সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ল্যামার্ক, অর্জিত বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার ও এপিজেনেটিক্স-এর ইতিহাস

ল্যামার্ক, অর্জিত বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার ও এপিজেনেটিক্স-এর ইতিহাস

জয়ন্ত দাস

জানুয়ারি ৭, ২০২৩ ৫৮১ 1

প্রথম পর্ব ল্যামার্কের জিরাফ ভাইজম্যানের ইঁদুর

ফরাসী বিজ্ঞানী জাঁ ব্যাপতিস্ত ল্যামার্ক। তিনি ডারউইনের অনেক আগে বিবর্তনের একটি সুসংহত তত্ত্ব প্রস্তাব করেন। তখন ১৮০৯ সাল, পাশ্চাত্যে রেনেসাঁ শেষ হয়ে প্রথম শিল্পবিপ্লবের সময়। ভারত তথা কলকাতায় পাশ্চাত্য শিক্ষাপ্রসারের একেবারে গোড়ার যুগ চলছে, হিন্দু কলেজ স্থাপিত হবে এর আট বছর পরে। আর কলকাতার মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হবে তারও ১৮ বছর পরে। সেই সময়ে জীববিজ্ঞানে অনেক কিছু অজানা ছিল, বিবর্তনের প্রমাণ তেমন যোগাড় হয়নি। জীববিজ্ঞানের সেই প্রাথমিক যুগে ল্যামার্ক বলেছিলেন, জীবের দেহে বিভিন্ন রসের প্রাকৃতিক প্রবণতা থেকে জটিল ও উন্নত জীব সৃষ্টি হয়। আর পরিবেশের সঙ্গে জীবের মানিয়ে নেবার জন্য দরকার প্রয়োজনীয় অভিযোজন। 

ল্যামার্ক ভেবেছিলেন, কোনও অঙ্গ একই কাজে বেশি করে ব্যবহার করলে সেই অঙ্গের উন্নতি ও বিকাশ হয়। এর এক জনপ্রিয় উদাহরণ হল জিরাফের লম্বা গলা। জিরাফ মগডালের পাতা খেতে চায়। তাই সে গলা লম্বা করার চেষ্টা করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম চেষ্টার ফলে আস্তে আস্তে জিরাফের গলা লম্বা হয়েছে। এক প্রজন্মে গলা যেটুকু লম্বা হয়েছে, সেটুকু পরের প্রজন্ম উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। সেই প্রজন্ম চেষ্টা করে গলা আরেকটু লম্বা করেছে। এই তত্ত্বকে বলে ব্যবহার ও অব্যবহারের তত্ত্ব। যে অঙ্গ যে কাজে বেশি ব্যবহার করা হবে, সেই অঙ্গ সেই কাজের জন্য বংশানুক্রমে বেশি উপযুক্ত হয়ে উঠবে।

অভিযোজনের এই পদ্ধতিগত ধারণা কিন্তু ল্যামার্কের নিজস্ব নয়। এটা প্রকৃতপক্ষে তখনকার দিনের সর্বজনীন ধারণা ছিল। এমনকি এখনো সাধারণভাবে ভাবা হয়, বাবা পণ্ডিত হলে ছেলেও পণ্ডিত হবে। অর্থাৎ কেউ নিজের চেষ্টায় জ্ঞান বাড়ালে, সেই অর্জিত গুণটি পরের প্রজন্মে বজায় থাকবে। ধারণাটি ভুল। অর্জিত গুণ পরের প্রজন্মে যায় না। অবশ্য তখন সময়টা ছিল ভিন্ন। ল্যামার্ক ডারউইনের থেকে ৫৫ বছরের বড় ছিলেন। ল্যামার্কের দুর্ভাগ্য, এই প্রচলিত ভুল ধারণাটি তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে গেল।

ল্যামার্কবাদ

ল্যামার্কবাদ বলতে এখন পূর্বসূরীর অর্জিত গুণ উত্তরসূরীতে বর্তানোর কথা বোঝানো হয়। এ নিয়ে ঊনবিংশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে বহু বিতর্ক হয়েছে। ডারউইনবাদের বিকাশের পরেও কেউ কেউ ভেবেছেন, অর্জিত গুণ পরের প্রজন্মে যেতে পারে। ডারউইনবাদীরা তাদের ‘ল্যামার্কবাদী’ আখ্যায় ভূষিত করেছেন। ‘ল্যামার্কবাদী’ কথাটা প্রায় একটা অপমানসূচক সম্বোধনে পরিণত হয়েছে। ল্যামার্কের মূল কৃতিত্ব কিন্তু বিবর্তনকে সমর্থন করা, তার সপক্ষে উদাহরণ দেওয়া ও বিবর্তনের কার্যকারণ সম্পর্ক খুঁজতে চেষ্টা করা। সেটা মানুষ প্রায় ভুলেই গেছে।

আমরা বলি, ডারউইন প্রথম বিবর্তনের বিজ্ঞানসম্মত কারণ ব্যাখ্যা করেন। দেখা যাক জিরাফের গলা লম্বা হওয়া নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা কী ছিল। ডারউইন বললেন, একই জিরাফ পিতামাতার সব সন্তানের গলা সমান লম্বা নয়। যাদের গলা বেঁটে তাদের খাদ্য কম জোটে বলে তারা কম দিন বাঁচে আর তাদের বংশধর কম হয়। যাদের গলা লম্বা তারা গাছের মগডাল থেকে পাতা খেয়ে বেশি দিন বাঁচে ও তাদের বংশধরের সংখ্যা বেশি হয়। এই বংশধরদের গলা গড়ে বেশি লম্বা হয়। এইভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জিরাফদের মধ্যে গলা লম্বা হবার বৈশিষ্ট্য বাড়ে। কিন্তু কীভাবে একটি বৈশিষ্ট্য পরের প্রজন্মে সঞ্চারিত হয় তা ডারউইন বলতে পারেননি। আর ল্যামার্ক সেটাই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। ল্যামার্কের ব্যাখ্যা ভুল ছিল।  

জিরাফের গলার দৈর্ঘ্য ও তাদের বংশধরদের আয়ু

গ্রেগর যোহান মেন্ডেল ও ‘জন্মগত গুণাবলী’

ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব প্রকাশের কিছু পরে, ১৮৬৫ সালে, গ্রেগর যোহান মেন্ডেল-এর বংশগতির পরীক্ষা নিয়ে গবেষণা প্রকাশিত হয়। কিন্তু ৩৫ বছর ধরে তা অনাদৃত ছিল। কয়েকজন বিজ্ঞানী ১৯০০ সালে তার মূল্য প্রথম বুঝতে পারলেন। সেই সূত্র ধরে বংশগতির একক জিন-এর ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। ডারউইন জিরাফের দুটি শাবকের মধ্যে গলার দৈর্ঘ্যের জন্মগত ফারাক ও সেই ফারাক বংশানুক্রমে প্রবাহিত করার কথা বলেছিলেন। এত দিনে জিনের ধারণার সাহায্যে এই ফারাকের কারণ ও বংশানুক্রমে তা প্রবাহিত হবার প্রকৃত পদ্ধতি বোঝা গেল।

জিনতত্ত্ব প্রস্তাব করেছে যে ‘জন্মগত গুণাবলী’ পরের প্রজন্মে প্রবাহিত হয়, কিন্তু ‘অর্জিত গুণাবলী’ পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হয় না। পরীক্ষায় তা ‘প্রায়’ প্রমাণিত হয়েছে। ‘প্রায়’ কেন, তা ক্রমশ প্রকাশ্য। জিনতত্ত্ব বলে, আপনি জিমে গিয়ে ব্যায়াম করে সুপুষ্ট মাংসপেশির অধিকারী হতে পারেন, তাতে আপনার পুত্র বা কন্যার পেশল চেহারা হবার সম্ভাবনা বিন্দুমাত্র বাড়ে না। অন্যদিকে, আপনার চেহারা যদি পারিবারিক ধাত অনুসারেই পেশিসমৃদ্ধ হয়, তাহলে আপনার পুত্র বা কন্যা কোনও চেষ্টা ছাড়াও পেশল গঠন পেতে পারে। এই কথাগুলো অজস্র পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে।

ল্যামার্কের তত্ত্বকে ভুল বলে প্রমাণ করার কাজে যারা পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন জার্মান বিজ্ঞানী আগুস্ট ফ্রেইডরিখ লিওপোল্ড ভাইজম্যান। তিনি ইঁদুর নিয়ে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানে সবথেকে বিখ্যাত পরীক্ষাটি করেন। কট্টর ডারউইন-পন্থী ও ল্যামার্কবাদ বিরোধী ভাইজম্যান ৯০১-টি ইঁদুর (mouse) ধরে তাদের লেজ কেটে দিয়েছিলেন। পাঁচটি প্রজন্ম ধরে ইঁদুরদের লেজ কেটেও একটিও লেজকাটা ইঁদুর জন্মায়নি।

১৮৮৮ সালে এই পরীক্ষার ফল দেখিয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, কোনও অর্জিত বৈশিষ্ট্য বংশপরম্পরায় যেতে পারে না। ভাইজম্যানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরে মূলধারার জীববিজ্ঞানে ল্যামার্ক অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেলেন।

কিন্তু ভাইজম্যান যে সমস্ত ইঁদুরের লেজ কেটে উঠতে পারেননি, সেটা ২০১৪ সালে প্রমাণিত হবে। তবে সে কথার আগে আমরা একবার যাব নেদারল্যান্ড তথা হল্যান্ডে।

দ্বিতীয় পর্ব হল্যান্ডের ক্ষুধার্ত শীত, ১৯৪৪

১৯৪৪ সাল, ৬ জুন। ডি-ডে। স্থলে জলে অন্তরীক্ষে আক্রমণ চালিয়ে ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলের দখল নিল মিত্রবাহিনী। আর তার সাথেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে গেল। তখন মুসোলিনি ক্ষমতাচ্যুত, ইতালি মিত্রবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। হিটলারের দিন গোনা শুরু হল। কিন্তু তখনো ফ্রান্স, বেলজিয়াম আর হল্যান্ড (নেদারল্যান্ড) হিটলারের দখলে। 

সেপ্টেম্বর ১৯৪৪। প্রায় সমগ্র হল্যান্ড জুড়ে শুরু হল রেল শ্রমিক ধর্মঘট—উদ্দেশ্য বুকের ওপর চেপে বসা নাজি পুতুল সরকারের কাজে যতটা সম্ভব বাধা দেওয়া। হিটলারের জার্মান সেনা আর হল্যান্ডের পুতুল নাজি সরকারের সেনার সম্মিলিত বাহিনীর রসদ যোগানোর কাজে বাধা পড়ল। রেললাইন জায়গায় জায়গায় তুলে ফেলল লুকিয়ে থাকা বিদ্রোহীর দল, ছিঁড়ে ফেলল টেলিগ্রাফ লাইন। একদিক থেকে মিত্রবাহিনী নিশ্চিত গতিতে এগিয়ে আসছে হল্যান্ড সীমান্তের দিকে, অন্যদিকে দেশের মধ্যে তাদের পক্ষে লড়ছে ‘দেশদ্রোহী’র দল—নাজিরা ক্রোধে উন্মাদ হয়ে গেল। তারা হল্যান্ডের মানুষের খাবার প্রায় বন্ধ করে দিল। অবশ্য এমনিতেও তখন জার্মান বাহিনীর রসদ নিয়ে টানাটানি ছিল।

হল্যান্ডের কুখ্যাত ১৯৪৪-এর মন্বন্তর শুরু হল। দেশের সমৃদ্ধ পশ্চিমাঞ্চলে, এমনকি আর্মস্টারডাম শহরে, মাথাপিছু খাদ্য এতটাই কমল যে তা থেকে দিনে মাত্র ১০০০ ক্যালোরি শক্তিও পাওয়া যেত না। এমনকি অনেকের ৪০০ থেকে ৮০০ ক্যালোরির বেশি জুটত না। ওদেশের নারীদের এমনিতে দিনে ২০০০ ক্যালোরি প্রয়োজন। আর গর্ভাবস্থায় প্রয়োজন ২৫০০ থেকে ৩০০০ ক্যালোরি।

১৯৪৫ সালের মে মাসে সমগ্র হল্যান্ডকে নাজিদের হাত থেকে মুক্ত করা গেল। কুড়ি হাজার মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে মারা গেছেন। এর পাশাপাশি এই কথাটাও রাখা যাক, মিত্রবাহিনী তথা চার্চিলের বদান্যতায় এর একবছর আগে বাংলার মন্বন্তরে মারা গেছেন কুড়ি থেকে ত্রিশ লক্ষ মানুষ। তবে তাতে বিশ্বমানবতা তেমন ‘অশনি সংকেত’ দেখেনি। কিন্তু চার্চিল কর্তৃক কৃত্রিম খাদ্যভাবজনিত বাংলার মন্বন্তর নয়, আজকের আলোচনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন হল্যান্ড নিয়ে। বা বলা ভাল, সেখানকার গর্ভবতী মায়েদের সন্তান নিয়ে, সেই সব সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

পৃথিবীর সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কম ঘটেছে যেখানে একটি বিশাল অঞ্চলের সমস্ত গর্ভবতী মায়েরা নির্দিষ্ট তিন-চারমাস সময় ধরে অর্ধাহারে থেকেছেন। সেই সময়ের আগে তাঁরা ভালমন্দ খেয়েছেন, সেই সময়ের পরেও তাঁরা ভালই খাদ্য পেয়েছেন। বৈজ্ঞানিকরা বুঝেছিলেন এই শিশুগুলির ভবিষ্যৎ শারীরিক ও মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে মায়ের পেটের শিশুর পুষ্টির অভাবের ফলাফল নিয়ে অনেক কিছু জানা যেতে পারে। গর্ভবতী মায়েদের খাদ্য থেকে বঞ্চিত করে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করা এমনিতে সম্ভব নয়, নাজি-ফ্যাসিস্ত ছাড়া আর এমন পরীক্ষা দুনিয়াতে কোনও মানুষ করবেনও না। যদি বা করেন তবে ইউরোপ বা আমেরিকাতে অন্তত করবেন না, ভারতে কিংবা আফ্রিকায় করবেন, যেমনটি চার্চিল সাহেব করেছিলেন।

হল্যান্ডের নারীদের ওপর ‘গর্ভাবস্থায় সীমিত সময়ের জন্য অর্ধাহার’ পরীক্ষাতে একটা বৈজ্ঞানিক সুবিধা ছিল। রাষ্ট্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া অর্ধাহারের সময়টুকু বাদে বাকি সময়ে মায়েদের অন্যসময়ে পুষ্টি ভালই ছিল, তাদের সন্তানদের পুষ্টিও খারাপ ছিল না। ফলে গর্ভাবস্থার কোনও নির্দিষ্ট সময় জুড়ে অপুষ্টির প্রভাব কী কী হতে পারে, সেটা বোঝা সম্ভব ছিল।

‘ডাচ হাঙ্গার উইন্টার কোহর্ট’। ১৯৪৪-এর শীতে হল্যান্ডে ক্ষুধাতুর মায়েদের পেটে থাকা সমস্ত শিশু। বিজ্ঞানের ইতিহাস এদের মনে রাখবে। শুধুমাত্র ভ্রূণের পুষ্টি আর বিকাশের সম্পর্ক বোঝার জন্যই তাদের মনে রাখবে, এমন নয়। মনে রাখবে এইজন্যই যে, এই নিষ্ঠুর পরীক্ষা প্রমাণ করতে পেরেছে যে, গর্ভাবস্থায় অজাত শিশুর পুষ্টি তার জন্মগত বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে। ‘ভ্রূণের অভিজ্ঞতা’ জীবনের চক্রব্যূহে প্রবেশের জন্য মানুষকে প্রস্তুত করে। কেমন করে?

১৯৪৪-৪৫ সালের শীতের সময় ক্ষুধার্ত ডাচ শিশুরা আবর্জনা জড়ো করে রাখার পাত্রর মধ্যে খাবারের অনুসন্ধান করছে

‘হল্যান্ডের ক্ষুধার্ত শীতের নিরীক্ষাধীন দল’-এর ওপর গবেষণার সরল সারাৎসার হল এইরকম।

১) যে সব বাচ্চারা গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে নাজিদের চাপানো অনাহারের শিকার হয়েছিল তাদের চেহারা গড়পড়তায় ছোটখাটো হয়ে গেল। জন্মানোর পরে তারা পুষ্টিকর খাদ্য পেয়েছিল, তাতে তাদের চেহারার কাঠামোর উন্নতি হয়নি। এরা যখন মধ্যবয়সী তখন ইউরোপ অতিপুষ্টিতে ভুগছে, স্থূলত্বের রোগ ছড়িয়ে পড়েছে ঘরে ঘরে। কিন্তু এই শিশুরা পরবর্তীকালেও মোটা হয়নি।

২) যে সব শিশুরা মায়ের অপুষ্টির সময়ে গর্ভ-জীবনের মাঝপথে, তাদের জীবনে কিন্তু এই অপুষ্টি অন্যরকম প্রভাব ফেলেছিল। মায়েরে অপুষ্টির সময় এই শিশুদের ভ্রূণের বয়স ছিল তিন মাস থেকে ছয় মাস। পরবর্তীকালে এদের কিডনির নানা অসুখ দেখা দেয়।

৩) যে সমস্ত ভ্রূণের বয়স ছিল সবথেকে কম (সদ্য ভ্রূণ তৈরির সময় থেকে ভ্রূণের তিন মাস বয়স পর্যন্ত), তারা বড় হয়ে অধিকাংশই অতিরিক্ত মোটা হয়ে যায়, তাদের রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যায়, এবং হৃদযন্ত্রের রোগ (হার্ট অ্যাটাক ইত্যাদি) দেখা যায়। আরও পরে যখন এদের বয়স ৫৫ বছর বা তার বেশি, তখন এদের এক বড় অংশ মানসিক সমস্যায় পড়ে।  

হল্যান্ডের শিশুরা গর্ভাবস্থায় অকস্মাৎ এক খাদ্য-সঙ্কটে পড়েছিল। মায়ের পেটে শিশুর খাদ্য আসে মায়ের রক্ত থেকে। ক্ষুদ্রতম ভ্রূণ, যারা তিন মাস বা তার কম সময় মায়ের গর্ভে এসেছে, তারা খাদ্য-সঙ্কটের মোকাবিলার জন্য একরকম পদ্ধতি নিয়েছে। তারা মায়ের রক্ত থেকে খাদ্যের শেষতম কণাটি সদ্ব্যবহার ও সঞ্চয় করার জন্য নিজেকে তৈরি করেছে। এভাবেই সে মায়ের পেটে পরিবেশের মোকাবিলা করেছে। এই শিশুরা খাদ্যের ব্যাপারে ‘কিপটেমির ‘জিন’-কে কার্যকর করেছে। বিজ্ঞানীরা বলেন, ‘Thirfty’ জিন, অর্থাৎ ‘মিতব্যয়ী’ জিন। ‘মিতব্যয়ী’ জিন ভ্রূণাবস্থায় কাজ শুরু করেছে, আর জন্মানোর পরে খাদ্য যথেষ্ট থাকার পরেও শরীর সেই জিনকে অকেজো করতে পারেনি। ফলে পরিণত বয়সে এদের শরীরে চর্বির পাহাড় জমে গেছে, অথচ শরীর সেই চর্বি ভাঙ্গিয়ে শক্তি উৎপাদন করেনি। ঠিক যেমন হাড়-কিপটের ব্যাঙ্কে টাকার পাহাড় জমে গেলেও সে ছেঁড়া জামাটাই পড়ে।

কিন্তু ‘মিতব্যয়ী জিন’ এল কোথা থেকে? একই বাবা-মায়ের অন্যান্য সন্তান, যারা মায়ের পেটে খাদ্য-সঙ্কটে পড়েনি, তাদের শরীরে এই মিতব্যয়ী জিনের কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি কেন? আসলে আমরা যাকে ‘মিতব্যয়ী জিন’ বলছি, তাকে ক্রোমোজোমের সমস্ত জিন ঘেঁটেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ এই শিশুদের জিনগত গঠন বদলে যায়নি তবে ভ্রূণাবস্থায় তাদের বেশ কিছু জিনস্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যায়। একে বলে জিনেরসুইচিং অফ জিনের নিয়ন্ত্রণের বদলের ফলে এইরকম  বদলকে বলে এপিজেনেটিক পরিবর্তন, বা জিনের ওপরের স্তরে বদল। তা জিনের গঠন না বদলিয়ে জিনসমূহের কাজকে বদলে দেয়।   

মায়ের পেটে ভ্রূণের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিন সুইচিং-এর তারতম্য হয়। তাই মায়েরা গর্ভাবস্থার ঠিক কোন সময়ে অকস্মাৎ খাদ্য-সঙ্কটে পড়েছিলেন, তার ওপর বাচ্চার স্থূলত্ব বা ডায়াবেটিসের প্রবণতা নির্ভর করে।

  • মায়ের পেটে নিষেক থেকে প্রথম তিনমাসের বাচ্চারা জিন সুইচিং-এর মাধ্যমে শরীরের ভেতরকার খাদ্য ব্যবহারে ‘মিতব্যয়ী’ হয়েছে।
  • কিন্তু গর্ভাবস্থার চার মাস থেকে ছয় মাসে শিশু মায়ের রক্তে খাদ্যের অভাব মোকাবিলা করেছে অন্য জিন সুইচিং-এর মাধ্যমে। তাদের কিডনির জল ধরে রাখার প্রবণতা বেড়ে গেছে, আর জন্মানোর পরে সেই প্রবণতা কিডনির রোগের জন্ম দিয়েছে।
  • আবার গর্ভাবস্থায় সাত থেকে নয়মাসে মাস বয়সী শিশুদের অন্য জিন সুইচিং হয়েছে। ফলে তাদের শরীরের কাঠামো স্থায়ীভাবে ছোটখাটো হয়ে গেছে।  

হল্যান্ডের এই মানুষদের শৈশব ও প্রাপ্তবয়সের রোগের বর্ণনা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। কিন্তু এর সঙ্গে ল্যামার্ক বা তাঁর অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুক্রমিক চলনের সম্পর্ক কী? না, সরাসরি সম্পর্ক কিছু নেই। তবে কিনা, মানুষ বা যে কোনও প্রাণী তাদের জিন উত্তরাধিকার সূত্রে পায়। যেসব জিন শরীরে আছে, তাদের সবাই সব সময়ে কাজ করে না। বিশেষ জিন কাজ করে বিশেষ পরিবেশে। আর পরিবেশের তেমন বদল ঘটলে জিন সুইচ অফ বা অন করার ফলে কোনও জিনের কাজ স্থায়ীভাবে বন্ধ হতে পারে। ডিএনএ অণুর ‘মেথিলেশন’ নামক রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্বারা সাধারণত এই স্থায়ী পরিবর্তন ঘটে। আমরা এর পরে দেখব, তার প্রভাব বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে পরের প্রজন্মেও পৌঁছাতে পারে। ল্যামার্কবাদের পুনর্জন্ম ঘটল নাকি?

বিজ্ঞানী ভাইজম্যান অনেক ইঁদুরের লেজ কেটেছিলেন। কিন্তু ইঁদুরের কিছু অর্জিত বৈশিষ্ট্য যে পরের প্রজন্মে পৌঁছয়, সেটা বুঝতে আরেকটু জটিল পরীক্ষার দরকার ছিল। পরের পর্বে সে প্রসঙ্গে আসব।

তৃতীয় পর্ব যে সব ইঁদুর কাটা লেজ নিয়ে জন্মাল 

২০১৪ সালে একটি মেডিক্যাল জার্নালে এক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। ধেড়ে ইঁদুর বা rat নিয়ে গবেষণা। পরীক্ষার উদ্দেশ্য হল গর্ভাবস্থায় ‘স্ট্রেস’ বা চাপের ফল বিচার।

শৈশবের ট্রমা ওএপিজেনেটিক্স

গবেষকরা কয়েকটি গর্ভবতী মেয়ে ইঁদুরকে সাতদিন ধরে প্রতি দিন কুড়ি মিনিট একটা ছোট জায়গায় আটকে রাখেন, আর পাঁচ মিনিট ধরে জলের মধ্যে তাদের সাঁতার কাটতে বাধ্য করেন। এইভাবে তাদের ওপর ‘স্ট্রেস’ সৃষ্টি করা হয়। তারপর দেখা হয় তাদের বাচ্চা নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্মাচ্ছে কিনা, এবং গর্ভাবস্থায় তাদের ওজন বৃদ্ধি ঠিকমত হয়েছে কিনা। তাদের আচরণ স্বাভাবিক কিনা সেটাও পর্যবেক্ষণ করা হয়। এছাড়া এই ইঁদুরদের রক্তের গ্লুকোজ এবং কর্টিকোস্টেরয়েড হরমোন মাপা হয়। কর্টিকোস্টেরয়েড হরমোনকে চলতি কথায় স্ট্রেস হরমোন বলে। স্ট্রেসের ফলে মানুষের বা ইঁদুরের রক্তে কর্টিকোস্টেরয়েড হরমোন বেড়ে যায়, গ্লুকোজও বেড়ে গিয়ে ডায়াবেটিসের লক্ষণ দেখা যেতে পারে। এছাড়া ইঁদুরদের বাচ্চাদের জন্মকালীন ওজন মাপা হল, ও প্রথম একমাস বয়স পর্যন্ত সেই ওজন কতটা বাড়ে তাও দেখা হল।

ফলাফল যা আশা করা হয়েছিল তাই হল। স্ট্রেসের ফলে ইঁদুরদের নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বাচ্চা হয়ে গেল, আর বাচ্চাদের পুষ্টি কম হল। মা-ইঁদুরদের গর্ভাবস্থায় ওজন যথেষ্ট বাড়ল না। তাদের আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে উঠল। তাদের রক্তে গ্লুকোজ এবং কর্টিকোস্টেরয়েড হরমোন বেড়ে গেল। বাচ্চাদের জন্মকালীন ওজন কম হল এবং প্রথম একমাস বয়স পর্যন্ত সেই ওজন বৃদ্ধিও কম হল।

এগুলো কোনোটাই অপ্রত্যাশিত ছিল না। এর আগে ইঁদুর নিয়ে এরকম অনেক পরীক্ষা হয়েছে, গিনিপিগ ইত্যাদি অন্য জীব নিয়েও পরীক্ষা হয়েছে। দেখা গেছে গর্ভাবস্থায় স্ট্রেসের ফল এরকমই হয়। এমনকি মানুষের ক্ষেত্রেও আমরা জানি, গর্ভাবস্থায় স্ট্রেস হলে একই ধরণের নানা সমস্যা হয়। তাই ধাত্রীবিদ্যার চিকিৎসকেরা গর্ভাবস্থায় মায়েদের স্ট্রেস এড়িয়ে চলতে বলেন।

তাহলে এই পরীক্ষার বিশেষত্ব কোথায়? বিশেষত্ব এখানেই যে, এই পরীক্ষায় স্ট্রেসযুক্ত ইঁদুরের মেয়ে ও নাতনিদেরও খুব যত্ন নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখা হয়েছে। দেখা গেছে যে, মেয়ের প্রজন্ম বা নাতনির প্রজন্ম যখন বড় হয়ে গর্ভবতী হচ্ছে, তখনও তাদের গর্ভাবস্থায় একই সমস্যা হচ্ছে। তাদের তাড়াতাড়ি বাচ্চা হয়ে যাচ্ছে, গর্ভাবস্থায় ওজন কম বাড়ছে, আচরণ অস্বাভাবিক হচ্ছে। এবং তাদের রক্তে গ্লুকোজ এবং কর্টিকোস্টেরয়েড হরমোন বেড়ে যাচ্ছে। সদ্যোজাত বাচ্চাদের জন্ম-ওজন কম, ওজনের বৃদ্ধিও কম হচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, পরবর্তী প্রজন্মের ইঁদুরদের গর্ভাবস্থায় কোনও স্ট্রেস হয়নি। তাহলে এর ব্যাখ্যা একটাই। গর্ভাবস্থায় রক্তে গ্লুকোজ এবং কর্টিকোস্টেরয়েড হরমোন বেড়ে যাবার মত নানা প্রবণতা যেন ‘বংশগত’ হয়ে গেছে। পারিভাষিক শব্দে বললে, একটি অর্জিত বৈশিষ্ট্য ‘বংশগত’ হচ্ছে!

ভাইজম্যান ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করে ১৮৮৮ সালে দেখিয়েছিলেন, অর্জিত বৈশিষ্ট্য বংশগত হতে পারে না। সেই ইঁদুরের ওপরেই কিনা আরেক পরীক্ষা ১২৬ বছর পরে দেখিয়ে দিল, অর্জিত বৈশিষ্ট্য বংশপরম্পরায় যেতে পারে! ইতিহাসের পরিহাস বলব নাকি? তাহলে কি ল্যামার্ক ঠিক বলেছিলেন?

ইঁদুরের রক্তে গ্লুকোজ এবং কর্টিকোস্টেরয়েড হরমোন গর্ভাবস্থায় বেড়ে যাবার প্রবণতা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে যায় কোন প্রক্রিয়ায়?

হল্যান্ডের ক্ষুধার্ত শীতের শিশুগুলির ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, মায়ের গর্ভে থাকাকালীন গর্ভের পরিবেশ শিশুর জিনকে প্রভাবিত করতে পারে। পরিবেশ জিনকে প্রভাবিত করে, কিন্তু কোষের মধ্যেকার জিনের মূল গঠন তাতে বদলে যায় না।  কিছু জিন, বা বলা উচিৎ কিছু জিনের উপাদান ডিএনএ, রাসায়নিকভাবে সামান্য পরিবর্তিত হয়ে যায়। কিন্তু সেই পরিবর্তন (মেথিলেশন) পরের প্রজন্মের জিনে পৌঁছায় না।

হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট ও তারপরের নানা প্রযুক্তিগত উন্নতি হবার ফলে এখন আমরা যে কোনও প্রাণীর সমস্ত জিনের গঠন সরাসরি জানতে পারি। হল্যান্ডের ক্ষুধার্ত শীতের শিশুগুলির সঙ্গে অন্যদের জিনগত ফারাক খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাদের ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ বা স্থূলত্বের জন্য দায়ী হল কিছু জিন যারা শিশুদের জন্মের আগেই ‘সুইচ অফ’ হয়েছিল। তেমনই ২০১৪ সালে যেসব ইঁদুর নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল, তাদের জিনের গঠনে কোনও পরিবর্তন হয়নি। তাদের জন্মের আগেই কিছু জিনের কার্যকারিতা বদলে গিয়েছিল। ফলে তাদের রক্তে গ্লুকোজ ও কর্টিকোস্টেরয়েড হরমোন বংশপরম্পরায় বেড়ে যায়।

আমরা আগে দেখি সাধারণ ইঁদুরের ক্ষেত্রে স্ট্রেসের ফলে কী হয়। স্ট্রেসে রক্তে কর্টিকোস্টেরয়েড হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, আর স্ট্রেস দূর হবার পরে কর্টিকোস্টেরয়েডের মাত্রা স্বাভাবিকে নেমে আসে। নামিয়ে আনার কাজটির জন্য মস্তিষ্কের একটি অংশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভবতী ইঁদুরের স্ট্রেসের ফলে শরীরে কর্টিকোস্টেরয়েড হরমোনের মাত্রা বাড়ে। এই হরমোনের প্রভাবে তাদের আগেভাগে বাচ্চা জন্মায় ও বাচ্চার মস্তিষ্কের কিছু অংশ অপরিণত থাকে। মস্তিষ্কের যে অংশটা স্ট্রেস কমলে কর্টিকোস্টেরয়েডের মাত্রা স্বাভাবিকে নামিয়ে আনার কাজটি করে, সেই অংশটিই এই ইঁদুর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অপরিণত থাকে। ফলে এই ইঁদুর বাচ্চাদের শরীরে কর্টিকোস্টেরয়েডের মাত্রা একবার বেড়ে গেলে চট করে নামতে চায় না। গড়ে তাদের এই হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের চাইতে বেশি থাকে। এই বাচ্চারা বড় হয়ে যখন নিজেরা গর্ভবতী হয়, তখনও তাদের রক্তে কর্টিকোস্টেরয়ডের মাত্রা বেশি থাকে। ফলে তাদের পেটের বাচ্চাদের মস্তিষ্কের একই অংশ একই ভাবে অপরিণত থাকে। ফলে সেই বাচ্চাদের রক্তে কর্টিকোস্টেরয়েড মাত্রা বেশি থাকে। এইভাবে বংশানুক্রমে শরীরে কর্টিকোস্টেরয়েডের মাত্রা বেশি হয়ে যায়। মনে হয় এটা যেন বংশগত বৈশিষ্ট্য।

আমরা ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত জেনে এসেছি বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্য মাত্রেই জিনঘটিত। ফলে কর্টিকোস্টেরয়েডের মাত্রা বংশানুক্রমিক ভাবে বেশি থাকলে তাকে আমরা জিনঘটিত বৈশিষ্ট্য বলেই ভাবতাম। কিন্তু এরকম বৈশিষ্ট্য জিনঘটিত নয়।  এই বৈশিষ্ট্য এপিজেনেটিক, অর্থাৎ জিনকে নিয়ন্ত্রণের ফলে উৎপন্ন বৈশিষ্ট্য। খেয়াল রাখতে হবে যে সাধারণ জেনেটিক বৈশিষ্ট্য যেখানে এলোমেলো বা রান্ডম, এপিজেনেটিক বৈশিষ্ট্য পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর অভিমুখে, ও তা দ্রুত উদ্ভূত হয়। দ্বিতীয়ত, এ হল অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুক্রমিক সঞ্চালন। 

অনেকে বলছেন, শেষ হাসিটা তাহলে ল্যামার্ক-ই হাসলেন।

তাই কি?

হ্যাঁ, কারণ কিছু অর্জিত গুণের বংশানুক্রমিক সঞ্চালন সম্ভব।

না, কারণ আমাদের জানা অধিকাংশ অর্জিত বৈশিষ্ট্য এভাবে বংশানুক্রমিক সঞ্চালিত হতে পারে না। তাছাড়া কয়েকটি প্রজন্মের পরে এরকম অর্জিত গুণ উধাও হয়ে যায়। কয়েক প্রজন্ম পরে ‘স্ট্রেস’ পাওয়া ইঁদুরের বংশধররা অন্যদের সঙ্গে একই রকম হয়ে যায়। ফলে চেষ্টা করে যে জিরাফ গলা লম্বা করেছে, তার বংশধরদের মধ্যে লম্বা গলার বৈশিষ্ট্য যদি আসতও, তা কোনোভাবেই কয়েক প্রজন্মের পরে স্থায়ী হতে পারত না।

তবে অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশানুক্রমিক সঞ্চালনের আরও নানা উপায় আছে। যেমন মায়ের ডিম্বাণুতে কিছু নির্দিষ্ট ‘ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর’-এর অভাব গর্ভস্থ সন্তানের একটি জিনকে সক্রিয় হতে দেয় না। পরিবেশে কিছু রাসায়নিক বিষের উপস্থিতির প্রভাবে এই সব ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরের অভাব হতে পারে। পরিবেশজনিত অর্জিত এইরকম বৈশিষ্ট্য বংশানুক্রমিক হতে পারে—এমনকি ত্রিশটি প্রজন্ম ধরে এর প্রভাব চলতে পারে। 

ল্যামার্ক মৃত। ল্যামার্ক দীর্ঘজীবী হউন।

বিধিসম্মত সতর্কীকরণঃ যে ল্যামার্কবাদের মৃত্যু হয়েছে, সেই ল্যামার্কবাদের পুনরুত্থান সম্ভব নয়। এ হল জেনেটিক্সের হাত ধরে ওঠা নব্য – ল্যামার্কবাদ। তাই দিয়ে আজ থেকে সাত-আট দশক আগেকার জেনেটিক্স অস্বীকার করা ল্যামার্কবাদকে সমর্থন করার প্রচেষ্টা সম্ভব নয়।

ল্যামার্ক মৃত। এবং চিরনিদ্রায় শায়িত। কিন্ত জিন কোনও স্বরাট সম্রাট নয়। তাকে নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশ। আর তা প্রজন্মান্তরেও দীর্ঘ ছায়া ফেলার ক্ষমতা রাখে।

চিত্র পরিচিতি

১) জাঁ ব্যাপতিস্তে ল্যামার্ক

২) জিরাফের গলার দৈর্ঘ্য ও তাদের বংশধরদের আয়ু

৩) ১৯৪৪-৪৫ সালের শীতের সময় ক্ষুধার্ত ডাচ শিশুরা আবর্জনা জড়ো করে রাখার পাত্রর মধ্যে খাবারের অনুসন্ধান করছে

৪) শৈশবের ট্রমা ও এপিজেনেটিক্স

পাদটীকা ও তথ্যসূত্র

১) Early Concepts of Evolution: Jean Baptiste Lamarck. The History of Evolutionary Thought. https://evolution.berkeley.edu/evolibrary/article/history_09

২) প্রসঙ্গত, ডারউইন নিজেও একই পিতামাতার সন্তানদের মধ্যে বৈশিষ্ট্যের ফারাক কেমন করে হয় তার ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছিলেন। ডারউইনের সেই ব্যাখ্যা ল্যামার্কের ব্যাখ্যার মতই ভুল ছিল। (তথ্যসূত্র Zou Y. Charles Darwin’s Theory of Pangenesis. The Embryo Project Encyclopedia. Published: 2014-07-20. https://embryo.asu.edu/pages/charles-darwins-theory-pangenesis

৩) August Friedrich Leopold Weismann (1834-1914). Yawen Zou. The Embryo Project Encyclopedia. Published: 2014-05-23. https://embryo.asu.edu/pages/august-friedrich-leopold-weismann-1834-1914

৪) Marshal T. Canada and the Dutch Hunger Winter, ‘The Canadian Encyclopaedia’. https://www.thecanadianencyclopedia.ca/en/article/canada-and-the-dutch-hunger-winter#:~:text=)

৫) Schulz LC., ‘The Dutch Hunger Winter and the developmental origins of health and disease’. Procedure National Academy of Science USA. 2010; 107(39): 16757–16758. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2947916/)

৬) Alberts B, Johnson A, Lewis J, et al., ‘Molecular Biology of the Cell.’, 4th edition. New York: Garland Science; 2002 https://www.ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK26872/

৭) এর পাশাপাশি একটা প্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে রাখা দরকার। আগস্ট ১৯৪২ থেকে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩ নাজি জার্মানির সেনারা স্তালিনগ্রাদ অবরোধ করে। সেখানকার মানুষের খাদ্যের অবস্থা হল্যান্ডের বা অ্যামস্টারডামের চাইতে বিশেষ ভাল ছিল না। কিন্তু সেখানে তখন যে গর্ভবতী মায়েরা ছিলেন তাদের বাচ্চারা পরবর্তীকালে এমন ডায়াবেটিস ইত্যাদির শিকার হয়েছে, এমন প্রমাণ নেই। এর দুটো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আছে। প্রথম ব্যাখ্যা হল, স্তালিনগ্রাদের তথ্যসংগ্রহে খামতি ছিল। আর দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হল, স্তালিনগ্রাদের মায়েদের পুষ্টি অ্যামস্টারডামের মায়েদের থেকে আগে থেকেই কম ছিল, আর স্তালিনগ্রাদে জার্মান অবরোধ শেষ হবার পরেও বহুদিন সেখানে খাদ্যের অভাব ছিল। সোভিয়েত দেশ তখনও হল্যান্ডের মত অত স্বচ্ছল হয়নি। জন্মের পরে স্তালিনগ্রাদের বাচ্চাদের এইরকম স্থূলত্ব বা ডায়াবেটিস ইত্যাদির প্রবণতা বাড়েনি। কারণ তারা ক্ষুধার রাজ্যের জন্য ভ্রূণাবস্থায় নিজেদের তৈরি করে ক্ষুধার রাজ্যেই জন্মেছিল, জন্মের পর হঠাৎ অতি-প্রাচুর্যের সমাজে অতি-আহারের মধ্যে পড়েনি। জন্মের আগের পরিবেশের সঙ্গে জন্মের পরের পরিবেশের সাযুজ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

৮) Yao et al. BMC Medicine 2014, 12:121 Ancestral exposure to stress epigenetically programs preterm birth risk and adverse maternal and newborn outcomes. http://www.biomedcentral.com/1741-7015/12/121

লেখক চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য-আন্দোলনের কর্মী, প্রাবন্ধিক।

মন্তব্য তালিকা - “ল্যামার্ক, অর্জিত বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার ও এপিজেনেটিক্স-এর ইতিহাস”

  1. এপিজেনেটিক্স এবং নিও ল্যামারক-এর প্রেক্ষিতে লাইসেঙ্কো এবং তৎকালীন রাশিয়ান বায়োলজির অবস্থান সম্পর্কে আজকের ব্যাখ্যা — বিষয়ে আলোচনার অপেক্ষায় থাকলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।