অওধের এক হতভাগ্য সুলতানের কিসসা
১৮৪৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী অওধের মসনদে বসেন সুলতান আবুল মনসুর মির্জা মোহাম্মদ ওয়াজিদ আলি শাহ (১৮২২-১৮৮৭) । কিন্তু পূর্বের বুরহান-উল-মুলক সাদাত খাঁন কিম্বা সাফদার জং এর আমলের সেই শান-শওকত আর নেই। ১৭৬৪ সালের বক্সার যুদ্ধের পর অওধ সুবার প্রায় অর্ধেক অংশই চলে যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে। পরবর্তীকালে অওধের শাসকরা বাধ্য হন ইংরেজদের সাথে অধীনতামূলক মিত্রতা নীতিতে স্বাক্ষর করতে। এতে নবাবদের দায়িত্ব কিছুটা কমে যায় বটে, তবে এর ফলে নবাবদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিও বহুল অংশে হ্রাস পায়। অবশ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এই বন্ধুত্বের ডাকে সাড়া না দিয়ে নবাবদের কোনো উপায়ও ছিল না। নবাব গাজিউদ্দিন হায়দারের সাথে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃপক্ষের সখ্যতা ছিল। নবাব গাজিউদ্দিন হায়দার (রাজত্বকাল ১৮১৪-১৮২৭) ছিলেন অওধের শেষ নবাব উজির (১৮১৪-১৮১৮) এবং প্রথম স্বাধীন বাদশাহ (১৮১৮-১৮২৭)। এই সুসম্পর্কের জেরেই কোম্পানি নবাবকে দেয় ‘স্বাধীন শাসকের খেতাব’। ফলে অওধের নবাবরা পরিচিতি পায় ‘অওধের স্বাধীন বাদশাহ’ হিসেবে।
সুলতান ওয়াজিদ আলি শাহের পৃষ্টপোষকতায় অওধ সুবার রাজধানী লখনৌ পরিণত হয়েছিল একটি উন্নতমানের সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র হিসাবে। তিনি ছিলেন অওধের দশম এবং শেষ শাসক (১৮৪৭-১৮৫৬)। শাহি খানা-পিনা, নাচ, গান, শায়রি, গজল, মুশায়রা নিয়ে বেশ সুখেই ছিলেন সুলতান। কিন্তু তাঁর সুখ বেশি দিন সইল না। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেশীয় রাজ্যগুলি গ্রাস করতে নিয়ে আসে এক নতুন আইন, যা ‘সত্ত্ববিলোপ আইন’ নামে পরিচিত। এই আইনে বলা হয়, কোনো দেশীয় শাসক সন্তানহীন অবস্থায় মারা গেলে সেই রাজ্য ইংরেজদের অধীনে চলে যাবে। সুলতান ওয়াজিদ আলির উত্তরাধিকারীর অভাব না থাকায় এই নতুন আইন সুলতানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ব্যর্থ হল। এর পরে অওধের সুলতানের বিরুদ্ধে নিয়ে আসা হয় কুশাসনের অভিযোগ। বলা হয় যে, আমোদ-প্রমোদে মত্ত সুলাতন ওয়াজিদ আলি শাহ অওধের জনসাধারণকে সুশাসন দিতে ব্যর্থ। ফলে সুলতানের বিরুদ্ধে কুশাসনের অভিযোগ তুলে পুরানো সব চুক্তি বাতিল করে প্রণীত হয় নতুন আইন।
৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৬। শীতের সন্ধ্যায় লখনৌ-এর জর্দাকোঠি প্রাসাদ সবে আলোতে সেজে উঠেছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে বাইজি নাচের আসর। এমন সময় খবর আসে ইংরেজ রেসিডেন্ট জেনারেল জেমস আউট্রাম সুলতানের সাক্ষাৎ প্রার্থী। খবর শুনে ওয়াজেদ আলির কপালে চিন্তার কালো মেঘ জমে। রেসিডেন্টকে আসতে দেখে সুলতান বুঝতে পেরেছিলেন, ভরা সন্ধ্যায় রেসিডেন্ট নিশ্চয়ই কোনো অশুভ সংবাদ শোনাতে হাজির হয়েছেন।
সুলতান দরবারে প্রবেশ করে রেসিডেন্ট আউট্রাম সাহেব ভনিতা না করে সরাসরি সুলতানের পদচ্যুতির কথা শুনিয়ে দেন সবার উপস্থিতিতে। তিনি জানান, অওধের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন এখন থেকে কোম্পানির অধীন। অওধের রাজস্ব আদায়ও এখন থেকে কোম্পানিই করবে। সুলতানকে বাৎসরিক ভাতা বাবদ ১২ লক্ষ টাকা এবং তাঁর কর্মচারীদের বেতন স্বরূপ আরও ৩ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। রেসিডেন্ট সাহেবের দরবারে আসার উদ্দেশ্য ছিল সুলতানকে এই চুক্তিপত্রের ব্যাপারে অবগত করে তাতে সুলতানের স্বাক্ষর নেওয়া।
পুরো ঘটনাটি এতটাই আকস্বিক ভাবে ঘটে যায় যে, সুলতান ওয়াজিদ আলি হতবাক হয়ে পড়েন। এমন পরিস্থিতির জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না।
সুলতান রেসিডেন্ট সাহেবকে কড়া ভাষায় জানান যে, এমন অন্যায় চুক্তি তিনি মেনে নেবেন না। বিনা অপরাধে তাঁর কাছ থেকে অওধের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। অবশেষে সুলতানকে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করাতে ব্যর্থ হয়ে রেসিডেন্ট আউট্রাম দরবার ত্যাগ করেন। সুলতান ওয়াজিদ আলি শাহ তাঁর সভাসদ ও পরিবার পরিজনদের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করেন, তাঁর প্রতি হওয়া এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুবিচারের আশায় তিনি কলকাতায় গিয়ে গর্ভনর জেনারেলের সাথে দেখা করবেন এবং ন্যায় বিচারের জন্য অনুরোধ করবেন।
১৩ মার্চ ১৮৫৬ সাল। রাজ্যহারা হতভাগ্য সুলতান কলকাতা যাবার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছেন। বিষন্ন ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সুলতানের সঙ্গী হন তাঁর মা মালকা কিশোয়ার বেগম, সঙ্গে সুলতানের কয়েকজন বেগম সহ বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। প্রাসাদে রয়ে যান সুলতানের প্রধান বেগম হজরত মহল সহ তাঁর সন্তানরা।
সুলতান ওয়াজিদ আলি যখন প্রাসাদ ত্যাগ করে লখনৌর রাস্তায় নামেন তখন হাজার হাজার নগরবাসী রাস্তার দুপাশে এক অজানা উৎকণ্ঠায় দাঁড়িয়ে।
‘জাব ছোড় চালে লখনৌ নগরী কাহে হাল কি হাম পার ক্যায়া গুজরি’
সুলতান ওয়াজিদ আলির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, কোনো শক্তিই প্রিয় অওধকে তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।
‘লখনৌ হামপার ফিদা অউর হাম ফিদা-এ-লখনৌ।
কিয়া হে তাকাত্ আসমা কি,হামসে ছুড়ায়ে লখনৌ।’
সুলতান কানপুর, ইলাহাবাদ হয়ে বারাণসী পৌছান। সেখানে কাশীর রাজা ইশ্বরী প্রসাদ সিংহ সুলতান ও তাঁর সঙ্গীদের সম্বধর্না জানান। সুলতান এবং তাঁর সফর সঙ্গীরা বেশ কিছুদিন কাশীর রাজার আতিথেয়তা গ্রহণ করেন এবং ১৮৫৬ সালের ২৫ এপ্রিল স্টিমারে কলকাতা যাবার উদ্দেশ্যে বারাণসী ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করেন।
‘দারো দিওয়ার পে হাসরাৎ সে নজর করতে হ্যায়,
রুখসত্-এ-আহলে ওয়াতন হাম তো সফর করতে হ্যায়।’
অবশেষে সুলতান ওয়াজিদ আলি শাহ তাঁর পারিষদবর্গ সহ কলকাতা পৌঁছান ১৮৫৬ সালের ৩ মে৷ কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সুলতান ওয়াজিদ আলি শাহের কলকাতা আগমন ভাল চোখে দেখেনি। ফলে সুলতান কোম্পানির কাছে তাঁর প্রাপ্য সম্মান পেলেন না। ওয়াজিদ আলি শাহ ফোর্ট উইলিয়ামে গিয়ে গভর্নর জেনারেলের সাথে দেখা করেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয় না। ফলে সুলতান হতাশায় মানসিক ও শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এদিকে হঠাৎ করেই সুলতানের কলকাতা আগমনের ফলে তাঁর জন্য কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কোনো বাসস্থানের সংস্থান করতে পারেনি, তাই কলকাতায় এসে কয়েকদিন তাঁকে স্টিমারেই কাটাতে হয়। এর মধ্যেই সুলতানের জন্য বাড়ি খোঁজা শুরু হয়। কলকাতার তিন-চার মাইল দক্ষিণে গার্ডেনরিচ নামক স্থানে কোম্পানির বেশ কয়েকটি বড়ো বড়ো বাড়ি ছিল, কোম্পানি সুলতানকে সেগুলি দান করলে সুলতানের বাসস্থান সমস্যার সমাধান হয়। গার্ডেনরিচ অঞ্চলে একটি মাটির বড়ো ঢিবি থাকায় সুলতান ওয়াজিদ আলি এই অঞ্চলের নাম রাখেন মাটিয়াবুর্জ; পরবর্তীতে তা মেটিয়াবুরুজে পরিণত হয়।
সুলতান মেটিয়াবুরুজে থাকতে শুরু করলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ পুনরায় সুলতানের কাছে পুরানো প্রস্তাব নিয়ে আসে। তাঁকে আবার অনুরোধ করা হয় চুক্তি মেনে নিয়ে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে। কিন্তু সুলতান ওয়াজিদ আলি শাহ নিজ সিদ্ধান্তে অনড় থেকে যান। সুবিচারের আশায় মহারানি ভিক্টোরিয়ার সাথে দেখা করে তাঁর কাছে এই অন্যায়ের প্রতিকার চাইবার জন্য লন্ডন যাওয়া স্থির হয়। পরিস্থিতির চাপে পড়ে সুলতান ওয়াজিদ আলি শাহ শয্যাগত; তাই সিদ্ধান্ত হয়ে সুলতানের হয়ে রানির কাছে যাবেন তাঁর মা মালকা কিশোয়ার বেগম; সঙ্গে সুলতান ওয়াজিদ আলির ভাই এবং পুত্র সহ কিছু গন্যমান্য ব্যাক্তি।
এদিকে ক্লান্ত সুলতানের জন্মভূমি লখনৌতে ফিরে যাবার জন্য মন ব্যকুল হয়ে উঠতো।
‘আয়ে না মেরে পাস তো মে আপ হি চালু,
মুঝকো খুদাকারে কাহি বুলায়ে লখনৌ।’
১৮৫৭ সাল। সুলতান কলকাতায় থাকতেই শুরু হয়ে যায় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেশীয় সিপাহীদের বিদ্রোহ। বাংলায় শুরু হলেও সেই বিদ্রোহের আগুন দ্রুত ভারতের অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়ে। নেতৃত্বহীন সিপাহীরা রাজ্যচ্যুত সুলতান ওয়াজিদ আলি শাহের সমর্থন এবং নেতৃত্ব কামনা করলেও ওয়াজিদ আলি বিদ্রোহীদের ডাকে সাড়া দেন না। সুলতানের সম্ভবত মনে হয়েছিল, বিদ্রোহী সিপাহীদের সামর্থন জানালে তিনি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃপক্ষের ক্রোধের কারণ হবেন। ফলে তাঁর হারানো রাজ্য পুনুরুদ্ধারের শেষ আশাটুকু নিভে যাবে। তাই তিনি সব ঘটনা গভর্নর জেনারেলকে জানিয়ে দেন। সব শুনে গভর্নর জেনারেল সম্ভবত অনুমান করেছিলেন, সুলতানের মন যে কোনো মুহূর্তে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই সিপাহী বিদ্রোহ চলাকালীন সময়ে সুলতানকে ফোর্ট উইলিয়ামে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
‘হুয়ে কেইদ ইস তারহা হাম বে গুনহা
আসিরো মে হে নাম হে বাদশাহ’।
অন্যদিকে লন্ডনে অওধ রাজ্যের যে মোকদ্দমা উপস্থিত হয়েছিল তাও মুলতুবি রাখা হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, যে রাজ্য প্রাপ্তির দাবি করা হচ্ছে তা বর্তমানে ইংরেজদের অধীনে নেই। তা এখন বিদ্রোহীদের কবলে চলে গিয়েছে, অওধ রাজ্য আবার ইংরেজদের অধিকারে এলে তা নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সুলতান গৃহবন্দী থাকা অবস্থাতে বিদ্রোহ দমিত হয়। অন্যদিকে অওধ রাজ্য আবার ইংরেজদের দখলে আসে, মামলা পুনরায় চালু হয়। লন্ডনে অবস্থিত সুলতানের মুখতার-এ-আম মসীহউদ্দীন খাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, মামলা তাঁরা জিতবেনই।
কিন্তু এদিকে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ামে থাকার সময় সুলতানের মুসাহিব ও পরামর্শদাতারা এক ষড়যন্ত্র করে। তারা উপলব্ধি করেছিল, মামলা জিতে গেলে সুলতানের কাছে তাদের গুরুত্ব কমে যাবে। ফলে তারা সবাই মিলিত হয়ে সুলতানকে বোঝাতে শুরু করে, কোম্পানি বাহাদুর কোনো রাজ্য দখল করলে তা আর ফেরত দেয় না। তাই কোনো ভাবেই এ মামলা জেতা সম্ভব নয়। অন্যদিকে সুলতান কলকাতায় প্রায় দেড় দুই বছর ধরে থাকায় কোনো আয় হয়নি। সুলতান যে অর্থ সাথে এনেছিলেন তাও প্রায় শেষ। বহু কর্মচারীর বেতন দীর্ঘদিন ধরে আটকে ছিল, ফলে সুলতান ওয়াজিদ আলি শাহ সব দিক ভেবে চিন্তে তাঁর হারানো রাজ্যের মায়া ত্যাগ করেন। এবং সিদ্ধান্ত নেন কোম্পানির সব দাবী মেনে নিয়ে তিনি চুক্তি পত্রে স্বাক্ষর করবেন।
সুলতান এবার তাঁর পরিষদবর্গের সাথে পরামর্শ করে ভাইসরয়কে লেখেন ‘ইংরেজ সরকার প্রস্তাবিত পেনশনে আমার স্বীকৃতি জানাচ্ছি। সুতরাং আজ পর্যন্ত আমার প্রাপ্য সমস্ত বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হোক এবং লন্ডনে আওধ রাজ্যর অধীকার প্রাপ্তি নিয়ে যে মামলা চলছে তা বাতিল করা হোক।’
এর উত্তরে সুলতানকে জানানো হয়, পূর্বের কোনো বকেয়া বেতন সুলতানকে দেওয়া হবে না। সুলতান ওয়াজিদ আলি যখন থেকে প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন তখন থেকেই তার বেতন শুরু হবে। সাথে আরও বলা হয়, এখন থেকে বছরে শুধুমাত্র ১২ লক্ষ টাকায় দেওয়া হবে; সুলতানের কর্মচারীদের বেতন বাবদ বছরে যে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার কথা ছিল তাও বাতিল করা হয়। সব শুনে সুলতান ক্ষোভে ফেটে পড়েন। কিন্তু তাঁর সভাসদরা তাঁকে কোম্পানির সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন, কারণ তা না হলে সুলতানের রাজ্য এবং পেনশন দুই হারানোর সম্ভবনা তৈরি হতে পারে, ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই ওয়াজিদ আলি শাহ এই নতুন বন্দোবস্ত মেনে নেন।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডে সুলতানের চিঠি পেয়ে মামলা বাতিল হয়ে যায়। ফলে সুলতানের ইংল্যান্ড পাঠানো প্রতিনিধি দল হতাশ হয়ে কলকাতায় ফেরার সিন্ধান্ত নেন। ফেরার পথে হতাশা ও অপমানে জর্জরিত সুলতানের মা মালকা কিশোয়ার বেগম মৃত্যু বরণ করেন। তার কিছু দিনের মধ্যে সুলতানের ভাইও মায়ের মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে যাত্রা পথেই অসুস্থ হয়ে মারা যান। বাকি প্রতিনিধি দল ফিরে আসে কলকাতায়।
এর মধ্যে সুলতান ওয়াজিদ আলি ফোর্ট উইলিয়াম থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসেন মেটিয়াবুরুজে। নবাবের ভাগ্য ভাল ছিল; তিনি বিদ্রোহের আগেই কলকাতা চলে এসেছিলেন। বিদ্রোহ চলাকালীন সময়ে লখনৌতে থাকলে হয়ত এই শেষ সম্মানটুকুও জুটত না। তাঁর অবস্থা দিল্লির বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরের চেয়েও খারাপ হতে পারত। কারণ লখনৌতে বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সুলতানের প্রধান পত্নী বেগম হজরত মহল।
সুলতানের হারানো রাজ্য ফিরে পাবার আশা ব্যর্থতায় পরিণত হয়। তিনি আর লখনৌতে ফিরতে চান না। যে অওধ রাজ্য একদিন তাঁর ছিল আজ তা বিদেশী শক্তির কবলে। তাই সুলতান ওয়াজিদ আলি শাহ সিদ্ধান্ত নেন জীবনের বাকি দিনগুলি তিনি কলকাতার মেটিয়াবুরুজেই কাটাবেন। ফলে মেটিয়াবুরুজকে গড়ে তোলা হয় লখনৌর আদলে ‘ছোটো লখনৌ’ হিসেবে। তবুও সুলতানের হৃদয়ে আঁকা লখনৌ এর স্মৃতি মাঝে মধ্যেই তাঁকে বিচলিত করে তুলত।
‘হার-চান্দ লাখ তারা ভুলাতা হু ইয়াদ কো
‘আখতার’ পুকার উঠা হে দিল হায়ে লখনৌ’।
একদা অওধের সুলতান আজ নির্বাসনে। সুলতান ওয়াজিদ আলি শাহ নিজেও জানতেন না তাঁর এই করুণ পরিণতির কারণ কী ছিল। সুলতান জীবনের বাকি দিনগুলি এই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজে গেছেন।
‘হুয়ে মুঝসে কাব তার্ক সাম ওয়া সালাত
মে হার সাল দেতাহু খামস ওয়া জাকাত।
তুঝে ইলম হে য়ে সামি ওয়া বসির
তেরি জাত তো হে আলিম ওয়া খাবির।
তু হে আলিম-উল-গায়েব য়ে কিবরিয়া
নেহি মুঝপে ওয়াজিব নামাজে কাযা।
চোর ঘর লুটে শাহ বান্ধা যায়
মেরি পাবান্দী কি হে ইয়ে সুরাত’।
তথ্য সহায়তা:
১) পুরানো লখনঊ –আবদুল হালীম ‘শরর’, অনুবাদ গুরুদাস ভট্টাচার্য ও মুনীরা খাতুন।
২) Rosie Llewellyn-Jones, The Last King in India: Wajid Ali Shah.
৩) অনিল তপাদার, কলকাতার ছোটো লখনৌ৷
৪) দিলীপ কুমার মুখোপাধ্যায়, অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ৷
৫) শ্রীপান্থ, মেটিয়াবুরুজের নবাব –
Websites
১) https://www.rekhta.org/poets/wajid-ali-shah-akhtar/couplets
২) http://autarmota.blogspot.in/2014/11/was-wajid-ali-shah-last-nawab-of-awadh.html
কৃতজ্ঞতা স্বীকার
১) মনজিলাত ফাতিমা (নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ্র বংশধর )।
‘ইতিহাস আড্ডা’ পোর্টালে প্রকাশিত এই নিবন্ধটি অযোধ্যার (অবধ) শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ-এর ট্র্যাজিক জীবনকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছে। একজন শাসক হিসেবে তার ব্যর্থতা বনাম একজন শিল্পী হিসেবে তার শ্রেষ্ঠত্ব—এই চিরন্তন দ্বন্দ্বটি এখানে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
পর্যালোচনার মূল দিকসমূহ:
* আবেগঘন আখ্যান: লেখক কেবল তথ্য পরিবেশন করেননি, বরং নবাবের মেটিয়াবুরুজের নির্বাসিত জীবন এবং তার লখনউ ত্যাগের করুণ দৃশ্যটি যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তা পাঠকের মনে গভীর সহানুভূতির উদ্রেক করে।
* রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ব্রিটিশদের ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ এবং ডালহৌসির চক্রান্তের বিষয়টি নিবন্ধে যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছে। এটি স্পষ্ট করে যে, নবাবের পতন কেবল তার বিলাসিতার ফল ছিল না, বরং তা ছিল একটি পরিকল্পিত ঔপনিবেশিক আগ্রাসন।
* শিল্পীর মূল্যায়ন: ঠুমরি ও কত্থক নৃত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নবাবের অবদানকে এখানে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একজন ‘বিলাসী রাজা’র আড়ালে যে একনিষ্ঠ ‘সংস্কৃতি সাধক’ লুকিয়ে ছিলেন, নিবন্ধটি তা সার্থকভাবে প্রমাণ করে।
উন্নতির অবকাশ:
নিবন্ধটি সাধারণ পাঠকদের জন্য চমৎকার হলেও, ঐতিহাসিক গবেষণার খাতিরে যদি নবাবের প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সেই সময়ের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক আলোচনা থাকত, তবে এটি আরও বস্তুনিষ্ঠ (Objective) হয়ে উঠত। এছাড়া কিছু রেফারেন্স বা তথ্যসূত্রের উল্লেখ থাকলে লেখাটির ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বেড়ে যেত।
সামগ্রিকভাবে, নিবন্ধটি ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায়কে অত্যন্ত ঝরঝরে এবং সহজবোধ্য ভাষায় সাধারণ মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে। এটি কেবল একজন সুলতানের পতন নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতির নির্বাসনের গল্প।
ভালো লাগলো লেখাটি। আমার একটি প্রিয় বিষয় ওয়াজেদ আলী র জীবন । যে তথ্যসূত্র দিয়েছেন তাই ধরে আরেকটু এগোব। ধন্যবাদ।