সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সম্পাদকীয়

ডিসেম্বর ১, ২০২৫

বই পড়া কি লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে?

বিগত শতকে যারা জন্মেছেন, তারা অনেকেই বই পড়তেন। শুধু বই নয়—মাসিক বা পাক্ষিক পত্রিকাও ভাই-বোন মিলে কাড়াকাড়ি করে পড়া হত। এই নিয়ে জগৎ জুড়ে ভাই-বোনদের মধ্যে বহু মান-অভিমান হয়েছে।

শুধুই বই পড়ার জন্য, শুধুই পত্রিকা পড়ার জন্য। 

এক সময়ে বার্ষিক পরীক্ষার শেষে শীতের সন্ধ্যায় ছেলে-মেয়েরা চাদর মুড়ি দিয়ে বসে দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প পড়ত—তাই তো লেখা হয়েছিল চাঁদের পাহাড়, ভোম্বল সর্দার, ফেলুদা বা কাকাবাবুর গল্প। অথবা বর্ষার বিকেলে, যখন মাঠে গিয়ে খেলা অসম্ভব, তখন ঘরের বসে জমিয়ে পড়া হত শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মোক্তার ভূত, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের লুল্লু।

তবে এসব বিগত শতকের কথা।

ইন্টারনেট আসবার আগে, আপনি ট্রেনের কামরায়, বাড়ির ছাদে, পার্কের বেঞ্চে বসে বই পড়তেন। ট্রেন যাত্রার শেষে পাক্ষিক পত্রিকা, খবরের কাগজ দলা পাকিয়ে পড়ে থাকতে দেখাই ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। এখন বই বা পাক্ষিক পত্রিকা বাদ দিন, এমনকী কারোকে একটা খবরের কাগজ পড়তে দেখলে লোকে অবাক হয়ে বিজাতীয় মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকেন।

আমাদের অবকাশ যাপন, আমাদের জ্ঞান আহরণের পদ্ধতি কি পাল্টে গেছে? বই পড়া কি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে?

ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের নেতৃত্বে একটি গবেষণা দলের মতে, ডিজিটাল মিডিয়ার কারণে মূলত বিনোদন হিসেবে বই বা পত্রিকা পড়ার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। তাঁরা দেখেছেন যে গত দুই দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মানসিক আনন্দের জন্য পড়ার প্রবণতা ৪০ শতাংশ কমেছে। গবেষকরা ২০০৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ১৫ বছর এবং তার বেশি বয়সী ২,৩৬,০০০ এরও বেশি মার্কিনের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যারা বই, ম্যাগাজিন, সংবাদপত্র বা ই-রিডার পড়েন অথবা যারা প্রতিদিন অডিওবুক শোনেন তাদের সংখ্যাও প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে।

তবে এই প্রবণতা শুধু মার্কিন দেশে সীমাবদ্ধ নয়, সারা পৃথিবীতেই এই ঝোঁক ছড়িয়ে গেছে। বাংলা ভাষার প্রকাশনা সংস্থাগুলি আজকে ধুঁকছে।

কেন বই পড়া দরকার? কেন পড়া দরকার?

ব্যক্তিগত বোধের (cognition) বিকাশের জন্য জীবনে পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ, কারণ পড়লে জ্ঞানের প্রসার ঘটে, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা করতে শেখে এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়। আহৃত এই জ্ঞান ও চলার পথে জীবনের যে অভিজ্ঞতা হয় তার মিলিত ফসল হল বোধ। বোধের বিকাশের ফলে মানুষ অন্য সব প্রাণীর থেকে ভিন্ন জীবন যাপন করতে সক্ষম হয়েছে।

অবশ্য এখন পড়ার সময়ও কমে গেছে, শিশুদের উপরেও পাঠের বোঝা বেড়েই চলেছে। তবে শিশুদের সঙ্গে মা বাবা যদি প্রতিদিন ধৈর্য ধরে এক ঘন্টা সময় দেন, একত্রে বই পড়েন, তাহলে হয়তো আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব। স্বীকার করতেই হবে গল্পের বই পড়ার অভ্যাস আবার ফিরে এসেছিল হ্যারি পটার সিরিজ লেখার সময়ে। অর্থাৎ শিশুকে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে মা বাবাকে যেমন বই পড়াতে সময় দিতে হবে, তেমনই লেখককেও ভাবতে হবে কীভাবে লেখাকে আরও আকর্ষণীয় করা যায়। লেখকদেরও হয়তো ভাবনার সময় এসেছে—বিভিন্ন বয়সের মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝে তাদের উপযোগী করে সেই রচনাকে নতুন ভাবে পরিবেশন করতে হবে।

নতুবা আমরা সিরিয়াল, শর্টস, সেলফি ও ব্লিনকিট-এর জীবনেই শুধু অভ্যস্ত হয়ে যাব।

তাতেই বা ক্ষতি কী? 

ক্ষতি আছে, ভয়ঙ্কর সেই ক্ষতি। হয়তো সুদূর কোনো এক অনাগত ভবিষ্যতে মানুষের চিন্তাশক্তি কমে যাবে, বোধ আর বিকশিত হবে না। সে কি আর মানব থাকবে?

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।