সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

গৌতম বুদ্ধের জন্মতারিখ – ঐতিহ্য, বিতর্ক ও প্রমাণ

গৌতম বুদ্ধের জন্মতারিখ – ঐতিহ্য, বিতর্ক ও প্রমাণ

জয়ন্ত ভট্টাচার্য

অক্টোবর ৩১, ২০২০ ৮৫৯ ১০

বৌদ্ধ সাহিত্যে বুদ্ধজন্মকথা:

“বোধায় জাতোঽস্মি জগদ্ধিতার্থমন্ত্যা ভবোৎপত্তিরিয়ং মমেতি।

চতুর্দিশং সিংহগতির্বিলোক্য বাণীং চ ভব্যার্থকরীমুবাচ।।”

– অশ্বঘোষের বুদ্ধচরিত, ১.১৫

[অনুবাদ: ‘আমি বোধির জন্য ও জগতের হিতকামনায় জন্মগ্রহণ করেছি, সংসারে এই আমার শেষ উৎপত্তি’, সিংহগতি বোধিসত্ত্ব চতুর্দিক নিরীক্ষণ করে এই ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করলেন।(রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুবাদ অবলম্বনে)]  

বৌদ্ধ সাহিত্যে বর্ণিত রাজা শুদ্ধোদনের রাণী মায়াদেবীর শাক্যরাজধানী কপিলাবস্তু থেকে মাতৃগৃহ কোলীয়রাজধানী দেবদহ যাত্রার পথে লুম্বিনীর কাননে একটি শাল (বা অশোক বা অশ্বত্থ) বৃক্ষের নীচে শাক্যমুনি অর্থাৎ গৌতম বুদ্ধকে জন্মদানের কাহিনী বহুপরিচিত। গৌতম বুদ্ধের জন্মকাহিনীর প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় পালি তিপিটকের সুত্তপিটকের অন্তর্গত দীঘনিকায়ের ‘মহাপদানসুত্ত’ (১৪.১.১৭) এবং মজ্ঝিমনিকায়ের ‘অচ্ছরিয়অব্ভুতসুত্ত’ (১২৩.২) অংশে। অবশ্য এই দুটি অংশের বর্ণনা শাক্যমুনি বুদ্ধের জন্মের নয়, যথাক্রমে, বিপস্সী বুদ্ধ ও সাধারণভাবে বোধিসত্ত্বের জন্মের বর্ণনা বলে উল্লিখিত। সংস্কৃত দীর্ঘাগমের ‘মহাবদানসূত্র’ বর্ণিত বিপশ্যী বুদ্ধের জন্মকথা পালি ‘মহাপদানসুত্তে’র সঙ্গে অভিন্ন। পরবর্তীকালে, সাধারণাব্দের প্রথম শতকে লেখা অশ্বঘোষের ‘বুদ্ধচরিত’ গ্রন্থে গৌতম বুদ্ধের জন্মের বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। সাধারণাব্দের তৃতীয় শতকে লেখা মহাযানী বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ‘ললিতবিস্তরে’র সপ্তম অধ্যায় জন্মপরিবর্তেও বুদ্ধের জন্মের দীর্ঘ বিবরণ রয়েছে। এরপর, সাধারণাব্দের চতুর্থ শতকে লেখা লোকোত্তরবাদী বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ‘মহাবস্তু’ ও পঞ্চম শতকে লেখা থেরবাদী বুদ্ধঘোষের ‘নিদানকথা’য় বুদ্ধের জন্মের বিবরণ পাওয়া যায়। গৌতম বুদ্ধ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বলে সর্বজনস্বীকৃত এবং লুম্বিনীর উদ্যানে (বা লুম্বিনী গ্রামে) তাঁর জন্মের ঘটনাও ঐতিহাসিক বলে স্বীকৃত। কিন্তু তাঁর জন্মের কাল আজও অত্যন্ত বিতর্কিত এবং অনিশ্চিত।   

গৌতম বুদ্ধের জন্মতারিখ  – ঐতিহ্য, বিতর্ক প্রমাণ:

গৌতম বুদ্ধ ঠিক কবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয় নি। শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস ও কাম্বোডিয়ায় ব্যবহৃত বুদ্ধাব্দ বা বুদ্ধনির্বাণাব্দের সূচনা গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের বছর থেকে। বৌদ্ধশাস্ত্র অনুযায়ী ঠিক ৮০ বছর বয়সে বৈশাখী পূর্ণিমার দিন গৌতম বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন। মিয়ানমারে অনুসৃত বৌদ্ধ পঞ্জিকা অনুযায়ী ঐ তারিখটি ছিল ১৩ মে, ৫৪৪ সাধারণপূর্বাব্দ (থাইল্যান্ডে অনুসৃত পঞ্জিকা অনুযায়ী ঐ তারিখ ১১ মার্চ, ৫৪৫ সাধারণপূর্বাব্দ)। এই পঞ্জিকা অনুযায়ী গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল ৬২৪ সাধারণপূর্বাব্দে। বর্তমানে সর্বসম্মত বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুযায়ী বুদ্ধের জন্ম ও পরিনির্বাণের কাল যথাক্রমে ৬২৩ সাধারণপূর্বাব্দ ও ৫৪৩ সাধারণপূর্বাব্দ। অধিকতর আধুনিক বিদ্বান এই পরম্পরাগত তারিখ মানতে রাজি নন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে এই বিষয় নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে এবং হচ্ছে। ১৯১২ সালে ভিলহেল্ম গাইগার, তাঁর সম্পাদিত ‘মহাবংস’ গ্রন্থের ভূমিকায়, ‘মহাবংস’ ও ‘দীপবংস’ গ্রন্থে প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে, গৌতম বুদ্ধের জন্ম ও পরিনির্বাণের কাল ৫৬৩ সাধারণপূর্বাব্দ ও ৪৮৩ সাধারণপূর্বাব্দ, এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। তাঁর এই মত পরবর্তীকালে অধিকাংশ আধুনিক বিদ্বানরা মেনে নিয়েছেন। ১৯৮৮ সালে বুদ্ধের জন্মতারিখ নিয়ে জার্মানির গোটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আলোচনাচক্র আয়োজিত হয়। এই আলোচনাচক্রে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ বিদ্বান অবশ্য বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ আনুমানিক ৪০০ সাধারণপূর্বাব্দের নিকটবর্তী কোন সময় হয়েছিল বলে মতপ্রকাশ করেন। আধুনিক বিদ্বানদের বুদ্ধের জন্মতারিখ নিয়ে সব সিদ্ধান্ত মূলতঃ লিখিত উৎসের (পাণ্ডুলিপি ও শিলালেখ) ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল। গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান নেপালের লুম্বিনীর মায়াদেবী মন্দির ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় উৎখননের কাজ বিংশ শতকে বিশেষ না হবার ফলে বুদ্ধের জন্মতারিখের ঐতিহাসিক সত্যতা নির্ণয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এখনো সেভাবে সংগৃহীত হয় নি।     

লুম্বিনী প্রত্নক্ষেত্রে প্রথম উৎখনন:

নেপালের বর্তমান লুম্বিনী অঞ্চলের অন্তর্গত রুপন্দেহী জিল্লায় অবস্থিত রুম্মিনদেই বা বর্তমান লুম্বিনী প্রত্নক্ষেত্র দীঘনিকায়ের মহাপরিনিব্বানসুত্তে (১৬.৫.৮) বর্ণিত চারটি বৌদ্ধ মহাস্থানের (তীর্থক্ষেত্র) অন্যতম (অন্য তিনটি উরুবেলা বা বোধগয়া, সারনাথ এবং কুশিনারা)। ‘দিব্যাবদান’ গ্রন্থে মৌর্য সম্রাট অশোক স্থবির উপগুপ্তের সঙ্গে লুম্বিনীতে এসেছিলেন বলে উল্লিখিত হয়েছে। আনুমানিক ৩৭০-৩৭৫ সাধারণাব্দের মধ্যে কোন এক সময় ইউয়েঝি (কুষাণ) বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ঝি সেংজাই লুম্বিনী দর্শন করতে আসেন। তাঁর লেখা গ্রন্থ ‘ওয়াইগুও-শি’ বর্তমানে লুপ্ত হলেও, তাঁর লুম্বিনীর বর্ণনা পরবর্তীকালের চীনা গ্রন্থ ‘শুইজিং-ঝু’-তে উদ্ধৃত হয়েছে। ঝি সেংজাই এখানে অশোকবৃক্ষের নীচে একটি মৌর্যকালীন বুদ্ধজন্মের ভাস্কর্য দেখেছিলেন (সম্ভবতঃ বর্তমানে বিদ্যমান গুপ্তকালীন ভাস্কর্যটি এরই অনুকৃতি)। এরপর, চীনা বৌদ্ধ পরিব্রাজক ফাজিয়ান (আনু. ৩৩৭-৪২২ সাধারণাব্দ) এবং জুয়ানজাং (আনু. ৬০২-৬৬৪ সাধারণাব্দ) এই বুদ্ধজন্মস্থানে এসেছিলেন এবং তাঁদের লিখিত লুম্বিনীর বর্ণনা এখনও বিদ্যমান। একাদশ শতকে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান লুম্বিনী দর্শনে আসেন। চতুর্দশ শতকে খস-মল্ল বংশীয় রাজা রিপুমল্লের (রাজত্বকাল ১৩১২-১৩ সাধারণাব্দ) লুম্বিনী আগমনের পর আর কোন তীর্থযাত্রীর এখানে আগমনের কোন তথ্য পাওয়া যায় নি। লুম্বিনী পাঁচ শতাব্দী বিস্মৃতির অন্তরালে বিলীন হয়।

ঊনবিংশ শতকের শেষে, ১ ডিসেম্বর, ১৮৯৬ সালে প্রথম জার্মান পুরাতত্ত্ববিদ আলয়জ আন্তন ফুহরার ও তৎকালীন পাল্পার প্রশাসক খড়্গ শমশের রাণা রুম্মিনদেই গ্রামে একটি টিলার খুব কাছে বেলেপাথরের তৈরি সম্রাট অশোকের একটি স্তম্ভ খুঁজে পান। এই স্তম্ভে লিখিত অশোকের শিলালেখ থেকে এই প্রত্নক্ষেত্রকে লুম্বিনী বলে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় (এই শিলালেখ আদৌ সম্রাট অশোকের কিনা এই বিষয়ে মতদ্বৈধ রয়েছে)। মাগধী প্রাকৃতে ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা এই শিলালেখ অনুযায়ী সম্রাট অশোক তাঁর রাজত্বকালের একবিংশ বর্ষে (২৪৯ সাধারণপূর্বাব্দে) লুম্বিনীতে শাক্যমুনি বুদ্ধের জন্মস্থানে উপনীত হয়ে তাঁর উপাসনা করে (পবিত্র শাল বা অশোক বৃক্ষের চারদিকে) একটি প্রস্তরের বেষ্টনী ও এই প্রস্তরস্তম্ভ নির্মাণ করেন। এই স্তম্ভটি বহু প্রাচীন কাল থেকে খাড়াখাড়িভাবে দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে গেছিল। চীনা বৌদ্ধ পরিব্রাজক জুয়ানজাং উল্লেখ করেছেন যে, তিনি স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে শুনেছেন বজ্রপাতের ফলে এই স্তম্ভটির এই অবস্থা হয়েছিল। এই অশোকস্তম্ভের শীর্ষভাগ এখনও খুঁজে পাওয়া যায় নি। জুয়ানজাং-এর বর্ণনা অনুযায়ী স্তম্ভশীর্ষে একটি অশ্বের প্রতিকৃতি ছিল। ১২ মার্চ, ১৮৯৯ সালে ভারতীয় পুরাতত্ত্ববিদ পূর্ণচন্দ্র মুখার্জী রুম্মিনদেই টিলার উৎখননের কাজ শুরু করেন। তিনি এখানে কারুকার্যময় ইটের তৈরি ‘সপ্তরথ’ স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত গুপ্তকালীন মায়াদেবী মন্দিরের অবশেষ খুঁজে পান। তিনি ১৮৯০ সালে এই টিলায় নির্মিত একটি ক্ষুদ্রাকার রুপাদেবী (মায়াদেবী) মন্দিরে রক্ষিত একটি ভগ্ন স্থাপত্যকর্মকে গুপ্তকালীন মথুরা শৈলীতে নির্মিত অশোকবৃক্ষের নীচে মায়াদেবীর গৌতম বুদ্ধকে জন্মদানের দৃশ্য বলে চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। তিনি এখানে বজ্রবারাহী দেবীর মূর্তির ভগ্নাবশেষ এবং আরও কয়েকটি বৌদ্ধ ভাস্কর্যের নিদর্শনের সন্ধান পান।   

বিংশ শতকে লুম্বিনী প্রত্নক্ষেত্র:

১৮৯৯ সালের উৎখননের পর দীর্ঘদিন যাবৎ আর কোন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান লুম্বিনীতে হয় নি। নেপালের সেনাপতি কায়সর শমশের রাণার নির্দেশে ১৯৩৩-১৯৩৯ সালে এখানে কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের কাজ হয়। কিন্তু, এই উৎখননের সময় বেশ কিছু পুরাতাত্ত্বিক অবশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৩৯ সালে কেসর শমশের রাণা ১৮৯৯ সালের উৎখননে প্রাপ্ত প্রাচীন মায়াদেবী মন্দিরের প্রত্নস্থলে একটি নতুন বৃহদাকার মায়াদেবী মন্দিরের নির্মাণ করে ঐ মন্দিরে বুদ্ধের জন্মকাহিনীর প্রাচীন ভাস্কর্যটিকে স্থাপন করেন এবং মন্দিরের নিকটবর্তী প্রাচীন শাক্যপুষ্করিণীর চারদিক আধুনিক উপকরণ দিয়ে বাঁধিয়ে দেন। কয়েকটি আলোকচিত্র ছাড়া এই উৎখননের কোন তথ্য সংরক্ষণ করা হয় নি। ১৯৬২ সালে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের তৎকালীন মহানির্দেশক দেবলা মিত্র লুম্বিনী পরিদর্শনের সময় অশোকস্তম্ভের পশ্চিমদিকে একটি ছোট খাত খুঁড়ে স্তম্ভের ভিত্তি সম্বন্ধে অধ্যয়ন করেন। তিনি দেখেন যে, পূর্ণচন্দ্র মুখার্জীর আবিষ্কৃত লুম্বিনীর বেশ কয়েকটি পুরাতাত্ত্বিক অবশেষ ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এমনকি, ১৯৫৭ সালে তাঁর নিজের দেখা ১৬টি ক্ষুদ্র স্তূপেরও আর কোন অস্তিত্ব নেই। তিনি লুম্বিনী ধর্মোদয় সমিতির এক ভিক্ষুর কাছে রক্ষিত ১৯৩৩-১৯৩৯ সালের উৎখননে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুগুলির একটি তালিকা প্রস্তুত করেন। ১৯৭০-এর দশকে নেপাল সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগ কেসর শমশের রাণার উৎখননের সময় ক্ষতিগ্রস্ত প্রাচীন স্তূপ, বিহার এবং আরও কয়েকটি পুরাতাত্ত্বিক অবশেষের সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়। ১৯৭৫-১৯৮৩ সাল পর্যন্ত বাবু কৃষ্ণ রিজল এবং এরপর ১৯৮৪-১৯৮৫ সালে তারা নন্দ মিশ্র মায়াদেবী মন্দির ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় উৎখনন চালিয়ে এই প্রত্নক্ষেত্রের উত্তর ভারতীয় কৃষ্ণ চিক্কণ মৃৎপাত্র কালপর্ব (আনু. চতুর্থ শতাব্দী সাধারণপূর্বাব্দ) থেকে খস-মল্ল কালপর্ব (নবম-চতুর্দশ শতক সাধারণাব্দ) পর্যন্ত ৬টি স্তরব্যাপী বস্তুগত সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা খুঁজে পান। তারা নন্দ মিশ্র এই উৎখননের মাধ্যমে মায়াদেবী মন্দিরের দক্ষিণে মৌর্যকালীন ইটের তৈরি একটি প্রাচীন বিহার খুঁজে পান। তিনিই প্রথম জানান যে, অশোকস্তম্ভটি একটি ইটের বেদীর উপর অবস্থিত প্রস্তরফলকের মধ্যে প্রোথিত রয়েছে। 

পূর্ণচন্দ্র মুখার্জীর উৎখননের প্রায় এক শতাব্দী পর, ১৯৯২-১৯৯৬ সালে, জাপান বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন ও লুম্বিনী ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে জাপানী পুরাতাত্ত্বিক সাতোরু উয়েসাকার নেতৃত্বাধীন একটি দল মায়াদেবী মন্দিরের অভ্যন্তরে উৎখনন চালায়। এই উৎখননে সাধারণাব্দের পূর্ববর্তী তৃতীয় শতকের মৌর্যকালীন একটি ইটের তৈরি মন্দিরের অবশেষ পাওয়া যায়। এই উৎখননের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে ইটের বেদীর সঙ্গে যুক্ত একটি ৭০সেমি×৪০সেমি×১০সেমি আকারের  প্রাকৃতিক শিলা, যা সম্ভবতঃ বুদ্ধের জন্মস্থান চিহ্নিত করার জন্য রাখা হয়েছিল। এই উৎখননের সময় একটি কুষাণকালীন সিদ্ধার্থের মহাভিনিষ্ক্রমণের দৃশ্য সম্বলিত টেরাকোটা স্থাপত্যকর্ম পাওয়া যায়। উৎখননে অশোকস্তম্ভের শীর্ষের কিছু ভগ্নাবশেষও উদ্ধার হয়। ১৯৯৭ সালে রাষ্ট্রসংঘ, লুম্বিনীকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান ঘোষণা করার পর, এই প্রত্নক্ষেত্রের সংরক্ষণের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে। ২০০২ সালে, মায়াদেবী মন্দিরে পূর্ববর্তী ১৯৯২-১৯৯৬ সালের উৎখননের এলাকার চারপাশে ইস্পাত ও ইট দিয়ে একটি কাঠামো নির্মিত হয়।

লুম্বিনী প্রত্নক্ষেত্রে সাম্প্রতিক উৎখনন:

২০১১-২০১৩ সালে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়, লুম্বিনী ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট ও নেপাল সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগের সম্মিলিত উদ্যোগে, ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ববিদ রবিন কনিংহাম ও নেপাল পুরাতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন মহানির্দেশক কোশপ্রসাদ আচার্যের নেতৃত্বে একটি দল মায়াদেবী মন্দিরের অভ্যন্তরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে মৌর্যকালীন স্তরের নীচে উৎখনন করে। এই উৎখননে প্রাক-মৌর্যকালীন স্তরের সন্ধান পর্যায়ের পাওয়া যায়। এই স্তরের প্রাচীনতম পর্যায়ে সাধারণাব্দের পূর্ববর্তী ত্রয়োদশ-দ্বাদশ শতকের তাম্রপ্রস্তর কালপর্ব থেকে সাধারণাব্দের পূর্ববর্তী ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত মানব বসতির সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর, মধ্যবর্তী পর্যায়ে, সাধারণাব্দের পূর্ববর্তী ষষ্ঠ শতকের মধ্যভাগে, প্রথম ধর্মীয় নির্মাণের জন্য মাটি ফেলে স্থানটিকে উঁচু করার ও মাটিতে সরলরেখায় কাঠের বা বাঁশের খুঁটি পোঁতার চিহ্ন পাওয়া যায়। রেডিওকার্বন পরীক্ষার দ্বারা এই নির্মাণের আনুমানিক কাল ৮০০-৫৪৭ সাধারণপূর্বাব্দ নির্ধারিত হয়েছে। এই চতুষ্কোণ অংশের ঠিক বাইরে প্রাপ্ত ভগ্ন মৃৎপাত্র ও কাঠকয়লার অবশেষ এই স্থানটির পবিত্রতার পরিচায়ক। এই প্রাচীনতম মন্দিরটি মাটি, বাঁশ ও কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। প্রাক-মৌর্যকালীন স্তরের অন্তিম পর্যায়ে এই পুণ্যস্থলের চারপাশের কাঠের বেষ্টনীর পরিবর্তে একটি ইটের বেষ্টনী নির্মাণের চিহ্ন পাওয়া যায়। এই উৎখননের ফলে জানা যায়, মৌর্যকালীন ইটের মন্দির এই ইটের বেষ্টনীকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়। এই মন্দিরের ছাদের জন্য ব্যবহৃত পোড়ামাটির টালির অংশ উৎখননে পাওয়া গেছে। পরবর্তীকালে মৌর্যকালীন মন্দিরের আরও সম্প্রসারণ করা হয় এবং সর্বশেষ ‘গুপ্ত’ কালপর্বে ‘সপ্তরথ’ স্থাপত্যরীতিতে বৃহদাকার ইটের মন্দির নির্মিত হয়।      

সাম্প্রতিক লুম্বিনী উৎখনন বুদ্ধের তারিখ:

রবিন কনিংহাম ও কোশপ্রসাদ আচার্যের এই সাম্প্রতিক উৎখননের ফলে জানা গেছে বুদ্ধের জন্মস্থান আনুমানিক সাধারণাব্দের পূর্ববর্তী ষষ্ঠ শতকের মধ্যভাগ থেকে পবিত্রস্থল হিসাবে পূজিত হচ্ছে। এই আবিষ্কার সম্ভবতঃ পরম্পরাগত বৌদ্ধ মত অনুযায়ী গৌতম বুদ্ধের সাধারণাব্দের পূর্ববর্তী সপ্তম শতকে শেষার্ধে জন্ম ও ষষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধে পরিনির্বাণের তারিখের ঐতিহাসিক সত্যতার প্রতি ইঙ্গিত করছে। তবে, শুধুমাত্র লুম্বিনী উৎখনন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বুদ্ধের তারিখ সম্পর্কে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া বোধহয় সঠিক হবে না।

তথ্যসূত্র:

১. Coningham, R.A.E., Acharya, K.P., Strickland, K.M., Davis, C.E., Manuel, M.J., Simpson, I.A., Gilliland, K., Tremblay, J., Kinnaird, T.C. and Sanderson, D.C.W. (2013). “The earliest Buddhist shrine: excavating the birthplace of the Buddha, Lumbini (Nepal)” in Antiquity Vol. 87, Issue 338 (December, 2013). Cambridge: Cambridge University Press. pp.1104-1123. 

২. Führer, A. (1897). Monograph on Buddha Sakyamuni’s Birthplace in Nepalese Tarai. Allahabad: The Government Press, N.W.P. and Oudh.

৩. Hirakawa, A. (1990). A History of Indian Buddhism: From Śākyamuni to Early Mahāyāna (tr. and ed. By P. Groner). Honolulu: University of Hawaii Press.

৪. Mishra, T.N. (1996). “The Archaeological Activities in Lumbini”. Ancient Nepal, 139, June,1996. Kathmandu: His Majesty’s Government, Department of Archaeology. pp.36-48. 

৫. Mitra, D. (1972). Excavations at Tilaura-Kot and Kodan and Explorations in the Nepalese Tarai. Calcutta: The Department of Archaeology, His Majesty’s Government of Nepal. pp.196-205.

৬. Mukherji, P.C. (1901). A Report on a Tour of Exploration of the Antiquities in Tarai, Nepal, The Region of Kapilavastu during February and March, 1899. No. XXVI, Part I of the Imperial Series. Calcutta: Office of the Superintendent of Government Printing, India.

৭. Petech, L. (1950). Northern India According to the Shui-Ching-Chu. Rome: Instituto Italiano Per Il Medio Ed Estremo Orinete. pp.34-36.

৮. Prasad R.G.N. (1986). “The Date of Buddha’s Mahāparinirvāṇa” in Annals of the Bhandarkar Oriental Research Institute, Vol. 67, No. ¼. pp.77-88.

৯. Prebish, C.S. (2008). “Cooking the Buddhist Books: The Implications of the New Dating of the Buddha for the History of Early Indian Buddhism” in Journal of Buddhist Ethics, 15, Annual 2008.

১০. Sircar, D.C. (1967). Inscriptions of Aśoka. Delhi: Publications Division, Ministry of Information and Broadcasting, Government of India. p.69.

১১. Smith, V.A. (1897). “The Birthplace of Gautama Buddha” in The Journal of the Royal Asiatic Society of Great Britain and Ireland, (July 1897). Cambridge: Cambridge University Press. pp.615-621.

১২. ঠাকুর, রথীন্দ্রনাথ (অনু.)(১৯৮৯).অশ্বঘোষের বুদ্ধচরিত. কলিকাতা: বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ.

১৩. Vaidya, P.L. (ed,)(1958). Lalitavistara. Darbhanga: The Mithila Institute of Post-Graduate Studies and research in Sanskrit Learning. 

১৪. Wiese, K. (ed.)(2013). The Sacred Garden of Lumbini: Perceptions of Buddha’s Birthplace. Paris: United Nations Educational, Scientific and Cultural Organization.

লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিবিদ্যার স্নাতক এবং বিগত তিন দশক ধরে বিমান প্রযুক্তিবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত। ইতিহাসের আগ্রহী পাঠক। ইতিহাস নিয়ে লেখালেখির সূত্রপাত সাম্প্রতিক।

মন্তব্য তালিকা - “গৌতম বুদ্ধের জন্মতারিখ – ঐতিহ্য, বিতর্ক ও প্রমাণ”

  1. লেখাটি খুব সুন্দর। তথ‍্য আর যুক্তির বিন‍্যাস যথেষ্ট শক্তিশালী। অশ্বঘোসের বুদ্ধচরিত প্রাচীন রচনা হলেও ভীষণ রকম ব্রাক্ষন‍্যবাদ ঘেসা রচনা।
    অন‍্য দিকে রিস্ ডেভিস বা ওল্ডেনবার্গের লেখা বুদ্ধের জীবনীগ্রন্থ গুলো আমার কাছে খুব প্রমান‍্য বলে মনে হয়।

    1. প্রথমত লেখাটি পড়া ও মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।
      অশ্বঘোষের রচনায় ব্রাহ্মণ্যবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিভাবে বুদ্ধ জীবনকথা পরিবর্তিত হয়েছে, সেই বিষয় নিয়ে আধুনিক বিদ্বানদের গবেষণার কথা সুবিদিত। এই নিয়ে নতুন করে আর কিছু বলার মত যোগ্যতা আমার নেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।