সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

সোভিয়েত রাশিয়ার নয়া আর্থিক নীতি (নেপ): বিতর্কের নানাদিক

সোভিয়েত রাশিয়ার নয়া আর্থিক নীতি (নেপ): বিতর্কের নানাদিক

সৌভিক ঘোষাল

ডিসেম্বর ১৬, ২০২৩ ২৫২ 0

১৯২০ সালে রাশিয়ার বলশেভিকরা তিন বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর শ্বেতরক্ষীদের নির্ণায়কভাবে পরাস্ত করতে সক্ষম হলেও দেশের অর্থনীতি ও পরিকাঠামো ভেঙে চুরে যায়। রাশিয়ার পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ থেকে খানিকটা পেছনে সরে এসে নেওয়া হয় নয়া আর্থিক নীতি বা নেপ। এতে গ্রামাঞ্চলে ধনী কৃষক ও কুলাকদের অনেকটা ছাড় দেওয়া হয়, যাতে রাশিয়ায় কৃষি উৎপাদন বাড়ে এবং সেনাবাহিনী ও শহরে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ বরাদ্দ থাকে। ভারী শিল্প ও কলকারখানা এরপরেও বেশ কয়েক বছর বেশ সঙ্কটগ্রস্থ অবস্থায় থাকলেও কৃষি উৎপাদন ক্রমশ বাড়তে থাকে। ১৯২৪ এ লেনিনের মৃত্যুর পর রাশিয়ায় শুরু হয় নেপ নিয়ে এক মহাবিতর্ক। সেই বিতর্ককে নানা দিক থেকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টাই আমরা এই লেখায় করব। তার আগে দেখে নেওয়া যাক ঠিক কোন পরিস্থিতিতে গৃহযুদ্ধের পর রাশিয়ায় লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা এই নয়া আর্থিক নীতি গ্রহণ করেছিলেন।

১৯২০ সালের নভেম্বরে লেনিন মস্কোর নিকটবর্তী এক গ্রাম কাশিনোতে যান এক বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করতে। সেখানে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা হয়। সরোকিন নামের এক কৃষক লেনিনকে  জানান যে আগে তারা মাঠে শন বুনতেন। কিন্তু সব উদবৃত্ত সরকার নিয়ে যাবে এই ভয়ে তারা আর শণ বোনেন না। সারায়েভ নামে আরেক কৃষক বলেন যে উদবৃত্ত বাজেয়াপ্ত করার আইনকে তারা ভয় পান। কাশিন নামের এক কৃষক বলেন তারা না চাইলেও সরকারের নীতির জন্য তারা গরু, ভেড়া মেরে খেয়ে ফেলেন বা তাদের লুকিয়ে রাখেন। লেনিন তাঁর জনসংযোগের সূত্রে গৃহযুদ্ধের সময়ে গৃহীত ওয়ার কমিউনিজমের নীতিমালার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার দিকটা বুঝতে পারছিলেন।

অর্থনীতির পুনর্গঠন বা নেপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত চর্চা হয়েছিল ১৯২১ সালের সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক) র দশম পার্টি কংগ্রেসে। তার আগেই বেশ কিছু বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হয়েছিল বলশেভিক সরকারকে। এই বিদ্রোহগুলো শ্বেতরক্ষীদের বিদ্রোহের চেয়ে ছিল একেবারেই আলাদা ধরনের। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় পেত্রোগ্রাদের ক্রনসতাদ নৌঘাটিতে নৌ সেনাদের বিদ্রোহের কথা। এরা ছিলেন বলশেভিক অনুগত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা বিদ্রোহ করেন। দাবি তোলেন শ্রমিক এবং কৃষকদের বেশ কিছু ছাড় দিতে হবে, সোভিয়েতগুলোতে অবাধ নির্বাচন করতে হবে। উদবৃত্ত বিধি তুলে নিয়ে শস্য উৎপাদক এলাকাগুলিতে বাধামুক্ত ব্যবসা বা খোলাবাজার ব্যবস্থার প্রচলন ছিল তাদের প্রধান দাবি। ক্রনসতাদ বিদ্রোহকে রেড আর্মি দ্রুত দমন করে। কিন্তু লেনিন এর মাধ্যমে আসা বিপদ সংকেতটা টের পান। তিনি সোভিয়েত রাষ্ট্রের সামাজিক ভিত্তি সংকীর্ণ হবার বিপদের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। ক্রনসতাদ বিদ্রোহের অব্যবহিত পরেই সংগঠিত বলশেভিক পার্টির দশম কংগ্রেসে বিষয়টিকে বিস্তারিত চর্চার মধ্যেও নিয়ে আসেন।

সেনাবাহিনী বা কৃষকদের পাশাপাশি শ্রমিকদের একাংশও সোভিয়েত সরকারের নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। ক্রনসতাদ বিদ্রোহের আগে পেত্রোগ্রাদে এবং আরও কয়েকটা শহরের কলকারখানায় বেশ কয়েকটা ধর্মঘট হয়ে যায়। শ্রমিকদের জীবনধারনের অবস্থার অবনতি, খাদ্য ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অনিয়মিত সরবরাহ, জ্বালানির অভাবে কয়েকটা কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলি বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল। শ্রমিকরা বেশ কয়েকটি প্রস্তাবও সরকারকে দেয়। তার মধ্যে একটি প্রধান দাবি ছিল ছোটখাটো ব্যবসা এবং কৃষি ও শিল্প পণ্যের মধ্যে বিনিময়ের ওপর থেকে বিধি নিষেধের বোঝা হালকা করতে হবে। শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা শিল্পপণ্যের বিনিময়ে গ্রামাঞ্চল থেকে খাদ্য জোগাড় করে শহরে নিয়ে আসার যে ব্যবস্থাপণা চালু করেছিল তার ওপর প্রায়শই হামলা চালানো হত। এই হামলা বন্ধ করার দাবি করে ব্যবস্থাটিকে বজায় রাখার আর্জিও তারা রেখেছিল।

শ্লিয়াপনিকভের মতো অগ্রণী ধাতু শ্রমিক, যিনি প্রথম সোভিয়েত সরকারের শ্রমমন্ত্রী ছিলেন, বলশেভিকদের শ্রমনীতির তীব্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের দিকটির বিরোধিতা করেন এবং কারখানার ওপর শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণের নীতির পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁর এই ওয়ার্কাস কন্ট্রোল আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়ান বলশেভিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আলেকজান্দ্রা কোলোনতাইও।

কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানালের চতুর্থ কংগ্রেসে দেওয়া এক বক্তৃতায় লেনিন এই প্রসঙ্গে বলেন যে, “১৯২১ সালে আমরা সোভিয়েত রাশিয়াতে একটা গভীর সংকটের চাপ অনুভব করেছি। আমি মনে করি এটা ছিল গভীরতর সংকট। এই সংকটের মধ্যে দিয়ে শুধু যে কৃষকদের একটা রীতিমতো বড়ো অংশের অসন্তোষই আমাদের দৃষ্টিপথে এসেছিল তা নয়, শ্রমিকদেরও একটা অংশের অসন্তুষ্টিকে আমরা দেখতে পেয়েছিলাম।” (কালেক্টেড ওয়ার্ক, খণ্ড ৩৩, পৃ ৪২১)

তথ্যের দিকে তাকালেও বোঝা যায় গৃহযুদ্ধের পরে অর্থনীতির পুনর্গঠন কেন জরুরী, এক কার্যক্রম হিসেবে সামনে এসেছিল। গৃহযুদ্ধের ফলে জাতীয় সম্পদের এক চতুর্থাংশ নষ্ট হয়েছিল, জাতীয় আয় নেমে এসেছিল এক তৃতীয়াংশে। অধিকাংশ কলকারখানার উৎপাদন সঙ্কটে পড়েছিল। ভারি শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। ১৯১৩ সালে প্রথম যুদ্ধ শুরু হবার আগে ভারী শিল্পে উৎপাদন যা হত, ১৯২০ সালে তা নেমে এসেছিল তার এক সপ্তমাংশে। ইস্পাত গলানোর পরিমাণ নেমে যায় শতকরা ৫ ভাগে। পরিবহন ব্যবস্থা অনেকটাই অকেজো হয়ে পড়ে। দেখা দেয় তীব্র খাদ্য সঙ্কট ও দুর্ভিক্ষ। গৃহযুদ্ধ ২ কোটির বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ২০ শতাংশ গৃহযুদ্ধে মারা যান। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বলশেভিকদের সমর্থনভিত্তির বিরুদ্ধেই একের পর এক বিদ্রোহ শুরু হয়ে যায়। নতুন করে রুশ দেশ, সমাজ ও অর্থনীতির গঠনকার্য শুরু করা জরুরী হয়ে পড়ে। এই নতুন গঠনকার্যের জন্য নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি নেওয়া হল। এটাই নেপ বা নিউ ইকনমিক পলিসি নামে বিখ্যাত হয়ে আছে৷

নেপ-এর নয়া নীতির সময়ে পুরোনো বেশ কিছু নীতি থেকে সরে এল বলশেভিকরা। কৃষকনীতিতে পরিবর্তন ছিল এর অন্যতম। লেনিনের অভিমত ছিল নেপ-এর শুরু করতে হবে অধিকাংশ কৃষকের প্রয়োজনের সঙ্গে রফা করে, কারণ দেশে সবচেয়ে জরুরী প্রয়োজন ছিল খাদ্যের এবং কৃষকরাই তার যোগানদার। “সব কিছুকেই প্রধানতম দিকটির বিবেচনাধীন করতে হবে এবং প্রধানতম দিক হল, যে কোনো মূল্যে খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো” (লেনিন, কালেক্টেড ওয়ার্কস, খণ্ড ৪৩, পৃ ৩১৮)। যন্ত্রশিল্পের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তার প্রসার ও বৃদ্ধিকে কিছুদিনের জন্য দ্বিতীয় স্তরের গুরুত্ব দিয়ে দেখবার কথা তখন বলেছিলেন লেনিন। মনে রাখতে হবে শ্রমজীবীদের নেতৃত্বে রেখে তার সঙ্গে কৃষকদের মৈত্রীর ওপর জোর দিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মূল রণনীতি গড়ে তুলেছিলেন লেনিন। কিন্তু তিনি যখন নেপ সংক্রান্ত ভাবনা চিন্তা করছেন তখন সোভিয়েত সমাজ ও সোভিয়েত রাষ্ট্রের কৃষক অংশকে আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিলেন। ১৯২০ সালের শেষের দিকে নেপ শুরু হবার আগেই তিনি লিখছেন, “আমাদের রাষ্ট্রকে প্রকৃতপক্ষে একটি শ্রমিক রাষ্ট্র বলা যায় না। একে বলা যায় শ্রমিক ও কৃষকদের রাষ্ট্র।” (লেনিন, কালেক্টেড ওয়ার্কস, খণ্ড ৩২, পৃ ২৪)। কৃষি অর্থনীতিবিদ এ বি চায়নভ, সাইবেরিয়া অঞ্চলের সোশ্যালিস্ট রিভোলিউশনারি (এস আর) দলের নেতা চের্নভ প্রমুখের লেখাপত্র এইসময় লেনিনকে প্রভাবিত করে। লেনিন ক্রমশ বুঝতে থাকেন “পার্টির বাইরের কৃষকেরা উদবৃত্ত বাজেয়াপ্ত করার নীতির বদলে শস্যে কর পরিশোধ করতে চাইছে (ট্যাক্স ইন কাইন্ড)। সেই আকাঙ্ক্ষাটি পূরণ করা দরকার।” (রাফ ড্রাফট অব থিসিস কনসার্নিং দি পেজেন্টস, লেনিন কালেক্টেড ওয়ার্কস, খণ্ড ৩২, পৃ ৩৪৩)

বলশেভিক পার্টির দশম কংগ্রেসে নিউ ইকনমিক পলিসি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পর কৃষকদের কাছ থেকে আদায়ের পরিমাণ ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়। নতুন পরিমাণটি স্থির করা হয় শহর এলাকা ও শ্রমিকদের নিম্নতম চাহিদাটিকে মাথায় রেখে। ফলন কম হলে আদায়ের পরিমাণ আরও কমানো হত। নেপ-এর সূত্রে এই প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয় যে দেশের আর্থিক পরিস্থিতি যত উন্নত হতে থাকবে, কর আদায়ের পরিমাণও সেই হারে কমানো হবে। ১৯২১ সালের মার্চের এক নির্দেশিকায় বলা হয় নির্ধারিত পরিমাণ কর আদায়ের পর উদবৃত্ত বাকি পরিমাণ ফসল কৃষক ও সরকারের পারস্পরিক সম্মতিতে ক্রয়বিক্রয় করা যাবে। ১৯২৩ সালে এক নতুন নীতিনির্দেশ জারি করা হয়। এই নির্দেশবলে একপাক্ষিকভাবে উদবৃত্ত ফসল বাজারে বিক্রি করার অধিকার লাভ করে কৃষকেরা।

১৯২৩ সাল থেকেই বীজ বোনার এলাকাগুলো ক্রমশ বাড়তে থাকে, গরু ছাগল মুরগী পালনেও জোয়ার আসে। বিপ্লবের পরে প্রথমবারের জন্য রাশিয়ার উদবৃত্ত ফসল বিশ্ববাজারে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯২২ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যবর্তী পর্বে সোভিয়েত খাদ্যশস্যের উৎপাদন ৫ কোটি ৬০ লক্ষ টন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৭ কোটি ৪৭ লক্ষ টন, বিট চিনির উৎপাদন বেড়েছিল ১৯ লক্ষ টন থেকে ৯১ লক্ষ টনে। গরু ঘোড়া মোষের সংখ্যা ৪ কোটি ৫৮ লক্ষ থেকে বেড়ে হয়েছিল ৬ কোটি ২১ লক্ষ। পশ্চিম ইউরোপের চেয়েও বৃদ্ধির হার ছিল দ্রুততর।

কুলাক বিরোধী নানা নীতি ও পদক্ষেপ থেকে ১৯২১ এর পর কিছুটা সরে এলেন কমিউনিস্টরা। তখন গৃহযুদ্ধর অবসান হয়েছে, শ্বেতরক্ষী বাহিনীকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলিও সরে গিয়েছে সোভিয়েত সীমান্ত থেকে৷ তত্ত্বগতদিক থেকে কুলাকদের পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রের শত্রুপক্ষ হিসেবে যে বিচার কমিউনিস্টরা করেছিল, সেই বিচার থেকে সরে না এসেও কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদে গৃহযুদ্ধ অবসানের পর কুলাকদের সঙ্গে কিছু সমঝোতা করা হয় ও কুলাকনীতিকে খানিকটা নমনীয় করা হয়। সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করতে পারছেন এমন কুলাক তথা ধনী কৃষকদের ইনসেনটিভ দেওয়া শুরু হয়। সমগ্র কৃষকদের মধ্যে চার শতাংশ কুলাক তখন ছিলেন। নতুন এই নীতির যুগে কুলাকরা অনেক জায়গাতেই তাদের সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অনেকটা বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হন। অনেক এলাকাতেই সোভিয়েত সরকারের প্রতিনিধির বদলে তারাই গ্রাম সমাজের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন।

নেপ অর্থনীতির দিকে যাবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বলশেভিক পার্টির মধ্যে ১৯২১ সালে খুব একটা বিতর্ক হয়নি। গৃহযুদ্ধের পর সে সময়ের প্রধান নেতৃত্ব – লেনিন, ট্রটস্কি, স্তালিন, কামেনেভ, জিনোভিয়েভ, বুখারিন – সকলেই নেপ-এর পক্ষে ছিলেন। নেপ থেকে সরে আসার সময়কালে, কুলাকদের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ চাপানো, কৃষিতে ফোর্স কালেক্টিভাইজেশনের প্রবর্তন, কৃষির উদবৃত্তকে শিল্পে নিয়ে আসার নীতিগুলি নিয়ে কিন্তু প্রবল বিতর্ক শুরু হল। এই বিতর্কের শুরুর সময় একদিকে ছিলেন প্রেয়ব্রাজেনস্কি ও ট্রটস্কি, অন্যদিকে ছিলেন বুখারিন ও তাঁর অনুগামীরা। ১৯১২৭-এ ট্রটস্কি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হলেন। এই বিতর্ক তারপরে নতুন মোড় নেয়। পার্টির সাধারণ সম্পাদক স্তালিন মধ্যপন্থী অবস্থান পরিবর্তন করে প্রেয়ব্রাজেনস্কিদের মতই দ্রুত শিল্পায়ন ও সে কারণে কৃষি থেকে উদবৃত্ত সঞ্চয়ের পথে এগোতে থাকেন। শুরু হয় স্তালিন বুখারিন দ্বন্দ্ব। রাশিয়ায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও নীতির দ্বন্দ্বকে পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার। সেইজন্য এই পর্বের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে আমাদের।

রাশিয়ার অর্থনীতি ও বলশেভিক সরকার যখন ধীরে ধীরে স্থিতাবস্থার দিকে এগোচ্ছে সেই সময়েই লেনিন অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯২১ সালে তাঁর অসুস্থতার শুরু ও ১৯২৩ সালে দ্বিতীয় স্ট্রোকের পর তিনি চলৎশক্তিহীন ও বাকরহিত হয়ে পড়েন। লেনিনের সুস্থ হয়ে পার্টি ও সরকার পরিচালনার সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে থাকে ও ১৯২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। লেনিনের অসুস্থতার সময়েই যে প্রশ্নটি সামনে এসেছিল, লেনিনের মৃত্যুর পর সেটি তীব্র হয়ে ওঠে। পার্টি ও সরকারে লেনিনের অবিসংবাদী নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী কে হবেন তাই নিয়ে যথেষ্ট দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

লেনিনের অসুস্থতার সময় থেকে পার্টির মধ্যে এমন কিছু প্রবণতা মাথা চাড়া দিতে থাকে যা লেনিনকে যথেষ্ট কুন্ঠিত করে। ১৯২২ সালে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন স্তালিন। কিছুদিন পর থেকেই স্তালিনের নানা কাজ ও পার্টি পরিচালনা পদ্ধতি সম্পর্কে লেনিন আপত্তি জানাতে থাকেন। স্ত্রুপস্কায়াকে স্তালিনের অপমানের ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে স্তালিনের সঙ্গে লেনিনের ব্যক্তিগত সম্পর্কেরও অবনতি হয় এবং লেনিন তাঁর মনোভাব কঠোর ভাষায় স্তালিনকে জানিয়েও দেন। লেনিন আশঙ্কা করতে থাকেন ভবিষ্যতে বলশেভিক পার্টি নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ হতে পারে এবং দ্বন্দ্বের মুখ্য দুই শরিক হতে পারেন ট্রটস্কি ও স্তালিন। স্তালিনকে পার্টির সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অপসারণের কথাও তিনি বলেন এবং এর কারণ হিসেবে স্তালিনের ক্ষমতা অপব্যবহারের প্রবণতা, রূঢ়তা, কমরেডসুলভ সহমর্মিতার অভাবের কথা লিখিতভাবে উল্লেখ করেন। বিপরীতে ট্রটস্কি সম্পর্কে তাঁর আপত্তির জায়গা ছিল সবকিছুকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের বিপরীতে প্রশাসনিকভাবে সমাধানের দিকে অতি আগ্রহ।

১৯২৩ এর মাঝামাঝি সময়ে তৃতীয়বার স্ট্রোকের পর লেনিন পক্ষাঘাতগ্রস্থ, চলৎশক্তিহীন, বাকশক্তিরহিত হয়ে পড়েন। এইসময় বলশেভিক পার্টির (তখন তার নাম কমিউনিস্ট পার্টি হয়েছে) পলিটব্যুরোর পূর্ণ সদস্য ছিলেন লেনিন, ট্রটস্কি, স্তালিন, কামেনেভ ও জিনোভিয়েভ। লেনিনের রাজনৈতিক অনুপস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে স্তালিন কামেনেভ ও জিনোভিয়েভের মধ্যে একটি জোট তৈরি হয় ও এই জোট নানা প্রশ্নে ট্রটস্কি বিরোধী অবস্থান নেয়। ১৯২৪ বা ১৯২৫ এর পার্টি কংগ্রেসে অর্থনীতির নানা প্রশ্নে মতপার্থক্য থাকলেও সেগুলি ট্রটস্কি সেভাবে সামনে আনেননি। তবে কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর অধিবেশনে মূলত দুটি প্রশ্নে তিনি পার্টি নীতির বিরোধিতা শুরু করেন। একটি ছিল পার্টির মধ্যে ক্রমবর্ধমান আমলাতান্ত্রিকতা সম্পর্ক ও দ্বিতীয়টি ছিল নেপ-এর ফলে কুলাকদের বাড়বাড়ন্তর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের পক্ষে এবং কৃষি থেকে উদবৃত্ত সঞ্চয়ের মধ্যে দিয়ে দ্রুত শিল্পায়নের পক্ষে। এই দ্বিতীয় মতটি অবশ্য পার্টিতে প্রথম বলিষ্ঠভাবে সামনে আনেন কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা প্রেয়ব্রাজেনস্কি। (দ্রষ্টব্য দ্য প্রেয়ব্রাজেনস্কি পেপারস।)

কতদিনের জন্য সোভিয়েত অর্থনীতিকে নেপের আওতায় থাকতে হবে তার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিৎ লেনিনের লেখায় সেভাবে পাওয়া যায় না। পরিস্থিতির বিকাশের ওপরেই তিনি লক্ষ রাখার কথা ভেবেছিলেন। দীর্ঘ অসুস্থতা ও কর্মক্ষমহীন হয়ে পড়ায় তাঁকে এই নিয়ে নতুন ভাবনাচিন্তার সুযোগ দেয়নি। প্রেয়ব্রাজেনস্কি নেপ-এর বিরুদ্ধে লেনিনের মৃত্যুর পর যখন এই নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা সামনে আনলেন তখন রুশ কমিউনিস্ট পার্টিতে প্রবল বিতর্কর জন্ম হল। ১৯২৫ সালে প্রেয়ব্রাজেনস্কির “সমাজতান্ত্রিক পূঞ্জীভবনের সূত্র” নামক তত্ত্বায়নটি সামনে আসে। এই তত্ত্বায়নে প্রেয়ব্রাজেনস্কি বলেন কয়েকটি পুরোনো কলকারখানা বাতিল করে নতুন কারখানা স্থাপন করার মধ্যে দিয়ে সোভিয়েত রাশিয়ায় শিল্পায়ন সম্ভব নয়। পুরো শিল্পের কাঠামোটির খোলনলচে বদলাতে হবে। এজন্য দরকার অর্থ সম্পদ ও প্রভূত বিত্তের। রাশিয়ার যেহেতু পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মতো উপনিবেশ নেই, যেখান থেকে এই বিত্ত সম্পদ পশ্চিম ইউরোপ তাদের শিল্পায়নের সময় আমদানি করেছিল, রাশিয়াকে এগোতে হবে অন্য পথে। নেপ জমানায় রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্তৃত্ত্বের বাইরে থাকা কৃষিক্ষেত্রকেই সম্পদের জোগানদার হিসেবে প্রেয়ব্রাজেনস্কি চিহ্নিত করেন। মার্কস কথিত আদি ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুঞ্জীভবনের সূত্রটি হাজির করে তিনি ধনতান্ত্রিক পুঞ্জীভবন ও সমাজতান্ত্রিক পুঞ্জীভবনের পার্থক্যের দিকগুলিকেও ব্যাখ্যা করেন। প্রেয়ব্রাজেনস্কি অবশ্যই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবাধ লুন্ঠনের পথে রাশিয়ার শিল্পায়নের কথা বলেননি। তবে শোষণ ও সংগ্রহের কথা তিনি বলেছেন। কৃষিক্ষেত্রের উদবৃত্তকে শোষণ করেই রুশ শিল্পক্ষেত্রের বিকাশ সম্ভব বলেই প্রেয়ব্রাজেনস্কি উল্লেখ করেন।

প্রেয়ব্রাজেনস্কির প্রথম সূত্রায়নের চড়া অবস্থানকে তিনি নিজেই পরে খানিকটা স্থিমিত করে দেন। পরে তিনি বলেন কৃষকদের থেকে জোর করে ফসল বা কর আদায় করা হবে না। তাদের জমি ও শস্যও বাজেয়াপ্ত করা হবে না। প্রেয়ব্রাজেনস্কি অসম বিনিময় নীতি চালু করার কথা বলেন। সরকার যেহেতু দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের অধিকারী তাই তার পক্ষে শিল্পজ দ্রব্যের ক্রয়মূল্য সরকারের তরফে বৃদ্ধি করা সম্ভব আর উল্টোদিকে কমানো সম্ভব কৃষিজ পণ্যের দাম। সরকারকে এই অসম মূল্য নীতি চালু করার প্রস্তাব দেন প্রেয়ব্রাজেনস্কি এবং বলেন এর ফলে সরকার কম দামে কৃষিজ দ্রব্য কিনতে পারবে এবং চড়া দামে শিল্পজ দ্রব্য বিক্রির অধিকার পাবে। গ্রামাঞ্চলে সঞ্চিত সম্পদ সরকারের তহবিলে জমা পড়বে ও সেই তহবিলকে সরকার শিল্পস্থাপণের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবে। ট্রটস্কি এই সূত্রায়নকেই এগিয়ে নিয়ে যান।

আমলাতান্ত্রিকতা নিয়ে ট্রটস্কির আক্রমণের মূল নিশানা ছিলেন পার্টির সাধারণ সম্পাদক স্তালিন ও কৃষি থেকে উদবৃত্ত সঞ্চয়ের মাধ্যমে দ্রুত শিল্পায়নের পক্ষে নীতি বদলের জন্য তাঁর বিতর্কের মূল নিশানায় ছিলেন তখন পার্টির অন্যতম প্রধান অর্থনীতিবিদ ও পলিটব্যুরোতে সদ্য পূর্ণ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়া বুখারিন। এইসমস্ত বিতর্ক সত্ত্বেও ১৯২৫ এর চতুর্দশ পার্টি কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোতে ট্রটস্কি ছিলেন। এই সময়ে স্তালিনের সঙ্গে বুখারিন ও বুখারিন অনুগামীদের বোঝাপড়া দৃঢ় হয় এবং কামেনেভ ও জিনোভিয়েভের সঙ্গে স্তালিনের দূরত্ব বাড়ে। কামেনেভ ও জিনোভিয়েভও ট্রটস্কির মতোই দ্রুত শিল্পায়নের পক্ষে নীতি গ্রহণের দাবিতে সোচ্চার হন এবং ট্রটস্কি, কামেনেভ, জিনোভিয়েভ জোট লেফট অপজিশন বা ইউনাইটেড অপজিশন নামে পরিচিত হয়।

১৯২৫ এর পার্টি কংগ্রেসের পর কামেনেভ পলিটব্যুরোতে তাঁর পূর্ণ সদস্য পদ হারান, কিন্তু জিনোভিয়েভ আর ট্রটস্কি পলিটব্যুরোতে পুনঃনির্বাচিত হন। কামেনেভ থেকে যান কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে। তবে জিনোভিয়েভকে পলিটব্যুরোতে রেখেই তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা হ্রাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পার্টি কংগ্রেসের অব্যবহিত পরেই সাংগঠনিক রদবদলের মাধ্যমে পেত্রোগ্রাদ, যার তখন নতুন নাম হয়েছে লেনিনগ্রাদ – তার নিয়ন্ত্রণ জিনোভিয়েভ অনুগামীদের হাত থেকে সরে আসে বুখারিন অনুগামীদের দিকে। পার্টির মুখপাত্র প্রাভদার সম্পাদক ছিলেন বুখারিন। প্রাভদায় এইসময় থেকে ট্রটস্কি নীতির বিরুদ্ধে নাম করে এবং ইঙ্গিৎ করে লেখা বেরোতে থাকে। ট্রটস্কিও পালটা প্রচার চালাতে থাকেন। পার্টির মধ্যে বিতর্ক তপ্ত ব্যক্তিগত বিরোধের আবহাওয়া তৈরি হয় এবং ১৯২৬ সালে পলিটব্যুরো থেকে ট্রটস্কি ও জিনোভিয়েভকে অপসারিত করা হয়। কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানালের মূল দায়িত্ব থেকে জিনোভিয়েভকে সরিয়ে সেখানে বসানো হয় বুখারিনকে।

বুখারিনের সময়ে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানালের চিনা নীতি সে দেশের কমিউনিস্টদের বিপর্যয় ও ধ্বংসের কারণ হয়। কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানাল স্তালিন ও বুখারিনের মতানুযায়ী চিনের কমিউনিস্ট পার্টিকে কুয়োমিনটাঙের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতে বলেছিল। চিনের পার্টি মনে করেছিল এই নীতি মারাত্মক হবে কিন্ত কমিন্টার্ন স্থানীয় কমরেডদের কথা না শুনে তার নীতি মানার জন্য জোর করে। ফল হয় ভয়াবহ। একটি অভ্যুত্থানের পর মস্কোর নির্দেশে চিনের কমিউনিস্টরা অস্ত্র সমর্পণ করেন এবং তারপর তৎকালীন কুয়োমিনটাঙ প্রধান চিয়াং কাই শেক এর সুযোগ নিয়ে চিনা কমিউনিস্টদের কচুকাটা করেন। হাজার হাজার চিনা কমিউনিস্টকে হত্যা করা হয়। এই মারাত্মক বিপর্যয়ের জন্য ট্রটস্কি কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানালকে এবং বুখারিন ও স্তালিনকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। পার্টির মধ্যে ক্রমবর্ধমান আমলাতান্ত্রিকতা ও গণতন্ত্রকে খর্ব করার অভিযোগও তীব্রতর করেন। পার্টি অধিবেশনে স্তালিন এইসমস্ত আক্রমণের জন্য ট্রটস্কিকে ক্ষমা চাইতে বললে তিনি ক্ষোভে বিস্ফোরণে ফেটে পড়েন ও স্তালিনকে “বিপ্লবের কবর খনক” (গ্রেভ ডিগার অব রিভোলিউশন) বলে আক্রমণ করেন। ১৯২৭ সালের নভেম্বরে বিপ্লবের দশম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ট্রটস্কি ও তার অনুগামীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। ডিসেম্বরের পঞ্চদশ পার্টি কংগ্রেসের একমাস আগে ১৯২৭ এর নভেম্বরে ট্রটস্কি, জিনোভিয়েভ ও কামেনেভকে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে অপসারণ করা হয় ও পার্টি থেকেই বহিষ্কার করা হয়। শুধু তাই নয় তাদের মস্কো থেকে বহুদূরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ট্রটস্কিকে নির্বাসিত করা হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রান্তে আলমা আটায়।

১৯২৭ এর পার্টি কংগ্রেসে অবশ্য ট্রটস্কিদের দীর্ঘদিনের দাবি মোতাবেক দ্রুত শিল্পায়নের দিকে এগনোর কথা বলা হয়। ১৯২৮ এর প্রথমদিকে কৃষকদের থেকে উদবৃত্ত সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় কিছু বল প্রয়োগের অভিযোগ তোলেন বুখারিন এবং দীর্ঘদিনের বোঝাপড়া পর্বের পর বুখারিন ও স্তালিনের মধ্যে মতান্তরের জন্ম হয়। কৃষকদের ওপর কোনোরকম জুলুমের বিপক্ষে বুখারিন বরাবর সরব ছিলেন এবং মনে করেছিলেন এজন্য যদি শিল্পায়নের গতি স্লথ রাখতে হয়, তাহলে সেটাও মেনে নিতে হবে। পলিটব্যুরোর দুই সদস্য রাইকভ ও তোমস্কিও ছিলেন বুখারিনের মতের অনুগামী। অন্যদিকে যেহেতু রাশিয়ার কোনো উপনিবেশ নেই তাই রাশিয়াকে যদি শিল্পায়নের দিকে দ্রুত এগোতে হয়, তাহলে কৃষিক্ষেত্র থেকে উদবৃত্ত সঞ্চয়ের মাধ্যমে এগনো ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা খোলা নেই বলেই দ্রুত শিল্পায়নের পক্ষের লোকেরা প্রেয়ব্রাজেনস্কির সূত্রায়ন মেনে নিতেন। এমনকী স্তালিনও ১৯২৮ সালের পরে এই মর্মে কথা বলা শুরু করেন।

প্রেয়ব্রাজেনস্কির তত্ত্বায়নের পরে ১৯২৫ সালেই বুখারিন তাঁর মতের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। ট্রটস্কি, কামেনেভ, জিনোভিয়েভদের সমর্থন প্রেয়ব্রাজেনস্কি সূত্রায়নের পক্ষে ছিল বলে তাঁদের সঙ্গেও বুখারিনের প্রবল বিতর্ক হয়। প্রেয়ব্রাজেনস্কির তত্ত্বায়নের বিরুদ্ধে বুখারিন তিন দিক থেকে তাঁর আপত্তি জানান – রাজনৈতিক, মানবিক, অর্থনৈতিক। তিনি বলেন প্রেয়ব্রাজেনস্কি সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক চরিত্রটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। বুখারিনের মতে, “কৃষকদের সঙ্গে যুদ্ধরত প্রলেতারিয় একনায়কতন্ত্র কোনোমতেই শক্ত ও দৃঢ় হতে পারে না”। বুখারিন মনে করেন প্রেয়ব্রাজেনস্কি নীতি কৃষকেরা কখনোই মেনে নেবে না। লেনিনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বুখারিন বলেন কৃষক ও শ্রমিকের স্বার্থের মেলবন্ধনের মধ্যেই সোভিয়েত শাসনের সাফল্যের ভিত্তিটি নিহিত আছে।

লেনিন দেখিয়েছিলেন গৃহযুদ্ধের সাফল্যের জন্য বলশেভিকরা বিশেষভাবে নির্ভর করেছিল কৃষক ও শ্রমিক মৈত্রীর ওপর। বিশেষ করে কুলাকদের কোণঠাসা করে ছোট ও মধ্য কৃষকদের বড়ো অংশটিকে নিজেদের দিকে নিয়ে আসার মধ্যে দিয়েই শ্বেতরক্ষী ও বিদেশী হানাদারদের সাঁড়াশি আক্রমণের মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছিল। উইলিয়ম হেনরী চেম্বারলিন বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার প্রথম চার বছরের অনুপুঙ্খ ইতিহাস লেখার সময়ে গৃহযুদ্ধ প্রসঙ্গে তাঁর বিখ্যাত বইতে বলেছিলেন এই যুদ্ধে শ্বেতরক্ষী ও বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে বলশেভিক ও লাল ফৌজের বিজয় নেহাৎ কোনো সামরিক ঘটনা নয়। এই জয়ও রাজনৈতিক বিজয় এবং বলশেভিকদের শ্রেণি সংগ্রামের অংশ। এই প্রসঙ্গে লেনিনের একটি বক্তৃতা প্রণিধানযোগ্য।

১৯১৯ সালের মার্চ মাসে লেনিন রেড আর্মির উদ্দেশ্যে সেই বক্তৃতায় বলেন –

“লাল ফৌজের কমরেড সেনানীরা,

ব্রিটেন, আমেরিকা ও ফ্রান্সের পুঁজিবাদিরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তারা শ্রমিক ও কৃষকদের সোভিয়েতের প্রজাতন্ত্রর ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়। কারণ এই প্রজাতন্ত্র জমিদার ও পুঁজিপতিদের শাসনকে উচ্ছেদ করে গোটা বিশ্বের সামনে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। রাশিয়ার জমিদাররা সাইবেরিয়া, দন তীরবর্তী অঞ্চল, উত্তর ককেশাস থেকে সেনা নিয়ে আসছে এবং এই কাজে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকা তাদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করছে। তাদের লক্ষ্য জারের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং জমিদার ও পুঁজিপতিদের ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা। কিন্তু এইটা হবে না। লাল ফৌজ তাদের সেনা সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ভোলগা অঞ্চল থেকে তারা জমিদার বাহিনী ও শ্বেতরক্ষী দলের সেনাপতিদের তাড়িয়ে দিয়েছে। রিগা লাল ফৌজের দখলে এসেছে৷ দখলে এসে গেছে প্রায় গোটা ইউক্রেন। লালফৌজ এখন এগিয়ে চলেছে ওডেশা ও রস্তভের দিকে।

আর একটু চেষ্টা, আর কয়েকমাস শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ের পরই আমরা চূড়ান্ত বিজয় হাসিল করতে পারব। লাল ফৌজ শক্তিশালী কারণ তারা অত্যন্ত সচেতনভাবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কৃষকদের জমির অধিকার, শ্রমিক ও কৃষকদের শাসন ও সোভিয়েতের ক্ষমতার জন্য লড়ছে।

লাল ফৌজ অপ্রতিরোধ্য কারণ তারা লক্ষ লক্ষ কৃষককে শ্রমিকদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা লড়তে শিখেছে, কমরেডসুলভ নিয়মানুবর্তিতা শিখেছে, তারা ভয় পায় না। কিছু প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে তারা ইস্পাতের মতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ক্রমশই তারা আরও বেশি দৃঢ়তার সঙ্গে শত্রুর বিরুদ্ধে এগিয়ে যাচ্ছে এবং জয়ের বিষয়ে তারা সুনিশ্চিত।

লাল ফৌজের সেনানী কমরেডরা, লাল ফৌজের মধ্যে শ্রমিক ও কৃষকদের ঐক্য খুবই সুদৃঢ়, ঘনিষ্ট ও অবিভাজ্য। কুলাক ও ধনী কৃষকেরা সোভিয়েত শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা অতি ক্ষুদ্র ও নগণ্য এক শক্তি। তারা কৃষকদের সামান্যই বোকা বানাতে পেরেছিল এবং তাও খুব সামান্য সময়ের জন্য। কৃষকেরা জানে কেবল শ্রমিকদের সঙ্গে ঐক্যের ভিত্তিতেই তারা জমিদারদের ধ্বংস করতে পারবে৷…

মধ্য কৃষকেরা শ্রমিকদের শত্রু নয়, বরং তারা সোভিয়েত শক্তির বন্ধুশক্তি। শ্রেণি সচেতন শ্রমিকরা ও সোভিয়েত মতাদর্শে প্রকৃত আস্থাশীলরা মধ্য কৃষকদের কমরেড বলেই মনে করেন। মধ্য কৃষকেরা অন্যের শ্রমকে আত্মস্যাৎ করে না। কুলাকদের মতো অন্যের সম্পদের বিনিময়ে তারা ধনী হয়ে ওঠে না।

সোভিয়েত সরকার কুলাকদের ধ্বংস করবে। যারা মধ্য কৃষকদের ওপর অন্যায় আচরণ করে তাদের খুঁজে বের করে সাহায্য করবে। শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে সমস্ত গরীব ও মধ্য কৃষকদের মৈত্রীর নীতিতে চলবে।”

কৃষক বিরোধী নীতি তাই আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে বলে বুখারিন মনে করেন। পুঁজিবাদী উন্নয়ন ও সমাজতান্ত্রিক উন্নয়নের মধ্যে জরুরী ব্যবধানের কথাটিও বুখারিন মনে করিয়ে দিতে চান। পুঁজিবাদী শিল্পায়নে গ্রামকে শোষণ করে শহরগুলি পরগাছার মতো বিকশিত হয়। সমাজতান্ত্রিক উন্নয়নে গ্রাম ও শহরের মধ্যে পরগাছা সম্পর্ক থাকতে পারে না। গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন ও বিকাশের মধ্যে দিয়েই সমাজতান্ত্রিক উন্নয়নের কথা ভাবা দরকার।

১৯২৫ পর্বে ট্রটস্কি, কামেনেভ, জিনোভিয়েভদের লেফট অপোজিশনের মোকাবিলা বুখারিন তাঁর অনুগামী পলিটব্যুরো সদস্য রাইকভ, তোমস্কিদের নিয়ে একযোগে করেছিলেন। সেইসময় বুখারিনের নেপকে কার্যকরী রাখার পক্ষে সওয়ালের বিরুদ্ধে স্তালিন জাননি। বরং বুখারিনের কৃষক ও শ্রমিক স্বার্থের মধ্যে সমন্বয়ের অবস্থানটির দিকেই ছিলেন। কিন্তু ১৯২৭ সালের পার্টি কংগ্রেসে ট্রটস্কি, কামেনেভ, জিনোভিয়েভদের সম্পূর্ণ পরাজয়ের পর স্তালিন তাঁর পুরোনো অবস্থান পরিবর্তন করেন। ১৯২৮ এর প্রথম দিকে একদিকে যেমন বুখারিন ও স্তালিনের বিতর্ক শুরু হয়। স্তালিন কৃষির সমবায়ীকরণ ও দ্রুত শিল্পায়নের দিকে এগোতে থাকেন। এইসময়ে কামেনেভ ও জিনোভিয়েভরা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিকে চিঠি দিয়ে ক্ষমা প্রার্থণা করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল তাঁদের দ্রুত শিল্পায়নের মতটি যেহেতু পার্টি গ্রহণ করে নিয়েছে, তাই এবার তারা পার্টিতে ফিরে পার্টি ও সোভিয়েত রাষ্ট্রের কাজে লাগতে চান। ট্রটস্কি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথাও তাঁরা বলেন।

১৯২৮ সাল থেকেই সোভিয়েত পার্টির তরফে কৃষির সমবায়ীকরণের নীতি নেওয়া হয় এবং এর মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন সাধারণ সম্পাদক স্তালিন স্বয়ং। প্রথমদিকে বলা হয়েছিল এই সমবায়ীকরণ প্রক্রিয়ায় কোথাও কৃষকদের ওপর কোনোরকম জোরজুলুম করা হবে না। স্বেচ্ছায় বুঝিয়ে চাষীদের সমবায়ের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হবে। সফল সমবায়ের উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে চাষীদের বেশি বেশি করে এর দিকে আকর্ষণ করার নীতি নেওয়া হয়। বাস্তবে অবশ্য ১৯২৯ থেকেই জোর করে সমবায়ের মধ্যে চাষীদের নিয়ে আসার কাজ শুরু হয় এবং ১৯২৯ থেকে ১৯৩৪ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ কৃষিজমিই সমবায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সমবায়ের মধ্যে আসার ক্ষেত্রে কুলাকদের থেকে সবথেকে বড়ো আপত্তি ওঠে এবং কুলাকদের নিকেশ করার নীতি নেওয়া হয়। হাজার হাজার কুলাককে গ্রেপ্তার করা হয়, সাইবেরিয়াতে নির্বাসন দেওয়া হয় এবং তাদের চাষের জমি বাজেয়াপ্ত করে তা সমবায়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অনেকে বলেন কুলাক দমনের আড়ালে মধ্য চাষীদের ওপরও আক্রমণ নামছে এবং সন্দেহের বশেও অনেককে অন্যায় হেনস্থা করা হচ্ছে।

১৯২৮ সাল জুড়ে পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটিতে কৃষি বনাম শিল্প বিতর্ক, নেপকে বজায় রাখা বনাম তা থেকে সরে আসা, কৃষকের স্বাধীনতা বনাম সমবায় পদ্ধতিতে চাষ ইত্যাদি নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলে। স্তালিনের নেতৃত্বে যে ফোর্স কালেক্টিভাইজেশন ও কৃষির উদবৃত্তকে বেশি পরিমাণে সরিয়ে এনে শিল্প স্থাপনে ব্যয় করার নীতি পার্টি ও সোভিয়েত রাষ্ট্র গ্রহণ করেছিল বুখারিন ছিলেন সেই নয়া নীতির সবচেয়ে সরব প্রতিবাদী।

১৯২৯ সালের পর তাঁকে পলিটব্যুরো থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, প্রাভদার সম্পাদক পদ থেকেও তিনি অপসারিত হন। সরে যেতে হয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানালের দায়িত্ব থেকেও। তবে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটিতে থেকে যান। তাঁর ওপরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক দায় দায়িত্বে ন্যস্ত করা হয়। এছাড়াও বুখারিন ১৯৩০ থেকে ১৯৩৮ এ তাঁর গ্রেপ্তারী ও হত্যার আগে অবধি শিল্প সাহিত্য বিষয়ে কাজ চালিয়ে যান। তবে সোভিয়েতের সরকারী সাহিত্য নীতি ‘সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজম’ এর চেয়ে অনেক ভিন্ন ছিল তাঁর অবস্থান। বরিস পাস্তেরনাককে তিনি সমকালীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড়ো কবি হিসেবে আখ্যা দিয়ে সরকারের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। শিল্প সাহিত্য ও এই প্রসঙ্গে রুশ নীতি এখানে আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। কেবল এটা বলা দরকার নেপ জমানা কৃষক শ্রমিক শ্রেণি সমন্বয়ের যে কথা বলেছিল, শিল্প সাহিত্যে উদার ও বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ তার সঙ্গে ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১৯২০ র দশকে রাশিয়ায় তাই দেখা গিয়েছিল শিল্পী সাহিত্যিকদের অনেক বেশি স্বাধীনতা ও নানা ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রবণতা। নেপ-এর অবসানে যখন অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রণ বাড়ল, রাশিয়ার গ্রামাঞ্চলে ফোর্স কালেক্টিভাইজেশন নীতি চালু হল, তখন শিল্প সাহিত্যের ওপরেও রাষ্ট্রীয় খবরদারি, নজরদারি বাড়ল এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা কমে এল। ১৯২০ র দশকের রুশ সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে ১৯৩০ দশকের রুশ সাহিত্য সংস্কৃতির তুলনা করলেই সেটা বোঝা যাবে। এই পর্যালোচনা আমাদের বর্তমান লেখার বিষয় নয় বলে আমরা এখানে বিস্তারে না গিয়ে প্রসঙ্গটির উল্লেখমাত্র করলাম।

বুখারিনের নেপকে বজায় রাখার নীতিটি কেন পরাজিত হল এই তার পর্যালোচনা করা দরকার। প্রথমেই যেটা বলার সেটা হল বলশেভিক বিপ্লবের পর সমাজতন্ত্রের পথে পূর্ণ বিজয়ের ক্ষেত্রে বলশেভিক কর্মী নেতাদের অধিকাংশই ধনী চাষী ও কুলাকদের মেনে নিতে পারছিলেন না। গ্রামাঞ্চলের নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস তাঁদের ভাবাবেগকে আহত করছিল। প্রেয়ব্রাজেনস্কির তত্ত্বায়নের পর্বে সেই ১৯২৫ সালেই কুলাকদের স্বরূপ উদঘাটন করে বই লেখেন বোগুশেভস্কি। সেই বইতে কুলাক প্রসঙ্গে বোগুশেভস্কি লিখেছিলেন “কুলাকেরা হচ্ছে অলস পরাশ্রয়ী জীব। বিগত যুগের অশরীরী প্রেত। সামাজিক স্তরে তাদের দল বা উপদল হিসেবে গণ্য করা যায় না, এতই নগণ্য তাদের অস্তিত্ত্ব। সংখ্যায় তারা মুষ্টিমেয় এবং ক্রমশ বিলীয়মান”। বোগুশেভস্কি সমসাময়িক একটি জনসুমারির ফলাফলকে তাঁর লেখার সমর্থনে পেশ করেন। ১৯২৫ এর সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী গ্রামে বাস করেন ৪৫ শতাংশ দরিদ্র চাষী, ৫১ শতাংশ মধ্য চাষী, ৪ শতাংশ কুলাক।

স্বল্পসংখ্যক কুলাক ও মধ্য চাষীদের মধ্যে সীমারেখাটা অবশ্য ছিল বেশ ধূসর। বুখারিন মনে করেছিলেন এই ধূসরত ও অস্পষ্টতার কারণে কুলাক বিরোধী অভিযান বাইরে থেকে পরিচালিত করতে গেলে বন্দুকের নল মধ্য চাষীর দিকের ঘুরে যেতে পারে। বুখারিন মনে করেছিলেন গ্রামের ভেতরের ব্যাপারে দরিদ্র চাষীরা যতটা ওয়াকিবহাল, সরকারী আমলারা তা নন। তাই কুলাক বিরোধী অভিযান চালাতে হলে তা গ্রামের দরিদ্র চাষীরা চালালেই ভালো, সরকারী আমলাদের দিয়ে তা চালাতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। মধ্য চাষীর ভয়ের দিকগুলিকে সামনে এনেছিলেন বুখারিন। তিনি লেখেন মধ্য চাষীরা সঞ্চয় করতে ভয় পাচ্ছে। তারা ভাবছে মাথার ওপর লোহার ছাদ লাগালে তারা কুলাক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবে। সে একটি আধুনিক মেশিন কিনলে লুকিয়ে কেনে একই ভয়ে। রাষ্ট্রযন্ত্র ও পার্টির চোখে কুলাক বলে চিহ্নিত হয়ে যাবার ভয়। এই ভয় থেকেই উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে সে পিছিয়ে যায়। কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়। বুখারিনের এই কথাগুলির মধ্যে একদিকে যেমন মধ্যচাষীর আতঙ্কের মনোভাবটি ব্যক্তি, তেমনি পার্টি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর মহলে কুলাক প্রশ্নে জনপ্রিয় মতটি কী ছিল সেটাও বোঝা যায়। 

১৯২৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়ায় জোরকদমে শুরু হল কৃষির সমবায়ীকরণ প্রক্রিয়া। কুলাকরা তাদের নিজস্ব জোতকে বড়ো বড়ো সমবায় জোতের মধ্যে নিয়ে আসার প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করল। পালটা প্রতিক্রিয়া এল কমিউনিস্টদের তরফেও। শ্রেণি হিসেবে কুলাকদের অস্তিত্বকেই ধ্বংস করার ডাক দেওয়া হল। ১৯৩৪ সালের মধ্যেই সোভিয়েত রাশিয়ার সমস্ত কৃষিজমির ৭৫ শতাংশকে নিয়ে আসা হল সমবায়ের মধ্যে। যে সব কুলাকরা এই সমবায়ীকরণের বিরোধিতা করল তাদের হয় গ্রেপ্তার করা হল বা বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলে নির্বাসন দেওয়া হল এবং তাদের জমি বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হল।

একদিকে যখন ফোর্স কালেক্টিভাইজেশন চলছে, অন্যদিকে তখন চলছে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (১৯২৮ – ১৯৩৩) আওতায় দ্রুত শিল্পায়ন। কৃষি থেকে উদবৃত্ত সঞ্চয়ের মাধ্যমে এই কাজ করা হচ্ছিল। শিল্প থেকে সঞ্চিত উদবৃত্তকেও পরে এই কাজে লাগানো হয়। শ্রমিকদেরও কম মজুরীতে এজন্য কাজ করতে হয়। তবে এই পর্বে কিছু ক্ষোভ বিক্ষোভ সত্ত্বেও সোভিয়েতের পুনর্গঠন, পশ্চিমা বিশ্বের সমকক্ষ শক্তি হয়ে ওঠার দেশপ্রেমিক আকাঙ্ক্ষা জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা সঞ্চার করে এবং এই উৎসাহ উদ্দীপনাই রাশিয়ার দ্রুত শিল্পায়ন ও আধুনিকীকরণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। এই পর্বেই আবার ফোর্স কালেক্টিভাইজেশন, গুলাগ ইত্যাদি বিতর্কের জন্ম হয়। স্তালিন নিয়ে অসীম প্রশংসা ও বিরাট নিন্দাবাদ – উভয় বিপ্রতীপ অবস্থানের ক্ষেত্রেই এই পর্বটির একটি বড়ো ভূমিকা আছে। স্তালিন অনেক আগেই একদেশে সমাজতন্ত্রের বিজয় সম্ভব নয় – এই অবস্থানের সঙ্গে খানিকটা পার্থক্য তৈরি করে একদেশে সমাজতন্ত্রের পূর্ণ বিজয় না হলেও অনেক অগ্রগতি সম্ভব বলে মনে করেছিলেন। একদিকে যখন ১৯২৯ সালের পর পুঁজিবাদী দুনিয়ায় মহামন্দা জনিত সঙ্কট দেখা দেয়, তখন তার বিপ্রতীপে সোভিয়েত অর্থনীতি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার হাত ধরে দ্রুত এগোতে থাকে। দেশ গঠনের জাতীয়তাবাদী আবেগ ও সোভিয়েত রাশিয়াকে পুঁজিবাদী দুনিয়ার তুলনায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন এই গঠনকার্যে যথেষ্ট সহায়তা করে।

আকর

১) লেনিন, ট্রটস্কি, বুখারিন, স্তালিন প্রমুখদের এই পর্বের বা এই পর্ব বিষয়ক রচনাবলী। (মার্ক্সিস্ট ডট অর্গ)।

২) দ্য প্রেয়ব্রাজেনস্কি পেপারস – তিন ভল্যুম – রিচার্ড বি ডে ও অন্যান্য সম্পাদিত।

৩) ই এইচ কারের তিনখণ্ডে লেখা দ্য বলশেভিক রেভেলিউশন (১৯১৭ – ১৯২৩)। সেই সঙ্গে ওনার আরেকটি বই ফ্রম লেনিন টু স্ট্যালিন।

৪) আইজাক ডয়েটশারের দ্য আনফিনিশড রেভোলিউশন : রাশিয়া ১৯১৭ – ১৯৬৭।

৫) উইলিয়াম হেনরি চেম্বারলিনের দ্য রাশিয়ান রেভেলিউশন বইয়ের দুটি খণ্ড।

৬) স্টিফেন এফ কোহেন – বুখারিন অ্যান্ড দ্য বলশেভিক রিভোলিউশন।

৭) আলেকজান্ডার এলরিচ – দ্য সোভিয়েত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিবেট ১৯২৪ – ১৯২৮।

৮) ইয়েভগেনি আমবার্তসুমভ – লেনিন’স নিউ ইকনমিক পলিসি।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।