সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ইতিহাস তথ্য ও তর্কর উপস্থাপনায়, প্রকাশিত হয়েছে ‘বঙ্গ ইতিহাস প্রবাহ’

সাম্প্রতিক লেখা

আমাদের মধ্যে ক’জনই বা ভোজপুরি সিনেমা সম্পর্কে খবর রাখি! এ ভাষার ছবি আজ বিশেষ কিছু ঝোঁকের জন্য পরিচিত। টেলিভিশনে তেমন ছবির অংশ বিশেষ দেখালে বেশ কৌতুক আর হয়ত কিছুটা তাচ্ছিল্য নিয়ে তাকায় ‘সিনেমাপ্রাণ’ বাঙালি দর্শক। তাই ষাটের দশকে এই ধারায় কোন পরিচালক কেমন ছবি তৈরি করেছিলেন তার তথ্য আমাদের কাছে না থাকাই স্বাভাবিক। ঔদাসীন্য যেখানে থাকার থাক, উল্লেখ করা যাক যে ১৯৬৬ সালে কুন্দন কুমার নামে একজন পরিচালক তৈরি করেছিলেন ‘লোহা সিং’ নামে ভোজপুরি চলচ্চিত্র। নামেই মজে যান অনেকে, তেমনি আবার চটেও যান বহু মানুষ। কোনো ছবির নাম ‘লোহা সিং’ ছিল শুনলে আর এক দফা অবজ্ঞা ধেয়ে আসবে নির্ঘাত। ছবিটা ওই সময়েও ভালো বাণিজ্য করেছিল জানলেও চলে যাওয়ার নয় এই অবজ্ঞা।১ তবে নামের পেছনে কাহিনিটা জানলে বোধহয় মনোভাব পাল্টাতে পারে খানিকটা।
রুশ বিপ্লবের আগেও মার্ক্স এবং তাঁর প্রথম ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ হয়েছিল। কলকাতা থেকে জনৈক ব্যক্তি প্রথম ইন্টারন্যাশনালের কাছে একটি চিঠি লিখে শ্রমিক ইউনিয়নকে তার অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। চিঠিটি ইন্টারন্যাশনালের অধিবেশনে পঠিত ও আলোচিত হয়েছিল, এটুকু জানা গেলেও কে এর লেখক বা কোন ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্তির আবেদন এখানে ছিল, তার পরিণতিই বা কী হয়েছিল, সে বিষয়ে বিশেষ কোনও খোঁজখবর পাওয়া যায় না। প্রথম ইন্টারন্যাশনালের অবলুপ্তির পর যে দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনাল গড়ে উঠেছিল, সেখানেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা গিয়েছেন ও বক্তৃতা দিয়েছেন। মার্ক্স সম্পর্কে ১৯১২ সালেই আগ্রহ উদ্দীপক লেখা প্রকাশিত হয় কলকাতার ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায়। হরদয়ালের এই লেখাটির শিরোনাম ছিল, ‘কার্ল মার্ক্স : এ মডার্ন ঋষি’। তবে মার্ক্সবাদের সঙ্গে বা কমিউনিস্ট আদর্শ ও সংগঠনের সঙ্গে ভারত তথা বাংলার ধারাবাহিক সংযোগ স্থাপিত হয়েছিল রুশ বিপ্লবের পরে। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পরে যে সব কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিও। পার্টির প্রতিষ্ঠা নিয়ে অবশ্য একটি বিতর্ক আছে। এর প্রতিষ্ঠা ১৯২০ সালে ভারতের বাইরে তাসখন্দে, না ১৯২৫ সালে ভারতের মধ্যে কানপুরে – সে নিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো একমত নয়।
মানুষ ঠিক কবে থেকে সঙ্গীত আয়ত্ত করেছিল, তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। প্রথম সঙ্গীত ছিল মানুষের কণ্ঠস্বর আর আশেপাশে থাকা বস্তুর উপর ঠুকে তোলা আওয়াজ বা ছন্দ; স্বাভাবিকভাবেই তার কোনো বস্তুগত প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবুও গবেষণায় মোটামুটি পরিষ্কার যে, প্রাগৈতিহাসিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই সঙ্গীতের বীজ তৈরি হয়েছিল। প্রকৃতির বিভিন্ন শব্দ ও পশুপাখিদের আওয়াজ অনুসারে সুর তৈরি করে তা গুনগুন করা, তালি বাজানো, পা ফেলা, পাথর বা কাঠের টুকরো ঘষে বা ঠুকে শব্দ বের করা—এসবই ছিল যোগাযোগ, শিকার, উৎসব আর গোষ্ঠীর ঐক্য রক্ষার এক স্বাভাবিক উপায়। শব্দের মধ্যেই প্রাচীন মানুষ নিরাপত্তা, উত্তেজনা বা সংহতির অনুভূতি তৈরি করত। এর ফলে সঙ্গীত কেবল বিনোদন ছিল না, বরং সামাজিক ও মানসিক দিক থেকে বেঁচে থাকার একটা হাতিয়ার।
রাত প্রায় দশটা। হুগলি নদীর বুকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে একটি ছোটো ফেরি। দিনের আলোয় এই ফেরিঘাট ছিল কোলাহলপূর্ণ—ব্যবসা, যাত্রী, দরকষাকষি, হিসাবের কোলাহলে আলোকিত। কিন্তু এখানে রাত নামতেই দৃশ্য বদলে যায়। চারপাশে অন্ধকার, কেবল জলের শব্দ আর দূরের শহরের অস্পষ্ট আলো। ফেরির এক পাশে বসে থাকা মাঝিটি সারাদিনের পরিশ্রম শেষে আবার কাজে নেমেছে। তবে তার এই শ্রম দিনের নয়—অন্ধকার রাতের। আর এই রাতই তার কাজকে ইতিহাসের চোখে ভিন্ন অর্থ দেয়। দিনের আলোয় যে শ্রম ছিল স্বাভাবিক জীবিকা, রাতের অন্ধকারে সেই শ্রমই হয়ে ওঠে সন্দেহজনক। ইতিহাসে রাত যেন কেবল একটি সময় নয়—একটি নৈতিক সীমারেখা, একটি রাজনৈতিক নির্মাণ।