আরাকানের প্রথম সহস্রাব্দ
প্রাথমিক কথন
বঙ্গোপসাগর মিয়ানমারের গা ঘেঁষে উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৬৪০ কিমি, আর চওড়ায় প্রায় ১৪৫ কিমি সরু লম্বা ভূখণ্ডটিই বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন, অতীতের আরাকান। মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও ভারত (উত্তর-পূর্বাংশ), এই তিনটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সংঘাতের মাঝের একফালি আরাকানের দীর্ঘকালীন সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনীতিগত সামরিক পরিস্থিতির জটিলতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই বাণিজ্যিক ও সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানটি।
আনুমানিক ৩৫ লক্ষ থেরবাদী বৌদ্ধ আরাকানিদের দেশে রয়েছে ১৫ লক্ষ রাষ্ট্রহীন মুসলমান রোহিঙ্গা। এই সংখ্যা রোহিঙ্গাদের নিজস্ব হিসাবে, যেহেতু রাষ্ট্রহীন, তাই মিয়ানমারের নথিতে তাদের জনসংখ্যা অপ্রকাশিত। ব্রিটিশ শাসনাধীন মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে মুসলিম রোহিঙ্গাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল পূর্ব-পাকিস্তানের অংশ হবার। সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং তারা মিয়ানমার রাষ্ট্রের, জান্তা সরকারের, চোখে রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে গেল। অবশ্য আগে থেকেই এই অঞ্চলে মুসলিম ও বৌদ্ধ ধর্মে বিরোধ ছিল। ভাষা বিরোধও ছিল। রোহিঙ্গাদের ভাষাকে বাংলার উপভাষা বলা চলে। বর্তমানে মিয়ানমারের সরকারি নীতি অনুযায়ী রাখাইন প্রদেশের ভাষা হল রাখাইন ও মারমার। দুটোই তিব্বতি-বর্মি ভাষাগোষ্ঠীর। ফলে মিয়ানমারের বর্মি ভাষার সাথে সাযুজ্য রয়েছে। বর্মি ভাষার মতোই আরাকানি লিপিতেও আছে ৩৩টি বর্ণমালা। একটা বড়ো ফারাক আরাকানি ভাষায় ‘র’ শব্দের উচ্চারণে আছে কিন্তু বর্মি ভাষায় ‘র’ হবে ‘য়’ বা ‘ইয়’। ফলে বর্মি ভাষায় রাখাইনরা হয়ে যাবে ইয়াখাইন। রেঙ্গুন হয়ে গেছে ইয়াঙ্গুন।
আরাকানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
শ্রদ্ধেয় রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর “হিন্দু কলোনিজ অফ দি ফার ইষ্ট” বইতে লিখেছেন:
“….আরাকানের ইতিহাস অনুসারে, প্রথম ভারতীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বেনারসের এক রাজার পুত্র দ্বারা, রাজধানী ছিল রামাবতী শহরে। দ্বিতীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আরাকান জেলার একজন ব্রহ্মপা(?), তিনি উল্লিখিত প্রথম রাজপরিবারের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। (দ্বিতীয়) পরিবারের একজন মহিলা বংশধর ধন্যাবতীতে শাসনকারী তৃতীয় রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠা করেন। উচ্চ বার্মার তাগাইমগের একজন ক্ষত্রিয় প্রধান তার ছোটো ভাইয়ের কাছে পূর্বপুরুষের রাজ্য ছেড়ে আরাকানে এসে ধন্যাবতীর (৩য়) রাজপরিবারের কন্যাকে বিয়ে করার মধ্যে দিয়ে চতুর্থ রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠা করেন, চতুর্থ রাজপরিবারের রাজধানী ছিল জিয়াউক-পান্ডুয়াং নামের পাহাড়ের উপরে। ১৪ সাধারণাব্দে চন্দ্র-সূর্য নামক এক রাজার রাজত্বকালে, মহামুনি নামে বিখ্যাত বুদ্ধ মূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছিল যা ঐতিহাসিক সময়কাল জুড়ে আরাকানের অভিভাবক দেবতা হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে।…” (মূল ইংরেজি থেকে প্রায় আক্ষরিক অনুবাদ এই লেখকের)। খেয়াল রাখতে হবে শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র দত্ত মহাশয়ের কালে আমার এই লেখার প্রধান ও বিশ্বাসযোগ্য সূত্র আনন্দচন্দ্র লিপির পাঠোদ্ধার হয়নি। ফলে তাঁর লিখিত আরাকানের ইতিহাস বহুলাংশে পরোক্ষ তথ্য ও কিংবদন্তি-নির্ভর ছিল।
ঐতিহাসিক কালের প্রথম থেকে ৯৫৭ সাধারণাব্দ পর্যন্ত আরাকান ছিল ভারতীয় রাজবংশের শাসনাধীন। ৭২৯ থেকেই ভারতীয় রাজবংশের ক্ষমতা দুর্বল হতে হতে ৮১৮ থেকে শুরু হয় আরাকানিদের শাসন। আরাকানি শাসনের প্রথম পর্ব লেমরো যুগ (৮১৮-১৪০৬) নামে পরিচিত। ১৪৩০ থেকে ম্রাউক-ইউ যুগ। ১৪২৯ থেকে ১৪৩৭ সাধারণাব্দ পর্যন্ত আরাকানের অন্তর্কলহের সুবাদে তা বাংলার সুলতানের করদ রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। যদিও মাত্র আট বৎসর সরাসরি ইসলামিক শাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, তথাপি আরাকানে ইসলামিক প্রভাব বজায় ছিল দীর্ঘকাল। ১৫৪২ সালের দিকে বাংলার সুলতানি শাসনের জোয়াল ছিঁড়ে আরাকান রাজা চট্টগ্রাম সহ বঙ্গোপসাগরের উপকূলের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে। কিন্তু ১৬৬৬-তে মোগলরা চট্টগ্রাম এলাকা আরাকান দখল থেকে মুক্ত করায় প্রায় একশত বৎসরের আরাকানি চট্টগ্রাম শাসনের অবসান ঘটে। ১৭৮৪-এর নভেম্বর মিয়ানমারের (তৎকালীন বর্মা) রাজা ইউ ওয়াইন আরাকান আক্রমণ করেন। ১৭৮৫ জানুয়ারিতে মিয়ানমারের রাজা মং ওয়াইন আরাকান রাজধানী ম্রাউক-ইউ দখল করে আরাকানকে মিয়ানমারের সঙ্গে জুড়ে নেন। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসনকাল থেকে আরাকান মিয়ানমারের অংশ হিসাবেই আছে।
আরাকানি ইতিহাসের খোঁজে
প্রাগিতিহাস অজানা হলেও আরাকান জনশূন্য ছিল না। বর্তমানের তিব্বতি-বর্মি ভাষী জনগোষ্ঠীর (বিভিন্ন গোষ্ঠীর মিশ্রণ) আরাকানে প্রবেশকাল আনুমানিক হাজার বা দেড় হাজার বৎসর আগে। তার আগের আরাকানবাসীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয় পাওয়াটা কঠিন। কিছু ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী আনুমানিক দ্বিতীয় শতাব্দীর আগে থেকে ভারতীয়রা আরাকানে পূর্ণমাত্রায় বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। এই বিষয়ে আরাকানে বহু লোককথা এবং কিংবদন্তি ও প্রত্ননিদর্শন আছে। ভারতীয়দের আগমনের আগের ঘটনাবলী ঘিরে যে কিংবদন্তি প্রচলিত আছে সঙ্গত কারণেই তার বিশ্বাসযোগ্যতা অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু আরাকানি কিংবদন্তি এদের জনমানসে এতটাই দৃঢ়ভাবে প্রোথিত যে এগুলোকে আরাকানি সভ্যতা-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবেই আমাদের ধরে নিতে হবে।
ভারতে আরাকানের সম্ভাব্য উল্লেখ পাই অন্ধ্রপ্রদেশের নাগার্জুনাকোন্ডার শিলালিপিতে। এটি রাজামাধারিপুত (তৃতীয় শতাব্দীর ইক্ষাকু রাজবংশের শ্রীবীরপুরীসাদাত)-এর রাজত্বের চতুর্থ বর্ষে লিখিত। লিপিতে লেখা আছে কাশ্মীর, গান্ধার, কিআইনা(?), কিলাতা, তোসালি, আভারামতা, ভামগ(ভঙ্গ?), বনবাসী, যুবানা, দামিলা, পালুরা, তাম্বপমনিদ্বীপ – এই এলাকাগুলোতে ধর্মপ্রচারকরা গিয়েছিলেন। অর্থাৎ তৃতীয় শতাব্দীর কিছু আগেই বৌদ্ধধর্ম প্রচারক দলটি আরাকানে উপস্থিত ছিল। নিহাররঞ্জন রায়ের মতে “কিলাতা” হল কিরাত। এবং এই কিলাতা বা কিরাতা দেশটি হল আরাকান এবং নিম্ন মিয়ানমার অঞ্চল।
আরাকানে ইতিহাসের প্রধান প্রত্ন-প্রমাণ প্রাচীন রাজধানী ভেসালিতে (বৈশালী) স্থাপিত আনন্দচন্দ্র লিপি। ৭২৯ সাধারণাব্দে ভেসালির রাজা আনন্দচন্দ্রের সংস্কৃত ভাষায় গুপ্ত নাগরী লিপিতে লেখা ৬৪ স্তবকের শিলালিপি। এতে আরও কয়েকজন প্রাচীনতর রাজার লেখনী থাকলেও তা পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি। লিপিতে আরাকানের ইতিহাসের আরম্ভ থেকে চন্দ্রবংশ ও দেব-বংশের রাজত্বকালের ইতিহাস মোটামুটি বিশদে লেখা আছে। তবে তাদের দুটি রাজধানী ধান্যবতী ও বৈশালী (স্থানীয় উচ্চারণে যথাক্রমে ধান্যওয়াদ্দী ও ভেসালি বা ওয়াইথালি) শহরের স্থাপনকালের উল্লেখ নেই। শিলালিপির লেখার বাইরে আরাকানের ইতিহাস সৃষ্টির প্রচেষ্টায় বিভিন্ন বর্মি ও বিদেশি ইতিহাসবেত্তারা বিভিন্ন পুথি (মূলত পালি ভাষায় লেখা) ও মূর্তি, মুদ্রা ছাড়াও ধান্যবতী ও ভেসালি শহরের ভগ্নাবশেষে পাওয়া তথ্যের সাহায্য নিয়েছেন।
সেই সংগৃহীত ইতিহাস বলে “ইতিহাসের সূত্রপাতের কালেই ভারত থেকে লোকেরা এসে কালাদান ও লেম্রো নদীর অববাহিকায়, পাহাড়ের পাদদেশে, বসতি স্থাপন শুরু করে। ভারতীয় অভিবাসীদের গোষ্ঠীপতিরা নিজেদের কপিলাবস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবি করত। ভারতীয়দের সেই সমাজ হিন্দু ধর্মীয় প্রথানুযায়ী চারটি বর্ণে বিভক্ত ছিল। রাজা এবং পুরোহিতরা বেদপাঠ করতেন। এলাকার ভূমিখণ্ড ও নদীর আর্য নামকরণ করা হয়। রাজবংশগুলো চন্দ্র ও সূর্যবংশদ্ভূত বলে দাবি করত।” লক্ষণীয় এখানে কোথাও সময়ের উল্লেখ নেই।
সময়ের সূত্র খুঁজতে গিয়ে টলেমির লেখায় পাই পূর্বভারতে ছিল “আর্গাইর” (রজত ভূমি), বহু রূপার খনি সমৃদ্ধ দেশ। সেই দেশের রাজধানী “সাদা”। শ্রদ্ধেয় রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে “রজতভুমি” বা “আর্গাইর” তথা “সাদা” হল জাভার মত কোন দ্বীপভূমিতে। কিন্তু জাভা তো ইন্দোনেশিয়াতে। অবশ্য আরাকানেও কোনো রূপার খনি নেই। ১৯৭৫ সালে প্রাচীন এশীয় মুদ্রা-বিশেষজ্ঞ মাইকেল মিচনার এই ধাঁধার সমাধানে লেখেন, আরাকানের রাজাদের মাধ্যমে রূপার বিরাট বাণিজ্য চলত। চিনের নানঝাও (ইউনান) আর মিয়ানমারের শান এলাকার পিউ রাজ্য বিষ্ণুপুর, হানলিন এলাকায়, শ্রীক্ষেত্রের বর্মন ও বিক্রম রাজবংশীয়দের শাসনাধীন অঞ্চলে, প্রচুর রূপার খনি ছিল। এই বিশাল এলাকার উৎপাদিত সমস্ত রূপা ইরাওয়াদ্দী (ইরাবতী) নদীপথে আসত রেঙ্গুন (ইয়াঙ্গুন)। তারপরে টলেমির বর্ণিত আরাকানের “সাদা” হয়ে পূর্বভারতে চলে যেত সেই রূপা, সমৃদ্ধ গুপ্ত সাম্রাজ্যের চাহিদা মেটাতে। অতএব আরাকানকে ভিন্ন অর্থে হলেও আর্গাইর (রজত ভূমি) বলা যেতে পারে। কিন্তু রাজধানীর নাম ‘সাদা’? মিচনার বলেন, ‘সাদা’ শব্দের উৎস হল আরাকানের শাসক রাজবংশ, চন্দ্র>চদ্দ>চদ্দা>চাদ্দা>সাদা থেকে। মিচনারের ‘সাদা’ শব্দের ব্যাখ্যা মেনে নিলে মানতে হবে যে দ্বিতীয় শতাব্দীর অনেক আগে থেকেই আরাকানে রাজত্ব করত চন্দ্রবংশ। এই ধারনার সমর্থন পাই বৌদ্ধ মহানিদ্দেস-এর ‘সাদা’ বন্দরের উল্লেখে। উড়িষ্যার গঞ্জাম জেলার পালুর, বাংলার তাম্রলিপ্ত, আর এই ‘সাদা’ বন্দরের মধ্যে বাণিজ্য হত।
টলেমিকে উল্লেখ করে জেরিনি লিখেছেন: গঙ্গা মোহনার গাঙ্গেয় উপসাগরের (বঙ্গোপসাগর) সমুদ্রপথের বন্দর এই ‘সাদা’। ভারতের পালুর থেকে পূর্বমুখী সমুদ্রযাত্রার ১৩ হাজার স্টেডিয়া দূরত্বে প্রথম বন্দর ‘সাদা’। এই হিসাবে ‘সাদা’ বন্দর হল বর্তমান আরাকান উপকুলের ‘থান্ডওয়ার’ বা অতীতের ‘দ্বারাবতী’। ইংরেজিতে ‘স্যান্ডোওয়ে’ আর পর্তুগিজ উল্লেখে ‘সেদোয়া’। পামেলা গুটম্যানের মতে এই সেদোয়াই ছিল বাসুদেব নামের নয় ভাইয়ের রাজ্যের রাজধানী। আনন্দচন্দ্র লিপিতে উল্লেখ না থাকলেও কিছু আরাকানি পুথিতে বাসুদেবের রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।
উপরের আলোচনার ভিত্তিতে আমরা আনুমানিক দ্বিতীয় পূর্ব শতাব্দী থেকে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্য আনুমানিক এবং চতুর্থ শতাব্দী থেকে আরাকানের যথাযথ ইতিহাস দাঁড় করাতে পারবো হয়ত। এই লেখায় ৯৫৭ সাধারণাব্দ অবধি বা শুধুই ভারতীয় শাসনকালের ইতিহাস আলোচিত হবে।
প্রাগৈতিহাসিক আরাকান, কিংবদন্তির ভিত্তিতে যার অন্য নাম রাখাইন। এই রাখাইন নামের উৎপত্তি নিয়ে পালি ভাষার প্রাচীন আরাকানি পুথি উল্লেখ করে রাক্ষপুরা বা রাক্ষসদের দেশ থেকে ‘রাখাইন’ শব্দের উৎপত্তি। এছাড়াও প্রাচীন আরাকানের আরও কয়েকটি নাম পাওয়া যায়, যথা – থুওয়ান্নাপুরা, রামাথুওয়ানানপুরা, আয়ুজ্জপুরা, দীন্যাওয়াদ্দি, মহাবিহিকা, মহিনথকমণ্ডলা, রামওয়াদ্দি, মেঘাওয়াদ্দি ইত্যাদি।
আরাকানের কয়েকটি প্রাচীন রাজধানী ও শহরের নাম:
২য় থেকে ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত রাজধানী হিসেবে ধান্যওয়াদ্দী (ধান্যবতী) এবং ভেসালি (বৈশালী) বা ওয়াইসালি বা ওয়াইথালি-এর নাম পাওয়া যায়। এরপরে ৯ম থেকে ১৫শ শতাব্দীর রাজধানীগুলো ছিল পিনসা, পারেইন, হক্রিত লাউংয়েত। অন্তিম রাজধানী ছিল ম্রাউক-ইউ। আরাকানের প্রধান নদী নাফ, মায়ু, কালাদান আর লেমরো। বর্তমানের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে আছে ম্রাউক-ইউ (ম্রাউক-উ), আকিয়াব বা সিতওয়ে, স্যান্ডোওয়ে, কিউকপিউ, কিয়াউকতাও ইত্যাদি।
আরাকানের প্রাগৈতিহাসিক তথ্যে প্রামাণ্য উপাদানের অভাব থাকলেও এর একটি সমৃদ্ধ লোককথা-ভিত্তিক ইতিহাস রয়েছে। সেই লৌকিক ইতিহাসে বলছে ৩৩২৫ থেকে ১৪৮৩ সাধারণ পূর্বাব্দের প্রথম ধান্যওয়াদ্দি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা মারায়ু। এরপরে ১৪৮৩ থেকে ৫৮০ সাধারণ পূর্বাব্দে ছিল দ্বিতীয় ধান্যওয়াদ্দি রাজবংশ। প্রতিষ্ঠাতা রাজা কানরাজাগ্রী। তারপরে ৫৮০ থেকে ৩২৬ সাধারণ পূর্বাব্দের তৃতীয় ধান্যওয়াদ্দির প্রতিষ্ঠাতা রাজা চন্দ্রসূর্য বা উচ্চারণ ভেদে চন্দ্রথুরীয়া, বা সন্দাসূর্য। এখান থেকেই বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ক লোককথার শুরু।
দুটি আরাকানি কিংবদন্তি ও মহামুনি:
প্রথম কিংবদন্তি
থেরবাদী বৌদ্ধধর্মাবলম্বী আরাকানিদের কিংবদন্তিতে তৃতীয় ধান্যওয়াদ্দী রাজবংশের রাজা সন্দাসূর্য প্রতিষ্ঠা করেন রাজধানী ধান্যওয়াদ্দি বা ধান্যবতী। বাৎসরিক ২০০ মি.মি. বৃষ্টি হওয়া সুজলা সুফলা ধান্যবতী বা ধান্যওয়াদ্দী ছিল বুদ্ধদেবের প্রশংসাধন্য। কিংবদন্তি অনুসারে গৌতমবুদ্ধ ধান্যওয়াদ্দীর প্রশংসায় বলেছেন জম্বুদ্বীপে মঝঝিম দেশের ষোলটি দেশে ভিক্ষুদের খেতে দেওয়া হয় ভুট্টা, মিলেট ও সিমের বিচি। কিন্তু এখানে (ধান্যওয়াদ্দীতে) দেওয়া হয় বার্লি আর চাউল। আমার পূর্বতন বুদ্ধগন, (কাকুসান, গঙ্গামনা, কাসাপ্পা) এই শহরকে বলে গেছেন ধান্যওয়াদ্দী। এখানকার বাসিন্দারা কখনো দুর্ভিক্ষের সামনে পড়েনি। এই এলাকাকে চিরকালই ধান্যওয়াদ্দীই বলা হবে।
দ্বিতীয় কিংবদন্তি
মহাপরিনির্বাণের ২৫ বৎসর আগে আনন্দ ও অন্য ৫০০ ভিক্ষু সহ স্বয়ং বুদ্ধদেব এসেছিলেন আরাকানের ধান্যওয়াদ্দিতে। রাজা সন্দাসূর্যের অনুরোধে, কালাদান নদীতীরের কিয়াওতাও শহরের পূর্বদিকের থেলাগিরি পর্বতে বুদ্ধদেব টানা সাতদিন শিল্পীদের সামনে বসেন, যাতে বুদ্ধের তেজ ও অলৌকিক শক্তিবলে তাঁর হুবহু আদলে একটি মূর্তি তৈরি সম্ভব হয়। মূর্তি নির্মাণ শেষে বুদ্ধদেব নিজে এটিকে “প্রাণবন্ত মূর্তি” বলে আশীর্বাদ করেন। যার ফলে এটি ‘মহামুনির জীবন্ত মূর্তি’ বলে খ্যাতি লাভ করে। (অন্য আরেকটি কিংবদন্তি আরও একধাপ এগিয়ে বলে, এই মূর্তি নির্মাণের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন স্বয়ং দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা।) এই মহামুনি মূর্তির পাদদেশে খোদিত রয়েছে বহু হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি। তবে বর্তমানের মূর্তিটি ততটা প্রাচীন মূর্তি নয়। সেই মহামুনি বেশ কয়েকবার অপহৃত হয়। শেষবারে ৯৫৭-তে তো যথেষ্ট ক্ষতিসাধনও করা হয়। তারপরে এখন যে মূর্তি মান্দালয়ে স্থাপিত তা হল সারাই করা মূর্তি।
এই কিংবদন্তিগুলোর সত্যাসত্য যাচাই করে কোনও সিদ্ধান্তে আসার সময় আমাদের মাথায় রাখতে হবে থেরবাদী বৌদ্ধ আরাকানিরা এই লোককথাকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। তাদের প্রাচীন পুথিতেও পালি ভাষায় এইসব লেখা আছে। অর্থাৎ আরাকানবাসীরা প্রায় দেড় হাজার বৎসরের বেশি সময় ধরে এই বিশ্বাসে স্থির। ফলে আরাকানের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসে এর গভীর প্রভাব সহ রাজনৈতিকভাবেও আরাকানের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। মিয়ানমারে বৌদ্ধ ধর্মের অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ‘মহামুনি’ বর্তমানে আছে মান্দালয়ে। মিয়ানমারের শেষ রাজবংশ কোনবাউং রাজবংশ আরাকান দখল করেই ‘মহামুনি’ নিয়ে যায় মূল ভুখণ্ডে। কারণ আরাকান আক্রমণ ও দখলের সেটা ছিল অন্যতম কারণ। মহামুনি নিয়ে না গেলে আরাকান বিজয়টাই অর্থহীন হয়ে যেত।
আরাকানে ভারতীয় অভিবাসন
ভারত থেকে প্রথম অভিবাসন কবে? ১৯৭২, মিয়ানমার আর্কিওলজির ডিরেক্টর অং থাও বলেন, ভেসালিতে (ওয়াইথালি) দ্বিতীয় শতকে হিন্দু রাজবংশ রাজত্ব করতো।
আরাকানে ভারতীয় অভিবাসনের প্রথমদিককার ঘটনাবলি:
প্রথম সহস্রাব্দের প্রথম শতকের সমৃদ্ধির হাত ধরে পূর্বভারতে সোনা, রূপার মতো মূল্যবান ধাতু ও পাথরের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে বণিকের নৌকা ভাসে পূর্বসমুদ্রের স্বপ্নের সূবর্ণভূমি, সূবর্ণদ্বীপের খোঁজে। কিন্তু পথে, আরাকানের খাঁড়িতে দাপিয়ে বেড়ানো জলদস্যুরা সমুদ্রযাত্রীদের ধরে দাস হিসাবে বিক্রি করে। ফলে সমুদ্র যাত্রার জলযানে থাকল দক্ষ তীরন্দাজ আর দূরযাত্রায় শুভাশুভক্ষণ বিচারের জন্য গনৎকার ব্রাহ্মণ। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আগতরা ক্রমে সুজলা সুফলা অরক্ষিত আরাকানের প্রায় জনশূন্য এলাকায় বসতি গড়তে থাকে। স্থানীয় আদিবাসীদের বিরোধ থেকে আত্মরক্ষার জন্য তীরন্দাজরা তো ছিলই। অভিবাসীসমাজ গঠনে অভিযাত্রীদলে থাকা গনৎকার ব্রাহ্মণরা হয়ে উঠল সামাজিক পরামর্শদাতা। পরবর্তী অভিযানে অভিযাত্রীদের সঙ্গে থাকা ফসলের বীজ ও উন্নত সেচ ব্যবস্থা এনে দিল কৃষির সাফল্য। সমৃদ্ধ হতে থাকা অভিবাসী জনপদগুলো প্রথম শতাব্দীর আগেই শুরু করে নগর গঠন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। কেমন ছিল প্রথমদিককার সংগঠন? পামেলা গুটম্যান বলছেন, রাজত্বের রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনে আগত সংখ্যায় ক্রমবর্ধমান কারিগর এবং দক্ষ কারিগরদের স্থান হল রাজপ্রাসাদের অন্দরে। কৃষকরা উদ্বৃত্ত ফসলের একাংশ কর হিসাবে দিত। গৃহরক্ষক হিসাবে কাজ করত সশস্ত্র রক্ষীদল। প্রয়োজনভিত্তিক সংগঠিত সশস্ত্র কৃষকরা শাসকের কর্তৃত্ব প্রয়োগে সাহায্য করত। রাজপরিবারের রক্ষার জন্য প্রাসাদ এবং শহর প্রতিরক্ষার জন্য দ্বিস্তরীয় প্রাচীর এবং পরিখা তৈরি হয়েছিল। প্রাসাদ ঘিরে প্রাচীরের অভ্যন্তরে নগর-রাজ্য ও নগরীর বিকাশ হয়েছিল। সমগ্র কর্মকাণ্ডে ও ভারতীয়করণে নিযুক্ত লোকপালরা মূল দিকনির্দেশনা দিত। অভিবাসনকারীরা এবং স্থানীয় বাসিন্দারা দেখেছিল উপজাতি সর্দার থেকে ঐশ্বরিক রাজায়, শামান থেকে ব্রাহ্মণ পুরোহিতে, আত্মার ঘর থেকে মন্দিরে, কুঁড়েঘর থেকে প্রাসাদে পরিবর্তিত হওয়া। এইভাবেই বাংলা এবং ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে স্থলপথে ও সমুদ্রপথে আরাকানে ভারতীয় সংস্কৃতি প্রতিস্থাপিত হয়েছিল।
দ্বিস্তরীয় প্রাচীর ঘেরা রাজধানী শহর গঠন সহ সুষ্ঠু প্রশাসন গড়ে ওঠে তৃতীয় শতকের আগেই। প্রতিষ্ঠিত হয় মগধের শাখা রাজবংশের রাজত্ব। ভারত থেকে অভিবাসীদের পরের ঢেউ আসে চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতক জুড়ে। ততদিনে আরাকানে ভারতীয়দের শাসন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। এই ভারতীয় রাজবংশের পরিচিতি প্রসঙ্গে আনন্দচন্দ্র লিপির পাঠোদ্ধার করা অক্সফোর্ডের অধ্যাপক জনস্টন বলেন, আরাকান ছিল বিহারের বৈশালীর লিচ্ছবি শাসক বংশধরদের শাসনাধীন। এরা গুপ্তবংশের উত্থানকালে (৩০০-৪৬৭ অব্দ) বিহারের বৈশালী থেকে পালিয়ে আরাকানে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করে।

আনন্দচন্দ্র শিলা লিপি (চিত্রঋণ: দি মগ নেশন উইকি আর্কাইভ) রৌপ্যমুদ্রা (চিত্রঋণ: উইকিমেডিয়া কমনস)
৭২৯-এ লেখা আনন্দচন্দ্র লিপি অনুযায়ী আরাকানের রাজবংশের কথা:
আনন্দচন্দ্র লিপির শুরুতে আছে-
প্রথম রাজা বাহুবলী। পরবর্তী রাজা রঘুপতি, এবং পরের রাজা চন্দ্রোদয় (২০২-২২৯)। কোনো রাজবংশের উল্লেখ নেই।
রাজবংশের প্রথম উল্লেখে আছে, অন্নাভেতা রাজবংশ (২২৯-২৩৪)। রাজাদের সংখ্যা নাম বা রাজধানী কিছুই বলা নেই।
পরবর্তী ৭৭ বৎসরের রাজা ও রাজবংশের নাম পাঠোদ্ধার করা যায়নি।
তারপরে যে নাম পাওয়া গেল:
৩১১-৩৩৪ সাধারণাব্দ – রাজা: রিমভ্যাপ্পা
৩৩৪-৩৪১ সাধারণাব্দ – রাণী: কুভেরামি বা কুভেরাপি
৩৪১-৩৬১ সাধারণাব্দ – কুভেরাপির দ্বিতীয় স্বামী উমাবীর্য রাজা হন।
৩৬১-৩৬৮ সাধারণাব্দ – রাজা: যুগনা বা যুগনাভ্যাস
৩৬৮-৩৭০ সাধারণাব্দ – রাজা লাংকি
চন্দ্রবংশ:
৩৭০-৪২৫ সাধারণাব্দে রাজা দ্বেনচন্দ্র নতুন রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকালে ১০১ জন রাজাকে যুদ্ধে পরাস্ত করার কাহিনিকে আমরা ধরে নেব অনেক উপজাতি প্রধানকে পরাস্ত করেছিলেন। দ্বেনচন্দ্র ৪.৭ বর্গ কিলোমিটারের এক স্বর্গের অমরাবতী-স্বরূপ অনিন্দ্য সুন্দর শহর গড়লেন। শহরের নাম কিন্তু বলা নেই।
৪২৫-৪৪৫ সাধারণাব্দ – রাজা কালাচন্দ্র। রাজ্যের আর্থিক উন্নতি হয়।
৪৫৪-৪৭৬ সাধারণাব্দ – রাজা দেবচন্দ্র।
৪৭৬-৪৮৩ সাধারণাব্দ – রাজা যজ্ঞচন্দ্র বা যত্নচন্দ্র।
৪৮৩-৪৮৯ সাধারণাব্দ – রাজা চন্দ্রবন্ধু। (চন্দ্রবন্ধু যত্নচন্দ্রের রক্ষিতার সন্তান। তাই নামের ধরন বদলে গেল।)
৪৮৯-৪৮৬ সাধারণাব্দ – রাজা ভূমিচন্দ্র।
সম্ভবত এই সময় ভেসালিতে আনন্দচন্দ্র লিপির চারপিঠওয়ালা পাথরের স্তম্ভটি স্থাপিত হয়। কারণ একপাশে রাজা ভুমিচন্দ্রের নামের আভাস পাঠ করা গেছে। যার অর্থ দাঁড়ায়, শিলালিপিটি ভুমিচন্দ্রের সময়ে বা তার আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
৪৮৯-৫২০ সাধারণাব্দ – রাজা ভুতিচন্দ্র।
রাজা ভুতিচন্দ্রের একটি তাম্রশাসনের আংশিক পাঠোদ্ধার করেছেন এপিগ্রাফিস্ট ড. সরকার। তাম্রশাসনে প্রথম রাজা দ্বেনচন্দ্র (৩৭০-৪২৫) থেকে আটজন শাসকের নাম ছিল, কিন্তু তাদের নাম পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বরং ছয়জন রাজার জননীর নাম লেখা আছে। ভুতিচন্দ্রের মাতা কল্যাণ দেবী, মাতামহী ক্যিয়াও দেবী, মাতামহীর মাতা সুকন্যা দেবী, তার মা কিমদল দেবী, তার মা কিমতন দেবী। এই তথ্য বলে খুব স্বাভাবিকভাবেই আনন্দচন্দ্র লিপিও সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়।
৫২০-৫৭৫ সাধারণাব্দ – ভুতিচন্দ্রের পরে নীতিচন্দ্র।
৫৭৫-৫৭৮ সাধারণাব্দ – রাজা হলেন বীরচন্দ্র। পুরোনাম বীরচন্দ্র দেবেনান। ইনি রাজকোষের বদলে নিজস্ব সম্পদ ব্যয় করে ১০০ বৌদ্ধ স্তূপ গড়েন।
৫৭৮-৫৯০ সাধারণাব্দ – রাজা প্রীতিচন্দ্র।
৫৯০-৫৯৭ সাধারণাব্দ – রাজা পৃথিবীচন্দ্র। দেবভক্ত ও ধার্মিক হিসাবে খ্যাত। এরপরেই রাজ্যজুড়ে অশান্তি দেখা দেয়।
৫৯৭-৬০০ সাধারণাব্দ – রাজা ধৃতিচন্দ্র। (যুদ্ধবিগ্রহে ভরা স্বল্পকালীন রাজত্ব। তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক না যুদ্ধে সেটাও পরিষ্কার না।)
(আনন্দচন্দ্র লিপি অনুযায়ী চন্দ্রবংশের সমাপ্তির শুরু এখানেই। পরবর্তী ২৩০ বৎসরে ১৬ জন রাজা রাজত্ব করলেও মাত্র ১৩ জনের নাম উল্লেখ আছে।)
৬০০-৬১২ সাধারণাব্দ – চন্দ্রবংশের পতনের পরে সিংহাসনে বসেন মহাবীর। ইনি পুরেমপুরা রাজ্যেরও রাজা। (এই পুরেমপুরার অজানা ভৌগোলিক অবস্থানকে অনুমানে স্বল্পদূরত্বের সমতট এলাকায় ভাবা হয়।)
৬১২-৬২৪ সাধারণাব্দ – রাজা ব্রাইয়াজাপ।
৬২৪-৬৩৬ সাধারণাব্দ – রাজা সেভিনরেন। (কোন এক মাভুকাকে হত্যা করেছিলেন, তাই মাভুকাঘাতিন নামেও পরিচিত।)
বলাবাহুল্য ব্রাইয়াজাপ, সেভিনরেন ঠিক ভারতীয় ছিল না। একটা সম্ভাবনা হল এরা সম্ভবত রাজপরিবারের পুরুষদের সঙ্গে স্থানীয় উপজাতীয় নারীদের মিলনে জন্মানো সংকর প্রজন্মের।
৬৩৬-৬৪৯ সাধারণাব্দ – সিংহাসনে বসেন ধর্মসুর এবং রাজবংশের সমাপ্তি হয়। ভেসালিতে এল ভিন্ন রাজবংশ।
৬৪৯-৮১৮ সাধারণাব্দ – দেব-আন্দজ বংশ:-
৬৪৯-৬৬৫ সাধারণাব্দ – রাজা বজ্রশক্তি। দেব-আন্দজ বংশের প্রথম রাজা। ধার্মিক হিসাবে খ্যাত ছিলেন।
৬৬৫-৭০১ সাধারণাব্দ – রাজা শ্রীধর্মবিজয়। রাজা শ্রীধর্মবিজয় ভেসালি রাজ্যের সীমা বাড়িয়ে দখল করে নিয়েছিলেন বাংলার কর (বা কার) বংশের সমতট রাজ্য, যার রাজধানী ছিল পত্তিকেরা (?)। শ্রীধর্মবিজয়ের বিজয়বর্ষ অজানা তবে বিজিত রাজ্য হাতছাড়া হয়েছিল ৬৮০ মতান্তরে ৭০১ সাধারণাব্দে। এরপর সমতট চলে যায় খড়গ রাজবংশের হাতে। পরবর্তীকালে তা আবার ফিরে যাবে হরিকেলের দেব-আন্দজ রাজবংশের কাছে। হরিকেল রাজাদের নামের শেষে চন্দ্র থাকায় তাদের চন্দ্রবংশ বলে ধরে নেওয়া হলেও অন্যান্য বিভিন্ন তথ্য বলে তারা সম্ভবত শৈব ধর্মী দেব-আন্দাজ রাজবংশেরই একটি শাখা।
৭০১-৭০৪ সাধারণাব্দ – শ্রীধর্মবিজয়ের পর ভেসালির রাজা হন নরেন্দ্রবিজয়।
৭০৪-৭২০ সাধারণাব্দ – রাজা শ্রীধর্মচন্দ্র। প্রথমে রাজা হন নরেন্দ্রচন্দ্র। তাঁর রাজক্ষমতা অস্বাভাবিক দ্রুততায় হাত বদল হয়ে চলে যায় তাঁরই কাকা শ্রীধর্মচন্দ্রের হাতে। এই শ্রীধর্মচন্দ্রই হলেন আনন্দচন্দ্র লিপির লেখক আনন্দচন্দ্রের পিতা।
৭২০-৭২৯ সাধারণাব্দ – রাজা আনন্দচন্দ্র। দেব-আন্দজ বংশের পতনের সূচনা।
৭৮৮-৮১০ সাধারণাব্দ – মহা তাইং সান্দ্রা। সম্ভবত ইনি ভেসালি নগরী পুর্নর্নিমাণ করান।
৯৫৭ সাধারণাব্দ – মোঙ্গোলীয়দের আক্রমণে চন্দ্ররাজবংশের শেষ রাজা সুলা তাইং সান্দ্রার মৃত্যু হলে ভারতীয় রাজবংশের আরাকান শাসনের সমাপ্তি ঘটে। এখানে সান্দ্রা শব্দটিকে আমরা চন্দ্র শব্দের উচ্চারণগত ত্রুটি হিসাবেই গণ্য করব।
ভেসালি (বৈশালী) বা ওয়াইথালি নগরীর ইতিহাস
আরাকানে প্রথম সহস্রাব্দের প্রথমাংশেই লিচ্ছবি রাজবংশের নেতৃত্বে ভারতীয় সংস্কৃতির বাহকরা তাদের পেছনে ফেলে আসা গৌরবময় দেশের শহরের নামটি প্রতিস্থাপিত করে। এই উদ্দেশ্যেই আরাকান উপনিবেশের রাজধানীর নাম রাখা হল বৈশালী। ক্ষত্রিয় রাজদরবারের ভাষা সংস্কৃত আর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও প্রশাসন এবং বৌদ্ধ ধর্মাচরণে থাকলো পালি ভাষা। লিপি গুপ্তযুগের নাগরি। প্রতিটি শিল্পকর্মে ভারতীয় বৈশিষ্ট্য। আরাকানে গড়ে তোলা এই ভারতীয় নগর বৈশালীর নাম উচ্চারণে সামান্য বদলে ভেসালি বা ওয়াইসালি হয়। শহরটির ধ্বংসাবশেষ এখনও কিছুটা পাওয়া গেলেও নানা কারণে সঠিক সময় বের করা যায়নি; জানা যায়নি তার সঠিক প্রতিষ্ঠাকালও।
চন্দ্রবংশীয়দের রাজধানী ভেসালি ছিল আরাকানের সমৃদ্ধ বন্দর নগরী। বাণিজ্যের সূত্রে শতশত জলযান বন্দরে অপেক্ষমান থাকত। বাণিজ্য চলতো মিয়ানমারের পিউ নগর-রাজ্যগুলোর সঙ্গে, আর থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, চীন (ইউনান), এবং অবশ্যই বাংলা তো ছিলই। পারস্যের সঙ্গেও বাণিজ্যের কথা জানা যায়। সেই পথেই আরাকানে আগমন হতে থাকে আরব বণিকদের।
আনন্দচন্দ্র লিপি থেকে জানা যায়, চন্দ্রবংশের প্রতিষ্ঠাতা দ্বেনচন্দ্র (৩৭০-৪২৫) বৈশালীর ২৬ কিলোমিটার উত্তরের ধান্যবতীতে রাজত্ব শুরু করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে সাড়ে চার বর্গকিলোমিটারের অজানা নামের নগর গড়েন। এখানে একটা প্রশ্ন ওঠে, লিচ্ছবির দ্বেনচন্দ্র কেন ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী মহামুনির মূর্তির শহর ধান্যবতী ত্যাগ করেছিল? তখন অবশ্য প্রশ্ন আসবে মহামুনি মূর্তি দ্বেনচন্দ্রের ধান্যবতীতে ছিল? অনেক প্রশ্নেরই সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই।
ইতিহাসবেত্তা মায়ার অং-ও-শ্বে-জান জানিয়েছেন, আনন্দচন্দ্র লিপিতে লেখা নেই, তবে ৩২৭ অব্দে ভেসালি গড়েন মাহা তাইং সান্দ্রা। এর প্রমাণ হল, ঐ সময়েই মাহা তাইং-এর স্ত্রী থুপাবাদেবী রাজধানীতে ফারাগ্রীতে বুদ্ধ মূর্তি স্থাপন করেন। এখানে সহজবোধ্য যে ইনি দ্বেনচন্দ্রকেই মাহা তাইং সান্দ্রা বলে ভেবে নিয়েছেন। এই ভুল অনেকেই করেছেন আনন্দচন্দ্র লিপি পাঠোদ্ধারের আগে।
প্রাচীন মিয়ানমার শিল্প বিশেষজ্ঞ ও গবেষক অস্ট্রেলিয়ার পামেলা গুটম্যানের মতে ভেসালি গড়া হয়েছিল ষষ্ঠ শতকে। সম্ভাব্য রাজা ভুতিচন্দ্র (৪৯৬-৫২০) অথবা নীতিচন্দ্র (৫২০-৫৭৫)। কিন্তু আনন্দচন্দ্র লিপিতে পাঠোদ্ধারের অযোগ্য পিঠে ভুতিচন্দ্রের নাম পাওয়ায় এখন নিশ্চিত যে নীতিচন্দ্রের আগে ৪৯৬-৫২০ সাধারণাব্দেই ভেসালি নাগরীর অস্তিত্ব ছিল।
কিন্তু এছাড়াও ভেসালি শহরের প্রতিষ্ঠার আরেকটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক কাহিনি বলে ৭৮৮ সাধারণাব্দে মাহা তাইং সান্দ্রা ভেসালি শহরের প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে যে ভেসালির ভগ্নাবশেষ দৃশ্যমান তা হল এই ৭৮৮ সাধারণাব্দের ভেসালি। এই ধারনার সপক্ষে বলা হয় ভগ্ন নগরীর নানা অংশে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ক যে লেখা রয়েছে তা অষ্টম শতকের নাগরি লিপি। প্রসঙ্গত আরাকানে আরাকানি লিপি প্রথম ব্যবহার শুরু হয় দ্বাদশ শতকের পরে। তার আগে শুধুই নাগরি লিপির প্রচলন ছিল। প্রশ্ন জাগে যদি ভেসালি ৭৮৮তে স্থাপিত হয়ে থাকে তবে ৭২৯ সাধারণাব্দে আনন্দচন্দ্র লিপি লেখা হল কি করে? একটা সম্ভাবনার কথা ভাবা যায়, রাজা মাহাতাইং সান্দ্রা ভেসালি নগরী প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং পুনঃনির্মাণ করেছিলেন ৭৮৮তে।
ভেসালির রাজবংশের ধর্ম বিশ্বাস
রাজবংশের তথা রাজার ধর্মই প্রজার ধর্ম (Cuius regio, eius religio) এমন একটা প্রথা এবং ধারনা প্রচলিত। কিন্তু ভেসালির দুটি প্রধান রাজবংশের প্রথমটি চন্দ্রবংশের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে কিছু মতভেদের সুযোগ আছে। রাজবংশটির ব্যবহৃত বংশগত চন্দ্র পদবী থেকে তাদের চন্দ্রবংশীয় বলে ভাবা হয়। চন্দ্রবংশের সব রাজাই নিজেদের ঈশ (শিবের একটি নাম) থেকে উদ্ভূত বলে দাবী করার ফলে রাজপরিবার এবং অভিজাত পরিবারগুলোকে শৈবধর্মী বলা হয়। শৈব রাজপরিবারটির প্রতীক ছিল শিবের নন্দী ষাঁড়। ষাঁড় ছিল তাদের প্রচলিত মুদ্রায় এবং ষাঁড়ের মূর্তি রাজধানী ভেসালিতে ইটের বেদীতে স্থাপিত ছিল। তবে শৈব সম্প্রদায় ভুক্ত হলেও চন্দ্র রাজত্বে ব্রাহ্মণ্যধর্মও প্রাধান্য পেত।
কিন্তু আরাকানের থেরবাদী বৌদ্ধ সান থা আং দৃঢ়ভাবে এই শৈবধর্মের ধারনাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দৃঢ় মত, চন্দ্রবংশীয় রাজারা থেরবাদী বৌদ্ধই ছিল। তাহলে ভেসালীতে নন্দী ষাঁড়ের মূর্তি কেন বা চন্দ্রবংশীয়দের মুদ্রাতেও ষাঁড় কেন? এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ও কিছু না, ষাঁড় ছিল রাজবংশের প্রতীক চিহ্ন মাত্র। কোন ধর্মীয় গুরুত্ব নেই।
আরাকানের ধান্যওয়াদ্দীর মহামুনি বুদ্ধমূর্তির উপাসনালয়ের প্রাচীন পুথি “মহান মূর্তির সত্য ইতিহাস” পাঠোদ্ধার করে প্রত্নবিদ স্যান শ্বে বু লেখেন, “চন্দ্র রাজারা বৌদ্ধধর্মের সমর্থক ছিলেন। তাঁরা মহামুনি মন্দির সহ বৌদ্ধধর্মকে রক্ষা ও মহিমান্বিত করতেন। তাঁদের এলাকা উত্তরে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। চট্টগ্রাম তখন চাটিগ্রাম নামে পরিচিত ছিল। এর থেকে যে উপসংহার টানা যায় তা হল, উইয়াসালি [ভেসালি] ছিল বৌদ্ধধর্মের মহাযানী রূপ অনুসরণকারী। রাজার রাজত্ব শাসন এবং জনগণ তথা প্রজাসাধারণ সবই ভারতীয় ছিল, কারণ মোঙ্গলীয় জাতিগুলোর অনুপ্রবেশ তখনও শুরু হয়নি।”
এই চন্দ্রবংশেরই রাজত্বকালে মহামুনি সহ বিভিন্ন কিংবদন্তির উৎপত্তি বলে অনুমান এবং হীনযান বৌদ্ধ ধর্ম তাঁদের রাজত্বকাল থেকেই আরাকানে প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। ভেসালিতেই এখনও আছে একক পাথর কুঁদে বানানো বুদ্ধের বিশাল মূর্তি। এছাড়া ছিল প্রচুর ক্ষুদ্রাকার বৌদ্ধ স্তূপ। আর ছিল প্রচুর এয়ে ধম্ম গাথায় ধম্মচক্রপ্পবত্তন সুত্ত-এর সংক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি। গুপ্তযুগের নাগরি লিপিতে, পালি ও সংস্কৃতে এয়ে ধম্ম হেতু বা প্রতীত্যসমুৎপাদ গাথা ও বৌদ্ধ ধর্মচর্চা বিষয়ক লিপিগুলো সবই এই চন্দ্র রাজবংশের আমলের। এর থেকে অনুমান করা যেতে পারে এই চন্দ্রবংশ শৈব ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মাচরণের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধধর্মেও সমান মর্যাদা ও ভক্তিশ্রদ্ধা প্রদর্শন করত। প্রকৃতপক্ষে ৫৭৫-৫৭৮ সাধারণাব্দের রাজা বীরচন্দ্র তো নিজস্ব সম্পদ ব্যয় করে ১০০টি বৌদ্ধ স্তূপ তৈরি করিয়েছিলেন। এছাড়া ভেসালিতে পাওয়া সচ্চবন্দ্র শিলালিপি অনুযায়ী, “এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা দ্বেনচন্দ্র ব্রাহ্মণ্য আচার অনুষ্ঠানের সাথেই মহাযান বৌদ্ধ ধর্মকেও রাজকীয় সমর্থনকে রাজ্যনীতি হিসাবে নথিবদ্ধ করেন।”
চন্দ্রবংশের পরে ভেসালিতে আসে দেব-আন্দজ বংশ। তাদের ধর্ম?
এই দ্বিতীয় রাজবংশটি ক্ষত্রিয় ও গরুড় পূজারী দেব-আন্দজ রাজবংশ বা শ্রী ধর্মরাজ-আন্দজ বংশ। আনন্দচন্দ্র লিপিতে গরুড়ের ছবি এই বংশেরই চিহ্ন বহন করে। আনন্দচন্দ্র লিপির ৬৪তম স্তবকে আনন্দচন্দ্র আত্মপরিচয়ে লিখেছেন তিনি অন্ধ্রের ভেঙ্গি শৈব রাজবংশের বংশধর। এই ভেঙ্গি রাজ্য সম্ভবত বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী গোদাবরী ও কৃষ্ণা নদীর অববাহিকায় ছিল।
৬৬৫-৭০১ সাধারণাব্দের রাজা ধর্মবিজয় সম্বন্ধে আনন্দচন্দ্র লিপি লিখেছে, ধর্মবিজয় নামকরণ হয় অন্ধ্রের ঐ বংশেরই আরেকজন রাজার নামানুসারে। ধর্মবিজয়ের মৃত্যুর পরে স্বর্গারোহনের বর্ণনায় লেখা হয়, ‘ত্রিরত্ন’ রাজা মৃত্যুতে লাভ করেন ‘লোকসুখম তুসিতম’। ‘ত্রিরত্ন’, ‘লোকসুখম তুসিতম’ শব্দের ব্যবহার থেকে অনুমান রাজা ধর্মবিজয় হীনযান বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তবে এমনও হতে পারে লেখার বাক্যবন্ধ শুধুই প্রচলিত বাক্য মাত্র।
ভেসালির রৌপ্য মুদ্রা
ভেসালির চন্দ্রবংশের উল্লেখযোগ্য কীর্তির মধ্যে পড়বে মুদ্রার প্রচলন। মিয়ানমারের মুদ্রা প্রচলনের প্রায় হাজার বৎসর আগেই প্রচলিত হয়েছিল আরাকানের মুদ্রা। মুদ্রায় ভেসালির চন্দ্র রাজবংশের প্রতীক শিবের ষাঁড় নন্দী এবং ত্রিশূল ছাপা থাকত। তাছাড়া কিছু মুদ্রায় শ্রীবৎস চিহ্নও পাওয়া গেছে। ভেসালির রৌপ্যমুদ্রা গুপ্ত সাম্রাজ্যের অনুকরণে প্রচলিত হয়। এই অনুকরণ শুধু মুদ্রা ব্যবস্থার ধারনার অনুকরণ নয়, একেবারে মুদ্রার নক্সা আর মাপে ওজনেও অনুকরণ হতে থাকে। আবার গুপ্ত সাম্রাজ্যের মুদ্রাও সম্ভবত অনুকরণ করা হয়েছিল কুষানদের মুদ্রা থেকে। আর কুষাণরা তাদের মুদ্রার অনুকরণ করেছিল রোমানদের থেকে।
সপ্তম শতাব্দীর শেষ ভাগের ভেসালির দেব-আন্দজ বংশের রাজা ধর্মবিজয় হরিকেল দখল করে যুগপৎ আরাকান ও হরিকেলের রাজা হলেন। কিন্তু ষাঁড় চিহ্ন সহ রাজা ধর্মবিজয়ের মুদ্রা আরাকানে মাত্র দুটি পাওয়া গেলেও হরিকেলে ও সমতটে অনেকগুলোই পাওয়া গেছে। অনেকে ব্যাখ্যা দেন, হরিকেলের রাজা সূর্যচন্দ্রের পুত্র ধর্মবিজয় ভেসালির সিংহাসন দখল করেছিলেন। কিন্তু হরিকেলের মুদ্রাগুলোর লিপি দশম শতাব্দীর। আবার দশম শতাব্দীতে আরাকানের কোন ভারতীয় রাজবংশ ছিল না। এছাড়া ভেসালির ভারতীয় রাজবংশের পতনের দুইশ বৎসর পরে দেখা মেলে হরিকেলের বৌদ্ধধর্মী চন্দ্রবংশের।
আরাকানে ভারতীয় রাজবংশের ক্ষমতা হারানোর পরে ভেসালির বাণিজ্যের স্রোত উল্টোদিকে বইতে শুরু করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বাণিজ্য তরী আরাকান থেকে বাইরে যাবার বদলে আরব থেকে বাণিজ্যতরীর আগমন হতে থাকে অনেক বেশি সংখ্যায়। কিন্তু তারপরেও বাংলায় ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে আরাকানি রৌপ্যমুদ্রা বাণিজ্যিক বিনিময় মাধ্যমের স্থান ধরে রেখেছিল আরও বহুকাল। পঞ্চদশ শতাব্দীতে আরাকানে চালু হয় গৌড়ের ইসলামিক সুলতানি মুদ্রা। প্রথানুযায়ী ইসলামিক মুদ্রা চিত্রহীন। সুলতানের নাম ও ধর্মীয় শব্দ উৎকীর্ণ থাকতো মাত্র। ভেসালির সেই রৌপ্যমুদ্রার বিশদ তথ্য নিয়ে আলাদা করে লেখার ইচ্ছে আপাতত স্থগিত থাকল।
তথ্যসূত্র-
- Noel F Singer, Vaisali And the Indianization of Arakan, APH Publishing Corporation, 2008.
- Htin KM. Early Buddhism in Myanmar: Ye Dhammā Inscriptions from Arakan. In: Early Interactions between South and Southeast Asia: Reflections on Cross-Cultural Exchange. Lectures, Workshops, and Proceedings of International Conferences. ISEAS–Yusof Ishak Institute; 2011, p-385-406.
- Ba Tha (Buthidaung), The Early Hindus and Tibetan-Burmans in Arakan” – The Guardian Magazine of November, 1964.
- The story of ancient Vesali Waithali.
- Pamela Gutman: Ancient Arakan Coinage, unpublished doctoral dissertation, Australian National University, 1976.
- Robert S Wicks: Bull and Trishula Coin issues of the Fifth and Eighth century from Arakan, Assam and Bengal, A revised topology and chronology. : Source: Museum Notes (American Numismatic society) Vol.25 1980. Published by American Numismatic Society.
- Tun Shwe Khine, MA: A Guide to Mahamuni.: Rakhine Book Series.
- Kyaw Minn Htin: Historical Geography Geography and Urbanization in Ancient Arakan. The archaeological landscape of the old capitals up to 1400 AD
- R C Majumdar: Hindu colonies of the far east.
- Arakan Today. Dec 6, 2011 edition.
- UN MMigration RCMC: Rohingya Cultural Memory Center.: Chronology of Arakan
- The Anandacandra Stone Inscription (2018) UNESCO Regional Committee, June 16, 2018
- Wikipedia
- Co-pilot Microsoft AI
অন্ধ্রপ্রদেশের নাগার্জুকোন্ডা শিলা লিপিতে যে নাম পাওয়া গেছে তার একটি হল ” কিলাতা”। যাকে নীহাররঞ্জন রায় ” কিরাত ” বলে উল্লেখ করেছেন। এই কিরাত কি বর্তমান ভারতের ” ত্রিপুরা ” রাজ্য?
কেন বলছি, ত্রিপুরার ইতিহাস লেখা গ্ৰন্থ রাজমালায় ত্রিপুরার পূর্ব নাম কিরাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজমালা অনেকেই সঙ্কলন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রাজমালা রচনা করেছেন।