সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সম্পাদকীয়

আগস্ট ৩, ২০২৫

ইতিহাসের আলো-আঁধারি

আগস্ট মাস ভারতের স্বাধীনতার মাস, সেই মাসের শুরুতেই স্বাধীনতার প্রায় আট দশক বাদে এমন একটি বিষয় নিয়ে লিখতে হচ্ছে যা আদৌ আশাপ্রদ নয়। ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা সংস্থা এনসিইআরটি কিছুদিন আগে আরও একটি সমাজবিজ্ঞানের নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করেছেন, অষ্টম শ্রেণির জন্য লেখা এবারকার বইটির নাম ‘এক্সপ্লোরিং সোসাইটি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড বিয়ন্ড’। বইটিতে উল্লিখিত তথ্যের সত্যি মিথ্যে নিয়ে বিদ্বান মহলে ইতিমধ্যেই  বিতর্ক শুরু হয়েছে, বাংলায় বর্গী হামলার ইতিহাস কেন বাদ দেওয়া হল, বা আহোমদের আদি বাসস্থান ঠিক লেখা হয়েছে কিনা এই সব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ সবের চাইতে অনেক বেশি চিন্তাজনক ভারতের মধ্যযুগের ইতিহাস সম্পর্কে একটি বিশেষ ধারণা কিশোরদের মনে গেঁথে দেওয়ার প্রয়াস এই বইটিতে প্রতিফলিত হয়েছে। 

এই বইটিতে প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে, তা হল, বিগত কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা ইতিহাস চর্চার ফলে ভারতে মধ্যযুগের কালপর্ব সম্পর্কে যে সাধারণ ঐক্যমত তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে পিছনে ফিরে গিয়ে একাদশ শতক সাধারণাব্দ থেকে সপ্তদশ শতক সাধারণাব্দ পর্যন্ত সময়কে মধ্যযুগের কাল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই কাল বিভাজনের যুক্তি কী তা এই পাঠ্যপুস্তকে উল্লেখ করা হবে সেই আশা করা যায় না, কিন্তু অভিপ্রায় বুঝতে অসুবিধা হয় না। বিগত কয়েক দশক ধরে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের নিরিখে ভারতের ইতিহাসের কাল বিভাজন করা হচ্ছে। সেই কারণে সামন্ততন্ত্রে রূপান্তরের পরিপ্রেক্ষিতে সপ্তম শতক সাধারণাব্দের মাঝামাঝি থেকে ভারতের মধ্যযুগের সুত্রপাত বলে মনে করা হয়। শুধু তাই নয়, মধ্যযুগকে আদি-মধ্যযুগ ও অন্ত-মধ্যযুগে বিভাজিত করা হয়। এই পাঠ্যপুস্তকে তার পরিবর্তে যে কাল বিভাজন করা হয়েছে, তাতে ঔপনিবেশিক আমলের ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকের হিন্দু-মুসলিম-ব্রিটিশ কাল বিভাজনের প্রভাব স্পষ্ট।

সম্ভবত এই পাঠ্যপুস্তকে যেটা বেশি বিপজ্জনক তা হল, মধ্যযুগের কালপর্বকে ইতিহাসের অন্ধকারতর কালপর্ব বলে চিহ্নিতকরণ। এক সময় ইউরোপের ইতিহাস লেখার সময় মধ্যযুগের ইতিহাসকে অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করার পিছনে যে ধারণা ছিল, তা ঔপনিবেশিক আমলে ভারতেও এসে পৌঁছেছিল। কিন্তু, স্বাধীনতার পরবর্তী কালের ইতিহাস চর্চায় এই ধরনের ভাবনার থেকে অনেকটাই মুক্তিলাভ করা সম্ভব হয়েছিল। আজ নতুন শিক্ষা নীতি কার্যকর করার নামে সেই পুরোনো ঔপনিবেশিক ভাবনাগুলিকে অনেক ক্ষেত্রেই ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে। ইতিহাস চর্চা যে আসলে বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে আলো-আঁধারির মধ্যে দিয়ে চলে আসা অতীতের বিশ্লেষণ সেই সহজ সত্যকে একুশ শতকে আবরিত করার এই ধরনের প্রয়াস বোধ হয় শুভবুদ্ধির পরিচায়ক নয়।

এর আগেও অনেক বার বিভিন্ন দেশের  শাসকবর্গকে নিজস্ব মতাদর্শ প্রচার করার জন্য ইতিহাস পাঠ্যপুস্তককে চয়ন করতে দেখা গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষের মন যুক্তিসঙ্গত ইতিহাসকে খুঁজেছে, খোলা চোখে দেখার চেষ্টা করেছে অতীতকে। ভারতে তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না আর ইতিহাস তথ্য ও তর্কের মঞ্চ ভারত বা বাংলার ইতিহাসকে কোনও রঙিন চশমা ছাড়া কেবল খালি চোখে দেখার সংকল্প থেকে কখনও বিচ্যুত হবে না।  

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।