সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

অশুরবানিপালের লাইব্রেরী

অশুরবানিপালের লাইব্রেরী

সুদীপ্ত পাল

এপ্রিল ২৩, ২০২২ ২৯০

নূতন রাজ্য দখলের সময় রাজারা ধনসম্পদ লুঠপাট করে, কিন্তু অশুরবানিপাল এমন একজন রাজা ছিলেন যিনি বইপত্র লুঠ করতেন। তবে শুধু লুঠ করে বই সংগ্রহ করতেন তা কিন্তু নয়, তিনি দূর দূরান্তে লোক পাঠাতেন লেখা সংগ্ৰহ করতে, বিদ্বজ্জনদের নিয়োগ করতেন অনুবাদের জন্য। একত্রিত করেছিলেন হাজার হাজার লিখিত মৃৎফলক, আর চামড়া ও প্যাপিরাসে লিখিত অগুনতি পুঁথি। পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রাপ্ত গ্রন্থাগারগুলির একটি- তৈরি করেছিলেন এই অশুরবানিপাল (৬৮৫-৬৩১ সাধারণ পূর্বাব্দ)। বর্তমান ইরাকের মোসুল শহরের কাছেই ছিল অশুরবানিপালের রাজধানী- নিনেভা- সেখানেই ছিল অধুনা ধ্বংসপ্রাপ্ত এই গ্রন্থাগার। নিও-আসিরিয়ান সাম্রাজ্যের শেষ বড়মাপের সম্রাট ছিলেন তিনি।

আসিরিয়া বলতে মূলতঃ ইরাকের উত্তর অংশকে বোঝায়, ব্যাবিলন বলতে দক্ষিণ অংশকে। অশুর বা অশশুর ছিল উত্তর ইরাকের একটি শহরের নাম, সেখান থেকে এসেছে ওই শহরের অধিষ্ঠাতা দেবতা অশুরের নাম। আর এই শহর বা দেবতার নাম থেকেই এসেছে আসিরিয়া (গ্রিক অস্সুরিয়া থেকে)। সিরিয়া নামটাও ওখান থেকেই এসেছে, সঠিক আরবি উচ্চারণ ও সরকারি নাম সূরিয়া। আর অশুরবানিপাল নামটাও ওই একই উৎসের। লাতিন ভাষায় নামগুলো আসিরিয়া এবং সিরিয়া হয়ে যায়। যাই হোক, নিও-আসিরিয়ান সাম্রাজ্যের সময়কাল ছিল লৌহযুগের শুরুর দিকে- ৯১১ থেকে ৬০৯ সাধারণ পূর্বাব্দ। প্রাচীন ও অধুনালুপ্ত সেই অশুর বা অশশুর দেবতার আজও এতটাই প্রভাব যে আজ ভারতবর্ষের খ্রিষ্টানদের এক পঞ্চমাংশ কোনো না কোনো সিরিয়ান বা আসিরিয়ান শাখার অনুগামী (এরা মূলতঃ কেরলে থাকে), এবং একটি মুসলিম প্রধান দেশের নামও (সিরিয়া) সেই অশুরের নামে। যদিও এরা কেউ অশুরের উপাসনা করে না, তবে নামের স্মৃতি আজও আছে।

 ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত অশুরবানিপালের লাইব্রেরির সংগ্ৰহের কিয়দংশ।

এখন অশুরবানিপালের সংগৃহিত ও লুণ্ঠিত সব ঐশ্বর্য রাখা আছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। কীরকম ছিল সেই সংগ্রহ? এখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কাছে যা আছে তা হল তিরিশ হাজারটি মাটির ফলক! এগুলোকে জুড়লে অন্ততঃ দশ হাজারটি আলাদা রচনা হয়। মূল সংগ্রহে হয়তো আরও বেশি ফলক ছিল। আর শুধু ফলক না, ছিল চামড়া ও প্যাপিরাসের পুঁথিও- এমন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। ছিল কাঠের বোর্ড ও মোমের হোয়াইটবোর্ড- এগুলো পরবর্তীকালে গ্রীস-রোমেও ব্যবহার হত- কাঠের ফ্রেমের উপর মোমের আস্তরণ- তার উপর স্টাইলাস দিয়ে লেখা হত- অনেকটা এযুগের ট্যাবলেটের মত। ইরানীয়রা যখন নিনেভা শহর দখল করল তারা পুড়িয়ে দেয় এই গ্রন্থাগার- আর তার ফলে চামড়া, প্যাপিরাস ও মোমের পুঁথি বা বোর্ডগুলো নষ্ট হয়ে যায়, তবে শাপে বর হয়- মৃৎফলকগুলি পুড়ে আরও শক্ত হয়।

এই সংগ্রহ নিয়ে আরও বিশদে বলার আগে কিছু প্রাককথন প্রয়োজন। পৃথিবীর আদিতম লিপির আবির্ভাব ইরাকেই। সুমেরীয় লিপি। ইরাক ও তার প্রতিবেশী সিরিয়া- এই অঞ্চল থেকেই সভ্যতার শুরু। তারও আগে চাষবাসের শুরুও এই অঞ্চল থেকে। নৌবাণিজ্য, নগরায়ণ সবকিছুরই আদিভূমি এই অঞ্চল- আর এগুলো অশুরবানিপালের যুগের থেকেও তিন সহস্রাধিক বছর আগের কথা। আদিতম লিখিত মহাকাব্য গিলগামেশের উৎসও এখানেই। লেবাননের ফিনিশীয় লিপি থেকেই একদিকে গ্রীক লিপির জন্ম ও সেখান থেকে লাতিন ও সিরিলিক লিপির – যে লিপিগুলোতে ইংরেজি সহ ইউরোপের প্রায় সমস্ত ভাষা লেখা হয়। আবার ওই ফিনিশীয় লিপি থেকে সিরিয়ার আরামাইক লিপির জন্ম আর সেই আরামাইক থেকে এসেছিল ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপি, আর ওই ব্রাহ্মী থেকেই দেবনাগরী ও বাংলা সহ সমস্ত ভারতীয় লিপির জন্ম – আর ভারতীয় লিপিগুলো থেকে জন্ম তিব্বত, মায়ানমার সহ অনেক এশীয় দেশের লিপির। অর্থাৎ সিরিয়া-ইরাক-লেবানন অঞ্চল (যাকে fertile crescent বলা হয়) একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে মানবজাতিকে সাক্ষর করার বিষয়ে। গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার চর্চাও ইরাক-সিরিয়া অঞ্চলেই শুরু। তাই পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থাগারগুলো ইরাক ও সিরিয়ায় পাওয়া যাবে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্ৰন্থাগার কিন্তু অশুরবানিপালের লাইব্রেরি নয়। ১৯৭০ সাল অবধি এটিই প্রাচীনতম প্রাপ্ত ছিল। সেই রেকর্ড ভেঙে দেয় সিরিয়ার এবলা (Ebla) ধ্বংসস্তূপে এক গ্রন্থাগারের আবিষ্কার। এটি অশুরবানিপালের লাইব্রেরির চেয়ে প্রায় দুই হাজার বছর পুরোনো। ইরাক-সিরিয়া অঞ্চলের সুপ্রাচীন লেখাপড়ার ব্যবস্থারই ধারাবাহিকতা ছিল অশুরবানিপালের লাইব্রেরী।

কী ধরনের লেখা তিনি সংগ্রহ করতেন? অনেক রকম- পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও সাধারণ কাহিনী, চিকিৎসাবিদ্যা, অভিধান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, আইন ইত্যাদি। বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী, যেমন গিলগামেশ, যেটি পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য তার একটি কপি তাঁর সংগ্ৰহে ছিল। ছিল দেবী ইশতারের পাতাল প্রবেশের কাহিনী।

এমন অনেক কাহিনী এই সংগ্ৰহে পাই যা পরবর্তীকালে অন্য রূপে অন্য নামে আমাদের সামনে এসেছে। তিনটি উদাহরণ দিচ্ছি-

এক) পৃথিবীর প্রথম সম্রাট সার্গন (এটি কিন্তু ঐতিহাসিক চরিত্র)- তিনি আক্কাদের রাজা ছিলেন। অবৈধ দাসীপুত্র সার্গনের জন্মকাহিনী, জন্মের পর ভেলায় ভাসিয়ে দেয়ার কাহিনী- এগুলো পরবর্তী যুগে আমরা মুসা (মোজেস) ও কর্ণের কাহিনীতে পাই।

দুই) আরেকটি চরিত্র আদপ- সে  নিষিদ্ধ খাবার ও পানীয় না খেয়ে ঈশ্বর অনুকে রাগিয়ে দেয় আর অমরত্বের বর পাবার সুযোগ হারায়। এই প্রসঙ্গে বলি অন্য একটি কাহিনী আছে আদপের যেখানে আমরা দেখি অমরত্বের বর হারালেও, জ্ঞানলাভের বর আদপের কাছে আগে থেকেই ছিল কারণ দেবতা এআ (বা এনকি) পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে আদপকে সাতদিনে সৃষ্টি করেন এবং জ্ঞানলাভের ক্ষমতা দেন। বুঝতে অসুবিধা হয়না, এই কাহিনীগুলোকেই উল্টেপাল্টে আদমের কাহিনী তৈরি করা হয়েছিল ইহুদী ধর্মগ্ৰন্থ তোরাহ’তে এবং পরে বাইবেল ও কুরআনে। তবে পার্থক্য আছে- আদম অমরত্ব আগে পেয়েছিল, জ্ঞানলাভ পরে করেছিল। বাইবেলে এআ আর অনু এই দুই দেবতার বদলে ভগবান আর শয়তানকে আনা হয়েছিল। জ্ঞানলাভ কিন্তু শয়তানেরই অবদান। আদম জ্ঞানলাভের নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ঈশ্বরকে চটিয়েছিল, আদপ অমরত্বের খাবার না খেয়ে ঈশ্বরকে চটিয়েছিল। আদপ শব্দটা পরবর্তী যুগে আরবি ভাষায় জ্ঞান অর্থে এবং এছাড়াও ভদ্রতা বা এটিকেট অর্থে ব্যবহার হয়েছে- সেখান থেকেই বাংলায় আদবকায়দা, বেয়াদব ইত্যাদি।

অনু আর এআ দুজনেই সুমেরীয় দেবতা যাদের পরবর্তী কালে বিভিন্ন সেমেটিক জাতি- আক্কাদীয় ও আসিরীয়রা গ্ৰহণ করেছিল।

তিন) তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হল “এনুমা এলিশ”- ব্যাবিলনীয় বিশ্বসৃষ্টিকাহিনী। এখান থেকেই মহাপ্লাবনের গল্প নেয়া হয়েছে তোরাহে এবং পরে বাইবেল ও কুরআনে। এই কাহিনী এসেছে হিন্দু পুরাণেও।

এছাড়াও অশুরবানিপালের লাইব্রেরীতে ছিল বিভিন্ন পুরোনো সামরিক চুক্তিপত্র, পুরোনো সামরিক অভিযানের কাহিনী, অশুরবানিপালের নিজের সামরিক অভিযানের বর্ণনা, আর্থিক লেনদেনের নথি, কৃষি বিষয়ক নথি। এগুলোই ছিল সংখ্যায় বেশি। যাঁরা অশুরবানিপালের জন্য লেখাগুলি সংগ্রহ করতেন বা অনুবাদ করতেন, তারা নিজেরাও সুপণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। অশুরবানিপালের প্রতিনিধিরা প্রতিবেশী ব্যাবিলনের অনেক ছোটখাটো গ্রন্থাগার থেকে অনেক ট্যাবলেট সংগ্রহ করে বা প্রতিলিপি করে নিয়ে আসত। তাঁর রাজদরবারে কুড়ি থেকে পঞ্চাশজন মতো লেখাপড়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষ ছিলেন বলে অনুমিত। এঁদের অনেকেই জ্যোতিষ ও জাদুবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অশুরবানিপালের বিদ্যাচর্চার একটা বড় উদ্দেশ্য ছিল ঈশ্বরের ইচ্ছা জানতে পারা। তাঁর গ্রন্থাগারের একটা বড় সংগ্রহ ছিল সেইসব লেখা যেগুলো ঈশ্বরপ্রদত্ত বিভিন্ন পূর্বাভাসের ব্যাখ্যা করে। ভবিষ্যৎগণনা ও জাদুবিদ্যা সংক্রান্ত অনেক লেখা তাঁর সংগ্রহের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল। ছিল বিপদ কাটানোর মন্ত্রের সংগ্রহও। গিলগামেশ সংগ্রহে রাখারও একটা বড় কারণ ছিল এই কাহিনিতে অনেক দুর্যোগের দৈব পূর্বাভাস বর্ণিত হয়েছে। গিলগামেশ স্বপ্নের মাধ্যমে অনেক দৈব সংকেত পেয়েছিলেন, আর সেই সংকেতগুলির ব্যাখ্যাও এই কাহিনীতে আছে। মহাপ্লাবনের গল্পও হয়তো একই কারণে সংগ্রহ করেছিলেন। ছিল চিকিৎসাবিদ্যা ও গণিত সংক্রান্ত লেখাও। ছিল জ্যোতির্বিদ্যায় ব্যবহৃত গণনযন্ত্র যেমন প্ল্যানিস্ফিয়ার, যেটি দিয়ে সহজে কোনো একটা প্রদত্ত দিন ও ঘন্টায় আকাশে নক্ষত্রদের অবস্থান নির্ণয় করা যায়।

 অশুরবানিপালের সংগ্ৰহের একটি প্ল্যানিস্ফিয়ার- জ্যোতির্বিদ্যায় ব্যবহৃত গণনযন্ত্র, যা যেকোন সময় এবং তারিখে আকাশে কোন কোন নক্ষত্র দৃশ্যমান হবে তার গণনায় সাহায্য করে।

বিভিন্ন জায়গা থেকে তিনি এই লেখাগুলো সংগ্রহ করতেন। কিছু বাবা ও ঠাকুরদার কাছ থেকে উত্তরাধিকারে পাওয়া। প্রতিবেশী ব্যাবিলনীয়রা প্রকৃতিতে দৃশ্যমান বিভিন্ন দৈব পূর্বাভাসকে ব্যবহার করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিত –রাজনৈতিক, প্রশাসনিক সবরকম সিদ্ধান্তে এই দৈব সংকেতগুলির ব্যবহার হতো। জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চায় ব্যাবিলন আসিরীয়দের থেকে এগিয়েই ছিল। ব্যাবিলনের সঙ্গে আসিরীয় সাম্রাজ্যের সম্পর্ক খুব শান্তিপূর্ণ ছিল না, কারন ব্যাবিলনীয়রা আসিরীয়দের আক্রমণকারী হিসেবে দেখত। তবে এই বৈরিতার মধ্যেও অশুরবানিপাল অনেক ব্যাবিলনীয় লেখার অনুবাদ বা প্রতিলিপি করিয়েছিলেন বলপ্রয়োগ এবং কৌশলের মাধ্যমে। অনেক ব্যাবিলনীয় পণ্ডিতকে নিজের রাজধানী নিনেভাতে নিয়েও এসেছিলেন। অশুরবানিপালের সংগ্রহের ব্যাবিলনীয় গুহ্যবিদ্যার অনেক লেখা তাঁর সময়ের থেকেও প্রায় হাজার বছর আগের ছিল।

ভবিষ্যৎকথন এবং দৈবসংকেত নিরূপণের এত তীব্র ইচ্ছার দুটো কারণ ছিল- সম্রাটের বিশ্বজয়ের ইচ্ছা আর বর্তমান সাম্রাজ্যে ঘটে চলা বিভিন্ন বিদ্রোহ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার বোধ। সেইজন্য জরুরি ছিল গ্রহ-নক্ষত্র আর প্রকৃতিতে দৃশ্যমান প্রত্যেকটা বিপদ সংকেতের পাঠোদ্ধার এবং তাদের প্রতিকার। এখনকার বিচারে অবশ্যই এগুলো কুসংস্কার, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন স্থানের এবং দূর দূর অতীতের তথ্যসংগ্রহ করে ভবিষ্যৎ নিরূপণের এই চেষ্টার মধ্যে সম্রাটের তথ্যনিষ্ঠা আর জ্ঞান আহরণের ইচ্ছাকে অবজ্ঞা করা যায় না।

এছাড়া এই সংগ্রহে ছিল অশুরবানিপালের পূর্বসূরীদের একটি পুরোনো সামরিক অভিযানের কাহিনী যেখানে য়হুদ শব্দটির প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায়। এই য়হুদ (লাতিন ভাষায় জুদিয়া) থেকেই ইহুদী বা জুডাইক বা জিউ কথাটা এসেছে।

লেখাগুলো বেশিরভাগই আক্কাদীয় ভাষায়, কিউনিফর্ম লিপিতে।

এই সুবিশাল লাইব্রেরী সেই যুগের, যেযুগে ভারতে লিপির কোনো প্রত্যক্ষ নিদর্শন টিকে নেই। সিরিয়া-ইরাক বাদ দিলে পৃথিবীর কোনো প্রান্তে কেউ এমন সংগ্ৰহ তখনও বানায়নি। অনেক প্রাচীন কাহিনী, বহু প্রাচীন কাহিনীর আরও প্রাচীনতর রূপ কিন্তু শুধুমাত্র এই লাইব্রেরীর দৌলতে পাওয়া যায়। গিলগামেশের সবচেয়ে ভালো সংরক্ষিত কপিও এখানেই পাওয়া যায়।

অশুরবানিপালের লাইব্রেরীর কথা বললে এর পূর্বসূরি এবলার গ্রন্থাগারের কথাও বলতে হয়, যদিও অশুরবানিপাল কখনোই এটিকে চাক্ষুষ করেননি। আমাদের কাছে কণিষ্ক যত পুরোনো অশুরবানিপালের কাছে এবলা ততটাই পুরোনো! উত্তর সিরিয়ার এবলা ২৫০০ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। এবলা দুবার ধ্বংস হয়েছিল। দ্বিতীয়বার আনুমানিক ১৬৫০ সাধারণ পূর্বাব্দে হিটাইটদের হাতে এটি শেষবারের মত ধ্বংস হয়, তারপর আর কখনো এই শহরের পুনরুদ্ধার হয়নি। এবলা ১৯৭০এর দশক পর্যন্ত একটি কিংবদন্তি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। যখন এটি প্রত্নতাত্ত্বিকরা আবিষ্কার করেছিলেন তাঁরা কিউনিফর্ম লিপিতে লিখিত কুড়ি হাজারখানি মাটির ট্যাবলেট উদ্ধার করেছিলেন। প্রাচীন লাইব্রেরিগুলির মতো, এবলার ট্যাবলেটগুলি দেওয়ালে তৈরি তাকে সারিবদ্ধভাবে সাজানো ছিল। একজন গবেষকের মতে, ট্যাবলেটগুলি “একটি অন্যটির উপরে, অনুভূমিক স্তূপে, ফাইলের মধ্যে থাকা কার্ডের মতো করে থাকত”।  এগুলি ঠিক এভাবেই আবিষ্কৃত হয়েছিল। এবলার লাইব্রেরির তাকগুলি হয় আক্রমণকারী সেনাবাহিনী পুড়িয়ে দিয়েছিল, বা সময়ের সাথে সাথে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল, হয়তো তাকগুলো ট্যাবলেটের ওজনে ভেঙে পড়েছিল।

শব্দার্থ সংগ্ৰহ। কিউনিফর্ম লিপিতে সম্ভবতঃ আক্কাদীয় ভাষা থেকে একই ভাষায়।

অনেক এবলা ট্যাবলেট “উত্তর-পশ্চিম সেমিটিক” বা “পুরানো কানানাইট” (এছাড়াও “এব্লাইট” নামে পরিচিত) নামে একটি অজানা উপভাষায় খোদাই করা ছিল।  অন্যান্য ট্যাবলেটগুলি সুমেরীয় ভাষায় ছিল, যা হারিয়ে যাওয়া ভাষা হলেও প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে সুপরিচিত ও বহু-অধীত। যে কোনো পুরোনো অপরিচিত ভাষা আবিষ্কার হলে তার পাঠোদ্ধার প্রয়োজন। তার জন্য দরকার “রোজেটা স্টোন”। মিশরের যে দ্বিভাষিক শিলালেখ ব্যবহার করে প্রাচীন মিশরীয় ভাষা ও লিপির পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়েছিল তার নাম ছিল রোজেটা স্টোন। কিন্তু এবলার জন্য এমন দ্বিভাষিক লেখ কোথায় পাওয়া যাবে? মজার ব্যাপার হলো এবলার ওই বিশাল গ্রন্থাগারেই ট্যাবলেটগুলির মধ্যে কয়েকটিতে সুমেরীয় ও এব্লাইট- দ্বিভাষিক মিশ্র লেখা ছিল।

এবলার ট্যাবলেটগুলি শহরের চল্লিশহাজার ও বৃহত্তর রাজ্যের আড়াই লক্ষ বাসিন্দার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে নথিভুক্ত করেছিল। জানা গেছে অন্যান্য আশিটি অঞ্চলের মানুষের সাথে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। অনেক ট্যাবলেট ছিল কাপড়ের ব্যবসা নিয়ে যেটি এবলার প্রধান ব্যবসা ছিল। অনেক ফলক করদান বিষয়ক ছিল। একটি স্টোর রুমে খাবার ও পানীয়ের তালিকা ছিল, মূলত সরকারী বার্তাবাহক এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের খাওয়াদাওয়ার হিসাব। কিছু ট্যাবলেটে কিংবদন্তি, স্তোত্র, জাদুকরী মন্ত্র আছে। রয়েছে বৈজ্ঞানিক রেকর্ড এবং পর্যবেক্ষণ – বিশেষ করে প্রাণিবিদ্যা এবং খনিজবিদ্যা বিষয়ক। এবলার ট্যাবলেটগুলিতে জেরুজালেম শহরের প্রাচীনতম উল্লেখ রয়েছে।

প্রথমবার যখন এবলা শহর ধ্বংস হয়েছিল, গ্রন্থাগারে আগুন লেগেছিল, তাতে শাপে বর হয়েছিল, অনেক মৃৎফলক আগুনে পুড়ে শক্ত হয়ে আরও সংরক্ষণযোগ্য হয়েছিল। কিন্তু হিটাইটদের হাতে দ্বিতীয়বার ধ্বংস হবার পর, এই শহর সম্পূর্ণভাবে মরুভূমির বাতাসের হাতে চলে যায়, বালিতে ধীরে ধীরে পুরো শহর ঢেকে যায়, গ্রন্থাগারও চাপা পড়ে যায়। অর্থাৎ অশুরবানিপাল বা তাঁর সমসাময়িক কেউ এই গ্ৰন্থাগারগুলি দেখার সুযোগ পায়নি। ইরাকের নিমরুদ শহরে আরেকটি ছোটোখাটো লেখসংগ্রহ ছিল- আরও পরবর্তী যুগে- দ্বিতীয় অশুরনাসিরপালের তৈরী রাজপ্রাসাদে। এটি নবম সাধারণ পূর্বশতকের, অতএব এর স্মৃতি ও অবশেষ সম্ভবতঃ অশুরবানিপালের সময়ও ছিল। প্রতিবেশী ব্যাবিলনেও ২০০০ সাধারণ পূর্বাব্দ থেকে অশুরবানিপালের সময় অবধি ছোট ছোট গ্রন্থাগারের উপস্থিতির প্রত্নতাত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়।

সব মিলিয়ে বলা যায় অতীতের এবং সমসাময়িক গ্রন্থাগার গুলির প্রভাব এবং সিরিয়া-ইরাক অঞ্চলের সুদীর্ঘ লেখাপড়ার সংস্কৃতি – এই দুটো জিনিস অশুরবানিপালকে তাঁর সুবিশাল গ্রন্থাগার গড়ে তুলতে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। সঙ্গে ছিল বিশ্বজয়ের উচ্চাশাও। এভাবেই দূর অতীতের এক সম্রাটের জ্ঞান আহরণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আজও আমাদের মধ্যে এক অমূল্য সম্পদ হয়ে টিকে আছে।

তথ্যসূত্র:

  1. Murray, Stuart A.P. (2009) The Library: An Illustrated History
  2. https://blog.britishmuseum.org/a-library-fit-for-a-king/
  3. ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সাইট ও তাদের ইউটিউব চ্যানেল
  4. উইকিপিডিয়া

মন্তব্য তালিকা - “অশুরবানিপালের লাইব্রেরী”

  1. সংগ্রহে রাখার মতো একটি লেখা। প্রাচীনতম গ্রন্থাগারের খবর জানা ছিল না। জানলাম। খুব ভালো লাগল। ধন্যবাদ।

  2. অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং মূল্যবান এ লেখাটির জন্য লেখককে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। ইতিহাস তথ্য ও তর্ক পেজ-এর পরিচালকদের প্রতিও কৃতজ্ঞ রইলাম।

  3. অসাধারন মূল্যবান লেখা। আমার স্মৃতির লাইব্রেরীতে সযত্নে রেখে দিলাম।

  4. সুদীপ্ত পাল যেন প্রাচীন আসিরিয়ার রাজা অশুরবানি পালেরই উত্তরপুরুষ হয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত। না হলে সেই প্রাচীন যুগের বিশ্ববিখ্যাত লাইব্রেরির এতো সুন্দর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা এই ছোট্ট পরিসরে কি আদৌ সম্ভব ছিলো ! সত্যিই অনবদ্য নিবন্ধ।