সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

হিন্দুমেলা, শিবাজী উৎসব ও সেকুলারিজমের পথে রবীন্দ্রনাথের যাত্রা (দ্বিতীয় পর্ব)

হিন্দুমেলা, শিবাজী উৎসব ও সেকুলারিজমের পথে রবীন্দ্রনাথের যাত্রা (দ্বিতীয় পর্ব)

শিবাশীষ বসু

জুলাই ৬, ২০২৪ ১০৭ 2

১৯০৫ সালের ২৪শে ডিসেম্বর, চিত্তরঞ্জন দাসের বাড়িতে আয়োজিত একটি সভায় গঠিত হল চরমপন্থী দল— ‘স্বদেশমণ্ডলী’। ১৯০৬ সালের ৪ঠা জুন থেকে ১২ই জুন ‘স্বদেশীমণ্ডলী’ কলকাতায় কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের ফিল্ড এ্যান্ড একাডেমির পান্তির মাঠে মহাসমারোহে শিবাজী উৎসব ও ভবানী পূজার আয়োজন করলো। এই উপলক্ষে গড়া হল শিবাজীর আরাধ্যা মা-ভবানী এবং তাঁর গুরু সন্ত রামদাসের মূর্তি। অশ্বিনীকুমার দত্তের সভাপতিত্বে মুল অনুষ্ঠানটি হল ৫ই জুন। এই উৎসবে তিলক, খাপার্দে এবং মুঞ্জে উপস্থিত ছিলেন। মুল অনুষ্ঠানে শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতাটি পাঠ করলেন।

বাল গঙ্গাধর তিলকের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে আমরা ইতিমধ্যেই আগের পর্বে আলোচনা করেছি, শুধুমাত্র এইটুকু জানানো যাক যে, তিলক ঘোষণা করেছিলেন, স্বরাজ আমাদের জন্মগত অধিকার, কিন্তু ‘কেশরী’ পত্রিকার প্রবন্ধেই হোক বা বক্তৃতাতে, ‘স্বরাজ’ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন ‘হিন্দু স্বরাজ’-এর আদর্শকে, এখানে অহিন্দুদের স্থান নেই। প্রথমে সার্বজনীন গণপতি উৎসব, তারপর গোরক্ষিণী সভা এবং অবশেষে শিবাজি উৎসব ইত্যাদি প্রবর্তনের ফল অচিরেই দেখা গেল, ১৮৯৫ সালে পুনাতে আয়োজিত কংগ্রেসের সম্মেলনে স্থানীয় মুসলমানরা যোগ দিলেন না, কারণ কংগ্রেসের হিন্দুদের প্রতি তাঁদের বিশ্বাস ততদিনে শিথিল হয়ে গেছে। রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় স্পষ্টভাবে লিখেছেন, “ইহার জন্য দায়ী ছিলেন লোকমান্য টিলক।”স্পষ্টতই, তিলকের এই জাতীয়তাবাদ ছিল প্রকৃতপক্ষে হিন্দু-জাতীয়তাবাদ। গণেশ উৎসবের ভিতর দিয়ে সামাজিক মেরুকরনের যে কাজটি তিলক শুরু করেছিরেন, তাকে সম্পূর্ণতা দিতেই তিনি প্রবর্তন করেছিলেন এই শিবাজী উৎসব। ‍১৮৯৭ সালের ১৩ই জুন শিবাজী উৎসব উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক সভায় তিলক মন্তব্য করেছিলেন, “শিবাজী যদি পরিকল্পিতভাবে মুঘল সেনাপতি আফজল খাঁকে হত্যা করে থাকেন তাহলে তিনি কোনো অন্যায় করেননি, কেননা আফজল খাঁ দেশের শত্রু এবং একাজ তিনি করেছিলেন দেশের স্বার্থে।” এটা না বললেও চলে যে, এখানে দেশ এবং হিন্দুত্ব সমার্থক। গণেশ শ্রীকৃষ্ণ খাপার্দে ছিলেন এই তিলকের ডান হাত। বরং আসুন এই বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে মহাশয় সম্বন্ধে এইখানে কয়েকটি কথা জানা যাক।

মুঞ্জে পরবর্তীকালে মহাত্মা গান্ধীর সেকুলার রাজনীতির কারণে কংগ্রেস ছেড়ে দিয়ে প্রথমে হিন্দু মহাসভার অন্যতম নেতা এবং পরে সর্বভারতীয় সভাপতি হয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার ছিলেন এই মুঞ্জের শিষ্য। ১৯৩১ সালের মার্চ মাসে ইনি ইতালিতে যান, বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাত করেন এবং ইতালির ফ্যাসিস্ট সাংগঠনিক রীতিনীতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। ইতালি সফরের পর মুঞ্জে তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন: “The idea of Fascism vividly brings out the conception of unity amongst people. India and particularly Hindu India need some such Institution for the military regeneration of the Hindus: so that the artificial distinction so much emphasised by the British of martial and non-Martial classes amongst the Hindus may disappear. Our Institution of Rashtriya Svayamsevak Sangh of Nagpur under Dr Hedgewar is of this kind, though quite independently conceived. I will spend the rest of my life in developing and extending this institution of Dr Hedgewar all trough out the Maharashtra and other provinces.”

“ফ্যাসিবাদের ধারণা জনগণের মধ্যে ঐক্যের ধারণাকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। ভারত এবং বিশেষ করে হিন্দু ভারতে হিন্দুদের সামরিক পুনর্জাগরণের  জন্য এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন আছে যাতে ব্রিটিশদের দ্বারা হিন্দুদের মধ্যে সামরিক এবং অ-সামরিক শ্রেণীর কৃত্রিম পার্থক্য অদৃশ্য হয়ে যায়। ডাঃ হেডগেওয়ারের অধীনে নাগপুরের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আমাদের প্রতিষ্ঠানটি এই ধরনের, যদিও (এটি) সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কল্পনা করা হয়েছে। মহারাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রদেশে ডাঃ হেডগেওয়ারের এই প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ও প্রসারে আমি আমার বাকি জীবন ব্যয় করব।” [অনুবাদ সম্পাদকের ]

২০০৬ সালে লিখিত কিথ মিডোক্রফট-এর ‘দি অল-ইন্ডিয়া হিন্দু মহাসভা আনটাচেবল পলিটিক্স এ্যান্ড ডিন্যাশনালাইজিং কনভারসন্স: দি মুঞ্জে-আম্বেদকর প্যাক্ট’ প্রবন্ধে তাঁর একটি বাণীতে মুঞ্জের ফ্যাসিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়: “Any money spent on untouchables is like feeding a garden-serpent with milk. We must leave the untouchables most severely to themselves.” অর্থাৎ, অচ্ছুতদের উন্নতিতে এক পয়সাও খরচ করার অর্থ হচ্ছে দুধ দিয়ে কালসাপ পোষা। অচ্ছুতদের তাদের নিজেদের দুর্দশার হাতে ছেড়ে দেওয়াই ভালো।

মুঞ্জের বড়োই আফসোস ছিল যে, ভারতবর্ষে হিটলার বা মুসোলিনীর মতো কোনো নেতা নেই, যিনি তাঁর আদর্শকে সাফল্যমণ্ডিত করতে পারেন— “I have thought out a scheme based on Hindu Dharm Shastra which provides for standardization of Hinduism throughout India. . . But the point is that this ideal cannot be brought to effect unless we have our own swaraj with a Hindu as a Dictator like Shivaji of old or Mussolini or Hitler of the present day in Italy and Germany. But this does not mean that we have to sit with folded hands until some such dictator arises in India. We should formulate a scientific scheme and carry on propaganda for it.”  

আমি হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে একটি পরিকল্পনা নিয়েছি যা সমগ্র ভারতে হিন্দুধর্মের প্রমিতকরণের ব্যবস্থা করবে। . . কিন্তু মোদ্দা কথা হলো এই আদর্শকে বাস্তবায়িত করা যাবে না যতক্ষণ না আমরা পুরোনো দিনের শিবাজী বা বর্তমান সময়ের ইতালি ও জার্মানিতে মুসোলিনি বা হিটলারের মতো একজন স্বৈরশাসককে হিন্দুর স্বরাজের জন্য পাই। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ভারতে এমন একজন স্বৈরশাসক না আসা পর্যন্ত হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে। আমাদের উচিত একটি বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং এর জন্য প্রচার চালিয়ে যাওয়া। [অনুবাদ সম্পাদকের]

সচরাচর দেখা গেছে, স্বদেশ পর্যায়ের যে কোনো উদ্যোগে ব্রিটিশ সরকার নানা রকমের বাধা সৃষ্টি করত। কিন্তু মহারাষ্ট্র এবং বাংলায় শিবাজী উৎসব নিয়ে ব্রিটিশরা কার্যত নীরব ছিল। শিবাজীর কল্পিত ‘অখন্ড হিন্দু ভারত’ চেতনা, যা ‘শিবাজী উৎসবে’-এর মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছিল, সেই রাজনীতি সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ। সিদ্ধান্ত নিলেন শিবাজী উৎসবে যোগ না দেওয়ার। রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন, একটু দেরীতে হলেও রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন যে, “শিবাজী উৎসব আন্দোলন হিন্দু জাতীয়তাবোধ হইতে উদ্ভূত; শিবাজী মহারাজ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া হিন্দুরাজ্য স্থাপন করেন। সুতরাং শিবাজী সম্বন্ধে গৌরববোধ হিন্দুদেরই হওয়া সম্ভব, মুসলমানদের নহে; সুতরাং, বিংশ শতাব্দীতে এই শ্রেণীর কোনো বীরকে অখন্ড ভারতের স্বাধীনতার প্রতীকরূপে গ্রহণ করা সম্ভব নহে।”

এমনকি একসময়ে যে শিবাজী উৎসবে তিনি যোগদান করেছেন, শিবাজীর নামাঙ্কিত কবিতা লিখে উৎসবে পাঠ করেছেন সেই রবীন্দ্রনাথকে দেখা গেল তৎকালীন হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে শিবাজীকে অসাম্প্রদায়িকরূপে প্রতিপন্ন করবার এই অনৈতিহাসিক প্রয়াসে যথেষ্ট বিরক্ত হয়ে ১৯০৬ সালের ৩রা জুন সুবোধচন্দ্র মজুমদারকে লেখা চিঠিতে মন্তব্যে করতে— “এক লক্ষ্মীছাড়া শিবাজী মেলা নিয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আটক পড়েছে।” এই সভায় রবীন্দ্রনাথের যোগদান না করবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেখিয়েছেন গৌতম রায়: “অনুমান করা যায় যে, মুঞ্জেদের সাম্প্রদায়িক চিন্তা এবং ধর্মান্ধ মানসিকতা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই কোনো সাম্প্রদায়িক মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তির সঙ্গে একমঞ্চে থাকতে তিনি রাজি হননি। শিবাজী হিন্দুর আত্মসম্মানকে তুলে ধরেছিলেন বলেই তাঁকে ঘিরে এই উৎসব— একথা খুব পরিস্কার ভাবেই তিলক প্রকাশ্যে বলেছিলেন।” রবি জীবনীকার প্রশান্তকুমার পালের মতে, “রবীন্দ্রনাথ দেশজননীকে ‘মাতৃমূর্তি’তে বন্দনা করলেও স্বদেশী আন্দোলনে ক্রমশ হিন্দু পৌত্তলিকতার অনুপ্রবেশে শঙ্কা বোধ করছিলেন, জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছিল।” গবেষক গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী লিখেছেন, “মুসলমান-বর্জ্জিত, মুসলমান ধর্ম-বিরোধী এই প্রকার উৎসবকে তিলক-অরবিন্দ-বিপিনচন্দ্র-ব্রহ্মবান্ধব প্রভৃতি চরমপন্থী নেতারা সেদিন প্রাণপণে যেরূপ জাতীয়তার বেদীতে প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, তাহা তো ধর্ম-নিরপেক্ষ জাতীয়তা নয়, … ইহা নির্জ্জলা পৌত্তলিক হিন্দুত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত হিন্দু জাতীয়তা। ইহা বঙ্কিম-প্রদর্শিত এবং বঙ্কিম অনুপ্রাণিত জাতীয়তা।”১০

কৃষ্ণকুমার মিত্রের ‘সার্কুলার বিরোধী সমিতি’ তাঁর অসংখ্য মুসলমান কর্মী ও সমর্থকদের কথা বিবেচনা করে এই উৎসব বয়কট করেন। পরের বছর ৭ই এপ্রিল ১৯০৭, চরমপন্থী বিপ্লবীদের মুখপত্র ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, “একদল সনাতন প্রথামত বক্তৃতা করিয়াই শিবাজীর স্মৃতি রক্ষা করা যথেষ্ট মনে করিলেন; আর একদল ভগবানের পূজা ভিন্ন ভক্তির পূজা অসম্পূর্ণ জানিয়া শিবাজীর সহিত সিংহবাহিনীর অর্চ্চনা করিয়া ধন্য হইলেন। একটা উচ্চ আদর্শ জনসাধারণের মধ্যে কেমন করিয়া প্রচার করিতে হয় তাহারও কতকটা মীমাংসা হইয়া গেল। আমাদের দেশের রাজনীতি যে ধর্ম্ম হইতে পৃথক করিলে জনসাধারণের মধ্যে আদৃত হইবে না তাহাও অনেকে বুঝিল।”১১ কেবলমাত্র ভবানী পূজা নয়, আয়োজন হত দুর্গা পূজারও। ‘আজকাল’ পত্রিকায় সাম্প্রতিক প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে লেখা হয়েছে, “১৯০৬ সালে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের দোতলার ঘরে দুর্গাপূজার আয়োজন করলেন বিপ্লবী পুলিনবিহারী দাস। পুরোহিত এলেন মহারাষ্ট্র থেকে। পূজার আয়োজনের মধ্যে রয়েছেন বিপ্লবী যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, বিপ্লবী তারকনাথ দাসেরা। কিন্তু প্রতিমা নেই। বদলে সাজানো আছে তলোয়ার, খাঁড়া, বল্লম, বর্শা। সমবেত কণ্ঠে বিপ্লবীরা গাইছেন ‘বন্দেমাতরম’ …।”১২

স্পষ্টতই, রাজনীতির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে মিশ্রিত করলে অদূর ভবিষ্যতে যে ঘোরতর সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে, এই জ্ঞানটাই অধিকাংশ জাতীয়তাবাদী নেতা ও কর্মীদের ছিল না। যদিও পরবর্তীকালে বিপিনচন্দ্র পাল আপশোষ করেছিলেন এবং স্বীকার করেছিলেন যে, স্বদেশী আন্দোলনে এই ধরনের হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচী নেওয়া অত্যন্ত নির্বোধের মতো কাজ হয়েছিল— “It gradually awoke, at least in a section of the nationalists, the foolish and suicidal ambition of once more re-establishing either a single Hindu state or a confederacy of Hindu states in India.”১৩

এটি ধীরে ধীরে জেগে ওঠে, অন্তত জাতীয়তাবাদীদের একটি অংশের মধ্যে, ভারতে একটি একক হিন্দু রাষ্ট্র বা হিন্দু রাষ্ট্রগুলির একটি সংঘ পুনঃপ্রতিষ্ঠার মূর্খ ও আত্মঘাতী উচ্চাকাঙ্ক্ষা। [অনুবাদ সম্পাদকের]

১৯০৮ সালের ১১-১২ ফেব্রুয়ারিতে পাবনায় আয়োজিত কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে রবীন্দ্রনাথকে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত করা হলে সভাপতির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ এক দিকে যেমন হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধানের সূত্র নিয়ে আলোচনা করলেন, তেমনই অন্যদিকে দরিদ্র অসহায় কৃষক-শ্রমিকদের দুর্দশার প্রতিও উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করাবার প্রচেষ্টা করলেন। হিন্দু-মুসলমান বিভেদ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রবীন্দ্রনাথ রেখেছিলেন এই বক্তৃতায়, (বক্তৃতাটি ছাপা হয়েছিল প্রবাসী পত্রিকার ফাল্গুন ১৩১৪ সংখ্যায়) “এ দিকে একটা প্রকাণ্ড বিচ্ছেদের খড়গ দেশের মাথার উপর ঝুলিতেছে। কত শত বৎসর হইয়া গেল, আমরা হিন্দু ও মুসলমান একই দেশমাতার দুই জানুর উপরে বসিয়া একই স্নেহ উপভোগ করিয়াছি, তথাপি আজও আমাদের মিলনে বিঘ্ন ঘটিতেছে। এই দুর্বলতার কারণ যতদিন আছে ততদিন আমাদের দেশের কোনো মহৎ আশাকে সম্পূর্ণ সফল করা সম্ভবপর হইবে না; আমাদের সমস্ত রাষ্ট্রীয় কর্তব্যপালনই পদে পদে দুরূহ হইতে থাকিবে। বাহির হইতে এই হিন্দু-মুসলমানের প্রভেদকে যদি বিরোধে পরিণত করিবার চেষ্টা করা হয় তবে তাহাতে আমরা ভীত হইব না— আমাদের নিজের ভিতরে যে ভেদবুদ্ধির পাপ আছে তাহাকে নিরস্ত করিতে পারিলেই আমরা পরের কৃত উত্তেজনাকে অতিক্রম করিতে নিশ্চয়ই পারিব।”১৪  

প্রকৃতপক্ষে স্বদেশী রাজনীতিতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের গুরুত্বটি একজন অরাজনীতিবিদ হয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমনটি বুঝতে পেরেছিলেন, তেমনটি চিত্তরঞ্জন দাশ এবং সুভাষচন্দ্র বোস ব্যতিত এই দেশের কোনো রাজনৈতিক নেতাই বোঝেননি। একাধিকবার রবীন্দ্রনাথ তাঁর বক্তৃতার মাধ্যমে, তাঁর প্রবন্ধের মধ্যমে, এমনকি তাঁর উপন্যাসের মাধ্যমেও সমকালীন নেতৃবৃন্দকে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সম্প্রদায়গত অনৈক্য দুর করা না গেলে দেশের নরমপন্থী বা চরমপন্থী— কোনো আন্দোলনই ফলপ্রসু হবে না। এই উপলক্ষ্যে তিনি সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে সহানুভূতি এবং সহৃদয়তা দেখাবার জন্য হিন্দু রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আবেদন জানালেন: “আমরা গোড়া হইতে ইংরেজের ইস্কুলে বেশি মনোযোগের সঙ্গে পড়া মুখস্থ করিয়াছি বলিয়া গবর্নমেন্টের চাকরি ও সম্মানের ভাগ মুসলমান ভ্রাতাদের চেয়ে আমাদের অংশে বেশি পড়িয়াছে সন্দেহ নেই। এইরূপে আমাদের মধ্যে একটা পার্থক্য ঘটিয়াছে। এইটুকু কোনোমতে না মিটিয়া গেলে আমাদের ঠিক মনের মিল হইবে না, আমাদের মাঝখানে একটা অসূয়ার অন্তরালে থাকিয়া যাইবে। মুসলমানেরা যদি যথেষ্ট পরিমাণে পদমান লাভ করিতে থাকেন তবে অবস্থার অসাম্য-বশতঃ জ্ঞাতিতের মধ্যে যে মনোমালিন্য ঘটে তাহা ঘুচিয়া গিয়া আমাদের মধ্যে সমকক্ষতা স্থাপিত হইবে।”১৫

রবীন্দ্রনাথ এই নীতিকেই হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের পূর্বশর্ত বলে নির্দেশ করেছিলেন।

প্রথম পর্বের লিঙ্ক https://www.itihasadda.in/hindumela-shivajiutsav-rabindranath-secularism/

তথ্যসূত্র:

১) প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্য প্রবেশক প্রথম খণ্ড, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ১৯৪৬, পৃষ্ঠা ৩৭৭

২) তাপস ভৌমিক সম্পাদিত, স্বাধীনতা সংগ্রামে সাময়িকপত্র, কোরক প্রাক-শারদ সংখ্যা, ২০২২, পৃষ্ঠা ১১২

৩) মার্জিয়া ক্যাসোলারি, ইন দি শ্যাডো অফ দি স্বস্তিকা : দি রিলেশনশিপস বিটুইন ইন্ডিয়ান র‍্যাডিক্যাল র‍্যাশনালিজম ইন্ডিয়ান ফ্যাসিজম এ্যান্ড নাজিজম, রৌটলেজ, ২০২০, পৃষ্ঠা ৪২

৪) জার্নাল অফ সাউথ-এশিয়ান স্টাডিজ, ভলিউম ২৯, টেলর এ্যান্ড ফ্রান্সিস গ্রুপ, এপ্রিল ২০০৬, পৃষ্ঠা ৯

৫) মার্জিয়া ক্যাসোলারি, ইন দি শ্যাডো অফ দি স্বস্তিকা : দি রিলেশনশিপস বিটুইন ইন্ডিয়ান র‍্যাডিক্যাল র‍্যাশনালিজম ইন্ডিয়ান ফ্যাসিজম এ্যান্ড নাজিজম, রৌটলেজ, ২০২০, পৃষ্ঠা ৪৬

৬) প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্র জীবনী ও রবীন্দ্র-সাহিত্য প্রবেশক দ্বিতীয় খণ্ড, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ১৯৬১, পৃষ্ঠা ১২৭

৭) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, চিঠিপত্র ত্রয়োদশ খণ্ড, বিশ্বভারতী গ্রন্থণবিভাগ, ১৯৯২, পৃষ্ঠা ১৪৫

৮) গৌতম রায়, ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস, ৯ নভেম্বর ২০২০, সিপিআইএম ডট অর্গ ডট ইন

৯) প্রশান্তকুমার পাল, রবি জীবনী পঞ্চম খণ্ড, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৫, পৃষ্ঠা ৩০৯

১০) গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী, শ্রীঅরবিন্দ ও বাংলায় স্বদেশী যুগ, নবভারত পাবলিশার্স, ১৯৫৬, পৃষ্ঠা ৪৫২-৪৫৩

১১) রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, বঙ্গভঙ্গ স্বদেশী বিপ্লববাদ, কে পি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানী, ২০১৬, পৃষ্ঠা ৭২-৭৩

১২) পার্থ চট্টোপাধ্যায়, স্বদেশমন্ত্রে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন বাংলার বিপ্লবীরা, আজকাল, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২

১৩) নীরদ সি চৌধুরী, দ্য অটোবায়োগ্রাফি অফ অ্যান আননোন ইন্ডিয়ান, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস, ১৯৬৮, পৃষ্ঠা ২২৮

১৪) রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত, প্রবাসী পত্রিকা ফাল্গুন ১৩১৪ সংখ্যা, ১৯০৮, পৃষ্ঠা ৬৪২

১৫) নেপাল মজুমদার, ভারতে জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা এবং রবীন্দ্রনাথ প্রথম খণ্ড, দেজ পাবলিশিং, ২০১১, পৃষ্ঠা ৩০৫

মন্তব্য তালিকা - “হিন্দুমেলা, শিবাজী উৎসব ও সেকুলারিজমের পথে রবীন্দ্রনাথের যাত্রা (দ্বিতীয় পর্ব)”

  1. ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। চলুক।

    তবে শিবাজী উৎসব বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের অনীহা ঐ একটা চিঠির একটা বাক‍্য ছাড়া কি আর কোনো সূত্রে বোঝা যায়?

    গবেষকরা অনেক কিছু অনুমান করেছেন কিন্তু তাঁদের অনুমানের ভিত্তি কি ঐ একটিই বাক‍্য?

    রবীন্দ্রনাথ নিজেকে শিবাজী উৎসব থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন সকলের জ্ঞাতসারে, তেমনটা কি হয়েছিল?

  2. দীনেশ্চন্দ্র সেনকে লিখিত এই চিঠি দুটি এই পর্বের জন্য প্রাসঙ্গিক মনে হল।
    ……………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….

    প্রিয়বরেষু গিরিধি

    বাদ প্রতিবাদের যে তরঙ্গ উঠিয়াছে তাহাতে আপনি মনকে লেশমাত্র ক্ষুব্ধ করিবেন না। আমার রচনায় যে শত্রুমিত্র সকলকেই জাগ্রত করিয়া তুলিয়াছে ইহা ভাল লক্ষণ জানিবেন। আমাকে কে আক্রমণ করিতেছে বা সমর্থন করিতেছে তাহা চিন্তার বিষয় নহে- আমার প্রবন্ধ যে দেশের মধ্যে কাজ করিতে আরম্ভ করিয়াছে ইহা আনন্দের বিষয়। বিরোধ এবং প্রতিবাদও একটা সত্যকে ব্যাপ্ত ও সুদৃঢ় করিয়া দিবার পক্ষে একান্ত প্রয়োজনীয় বলিয়া জানিবেন- অতএব আমার অবমাননায় আপনি কিছুমাত্র দুঃখিত হইবেন না। আমি এমন অনেকবার লাঞ্ছনা সহ্য করিয়াছি আমাকে লইয়া অনেক তোলপাড় হইয়া গেছে আজ তাহার চিতুমাত্রও নাই অথচ আমি যেখানে ছিলাম সেইখানেই টিকিয়া আছি। অতএব ধৈয্য ধরিয়া বর্তমান বাগ্ বিতণ্ডার পরিণাম অপেক্ষা করিবেন।

    আজ দেউস্কর মহাশয়ের বৈদ্যুত তাড়নায় শিবাজিউৎসব সম্বন্ধে একটা কবিতা লিখিয়া পাঠাইলাম। যদি সুবিধা পান তবে তাহার এক কপি শৈলেশের কাছ হইতে লইয়া দেখিবেন।

    এখানে আসিয়া অবধি রচনাকার্য্য যে বিশেষ অগ্রসর হইতেছে তাহা বলিতে

    পারিনা। এখনো আমার কল্পনাশক্তি প্রসুপ্ত আছে।

    ভাদ্রমাসের ভারতী আমার হস্তগত হয় নাই। পাঠাইয়া দিতে বলিবেন।

    মীরার পাত্রসম্বন্ধে মোকাবিলায় আপনার সঙ্গে আলোচনা করিব।

    ইতি ১১ই ভাদ্র ১৩১১

    আপনার

    শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।সেপ্টেম্বর 1904।
    ………………………………………………………………………………………………..

    প্রীতিসম্ভাষণমেতৎ বোলপুর

    স্বদেশী আন্দোলন ইতিহাসের গুটিকয়েক সূত্রঃ-

    প্রথম ইংরেজি শিক্ষার মত্ততায় বাঙালী ছাত্রদের মনে স্বদেশী-বিদ্বেষের উৎপত্তি হইয়াছিল। তখন শিক্ষাপ্রাপ্ত বাঙালী দেশের শিল্প সাহিত্য ইতিহাস ও ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে নিজেদের দৈন্য কল্পনা করিয়া লজ্জাবোধ করিতেছিল এবং সকল বিষয়েই পাশ্চাত্ত্য অনুকরণই উন্নত Culture বলিয়া স্থির করিয়াছিল।

    প্রাচীন ধৰ্ম্মশাস্ত্র সম্বন্ধে অজ্ঞতা ও অবজ্ঞা প্রযুক্ত অনেকে নাস্তিক ও অনেকে খৃষ্টান- ঘেঁষা হইয়া পড়িতেছিলেন।

    সেই সময়ে রামমোহন রায়ের শিষ্য দেবেন্দ্রনাথ ধর্মব্যাকুলতা অনুভব করিয়া প্রাচীন শাস্ত্র অন্বেষণে, প্রবৃত্ত হন। যদিচ প্রচলিত ধর্ম-সংস্কার তিনি পরিত্যাগ করিয়াছিলেন, তথাপি স্বদেশের শাস্ত্রকেই দেশের ধর্মোন্নতির ভিত্তিরূপে তিনি গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনিই তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় বেদ উপনিষদের আলোচনা ও বিলাতী বিজ্ঞানতত্ত্ব প্রভৃতির প্রচার বাংলা ভাষায় প্রবর্তন করেন। আদি ব্রাহ্মসমাজ বিদেশী ধৰ্ম্ম হইতে স্বধম্মে ও বিদেশী ভাষা হইতে মাতৃভাষায় শিক্ষিত সম্প্রদায়কে আর্কষণ করিবার চেষ্টা করেন।

    কেশববাবুরা যখন ব্রাহ্মসমাজে প্রবেশ করিয়া ব্রাহ্মধর্ম্মের সহিত হিন্দুসমাজের বিচ্ছেদ-সাধনের উপক্রম করিলেন তখন দেবেন্দ্রনাথ হিন্দুসমাজকে ত্যাগ করিলেন না-ব্রাহ্মধর্মকে হিন্দু- সমাজেরই অঙ্গ বলিয়া গণ্য করিলেন। আধুনিক শিক্ষিত চিত্তকে স্বদেশের অভিমুখী করিবার এই প্রয়াস।
    দেবেন্দ্রনাথের পরিবারে আধুনিক শিক্ষার সহিত স্বদেশী ভাবের সমন্বয় চেষ্টা বরাবর কাজ করিতে লাগিল। হিন্দুমেলা এই স্বদেশী ভাবের আর একটি অভ্যুত্থান। দ্বিজেন্দ্রনাথ, গণেন্দ্রনাথ, নবগোপাল মিত্রকে সাহায্য করিয়া এই মেলার প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে স্বদেশী শিল্পের, স্বদেশী মল্লবিদ্যার, স্বদেশী games এর প্রর্দশনী হইত-স্বদেশী গান গীত ও স্বদেশী কবিতা আবৃত্ত হইতে।

    তাহার পর বঙ্কিমের বঙ্গদর্শন বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকভাবে পরিপুষ্ট করিয়া দেশের শিক্ষিতগণকে মাতৃভাষায় জাতীয় সাহিত্য রচনায় উৎসাহিত করিয়া তুলিল। ইহার কিছুকাল পরে শশধরের প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্য। ইতিমধ্যে বৃদ্ধ রাজনারায়ণ বসুকে লইয়া আমাদের পরিবারে সাধারণের অগোচরে স্বদেশীভাবের বিশেষরূপ চর্চ্চা হইতেছিল। গোপনে স্বদেশী দেশালাই ও উৎকর্ষপ্রাপ্ত তাঁত প্রভৃতি নির্মাণের জন্য চেষ্টা চলিতেছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এই স্বদেশী ভাবের উত্তেজনাতেই খুলনা হইতে বরিশালে ষ্টীমার চালাইতে প্রবৃত্ত হইয়া ইংরেজ-কোম্পানির সহিত দারুণ প্রতিযোগিতায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন- তৎকালে বরিশালে স্বদেশীর দল তাঁহার সাহায্যের জন্য যেরূপ প্রচণ্ড উৎসাহে যাত্রী সংগ্রহ ও যাত্রী ভাঙানর কাজে প্রবৃত্ত হইয়াছিল এরূপ Fuller-এর আমলে ঘটিলে কি বিপদ হইত অনুমান করিবেন।

    কনগ্রেস গবর্মেন্টের নিকট আবেদনের দিকেই শিক্ষিত-সম্প্রদায়ের চেষ্টাকে প্রবৃত্ত করাইল। সাধনা পত্রে ও তাহার পরে অন্যত্র এইরূপ আবেদন নীতি ত্যাগ করিয়া

    আত্মশক্তি চালনার দিকে মন দিতে উপদেশ দেওয়া হইয়াছে এবং বলেন্দ্রনাথ এবং আমাদের পরিবারের অনেকে যোগ দিয়া স্বদেশী ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠা করা হইয়াছে।
    এই স্বদেশী ভাণ্ডারের ভগ্নাবশেষের উপরে Indian Stores এর অভ্যুদয়।

    ইহার অনতিকাল পরেই Provincial Conference এ যাহাতে বাংলা ভাষায় দেশের আপামর সাধারণের নিকট স্বদেশের অভাব আলোচনা করা যায়- যাহাতে ইংরেজি ভাষায় কেবল রাজার নিকট আবেদনেই আমাদের কর্তব্য নিঃশেষিত না হয় রাজসাহী কনফারেন্সে সত্যেন্দ্রনাথের নায়কতায় প্রথম সেই চেষ্টা করা হইয়াছিল, পর বৎসর ঢাকাতেও সেই চেষ্টা করা যায়।

    স্বদেশী movement এর সঙ্গে এই সকল চেষ্টার ঘনিষ্ঠ যোগ আছে। ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে যেমন আদি ব্রাহ্মসমাজ প্রাচীন শাস্ত্রের দিকে মনকে টানিয়াছিলেন Politics সম্বন্ধেও সেইরূপ কিছুদিন হইতে দেশের লোককে দেশের দিকেই টানিবার চেষ্টা চলিতেছিল। তৎকালে শিক্ষিত লোকেরা যেমন সহজে শাস্ত্রের দিকে স্বদেশী ধৰ্ম্ম ও স্ব সমাজের দিকে ফিরিতে চাহেন নাই এখনকার দিনেও সেইরূপ শিক্ষিত agitation ওয়ালা সহজে আবেদনের পালা বন্ধ করিয়া স্বদেশের জনসাধারণের সম্মুখে দাঁড়াইতে প্রস্তুত হন নাই।
    নূতন পর্য্যায় বঙ্গদর্শনে এই আত্মশক্তি-চর্চা ও স্বদেশী ভাবের দিকে দেশের চিত্ত আকর্ষণের জন্য উপদেশের প্রবর্তন করা হয় এবং বোলপুরের বিদ্যালয় স্থাপন ও শিক্ষার ভার নিজের হাতে ও স্বদেশী ভাবে প্রবর্তনের চেষ্টা। এ সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয় অগ্রণী। তিনি ইংরেজি ধরনের বিদ্যালয় দেশীয় লোকের দ্বারা চালাইতে সুরু করেন আমার চেষ্টা যাহাতে বিদ্যাশিক্ষার আদর্শ যথাসম্ভব স্বদেশী রকম হয়।

    এইরূপ আন্দোলন যখন দেশে ভিতরে ২ চলিতেছে, তখন যোগেশ চৌধুরী কংগ্রেসে শিল্প-প্রদর্শনী খুলিয়া কংগ্রেসের আবেদন- প্রধান ভাবকে স্বদেশী ভাবে দীক্ষিত করিবার প্রথম চেষ্টা করেন- তাহার পর হইতে এই প্রদর্শনী বৎসরে ২ চলিতেছে।

    ইতিমধ্যে আশু চৌধুরী বর্দ্ধমান কনফারেন্সে পোলিটিক্যাল ভিক্ষাবৃত্তির বিরুদ্ধে তর্ক উত্থাপন করিয়া গালি খান। কিন্তু দেশ অন্তরে অন্তরে স্বদেশী ভাবে দীক্ষিত হইয়া আসিতেছিল। এমন সময়ে পার্টিশন ব্যাপার একটা উপলক্ষ্য মাত্র হইয়া এই স্বদেশী আন্দোলনকে স্পষ্টরূপে বিকশিত করিয়া তুলিল। বস্তুতঃ বয়কট করার ছেলেমানুষী ইহার প্রাণ নহে। ইতি ১লা অগ্রহায়ণ ১৩১২

    আপনার শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    [এপ্রিল ১৯০৬]

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।