সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

এক অ্যানিমিয়ার ইতিহাস ও মন্দ জিনের উপাখ্যান

এক অ্যানিমিয়ার ইতিহাস ও মন্দ জিনের উপাখ্যান

জয়ন্ত দাস

ডিসেম্বর ৩১, ২০২০ ২৫৯
পর্ব ১

ওয়াল্টার ক্লেমেন্ট নোয়েল, আফ্রিকান বংশজাত যুবক। দাঁতের ডাক্তারি পড়তে গ্রেনাডা থেকে শিকাগো এসেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই নোয়েলের শারীরিক সমস্যা ছিল অনেক। ১৯০৪ সালে বছর কুড়ির নোয়েল শ্বাসকষ্ট-জনিত সমস্যা নিয়ে শিকাগোর প্রেসবাইটেরিয়ান হাসপাতালে ডা. জেমস হেরিকের অধীনে ভর্তি হলেন। তার দেখাশোনার ভার পেলেন একেবারে শিক্ষানবিশ এক যুবক ডাক্তার, আর্নেস্ট আয়রন। নোয়েলের রক্ত নিয়ে ডা. আয়রন তার অণুবীক্ষণে দেখলেন, রক্তের লোহিতকণিকাগুলো স্বাভাবিক বর্তুলাকার নয়, কেমন লম্বাটে। লোহিতকণিকাগুলোর এই ভিন্নতা দেখে সঙ্গে সঙ্গে ডা. জেমস হেরিকের সঙ্গে কথা বললেন ডা. আয়রন। 

একটি অজানা রোগকে আদ্যোপান্ত জানার শুরু সেখানেই। বছর কুড়ি চেষ্টার পর তার রোগের রহস্য প্রায় পুরোটাই ফাঁস করতে পারেন বিজ্ঞানীরা। নোয়েল অবশ্য ততদিন বাঁচেননি। 

রহস্যটা কী? লোহিতকণিকার ভিতরে আছে হিমোগ্লোবিন নামের এক প্রোটিন। নোয়েল এবং অনুরূপ কয়েকজন রোগীর কেস রিপোর্ট ঘেঁটে, আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একদিন বোঝা গেল, লম্বাটে ঐ লোহিতকণিকাগুলোর ভেতরের হিমোগ্লোবিন ঠিক স্বাভাবিক নয়। হিমোগ্লোবিন হল লোহিতকণিকার মূল অংশ। তার কাজ অক্সিজেন বহন করা। এই রোগে সেই হিমোগ্লোবিন অণুটি স্বাভাবিক বর্তুলাকারের বদলে লম্বাটে, চাষির হাতের কাস্তের মতো আকৃতির হয়ে যাচ্ছে। ফলে লোহিতকণিকা ফেটে যাচ্ছে, হচ্ছে ভয়ানক রকমের রক্তাল্পতা ও আরও নানা সমস্যা। ইংরাজিতে কাস্তের প্রতিশব্দ হল ‘সিকল’ (sickle)। তরুণ ডাক্তার আয়রন অণুবীক্ষণে ওরকম কাস্তের মতন লোহিতকণিকা দেখেছিলেন, আর তখন থেকে সেই শব্দটাই চালু হয়ে গিয়েছিল। তাই রোগটার নামকরণ করা হল সিকল সেল অ্যানিমিয়া—‘কাস্তে-কোষ রক্তাল্পতা’। [তথ্যসূত্র ১]

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে সিকল সেল অ্যানিমিয়া গবেষণা একটা মোড় ফেরানো ঘটনা। সিকল সেল অ্যানিমিয়াতে হিমোগ্লোবিন অণুর গঠনবৈশিষ্ট্য আবিষ্কারের কৃতিত্বের অন্যতম দাবিদার হলেন গত শতকের বিখ্যাততম রসায়নবিদ লিনাস পাউলিং। ১৯৫১ সালে পাউলিং বলেছিলেন ‘প্রথম আণবিক রোগ’ (দি ফার্স্ট মলিকুলার ডিজিজ) হল সিকল সেল অ্যানিমিয়া। তখনও পর্যন্ত একমাত্র এই রোগের কারণটি একদম আণবিক স্তর পর্যন্ত জানা গিয়েছিল। এর আগে হিমোগ্লোবিন অণুর গঠন জানা ছিল। পাউলিং ও অন্যান্যরা দেখান যে, সিকল সেল অ্যানিমিয়ায় হিমোগ্লোবিন অণুর মধ্যে বিশেষ একটি জায়গায় একটা অ্যামাইনো অ্যাসিডের বদলে অন্য আরেকটা অ্যামাইনো অ্যাসিড ভুলভাবে বসে যায়। তার ফলে হিমোগ্লোবিন অণুর চেহারা বদলে যায়। বিশেষত অক্সিজেন-বিহীন অবস্থায় হিমোগ্লোবিন অণু মোটামুটি বর্তুলাকার চেহারার বদলে কাস্তের আকার নেয়। এরপরে বিভিন্ন রোগের জন্য দায়ী নানারকম অণুর আণবিক স্তর পর্যন্ত গবেষণা করে রোগের কারণ বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সিকল সেল অ্যানিমিয়া এ ব্যাপারে ছিল একমেবাদ্বিতীয়ম।

স্বাভাবিক লোহিত রক্তকণিকার পাশাপাশি একটি সিকল সেল কণিকার ইলেকট্রিন মাইক্রোস্কোপে তোলা ছবি (চিত্রঋণ – উইকিপিডিয়া)

সিকল সেল অ্যানিমিয়া রোগের আণবিক গঠনগত কারণ ঠিক কী?

হিমোগ্লোবিনের একটি অংশ, যাকে বলে বিটা সাবইউনিট প্রোটিন, তা আর সমস্ত প্রোটিনের মতোই অ্যামাইনো অ্যাসিডের একটি শৃঙ্খল। একটার পর একটা অ্যামাইনো অ্যাসিড জুড়ে এই শৃঙ্খল তৈরি হয়। ঠিকঠাক শৃঙ্খল হলে প্রোটিন অণুটির গঠন কিন্তু লম্বা শেকলের মতো হবে না, চারটে শৃঙ্খল একসাথে মিলে মোটামুটি বর্তুলাকার এক গঠন হবে। সেটা লোহিতকণিকার মধ্যে সুন্দর ভাবে  থাকতে পারে ও অক্সিজেন বহন করতে পারে। লোহিতকণিকা খুব সূক্ষ্ম রক্তজালকের মধ্যে দিয়ে যায়, সেখানে কণিকাগুলো সামান্য ভাঁজ হয়ে বা খানিক দুমড়ে ঢুকতে পারে। স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তার আকৃতি পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। কিন্তু অক্সিজেন-বিহীন অবস্থায় সিকল বা কাস্তে আকৃতির হিমোগ্লোবিন তাতে বাধা দেয় ও লম্বাটে লোহিতকণিকা ক্ষুদ্র রক্তবাহী শিরা বা ধমনির মুখ রুদ্ধ করে দেয়। এতে রক্ত চলাচল আরও আটকে যায় এবং আশপাশের অন্য লোহিতকণিকার অক্সিজেন কমে গিয়ে রক্ত চলাচলে আরও বেশি বাধার সৃষ্টি করে। তাছাড়া কাস্তে-আকৃতির হিমোগ্লোবিন লোহিতকণিকা কোষটিকে ফাটিয়ে দেয়। এ দুটো ব্যাপার থেকেই সিকল সেল অ্যানিমিয়ার যাবতীয় উপসর্গ ও রোগলক্ষণ সৃষ্টি হয়।

সিকল সেল অ্যানিমিয়া যে বিশ্বের ‘প্রথম আণবিক রোগ’, লিনাস পাউলিং-এর এই কথাটার অর্থ বোধহয় এখন বোঝা যাচ্ছে। কেবলমাত্র হিমোগ্লোবিনের আণবিক গঠনবিকৃতি দিয়ে রোগটার সমস্ত লক্ষণ ও উপসর্গ ব্যাখ্যা করা সম্ভব। রসায়নবিদ্যার পরিভাষায় আণবিক গঠনবিকৃতিটি হল “হিমোগ্লোবিনের বিটা সাবইউনিটের ছয় নম্বর স্থানে গ্লুটামিক অ্যাসিড নামক অ্যামাইনো অ্যাসিডের বদলে ভ্যালিন নামের আরেকটি অ্যামাইনো অ্যাসিড বসে যাওয়া”—এর ফলে হিমোগ্লোবিনের আকৃতি বদলে যায় ও তার থেকে যাবতীয় রোগের উৎপত্তি হয়। ১৯৫১ সালে রসায়নবিদ লিনাস পাউলিং যা বলেছিলেন, তা এক অর্থে জীববিজ্ঞান বিষয়ে রসায়নবিদদের বহুদিনের স্বপ্ন। সে স্বপ্ন হল জীববিজ্ঞানকে রসায়নবিদ্যার অণু-পরমাণু দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা। সে ব্যাখ্যা না হয় এভাবে করা গেল। কিন্তু হঠাৎ করে হিমোগ্লোবিনে গ্লুটামিক অ্যাসিডের জায়গায় ভ্যালিন বসল কেন? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের আরও দু’বছর এগিয়ে যেতে হবে। ১৯৫১-র পরে ১৯৫৩ । লিনাস পাউলিং-এর পরে জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিক।

হিমোগ্লোবিনের মতো প্রোটিন অণুর গঠন জানা গেছে। কিন্তু শরীরে তা তৈরির প্রক্রিয়া কে নিয়ন্ত্রণ করছে? কার নির্দেশের গোলমালে প্রোটিনের গঠনবিকৃতি হচ্ছে? তাকে বানানোর নির্দেশাবলি মানবদেহে কোথায় লুকিয়ে আছে, আর কী করেই বা বংশ-পরম্পরায় প্রবাহিত হচ্ছে? এখন আমরা জানি, সেটা লুকিয়ে আছে মানুষের কোষের ক্রোমোজোমে অবস্থিত ডিএনএ অণুতে, অর্থাৎ জিন-এ। তাই হিমোগ্লোবিনে গ্লুটামিক অ্যাসিডের জায়গায় ভ্যালিন বসল কেন—এই প্রশ্নের উত্তর জানতে গেলে আমাদের জানতে হবে ডিএনএ আর জিন। জানতে হবে ১৯৫৩-তে ওয়াটসন, ক্রিক, রোজালিন্ড ফ্র্যাংকলিন ও মরিস উইলকিন্সের ডিএনএ-র ডাবল হেলিক্স গঠন আবিষ্কার কেমন করে বদলে দিল আমাদের জীববিদ্যা ও চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চাকে।

সে অন্বেষণে যাবার আগে বলি, লিনাস পাউলিং-এর মতো রসায়নবিদের স্বপ্ন জীববিজ্ঞানকে রসায়নবিদ্যার অণু-পরমাণু দিয়ে ব্যাখ্যা করা । তেমনই রসায়নবিদ্যা নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের বা বলা ভালো কিছু দিকপাল পদার্থবিজ্ঞানীর, একটি বহুকাল লালিত স্বপ্ন বা ধারণা আছে। সে ধারণা হল, রসায়নবিদ্যাকে পদার্থবিজ্ঞানের কণাবিদ্যা, বলবিদ্যা, ইলেকট্রিক চার্জ—এসব দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব । অর্থাৎ রসায়নবিদ্যা যেন চায় জীববিজ্ঞানকে তারই একটি অংশে পরিণত করতে, আর পদার্থবিজ্ঞান চায় রসায়নবিদ্যাকে পদার্থবিজ্ঞানের অংশে পরিণত করতে । লিনাস পাউলিংকে ডিএনএ গঠন আবিষ্কারের রেসে হারিয়ে দেওয়া ক্রিক-ওয়াটসন জুটির ওয়াটসনের উক্তিটি এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে—“বিজ্ঞান একটাই আছে—সেটার নাম পদার্থবিজ্ঞান। বাকি সব নেহাত সমাজসেবা ।” [তথ্যসূত্র ২]

পর্ব ২

সিকল সেল অ্যানিমিয়াতে হিমোগ্লোবিনের গঠনগত ত্রুটি থাকে তার জিনের গঠনের জন্য। “হিমোগ্লোবিনের বিটা সাবইউনিটের ছয় নম্বর স্থানে গ্লুটামিক অ্যাসিড নামক অ্যামাইনো অ্যাসিডের বদলে ভ্যালিন নামের আরেকটি অ্যামাইনো অ্যাসিড বসা”—এই অঘটন ঘটে, কেন-না হিমোগ্লোবিনের বিটা সাবইউনিট তৈরি করার সঙ্কেত বহন করে যে জিনটি, সেটি অতীতে কোনো একসময় মিউটেট করেছিল। সেই মিউটেট করা বা পরিবর্তিত জিনটি আছে আমাদের ১১ নম্বর ক্রোমোজোমে। জিনটি ভুল ধরনের হিমোগ্লোবিনের সঙ্কেত বহন করেছে বংশানুক্রমে, আর এইভাবে বংশগত রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। 

ম্যাপে সিকল সেল জিনের ভৌগোলিক বিন্যাস দেখানো হয়েছে। (চিত্রঋণ – উইকিপিডিয়া)

ইউরোপ বা এশিয়ার মানুষের তুলনায় আফ্রিকার মানুষের মধ্যে সিকল সেল মিউটেশন বেশি। আফ্রিকার কোনো কোনো অঞ্চলে এই মিউটেশনের হার শতকরা চল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত। এর মানে অবশ্য এই নয় যে চল্লিশ শতাংশ মানুষের সিকল সেল অ্যানিমিয়া রোগটি আছে। চল্লিশ শতাংশের মধ্যে অধিকাংশের দেহে এই মিউটেশন আছে জোড়া-জিনের এক কপিতে। সেটা নিয়ে এবার আমরা বিস্তৃত আলোচনা করব। [তথ্যসূত্র ৩] 

এটা শুনে বেশ অবাক লাগে। শতকরা চল্লিশ শতাংশ মানুষের মধ্যে রয়েছে এমন একটা মিউটেশন যার ফলে মানুষ শৈশব থেকে রোগে ভুগে ভুগে অল্প বয়সে মারা যাবার সম্ভাবনা আছে । এমন একটা ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য কী করে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার চালুনির মধ্যে দিয়ে টিকে থাকতে পারল? শুধু টিকে থাকা নয়, শতকরা চল্লিশ শতাংশ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারল? ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব যাঁদের জানা আছে, তারা এ প্রশ্ন তুলবেন ।

সিকল সেল অ্যানিমিয়া রোগী নেহাতই অভাগা। মানব-প্রজাতি নানা জন্মগত বা জেনেটিক ত্রুটি বহন করে চলেছে, এটা তারই উদাহরণ। কিন্তু সত্যিই কি তাই? সত্যিই কি সিকল সেল অ্যানিমিয়া কেবলই একটা ত্রুটিমাত্র? ‘খারাপ’ জিনের এক আদর্শ উদাহরণ?

বিগত শতকের মাঝামাঝি দক্ষিণ আফ্রিকার গবেষক এন্থনি ক্লিফোর্ড অ্যালিসন দেখান যে, সিকল সেল অ্যানিমিয়া রোগের জন্য দায়ী জিন-পরিবর্তন বা মিউটেশন আফ্রিকা মহাদেশের মানুষের মধ্যে প্রচুর আছে। কেবল এটুকু বললে অর্ধেক বলা হবে। আফ্রিকার যেসব অঞ্চলে ম্যালেরিয়া বেশি, সেখানে মানুষের মধ্যে সিকল সেল মিউটেশনের উপস্থিতি বেশি। অবশ্য অ্যালিসনের গবেষণার কয়েক বছর আগেই সিকল সেল অ্যানিমিয়া ও থ্যালাসেমিয়া আর ম্যালেরিয়ার মধ্যে এরকম একটা সম্পর্ক পাওয়া যাবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী জেবিএস হ্যালডেন। হ্যালডেন কেমন করে এমন একটা আন্দাজ করলেন? আর সেটা নিয়ে ঐতিহাসিকদের, বিশেষ করে মানুষের প্রাগিতিহাস নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা এত মাথা ঘামান কেন?

প্রথমে আমরা দেখি সিকল সেল অ্যানিমিয়া রোগটা কীভাবে তা বাবা-মায়ের থেকে সন্তানে প্রবাহিত হয়। সিকল সেল অ্যানিমিয়া রোগের কারণ হল আমাদের রক্তের লোহিতকণিকার হিমোগ্লোবিন অণুর বিকৃতি। রক্তের মূল কাজ অক্সিজেন বহন করে কোষে কোষে পৌঁছে দেওয়া, আর হিমোগ্লোবিন সেই কাজটাই করে। হিমোগ্লোবিন হল কয়েকটা প্রোটিন অণু আর লোহার সমাহারে তৈরি একটি বৃহৎ অণু। আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরি করার জন্য যে ক’টি প্রোটিন লাগে, আমাদের কোষের ক্রোমোজোমে তাদের প্রত্যেকটি তৈরির সংকেত বহন করে এক বা একাধিক জিন। এই জিনগুলি প্রতিটি একা থাকে না, জোড়ায় জোড়ায় থাকে। অর্থাৎ একটি প্রোটিন তৈরি করার জন্য যদি একটি জিন দরকার হয়, আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষ সেই জিনের একটা নয়, দুটো কপি আছে। এক কপি  জিন আসে মা’র কাছ থেকে, আরেক কপি আসে বাবার কাছ থেকে। অবশ্য এর ব্যতিক্রম আছে, সেটা নিয়ে আমাদের এখন চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।

সিকল সেল অ্যানিমিয়ার ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিনের একটি প্রোটিন তৈরি করার সংকেতবাহী একটি জিন মিউটেশনযুক্ত থাকে। আগেই দেখেছি, প্রত্যেক মানুষের শরীরে সেই জিনের দুটো কপি থাকে। দুটি কপিই যদি সিকল মিউটেশনযুক্ত হয়, তবে সেই মানুষের শরীরে সিকল সেল অ্যানিমিয়া রোগটি হবে। একটি জিন সিকল মিউটেশন-যুক্ত ও অন্যটি স্বাভাবিক হলে, তার এই রোগ হবে না। কিন্তু তার শরীরে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে—আসবে লোহিতকণিকার গঠনে সামান্য বদল। পরিবর্তিত কণিকাটি মানুষের প্রয়োজনীয় স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারবে, কিন্তু ম্যালেরিয়া রোগের পরজীবী প্রাণী তার মধ্যে টিকতে পারবে না। ম্যালেরিয়া রোগের কারণ হল এক ক্ষুদ্র পরজীবী প্রাণী। তাদের জীবনচক্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় কাটে মানুষের লোহিতকণিকার মধ্যে। সেটা এইসব মানুষের দেহে ঠিকভাবে ঘটতে পারে না। ফলে ম্যালেরিয়ার জীবাণু এদের শরীরে বংশবৃদ্ধি করে রোগ ঘটাতে তেমন পারে না।

যদি কোনো সন্তান তার মায়ের কাছ থেকে সিকল সেল মিউটেশনযুক্ত জিন পায়, আবার বাবার কাছ থেকেও ঐ একই মিউটেশনযুক্ত জিন পায়, তাহলে তার শরীরে সিকল সেল অ্যানিমিয়া হবে। কিন্তু বাবা কিংবা মা, এ দুজনের একজনের কাছ থেকে যদি মিউটেশনযুক্ত জিন বাচ্চার শরীরে যায়, তাহলে বাচ্চাটি অন্যজনের কাছ থেকে স্বাভাবিক জিন পাবে। স্বাভাবিক জিন এক কপি থাকলেই যথেষ্ট, তার শরীর সেই এক কপি জিন দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে পারবে। মিউটেশনযুক্ত জিন একটিমাত্র থাকলে সিকল সেল অ্যানিমিয়ার লক্ষণ তেমন দেখা যায় না। দুই কপি জিনই যদি মিউটেশন-যুক্ত থাকে, তাহলে শরীরে কেবল বেঠিক প্রোটিন-যুক্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি হবে। তার শরীরে সিকল সেল অ্যানিমিয়ার লক্ষণ পূর্ণমাত্রায় দেখা দেবে। তার শরীরে তৈরি হবে অন্যরকম হিমোগ্লোবিন, যার নাম ‘হিমোগ্লোবিন এস’। অক্সিজেনের অভাব হলেই সেটি অনেকটা কাস্তের মতো দেখতে হয়ে যায়। তখন লোহিতকণিকাটি ফেটে মরে যায়। আর এ থেকেই অ্যানিমিয়া ও অন্যান্য বিপত্তি ঘটে।                                                                                                                                                                                                                                            

এবার এক ‘হিমোগ্লোবিন এস’ মিউটেশনযুক্ত দম্পতির কথা ভাবি। ধরা যাক দম্পতির দুজনেরই এক কপি জিন ভালো, আরেক কপি জিন ‘হিমোগ্লোবিন এস’ মিউটেশন বহন করে। তাঁদের যদি চারটি সন্তান থাকে তাহলে গড়ের হিসেবে চারটির মধ্যে একটি বাবা-মা দুজনের কাছ থেকে মিউটেশনযুক্ত জিন পাবে এবং তার সিকল সেল অ্যানিমিয়া হবে। খুব সম্ভবত তার অল্পবয়সে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হবে এবং তার কোনো বংশধর থাকবে না। আর একজন সন্তান বাবা-মা দুজনের কাছ থেকে স্বাভাবিক জিন পাবে—তার নিজের শরীরে সিকল সেল রোগলক্ষণ দেখা দেবে না, বা তার সন্তানদের শরীরেও সে এই রোগ ছড়িয়ে দেবে না। বাকি দুজন সন্তান বাবা কিংবা মায়ের কাছ থেকে মিউটেশনযুক্ত জিন একটি পাবে, আর অন্যজনের কাছ থেকে স্বাভাবিক জিন পাবে। তাদের শরীরে রোগলক্ষণ থাকবে না। কিন্তু তারা ম্যালেরিয়া থেকে অনেকটা মুক্ত থাকবে—ম্যালেরিয়া রোগে মরার সম্ভাবনা তাদের নেই বললেই চলে। আবার বাবা মা’র দুজনের মধ্যে একজন যদি তাঁর এক কপি জিনে ‘হিমোগ্লোবিন এস’ মিউটেশন বহন করেন, তাহলে তাঁদের সন্তানদের কারো সিকল সেল অ্যানিমিয়া রোগটি হবে না, অথচ অর্ধেক সন্তানের এক কপি জিন ‘হিমোগ্লোবিন এস’ মিউটেশন থাকায় তারা ম্যালেরিয়া থেকে বেঁচে যাবে।

এবার সুদূর অতীতে প্রাগৈতিহাসিক কোনো পরিবেশে যদি ম্যালেরিয়াতে মরার সম্ভাবনা খুব বেশি হয়, তাহলে কী হবে? সেখানে কোনো এক সাধারণ দম্পতির বাচ্চাদের অর্ধেক বা তার বেশি অংশ যদি ছোটবেলাতেই ম্যালেরিয়া রোগে মরে যায়, তাহলে বাবা-মায়ের কাছ থেকে যে বাচ্চা সিকল সেল মিউটেশনযুক্ত জিন একটি কপি পাচ্ছে, সেই বাচ্চা ম্যালেরিয়া থেকে বেঁচে যাবে। তার বাঁচার উল্টোপিঠে তার ভাই বা বোনের যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু থাকতে পারে। কিন্তু যদি তার বাবা ও মা দুজনেই ঐ মিউটেশনযুক্ত জিন বহন করেন তবেই এমন দুর্ঘটনা ঘটবে। 

ম্যাপে ইতিহাসে ম্যালেরিয়ার ভৌগোলিক বিন্যাস দেখানো হয়েছে। (চিত্রঋণ – উইকিপিডিয়া)

কিন্তু এ কেবল তত্ত্বপ্রস্তাব বা হাইপোথেসিস। সত্যিই কি সুদূর অতীতে মানবের আদি আবির্ভাবস্থল আফ্রিকাতে ম্যালেরিয়ার এত উৎপাত ছিল? এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করবেন যোগ্যতর ঐতিহাসিকেরা, আমি কেবল গোড়ার কথাটা বলে যাই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ম্যালেরিয়া মোটামুটি এক লক্ষ বছর ধরে মানুষের সঙ্গে আছে। এখনও ম্যালেরিয়াতে বছরে দশ লক্ষ শিশু মারা যায়। বারবার অজস্র জনপদ উজাড় হয়েছে ম্যালেরিয়ার আক্রমণে।

ডিএনএ মিউটেশনের গবেষণা আজ দেখাচ্ছে, প্রাগৈতিহাসিক কালে আফ্রিকাতে হিমোগ্লোবিনের বিটা সাবইউনিটের সঙ্কেত বহনকারী ডিএনএ-র অন্তত চারবার আলাদা আলাদাভাবে মিউটেশন হয়েছিল। তার ফলে সুদূর অতীতেই চারটি বিটা-গ্লোবিউলিন হ্যাপ্লোটাইপ তৈরি হয়। উৎপত্তিস্থল অনুসারে এদের নাম হল বেনিন, সেনেগাল, ক্যামেরুন আর বান্টু (বা সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক)। শুধু তাই নয়, আফ্রিকার বাইরে আরেকটি মিউটেশনের ফলে আরেকটি বিটা-গ্লোবিউলিন হ্যাপ্লোটাইপ দেখা যায়—সেটির নাম আরব-ইন্ডিয়ান হ্যাপ্লোটাইপ। মধ্যভারতের জনজাতির মধ্যে এই হ্যাপ্লোটাইপটি পাওয়া যায় এবং এই অঞ্চলে কোনো কোনো জায়গায় চল্লিশ শতাংশ মানুষের মধ্যে তা দেখা যায়। পাঁচটি হ্যাপ্লোটাইপের অর্থ, অন্তত পাঁচবার এই মিউটেশনটি হয়ে এখনও টিকে আছে। যদিও এক-একটি হ্যাপ্লোটাইপে মিউটেশনটি ঘটেছে ডিএনএ-র আলাদা আলাদা জায়গায়, হিমোগ্লোবিন তৈরিতে এরা একই প্রভাব ফেলেছে। অর্থাৎ হ্যাপ্লোটাইপ যাই হোক, তার ফল হল একইরকম রোগ সৃষ্টি, একইরকম ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি এবং একই ভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মে বাহিত হবার ইতিহাস। [তথ্যসূত্র ৪] 

শেষ কথা

• ইতিহাসকে বুঝতে গেলে রোগের ইতিহাস আমাদের একটা বড় হাতিয়ার হতে পারে।

• কোনো জিন ভাল না মন্দ, তা বহনকারী মানুষের ক্ষতি করে নাকি উপকার করে, এ প্রশ্নের পরম উত্তর সবসময় ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ হয় না।

• জিন গবেষণা করে যেমন ইতিহাস, পরিযান ইত্যাদি বোঝা যায়, তেমনই অনেক সময় কোনো জিনের মিউটেশন তার উৎপত্তির সময়কার পরিবেশের ছাপ নিজের মধ্যে ধরে রাখে।

——————————————————————————–

তথ্যসূত্র :

    ১) Walter Clement Noel—First Patient Described With Sickle Cell Disease, Robert A. Kyle,  Marc A. Shampo. Mayo Clin Proc. 2010; 85(10): e74–e75.  https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2947974/

(১৯ জুলাই ২০২০ তারিখে ইন্টারনেটে দেখা)

    ২) https://en.wikiquote.org/wiki/James_D._Watson (There is only one science, physics: everything else is social work. (১৯ জুলাই ২০২০ তারিখে ইন্টারনেটে দেখা)

    ৩)  Sabeti, P. (2008) Natural selection: uncovering mechanisms of evolutionary adaptation to infectious disease. Nature Education 1(1):13. https://www.nature.com/scitable/topicpage/natural-selection-uncovering-mechanisms-   of-evolutionary-adaptation-34539/

( ১৯ জুলাই ২০২০ তে দেখা হয়েছে। অবশ্য ঐতিহাসিক কারণে আমেরিকার বাসিন্দা কালো মানুষ, যাঁদের পূর্বসূরিরা আফ্রিকার কোন অঞ্চল থেকে এসেছিলেন সেটা ভালভাবে জানা আছে, তাঁদের এইসব সমীক্ষায় বেশি সংখ্যায় নেওয়া হয়েছে।)

    ৪)  Sickle cell anemia : clinical diversity and beta S-globin haplotypes. Sandra Regina Loggetto. Rev Bras Hematol Hemoter. 2013; 35(3): 155–157.  https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3728122/

(১৯ জুলাই ২০২০ তে দেখা)

লেখক চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য-আন্দোলনের কর্মী, প্রাবন্ধিক।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।