সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

মধ্যযুগে মহামারি

মধ্যযুগে মহামারি

মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

আগস্ট ২৮, ২০২১ ২১০

যখন মানুষ কোন রোগের প্রাদুর্ভাবে উদ্ভ্রান্ত হয়ে পরে, জানে না তার চিকিৎসাবিধি তখন সে বিশ্বাস করে বিভিন্ন কুসংস্কারে। এই বিষয়ে দেশ, ধর্ম, জাতিতে পার্থক্য থাকে না। আবার যখন মানুষ স্বাস্থ্যবিধি শিখল, এন্টিবায়োটিক ও প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হল এবং বিজ্ঞানশিক্ষা পেল স্বাভাবিকভাবেই তখন তার আস্থা এল আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে।

মায়ের দয়া

বসন্ত রোগকে বাংলায় আবহমান কাল ধরে ‘মায়ের দয়া’ বলে ডাকা হয়েছে। এই ‘মা’ হলেন দেবী দুর্গার এক রূপ ‘মা শীতলা’।

বাঙালিরা বিশ্বাস করতেন (এখনও হয়ত অনেকে করেন) যে, বসন্ত হল মা শীতলার আশীর্বাদ। এই রোগকে তাই বলা হত মায়ের দয়া। কেন দয়া? কারণ এর তো সত্যিকারের চিকিৎসা ছিল না, দেবীর দয়া ভেবে নিজেকে প্রবোধ দিলে শান্তি মেলে।

ঈশ্বর মানুষের দেহের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখেন। তাই তিনি প্রয়োজন হলে শাস্তি হিসাবে এই রোগ মানুষকে দেন। আবার দরকারে ঝাঁটা দিয়ে ঝেঁটিয়ে, জলের পাত্র থেকে শান্তিবারি ছিটিয়ে সুস্থও করে তোলেন।

বসন্তের ইনকিউবেশন পিরিয়ড ছিল ১২ থেকে ১৪ দিন। বুঝে উঠবার আগেই এই ভয়ঙ্কর সংক্রামক অসুখে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত।

তারপরে ১৭৯৬ সালে এডওয়ার্ড জেনার বসন্তের টীকা আবিষ্কার করেন, আর শেষ পর্যন্ত ১৯৭৭ সালের পরে পৃথিবীতে এই রোগ নির্মূল হয়ে যায়।

প্লেগ ও প্রভুর দয়া

মধ্যযুগে প্লেগ ছিল রহস্য ঘেরা। ইউরোপীয়রা একে বলত ব্ল্যাক ডেথ। এক ধরনের মাছি প্রথমে ইঁদুরকে আক্রমণ করে। তারপরে আক্রান্ত ইঁদুরের থেকে ব্যাক্টেরিয়ার সাহায্যে রোগ মানুষের মধ্যে বিস্তার লাভ করে। প্লেগের ইনকুবেশন পিরিয়ড ছিল ৩-৭ দিন। বিউবনিক প্লেগে আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকে কালো ছোপ পড়ত। গ্রন্থি বা কুঁচকি ফুলে উঠত। সঙ্গে থাকত বমি বমি ভাব, জিহ্বার ফোলাভাব এবং ভয়ঙ্কর মাথাব্যথা।

আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যা, স্বাস্থ্যবিধি, এন্টিবায়োটিক ইত্যাদি আসার বহু আগে ১৩৪৯ সালে দুই বছর ধরে এই প্লেগ মহামারির আকার নিয়েছিল ইউরোপ ও ইজিপ্টে। সম্ভবত সেই সময়ে এই রোগে মারা যায় ৫ কোটি মানুষ (WHO data)। সমগ্র ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও ইজিপ্টে এই প্লেগে মারা গেছে অঞ্চল বিশেষে ৩০ থেকে ৬০% মানুষ।

অন্তত ১০০ বছর ধরে এই মারণ রোগ বারবার ঘুরেফিরে বিভিন্ন অঞ্চলে এসেছে। মনে করা হয় ১৪২০ সাধারণ অব্দ পর্যন্ত মহামারি ইউরোপকে গ্রাস করেছিল।

• সম্ভবত বিউবনিক প্লেগের উৎস ছিল পূর্ব এশিয়া। সেখান থেকে, ইঁদুরে মাছির দ্বারা বাহিত হয়ে সেই ব্যাকটেরিয়া ইতালির জেনোয়ার ব্যবসায়ীদের জাহাজে করে চলে গেছিল ভূমধ্যসাগরে।

• ইতালিতে এই ভয়াবহ রোগ আসে ১৩৪৬-৪৭ সালে। তারপরে ইতালি থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপের অন্য অংশে।

• ১৩৪৮ সালের মধ্যে এই মারণ রোগ ছড়িয়ে পরে স্পেন, ইংল্যান্ড এবং আজকের স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলিতে।

• ১৩৫৩ সালের গ্রীষ্মে নতুন উদ্যমে এই রোগ আবার ছড়িয়ে যায় পূর্বে মস্কো ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত, দক্ষিণে ইজিপ্টে।

বিউবনিক প্লেগের ফলে ইউরোপের গ্রামাঞ্চলের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল শহরগুলি। শহরগুলির মধ্যে আবার সন্ন্যাসী সম্প্রদায়গুলি বেশি আক্রান্ত হয়েছিল। ইতালি ও ইংল্যান্ডের কিছু অংশে এই রোগে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ মারা যায়।

লন্ডনে যখন একটি পরিবারে প্লেগ দেখা দিত, অনেক সময়ে তাদের ঘরটি সিল করে দিয়ে পুরো পরিবারকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হত! অন্যথায় ঘরগুলির দরজায় আঁকা থাকত রেড ক্রস আর লেখা থাকত “প্রভু আমাদের প্রতি দয়া করুন”। শহরের শববাহকরা একটি ঠেলা গাড়ি নিয়ে রাতের বেলায় ঘুরত আর চিৎকার করত “আপনার মৃতকে বের করে আনুন”, এই চিৎকার শুনে বাড়ির জীবিত সদস্যরা রাতের বেলা মৃতদেহগুলি ঘর থেকে বের করে শব বাহকদের দিয়ে দিত। তারপরে সব দেহ একসাথে প্লেগের গর্তে ফেলা হত।

সেই সময়ে দ্বিতীয় চার্লস এবং তার কোর্ট লন্ডন ছেড়ে অক্সফোর্ডে পালিয়ে যায়। স্যামুয়েল পেপিস লন্ডনের শুনশান রাস্তাগুলির বিবরণ দিয়েছেন তার ডায়েরিতে। যাদের সামান্য সঙ্গতি ছিল তারা সকলে মহামারি হাত থেকে রক্ষা পেতে লন্ডন শহর থেকে পালাত।

ইউরোপের রাজন্যবর্গ ও সমৃদ্ধিশালী অংশও এই প্লেগের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। রাজ্যদের মধ্যে আরাগনের পিটার চতুর্থর রানী এলিয়েনর এবং ক্যাস্টিলের রাজা আলফোনসো একাদশ মারা গিয়েছিলেন। ইংরেজ রাজা তৃতীয় অ্যাডওয়ার্ডের মেয়ে জোয়ানও মারা গিয়েছিলেন। ক্যানটারবেরির পর পর দুই আর্চবিশপের মৃত্যু হয়েছিল প্লেগে।

ফ্ল্যাজেল্যান্ট ও তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত 

ইউরোপীয়দের মধ্যে ফ্ল্যাজেল্যান্টরা ছিল এক খ্রিস্টীয় ধর্মীয় সম্প্রদায়। ওরা ওই সময়ে প্রকাশ্যে নিজেদের বা পরস্পরকে বেত্রাঘাত করে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাইত। অর্থাৎ কোন অজানা পাপের কারণে ঈশ্বরের শাস্তিস্বরূপ প্লেগ রোগ মহামারির আকারে এসেছে। তার থেকে মুক্তি পেতে ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করতে হবে। সঙ্কটের সময়ে মুক্তির লক্ষ্যে এই প্রথা তখন খুব জনপ্রিয় ছিল। দীর্ঘস্থায়ী প্লেগ, ক্ষুধা, খরা ইত্যাদি কারণে হাজার হাজার দিশাহারা মানুষ মুক্তির সন্ধানে এই চরম পদ্ধতি অবলম্বন করত। ক্যাথলিক চার্চের নিন্দা সত্ত্বেও, চৌদ্দশো শতাব্দীর মধ্যভাগে ইউরোপকে ধ্বংস করে দেওয়া ব্ল্যাক ডেথের হামলার সময় এই মতবাদ খুব শক্তিশালী হয়েছিল। সাদা পোশাক পরে, এই সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্মীয় উন্মাদনায় গ্রামাঞ্চলে ক্রস টেনে নিয়ে যেত আর নিজেদের চাবুক মারত। আজকে অবশ্য সেই সম্প্রদায়ও আর নেই আর এন্টিবায়োটিক আবিষ্কার হবার পরে প্লেগও বিভিন্ন দেশে নির্মূল হয়ে গেছে।

অর্থনীতিতেও মহামারি বিপর্যয় নিয়ে এসেছিল। তখন ব্যবসা বাণিজ্য কমে যায়। এখনকারই মত। অতি মাত্রায় শ্রমিক মারা যাওয়ার কারণে কৃষিকাজ হ্রাস পায়। প্লেগের পরে আসত দুর্ভিক্ষ। অনাহারে আবারও মারা যেত বহু মানুষ।

অবশ্য এর ফলে পরবর্তীকালে জমির মালিকরা বাধ্য হয়েছিল মজুরি বৃদ্ধিতে।

ইহুদিরা দায়ী

যথারীতি, যখন প্লেগ (ব্ল্যাক ডেথ) ইউরোপের প্রায় অর্ধেক মানুষকে উজাড় করে দেয়, তখন তার দায় চাপানো হয় ইহুদিদের উপরে। গুজব ছড়ানো হয় যে ইহুদিরা কূপের জল বিষাক্ত করে প্লেগ ছড়াচ্ছে। সেই সময়ে পুরো ইউরোপ জুড়ে ইহুদি বিরোধীতা তীব্র আকার ধারণ করেছিল। হয়তো ইহুদিদের যূথবদ্ধ ভাবে জীবনযাপন ও অমিশুকে স্বভাব এই প্রচারগুলিকে সফলতা দিয়েছে।

আধুনিক স্বাস্থ্যবিধির সূচনা

সেই সময়ে, যখন চিকিৎসাবিদ্যা প্রায় ছিল না বললেই হয়, ইউরোপীয় অভিজাত সম্প্রদায় কয়েকটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যার ফলে এই মারণ রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকটা কমে যায়।

১) তারা মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে দেয়। উত্তর ইতালিতে প্রথম quarantine বা সঙ্গরোধ চালু হয়। অসুস্থ রোগী ও তার পরিবারকে নিজের ঘরে বা প্লেগ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

২) এই রোগে মৃত মানুষকে সম্পূর্ণভাবে কবর দেওয়া হয়।

৩) মৃত মানুষের ব্যবহৃত সব জিনিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

৪) যারা বাড়িতে ছিল সঙ্গরোধে অথবা এই ভয়াবহ অবস্থায় যাদের চূড়ান্ত খাদ্যাভাব হয় ইতালিয় অভিজাতবর্গ তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

এই সব ব্যবস্থা নেবার ফলে ১৪৫০ সাল থেকে প্লেগের প্রাদুর্ভাব ইউরোপে কমতে থাকে।

আল্লার আশীর্বাদ

প্লেগের ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখি যে, মধ্য এশিয়াতে বিউবনিক প্লেগ চলেছে আরও দীর্ঘদিন ধরে; ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত।

অথচ ইউরোপ তার অনেক আগেই সঙ্গরোধে থেকে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই রোগকে প্রতিহত করেছে। কারণ কি? ওই অঞ্চলের মুসলমানরা মনে করতেন প্লেগ হল আল্লার আশীর্বাদ, যারা এই রোগে মারা যাবে তারা সকলে সোজা স্বর্গে পৌঁছে যাবে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৮৪৪ সালে ইউরোপীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে ইজিপ্ট ও মধ্য এশিয়াতে প্লেগ সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হয়।

পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন মহামারি, অতিমারি এসেছে। কোটি কোটি মানুষ পতঙ্গের মত ধ্বংস হয়ে গেছে। আবার তার প্রতিকার বেরিয়েছে। প্রতিকার বেরিয়ে যাবার পরে মায়ের দয়া, ফ্ল্যাজেল্যান্ট খ্রিস্টিয় ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আত্মনিগ্রহ, আল্লার আশীর্বাদ – এসবের আর প্রয়োজন হয়নি।

তথ্যসূত্র-

১. Suzanne Austin Alchon, A Pest in the Land: New World Epidemics in a Global Perspective

২. Ben Johnson, The Great Plague 1665 – the Black Death, Historic UK

৩. Britannica.com

৪. Damir Huremović, Brief History of Pandemics (Pandemics Throughout History), Psychiatry of Pandemics, May 16 : 7–35, 2019

৫. জয়ন্ত দাস , গুটিবসন্তের টিকা – ভারতীয় ভেরিলেশন ও জেনারের ভ্যাক্সিন, ইতিহাস তথ্য ও তর্ক পোর্টাল।(https://www.itihasadda.in/gitibasanter-tika/)

লেখিকা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনীয়ারিং বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপিকা। প্রাবন্ধিক।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।