ম নিয়ে যান। এই সকলের দ্বারা পরবর্তীকালে আটটি শরীরস্তুপ, একটি কুম্ভস্তুপ এবং একটি অঙ্গারস্তুপ নির্মিত হয়েছিল। রাজগৃহ, বৈশালী কপিলাবস্তু, অন্নকপ্প, রামগ্ৰাম, বেষ্টাদাপ, পাবা, কুশিনগরে শরীরস্তুপ স্থাপিত হয়েছিল।
দুটি ঘটনাই লক্ষ্য করুন। প্রথমটি, একজন তৎক্ষণাৎ বুদ্ধকে অস্বীকার করার স্পর্ধা দেখিয়েছে৷ আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দেহধাতু সংগ্ৰহে কলহ করার প্রশ্ন আসে কেন? কারণ বুদ্ধ সর্বত্রই আছেন, এই ছিল তাঁর শিক্ষা।
এবার কলহ প্রসঙ্গেই আসা যাক।
বৌদ্ধধর্মের শিষ সংখ্যা যত বাড়ছিল, পারস্পরিক মতভেদও ততই বাড়ছিল। বিশেষত, তখন বুদ্ধরূপ ছাতাটি সরে গেছে, যাঁর কাছে গেলে এই মতভেদ দূর হতে পারে। এই অবস্থায় ঠিক কী কী নিয়ে দলাদলি শুরু হল তার বর্ণনা দীর্ঘ।
প্রথম যে দশটি বস্তুর জন্য দলাদলি হয় পালিতে তাকে দশবথ্থু এবং সংস্কৃতে দশ বস্তু বলে। এইগুলি হল যথাক্রমে–
- কপ্পোতি সিঙ্গিলোণ কপ্পো–অনেক ভিক্ষু শিঙের পাত্রে সামান্য নুন সঞ্চয় করে রাখতেন। ভিক্ষা প্রদানের সময় অনেকক্ষেত্রে আলুনি খাদ্যই দেওয়া হত, এঁটো’ এড়ানোর জন্য। এই সামান্য কথা নিয়ে বাদ-বিসম্বাদ তৈরি হল, কারণ ভিক্ষুকের আবার সঞ্চয় কী! তাহলে এরা গৃহস্থ হয়ে গেছে। অতটা কড়া নন যেসব ভিক্ষু, তাঁরাও বিবাদ মেটাতে পারলেন না।
- কপ্পতি দ্বঙ্গুল কপ্পো–বুদ্ধদেব নিয়ম করে গিয়েছিলেন, বেলা ঠিক দুই প্রহরের পরে কোনো ভিক্ষু আহার করতে পারবেন না। বারোটা বাজার আগেই সকলকে খাওয়া সেরে নিতে হবে। এরপর যদি খেতে হয় জল, বড়োজোর ফলের রস, ঘোল খাওয়া যাবে। কিন্তু সবদিনে গৃহস্থ সময়মতো ভিক্ষা দিতে পারতেন না। ফলে যে সময়ে ভিক্ষু ভিক্ষা পেতেন দেখা যেত সেই সময়ে বারোটা বেজে যাচ্ছে। এইভাবে কারুর আধপেটা খাওয়া হত, কারুর বা তাও নয়। এইক্ষেত্রে মধ্যাহ্ন পার হওয়ার পর সূর্যের ছায়া যখন দুই আঙুল পরিমাণ অতিবাহিত হয়, তখনও ভিক্ষুদের জন্য খাবার গ্রহণের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কড়া ভিক্ষুরা মত দিলেন না। সুতরাং, এক্ষেত্রেও মতান্তর শুরু হল।
- কপ্পতি গামান্তর কপ্পো–নিয়ম ছিল ভিক্ষুরা এক গ্ৰামে একদিন ভিক্ষা করবে। একদিনে দুই গ্রামে যেতে পারবে না। যদি গ্রামান্তরে নিমন্ত্রণ হয় তাহলে বুদ্ধদেব নিয়ম করে দিয়েছিলেন, ভিক্ষু ঘরে খেয়ে যেতে পারবে না। কারণ এতে একদিনে দুবার খাবার দোষ হবে৷ তাছাড়া, নিমন্ত্রণকারীর আয়োজনও উদ্বৃত্ত হয়ে যেতে পারে। এইসময়ে ভিক্ষুরা বলতে লাগল, যদি পেটে কিছু না থাকে তাহলে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বেশি কষ্ট হবে। এও একটা বিবাদের কারণ।.
- কপ্পতি আবাস কপ্পো–বুদ্ধদের নিয়ম করেছিলেন, এক জায়গায় যতজন ভিক্ষু থাকবে, তারা যেন একত্রিত হয়ে উপসোথপালন (উপোষ করে ধর্মকথা শোনা) করে। এক্ষেত্রে একটি বিহারের কাছাকাছি অঞ্চলের সবাইকে বোঝানো হয়েছে। অষ্টমী, পূর্ণিমা ও অমাবস্যা এই কদিন সকলে সমবেত হয়ে উপসোথ পালন করবে বলে বুদ্ধদেব নির্দেশ দেন। কিন্তু এখন কেউ কেউ বললেন, এ নিয়ম বড়ো কঠোর। যার যেখানে ইচ্ছে সে সেখানেই উপসোথ করবে। কিন্তু বৃদ্ধরা মত দিলেন না।
- কপ্পতি অনুমতি কপ্পো–বৌদ্ধদের সব কাজকর্ম সংঘ মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে তবে হত। অর্থাৎ এক বিহারের যত ভিক্ষু আছে তারা সমবেত হয়ে কার্যনির্বাহ কীভাবে হবে তা স্থির করতেন। সকলের মত নেওয়া হত। অনেক সময় কিছু ভিক্ষু অনুপস্থিত থাকতেন। তখন বিহারের প্রধান ভিক্ষুরা তাদের সম্মতি পাওয়া যাবে এইরকম ধরে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। এই বিষয়ে বিবাদ উপস্থিত হবে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। একদল বলেন ‘অনুপস্থিত ভিক্ষুরা যে তোমাদের হয়ে মত দিবেন একথা তোমরা কী করে ভাবছো!’ আর একদল বলেন, ‘তারা তো উপস্থিত ছিলেন না। তাই কি করি? সংঘের দরকারি কাজ তো ফেলে রাখা যায় না।’
- কপ্পতি আচিণ্ণ কপ্পো–অনেক ভিক্ষু বলতে থাকেন, আমার গুরু (এই গুরু অবশ্যই বুদ্ধদেব নন, এদের যারা দীক্ষা দিয়েছিলেন সেইসব গুরু) এই কাজ করে গেছেন, তাই আমিও করব। বৃদ্ধ তপস্বীরা বলতেন, তোমার গুরু কোথায় কোন কাজ করে গেছেন, সেটাকে তো আর বুদ্ধের উপদেশের বিরোধী কোনো প্রমাণ হিসাবে ধরা চলে না! অতএব এই কাজ করা যাবে না। সুতরাং বিবাদ…
- কপ্পোতি অমথিতকপ্পো–দুধ আর দই এর মাঝামাঝি যে অর্ধতরল স্তর, ভিক্ষুরা দাবি করলেন সেটা সবসময়ই খাওয়া চলবে।
- কপ্পোতি জলোগি কপ্পো–মদ গেঁজে ওঠার পূর্বে অর্থাৎ তাড়ি হবার ঠিক আগে সেই ঝাঁঝালো জল খাওয়া নিয়েও বিতর্ক হয়। কারণ জল খাবার বিধান আছে সবসময়ই। তাই যতক্ষণ না পুরো বস্তু মদ্যে পরিণত হচ্ছে, তা তো জলই। পেটে গিয়ে যদি মদ হয়, তো আমরা কি করতে পারি? এই ছিল বিরোধী দলের যুক্তি।
- কপ্পোতি অসদকংনাসীদনং–নিসীদন শব্দের অর্থ আসন। আর দশা অর্থ কাপড়ের ছিলে। কাপড়ের ছিলে কেটে যে সুন্দর আসন তৈরি হয়, তাতে বসা বৌদ্ধদের নিষেধ ছিল। কারণ বুদ্ধ বলে গেছেন উচ্চাসনে বা মহাসনে বসবে না। অতএব ছিলেকাটা সুন্দর আসনে বসা যাবে না। বিরোধী পক্ষ বলতে লাগল, ছিলে কাটলাম বা না কাটলাম, আমরা তো কোনো উচ্চাসনে বা মহাসনে বসছি না। তাহলে কী করে নিয়ম লঙ্ঘণ হয়?
- কপ্পোতি জাতরূপ রজতন্তি–সোনা রুপা গ্রহণ করা, বুদ্ধদেবের নির্দেশ অনুযায়ী, ভিক্ষুকদের পক্ষে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ কাজ। কিন্তু বৈশালীরা ভিক্ষুরা ছলের মাধ্যমে তা নিতেন। তারা উপসথ-শালায় একটি জলপূর্ণ পাত্র রাখতেন এবং উপাসকদের বলতেন, তোমরা এই জলে কার্ষাপণ ফেলে দাও। তারাও ফেলে দিত। ভিক্ষুরা সোনা রুপা ছুঁতেন না, কার্ষাপণ ছিল তামার মুদ্রা৷ কিন্তু পরে নিজেদের লোক দিয়ে সেগুলো তুলে খরচ করতেন। এর সপক্ষে আবার যুক্তিও দিতেন। বলতেন আমরা তো ছুঁইনি। কী করে তাহলে বুদ্ধের আজ্ঞা লঙ্ঘণ হল?
ভাবতে সত্য কষ্ট হয়, বুদ্ধের সর্বাপেক্ষা প্রিয় নগরী বৈশালীর এই দশা হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর একশো বছরের মধ্য! যে বৃজিদের তিনি এত ভালোবাসতেন, হয়তো তাদের মধ্যেও কেউ এই ধরনের আচরণ করতেন!
বুদ্ধের মৃত্যু ১০০ বছর পরে এই দশবস্তু প্রচলনের জন্য আন্দোলন হতে থাকে। এইসময়ে বৈশালীতে যশ নামে এক জ্ঞানবৃদ্ধ শ্রমণ আসেন। তিনি এইসব আচরণের প্রতিবাদ করলে বৈশালীর লোকেরা এমন অত্যাচার করল যে তিনি পালিয়ে প্রথমে কৌশাম্বীতে গেলেন। সেখান থেকে পাবা ও অবন্তীতে লোক পাঠালেন। নিজে অহোগঙ্গো পর্বতে গেলেন। দ্রুত সব জায়গা থেকে লোক উপস্থিত হলে স্থির হল সকলকেই বৈশালীতে যেতে হবে। সেখানেই হবে বিচার। বিচার হল উব্বিহিকা পদ্ধতিতে। অর্থাৎ আট জন লোককে বেছে নিয়ে তাদের হাতে নিষ্পত্তির ভার দেওয়া হল। এদের সকলেরই বয়স একশোর উপর, এরা সকলেই তথাগতকে দেখেছিলেন এবং সকলেই দশবস্তুর বিরুদ্ধে মত দিলেন। যাঁরা সেই মত গ্ৰহণ করলেন না তারা আলাদা হয়ে নিজেদের মতো করে বৈশালীর উপকন্ঠে কুটাগারশালায় একটি মহাসম্মেলনর আয়োজন করেন। এটিই দ্বিতীয় মহাসংগীতি। বস্তুত, এই মহাসঙ্গীতিতে যোগদানকারীদেরই নাম হল মহাসাংগিক/মহাসাংঘিক। আর বাকি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র অংশে যারা রয়ে গেলেন তাদের নাম হল থেরবাদী।
এরপরে দুপক্ষেই হতে থাকে ক্রমাগত বিভাজন। থেরবাদের মধ্যে দশটি বিভাগ ও মহাসাংগিকে সাতটি বিভাজন তৈরি হয়। কিন্তু, স্বভাবতই এরা বেশিদিন নিজেদের স্বাতন্ত্র ধরে রাখতে পারে না। লুপ্ত হয়ে যায়, আর নয়তো অন্য শাখার সাথে যুক্ত হয়। এইভাবে উদ্ভূত সতেরোটি শাখার মধ্যে অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে কেবল চারটি। সেগুলি হল–বৈভাষিক, সৌত্রান্তিক, মাধ্যমিক ও যোগাচার। আবার এই চার শাখা নিজেদের আচার, দর্শন ইত্যাদির সাযুজ্য অনুযায়ী দুটি শাখায় পরিণত হয়—হীনযান ও মহাযান। অবশ্য থেরবাদীরা হল হীনযান এবং মহাসাংগিকরা মহাযান, এই কথাও বলা হয়ে থাকে। বর্তমানে আমরা মূলত এই দুটিরই উল্লেখ করে থাকি।
এবার আসা যাক এ দুটি মতের মধ্যে প্রভেদ কী ছিল সেই আলোচনায়। যদিও তা বেশ জটিল ও নানা মতের সংযোগ বিয়োজনে যথারীতি জটিলতর হয়েছে।
হীনযান আখ্যাটি থেরবাদীদের প্রতি প্রয়োগ করে মহাযানীরা। যদিও থেরবাদীরা কখনোই নিজেদের হীনযানী বলতে রাজি ছিল না। বরঞ্চ তারাই নিজেদের মহাযানী বলে পরিচয় দিতেন। সূত্রলঙ্কারে গ্ৰন্থে হীনযান-মহাযান এর পার্থক্য নিরূপণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
১.বৌদ্ধদের ধর্মগ্ৰন্থ ত্রিপিটক তৈরি হয়েছে হীনযান মতকে কেন্দ্র করে। [বাস্তবে, সে সময়ে বৌদ্ধধর্মের কোনো বিভাগই ছিল না। হতে পারে, ত্রিপিটকের আদেশ নির্দেশ হীনযান মতের সঙ্গে মেলে বলে আসঙ্গ ঐরকম মত প্রকাশ করেছেন।]….মহাযানে এই রকম তিনটি পিটকের বিভক্ত গ্ৰন্থ নেই। তার জায়গায় রয়েছে অসংখ্য ধর্মগ্ৰন্থ। এর মধ্যে বৈপুল্য সূত্র, গম্ভীরা সূত্র, ক্রমে পারমিতা সূত্র ও অন্যান্য গ্ৰন্থ যুক্ত হয়। মহাযানীগণ এইগুলিকেই বিশুদ্ধ বুদ্ধবাণী বলে প্রচার করতে থাকেন।
২ মহাযানীর আসল লক্ষ্য বুদ্ধত্ব লাভ করা। যেখানে হীনযানীর আদর্শ অর্হত্ব্যলাভ। হীনযানের লক্ষ্য স্বমুক্তি। আর মহাযানী তার নিজস্ব নির্বাণ ব্যতীত পার্থিব সকল কিছুর মুক্তি আকাঙ্খা করে।
৩. মহাযানীগণ ইতিমধ্যে বোধিসত্ত্বর ধারণা আনেন। বোধিসত্ত্ব হলেন এমন একজন যিনি বুদ্ধত্ব লাভের পথে অগ্রসরমান। বোধিসত্ত্বকে বৌদ্ধত্ব লাভ/বিকাশ ঘটানোর জন্য সাধনা করতে হয়। আর এই সাধনায় তাঁদের শক্তি হলো পারমিতা। এই বোধিসত্বরা হলেন–
১. মঞ্জুশ্রী অথবা বাগীশ্বর,
২. পদ্মপানি অবলোকিতেশ্বর,
৩. বজ্রপাণি (সম্ভবত শক্তিরূপী মহেশ্বর)।
সংক্ষেপে পারমিতা বিষয়ে কয়েকটি কথা বলা যায়। শব্দটি আসলে পারমি। এটি মহাযান বৌদ্ধ ধর্মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ পরিপূর্ণতা। যা লাভ না করলে, কোনো মানুষের তার ইপ্সিত আত্মিক বোধে উত্তরণ সম্ভব নয়। যাইহোক, অনেক পারমিকে একসাথে বলা হয় পারমিতা।
পরবর্তীকালে এলেন দেবী নৈরাত্মা, বহু ধ্যানীবুদ্ধ তারা, ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন কেবলমাত্র মহাযান মতে এত দেবদেবী উপাসনা হয়তো অসুবিধা জনক হয়ে যাচ্ছিল বা নতুন জ্ঞানরাজির উদ্ভব ঘটেছিল বা দেশভেদে আরও দেবদেবী যুক্ত হচ্ছিলেন—যে কারণেই হোক, বৌদ্ধ ধর্মের ক্রম পরিবর্তনের শেষ পর্যায়ে বৌদ্ধ ধর্ম তন্ত্রযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মে পরিবর্তিত হয়েছিল। এই সময় কয়েকটি তান্ত্রিক শাখা গড়ে উঠেছিল; যথা মন্ত্রযান, বজ্রযান, সহজযান ও কালচক্রযান।
- মন্ত্রকে আশ্রয় করে সাধনার যে পথ তাই মন্ত্রযান। মন্ত্রযানের উদ্ভবের সময়কাল একেবারে স্থির ভাবে বলা না গেলেও মোটামুটি পঞ্চম শতক ধরা যায়। বৌদ্ধপণ্ডিত আসংগের ওই শতকের একটি গ্রন্থে তান্ত্রিক যৌনাচারযুক্ত যোগসাধনার বর্ণনা রয়েছে।
- বজ্রকে নির্ভর করে যে সাধনার পথ বা যান তাই হল বজ্রযান এবং এর অনুগামীরা হলেন বজ্রাচার্য। বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বগনের দাক্ষিণ্য ও সাহায্য মুক্তি অর্জনে সহায়ক, এই মহাজনী চিন্তাধারার সঙ্গে নতুন মোহিনী অতীন্দ্রিয়বাদ যুক্ত করে এই বিশ্বাস উৎপন্ন হল যে মোহিনী শক্তিকে আয়ত্ত করতে পারলে ইহজগতে মুক্তি লাভ সম্ভব। উক্ত শক্তিই হল বজ্র আর এই থেকেই বজ্রযান। গূহ্যসমাজতন্ত্র নামক গ্ৰন্থে এই সম্প্রদায়ের মন্ত্র, মুদ্রা, দেবতা, ধ্যান ইত্যাদির তন্ত্রসম্মত উপাচারবিধি ও অনুষ্ঠানের উল্লেখ পাওয়া যায়।
- সহজযান আবার বজ্রযান সাধনার সূক্ষ স্তর বিশেষ। সহজের আক্ষরিক অর্থ হল যা সহজাত অর্থাৎ যা ‘একত্রে জন্মায়’। বস্তুত সহজযানের শিক্ষা কেবলমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিযুক্ত প্রকৃতির দ্বারা পরিচালিত নয়। এটি পালনীয় কঠোর নিয়মানুবর্তিতাও বটে। তাছাড়া সহজযান স্বতঃস্ফূর্ত প্রবৃত্তির দ্বারা বাস্তবতার দিকে পরিচালিত। এই সহজযানের সিদ্ধাচার্যদের অমর সৃষ্টি হল চর্যাপদ।
- এইসব থেকে আসে কালচক্রযান। কালচক্রের অর্থ হল ধ্বংসের চক্র এবং কালচক্র যান হল সেই যান যা কালচক্র বা ধ্বংসের চক্র থেকে রক্ষা করে৷ তিব্বতীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী কালচক্রযানের উদ্ভব হয় প্রধানত ভারতবর্ষের বাইরে শম্ভল নামক স্থানে।
এইভাবে বৌদ্ধ ধর্মের অজস্র বিভাগ, আবার তারও উপবিভাগে বৌদ্ধরা রত থাকে। যে শাক্যসিংহ একদা মানুষের ত্রিতাপ মোচনের প্রচেষ্টা আজীবন পালন করে গেলেন, যিনি ঈশ্বরের অস্তিত্বকে পর্যন্ত অস্বীকার করে মানব মানবীর সম অধিকারের বাণী ধ্বনিত করলেন, তাকে কাজে রূপদান করলেন, যিনি ধনীনির্ধন ভেদে সকলকে কাছে টেনে সাম্যের জীবন্ত উদাহরণ রেখে গেলেন, আমাদের মূঢ়তায় আমরা তাঁর আদর্শকে কোথায় স্থান দিলাম? কেবল কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতীকে?!
এর উত্তর হয়তো দিতে পারেন মৈত্রেয়। আমরা তাঁর আগমনের প্রতীক্ষায়…
[অনেক ব্যতিক্রমী প্রকৃত বুদ্ধঅনুসারী অবশ্যই রয়েছেন। তাঁরা আমার নমস্য]
তথ্যসূত্র
- বিভিন্ন নিকায়, সুত্তবিভঙ্গ ইত্যাদির অংশ।
- ড.মণিকুন্তলা হালদার, বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস, মহাবোধি বুক এজেন্সী৷
- সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বৌদ্ধধর্ম, ডিজিটাল লাইব্রেরি ইন্ডিয়া৷
- ভারতবর্ষ পত্রিকায় প্রকাশিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রবন্ধ।
- রাহুল সাংকৃত্যায়ন, মহামানব বুদ্ধ, চিরায়ত প্রকাশন।
- Anukul Chandra Banerjee, Sarvastivada literature, digitallibraryindia.
- Encyclopaedia of Buddhism.
বাহহ।খুব সুন্দর।ছোট পরিসরে এক যথা সম্ভব সম্যক ও অপ্রভাবিত রচনা। সাধুবাদ।
ধন্যবাদ
খুব ভালো লাগল। দশবত্থুর বিস্তারিত বিবরণ খুব কাজের।
ভবিষ্যতে বজ্রযান সহজযান ইত্যাদি শাখাগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আশা করছি।
খুব ভালো লাগল। দশবত্থুর বিস্তারিত বিবরণ খুব কাজের।
ভবিষ্যতে বজ্রযান সহজযান ইত্যাদি শাখাগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আশা করছি।
বুদ্ধ পরবর্তী বৌদ্ধ ধর্মের বিভাজন সম্পর্কে বেশ সংহত একটি লেখা। এক নিমিষে পড়তে ভালো লাগলো। তবে আফসোসও যে এই বিভাজনের কারণেই বৌদ্ধ ধর্মের প্রবহমান ধারা ক্রমশ ক্ষীণ হয়েছে।
সত্যিই তাই