ভারতে পর্তুগিজ বনাম ওলন্দাজ বাণিজ্যের সাতকাহন ও ইংরেজরা
পঞ্চদশ শতকের শুরুর দিক। দিল্লি সুলতানির শেষের শুরু। বিদেশি আক্রমণ, কলহ-বিবাদে ভারতের রাজনৈতিক আকাশ তখন মেঘাচ্ছন্ন। এমন এক সময় ভারত থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে ইউরোপের এক ছোট্ট দেশ পর্তুগালের সাহসী জাহাজ জিব্রাল্টার প্রণালী পার হয়ে মরক্কোর সেউটায় এক উপনিবেশ (১৪১৫ সাধারণাব্দ) তৈরি করে ফেলে। আফ্রিকায় প্রথম ইউরোপীয় উপনিবেশ। পরবর্তী ৮০ বছরের মধ্যে কেপ ভার্দে, ঘানার এলমিনা, মোজাম্বিক দখল করে দাস ব্যবসা, অন্যান্য পণ্য ও স্বর্ণ বাণিজ্যের হাত ধরে পর্তুগিজদের ব্যবসায়িক রমরমার চূড়ান্ত অবস্থা। আর যেদিন উত্তমাশা অন্তরীপ পার হওয়ার জাদুকাঠির সন্ধান পাওয়া গেল, তার পর তো দ্রুতবেগে পর্তুগিজ নৃশংসতায় ভর করে পূর্ব আফ্রিকার মোম্বাসা, কিলওয়া, সোফালা – একের পর এক বাণিজ্য ঘাঁটিতে পর্তুগিজ পতাকা উড়তে থাকে। সোফালা বন্দরে এসে ভাস্কো দা গামা ভারতীয় নাবিকদের দেখা পান। এদেরই সাহায্য নিয়ে তিনি প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে সমুদ্রপথে দক্ষিণ ভারতের কেরল উপকূলের কালিকটে (বর্তমান কোঝিকোড়) এসে পৌঁছোন। তারিখ ছিল ২০ মে, ১৪৯৮ সাধারণাব্দ। তখন উত্তর ভারতের দিল্লিতে দুর্বল লোদিদের শাসনে ইতিমধ্যেই ব্যবসা বাণিজ্যের গঙ্গাপ্রাপ্তি হয়ে গেছে, আর দখিন দেশের সমৃদ্ধ রাজ্য কালিকটের হিন্দু রাজা জামোরিন বৈদেশিক বাণিজ্যের আশায় স্বয়ং ভাস্কো দা-গামাকে স্বাগত জানাচ্ছেন।

চিত্র: ১৫০২ সালে তৈরি পর্তুগিজ মানচিত্র (চিত্রঋণ- ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক)
কিন্তু পর্তুগিজরা কেবল বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ভারতে আসেনি, বরং তারা শীঘ্রই ভারতের রাজনৈতিক ডামাডোল বুঝে নিয়ে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে উঠেপড়ে লেগে যায়। ১৫০৩ সালের মধ্যে তারা কোচিনে প্রথম ইউরোপীয় দুর্গ নির্মাণ করে ফেলে। ভারত মহাসাগরে একাধিপত্যের আশায় ভারতবর্ষের সমগ্র পশ্চিম উপকূল অর্থাৎ কেরল থেকে গুজরাত পর্যন্ত অঞ্চল পর্তুগিজ প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসতে সচেষ্ট হয়। এই অতিসক্রিয়তায় এবারে ভারতীয়, আরব ও মিশরীয় (মামেলুক) বণিকদের টনক নড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরেই আরব সাগর-ভারত মহাসাগর অঞ্চলে আরব-মামেলুক বণিকেরা একচেটিয়া বাণিজ্য করে আসছিল। বিনা বাধায় পর্তুগিজদের হাতে তা ছেড়ে দিতে তারা রাজি ছিল না। ইতিমধ্যেই পর্তুগিজ দৌরাত্ম্যে কায়রো ও ভেনিস ইউরোপে মশলা সরবরাহের একচাটিয়া নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। তাই আসন্ন বিপদের আঁচ পেয়ে আরব-মিশরীয় বণিকেরা রুখে দাঁড়াতে মনস্থ করে। অপরদিকে গুজরাত ছিল সেসময় ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী সামুদ্রিক বাণিজ্যের পৃষ্ঠভূমি। ফলে গুজরাত রাজেরও পরিস্থিতি বুঝতে দেরি হয়নি। সময়ের দাবি মেনে নিয়ে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে এক অস্বাভাবিক আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তোলার তোড়জোড় শুরু হয়।
১৫০৮ সাধারণাব্দে গুজরাতের সুলতান মাহমুদ বেগড়া এবং কায়রোর মিশরীয় মামেলুক সুলতানি পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে একজোট হয়, যে জোটের নেতৃত্বে ছিলেন আমির হুসেন আল-কুরদি। অন্যদিকে পর্তুগিজদের সেনাপতি ছিলেন ভাইসরয় ফ্রান্সিসকো দে আলমেইদার পুত্র ডম লরেনসো দে আলমেইদা। সমুদ্র আধিপত্য নিয়ে এদের মধ্যে গুজরাত উপকূলের চাউল নামে জায়গায় প্রচণ্ড এক নৌযুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে গুজরাত-মিশরীয় জোট যে শুধু জিতে যায় তাই নয়, পর্তুগিজ সেনাপতি ডম লরেনসো দে আলমেইদা নিহত হন। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই প্রথম অপ্রতিরোধ্য পর্তুগিজরা হারের মুখ দেখল, কিন্তু নাছোড় তারা ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ১৫০৯ সালেই দিউ-র যুদ্ধে উক্ত জোটকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে ফেলে। নিজেদের শক্তি সংহত করার উদ্দেশ্যে এর এক বছরের মাথায় ১৫১০ সালে পর্তুগিজ গভর্নর আলফনসো ডি আলবুকার্ক বিজাপুরের সুলতানের কাছ থেকে গোয়া ছিনিয়ে নেন। অচিরে এটিই পর্তুগিজদের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। ভারত মহাসাগর-আরব সাগর অঞ্চলে পরবর্তী একশ বছরে পর্তুগিজদের চ্যালেঞ্জ করার আর কেউ রইল না। সমগ্র সমুদ্র জুড়ে তারা বিনা বাধায় কার্তাজ প্রথা (জবরদস্তিমূলক নৌশুল্ক) চালু করে একচেটিয়া ব্যবসা করতে থাকে।
পর্তুগিজ বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক সরকারি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হত। লিসবন ছিল তাদের ইউরোপীয় সদর দপ্তর। এশিয়ায় তাদের মূল কেন্দ্র ছিল গোয়া (ভারত), ম্যাকাও (চিন) এবং মালাক্কা (মালয়েশিয়া)। তারা ব্রাজিল থেকে সোনা, আফ্রিকা থেকে হাতির দাঁত ও দাস এবং এশিয়া থেকে মশলা সংগ্রহ করে লিসবনে পাঠাত। ভারতে দাস ব্যবসার দিকেও নজর ছিল তাদের। এব্যাপারে বাংলার হুগলি, সন্দ্বীপ ও চট্টগ্রাম ছিল তাদের মূল শিকারভূমি।
প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, পর্তুগালের রাজতন্ত্র পর্তুগিজ নৌ-বাণিজ্যের লভ্যাংশে সরাসরি ভাগ বসানোর উদ্দেশ্যে চার্চ এবং সামরিক কর্তৃত্বকে একসঙ্গে মিশিয়ে গোয়ায় ‘এস্তাদু দা ইন্দিয়া’ (Estado da India) গঠন করেছিল, ইংরেজ (EIC) বা ওলন্দাজদের (VOC) মত কেবলমাত্র বাণিজ্যভিত্তিক কর্পোরেট কাঠামো তৈরির কথা তাদের মাথাতেই আসেনি।
মুশকিলটা এখানেই হল। রাজতন্ত্র ও চার্চের সরাসরি সমর্থনে ‘এস্তাদু দা ইন্দিয়া’ নিখাদ ব্যবসার বাইরে বাকি সব ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা শুরু করল। জোর করে ধর্মান্তরকরণ, জলদস্যুতা, সাধারণ ভারতীয়দের ধরে নিয়ে গিয়ে দাস ব্যবসা, সর্বোপরি কার্তাজ ব্যবস্থা পর্তুগিজদের গ্রহণযোগ্যতা একেবারে তলানিতে নিয়ে গেল, যা তাদের আগ্রাসী বাণিজ্যিক বিস্তারের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল।
কার্তাজ ব্যবস্থা ছিল এক ধরণের সমুদ্র লাইসেন্স। পর্তুগিজদের অনুমতিপত্র ছাড়া ভারত মহাসাগরে অন্য কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারত না। সমুদ্র জুড়ে পর্তুগিজদের তীব্র নজরদারি ও দখলদারি কায়েম ছিল। অন্য কোনো জাহাজ দেখলেই লুটপাট করে তা ডুবিয়ে দেওয়া হত। এমনকি মোগল জাহাজ বা তীর্থযাত্রীদের জাহাজও ছাড় পেত না। তাৎক্ষণিকভাবে এতে বাণিজ্যিক একাধিপত্য বিস্তার হলেও এর সুদূরপ্রসারী ফল পর্তুগিজদের পক্ষে মারাত্মক হয়েছিল। তারা দ্রুত স্থানীয় সহানুভূতি এবং রাজনৈতিক সমর্থন হারিয়ে ফেলে।
মোগল সম্রাটরা প্রথমদিকে পর্তুগিজদের নিয়ে যথেষ্ট কৌতূহলী ছিলেন। সম্রাট আকবর তাঁর দরবারে সর্বধর্ম আলোচনা সভায় গোয়া থেকে জেসুইট পাদ্রিদের আমন্ত্রণ জানাতেন। কিন্তু মোগল জাহাজ থেকে কার্তেজ দাবি করায় এবং মক্কার তীর্থযাত্রীদের জাহাজ ডুবিয়ে দেবার ঘটনায় তিনি পরবর্তীকালে পর্তুগিজদের প্রতি যথেষ্ট বিরক্ত হন।
ইতিমধ্যে ভারতে ইউরোপীয় বাণিজ্যে দ্রুত পটপরিবর্তন হচ্ছিল। ইংল্যান্ডে ১৬০০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠিত হয়। নেদারল্যান্ডসেও ১৬০২ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি VOC (Vereenigde Oost-Indische Compagnie) তৈরি করা হয়। কিছুদিন পরে ১৬৬৪ সালে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (Compagnie francaise des Indes Orientales) আত্মপ্রকাশ করে। এদের সকলের নজর তখন ভারত তথা এশিয়া মহাদেশের বিপুল সম্পদের দিকে।
১৬০৮ সালে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিন্সের নেতৃত্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গুজরাতের সুরাতে ঘাঁটি গাড়ে। ইংরেজরা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে প্রথামাফিক উপঢৌকন দিয়ে বাণিজ্যিক ঘাঁটি তৈরির অনুমতি চাইল। কিন্তু সুরাতে পর্তুগিজদের বাণিজ্য কুঠি আগে থেকেই ছিল। স্বাভাবিকভাবেই তারা ব্যবসায়িক আধিপত্য হারানোর ভয়ে ইংরেজদের আটকাতে চাইবে। ফলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। ১৬১২ সালে সুয়ালি হোলের যুদ্ধে ক্যাপ্টেন থমাস বেস্টের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনি পর্তুগিজদের হারিয়ে দেয়। মোগল জাহাজ লুট আর জবরদস্তি ধর্ম পরিবর্তনের কারণে সম্রাট জাহাঙ্গীর আগে থেকেই পর্তুগিজদের উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। ফলে এই জয় জাহাঙ্গীরের নজরে ইংরেজদের মর্যাদা বাড়িয়ে তোলে যা নিকট ভবিষ্যতে তাদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক হয়েছিল। পর্তুগিজ-মোগল সম্পর্কের অবনতি চরম পর্যায়ে পৌঁছায় যখন বাংলায় পর্তুগিজদের অনৈতিক দাস ব্যবসা ও উদ্ধত আচরণের জন্য সম্রাট শাহজাহান ১৬৩২ সালে তাদের হুগলি ঘাঁটি আক্রমণ করে ছারখার করে দেন।

১৬০২ সালে বর্তমান অন্ধ্রের মসুলিপত্তনমে প্রথম ওলন্দাজ (ডাচ) বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয়। এশিয়াতে পর্তুগিজদের একচেটিয়া সামুদ্রিক দাদাগিরি হটাতে সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক ছিল এই ওলন্দাজরা। এই দুই ইউরোপীয় শক্তির প্রধান সংঘাত-ক্ষেত্র ছিল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মশলা দ্বীপপুঞ্জ (ইন্দোনেশিয়া) এবং ভারতের মালাবার উপকূল। ১৬৪১ সালের মধ্যে ওলন্দাজরা পর্তুগিজদের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রধান কৌশলগত কেন্দ্র মালাক্কা দখল করে বসে। এর ফলে এই অঞ্চলে পর্তুগিজ বাণিজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। এখানেই শেষ নয়। ১৬৫৮ সালে ওলন্দাজরা পর্তুগিজদের কাছ থেকে সিলোন (সিংহল) ছিনিয়ে নেয় যা ছিল পর্তুগিজ দারচিনি ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র। এরপর ১৬৬৩ সালে দক্ষিণ ভারতের কোচিন থেকেও পর্তুগিজরা বিতাড়িত হয়। প্রতিপক্ষ সেই একই—ওলন্দাজ VOC। এর ফলে ভারতের মূল ভূখণ্ডের গোয়া, দমন ও দিউ-তে পর্তুগিজ আধিপত্য সীমিত হয়ে পড়ে, সেই সঙ্গে তারা চিরদিনের মতো ভারত মহাসাগরের একচেটিয়া আধিপত্য হারায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাকি ইউরোপীয় শক্তিদের থেকে এক শতাব্দী আগে শুরু করেও শেষ পর্যন্ত পর্তুগিজরা এই বাণিজ্যিক লড়াইয়ে টিকতে পারল না কেন? আসলে পর্তুগিজ ব্যবসায়ে কর্পোরেট সংস্কৃতির অভাব থাকায় তারা বাণিজ্যিক স্বার্থের চেয়েও অন্য বিষয়গুলিতে বেশি জড়িয়ে পড়েছিল। যেমন, জোর করে স্থানীয়দের ধর্মান্তরকরণ, স্থানীয় মহিলাদের সঙ্গে জবরদস্তি মেলামেশার মাধ্যমে মিশ্র জাতি গড়ে তোলার চেষ্টা, দাসব্যবসা ও জলদস্যুতার বাড়াবাড়ি—এসব কারণে স্থানীয় সমর্থন বা বাণিজ্যিক একাগ্রতা, কোনটাই তাদের পক্ষে ছিল না। আবার ডাচ ও ব্রিটিশদের উন্নত নৌ-কৌশল মোকাবিলার মত পারদর্শিতা তারা দেখাতে পারেনি। দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রাজিল আবিষ্কারের পরে পর্তুগাল সরকারের মনোযোগ ভারতের চেয়ে ব্রাজিলের দিকে বেশি যায়, ফলে এসব পরাজয় নিয়ে হয়তো তারা খুব একটা মাথা ঘামায়নি।
পর্তুগিজদের পরাজয়ের শূন্যতা সাময়িকভাবে পূরণ করেছিল ওলন্দাজরা। মসুলিপত্তনমের পর তারা পুলিকট (১৬১০), সুরাত (১৬১৬), বিমলীপত্তনম (১৬৪১) এবং বাংলার চুঁচুড়ায় (১৬৬৩) শক্তিশালী বাণিজ্য ঘাঁটি গড়ে তোলে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে দক্ষিণ ভারতের বস্ত্রশিল্পকে পাখির চোখ করে ১৬৯০ সাধারণাব্দে ওলন্দাজরা নাগাপত্তনমকে তাদের মূল কেন্দ্রে পরিণত করে। এর কারণ ছিল। ওলন্দাজদের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার (ইন্দোনেশিয়া) মশলার বাজারে আধিপত্য স্থাপন করা। সেই বাণিজ্যের কাঁচামাল হিসেবে ভারতীয় বস্ত্রের গুরুত্ব বুঝতে পেরে তারা ভারতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা শুরু করে।
ওলন্দাজ বাণিজ্যের এই আন্তঃএশীয় বাণিজ্য মডেলটি ছিল তৎকালীন বিশ্ব অর্থনীতির এক অভূতপূর্ব আবিষ্কার। তারা ইউরোপ থেকে সোনা-রুপো বা নগদ অর্থ আমদানি নির্ভর বাণিজ্য মডেলের পরিবর্তে এশিয়ার এক প্রান্তের পণ্য অন্য প্রান্তে বিক্রি করে সর্বাধিক মুনাফা তৈরির এক স্বয়ংসম্পূর্ণ মডেল গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়। এশিয়ার তিন প্রান্ত তাদের এই মডেলের তিনটি স্তম্ভ ছিল। ভারত, জাপান-চীন এবং ইন্দোনেশিয়া। করমণ্ডল উপকূল, বাংলা এবং গুজরাত থেকে তারা উন্নত সুতিবস্ত্র যেমন- ক্যালিকো, মসলিন ইত্যাদি, সেই সঙ্গে বারুদের জন্য প্রয়োজনীয় সোরা সংগ্রহ করত। তারা কিন্তু ভারত থেকে সংগ্রহ করা বস্ত্রের একটা বড়ো অংশ ইউরোপে না পাঠিয়ে জাপানে রপ্তানি করত। একমাত্র নাগাসাকিতে এই লেনদেন চলত। জাপানের অভিজাত সমাজের কাছে ভারতীয় দামী কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা ছিল। ভারতীয় সুতিবস্ত্র আর চীনা রেশম বিক্রির বিনিময়ে জাপান থেকে তারা পেত তামা, রুপো ও সোনা (কোবান নামে জাপানি মুদ্রা)। চীন থেকে তাদের মূল সংগ্রহ ছিল রেশম ও চীনামাটি। ভারত থেকে সংগৃহীত বস্ত্রের চাহিদা মশলা দ্বীপপুঞ্জে (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) এত বেশি ছিল, সেখানকার মশলা চাষিরা ভারতীয় বস্ত্রের বিনিময়ে মশলা দিতে কার্পণ্য করত না। জাপান থেকে পাওয়া তামা, রুপো ও সোনা ওলন্দাজরা আবার ভারতে নিয়ে আসত। ভারতে মুদ্রাস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের কারণে এসব মূল্যবান ধাতুর প্রচুর চাহিদা তৈরি হয়। ফলে এসব ধাতুর বিনিময়ে ওলন্দাজ বণিকেরা আবার বস্ত্র সমেত অন্যান্য ভারতীয় পণ্য যথেষ্ট সুলভে কিনে নিত। এই বাণিজ্য মডেলের সর্বশেষ অংশে তারা সংগৃহীত মশলা (লবঙ্গ, জায়ফল, গোলমরিচ, দারচিনি ইত্যাদি) এবং রেশম ও মসলিন ইউরোপে পাঠাত। এই অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক পরিকল্পনার ফলে ইউরোপীয় বিনিয়োগের উপর তাদের লাভের হার অন্য সমকক্ষ কোম্পানিগুলির তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
ওলন্দাজদের এই বাণিজ্য মডেলটি ইউরোপে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ইংরেজ সহ অন্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি যখন সোনা-রুপোর জন্য লন্ডনের মুখাপেক্ষী থাকত, ওলন্দাজরা কিন্তু এশিয়ার ভেতরেই সম্পদ তৈরি করতে শিখে গিয়েছিল। এছাড়া তাদের আরও কয়েকটি সুবিধা ছিল। এশিয়াতে ওলন্দাজদের নিজস্ব টাঁকশাল ছিল এবং তারা বিভিন্ন দেশের মুদ্রামানের পার্থক্য থেকে অর্থাৎ এক্সচেঞ্জ রেট থেকে লাভ করতে জানত। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সপ্তদশ শতকে ওলন্দাজদের জাহাজের সংখ্যা বাকি সব ইউরোপীয় শক্তির সম্মিলিত জাহাজের সংখ্যার থেকে বেশি ছিল। যদিও এগুলি যুদ্ধজাহাজ নয়, প্রায় সবই ‘ফ্লুইট’ ধরণের পরিবহণ জাহাজ যা তাদের দ্রুত পণ্য পরিবহণে সাহায্য করত। জাভার বাটাভিয়া (বর্তমান জাকার্তা) ছিল এই পুরো এশীয় নেটওয়ার্কের স্নায়ুকেন্দ্র। এখান থেকেই সমস্ত রুটের জাহাজ নিয়ন্ত্রণ করা হত।
এ প্রসঙ্গে ওলন্দাজদের আরেকটি কৌশলগত সুবিধার কথা না বললেই নয়। ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা VOC ছিল সপ্তদশ শতকের একমাত্র ইউরোপীয় শক্তি, যারা জাপানের সঙ্গে বিশেষ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। জাপানের ‘সাকোকু’ বা বাকি পৃথিবীর থেকে বিচ্ছিন্নতা নীতির সময়ও একমাত্র ওলন্দাজদের জন্য জাপান নিজের দরজা খুলে রেখেছিল। নাগাসাকি থেকে ওলন্দাজদের সোনা, রুপো ও তামার বুলিয়ন (Bullion) বা বার সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং কৌশলগত। জাপানি শোগুনরা সাকোকু নীতির মাধ্যমে সমস্ত বিদেশীদের তাদের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ন্যূনতম যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে তারা নাগাসাকি বন্দরে দেজিমা নামে এক কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে রাখে। ওলন্দাজরা কেবলমাত্র এই ছোট্ট দ্বীপ থেকেই তাদের জাপানি বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারত। এটি ছিল জাপানের সাথে বিশ্বের একমাত্র সংযোগস্থল। আগেই বলা হয়েছে ওলন্দাজরা ভারতীয় ও চীনা পণ্যের বিনিময়ে জাপান থেকে মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করত। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময় জাপানি রুপোর রপ্তানি কমে গেলে ওলন্দাজদের মূল লক্ষ্য হয় তামা। এই তামা তারা ভারতে নিয়ে আসত। ভারতে তখন মুদ্রাস্ফীতির কারণে তামার মুদ্রার চল বাড়ছিল, সেই সঙ্গে বিভিন্ন মন্দিরে মূর্তি ও অন্যান্য ভাস্কর্য তৈরি এবং কামান ঢালাইয়ের জন্য তামার চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে গিয়েছিল। তামা ওলন্দাজদের ভারত ও ইউরোপে বিশাল মুনাফার অন্যতম মাধ্যমে পরিণত হয়। সোনাও কিন্তু এ ব্যাপারে পিছিয়ে ছিল না। ১৬৭০ সাধারণাব্দ নাগাদ ওলন্দাজরা জাপান থেকে প্রচুর পরিমাণে স্বর্ণমুদ্রা বা কোবান সংগ্রহ করা শুরু করে। এর পেছনেও অর্থনৈতিক কারণ ছিল। জাপানে তখন সোনার দাম ছিল বিশ্ববাজারের তুলনায় অনেকটা কম। তাই ওলন্দাজরা এই সোনা জোগাড় করে দক্ষিণ ভারতের পুলিকট বা নাগাপত্তনমে নিয়ে এসে সেখানকার স্থানীয় স্বর্ণমুদ্রা প্যাগোডায় রূপান্তরিত করে তা দিয়ে বস্ত্র, মশলাপাতি, সোরা ইত্যাদি ভারতীয় পণ্য কিনত।
এবারে এই প্রশ্ন আসতে পারে যে, কেন জাপানিরা বাকি দেশগুলিকে ছেড়ে একমাত্র ওলন্দাজদের জাপানে ব্যবসা করার অনুমতি দিয়েছিল? আসলে পর্তুগিজদের নিয়ে জাপানিদের ইতিমধ্যেই এক তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। পর্তুগিজরা বাণিজ্যের ছলে জাপানে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের চেষ্টা করায় তাদের অনেককে মৃত্যুদণ্ড ও বাকিদের বহিষ্কার করা হয়েছিল। তখন থেকে জাপানিরা বিদেশিদের সম্বন্ধে সন্দিহান হয়ে ওঠে। কিন্তু ওলন্দাজরা শোগুনকে এই বলে আশ্বস্ত করতে পেরেছিল যে, তারা কেবলমাত্র বাণিজ্যে আগ্রহী, ধর্মান্তরে নয়। এছাড়া ওলন্দাজরা বাকি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন জাপানিদের বিশ্ব রাজনীতি এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের খবর সরবরাহ করত যাকে জাপানিরা বলত ‘রাঙ্গাকু’ বা ওলন্দাজ শিক্ষা। ওলন্দাজদের প্রতি জাপানিদের এই বিশ্বাস থেকে জাপান তাদের জন্য নিজের দরজা খুলেছিল।
ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের জাল এবং ভারতে তাদের মধ্যেকার আধিপত্যের লড়াই ছিল মূলত বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির এক জটিল সংমিশ্রণ। এ কারণে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম দিকে পর্তুগিজ বনাম ওলন্দাজ যুদ্ধে ওলন্দাজদের পক্ষ নিলেও সতেরো শতকের মাঝামাঝি থেকে তারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম আকার নেয় ১৬২৩ সাধারণাব্দে আম্বয়না হত্যাকান্ডের মাধ্যমে। বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার আম্বয়নায় বাণিজ্যিক শত্রুতার কারণে ওলন্দাজরা ১০ জন ইংরেজ বণিককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। এই ঘটনার পর ইংরেজরা বুঝতে পারে মশলা দ্বীপপুঞ্জে ওলন্দাজদের যা আধিপত্য তাতে ওখানে তাদের হারানো প্রায় অসম্ভব। ফলে তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ত্যাগ করে ভারতে একচেটিয়া সুতিবস্ত্র ব্যবসায় মন দেয়। ইতিমধ্যে ইউরোপে ইংল্যান্ড ও হল্যান্ডের মধ্যে ১৬৫২ থেকে ১৬৭৪ সালের মধ্যে তিন তিনটে বড়ো যুদ্ধ হয়, যার প্রভাব ভারতে ইঙ্গ-ডাচ সম্পর্কেও পড়ে। আপাতত সমুদ্রে ওলন্দাজরা শক্তিশালী থাকলেও স্থলভাগে ইংরেজরা ভারতীয় রাজাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। অবশেষে পলাশির যুদ্ধের পর বাংলার নবাব মীর জাফর ইংরেজদের প্রভাব মুক্ত হতে ওলন্দাজদের সাহায্য চান। ছদ্ম-আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান ওলন্দাজরা বাংলার নবাবের পক্ষ নিয়ে চিনসুরা (চুঁচুড়া) থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্ত ছিল ওলন্দাজদের জন্য একপ্রকার রাজনৈতিক আত্মহত্যা। ১৭৫৯ সাধারণাব্দে বিদারার যুদ্ধে তারা আগে থেকে প্রস্তুত ইংরেজ সেনাপতি কর্নেল ফোর্ডের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হয়। বিদারার হার কার্যত ওলন্দাজদের ভারতের বাণিজ্যিক রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নিশ্চিত করে। ক্রমে তারা ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানি আশ্রিত বিলীয়মান এক বণিকগোষ্ঠীতে পরিণত হয়।

ভারতে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহুল আলোচিত হওয়ায় এই প্রবন্ধে তার উল্লেখ আর করা হল না। কিন্তু তুলনায় কম আলোচিত পর্তুগিজ-ওলন্দাজ-ইংরেজ সম্পর্কের জটিল রসায়ন পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ—এই তিন শতাব্দী জুড়ে এশিয়া তথা ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনায় অবশ্যম্ভাবী জায়গা করে নেয়। ভারতীয় সমাজে পর্তুগিজ অবদান কম নয়। আলু, লঙ্কা, আনারস, ভুট্টা, কাজুবাদাম, তামাক থেকে শুরু করে প্রথম মুদ্রণযন্ত্রের ব্যবহার—বহুক্ষেত্রেই পর্তুগিজরা ছিল পথপ্রদর্শক। কিন্তু তাদের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, স্থানীয় সমর্থন না পাওয়া এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি তাদের পতনের মূল কারণ ছিল। অপরদিকে ওলন্দাজরা মশলা বাণিজ্যে জয়ী হলেও ভারতের মতো বিশাল দেশের রাজনীতি এবং বাণিজ্যিক চতুরতা দুটোই বুঝতে ভুল করেছিল, যে ভুল শেষ পর্যন্ত আর পাঁচটা ইউরোপীয় কোম্পানির মতো তাদেরও ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিয়ে গিয়ে ফেলে, পরিবর্তে একই চাতুর্যের বিচক্ষণ ব্যবহার ইংরেজদের ‘ভারত ভাগ্যবিধাতা’ হয়ে ওঠার পথকে মসৃণ করে তোলে।
তথ্যসূত্র:
- Ian Burnet; East Indies: The 200 Year Struggle Between the Portuguese Crown, the Dutch East India Company and the English East India Company for Supremacy in the Eastern Seas; Rosengerg Publishing, Whitehall Road, Australia; 2013
- Ernst van Veen & Leonard Blusse; Rivalry and Conflict: European Traders and Asian Trading Networks in the 16th and 17th Centuries; Dev Publishers & Distributors, Darya Ganj, New Delhi; 2017
- Om Prakash; European Commercial Enterprise in Pre-Colonial India; Cambridge University Press, Shaftesbury Road, UK;1998
- Frederic Charles Danvers; The Portuguese in India: Being a History of the Rise and Decline of Their Eastern Empire; W. H. Allen & Co. Ltd (original London edition); 1894