সম্পাদকীয়
আর কতকাল নারী সুরক্ষা হবে রাজনীতির হাতিয়ার!
১৩৩২ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যার ‘প্রবাসী’তে বিবিধ প্রসঙ্গ বিভাগে ‘নারীরক্ষা সমিতি’ শিরোনামে একটি আবেদন প্রকাশিত হয়।
‘বঙ্গের নানা জেলায়, বিশেষত উত্তর ও পূর্ববঙ্গে, দুর্বৃত্ত লোকেরা অনেক স্থলে নারীদের উপর অবাধে অত্যাচার করে। লাঞ্ছিতা অনেক নারী ও তাঁহাদের আত্মীয়-স্বজনগণ অনেক সময় পাতিত্যের ভয়ে কিংবা দুর্বৃত্তদের প্রতিহিংসার ভয়ে অত্যাচারের কথা প্রকাশ করে না। অনেক সময় স্থানীয় পুলিশের শৈথিল্যে বা উৎকোচগ্রাহিতার জন্য, কিংবা অত্যাচারিতাদের মোকদ্দমা চালাইবার মত টাকা না থাকায়, দুর্বৃত্তরা দণ্ড পায় না। অন্যদিকে, কয়েকটি মোকদ্দমায়, যেমন বরদাসুন্দরী ও সুহাসিনীর মোকদ্দমায়, দেখা গিয়াছে যে, অত্যাচারিতদের অভিযোগের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা চলাইবার জন্য টাকার অভাব হয় না।
এরূপ অবস্থায় অত্যাচার দমনের জন্য এবং অত্যাচারিতদের পক্ষ অবলম্বন করিয়া মোকদ্দমা চালাইবার জন্য গ্রামে গ্রামে নারীরক্ষা সমিতি স্থাপন, জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর সাহসী পুরুষদিগের দ্বারা রক্ষীদল গঠন, অর্থসংগ্রহ, প্রভৃতি করা আবশ্যক। …. এইসকল উদ্দেশ্য সাধন করিবার জন্য জনসাধারণের নিকট আমরা জনবল ও অর্থবল প্রার্থনা করিতেছি।’
আবেদনের নিচে যাঁদের স্বাক্ষর ছিল তাঁদের মধ্যে আছেন বিখ্যাত রসায়নবিদ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, ব্রাহ্মসমাজের নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী কৃষ্ণকুমার মিত্র, বিশিষ্ট সমাজসেবী এবং বেঙ্গল কেমিক্যাল-এর পরিচালনমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য সত্যানন্দ বসু, বিশিষ্ট আইনজীবী যতীন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ।
আসলে আমাদের পুরাণ ও মহাকাব্যেও নারীর প্রতি অবিচার ও নির্দয় আচরণের বহু উদাহরণ পাওয়া যায়। মহাকাব্য ইতিহাস নয় ঠিকই, কিন্তু মহাকাব্য তার রচনাকালের সমাজচিত্রকে প্রতিফলিত করে। যুগে যুগে আমাদের মহাকাব্য মহাভারতে নতুন নতুন কাহিনী সংযোজিত হয়েছে। সেই মহাকাব্যের দিকে যদি তাকাই তাহলে কী দেখতে পাই? নারীর উপর পুরুষের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ও নির্দয় আচরণ বহুলভাবে চিত্রিত। ধৃতরাষ্ট্রের রাজসভায় দ্রৌপদীর প্রকাশ্য লাঞ্ছনা মূল গল্পের নির্ধারক বৃত্তান্ত। এ ঘটনায় নারীর প্রতি যে শারীরিক ও মানসিক নির্দয়তার প্রকাশ ঘটেছে তা দেখিয়েছে নারী সমাজে কতটা অসহায়। নারী চরম নিষ্ঠুরতার শিকার হলেও সমাজ পুরুষের অত্যাচারকে ক্ষমা করেছে, এমনকী অনুমোদন করেছে।
রামায়ণে প্রজবৎসল রাজা রামচন্দ্র তাঁর স্ত্রী সীতাকে বিনা অপরাধে ত্যাগ করেছেন শুধুমাত্র প্রজাদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার তাগিদে। তবে সেই যুগে সারা পৃথিবীতেই এই অবিচার চলেছে। পৃথিবীর মহাকাব্য ও ধর্ম গ্রন্থে সেই বিবরণ ছত্রে ছত্রে পাওয়া যায়।
তবে আধুনিক যুগে গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে নতুনভাবে নারী অধিকার স্বীকৃত হয়েছে—অন্তত খাতায় কলমে। উপরের প্রতিবেদন লেখার শতবর্ষ অতিবাহিত। স্বাধীনতার পর ৭৮ বছর অতিক্রান্ত।
জনগণের দ্বারা নির্বাচিত কেন্দ্রে ও রাজ্যে ক্ষমতাসীন গণতান্ত্রিক সরকার। দেশের আছে নিজস্ব সংবিধান। সেই সংবিধানকে রক্ষা করার অঙ্গীকার নিয়ে জনপ্রতিনিধিরা দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশের নির্দিষ্ট আইন আছে, আইন রক্ষার জন্য পুলিশবাহিনী আছে, বিচারব্যবস্থা আছে। ভারতের সংবিধানে মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমান অধিকার স্বীকৃত, বৈষম্য নিষিদ্ধ—ধারা ১৪-এ আইনের সামনে সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে, এছাড়াও ধারা ১৫(৩) নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। জাতীয় মহিলা কমিশন গঠিত হয়েছে।
দেশের নারীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
তবু কোথায় যেন এক বিরাট ফাঁকি ধরা পড়ে গেছে। খোদ রাজধানী দিল্লিতে নির্ভয়া কাণ্ডে দেশ তোলপাড় হয়েছিল৷ হাথরস, উন্নাও … এক একটি দগদগে স্মৃতি। আর জি কর হাসপাতালের ঘটনা এক বছর পেরিয়ে গেল, সরকারে আসীন রাজনৈতিক দলটি অপরাধীদের আড়াল করতে আংশিক সফল তো বটে! কলেজের মধ্যেই গণধর্ষিত ছাত্রী, মূল অভিযুক্ত কলেজেরই প্রাক্তনী এবং শিক্ষাকর্মী। ন্যায়বিচার না পাওয়ার ঘটনা এইসমস্ত অপরাধকে আরও উৎসাহিত করছে।
আর ভারতবর্ষের বর্তমান শাসক যে পথে দেশকে চালিত করতে চায় সেটি মানুবাদী সংস্কৃতির মতাদর্শ। সেখানে নারীকে দেবীরূপে মহিমান্বিত করার কপট প্রয়াস আছে, ‘মাতৃশক্তি’ বলে প্রতিপন্ন করার ভেক আছে কিন্তু নারীর মর্যাদা রক্ষা বা নারী পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার চিন্তা অনুপস্থিত।
সম্প্রতি একটি পত্রিকায় নারী নির্যাতন বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন এক নারী, ‘ট্রেনে বাসে, ভিড় রাস্তায় যেসব অবাঞ্ছিত স্পর্শ নারীদের সইতে হয় তার প্রতিকার এই সমাজে কীভাবে হবে, আর কবেই বা হবে!’ একজন শিক্ষিত মহিলাও তার কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে হাড়ে হাড়ে টের পায়, সে আসলে ‘মেয়েছেলে’ —সমাজের ভোগ্যপণ্য! …. ‘
নারীদের প্রতি যোগ্য সম্মান প্রদর্শন করার অভ্যাস আমরা প্রতিদিন করে চলেছি তো? অন্তত আমরা যারা ইতিহাস সচেতন। নারীদের সুরক্ষার জন্য আইনি ও নীতিগত পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, বিচার ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রশিক্ষণ জরুরি। এখানেই ফাঁকি রয়ে গেছে, অন্যায়ের যথোপযুক্ত শাস্তি হয় না, তাই নারীদের প্রতি সহিংসতা ও অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশ এবং বিচারব্যবস্থা থেকে গেছে অসংবেদনশীল, অদক্ষ এবং গতানুগতিক।
আর তাই রাজনীতিবিদরা নারী সুরক্ষাকেও ভোটের হাতিয়ার করতে সাহস পায়।