সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

পুরনো সম্পাদকীয়

বাংলায় নিদাঘের এই মাসগুলিতেই আসে পঁচিশে বৈশাখ আর এগারই জ্যৈষ্ঠ আর প্রত্যেক বার নতুন করে ভাবায় বাংলার গানের দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা। অন্ত-মধ্যযুগ থেকে যে ভূখণ্ড বাঙ্গালা বা পরে বাংলা নামে পরিচিত, সেই নদীবিধৌত ভূখণ্ডের অধিবাসীরা প্রাগিতিহাস ও ইতিহাসের প্রাচীন কালপর্বে কোন ভাষায়, কোন ভাবনাকে গানের সুরে প্রকাশ করতেন তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না, কিন্তু অনুমান করা যায়, আজও বাংলার জনমানস থেকে সেই সুর আর ভাবনার আবেশ লুপ্ত হয়নি। শুধু বাংলা ভাষা নয়, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও ত্রিপুরার বিভিন্ন প্রান্তের জনজাতীয় অধিবাসীদের সব মাতৃভাষার সঙ্গীত ঐতিহ্যও বাংলার সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অঙ্গীভূত। বাংলার সঙ্গীতের ইতিহাস নিয়ে এক শতকের বেশি সময় ধরে যথেষ্ট গবেষণা হলেও, বাংলার সঙ্গীতের এই সামগ্রিক রূপটি আজও অধিকাংশ মানুষের কাছে অধরা।
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন সমাগত। এই ফাঁকে ব্রিটিশ ভারতে নির্বাচনী ব্যবস্থার শুরুর দিনগুলির ইতিহাস নিয়ে একটু আলোচনা করলে মন্দ হবে না। ১৯২০ সালে ব্রিটিশ আমলে সারা দেশে প্রথম প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন হয়৷ তখন নির্বাচনী ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত জটিল। নির্বাচনে ভোটার হিসেবে যোগ্যতা অর্জনের জন্য ব্যক্তিকে সম্পত্তির বা জমির মালিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা অথবা আয়কর বা পৌরকর দেবার প্রমাণপত্র থাকতে হত। ফলে এই ব্যবস্থাতে মূলত ধনী, পশ্চিমা-শিক্ষিত ভারতীয়দেরই ভোট দেওয়ার অধিকার থাকত। নারীদের ভোট দানের অধিকার খুবই সংকুচিত ছিল। আজকের সর্বজনীন ভোটাধিকারের তুলনায় তখনকার ভোটাধিকার ছিল সীমিত সংখ্যক মানুষের—জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও কম মানুষ ভোট দিতে পারতেন।
স্বাধীনতার আগে জওহরলাল নেহরু ১৯৪৬ সালে তাঁর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া বইতে সায়েন্টিফিক টেম্পার বা বিজ্ঞান মনস্কতার কথা লিখেছিলেন। স্বাধীনতার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলাল ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশে বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তোলার বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন। নেহরু তাঁর বইতে লিখেছিলেন, ‘দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য বিজ্ঞানের প্রয়োগ আজ আবশ্যিক, একে এড়িয়ে যাবার কোনো উপায় নেই, কিন্তু প্রয়োগের পর আরও কিছু করা দরকার—তা হল বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা গড়ে তোলা, দুঃসাহসী জটিল বৈজ্ঞানিক মেজাজ, সত্য ও জ্ঞানের জন্য অনুসন্ধান; কোনো কিছু পরখ, যাচাই না করে গ্রহণ না করা এবং নতুন প্রমাণ সামনে এলে পুরানো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার তৎপরতা; আগে থেকে ঠিক করা ধারণার উপর নয়, পর্যবেক্ষণলব্ধ সত্যের উপর আস্থা, মনের কঠোর শৃঙ্খলা—এসবই আজ প্রয়োজন। শুধু বিজ্ঞানের প্রয়োগের জন্য নয়, জীবনের জন্যও এবং তার সমস্যা সমাধানের জন্যও। বৈজ্ঞানিক মেজাজ ও দৃষ্টিভঙ্গি এক জীবনশৈলী, চিন্তা প্রক্রিয়া, কার্যধারা এবং সহ-নাগরিকদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পদ্ধতি হওয়া উচিত। বিজ্ঞানমনস্কতা যে পথ তৈরি করে সেই পথ দিয়ে মানুষের হাঁটা দরকার। বিজ্ঞান কেবল ইতিবাচক জ্ঞানের চর্চা করে, কিন্তু বিজ্ঞানমনস্কতা যে প্রভাব তৈরি করে তা পাশফেলের চেয়ে অনেক সুদূরপ্রসারী।’
২০২৬ সাল শুরু হল। নতুন বছরের শুরুতে বাংলায় ইতিহাস চর্চার একটি বিশিষ্ট ঘরানাকে নিয়ে নতুন কিছু চিন্তা ভাবনা করা যেতে পারে। বিগত দুই শতকে বাংলায় ইতিহাস চর্চা শাসকদের কেন্দ্র করে আবর্তনের কক্ষপথ ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের জীবনচর্যার অন্বেষণের দিকে অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। এগিয়ে চলার পথে বাংলার জেলাভিত্তিক ইতিহাস চর্চার বিশাল স্রোতের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে স্থানিক ইতিহাস চর্চার ধারা। আজ বাংলার তথ্যভিত্তিক ইতিহাস চর্চার পরিধির মধ্যে চলে এসেছে অনেক গ্রাম ও শহর, জনগোষ্ঠী ও সমাজ, খাদ্য ও পরিধান এবং স্থানিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বাংলার বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক ও স্থানিক ইতিহাস চর্চার জন্য গঠিত সংগঠন ইতিমধ্যেই তাদের উল্লেখনীয় কাজের জন্য সম্মান ও স্বীকৃতি অর্জন করেছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় প্রত্যেক জেলায় ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলি যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ নিরলস ভাবে করে চলেছে তারই পরিণামে আজ সামগ্রিক ভাবে বাংলার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ রূপ ধারণ করতে সমর্থ হয়েছে।