সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

আকাশবাণীর নামকরণ

আকাশবাণীর নামকরণ

মানসপ্রতিম দাস

সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৫ ৭৩২ 7

‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ নামটা এল কীভাবে তা নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ দেখা যায় না বাঙালি সমাজে। কিন্তু ‘আকাশবাণী’ এই নামটি কার দেওয়া তা নিয়ে অনড় একটা জবাব তৈরি হয়ে আছে অনেকদিন ধরেই। এ নিয়ে আবালবৃদ্ধবনিতা চিন্তিত এমন দাবি করা কখনোই উচিত হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে একটু-আধটু মাথা ঘামান যাঁরা তাঁদের কাছে উত্তর অবশ্য তৈরি হয়েই আছে। রবীন্দ্রনাথ এই নামকরণ করেছিলেন।

কিঞ্চিৎ বেশি উৎসাহী যাঁরা তাঁদের আলোচনায় আমরা চলে যাই সেই ১৯৩৮ সালে। শর্টওয়েভ ট্র্যান্সমিটারের উদ্বোধন উপলক্ষে অনেকরকম আয়োজন হল। এর মধ্যে একটা ছিল ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকার বিশেষ সংস্করণ প্রকাশ। এই সংখ্যার জন্য রবীন্দ্রনাথের একটি লেখা যাতে পাওয়া যায় তার জন্য চেষ্টা করতে পত্রিকার সম্পাদক নলিনীকান্ত সরকার পৌঁছলেন শান্তিনিকেতনে, সঙ্গে ছিলেন সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী। গিয়ে জানলেন যে কবি বেশ অসুস্থ, পাওয়া যাবে না লেখা। হতাশ হয়ে দু’জনে ফিরলেন কলকাতায়। এর তিন দিন পরেই একটা চিঠি এল নলিনীকান্তের কাছে। সুধাকান্ত রায়চৌধুরী জানিয়েছেন যে ওঁরা ফিরে আসার পরেই একখানা কবিতা লিখে পাঠিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁকে দিয়েছেন কবি। শিরোনাম নেই সে কবিতার, ছাপা হল বেতার জগৎ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায়। কবিতার প্রথম চারটে লাইন এইরকম—

ধরার আঙিনা হতে ঐ শোনো

উঠিল আকাশবাণী।

অমরলোকের মহিমা দিল যে

মর্ত্যলোকেরে আনি।

কবির হাতে এই রচনার তারিখ লেখা ৫ আগস্ট, ১৯৩৮। পত্রিকার জন্য এটাই ছিল তাঁর প্রথম ও শেষ বাণী। যে রেফারেন্স ব্যবহার হল এখানে তা প্রাথমিক নয় মোটেই। প্রাবন্ধিক লিখেছেন শোনা কথা বা পাঠ করা লেখার উপর ভিত্তি করে, সেই সূত্রের উল্লেখ নেই প্রবন্ধে। তবে আকাশবাণী শব্দটা বোধহয় এর আগেও ব্যবহার করেছেন বা অন্তত ব্যবহারের কথা ভেবেছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘বাংলা শব্দতত্ত্ব’ শীর্ষক রচনায় খুঁজে পাই এই দুটো বাক্য—

‘ … Broadcast-এর বাংলা চান। আমি কখনো কখনো ঠাট্টার সুরে বলি আকাশবাণী।’

যে পৃষ্ঠায় এই লেখা রয়েছে তার পাদটীকায় বলা আছে যে নলিনীকান্ত সরকার তাঁর লেখা ‘শ্রদ্ধাস্পদেষু’ গ্রন্থে ‘রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক প্রবন্ধে এই কবিতাটি লিপিবদ্ধ করেছেন এবং লেখার প্রসঙ্গ জানিয়েছেন। দুঃখের বিষয়, নলিনীকান্তের অন্য বই পেলেও বর্তমান লেখকের পক্ষে এই বইটি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। হাতে পেলে হয়ত দীর্ঘায়িত করা যেত আলোচনার এই অংশ।

ইন্টারনেট আসার পরে আমাদের জানার পরিধি বেড়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখের সামনে আসছে হরেক রকম তথ্য। আকাশবাণী নিয়েও দু’চারটে লেখা ভেসে আসে সামনে। চলে আসে নামকরণের প্রসঙ্গও, এক-আধবার উঁকি দেয় বিতর্ক। রবীন্দ্রনাথ না মহীশূর? বাংলা নাকি কন্নড়? কে নেবে ‘আকাশবাণী’ নামকরণের কৃতিত্ব? এ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে নিঃসন্দেহে।

মনোবিদ গোপালস্বামী

মানুষটা একাই একশো। পেশায় তিনি সাইকোলজির অধ্যাপক। শখে বেতার কেন্দ্রের নির্মাতা ও পরিচালক, বয়স্কশিক্ষার প্রসারে উদ্যোগী, টেনিস খেলতে উৎসাহী। তাঁর নাতির স্মৃতিচারণে জানতে পারি যে নানা ওঠাপড়ায় ভরা এম ভি গোপালস্বামীর জীবন। আজকের তামিলনাড়ুতে ১৮৯৬ সালে তাঁর জন্ম, পড়াশোনা পাচাইয়াপ্পা কলেজে। কিন্তু বিলেতে গিয়ে দেখলেন যে একেবারেই কোনো গুরুত্ব নেই তাঁর ডিগ্রির। তাই সেখানে ফের স্নাতক স্তর থেকে পড়াশোনা শুরু করতে হল। অবশেষে ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ লন্ডন-এ চার্লস স্পিয়ারম্যানের কাছে সাইকোলজিতে পিএইচডি করলেন। বিলেত থেকে ফিরে ১৯২৪ সালে ইউনিভার্সিটি অফ মাইসোর-এর অধীনে এক কলেজে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন মনস্তত্ত্ব পাঠ ও গবেষণার জন্য আলাদা বিভাগ। এই বিভাগ প্রাচীনত্বের দিক থেকে দেশে দ্বিতীয় স্থান দখল করে আছে। কন্নড় ভাষা জানতেন না তামিল এই পণ্ডিত, কিন্তু কর্মসূত্রে মহীশূর হয়ে উঠল তাঁর দ্বিতীয় গৃহ। এখানেই তাঁকে পেয়ে বসল বেতার সম্প্রচার নিয়ে নাড়াচাড়ার শখ। বেতারের জন্য যে কারিগরী বিদ্যা লাগে তাতে দক্ষ ছিলেন জগদীশ—গোপালস্বামীর সহযোগী। দু’জনে মিলে মেতে রইলেন নানা পরীক্ষানিরীক্ষায়। ট্র্যান্সমিটার যোগাড় করে এক সময় বেতার কেন্দ্র স্থাপনে উদ্যোগী হলেন তাঁরা। সালটা ১৯৩৬। সমস্যা হল অ্যান্টেনা দাঁড় করাতে গিয়ে, ষাট ফুট উঁচু দণ্ডের মাথায় অ্যান্টেনা বসাবে কে? মুশকিল আসান হয়ে এগিয়ে এল গোপালস্বামীর বিশ্বস্ত অনুচর মল্ল, ষাট ফুট চড়ে ঠিক বেঁধে দিয়ে এলেন অ্যান্টেনা। সম্প্রচারের ব্যবস্থা হল নিজের বাসস্থান ‘ভিট্‌ঠল বিহার’ থেকে। কিন্তু শুনবে কে? এক-একটা রিসিভার সেটের দাম তখনকার দিনে তিনশ টাকা। শখের জন্য এতটা অর্থ ব্যয় করতে পারে কে! তখন উদ্ভাবনী ব্যবস্থা ভাবলেন গোপালস্বামী। সবার জন্য উন্মুক্ত উদ্যান বা পাবলিক পার্কে ‘রিসিভার সেট’ বসানোর ব্যবস্থা করলেন তিনি। অভিনব একটা ব্যাপার দেখল মহীশূরের মানুষজন। জোড়া হল লাউডস্পীকার। এবার আর শুনতে বাধা নেই! সঙ্গীতশিল্পী ও বক্তাদের নিয়ে আসা হত টোঙ্গা করে, খাওয়ানো হত উপমা আর কফি। এভাবেই কাজ শুরু করল ভারতের প্রথম বেসরকারি বা ব্যক্তিগত রেডিও স্টেশন। নিজের উপার্জন থেকেই এসব খরচ মেটাতেন গোপালস্বামী।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সংবাদের ব্যাপারে একটা আগ্রহ দেখা দিল নাগরিকদের মনে। নতুন উদ্যোগ দরকার, বার্ষিক একটা অর্থসাহায্য করতে এগিয়ে এল মহীশূরের পুরসভা। এক বক্তৃতার আসরে বেতার নিয়ে আলোচনা শুনলেন এইচ কে রঙ্গনাথের কন্ঠে, এতই ভালো লাগল যে গোপালস্বামী তাঁকে সংবাদপাঠক হিসেবে বেছে নিলেন। তাঁর জন্য মাসিক বেতন ধার্য হল কুড়ি টাকা। ‘ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন’-এর (বিবিসি) দেওয়া খবর শুনে, খবরের কাগজ ঘেঁটে স্ক্রিপ্ট বানাতেন নারায়ণ কস্তুরী। সেটাই দিনে তিন বার পাঠ করতেন রঙ্গনাথ।

কস্তুরীর অবদান

নানা কারণে কস্তুরীর নিজেরও বেশ উল্লেখযোগ্য একটা অনুগত গোষ্ঠী ছিল। অন্যান্যদের সঙ্গে সেই বৃত্তে ছিলেন ছাত্র রঙ্গনাথ। সাহিত্য রচনায় সাফল্যের পাশাপাশি কস্তুরী খ্যাতি অর্জন করেছিলেন রঙ্গরসের কথক হিসেবে। সম্প্রচারের ক্ষেত্রে এইসব কাজে এসেছিল। তিনি এবং গোপালস্বামী কাজ করতেন একই প্রতিষ্ঠানে—‘মহারাজা’স কলেজ’। সেখানেই তিনি দেখলেন যে বিদেশের এক কনফারেন্স থেকে ফেরার সময় গোপালস্বামী হল্যান্ড থেকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন একখানা ট্র্যান্সমিটার। তাঁর ভাষ্যে জানা যায় যে মহীশূরের পুরসভা বার্ষিক বরাদ্দ দিয়েছিল শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের জন্য। শর্টওয়েভ যুক্ত হওয়ার পরে গোপালস্বামীর বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচার পৌঁছে যেতে লাগল দূর দূরান্তে।

একদিন কলেজের কমন রুমে এসে বসলেন গোপালস্বামী। সেই ঘরটা চিহ্নিত হত চিন্তন-গৃহ হিসেবে। সহযোগীদের কাছে গোপালস্বামী একটা নাম চাইলেন তাঁর বেতার কেন্দ্রের জন্য। সবাই ভাবলেন বিষয়টা নিয়ে, অবশেষে কস্তুরীর দেওয়া নাম পছন্দ হল পরিচালকের। আকাশবাণী। স্পষ্ট করে সালের উল্লেখ অবশ্য নেই এখানে। সেটা কি ১৯৩৮ সালের আগস্টের আগে নাকি পরে? যাই হোক, গোপালস্বামী কস্তুরীকে রাজি করালেন পূর্ণ সময়ের সহ-পরিচালক হিসেবে তাঁর বেতার কেন্দ্রে যোগ দিতে। আগেই আমরা জেনেছি যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সংবাদের স্ক্রিপ্ট লেখার দায়িত্ব নিয়েছিলেন কস্তুরী। কী কী করতেন তিনি তার একটা ধারণা দিয়েছেন নিজের লেখায়। ১৯৩৬ সালে ভারতের সরকারি বেতার সম্প্রচারকের নাম হয়ে গিয়েছে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’, সংক্ষেপে এআইআর (AIR)। দিল্লী কেন্দ্র থেকে যে সংবাদ প্রচারিত হত তা মন দিয়ে শুনতেন কস্তুরী, শ্রোতাদের জন্য যেগুলো উপযুক্ত মনে হত তা লিখে রাখতেন যত্ন করে। কন্নড় ভাষায় সেগুলো অনুবাদ করে, হাতে লেখা স্ক্রিপ্ট দিতেন রঙ্গনাথের হাতে। নিজের বিএসএ সাইকেলে করে দু’ মাইল দূরের কেন্দ্রে সেটা নিয়ে যেতেন রঙ্গনাথ। শত মনযোগ সত্ত্বেও অবশ্য কিছু বিষয় বাদ পড়ে যেত স্ক্রিপ্ট থেকে। যেমন একবার দেরিতে জানলেন যে, কাবেরী বাঁধের নীচে অবস্থিত বৃন্দাবন গার্ডেন্‌স ঘুরে গিয়েছেন লর্ড ওয়াভেল। সেটা আর জায়গা পা নি স্ক্রিপ্ট-এ। আর একবার ঘোষকের উচ্চারণের ভুলে কন্নড় ভাষায় ‘শ্রোথ্রুগলু’ শোনাল ‘শত্রুগলু’। শ্রোতৃবৃন্দের বদলে শত্রুবৃন্দ! দায় চাপল কস্তুরীর কাঁধে। এখানেই শেষ নয়। একবার দশেরা উৎসবের সময় ন’ দিন ধরে বিশেষ এক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করা হল এবং রিহার্সাল চলল পুরোদমে। চার দিন ধরে ভালোই চলল সম্প্রচার। পঞ্চম দিনে এসে গোপালস্বামী বললেন যে বাকি পর্বগুলোর মধ্যে একটা নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। সেখানে দেবীর যে নাম ব্যবহৃত হয়েছে সেটা এক হোমরাচোমরা পদাধিকারীর স্ত্রীর নাম। সেটা গণমাধ্যমে এভাবে ব্যবহৃত হোক তা মোটেই চান না সেই মানুষটি। ঝুঁকি না নিয়ে বাকি পর্বগুলো বাতিল করতে বললেন গোপালস্বামী। কিন্তু ইংরেজির শিক্ষক কস্তুরী সে কথা না মেনে চালিয়ে গেলেন সম্প্রচার। ফল যা হল তা মোটেই সুখের নয়। একদিকে গোপালস্বামী কস্তুরীর জায়গায় তাঁরই এক সহকর্মীকে নিয়োগ করলেন বেতার কেন্দ্রের সহ পরিচালকের পদে। অন্যদিকে দু’শ কিলোমিটার দূরে, শিমোগার এক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে বদলি করা হল তাঁকে। সেখানে ম্যালেরিয়ার উৎপাত, মহীশূরের সুযোগসুবিধে যে নেই তা বলাই বাহুল্য। ১৯৪৬ সালে সেখানেই যেতে বাধ্য হলেন কস্তুরী।

পরে, স্বাধীন ভারতে, আবার বেতারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন কস্তুরী। ব্যাঙ্গালোর কেন্দ্রে তাঁকে প্রোডিউসার হিসেবে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তিনি তা গ্রহণ করেন। কেন্দ্রের মানুষজন এটা আবিষ্কার করে খুশি হন যে তিনিই ‘আকাশবাণী’ নামটা দিয়েছিলেন এবং এটা বুঝে সহমর্মিতা দেখান যে তাঁকে অন্যায্যভাবে বহিষ্কার করা হয়েছিল মহীশূরের বেতার কেন্দ্র থেকে। গ্রামের মানুষদের জন্য, শিশুদের জন্য এবং মহিলাদের জন্য যেসব অনুষ্ঠান হয় তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কস্তুরীকে। এছাড়াও বিশেষ বিশেষ দিবসে সম্প্রচারের প্রস্তুতির গুরুদায়িত্ব পড়ত তাঁর কাঁধে। কস্তুরীর আর একটি বিশেষ পরিচয় হল, তিনি পুত্তাপার্থীর সত্য সাঁই বাবার ঘনিষ্ঠ শিষ্য ছিলেন। বাবার আদেশ না নিয়ে কাজে নামতেন না তিনি। তেমনি ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে যখন তিনি আদেশ পেলেন রেডিওর কাজ ছেড়ে বাবার শুরু করা মাসিক নিউজ লেটার-এর সম্পাদকের দায়িত্ব নেওয়ার তখন দ্বিধা না করে তা পালন করেন তিনি। ১৯৮৭ সালে মৃত্যুর আগে অবধি এই পদে ছিলেন কস্তুরী।

৫  

নামকরণ পর্ব

মহীশূরের বেসরকারি বেতার কেন্দ্র চিরকাল গোপালস্বামীর হাতে থাকেনি। সেটা আরউইন রোডে স্থানান্তরিত হয় এবং একটা সময়ে মহীশূরের পুরসভা সেটা অধিগ্রহণ করে। অবশেষে হাতবদল হয়ে ১৯৪২ সালে মহীশূরের মহারাজার অধিকারে চলে যায়। ১৯৫৫ সালের দোসরা নভেম্বর, পঞ্চাশ কিলোওয়াটের মিডিয়াম ওয়েভ ট্র্যান্সমিটার নিয়ে উদ্বোধন হয় ব্যাঙ্গালোর বেতার কেন্দ্রের। এই সময়েই বন্ধ করে দেওয়া হয় মহীশূরের বেতার কেন্দ্র। এই নিয়ে স্থানীয় মানুষের বিক্ষোভ থাকলেও তাতে আমল দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক। ১৯৫৬ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের সিদ্ধান্তে গৃহীত হল ‘আকাশবাণী’ নামটি। স্থির হল যে ইংরেজি ভাষায় অনুষ্ঠান ছাড়া আকাশবাণী নামটাই ব্যবহৃত হবে যাবতীয় সম্প্রচারে। এর সঙ্গে আরও একটা জায়গায় চলে এল আকাশবাণী নামটা। ১৯২৭ সালে ভারতে বেতারের ইংরেজি ভাষার মুখপত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল Indian Radio Times. এই নাম ১৯৩৫ সালে পাল্টে হয়ে যায় Indian Listener. ১৯৬৩ সালের জানুয়ারিতে এই নাম আবার পাল্টে হয়ে গেল Akashvani. হিন্দী ভাষাতেও অবশ্য এই একই নামে মুখপত্র ছিল। আগে তার নাম ছিল ‘সারঙ’।  

এতটা জেনে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেন পাঠক। কে, কার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-র নাম দিলেন আকাশবাণী? এটা বললে চলবে না, সম্প্রচারক সংস্থার এত সুন্দর একটা নাম যে রয়েছে সেটাই যথেষ্ট। নামকরণের আপাত তুচ্ছ ঘটনার মধ্যেও হয়ত থেকে যেতে পারে কিছু প্রভাব, কিছু ঝোঁক, কিছু ব্যক্তিগত পছন্দ যা অবহেলার নয়। তথ্যের অভাবে ইতিহাসের সেই অংশটা তুলে ধরা গেল না এখানে। রয়ে গেল আক্ষেপ। তবে এটা দিয়ে শেষ করা যায়, মহীশূরের সঙ্গে কোনো বৈরিতা ছিল না রবীন্দ্রনাথের। ১৯১৯ সালে সুরেন করকে নিয়ে তিনি ‘মাইসোর ইউনিভার্সিটি’-তে গিয়েছিলেন, বিশ্বভারতীর জন্য সেখান থেকে সংগ্রহ করেছিলেন অর্থ। ১৯২৮ সালে ব্যাঙ্গালোরের নামি এক অতিথিশালায় তিনি ছিলেন, সেখানেই শেষ করেন ‘শেষের কবিতা’ লেখা। পরে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার পথে ব্যাঙ্গালোরে থেকে তিনি ‘শাপমোচন’ ও ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যের অভিনয় করেন।১০ ফলে নামকরণের প্রশ্নে অন্তত কবিকে দাঁড় করানো চলবে না মহীশূরের বিপরীতে! ভারতের সংস্কৃতি সংশ্লেষের। সেভাবেই উঠে এসেছে আকাশবাণী নামটি।

তথ্যসূত্র

১। অজিত বসু, রবীন্দ্রনাথের বেতার-সম্প্রচার, কলকাতা পুরশ্রী, (২০ আগস্ট ২০১০)৷

২। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলা শব্দতত্ত্ব, বিশ্বভারতী, তৃতীয় স্বতন্ত্র সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১৯৮ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)৷

৩। Bharathi Ghanashyam, Connecting with my grandfather Dr. M.V. Gopalaswamy who founded Akashvani, Star of Mysore, https://starofmysore.com/connecting-with-my-grandfather-dr-m-v-gopalaswamy-who-founded-akashvani/amp/

৪। N Kasturi, Loving God, p.76, (Sri Sathya Sai Books and Publications Trust, 1982).

৫। ঐ, p.226-228

৬। Antonio Rigopoulus, The hagiographer and the avatar: The Life and Works of Narayan Kasturi, p.149 (State University of New York Press, Albany, 2021).

৭। Akashvani Mysore is 90, Star of Mysore, https://starofmysore.com/akashvani-mysore-is-90/

৮। G C Awasthy, Broadcasting in India, p.15 (Allied Publishers Private Limited, 1965).

৯। ঐ, p.207-209

১০। Papiya Bhattacharya, Tagore’s Kannada Connection, 07 May 2015, The New Indian Express, https://www.newindianexpress.com/cities/bengaluru/2015/May/07/tagores-kannada-connection-757288.html

বিজ্ঞানের ইতিহাস ও জনপ্রিয় বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি ও সম্প্রচারের কাজে তিন দশক ধরে যুক্ত আছেন। স্নাতক থেকে পিএইচডি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আকাশবাণীর অনুষ্ঠান আধিকারিক হওয়ার পাশাপাশি একজন স্বাধীন গবেষক। প্রকাশিত বই: ন্যানোটেকনোলজি, নক্ষত্রের নকশিকাঁথা, শতাব্দীর বিশ্বমারী, জলবায়ু বিতর্ক, একুশ শতকের নোবেলজয়ী চিকিৎসাবিজ্ঞান, সুস্থায়ী উন্নয়নের নীল নকশা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু: একটি জীবনকথা।

মন্তব্য তালিকা - “আকাশবাণীর নামকরণ”

  1. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়া বাকি পুরো অংশটাই নতুন জানলাম। খুব সুন্দর করে, কোনরকম পক্ষপাতিত্ব না করে ইতিহাস প্রকাশ করার জন্য অনেক পড়াশোনা, জ্ঞান আর সাহস দরকার । সবই উপস্থিত। অসংখ্য ধন্যবাদ।

  2. পক্ষপাতিত্বহীন ইতিহাস যেমন হওয়া উচিত।
    প্রিয় বিজ্ঞান গবেষককে🎤
    আন্তরিক অভিনন্দন🎤🎤
    ও শুভেচ্ছা🎤🎤🎤🎤

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।