সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

প্রয়াণের অর্ধশতক পেরিয়ে ডেভিড ম্যাককাচন

প্রয়াণের অর্ধশতক পেরিয়ে ডেভিড ম্যাককাচন

দীপরাজ দাশগুপ্ত

মার্চ ১৬, ২০২২ ২৬০

আজ থেকে বছর দশেক আগে যখন ফেলুদা কাহিনীর শেষ উপন্যাস ‘রবার্টসনের রুবি’ পড়ি, তখন সত্যজিৎ রায়ের লেখার মাধ্যমে ডেভিড ম্যাককাচন সাহেবের কথা প্রথম জানতে পারি। তারপর দীর্ঘদিন পর বিদ্যাসাগর কলেজে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক শেখর ভৌমিক স্যারের একটি লেখায় ডেভিড ম্যাককাচনের উল্লেখ দেখে তাঁর প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। স্যারের সেই লেখাটি পড়ার পর বহুদিন কেটে গেছে, সেই সাথে আমার ডেভিড ম্যাককাচন চর্চার আগ্রহ বেড়েই চলেছে। টেরাকোটাপ্রাণ এই বিলিতি সাহেব মানুষটিকে জানার যেন কোনো শেষ নেই। তাঁর সম্পর্কে পড়তে গিয়ে দেখতে পাই তিনি ও বাংলার মন্দির টেরাকোটা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছেন। 

ডেভিড ম্যাককাচন-এর জন্ম ইংল্যান্ডের কভেন্টির এক মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯৩০ সালের ১২ই আগস্ট। কভেন্টির ‘কিং হেনরী এইট গ্রামার স্কুলে’ ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তাঁর শিক্ষালাভ। তারপর দেশের আইন অনুযায়ী আঠারো মাসের মিলিটারি সার্ভিসে যোগদান করেন। এরপর তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শুরু হয়। কেম্ব্রিজের ‘যেশাস কলেজে’ অধ্যয়ন ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত। ১৯৫৫ সালে ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ ও জার্মান ভাষা-সাহিত্যে ‘ট্রাইপস’ পেয়ে স্নাতক এবং ১৯৫৭ সালে তিনি স্নাতকোত্তর হন। 

দক্ষিন ফ্রান্সের দুটি ফরাসি স্কুলে ইংরেজির শিক্ষক হিসাবে শিক্ষকতা করার মাধ্যমে ডেভিড তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৭ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে আসেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির প্রভাষক হিসাবে। ১৯৬০ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ভাষা সাহিত্যের শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন এবং ১৯৬৪ সালে ওই বিভাগে ‘রিডার’ পদে উন্নীত হন। 

বিলেতে থাকাকালীন টেগোর সোসাইটির মাধ্যমে তিনি রবীন্দ্র অনুরাগী হয়ে ওঠেন। ফ্রান্সের দুটি স্কুলে শিক্ষকতা করার পর তিনি ভারতবর্ষে আসার সিদ্ধান্ত নেন। বিশ্বভারতী থেকে তাঁর শিক্ষকতা করার আবেদন গ্রহণ করা হলে তিনি ১৯৫৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শান্তিনিকেতনে এসে পৌঁছান। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমদিকে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও বিশ্বভারতীর তৎকালীন উত্তপ্ত পরিবেশ এবং নিজের স্বাস্থ্যের অবনতি তাঁকে সেখান থেকে সরে আসতে বাধ্য করে। বুদ্ধদেব বসুর আমন্ত্রণে ১৯৬০ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলকসাহিত্য বিভাগে অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। ‘Indian Writing in English’ বিষয়টির সূচনালগ্ন থেকে ম্যাককাচন এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। যাদবপুরে পড়াতে এসে তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত পরিবেশটি পেয়েছিলেন। এখানে তিনি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তাঁর এই সম্পর্ক আমৃত্যু অব্যাহত ছিল। শিক্ষক হিসাবে শিক্ষার্থীদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিলেন ম্যাককাচন। পড়ুয়ারা তাঁর পাণ্ডিত্য, ক্লাসে পড়ানোর পদ্ধতি, পড়ুয়াদের প্রতি তাঁর সহজ, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ- সব কিছু সাদরে গ্রহণ করেছিল। যাদবপুরে অধ্যাপনার সময়েই ম্যাককাচন একনিষ্ঠ টেরাকোটা গবেষক হয়ে ওঠেন। 

যাদবপুরে অধ্যাপনা করে যে অর্থ পেতেন, তার একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করতেন তাঁর টেরাকোটা গবেষণার কাজে। নিজের থাকা-খাওয়া-যাতায়াতের জন্য যতটুকু অর্থ প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই তিনি খরচ করতেন। ছেঁড়া গেঞ্জি সেলাই করে পড়তেন, সাধারণ খাবার খেতেন, যাতায়াতের খরচ বাঁচানোর জন্য সাইকেল, লোকাল বাস-ট্রেনে চড়তেন। কোন বিলাসিতার সুযোগ তাঁর ছিল না। টেরাকোটার স্থাপত্যের (মন্দির, মসজিদ ও অন্যান্য) খোঁজে মাইলের পর মাইল হাঁটতেন। কখনো বা সাইকেল চালিয়ে যেতেন। লোকে তাঁকে ‘সাইকেল সাহেব’ বলে ডাকত। বাংলার  টেরাকোটা মন্দির স্থাপত্যের জীর্ণ ভগ্নদশা ও এর সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষের উদাসীনতা তাঁর হৃদয়কে ব্যথিত করত। কোনো জীর্ণ মন্দির খুঁজে পেলে ডেভিড প্রথমে তার চারদিকের আগাছা ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতেন। আগাছার জঙ্গল থেকে মন্দিরকে রক্ষা করার জন্য তিনি এসিড ও কীটনাশক ব্যবহার করতেন। স্থানীয় মানুষদের জড়ো করে যথাসম্ভব বাংলায় তাদের টেরাকোটা স্থাপত্যের গুরুত্ব ও এর সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বোঝাতেন। আগাছা রোধে এসিড ও কীটনাশক প্রয়োগের পদ্ধতি শিখিয়ে দিতেন। তাঁর বলা অনেক কথায় স্থানীয় লোকজন বুঝতো না, কিন্তু একজন বিলিতি সাহেবের টেরাকোটা মন্দিরের প্রতি গভীর মমত্ববোধ তাদের বিস্মিত করত।

চারিদিক যথাসম্ভব পরিস্কার করে ডেভিড মন্দির স্থাপত্যের ছবি তুলতেন নানা আঙ্গিকে, নানা ধরনে। তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতেন। মন্দিরের গায়ে খোদিত টেরাকোটার কারুকার্যকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন। তথ্য নোট করে রাখতেন। এই টেরাকোটা অভিযানে তাঁর সঙ্গে থাকত মাপার ফিতা, কাটারি, এসিড-কীটনাশক, প্রিয়সঙ্গী লাইকা ক্যামেরা, নোটবুক, টর্চলাইট, টেপরেকর্ডার আর সাইকেল। একটি মন্দিরের দিনের নানা সময়ে নানাভাবে ছবি তোলার জন্য ডেভিড কয়েকবার সেখানে যেতেন। এই কাজের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও ভালোবাসা, অক্লান্ত পরিশ্রমকে ঢেকে রাখত মুগ্ধতা ও অনুপ্রেরণার আড়ালে। মন্দিরের সন্ধানে বের হয়ে কতদিন তাঁর খাওয়ার অবসর থাকত না। চা-বিস্কুট দিয়েই তিনি কাজ চালিয়ে নিতেন। কলকাতা থেকে দূর-দূরান্তে মন্দিরের খোঁজে গিয়ে যেদিন ফিরতে পারতেন না, সেদিন শুয়ে থাকতেন কোনো ভগ্ন টেরাকোটা মন্দিরে। টর্চ জ্বালিয়ে রাতের অন্ধকারে চেয়ে থাকতেন টেরাকোটায় খোদিত নানা কাহিনীর দিকে। কাজের ক্লান্তি কখনোই তাঁকে তাঁর গবেষণা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। অক্লান্ত পরিশ্রম করে এক দশক ধরে তিনি এই বৃহৎ কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন কোনো সরকারি বা বেসরকারি অনুদান ছাড়াই- সম্পূর্ণ নিজের অর্জিত অর্থের উপর নির্ভর করে। নিজের সকল অবসর ও স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দিয়ে। আজ আমাদের এসব গল্পকথা বলে মনে হয়। আমাদের নিজস্ব শিল্প সম্পদকে রক্ষার জন্যে একজন ইউরোপীয় সাহেব যা করে গেছেন, তার যথাযথ মূল্যায়ন এখনো পর্যন্ত আমরা করতে পারিনি। ডেভিডের সেই কৃচ্ছসাধন, সেই অপরিসীম আত্মত্যাগ, সেই অসামান্য অবদানের গুরুত্ব আমরা খুব কমই অনুধাবন করতে পেরেছি। বাইরে থেকে এসে কেউ আমাদের নাড়িয়ে দিয়ে না গেলে বাঙালী জাতি নড়তে চাই না। আমাদের অমূল্য শিল্পসম্পদ টেরাকোটার স্থাপত্যের ক্ষেত্রে ডেভিড ম্যাককাচন সেই কাজটি করে দিয়ে গেছেন। এখন আমাদের এগিয়ে যাবার পালা। 

বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক ও ডেভিডের বন্ধু অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন,

 “ভারতীয় পুরাকীর্তি, বিশেষ করে উভয় বাংলার ‘টেরাকোটা’ মন্দির-মসজিদ–এই নির্বাচিত বিষয়ের অধ্যয়নে সে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। সে গবেষণায় তার মতো নিরলস তার মতো অদ্ভুতকর্মা, তার মতো একাগ্রমনা আর কাউকে আমি দেখিনি। যে বিষয় সে বেছে নিয়েছিল তা অনাবিস্কৃত সমুদ্রের মতোই বিশাল, যেখানে দীপবর্তিকার চিহ্নমাত্র নেই।”

 অমিয়বাবুর করা এই ডেভিড মূল্যায়ন যথার্থ ছিল। স্বল্পায়ু ডেভিড যা ভেবেছিলাম, যে কাজ তিনি শুরু করে গিয়েছিলেন, তাঁর সময়ের অনেকের কাছেই তা ছিল কল্পনার বাইরে। বাংলার টেরাকোটা স্থাপত্যের গবেষণায় ডেভিড তাই পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছিলেন। এ ব্যাপারে যে বিপুল তথ্যভাণ্ডার ও অসংখ্য ছবি ডেভিড রেখে গিয়েছিলেন তা এই কাজের পরবর্তী গবেষকদের কাছে মহামূল্যবান আকর হিসাবে গণ্য হয়েছে। তিনি তাঁর গবেষণা কর্মের মাধ্যমে আমাদের পথনির্দেশ করে গেছেন। তিনি যদি দীর্ঘায়ু হতেন, তবে টেরাকোটা মন্দির গবেষণা অনেক আগেই বিশ্বপ্রসিদ্ধি লাভ করতে পারত। তাঁর অকাল মৃত্যু আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে রয়ে গেল।

 ডেভিড পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা যেমন, বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমান, হুগলী, হাওড়া, মেদিনীপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ ও দিনাজপুরের সবচেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে গেছেন পুরাকীর্তির খোঁজে কখনো মাইলের পর মাইল হেঁটে, কখনো সাইকেলে। প্রখর রৌদ, ভ্যাপসা গরম, ঝড়-বৃষ্টি, পথে থাকা-খাওয়ার চূড়ান্ত অসুবিধা কোনো কিছুই তাঁকে তাঁর সংকল্প থেকে নিরস্ত করতে পারত না। 

প্রবল ঝুঁকি নিয়ে ডেভিড দু’বার পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশে) পুরাকীর্তির সন্ধানে গিয়েছিলেন। পূর্ববঙ্গের রাজশাহী, খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, পাবনা অঞ্চলে টেরাকোটার টানে ছুটে বেড়িয়েছেন। পূর্ব বাংলার নদীমাতৃক শ্যামল প্রকৃতি, স্থানীয় জনসাধারণের সহজ-সরল অমায়িক ব্যবহার, অতিথি-পরায়ণতা তাঁর মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। সেখানকার বাঙালী হিন্দু ও মুসলমানের মিলিত প্রয়াসে, চিরাচরিত প্রথায় অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। পূর্ব- পাকিস্তানের মধ্য থেকে এক নতুন দেশের জেগে ওঠার সম্ভাবনার কথা ডেভিড লিখেছিলেন তাঁর ‘Impressions Of East Pakistan’ প্রবন্ধে। তাঁর সেই কথা পরে সত্য হয়ে উঠেছিল। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগেই বাংলাদেশ স্বাধীন দেশে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বাধীন বাংলাদেশে ডেভিডের আর যাওয়া হয়নি। ঢাকার ‘ইতিহাস’ পত্রিকায় ডেভিডের পূর্ব বাংলার পুরাকীর্তি নিয়ে লেখা প্রবন্ধ প্রকাশিত ও প্রশংসিত হয়েছিল। 

কলকাতায় ডেভিডের অন্যতম বন্ধু ছিলেন সত্যজিৎ রায়। টেরাকোটা নিয়ে ডেভিডের আগ্রহের অনেক আগে থেকেই সিনেমা ও পাশ্চাত্য সংগীতের সূত্র ধরে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। সত্যজিতের প্রস্তাবে ‘তিনকন্যা’ থেকে ‘সীমাবদ্ধ’ পর্যন্ত সব চলচ্চিত্রের ইংরেজি সাবটাইটেল তৈরি করে দিতেন ডেভিড। সত্যজিৎ রায়ের ‘অভিযান’ সিনেমার শুটিং চলাকালে বীরভূম জেলার হেতমপুরে কয়েকটি টেরাকোটা মন্দির দেখে এই ব্যাপারে ডেভিডের আগ্রহ তৈরি হয়। কলকাতায় ফিরে সত্যজিৎ নিজের সংগ্রহ থেকে তাঁকে মন্দির স্থাপত্য বিষয়ক কয়েকটি বই পড়তে দিয়েছিলেন। এভাবে ডেভিডের টেরাকোটা নিয়ে আগ্রহ সুগভীর গবেষণার নেশায় পরিণত হয়েছিল। সত্যজিতের লেখা থেকে জানা যায়, ডেভিড ভারতবর্ষ জুড়ে প্রাচীন মন্দির থেকে বিভিন্ন  ভাষ্কর্যের চোরাচালান ও বিদেশে পাচার রোধে উদ্যোগী হয়ে উঠেছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি তাঁর সীমিত সামর্থের মধ্যে থেকেই অনেক কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন। এসব শিল্প ধ্বংসকারী কাজ তাঁকে খুব ব্যথিত ও উত্তেজিত করে তুলত। তিনি এর প্রতিকারে পরিচিত বুদ্ধিজীবী মহলের কাছে সহায়তা চাইতেন। তাঁর লেখা বিভিন্ন চিঠিপত্রের শেষে থাকত, এদেশের পুরাকীর্তি ও শিল্পসম্পদকে যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ এবং রক্ষার জন্য বিনীত আবেদন। 

সত্যজিৎ রায় তাঁর প্রিয়বন্ধুকে ফেলুদা কাহিনীর মাধ্যমে স্মরণ করেছেন। রবার্টসনের রুবির অন্যতম চরিত্র পিটার রবার্টসন ম্যাককাচনের লেখা পড়ে বীরভূমের মন্দির দেখতে চায়। জটায়ুর প্রশ্নের উত্তরে ফেলুদা বলেছে, ডেভিড ম্যাককাচন। অকালমৃত্যু তাঁর কাজ শেষ করতে দেয়নি, তাও যা করেছেন তার জবাব নেই।  ….ফেলুদার মাধ্যমে সত্যজিৎ একথা বলে গেছেন। এভাবেই হয়তো তিনি তাঁর বন্ধুর কাজকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন! ডেভিডের মৃত্যুর পর সত্যজিৎ রায়ের লেখা নিবন্ধে বন্ধুর অসামান্য কাজের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশ পেয়েছে। 

সত্যজিৎ রায় ছাড়াও অধ্যাপক পুরুষোত্তম লাল, দার্শনিক চিন্তাবিদ আবু সায়ীদ আইয়ুব, অধ্যাপিকা গৌরী আইয়ুব, বুদ্ধদেব বসু, প্রতিভা বসু, নরেশ গুহ, ইতিহাসবিদ অশীন দাশগুপ্ত, উমা দাশগুপ্ত, গবেষক তারাপদ সাঁতরা, অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিকলাল সিংহ প্রমুখ অনেকেই ছিলেন ডেভিডের বন্ধু। ডেভিডের অনাড়ম্বর জীবনযাপন, সাদামাটা বেশভূষা ও কৌতুকপ্রিয় সহজ প্রকৃতি সবাইকে মুগ্ধ করত। বিশিষ্ট বন্ধুদের স্মৃতিচারণায় ডেভিডের অনেক কথায় উঠে এসেছে নানা প্রসঙ্গে। যা আমাদের মানুষ ডেভিড, গবেষক ডেভিডকে বুঝতে ও চিনতে সাহায্য করে। 

টেরাকোটা নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি ডেভিড বাংলার পটচিত্রের ওপর কাজ শুরু করেছিলেন। দরিদ্র পটুয়াশিল্পীদের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য তিনি কাজ করে গেছেন। পটুয়াদের রক্ষায় পটচিত্র শিল্পের বৈশ্বিক বাজার তৈরী করার স্বপ্ন দেখেছিলেন ডেভিড। মেদিনীপুরের “ডেভিড গ্রাম” তাঁর সেই স্মৃতিকে বহন করছে। 

ডেভিডের অকাল মৃত্যুর পর তাঁর সংগৃহীত তথ্যের উপর ভিত্তি করে বন্ধু, ছাত্র, গবেষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একে একে প্রকাশিত হয় Late Midieval Temples of Bengal, Brick Temples of Bengal, Patuas And Patua Songs Of Bengal. ডেভিডের তোলা দুই বাংলার মন্দিরের প্রায় কুড়ি হাজার ছবি লন্ডনের ভিক্টোরিয়া এন্ড এলবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর সংগৃহীত সব পটচিত্র রয়েছে কভেন্ট্রির হারবার্ট আর্ট গ্যালারিতে। স্বল্পায়ু ডেভিডের এই বিপুল কর্মকান্ডের কথা ভাবলেও বিস্মিত হতে হয়। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু যাওয়ার আগে পরবর্তীদেরকে পথনির্দেশ করে দিয়ে গেছেন। রেখে গেছেন বিশাল পাথেয়। 

বাংলার মন্দির ছাড়াও তিনি পুরাকীর্তির সন্ধানে ছুটে বেড়িয়েছেন ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে- যেমন ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকে। এসব জায়গার প্রাচীন মন্দির থেকে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন ডেভিড। মৃত্যুর আগে তিনি ইংল্যান্ডের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসাবে পড়াতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে কলকাতায় ফিরেই চলে গিয়েছিলেন ওড়িশায় প্রাচীন পুরাকীর্তির খোঁজে। ওড়িশা ভ্রমণ থেকে ফিরে এসে অতর্কিত পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি কলকাতায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কলকাতার ‘ভবানীপুর সিমেট্রিতে’ মাত্র ৪১ বছর বয়সী ডেভিডের দেহ সমাহিত করা হয়েছিল। পরে তাঁর কাছের বন্ধুরা মিলে ডেভিডের সমাধিস্থলটিকে টেরাকোটায় মুড়ে দেয়। –

মৃত্যুর কিছু আগে শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর মূল্যবান পুস্তকের যাবতীয় সংগ্রহ তিনি দিয়ে যান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগকে। তাঁর একান্ত প্রিয় ছাত্র ও গবেষক সুহৃদকুমার ভৌমিককে সদ্য আনা টেপ রেকর্ডার, ভবিষ্যতের জন্যে পটুয়া সংগীত সংগ্রহের সাধনা ও গবেষণার জন্যে। মন্দির-মসজিদের তথ্যসংগ্রহের কাজের সুবিধার জন্যে তাঁর মুল্যাবান ক্যামেরার সম্ভার দিয়ে গেছেন তাঁর ভ্রমণপথের সঙ্গী ও আনন্দ নিকেতন কীর্তিশালার কিউরেটর গবেষক তারাপদ সাঁতরাকে। ডেভিডের অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছেন- ছাত্র সুহৃদকুমার ভৌমিক, বন্ধু তারাপদ সাঁতরা, হিতেশরঞ্জন সান্যাল, অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিকলাল সিংহ প্রমুখ। 

এ বছর ডেভিড ম্যাককাচনের মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর হল। অর্ধশতক হয়ে গেছে তিনি চলে গেছেন। রয়ে গেছে তাঁর টেরাকোটাময় স্বপ্ন। পুরাকীর্তি রক্ষার আকুল আহ্বান। কলকাতার বুকে টেরাকোটা মোড়া এক সমাধিতে শুয়ে ডেভিড ম্যাককাচন ভারতশিল্পের গবেষণায় পথনির্দেশ করে চলেছেন একান্ত নিভৃতে। 

(বি.দ্র: বাংলায় অনেকে ডেভিডের নাম ম্যাকাচ্চিয়ন, ম্যাককাচ্চন লিখে থাকেন। আমি সত্যজিৎ রায়ের লেখা “ম্যাককাচন” বানানটি অনুসরণ করলাম।) 

তথ্যসূত্র: 

* ডেভিড জে. ম্যাককাচন : জীবন ও সাধনা – তারাপদ সাঁতরা, 

* ডেভিড স্মৃতি – সুহৃদকুমার ভৌমিক, 

* এক ঝাঁক পলায়নরত ময়ূর – সত্যজিৎ রায়, 

* ডেভিড ও বাংলার প্রত্নকীর্তি – দেবকুমার চক্রবর্তী,

* বাংলার এক বিস্মৃতপ্রায় প্রত্ন-ভাস্কর্য গবেষক – সোমাভা বিশ্বাস, 

* মন্দিরপ্রাণ ডেভিড ম্যাককাচন – ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী,

* বাঁকুড়া জেলার মন্দির : ডেভিড ম্যাককাচন – মানিকলাল সিংহ, 

* ডেভিড ম্যাককাচন ও তাঁর কাজ – অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়,

* বাংলার মন্দিরে এক ইংরেজ সাহেব – দীপঙ্কর ভট্টাচার্য।

মন্তব্য তালিকা - “প্রয়াণের অর্ধশতক পেরিয়ে ডেভিড ম্যাককাচন”

  1. এমন বিরল ব্যক্তিত্ব ও বাংলার স্থাপত্যপ্রেমী শিক্ষক ও গবেষকের জীবনবৃত্যান্ত জেনে সমৃদ্ধ হলাম।

  2. এমন বিরল ব্যক্তিত্ব ও বাংলার স্থাপত্যপ্রেমী শিক্ষক ও গবেষকের জীবনবৃত্ত্যান্ত জেনে সমৃদ্ধ হলাম।

  3. সেটা 1968 সাল ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি । এক গরমের ছুটির দিন সকাল নয়টা নাগাদ পুরাকীর্তি গবেষক ও লেখক পঞ্চানন রায় মশাইয়ের সঙ্গে এলেন এক সাহেব আমাদের বাড়ির পঞ্চচুরা নারায়ণ মন্দির দেখতে । সঙ্গে দামী ক্যামেরা ,ট্রাইপড স্ট্যান্ড, কত ধরনের লেন্স ফিল্টার, ব্রাশ, সলিউশন আর সাহেবের নিষ্ঠা । কর্তাদের আমলে তৈরি মন্দিরের যে কোন মূল্য থাকতে পারে নিত্য দিন দেখতে দেখতে ভুলে গেছিলাম ।
    এবার দাদুর মঞ্চে পদার্পণ , সদর বৈটক খানায় অপেক্ষারত অভ্যাগতদের আতিথেয়তার একটা দায়
    থাকে ! দেখা গেল অতিথি বৃদ্ধ দাদুকে তুই বলে সম্বোধন ও অনুযোগ করছেন ! জানা গেল দাদু ও পঞ্চানন রায় মশাই 1921 সালে কলকাতার City Collegiate School থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন । সাহেব মাপজোখ শুরু করবেন এবার, কবে সুন্দর ওই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জানবেন, দৈর্ঘ্য প্রস্থ উচ্চতা ,গঠনশৈলী ইত্যাদি নবাকিচু । তা আমি বীরের মত মঞ্চে লাফ মেরে নামলাম । সেসব হল , এবার আসল কাজ সাহেবের শুরু – ফটো তোলা ! প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ওই বৈশাখ জৈষ্ঠ্যের তীব্র গরমে দরদর ঘামশিক্ত সাহেব তারপর জানতে চাইলেন নিকটবর্তী প্রাক্তন জমিদার মন্ডলদের সম্ভাব্য মন্দির ও পাশাপাশি অন্য কোন মন্দিরের পথ দেখাতে কেউ সঙ্গী হবেন কিনা । প্রায় দেড় দু ঘণ্টা তখন কেটে গেছে , আমাদের পাড়ার ভিড় তখন কোন মজা নেই দেখে কেটে পড়েছে । সানন্দে সঙ্গী হলাম । ভুলেও ইংরেজি বলেন নি যদিও আমি মুখিয়ে ছিলাম । বলেছিলেন তাঁর পিতা মাতার কথা একজন ব্রিটিশ অন্যকোন ফ্রেঞ্চ , যাদবপুরে চাকরি করেন ইত্যাদি ।
    মন্ডল দের বাড়ির এক দুটো ছোট দীনহীন মন্দিরে তাঁর বেশি সময় লাগেনি । তারপর রওয়ানা দিলাম পাশের সাহাচক গ্রামের , সেখানেও সমৃদ্ধ কোন মন্দির পেলাম না । তখন প্রায় দুটো তিনি বাড়ি ফেরার কথা বললেন কেননা আমাকে ত চান খাওয়া করতে হবে , তাঁকে নয় ! চমৎকৃত হলাম । আমি তখন বাংরেজি ভাষায় জিজ্ঞাসা করে ফেললাম তাঁর কাজ কী ফিনিশ ? তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন ফিনিশড । গালে যেন চড় পড়ল , সাহেবের কাছে বেইজ্জত বাঙালি ।
    এতটা সময় তিনি পিতৃসুলভ স্নেহে শেখাচ্ছিলেন মন্দিরের গঠনশৈলী , এক চূড়া না পঞ্চ চুড়া ,পাললিক মৃত্তিকাময় অঞ্চলে পোড়া ইট , ইটের বেদ , দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আনা ল্যাটেরাইট পাথরে তরী কিনা , স্থাপন ফলক মন্দিরের কোথায় বসানো থাকে ,এবং বিশেষত টেরাকোটার কাজের নৈপুণ্য ও বৈশিষ্ট্য ! তিনি ধারাভাষ্যের মত বলছিলেন অতীতের মানুষের সংস্কৃতি ধর্মীয় ভাবনার ছাপ থাকে মন্দিরে । উদাহরন টেনে আমাদের মন্দিরে তারকাসুর বধের ও অন্যান্য টেরাকোটা নির্বাচন আমাদের বংশের মানুষের আধ্যাত্মিক ভাবনার কথা বলে । মুগ্ধ বিস্ময়ে আমি জীবন্ত সে ধারাভাষ্য শুনছিলাম । তিনি বলছিলেন মানুষের সংস্কৃতির স্বাক্ষর থাকে পূরণ palimpsest এ ,
    বললেন পূরণ পুঁথি পত্র অনাদরে বাংলার ঘরে ঘরে নষ্ট হচ্ছে ।
    বাড়ি ফিরে চান খাওয়া ইত্যাদি । আধঘন্টা পরেই কর্মোদ্যমি মানুষটি আবার বেরিয়ে পড়লেন আশেপাশের মন্দির দেখতে । আমি এবার বেশ মাপজখে দর হয়ে গেছি । পাশের পরিত্যক্ত বেরা বাগানের দু তিনটি মন্দিরে মাপজোখ করলাম । মনে রাখতে হবে তিনি ইতিপূর্বে বলেছেন ক্ষেত্র সমীক্ষার কাজে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগ যেন আহত বা হয় ত মনে রাখতে হবে এবং এতগুলো মন্দিরের কোনটিতে তিনি চরেন নি ।
    বিকেল সন্ধের মুখে ভাবলাম এই পথহারা পথিকের গন্তব্য কী ? ভাবলাম আমাদের বাড়ি রাত্রিবাস করবেন । কিন্তু তিনি জানতে চাইলেন গ্রামের পথ ধরে তিনি একটু দূরবর্তী বাদুদেবপুর গ্রামে পঞ্চানন বাবুর বাড়ি যাবেন কিভাবে ? নিমরাজি হয়ে বললাম যদি প্রস্তাব দিলাম রাত্রে বাড়িতে কাটিয়ে পরেরদিন সকালে রওয়ানা দিলে যেমন হয় ! তিনি পরেরদিন কলকাতা ফিরে যেতে হবে বলেছিলেন ।
    পরে এই সাহেবের মুখে শুনে তারাপদ সাতরা ও অন্য আরও প্রত্নসন্ধানি বাড়ি আসেন । আনন্দ নিকেতনে আওহান জানান। ইতিমধ্যে তারাপদ বাবু তাদের মুখপত্র কৌশিকির দু তিনটি সংখ্যা দিয়েছেন । আমি গরম চষে আড়াইশ বছরের প্রাচীন শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের প্রায় চার ইঞ্চি পুরু পুঁথি আনন্দ নিকেতন সংগ্রহশালায় জমা দিয়েছি ।
    হ্যাঁ বলা হয়নি বিদায় বেলায় সেই প্রথম ও শেষবারের মত মানুষটি পরিচয় দিলেন তিনি ডেভিড ম্যককাচান ।