সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ইতিহাসের শহর কাঞ্চীতে

ইতিহাসের শহর কাঞ্চীতে

সুদীপ্ত পাল

নভেম্বর ১৯, ২০২২ ৮০

পতঞ্জলির মহাভাষ্য থেকে শুরু করে চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের পরিব্রাজনবৃত্তান্ত, মহাভারত থেকে শুরু করে বাংলার অন্নদামঙ্গলের বিদ্যাসুন্দর উপাখ্যান অবধি বহু সাহিত্যে তামিলনাড়ুর একটি সমৃদ্ধ জনপদের কথা জানতে পারা যায়। তার নাম কাঞ্চীপুরম। ১০০০-১৩০০ বছর পুরোনো এতগুলি ফ্রি-স্ট্যান্ডিং স্থাপত্য এরকম অক্ষত অবস্থায় এত বছর ধরে টিকে থাকার উদাহরণ পৃথিবীতে কমই আছে। সেই বিচারে কাঞ্চীপুরম রোম আর খাজুরাহের সঙ্গে তুলনীয়। ভারতের সবচেয়ে পুরোনো ফ্রি-স্ট্যান্ডিং স্থাপত্যগুলির মধ্যে পড়ে গুপ্ত ও চালুক্যদের বিভিন্ন মন্দির, আর তারপরেই পল্লব স্থাপত্য। পল্লব স্থাপত্য দেখার দুটো সেরা জায়গা হল মহাবলীপুরম (সপ্তম শতক) আর কাঞ্চীপুরম (অষ্টম শতক)। কাঞ্চীপুরমে আছে চোল আর বিজয়নগর যুগের মন্দিরও।

কাঞ্চীপুরমের নিকটতম বিমানবন্দর আর বড় রেলস্টেশন হল চেন্নাই। সেখান থেকে ৬০ কিমি রাস্তা সড়কপথে যেতে হয়। লোকাল ট্রেনও যায়।

আমরা অবশ্য ব্যাঙালোর থেকে ভোরের ট্রেন ধরে আরাক্কোনম এসে ট্যাক্সি ধরে দুপুর নাগাদ পৌঁছলাম। শহরের মূল বাজার অঞ্চলে থাকলে অনেকগুলি মন্দির হেঁটে দেখা যায়। প্রতি আনাচে-কানাচে অলিতে-গলিতে একেকটা সাতশ থেকে তেরোশো বছর পুরোনো মন্দির। তাদের মধ্যেই জমজমাট শহর। এথেন্স আর রোম ছাড়া আর কোনো জীবিত শহরে এমন দেখেছি মনে পড়ে না, অন্ততঃ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়। ধ্বংসস্তূপের কথা আলাদা। এই মন্দিরগুলো এখনও সক্রিয়, ধারাবাহিকভাবে।

ঘোরার জন্য দুই-বেলা যথেষ্ট। দুপুর ১২টা থেকে ৪টে প্রায় সব মন্দির বন্ধ থাকে, আর রোদও প্রচণ্ড থাকে। একরাত্রি থেকে কিছু মন্দির বিকেলে, কিছু সকালে দেখা সুবিধাজনক। সকালবেলা ৭টায় অনেক মন্দির খুলে যায়। সন্ধেবেলা কৈলাশনাথ মন্দির ৫:৩০ অবধি, অন্যগুলি ৭টা-৮টা অবধি খোলা।

দুপুরে একটা সুস্বাদু তামিল থালি খেয়ে বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম। সবার প্রথমে কৈলাশ যাত্রা।

১) কৈলাশনাথ মন্দির: কাঞ্চীতে আর কিছু না দেখলেও এটি অবশ্যই দেখতে হয়। এই মন্দির পরবর্তীকালে দ্রাবিড় শৈলীর পরাকাষ্ঠা হয়ে দাঁড়ায়। এর অনুকরণেই পট্টাডকাল বিরূপাক্ষ, আর তার অনুকরণে ইলোরার বিশ্বখ্যাত কৈলাশ মন্দির। কাঞ্চী কৈলাশ অষ্টম শতকে পল্লবদের তৈরি। পরের দুটো অষ্টম শতাব্দীতে যথাক্রমে চালুক্য ও রাষ্ট্রকূটদের দ্বারা নির্মিত।

কৈলাশে শিবের এত রূপ আর এতরকমের কেশবিন্যাস- দেখলে অবাক হতে হয়। শিবের পশুপতি রূপ, নটেশ রূপ, ব্যাধরূপ- এগুলো লক্ষণীয়। শিবের নৃত্যরত রূপ এই মন্দিরে একাধিক স্থানে দেখা যায়। এই রূপ নটেশ বা নটরাজ বা প্রোটো-নটরাজ নামে পরিচিত। নট মানে অভিনেতা। প্রাচীন ভারতে অভিনয় এবং নৃত্য যে প্রায় সমার্থক ছিল, আর শিবের আইকোনোগ্রাফি যে অনেকটাই নর্তক পুরুষের রূপ ছিল- সেই কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় এই মন্দিরের ভাস্কর্যগুলি। শিবের একাধিক হাতের মধ্যে কয়েকটি হাতে নাচের মুদ্রা, কয়েকটি হাতে অস্ত্র। হাতে অস্ত্র থাকলেও তিনি ক্রুদ্ধ নন। এটিকে প্রাচীন মার্শাল ডান্সের রূপায়ণ হিসেবে দেখা যায়। একাধিক হাতকে অ্যানিমেশন হিসেবে দেখানো শিবের আইকোনোগ্রাফিতে বেশ প্রচলিত ছিল।

কিরাতার্জুনীয় কাহিনীর চিত্রণও বেশ কিছু ভাস্কর্যে দেখা যায়। এই কাহিনীতে শিব কিরাত বা ব্যাধরূপে অর্জুনকে দেখা দিয়েছিলেন। অনেক মূর্তিতেই শিবকে নাসাগ্ৰদৃষ্টিমুদ্রায় দেখা যায়- যেখানে শিবের দুটি চোখের দৃষ্টি নাসাগ্ৰে নিবদ্ধ। মূর্তিগুলো পাথর হলেও স্থবির নয়, তাদের মধ্যে জঙ্গমতা আছে, ছোট ছোট কাহিনী আছে। সবমিলিয়ে শিব এখানে বর্ণময়, নাটকীয়, বহুরূপে উদ্ভাসিত- সমাজের মূলধারার কিছুটা বাইরে যেন তাঁর অবস্থান।

এছাড়াও আছে দক্ষিণামূর্তি শিব, শিব-পার্বতী, মহিষমর্দিনী, সিংহবাহিনী ইত্যাদি। পুরো মন্দির জুড়ে আছে দণ্ডায়মান গর্জনরত সিংহ। আবার বাইরের দেয়ালে রয়েছে আরোহী যোদ্ধা পিঠে সিংহ। এখানকার অন্য একটি মন্দিরে এবং পল্লবদের আরেকটি মন্দিরনগরী মহাবলীপুরম- সেখানেও সিংহের বাহুল্য লক্ষণীয়। এর আগে সিংহের এত ব্যবহার অশোকের স্তম্ভগুলিতে এবং মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন বৌদ্ধ গুহাচৈত্যে দেখা গেছে। গুপ্ত আর চালুক্যরা এত সিংহের চিত্রণ করেনি। মন্দিরটির নির্মাতা পল্লবরাজ নরসিংহবর্মন রাজসিংহের নামের সঙ্গে মিলিয়ে যেন রাজারই প্রতীক এই সিংহগুলি।

সামান্য রঙিন মুরাল পেইন্টিং এখনও অবশিষ্ট আছে, একটু খুঁজে খুঁজে দেখতে হবে। রংগুলো সম্ভবতঃ পল্লবযুগের নয়, পরবর্তীকালের। অনেক মূর্তিই পরবর্তীকালে প্লাস্টার দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে, এবং সংস্কারের মান মূল ভাস্কর্যগুলির সঙ্গে তুলনীয় নয়।

নরসিংহবর্মন রাজসিংহ ৭২০ সাল নাগাদ মন্দিরটি বানান। চালুক্যরা পল্লবদের পরাস্ত করে তাদের শিল্পীদের যুদ্ধবন্দি করে নিয়ে যায়- তৈরি হয় পট্টডকালের বিরূপাক্ষ। তারপরে রাষ্ট্রকূটরা চালুক্যদের পরাজিত করে শিল্পীদের বন্দি করে নিয়ে যায়- তৈরি হয় ইলোরার কৈলাশ। এভাবেই কাঞ্চীর কৈলাশ থেকে ইলোরার কৈলাশের শৈল্পিক যাত্রা ঘটে- এটা অনেক ইতিহাসবিদের ধারণা।

২) বরদারাজ পেরুমল মন্দির: শৈল্পিক বিচারে আরেকটি সেরা মন্দির এটি। একাদশ শতকে চোলদের তৈরি। তবে এই মন্দির কমপ্লেক্সের সেরা আকর্ষণ হল বিজয়নগর রাজাদের তৈরি “হান্ড্রেড পিলার হল”- চতুর্দশ বা পঞ্চদশ শতকের। হান্ড্রেড পিলার হলে অনেকগুলি ভাস্কর্যমণ্ডিত পিলার- কোনওটা দুই পায়ে দাঁড়ানো ঘোড়া, কোনওটা পাখি- ইত্যাদি। ময়ূর। ঘোড়ার উপরে অশ্বারোহী, পাখির উপরে মানুষ। আর এগুলি সবই লম্বা পিলারের আকারে- অতএব সবারই দন্ডায়মান রূপ। এই বিশেষ শৈলীটা বিজয়নগর শিল্পের বৈশিষ্ট্য, হাম্পিতেও আছে। মূল মন্দিরে এবং আনুষঙ্গিক মণ্ডপগুলিতে বিজয়নগর যুগের রঙিন মুরাল পেইন্টিং এবং সিলিং পেইন্টিং দর্শনীয়। এটি বাজার এলাকা থেকে একটু দূরে। গাড়ি নিতে হবে।

                         বরদারাজ পেরুমল মন্দির – মুরাল পেইন্টিং

ইতিহাসের মাঝে মাঝে বর্তমানের চর্চা করে নেয়া ভাল। এই শহরের দক্ষিণী স্টাইলের খাবার খুবই সুস্বাদু, আছে তামিল স্টাইলের বিরিয়ানিও। আর কাঞ্জিভরম শাড়ি তো পৃথিবীবিখ্যাত। রাতের দিকে এগুলো সেরে নেয়া যায়। পরের দ্রষ্টব্যগুলো আমরা পরের দিন সকালে দেখতে বেরোলাম।

৩) বৈকুণ্ঠ পেরুমল মন্দির: অষ্টম শতকে পল্লবদের তৈরি বিষ্ণুমন্দির। রাজা নন্দিবর্মন পল্লবমল্ল ৭৭০-৭৭৫ সাল নাগাদ এটি বানান।

মন্দিরটির ভিত্তি হল একটি মণ্ডল। এইধরনের মণ্ডলকে ভিত্তি হিসেবে রেখে মন্দির নির্মাণ পরবর্তীকালে খাজুরাহোতেও দেখা যায়। বৈষ্ণবদের প্রাচীনতম আগম সাহিত্যগুলির মধ্যে পড়ে পাঞ্চরাত্র সংহিতা। সেখানে বর্ণিত চক্রাব্জমণ্ডল এই মন্দিরের ভিত্তি বলে অনুমিত। চক্রাব্জ হল আট পাঁপড়িআলা পদ্ম বা চক্র।

অদ্ভুত রহস্যময় পরাবাস্তবিক পরিবেশ এখানে- কিছুটা এর কম্প্যাক্ট আকারের জন্য, কিছুটা ভাস্কর্যের বাহুল্যের জন্য। মূল মন্দিরের চারপাশের প্রাকারগুলিতে (মন্দিরের দিকে মুখ করে তৈরি ঢাকা বারান্দা) প্রচুর ভাস্কর্য, অজস্র কাহিনীকথন তাদের মধ্যে। পল্লবরাজ নন্দিবর্মণের জীবনকাহিনী, তাঁর যুদ্ধাভিযান, অভিষেক, রাজসভা ইত্যাদি অত্যন্ত বিশদভাবে চিত্রিত আছে এখানে। মূল মন্দিরের দেয়াল জুড়ে প্রচুর দেবদেবী তাঁদের অষ্টম শতকের প্রাচীন রূপে বিরাজমান।  মন্দিরের ছাপ্পান্নটি ভাস্কর্যমণ্ডিত প্যানেলে ভাগবত পুরাণের ঘটনাবলী চিত্রায়িত হয়েছে।

পিলারগুলিকে অবলম্বন দিয়ে বসে আছে অনেকগুলো সিংহ। এটি কৈলাশের কথা আরেকবার মনে করিয়ে দেয়। এটি বাজার এলাকার কাছে। হেঁটে যাওয়া যায়।

খুব বেশি সময় না পেলে উপরের তিনটি অবশ্যই দেখবেন। আর একটু বাড়তি সময় পেলে দেখবেন:

৪) একাম্বরেশ্বর মন্দির: একাদশ শতকে চোলদের তৈরি। অনেকগুলি উঁচু উঁচু গোপুরম যা অনেক দূর দূর থেকে দেখা যায়। আভ্যন্তরীণ শিল্পকর্মও খুব সুন্দর। শহরের সবচেয়ে বড় মন্দির কমপ্লেক্স। এটিও বাজার থেকে হাঁটা দূরত্বে।

৫) মুথীশ্বরর কোবিল: অষ্টম শতকে পল্লবদের তৈরি। ছোট মন্দির- কিন্তু প্রাচীনত্বের জন্য দর্শনীয়। ভাস্কর্যসমূহও সুন্দর।

৬) জুরহেশ্বরর কোবিল: অষ্টম শতকে পল্লবদের তৈরি। ছোট মন্দির- কিন্তু প্রাচীনত্বের জন্য দর্শনীয়। ভাস্কর্যসমূহও সুন্দর। তাছাড়া এর বাস্তু নকশা অনেকটাই অন্য পল্লব মন্দিরের থেকে আলাদা। এর মূল মণ্ডপ গোলাকার। (অন্যদেরগুলো চৌকোনা।)

৭) মদঙ্গীশ্বরর কোবিল: অষ্টম শতকে পল্লবদের তৈরি। খুব ছোট মন্দির- কিন্তু প্রাচীনত্বের জন্য দর্শনীয়।

৮) কামাক্ষী মন্দির: শংকরাচার্যের মঠের সাথে যুক্ত এই মন্দির। ধর্মীয় গুরুত্ব অনেক, তবে এটি আধুনিক মন্দির। মূল মন্দির অবশিষ্ট নেই।

এই পাঁচটি মন্দির বাজার এলাকার কাছেই। হেঁটে যাওয়া যায়।

এছাড়াও এই শহরের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হল রাস্তা দিয়ে যেতে আসতে হঠাৎ হঠাৎ করে এক একটা পাঁচশো কি হাজার কি তেরো’শো বছর পুরোনো মন্দির বা গোপুরম চোখে পড়বে। কয়েকশো মন্দির নিয়ে যথার্থই মন্দির নগরী এটি। আধুনিক শহরের পরতে পরতে এরকম প্রাচীন ইতিহাসের আনাগোনা- পৃথিবীর খুব কম শহরেই পাবেন।

শুধু বিষ্ণু আর শিব নন, কাঞ্চীতে বুদ্ধও আছেন, বা বলা ভালো, ছিলেন। সপ্তম শতাব্দীর আগের কথা। সপ্তম শতকে হিউয়েন সাঙ যখন কাঞ্চীতে এলেন, তখন প্রথম নন্দিবর্মণের রাজত্ব। তিনি মহাবলীপুরমের গুহাশিল্পগুলির নির্মাণ করছেন ঐ সময়ে। তখনও কাঞ্চীর বিখ্যাত মন্দিরগুলি তৈরি হয়নি। সেগুলো আরো এক শতাব্দী পরে‌। কিন্তু হিউয়েন সাঙ এসে দেখতে পাচ্ছেন কাঞ্চীতে আছে একশটি বৌদ্ধ সংঘারাম, যেখানে দশ হাজার ভিক্ষু থাকতেন। তিনি বর্ণনা দিয়েছিলেন শহরের দক্ষিণ দিকের একটি বিহারের যেখানে বিদেশি ছাত্ররাও আসত, তর্কশাস্ত্র শিখত। তিনি দেখেছিলেন আশিটি হিন্দু মন্দিরও। এখনও মন্দিরনগরী কাঞ্চীর অলিতে-গলিতে আনাচে-কানাচে ৭০০-১৩০০ বছরের পুরোনো হিন্দু মন্দির দেখা যায়। কিন্তু কোথায় গেল সেই বৌদ্ধ বিহারের অবশেষগুলো?

আগের দুবার যখন এই শহরে ঘুরতে এসেছি তখন জানতাম না কাঞ্চীর এই বিরল সম্পদের কথা। এবার খুঁজে খুঁজে পৌঁছে গেলাম। সি এম সুব্বারাইয়া মুদালিয়ার হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল- বাজার থেকে হাঁটা দূরত্বে। স্কুলের মাঠে একটা খাঁচার মত মন্দিরে রাখা এক বুদ্ধ! অনেক অনেক শৈব ও বৈষ্ণব মন্দিরের মাঝে পাওয়া এই অপ্রত্যাশিত বুদ্ধ মূর্তি! স্কুলের মাঠে রাখা কারণ ১৯৮০র দশকে এই স্কুলের মাঠেই এটি পাওয়া যায়। নয় বছর আগে খাঁচাটা ছিল না, যার ফলে মূর্তির কিছু ক্ষতি হয়েছে। স্কুলের খেলার মাঠে তিরিশ বছর ধরে খোলা হাওয়ায় রাখা ছিল দেড় হাজার বছর পুরোনো বুদ্ধ মূর্তি- বুঝুন অবস্থা! এখন বুদ্ধকে একটি গাছের নিচে বসিয়ে একটি ধর্মচক্র, পদ্ম ইত্যাদি যোগ করে একটা খাঁচার মত বৌদ্ধ মন্দির তৈরি করে দেয়া হয়েছে।

দেখে ঠিক বুদ্ধ বলে মনে হচ্ছিল না, বরং তামিল আলবার বা নায়নার কবিদের মূর্তি মনে হল, তবে পরে খোঁজ করে দেখলাম তামিলনাড়ুর বুদ্ধমূর্তিগুলি এরকমই হত। একই জায়গায় একই শিল্পরীতিতে বানানো, তাই এই সাদৃশ্য। পুরো তামিলনাড়ুতে পাওয়া হাতে গোনা কয়েকটি বুদ্ধমূর্তির একটি হল এটি। আগাগোড়া হিন্দু মন্দিরনগরীতে একে খুঁজে পাওয়াটাও বিশাল ব্যাপার।

এছাড়া কাঞ্চীর কারুক্কিনিল অমরনথবল (Karukkinil Amarnthaval) মন্দিরে আছে দুটি বুদ্ধ মূর্তি। মন্দিরটি পুরোনো, বুদ্ধ মূর্তি দুটি তার চেয়েও পুরোনো। দক্ষিণ ভারতে অনেক মন্দিরেই অনেক মূর্তি পাওয়া যায় যেগুলো মন্দিরের থেকে অনেক অনেক পুরোনো। মন্দিরের কিছুটা পল্লব কিছুটা চোল যুগের। বুদ্ধ দুটি প্রায় ষষ্ঠ শতকের। পল্লবদের আগের যুগের। একটি ভূমিস্পর্শ মুদ্রায়, অন‌্যটি ধ্যান মুদ্রায়। এছাড়া কাঞ্চীর শিবকাঞ্চী পুলিশ থানায় একটি দশম শতকের স্থানীয় বুদ্ধ মূর্তি রাখা আছে। কাঞ্চীতে প্রাপ্ত একটি দণ্ডায়মান বুদ্ধ মূর্তি রাখা আছে চেন্নাই মিউজিয়ামে। কাঞ্চীর একাম্বরেশ্বর শিব মন্দিরের দেয়ালে কিছু পাথরের ইঁটে ধ্যানমুদ্রায় বুদ্ধ বা জৈন মূর্তি দেখা যায়- হয়তো কোনো ভেঙে যাওয়া বিহার বা মন্দিরের দেয়াল থেকে সংগ্রহ করে তাদের পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে।

দক্ষিণ ভারতে বুদ্ধের বিস্তার তেলেঙ্গানা, কর্ণাটকের বল্লারী অঞ্চল ও উত্তর অন্ধ্র প্রদেশে এসে শেষ হয়ে যায়। কৃষ্ণা নদীর অববাহিকায় এসে যেন আচমকা বুদ্ধের যাত্রাপথ থেমে যায়। আরো দক্ষিণে যেন বুদ্ধ কখনোই ছিল না!

কিন্তু গত কয়েক দশকে হঠাৎ হঠাৎ করে পাওয়া কিছু কিছু বুদ্ধমূর্তি দেখিয়ে দিচ্ছে, বৌদ্ধ ধর্ম তামিলনাড়ুতেও ভালমতই ছিল। এটি আকস্মিকভাবেই শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মের পাশে চাপা পড়ে যায়, বা চাপা দিয়ে দেয়া হয়। তবু চাপা পড়ে যাওয়া অতীত মাঝে মাঝে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে!

 তামিলনাড়ুতে একসময় বৌদ্ধ ধর্মের ভালই বিস্তার ছিল। মায়ানমার আর সিংহলের বিভিন্ন বৌদ্ধ নথি থেকে তামিল বৌদ্ধ সংস্কৃতির কথা জানা যায়। নাগাপট্টিনমে অশোকের তৈরি বিহারের কথা মায়ানমারের নথিতে আছে। কাবেরীপট্টনমের আশেপাশে বৌদ্ধ বিহারের উপস্থিতির কথা মণিমেখলাই কাব্যে আছে, আর এই এলাকায়ই পল্লবনেশ্বরমে কিছু বৌদ্ধ বিহারের অবশেষ পাওয়া গেছে। চিনে যিনি কুংফু নিয়ে গিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়, সেই বোধিধর্মও তামিলনাড়ুর লোক।

তাহলে কোথায় গেল তামিল বৌদ্ধ ধর্ম? আর্কিওলোজিকাল রেকর্ড এত কম কেন? উত্তর হল, যে যুগ থেকে তামিলনাড়ুর আর্কিওলোজিকাল রেকর্ড বলিষ্ঠ হতে শুরু করেছে, সেই পল্লব যুগ থেকেই বৌদ্ধধর্ম এখানে সংকুচিত হতে থাকে। কিন্তু কেন? মনের মধ্যে এই প্রশ্ন নিয়েই ঐ স্কুলের মাঠ থেকে বেরিয়ে ঘরমুখো হলাম।

তথ্যসূত্র:

  • Hudson, D. Dennis, “The body of God : an emperor’s palace for Krishna in eighth-century Kanchipuram”, Oxford University Press, 2008
  • Dietmar Rothermund, “A History of India by Hermann Kulke”, ( 2016), page 86-
  • হিউয়েন সাঙের কাঞ্চীর বর্ণনার সূত্র
  • চেন্নাই গভর্নমেন্ট মিউজিয়ামের আরকিওলোজি বিভাগের ওয়েব পেজ: https//www.chennaimuseum.org
  • মন্দিরগুলির সাইনবোর্ড

মন্তব্য তালিকা - “ইতিহাসের শহর কাঞ্চীতে”