সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

প্রসঙ্গ ফ্যাসিবাদ: নেহেরু-সুভাষ মতদ্বৈধতা

প্রসঙ্গ ফ্যাসিবাদ: নেহেরু-সুভাষ মতদ্বৈধতা

শিবাশীষ বসু

মার্চ ২৩, ২০২৪ ১৮৬ 0

(এক)

১৯৩৫ সালের ২রা আগস্ট কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেস অধিবেশনে পেশ করা ‘যুক্তফ্রন্ট থিসিস’-এ প্রখ্যাত বুলগেরিয়ান কমিউনিস্ট নেতা জর্জি ডিমিট্রভ ‘দি ক্লাস ক্যারেক্টার অফ ফ্যাসিজম’ প্রবন্ধে জার্মান নাৎসিবাদকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন, “The most reactionary variety of fascism is the German type of fascism. It has the effrontery to call itself National Socialism, though it has nothing in common with socialism. German fascism is not only bourgeois nationalism, it is fiendish chauvinism. It is a government system of political gangsterism, a system of provocation and torture practised upon the working class and the revolutionary elements of the peasantry, the petty bourgeoisie and the intelligentsia. It is medieval barbarity and bestiality, it is unbridled aggression in relation to other nations.” (“সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ধরনের ফ্যাসিবাদ হল জার্মান ফ্যাসিবাদ। এর নিজেকে জাতীয় সমাজতন্ত্র বলে অভিহিত করার ধৃষ্টতা রয়েছে, যদিও সমাজতন্ত্রের সঙ্গে এর কোনওই মিল নেই। হিটলারের ফ্যাসিবাদ শুধুমাত্র বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ নয়, এ হল পাশবিক জাতিদম্ভ। এ হল রাজনৈতিক দস্যুতার এক শাসনব্যবস্থা, শ্রমিকশ্রেণি, কৃষক, পেটি-বুর্জোয়া ও বুদ্ধিজীবীদের বিপ্লবী অংশের বিরুদ্ধে প্ররোচনা ও নির্যাতনের ব্যবস্থা। এ হল মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও পাশবিকতা, অন্যান্য জাতিদের সম্পর্কে বল্গাহীন আক্রমণ।”)

অথচ এইসময় দেখা যায় ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবীমহলের একটা বড় অংশ ইতালির ফ্যাসিবাদ ও জার্মানির নাৎসিবাদের উপর সহানুভূতিশীল। বেনিতো মুসোলিনি এবং অ্যাডলফ হিটলার নূতন রাজনৈতিক অবতাররূপে রীতিমত পূজিত হচ্ছিলেন। অবশ্য এর মূলে ছিল ভারতবর্ষের পরাধীনতা এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে ভারতবাসীর স্বাভাবিক ক্ষোভ। ভারতের জাতীয়তাবাদী পত্রিকাগুলিতেও ফ্যাসিজমের ও নাৎসিজমের প্রচারকার্য চলছিল এবং কীভাবে তাঁরা নিজের নিজের দেশকে সঙ্ঘবদ্ধ, উন্নত ও শক্তিশালী করে তুলেছেন, সেইসব দৃষ্টান্ত দেখানো হতে লাগলো। গবেষক সুস্নাত দাশের মতে, “এমন কি গান্ধীজি, পণ্ডিত মালব্য, সুভাষচন্দ্র প্রভৃতি কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতারাও অনেকে ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণের আগে পর্যন্ত মুসোলিনী ও ফ্যাসিজমের প্রকৃত চরিত্ররূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হন নি।” কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতালীয় ভাষা সাহিত্যের অধ্যাপক প্রমথনাথ রায়, অধ্যাপক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখরা সেই সময় ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রকাঠামোর প্রশংসা করে একাধিক প্রবন্ধ লিখেছেন। মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় ‘ফ্যাসিজম এ্যান্ড দি নিউ জেনারেশন’ শীর্ষক প্রবন্ধে প্রমথনাথ রায় প্রশংসার ছলে বর্ণনা করলেন, কিভাবে ইতালির পরবর্তী প্রজন্মকে ফ্যাসিবাদে দীক্ষিত করবার জন্য ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে: “Fascism envisages its task as one of long duration, requiring a great moral transformation and a profound change of mentality. This is the reason of the fundamental importance given by Mussolini to the proper training of the new generation. The present generation, that is to say, the generation of the March on Rome, has engendered, as a result of the hard lesson of sacrifice learned during the war and in the fight against the degeneration of Italian society, an idealistic impulse and the vision of a higher ideal hut the effect of a long period of moral depression and materialism cannot be got rid of so easily The real burden of translating this higher ideal into actuality must fall upon the new generation, which must, therefore, be trained for that purpose This is also one of the justifications of the dictatorial government in Italy in this period of transition. … What is the training which the Fascist regime gives to the rising generation? It is not so much a training in the particular political creeds of Fascism, as an attempt to imbue Italian young men with that spirit of ‘work, discipline, disinterestedness, probity of life, loyalty, sincerity and courage’ the lack of which gives rise, in all ages, and in all climes, in private and public life, to the conditions out of which Fascism emerged In this respect Fascism has, as Mussolini says, a universal significance, particularly for those countries which were once great and are now trying to regenerate themselves.” ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড দি ফ্যাসিস্ট আইডিয়াল’ শিরোনামে সুনীতি চট্টোপাধ্যায় লিখলেন, “Mussolini and his followers claim to have done as much for the people of Italy. I do not know the exact situation now, but in 1922 when I was in Italy, as a passing sojourner, I could see that Fascism at that time was making for an orderly and all-embracing scheme of national progress, despite the opposition of some groups within the body-politic which shouted for Bolshevism and chalked on the walls Viva Lenin, an inscription which the Fascists would always score through and restore to Vive il Re. Some Italian friends whom I knew long and intimately in England, members of the middle class, who were in the army during the war, spoke to me about the measures that the Fascist Party were taking bettering the conditions of the masses.” ‘হের হিটলার ও নব্য জার্মানী’ এই শিরোনামে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হল: “যে শক্তিমান বীর নূতন পতাকা হস্তে ইউরোপের রাষ্ট্রক্ষেত্রে ভাগ্যবিধাতারূপে পুরোভাগে আসিয়া দাঁড়াইলেন তিনি হিটলার — সফলকাম নায়ক মুসোলিনীর শিষ্য, ফরাসি দুশ্চিন্তার স্থল এবং ইংরাজের উৎকণ্ঠার কারণ। … জার্মানীকে হীনতামুক্ত করিতে যদি তিনি কৃতকার্য হন, তাহা হইলে তিনি জার্মানীর রাষ্ট্রক্ষেত্রে এক মহৎকার্য করিয়া ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবেন সন্দেহ নেই।” ১৯৩৩ সালের ২৪শে নভেম্বর থেকে পাক্ষিক ‘দেশ’ পত্রিকাটি প্রকাশিত হতে আরম্ভ করে। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই ‘হিটলার ও জার্মানী’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখা হয়: “জার্মান জাতি যখন পরাজয়ের গ্লানি লইয়া অবসাদের অন্ধকারে দুঃসহ ব্যথা ভোগ করিতেছিল, সেই সময়ে আশা ও শক্তির বাণী লইয়া আবির্ভূত হইলেন হিটলার। … আজ তিনি জার্মানীর সর্বময় প্রভু — সমস্ত জাতির কাছে আজ তিনি ত্রাণকর্তারূপে প্রতিভাত হইতেছেন। … জার্মানীর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কম্যুনিস্টদের পরাজয় এবং হিটলারের এই আকস্মিক অভ্যুদয় — একটি সত্যের দিকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত করিতেছে। এই সত্যটি হইতেছে, যুগে যুগে মানুষের কাছে জন্মভূমির স্বাধীনতার দাবীই সর্বাপেক্ষা বড় হইয়া দেখা দিয়াছে। যতক্ষণ পর্যন্ত মাতৃভূমি অসম্মানের ধূলিতলে লুটাইতে থাকে ততক্ষণ মানুষ বিশ্ববিপ্লব, আন্তর্জাতিক মুক্তি ইত্যাদি বড় বড় কথা লইয়া মাথা ঘামাইতে ভালোবাসে না। হিটলারের কণ্ঠে জাতীয়তার বাণী দেশাত্ববোধের মন্ত্র। … হিটলার জাতির আশু জীবনমরণ সমস্যার সমাধান করিতে অগ্রসর। তাই আজ তিনি জার্মানীর মুকুটহীন রাজা।” স্পষ্টতই, উগ্র জাতীয়তাবোধ থেকেই এইসব রচনার উৎপত্তি। মনে রাখতে হবে, আমরা এমন একটা সময়ের কথা বলছি যখন ‘রয়টার’ কর্তৃক জার্মানিতে হাজার হাজার ইহুদি ও কমিউনিস্টদের নিধনের খবর, মানুষের মৌলিক অধিকার পদদলিত হওয়ার খবর এদেশেও প্রতিদিন প্রকাশিত হতে শুরু করেছে।

বস্তুতপক্ষে, সেই সময়কার ভারতবর্ষে হাতে গোনা তিন-চারজন চিন্তাবিদ ছাড়া (সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানবেন্দ্রনাথ রায় ও জওহরলাল নেহেরু) ইউরোপে ফ্যাসিজমের উত্থান, প্রসার ও ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না। এঁদের লেখাপত্র পড়লে বোঝা যায় যে, সভ্যতা ও মানবতার পরিপন্থী এই আদর্শটি ভবিষ্যতে কি রূপ নিতে পারে সেটা বিংশ শতকের তিনের দশকেই তাঁর‍া বুঝতে পেরেছিলেন। সত্যি কথা বলতে কি, এই ব্যতিক্রমী কয়েকজনকে বাদ দিলে ভারতবর্ষের বাকি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের (গান্ধীজী ও সুভাষচন্দ্র সহ) ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে ধারণা ছিল অত্যন্ত ভাসাভাসা, অস্পষ্ট। এমনকি জাতীয়তাবাদী মহলে তখন নবজাগ্রত ইতালির প্রাণপুরুষ হিসেবে মুসোলিনি-প্রশস্তিও মোটামুটিভাবে চালু ছিল। ফ্যাসিজমকে দেখা হত যুদ্ধবিদ্ধস্ত ইতালির নবজাগরণ রূপে। তার উপর ইতালি ও জার্মানির আদ্যন্ত ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাব এবং ভারতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের অবসানের আকাঙক্ষা — এই দুইয়ের যোগফলে তাঁরা ইউরোপের ফ্যাসিবাদকে দেখেছিলেন ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী আয়নায়। ফলে ফ্যাসিবাদের ভবিষ্যৎ চরিত্র কি ভয়ানক হতে পারে, তা তাঁরা অনুধাবন করতে পারেন নি। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলেন সুভাষচন্দ্র বসু, তিনি যে ফ্যাসিবাদের একজন মুগ্ধ প্রশংসক ছিলেন তার অজস্র প্রমাণ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাঁর লেখাপত্রে, বক্তৃতায় এবং তিনি মনে করতেন যে, আমেরিকা বা ইংল্যান্ডের মতো খোলামেলা গণতন্ত্র নয়, ভারতবাসীরা ষখন স্বাধীন ও স্বাবলম্বী হবেন তখন ভারতের সংহতি রক্ষা ও বিশৃঙ্খলা রোধের একমাত্র উপায় হিসেবে ইতালি বা জার্মানির মতো সামরিক শৃঙ্খলাযুক্ত শক্তিশালী একদলীয় গভর্নমেন্ট প্রয়োজন। যদিও ‘ইতালি বা জার্মানি’ শব্দদুটি তিনি সরাসরি উচ্চারণ করেননি।

(দুই)

১৯৩৫ সালের কথা। ইতালির ফ্যাসিজম ও জার্মানির নাৎসিজম তখন তাদের নখ-দাঁত হিংস্রভাবে দেখাতে আরম্ভ করেছে। এই ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘দি ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ গ্রন্থে সুভাষ মহাত্মা গান্ধীর ডাণ্ডি পদযাত্রার তুলনা মুসোলিনির রোম অভিযানের সঙ্গে করলেন — “… the march to Dandi was an event of historical importance which will rank on the same level with Napoleon’s march to Paris on his return from Elba or Mussolini’s march to Rome when he wanted to seize political power.”  প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, উপরোক্ত উভয়ক্ষেত্রেই পদযাত্রাকারীরা অর্থাৎ নেপোলিয়ন অথবা মুসোলিনি দুজনের কেউই সাধারণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকারী ছিলেন না, তাঁদের সঙ্গে আদৌ আমজনতা ছিল না; ছিল সুশিক্ষিত সৈন্যদল এবং মুসোলিনি আদৌ মার্চ করে রোমে আসেননি, এসেছিলেন ট্রেনে!

কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় কন্যা ইন্দিরাকে নেহেরু যে পত্রগুচ্ছ লিখেছিলেন তাতে ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট ধারণা ও তীব্র বিরোধিতার একাধিক নিদর্শন মেলে। ২১শে জুন ১৯৩৩, ‘মুসোলিনি অ্যান্ড ফ্যাসিজম ইন ইতালি’ পত্র-প্রবন্ধে তিনি লেখেন, “Fascism and communism, though violently opposed to each other, have some activities in common. But so far as principles and ideology are concerned there can be no greater contrast than between these two. For fascism, we have seen, has no basic principles; it starts off from a blank. Communism or Marxism, on the other hand, is an intricate economic theory and interpretation of history, which requires the hardest mental discipline.”। ২২শে জুন ১৯৩৩, কন্যা ইন্দিরাকে লিখিত ‘ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডিক্টেটরশিপস’ শীর্ষক পত্র-প্রবন্ধে নেহেরু লিখলেন, “As fascism has spread in other countries, it has become clear that it is not a peculiar Italian phenomenon, but that it is something which appears when certain social and economic conditions prevail in a country. Whenever the workers become powerful and actually threaten the capitalistic State, the capitalist class naturally tries to save itself. Usually such a threat from the workers comes in times of violent economic crisis. If the owning and ruling class cannot put down the workers in the ordinary democratic way by using the police and army, then it adopts the fascist method. This consists in creating a popular mass movement, with some slogans which appeal to the crowd, meant for the protection of the owning capitalist class. The backbone for this movement comes from the lower middle class, most of them suffering from unemployment, and many of the politically backward and unorganised workers and peasants are also attracted to it by the slogans and hopes of bettering their position. Such a movement is financially helped by the big bourgeoisie who hope to profit by it, and although it makes violence a creed and a daily practice, the capitalist government of the country tolerates it to a large extent because it fights the common enemy — socialist labour. As a party, and much more so if it becomes the government in a country, it destroys the workers’ organisations and terrorises all opponents. … Fascism thus appears when the class conflicts between an advancing socialism and an entrenched capitalism become bitter and critical.”।

এই কারণেই ১৯৩৩ সালের ১৮ই ডিসেম্বর সংবাদপত্রে প্রচারিত একটি বিবৃতিতে জওহরলাল নেহেরু স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন, আজকের পৃথিবীকে মূলত কমিউনিজম ও ফ্যাসিজমের মধ্যে একটি ধারা বেছে নিতে হবে কারণ এই দুটির মধ্যে কোনো মধ্যপথ নেই, এবং প্রথমটারই তিনি একান্ত সমর্থক। নেহেরু আরও জানিয়েছিলেন যে, ফ্যাসিবাদকে তিনি অত্যন্ত অপছন্দ করেন কারণ এটি হল পুঁজিবাদী সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এক স্থুল বর্বর প্রয়াস। “I do believe that fundamentally the choice before the world today is one between some form of Communism and some form of Fascism, and I am all for the former, that is Communism. I dislike Fascism intensely and indeed I do not think it is anything more than a crude and brutal effort of the present capitalist order to preserve itself at any cost. There is no middle road between Fascism and Communism. One has to choose between the two and I chose the Communist ideal. In regard to the methods and approach to this ideal, I may not agree with everything that the orthodox communists have done. I think that these methods will have to adapt themselves to changing conditions and may vary in different countries. But, I do think that the basic ideology of Communism and its scientific interpretation of history is sound.”

নেহেরুর এই বক্তব্যের সরাসরি বিরোধিতা ও সমালোচনা করে ‘দি ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ গ্রন্থে সুভাষচন্দ্র লিখেছিলেন — “The view expressed here is, according to the writer, fundamentally wrong. Unless we are at the end of the process of evolution or unless we deny evolution altogether, there is no reason to hold that our choice is restricted to two alternatives. Whether one believes in the Hegelian or in the Bergsonian or any other theory of evolution — in no case need we think that creation is at an end. Considering everything, one is inclined to hold that the next phase in world-history will produce a synthesis between Communism and Fascism. And will it be a surprise if that synthesis is produced in India?” (“লেখকের ধারণা উপরোক্ত মত মূলতই ভ্রান্ত। যতক্ষণ না আমরা বিবর্তন পদ্ধতির চরমে পৌঁছোই কিংবা তাকে একেবারে অস্বীকার করি ততক্ষণ এরূপ মনে করবার কোনও কারণ নেই যে দুটি বিকল্পের মধ্যেই আমাদের নির্বাচন সীমাবদ্ধ। হেগেল কিংবা বার্গসনের অথবা বিবর্তনের অন্য যে কোনও মতেই বিশ্বাস করি না কেন — কোনও ক্ষেত্রেই আমাদের ধারণা করে নেওয়া উচিত নয় যে সৃষ্টি চরম অবস্থায় পৌঁছে গেছে। সব কিছু বিবেচনা করে দেখলে এই মতই পোষণ করতে হয় ষে বিশ্ব-ইতিহাসের পরবর্তী পর্যায়ে কমিউনিজম ও ফ্যাসিবাদের মধ্যে একটা সমন্বয়ের সৃষ্টি হবে; এবং এ সমন্বয় যদি ভারতেই সৃষ্টি হয় তা হলে বিস্ময়ের কি আছে?”)

সুভাষচন্দ্র কেন এই দুই আদর্শের সমন্বয় চান তা-ও তিনি জানিয়েছিলেন ‘ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ গ্রন্থটিতে। “In spite of the antithesis between Communism and Fascism, there are certain traits common to both. Both Communism and Fascism believe in the supremacy of the State over the individual. Both denounce parliamentarian democracy. Both believe in party rule. Both believe in the dictatorship of the party and in the ruthless suppression of all dissenting minorities. Both believe in a planned industrial reorganisation of the country. These common traits will form the basis of the new synthesis.” এই বিশেষ মন্তব্যটির অনুবাদটিও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি: “কম্যুনিজম ও ফ্যাসিবাদের মধ্যে বৈষম্য আছে ঠিকই — কিন্তু এই দুই মতবাদেরই কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের মিল দেখা যায়। ব্যক্তির উপরে রাষ্ট্রের প্রাধান্যে এই দুইটি মতবাদই বিশ্বাস করে থাকে — দুইটিরই আস্থা সংসদীয় গণতন্ত্রের বদলে দলীয় শাসনে। দুইটিতেই দলের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও ভিন্ন মতাবলম্বী সংখ্যালঘুদের নির্মমভাবে উৎখাত করায় বিশ্বাস করা হয়ে থাকে। পরিকল্পনানুসারে দেশের শিল্প পুনর্গঠনে এই দুই মতবাদই বিশ্বাসী। এই সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোই হনে নতুন সমন্বয়ের ভিত্তি।” লিওনার্ডো গর্ডনের মতে, “When Bose referred to the accomplishments of fascism, he mentioned the efficiency of the fascist state in transforming a languid society into a dynamic one. The focus was on means, and on the role of the forceful leader. These few positive references to fascism do not specify any particular nation and tend to be vague and general, but it is likely to be with Italy in mind that Bose wrote.” মনে রাখতে হবে, এই বইটি (দি ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল) রচনাকালে সুভাষচন্দ্র ইতালি সফর করেছিলেন এবং তখনও পর্যন্ত পুরোপুরিভাবে সর্বভারতীয় নেতা না হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে সরকারি সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

এর বছর তিনেক আগে, ২৪শে সেপ্টেম্বর ১৯৩০, কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর ভাষণে সুভাষ বলেছিলেন, তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের পদচিহ্ন অনুসরণ করেই চলতে চান এবং “…if I may put his policy and programme in modern language, I would say that we have here in this policy and programme a synthesis of what Modern Europe calls Socialism and Fascism. We have here the justice, the equality, the love, which is the basis of Socialism and combined with that we have the efficiency and discipline of Fascism as it stands in Europe today.”

বস্তুত তাঁর ইউরোপীয় সফরের পূর্বেই, অর্থাৎ মুসোলিনি ও হিটলারের সঙ্গে পরিচয়ের অনেক আগে থেকেই তিনি ‘সুপারম্যান’ তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। শিশির কুমার বোস সম্পাদিত ‘সুভাষচন্দ্র সমগ্র রচনাবলী’র তৃতীয় খণ্ডের পৃষ্ঠা ২০৮ থেকে উদ্ধৃত করে ‘ফ্যাসিজম অ্যান্ড নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস (১৮৯৭-?)’ প্রবন্ধে গবেষক সৌম্য বোস জানিয়েছেন, “In his presidential address at Midnapur Youth Conference held on 29th December 1929, Subhas Bose emphasised that Nietzsche’s theory of ‘Superman’ was formulated for the welfare of human beings. If a nation had any idealism, its great men must dream of a ‘Superman’. The nation, which did not have idealism, could not alive and that nation could not be the owner of a greatest creation.”। বস্তুত সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, “বর্তমান যুগে কী প্রাচ্য, কী পাশ্চাত্যে আমরা Superman (অতিমানুষ)-এর কথা শুনিতে পাই। Superman-এর মতবাদ অনেকে উপহাস করিয়া উড়াইয়া দেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইহা উপহাস করিবার বিষয় নয় — কারণ ইহার মধ্যে একটা মহান সত্য নিহিত আছে। Superman-এর যে রূপ জার্মান দার্শনিক Nietzsche (নীটশে) দিয়াছেন অথবা ভারতের কোনো মনীষী দিবার চেষ্টা করিয়াছেন, তাহা আপনারা অখণ্ড সত্য বলিয়া গ্রহণ না করিতে পারেন — কিন্তু তাঁদের উদ্দেশ্য যে সাধু ও মানবজাতির পক্ষে কল্যাণকর এবং তাঁদের প্রচেষ্টা যে প্রশংসনীয় সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। যে জাতির শ্রেষ্ঠ মনীষীগণ Superman-এর (অতিমানুষের) স্বপ্ন দেখেন না — সে জাতির কি idealism বা আদর্শবাদ আছে? এবং যে জাতির আদর্শবাদ নাই সে জাতি কি জীবন্ত — সে জাতি কি মহত্তর সৃষ্টির অধিকারী হইতে পারে?” সুভাষচন্দ্রের ইউরোপ সফর এই বিষয়ে তাঁর বিশ্বাসকে আরও তীব্র করে তোলে। তাঁর সুদৃঢ় প্রত্যয় জন্মায় যে, ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ভারতের প্রয়োজন একজন শক্তিশালী সামরিক ধরনের নেতার। “Bose felt that in India’s struggle against the British, the people needed a strong, vigorous, military-type leader — perhaps even himself — and not a hesitant, confused, reformist guru. Showing admiration for strong leaders, among whom he listed Hitler, Stalin, Mussolini — and even Sir Stanley Jackson, a former governor of Bengal.” প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, জার্মান দার্শনিক ফ্রেডারিক নীৎসে-কে ফ্যাসিবাদ ও পরবর্তীকালের নাৎসিবাদের অন্যতম তাত্ত্বিক জনক বলে মনে করা হয়। আর এটাও মনে রাখবেন যে, প্রাক্তন ক্রিকেটার ও পরবর্তীকালে বাংলার গভর্নর জ্যাকসন সাহেবকে তাঁর অত্যাচারের জন্য বিপ্লবী বীণা দাস গুলি করে হত্যা করবার প্রচেষ্টা করেছিলেন।

(তিন)

এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী মহলে ফ্যাসিজমের প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে ১৯৩৩ সালের ডিসেম্বরে রোমে ‘ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউট’ স্থাপন করা হল। ২১শে ডিসেম্বর ১৯৩৩, সংস্থাটির উদ্বোধন করলেন মুসোলিনি, বক্তৃতার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন সুভাষচন্দ্রও। ডিসেম্বর ২২-২৮, রোমের ‘জুলিয়াস সিজার হল’-এ আয়োজিত ‘এশিয়াটিক স্টুডেন্টস কংগ্রেস’এর বিবরণ জানিয়ে সুভাষচন্দ্র মিসেস নাওমি সি ভেট্টারকে একটি চিঠি লিখেছিলেন ১২ই জানুয়ারি ১৯৩৪: “There was the Asiatic Students’ Congress from the 22nd to 28th December  —  attended by 600 Asiatic students from different centres in Europe. Travelling was free on the Italian Railways and free board and lodging was given in Rome for one week. Mussolini addressed the Congress on the 22nd December. The speech was a fine one — whatever we might think of the speaker. He said, ‘It is nonsense to say that East and West will never meet. Rome has in the past been the connecting link between Europe and Asia and she will be so once again. On this rapprochement depends the salvation of the world. Rome has in the past colonised Europe — but her relations with Asia have always been of a friendly kind, based on cooperation.”। ইতিমধ্যে ৬ই জানুয়ারি ও পরে ২৮শে এপ্রিল সুভাষচন্দ্র-মুসোলিনি সাক্ষাৎকার হয়েছে। পিতার অসুস্থতার কারণে ইউরোপ ছেড়ে চলে আসবার সময়ে সুভাষচন্দ্র মুসোলিনিকে একটি চিঠি লিখলেন; সেই চিঠির কারণে পরবর্তীকালে তিনি বহু সমালোচিত হয়েছিলেন। সুভাষ লিখেছিলেন: “Owing to the sudden illness of my father who is in a precarious condition, I have to fly back home at once. At the moment, I am passing through Roma on my way to India. I very much regret that owing to my sudden and unavoidable departure, I could not once more have the honour of calling on Your Excellency. I only hope that I shall be able to come back to Europe once again in order to finish my half-done task. I shall never forget the kindness I have received at Your Excellency’s hands — nor shall I ever forget the sympathy Your Excellency has shown for my unfortunate country. I carry home with me feelings of profound gratitude towards Your Excellency. I am sure Your Excellency will never forget that India expects much help and guidance from Your Excellency. It may be that Your Excellency is destined to play an important part in the liberation of my unfortunate country, as Your Excellency had already done in the case of Italy.”।

মাস দুই পরে সুভাষচন্দ্র পুনরায় ইউরোপে ফিরে গেলেন এবং ২৫শে জানুয়ারি ১৯৩৫, মুসোলিনির সঙ্গে আবার দেখা হল। এই সময়ে মুসোলিনির সঙ্গে পরপর তিনদিন আলোচনা হয়; সুভাষচন্দ্র মুসোলিনিকে তাঁর ভবিষ্যৎ কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করেন এবং তিনি যথেষ্ট প্রভাবিত হন। লিওনার্ডো গর্ডনের মতে, “Throughout the following years, Bose received positive support from Mussolini and no doubt found the attention — from someone whom he believed was among those in world politics who ‘really counted’ — most flattering. One has to remember that even a recent and most critical biographer of Mussolini has explained that Mussolini had a knack for charming visitors whom he saw infrequently. Then, too, from the few details that have filtered out, it appears that Bose felt that he was treated as an important leader of a significant nation struggling for its freedom, and also that Mussolini — in contrast to the Germans — treated him more as an equal and without racial condescension.” সম্ভবত এই কারণেই দেখা যায়, হিটলার তথা জার্মানির প্রতি একাধিকবার সমালোচনামূলক মন্তব্য করলেও মুসোলিনির প্রতি বরাবরই দোদুল্যমানতায় ভুগেছেন সুভাষ — “His ambivalence toward Mussolini was obvious.”

বস্তুত এইসব কারণেই, ১৯৩৪ সালের নভেম্বর মাসে লিখিত ‘ফ্যাসিজম’ গ্রন্থের ভূমিকায় সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর সুভাষচন্দ্রের তীব্র সমালোচনা করে লিখলেন, “কালে ভারতবর্ষীয় ন্যাশানালিস্টরা যে ফ্যাসিস্ট মূর্তিতে দেখা দেবে, তাতে সন্দেহ নেই। বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বড় আদরের নেতা সুভাষ বসু মুসোলিনীর প্রেমে গদ্গদ হয়ে মুসোলিনীকে এক সার্টিফিকেট দিয়েছেন। সুভাষ বসুর মতন লোকের মুসোলিনীকে সার্টিফিকেট দেওয়াটা যতই হাস্যকর হোক না কেন, আমাদের ভুললে চলবে না যে সুভাষ বসু অনেক দিন থেকেই ফ্যাসিস্ট নীতি অবলম্বন করে আসছেন। যে-বার কলকাতা কংগ্রেসের সময় শ্রমিকরা কংগ্রেসের সভায় উপস্থিত হয় সে-বার, ধাঙড়দের ধর্মঘটের সময়ে ও আরও অনেক ক্ষেত্রে বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের এই উপযুক্ত নেতাটি যে-মনোভাব ও কার্যপদ্ধতি দেখিয়েছিলেন, তাকে ফ্যাসিজমের পূর্বাভাস বলা যেতেই পারে। যেটুকু বাকি ছিল সেটুকু এবার ইয়োরোপে গিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।” বাস্তবিকই, মুসোলিনির সাথে তাঁর ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ ইতিমধ্যেই ফ্যাসিবাদের মহিমায় আচ্ছন্ন থাকা সুভাষচন্দ্রকে ফ্যাসিবাদের দিকে দ্বিগুণভাবে আকৃষ্ট করে — “In an interview in Italy, Bose declared how ‘greatly he was interested in fascism’, although to him fascism and ‘hot nationalism’, to use Bose’s own expression, were identical.”

আসলে পরাধীন ভারতবর্ষকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শক্তির শাসনমুক্ত করে স্বাধীনতা আনতে প্রয়োজন ছিল শৃংখলাপরায়ণ শক্তিশালী এক নেতৃত্বের — হিটলার ও মুসোলিনির মধ্যে সেই আইডলই খুঁজেছেন ভারতীয় চিন্তাবিদরা। সুগত বোসের মতে, “His (সুভাষচন্দ্রের) decision to engage with Mussolini was motivated not by romanticism or ideology, but rather by the pragmatic consideration that Mussolini was the leader of an important country with certain conflicts of interest with Britain in the Mediterranean.” ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের বর্বরতাকে সুভাষচন্দ্র সহ ভারতীয় নেতৃবৃন্দের অধিকাংশই উপেক্ষা করেছেন এই যুক্তিতেই।

(চার)

আমরা আরও চার বছর এগিয়ে যাই চলুন।  ১৯৩৮ সালে রজনী পাম দত্তের সহিত সাক্ষাৎকারের সময়ে সুভাষচন্দ্র স্বীকার করলেন যে, ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে তাঁর অবস্থান ভুল ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, রজনী পাম দত্তের সঙ্গে সুভাসচন্দ্র বোসের সাক্ষাৎকারের বিবরণটি ২৪শে জানুয়ারী ১৯৩৮, লণ্ডনের ‘ডেইলি ওয়ার্কার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই সাক্ষাৎকারে রজনী পাম দত্ত সুভাষচন্দ্রকে সরাসরি অভিযোগ করেন, ‘দি ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ গ্রন্থে ফ্যাসিজম সংক্রান্ত ওনার মন্তব্য এবং কম্যুনিজম সম্বন্ধে ওনার সমালোচনা নিয়ে অনেক বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়েছে — এই বিষয়ে ওনার বক্তব্য কি? সুভাষচন্দ্র স্বীকার করেন, “My political ideas have developed further since I wrote my book three years ago. What I really meant was that we in India wanted our national freedom, and having won it, we wanted to move in the direction of Socialism. This is what I meant when I referred to ‘a synthesis between Communism and Fascism’. Perhaps the expression I used was not a happy one. But I should like to point out that when I was writing the book, Fascism had not started on its imperialist expedition, and it appeared to me merely an aggressive form of nationalism. … I should point out also that Communism as it appeared to be demonstrated by many of those who were supposed to stand for it in India seemed to me anti-national, and this impression was further strengthened in view of the hostile attitude which several among them exhibited towards the Indian National Congress. It is clear, however, that the position today has fundamentally altered. … I should add that I have always understood and am quite satisfied that Communism, as it has been expressed in the writings of Marx and Lenin and in the official statements of policy of the Communist International, gives full support to the struggle for national independence and recognises this as an integral part of its world outlook.”

ওই বছরেরই ১৯শে ফেব্রুয়ারি হরিপুরা কংগ্রেসে প্রদত্ত সভাপতির ভাষণে তিনি ইতালি ও জাপানকে জঙ্গী, আক্রমণাত্মক ও সাম্রাজ্যবাদী বলে সমালোচনা করলেন। অবশ্য বছরখানেক আগেই, ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণের পর সুভাষচন্দ্র ইতালির সমালোচনা করে মডার্ন রিভিউ-এর পাতায় ‘দি সিক্রেট অফ আবিসিনিয়া অ্যান্ড ইটস লেসন’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন : “It is strange that Italy has been conducting a virulent and persistent campaign against the other imperialist powers hoping thereby to secure mitigation of the wrong that she is doing to Abyssinia.” দুই বছর পর ‘ইউরোপ: টুডে অ্যান্ড টুমরো’ প্রবন্ধে তিনি একে “… the rape of Abyssinia.” বলে ধিক্কার দেন। আর একটা ব্যাপার হল, নাৎসি জার্মানির দর্শন এবং হিটলারের প্রতি অবশ্য তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই ছিল সমালোচনামূলক; ২৫শে মার্চ ১৯৩৬, জার্মানির ডয়েচে অ্যাকাডেমির তৎকালীন পরিচালক ড. ফ্রাঞ্জ থিয়ারফেল্ডারকে তিনি লিখেছিলেন: “When I first visited Germany in 1933, I had hopes that the new German nation which had risen to a consciousness of its national strength and self-respect would instinctively feel a deep sympathy for other nations struggling in the same direction. Today, I regret that I have to return to India with the conviction that the new nationalism of Germany is not only narrow and selfish but arrogant.” অপরদিকে যদিও ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে জাপানি লড়াইকে তিনি সমর্থন করেছিলেন কিন্তু চীনের উপর তাদের সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের নিন্দা করে বার্লিনের চেক-জাত ইহুদি মিসেস কিট্টি কুর্তিকে সুভাষচন্দ্র লিখেছিলেন, “The Japanese, are, in my opinion the ‘British of the East’. The Chinese are of course much more likeable as a race, because they are human, kind and ethical.” জানিয়েছেন সৌম্য বোস, ‘ফ্যাসিজম এ্যান্ড নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস (১৮৯৭-?)’ প্রবন্ধে। 

(পাঁচ)

তাহলে শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? সব দেখেশুনে মনে হয়, সুভাষচন্দ্র হয়তো কমিউনিজম ও ফ্যাসিজম নিয়ে জানবার ও বোঝবার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি দুটি মতবাদের মধ্যেই ইতিবাচক কিছু খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি তাঁর মতো করে ভারতের মাটিতে ভারতের উপযুক্ত একটি দর্শন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যার মর্মবস্তু হল, তাঁর ভাষাতেই, ন্যায়, সাম্য ও প্রেমের পাশাপাশি দক্ষতা ও শৃংখলা। কিন্তু উভয় মতবাদের মিশ্রণ কি আদৌ সম্ভব? উভয়ের স্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করেছেন নেহেরু, ২২শে জুন ১৯৩৩, কন্যা ইন্দিরাকে লিখিত ‘ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডিক্টেটরশিপস’ শীর্ষক পত্র-প্রবন্ধে: “Fascism is intensely nationalistic, while communism is international. Fascism actually opposes internationalism. It makes of the State a god on whose altar individual freedom and rights must be sacrificed;” (“ফ্যাসিজম জাতীয়তাবাদের উগ্র উপাসক; কমিউনিজম আন্তর্জাতিক ঐক্যে বিশ্বাসী। ফ্যাসিজম বাস্তবিকই আন্তর্জাতিকতার বিরোধী। রাষ্ট্রকে বসিয়েছে দেবতার আসনে, সে দেবতার পূজাবেদীর সামনে ব্যক্তির সমস্ত স্বাধীনতাকে এবং অধিকারকে বলি দিতেই হবে;”)। 

প্রশ্ন আরও একটি। এই যে ইহুদি ও কমিউনিস্ট নিধন, বন্দিশিবিরের অবর্ণনীয় অত্যাচার — ইত্যাদির খবর নেতাজি একেবারেই জানতেন না, তা তো নয়। ১৯৩৯ সালের মার্চে ত্রিপুরী কংগ্রেস অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাবে ফ্যাসিস্ট হিটলারের সমালোচনা করে বলা হয়, “বিশ্ববাসী আজ সভয়ে লক্ষ্য করছে, নাৎসী সরকার ইহুদী জাতির বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে …”। কিন্তু তারও প্রায় মাস চারেক আগে ২০শে নভেম্বর ১৯৩৮, ‘দি জিউস’ শীর্ষক প্রবন্ধে ইহুদিদের গণহত্যা করবার দায়ে হিটলারকে অভিযুক্ত করে গান্ধিজি লিখেছিলেন: “But the German persecution of the Jews seems to have no parallel in history. The tyrants of old never went so mad as Hitler seems to have gone. And he is doing it with religious zeal. For he is propounding a new religion of exclusive and militant nationalism in the name of which any inhumanity becomes an act of humanity to be rewarded here and hereafter. The crime of an obviously mad but intrepid youth is being visited upon his whole race with unbelievable ferocity. If there ever could be a justifiable war in the name of and for humanity, a war against Germany, to prevent the wanton persecution of a whole race, would be completely justified. … But if there can be no war against Germany, even for such a crime as is being committed against the Jews, surely there can be no alliance with Germany. How can there be an alliance between a nation which claims to stand for justice and democracy and one which is the declared enemy of both? … Germany is showing to the world how efficiently violence can be worked when it is not hampered by any hypocrisy or weakness masquerading as humanitarianism. It is also showing how hideous, terrible and terrifying it looks in its nakedness shameless persecution?” প্রবন্ধটি ২৬শে নভেম্বর ‘হরিজন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এবং এই প্রবন্ধের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল — সম্ভবত এই প্রথমবার গান্ধিজি হিংসার বিরুদ্ধে হিংসাকে সমর্থন করেছিলেন।  

মনে রাখবেন, সুভাষচন্দ্র তখনও কংগ্রেস ছাড়েননি

গবেষক ভিটো স্যালিয়ার্নোর মতে সুভাষচন্দ্রের এই ফ্যাসিবাদের প্রতি মুগ্ধতার কারণে তিনি কংগ্রেসের অন্দরেও সমালোচিত হয়েছিলেন — “Bose’s propaganda campaign in favour of totalitarian regimes in Europe was condemned by a large part of the Indian Congress.”। আত্মজীবনীতে নেহেরু স্পষ্টভাবে লিখেছেন, “In 1938 the Congress sent a medical unit consisting of a number of doctors and necessary equipment and material to China. For several years this unit did good work there. When this was organized, Subhas Bose was president of the Congress. He [Bose] did not approve of any step being taken by the Congress which was anti-Japanese or anti-German or anti-Italian. And yet such was the feeling in the Congress and the country that he did not oppose [any] manifestations of Congress sympathy with China and the victims of fascist and nazi aggression. We passed many resolutions and organized many demonstrations of which he did not approve during the period of his presidentship, but he submitted to them without protest because he realized the strength of feeling behind them. There was a big difference in outlook between him and others in the Congress Executive, both in regard to foreign and internal matters, and this led to a break early in 1939.” অথচ এই ১৯৩৮ সালের আগস্ট মাসেই আমরা দেখছি,  চীনে জাপানি আক্রমণকে কড়া নিন্দা করে রবীন্দ্রনাথ এবং জওহরলাল ও সুভাষচন্দ্র সহ একাধিক কংগ্রেস নেতা বিবৃতি দেন এবং কংগ্রেসের উদ্যোগে চীনে একটি মেডিকেল মিশন পাঠানোর কথা স্থির করা হয়।

তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, সুভাষচন্দ্র নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট শক্তিজোটকে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, বিভিন্ন জাতির উপর তাদের অত্যাচারের ক্ষেত্রে চোখ বুজেও ছিলেন; কিন্তু ফ্যাসিবাদের কাছে তিনি কখনওই আত্মসমর্পণ করেন নি। প্রথমে কমিউনিস্ট রাশিয়ার কাছ থেকেই ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রামে সাহায্য পাওয়ার আশাতেই তিনি দেশ ত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু ততদিনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পট পরিবর্তন ঘটেছে — জার্মানি দ্বারা রাশিয়া আক্রান্ত হয়েছে; আমেরিকা, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সঙ্গে মিলে রাশিয়া মিত্রশক্তি জোট তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে। স্বভাবতই সুভাষচন্দ্র জার্মানি-ইতালি-জাপান পরিচালিত অক্ষ-শক্তিজোটের উপরেই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, কিন্ত রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি শব্দও কোনও দিন সুভাষচন্দ্র উচ্চারণ করেন নি, এমনকি ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। এই ব্যাপারে শেষ কথাটি বলে দিয়েছেন উত্তমচাঁদ, কাবুলে সুভাষচন্দ্রের আশ্রয়দাতা : “For forty-five days Bose Babu was with me and not once during this period did I hear one good word for the Axis from his lips. He hated them as much as the British. In Berlin he must have made another attempt to get to Russia through the Russian Embassy. But the declaration of the Russo-German War must have finally dashed his hopes of reaching Russia. He reached Berlin on March 28, 1941 and on June 22 the Russo-German War broke out.”

উত্তমচাঁদের কথা সত্যি হলে আপনাকে মেনে নিতেই হবে যে, সুভাষচন্দ্র তাঁর মতো করে লেসার ইভিল-কে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন গ্রেটার ইভিল-কে হারানোর জন্য। কিন্তু কালের বিচারে কোনটা গ্রেটার ইভিল — ইম্পিরিয়ালিজম, নাকি ফ্যাসিজম? উত্তরটা বরং পাঠক-পাঠিকারাই দিন।

তথ্যসূত্র:

১. জর্জি ডিমিট্রভ, ‘সিলেক্টেড ওয়ার্কস, দ্বিতীয় খণ্ড’।

২. রথীন চক্রবর্তী সম্পাদিত, ‘ফ্যাসি-বিরোধী সংগ্রাম ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম’

৩. সুস্নাত দাশ, ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামে অবিভক্ত বাংলা’।

৪. রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত, ‘দি মডার্ন রিভিউ, জুলাই ১৯৩১’।

৫. রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত, ‘দি মডার্ন রিভিউ, ফেব্রুয়ারি ১৯৩২’।

৬. শিশির কুমার বোস সম্পাদিত, ‘নেতাজি কালেক্টেড ওয়ার্কস দ্বিতীয় খণ্ড: দি ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’

৭. জওহরলাল নেহেরু, ‘গ্লিম্পসেস অফ ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’।

৮. শিশিরকুমার বসু সম্পাদিত, ‘সুভাষচন্দ্র বসু সমগ্র রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড’।

৯. লিওনার্ডো গর্ডন, ‘ব্রাদার্স এগেনস্ট দি রাজ’।

১০. শিশির কুমার বোস ও সুগত বোস সম্পাদিত, ‘নেতাজি কালেক্টেড ওয়ার্কস ষষ্ঠ খণ্ড: লিডার অফ দি ইউথ’।

১১. অঙ্কিতা রানাওয়াত সম্পাদিত, ‘এশিয়ান জার্নাল অফ মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ এ্যান্ড রিভিউ, ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০২১’।

১২. সুনীল দাস সম্পাদিত, ‘সুভাষ রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড’।

১২. শিশির কুমার বোস ও সুগত বোস সম্পাদিত, ‘নেতাজী কালেক্টেড ওয়ার্কস অষ্টম খণ্ড: লেটারস, আর্টিকলস, স্পিচেস এ্যান্ড স্টেটমেন্টস ১৯৩৩-১৯৩৭’।

১৩. ভিটো স্যালিয়ার্নো, ‘ফ্যাসিজম অ্যান্ড ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’।

১৪.  সুগত বোস, ‘হিজ ম্যাজেস্টিজ অপোনেন্ট: সুভাষ চন্দ্র বোস অ্যান্ড ইন্ডিয়া’স স্ট্রাগল এগেনস্ট এম্পায়ার’।

১৫.  সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ফ্যাসিজম’

১৬. বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, ‘সুভাষ চন্দ্র বোস অ্যান্ড মিডল ক্লাস র‍্যাডিক্যালিজম: এ স্টাডি ইন ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম ১৯২৮-১৯৪০’।

১৭. রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত, ‘দি মডার্ন রিভিউ, নভেম্বর ১৯৩৫’।

১৮. রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত, ‘দি মডার্ন রিভিউ, সেপ্টেম্বর ১৯৩৭’।

১৯. গিরিজা মুখার্জী, ‘বিল্ডার্স অফ মডার্ন ইন্ডিয়া: সুভাষ চন্দ্র বোস’।

২০. সুরেশচন্দ্র মজুমদার অনূদিত, ‘জওহরলাল নেহেরু: বিশ্ব-ইতিহাস প্রসঙ্গ’

২১. মৌলনা আবুল কালাম আজাদ, ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রীডম’।

২২. নবজীবন ট্রাস্ট সম্পাদিত, ‘দি কালেক্টেড ওয়ার্কস অফ মহাত্মা গান্ধী, খণ্ড ৬৮’।

২৩. জওহরলাল নেহেরু, ‘দি ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’।

২৪. দিলীপ কুমার রায়, ‘নেতাজী: দি ম্যান রেমিনিসেন্স’।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।