সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

প্রাচীন যুগে ভারতে নাস্তিক্যবাদের চর্চা

প্রাচীন যুগে ভারতে নাস্তিক্যবাদের চর্চা

মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

জুন ৫, ২০২১ ২৯৩ ২১

ভারতে একসময়ে নাস্তিক্যবাদ চর্চা করা হয়েছে, তখন যুক্তিবাদ ক্রমাগত বিকশিত হয়েছে। সেই সময়ে এই দেশে এই নাস্তিক সম্প্রদায়গুলি শক্তিশালী ছিল।

২০১২ সালে ডিসেম্বর মাসে পিউ রিসার্চ সেন্টার বিশ্বব্যাপী ২৩০টি দেশে গবেষণা করে কিছু তথ্য প্রকাশ করে। ওই মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে প্রায় ১৬.৩% মানুষ কোন প্রচলিত ধর্মে আস্থা রাখেননি। এদের মধ্যে আছেন সেকুলার হিউম্যানিস্ট। এরা মনে করেন কোন ধরণের ঈশ্বরের সহায়তা ছাড়াই মানুষ নিজে ন্যায়পরায়ণ থাকতে পারে। আছেন ফ্রি থিঙ্কার, এরা সবরকম ধর্মমতকে ত্যাগ করেছেন। আছেন স্পিরিচুয়াল-রা। এরা সংগঠিত ধর্মে আস্থা রাখেন না তবে আধ্যাত্মিক উন্নতির পক্ষে। আর আছেন ধর্ম বিরোধীরা, এরা মনে করেন মানুষের ভালো থাকার জন্য কোন ধর্মের প্রয়োজন নেই।

পাশ্চাত্যের এই সব মতবাদ কিছু কিছু সেই প্রাচীন কাল থেকে আমাদের দেশেও চর্চা করা হয়েছে।

অধুনা নিয়মে নাস্তিক অর্থ নিরীশ্বরবাদী; প্রাচীন অর্থে নাস্তিক বলতে বোঝায় বেদবিরোধী। নাস্তিকের সংজ্ঞা ছিল, যে ঈশ্বরকে প্রামাণ্য বলে স্বীকার করে না এবং বেদকেও প্রামাণ্য হিসেবে স্বীকার করে না তিনিই নাস্তিক। উপনিষদে এর সাথে যে পরলোকে বিশ্বাস করেন না তাকেও নাস্তিক বলেছে।

কেউ যদি আত্মা বা পরলোকে বিশ্বাস করেন কিন্তু বেদে অবিশ্বাস করেন ভারতীয় আস্তিক দর্শন অনুযায়ী তিনি নাস্তিক। ঈশ্বর, পরলোক ও বেদ – এই তিন ছিল ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মূল তিন স্তম্ভ, এবং এর একটিতে বিশ্বাস হারালেই সে নাস্তিক। পরবর্তীকালে যারা যজ্ঞে অবিশ্বাসী তাদেরও নাস্তিক বলা হয়েছে। যজ্ঞ সংসার যাত্রার অঙ্গ, তাই যজ্ঞ বেদেরও অংশ।

তাই ব্রাহ্মণ্যবাদীর চোখে ১) লোকায়ত, ২) বৌদ্ধ, ৩) জৈন এই তিনটি দর্শনই নাস্তিক্যবাদ।

সংশয় কিন্তু ছিল বৈদিক যুগের প্রথম থেকেই থেকে। ভার্গব প্রশ্ন করেছেন, কে ইন্দ্রকে জন্মাতে দেখেছেন? মনে রাখতে হবে ইন্দ্রই যজ্ঞের মূল দেবতা। রামায়ণে জাবালি ছিলেন ব্রাহ্মণ, কিন্তু তবুও তিনি ব্রাহ্মণ্যবাদী ছিলেন না। যে যাজ্ঞবল্ক্য উপনিষদে গোমাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে যুক্তি সাজিয়েছেন, তিনিই আবার বলেছেন, ভালো গোমাংস পেলে আমি খাব। এত পরলোকের কথা বলার পরেও রাজার কাছ থেকে ধন ও গোধন নিতে ছিলেন যথেষ্ট ব্যকুল। সংশয় ছিল যজ্ঞফল নিয়েও, বিশেষত যজ্ঞের পরে ফললাভ না হলে সংশয় বাড়তো।

প্রাচীন ভারতের নাস্তিক্যবাদ নিয়ে বিস্তারিত লেখা কঠিন। প্রথমত লোকায়তিকদের বই আর পাওয়া যায় না। পাওয়া যাবে এমন সম্ভাবনাও কম। হয়তো বিপক্ষীয়রা তা ইচ্ছাকৃত ভাবে ধ্বংস করেছেন। তখনকার সমাজে নিন্দাসূচক শব্দ ছিল নাস্তিক। লোকায়ত মতবাদকে আক্রমণ করবার জন্য ব্রাহ্মণ্য দর্শনের গ্রন্থে লোকায়ত উদ্ধৃতি তুলে আক্রমণ করা হয়েছে। এই উদ্ধৃতিগুলিই যা সম্বল। অর্থাৎ বিরোধীদের বইয়ে তাদের পছন্দসই উদ্ধৃতির উপর ভিত্তি করে এই দর্শন সম্বন্ধে ধারণা করতে হয়। মনে রাখা দরকার বিপক্ষের উৎসাহ ছিল লোকায়তকে খণ্ডন করার দিকে – তার সম্প্রসারণে নয়।

মাধবাচার্য তার ‘সর্ব-দর্শন সংগ্রহে’ চার্বাক ও লোকায়ত নামে দার্শনিক মতবাদের কথা লিখেছেন। লোকায়তিকরা ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষ ছাড়া অন্য কোন জ্ঞানের সূত্র স্বীকার করেন না। এরা বেদ, পরলোক, পুনর্জন্ম – কিছুতে বিশ্বাসী ছিলেন না। আবার অনেকে আত্মাতেও বিশ্বাস করতেন না; এরা ছিলেন চার্বাকপন্থী। মাধব প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন সেকারণেই লোকায়তিকরা স্থূল ইন্দ্রিয়সুখ সর্বস্ব।

চার্বাক দার্শনিকরা এক সুপ্রাচীন বস্তুবাদী সম্প্রদায়। খুব সম্ভবত এরাই ভারতীয় দর্শনে প্রথম যুক্তিবিদ্যার প্রসার ঘটিয়েছিল। এরা শুধু বেদ ও যজ্ঞের বিরোধিতা করতেন না, সাথে আত্মা ও পরলোকেরও বিরোধী ছিলেন। নাস্তি যজ্ঞফলং নাস্তি পরলোক–যজ্ঞে ফল হয় না, পরলোক নেই।’ বৈদিক দার্শনিকরা এদের বলতেন পাষণ্ড, ঈশ্বরনাস্তিত্ববাদী।

চার্বাকপন্থীরা বিশ্বাসীদের বলেছেন বুদ্ধিপৌরুষহীন। অর্থাৎ কাপুরুষ। কারণ এরা চিন্তা করতে ভয় পায়, তাই অন্যে যা বোঝায় তাই মেনে নেয়।

এদের কিছু উদ্ধৃতি নিচে দিলাম-

১) ন স্বর্গো নাপবর্গো বা নৈবাত্মা পারলৌকিকঃ।

নৈব বর্ণাশ্রমাদীনাং ক্রিয়াশ্চ ফলদায়িকাঃ ।।

অর্থাৎ, স্বর্গ বলে কিছু নেই; অপবর্গ বা মুক্তি বলেও নেই, পরলোকগামী আত্মা বলেও নেই। বর্ণাশ্রম-বিহিত ক্রিয়াকর্ম নেহাতই নিষ্ফল।

২) পশুশ্চেন্নিহতঃ স্বর্গ জ্যোতিস্টোমে গমিষ্যতি।

স্থাপিতা যজমানেন তত্র কস্মান্ন হিংস্যতে ।।

অর্থাৎ, জ্যোতিস্টোম যজ্ঞে নিহত পশু যদি সরাসরি স্বর্গে যায়, তাহলে যজমান কেন নিজের পিতাকে হত্যা করে না? সোজা ভাষায় – স্বর্গে যাবার অমন সোজা সড়ক থাকতেও যজমান কেন নিজের পিতাকে তা থেকে বঞ্চিত করে?

৩) ততশ্চ জীবনোপায়ো ব্রাক্ষ্মণৈবির্হিতস্ত্বিহ।

মৃতানাং প্রেতাকার্যাণি ন ত্বন্যৎ বিদ্যতে ক্কচিৎ ।।

অর্থাৎ, ব্রাক্ষ্মণদের জীবিকা হিসেবেই মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধাদি প্রেতকার্য বিহিত হয়েছে। তাছাড়া এসবের আর কোনো উপযোগিতা নেই।

৪) মাংসানাং খাদনং তদ্বন্নিশাচর-সমীরিতম্।

অর্থাৎ, চোরেরাই (নিশাচর) মাংস খাবার মতলবে যজ্ঞ পশুবলির বিধান দিয়েছেন।

লোকায়ত দর্শন কবে লেখা হয়েছে?

অতি প্রাচীন সময় থেকে এদেশে নাস্তিক্য চিন্তার আভাস পাওয়া যায়। প্রাচীন অর্থশাস্ত্র, প্রাচীন বৌদ্ধশাস্ত্রে এর উল্লেখ দেখে এই অনুমান করা যেতে পারে যে অন্তত আড়াই হাজার বছর আগে থেকে এই মতবাদ ছিল। খ্রিস্টের জন্মের ৬০০ বছর আগে, অর্থাৎ বুদ্ধের জন্মেরও আগে থেকে ভারতীয়দের মধ্যে বিস্ময়কর মত বৈচিত্র্যের আবির্ভাব হয়েছিল।

বেদ ও যজ্ঞের ক্রিয়ায় আরও কিছু সম্প্রদায় অবিশ্বাসী ছিলেন। এদের মধ্যে প্রধান হোল নির্গ্রন্থ জ্ঞাতপুত্র প্রবর্তিত জৈন ধর্ম, গৌতম বুদ্ধের বৌদ্ধ ধর্ম ও মস্করি গোসাল প্রবর্তিত নিয়তিবাদী/আজীবিক সম্প্রদায়।

এসবের মধ্যে বৌদ্ধ গ্রন্থ অনেকটা পাওয়া যায়। ৪৮৩ সাধারণ পূর্বাব্দে ৮০ বছর বয়সে বুদ্ধ মারা যান। বুদ্ধ নিজে কোন গ্রন্থ রচনা করেননি, তিনি দর্শনচর্চার বিরোধী ছিলেন। তার বাণীর মূল কথা তার মৃত্যুর ১০০ বছরের মধ্যে লিপিবদ্ধ হয়।

মহাবোধি জাতকে বলা হয়েছে, ‘দান নেই, যজ্ঞ নেই, হোম নেই, ভালমন্দ কর্ম ফলের পরিণাম নেই, মাতা নেই, পিতা নেই, ইহলোক নেই, পরলোক নেই–৷’ এখানে প্রথমেই কর্মকাণ্ডকে অর্থাৎ যজ্ঞ, দক্ষিণা, ইত্যাদি যজ্ঞসংশ্লিষ্ট তথাকথিত পুণ্যকর্মকে অস্বীকার করা হয়েছে। এবং জীবনের অন্তে মানুষের স্বপ্ন যে পরলোক, তাকেও অস্বীকার করা হয়েছে।

যজ্ঞ সব কাম্যবস্তুর প্রতিশ্রুতি দেয়; সুখ, জয়, ধন, ঐশ্বৰ্য – তবে মানুষ ভোগ করবে তো শরীর দিয়েই! সেই শরীরের তিনটি বড় সংকট হল– ব্যাধি, জরা ও মৃত্যু — এগুলি নিবারণের কোনও বিধান বেদে নেই। তখনকার সমাজ জন্মান্তরে বিশ্বাস করত, অতএব জন্মান্তরেও মানুষকে এই তিনটি সংকটের সম্মুখীন হতে হবে! সংশয় জাগল সিদ্ধার্থের মনে; বেদের নির্দেশিত পথে যখন এই তিন মহাসংকটের জন্য কোনও প্রতিবিধান নেই, তখন বেদের পথে স্থায়ী সুখের পথনির্দেশও পাওয়া যাবে না। বুদ্ধের সংশয়ের প্রায় অনুরূপ সংশয় ছিল মহাবীরের, এবং সম্ভবত অন্য বেদবিরোধী মতের প্রবক্তাদেরও।

তবে এই বেদবিরোধী ধর্মমতগুলি, বৌদ্ধ, জৈন ও আজীবিক সম্প্রদায়, বৈদিক ধর্মের মত পুনর্জন্মকে স্বীকার করে নিয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে জীবন যতই মূল্যবান হোক, এই ঋণ-ব্যাধি-দারিদ্র্য-সংকুল জীবনের পুনরাবৃত্তি লোভনীয় নয়। ইহলোকে অধিকাংশ মানুষের সুখ নেই, সুখকর পরলোকের অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিশ্চয়তা নেই। এমন অবস্থায় পুনর্জন্মবাদ বলল, ইহলোকে আচরিতাৰ্থ বাসনা অনেক রইল, স্বৰ্গে গিয়ে পাবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই, পরজন্মে ওই সব অপূর্ণ বাসনা পূরণ কোর।

বৌদ্ধ ধর্মমত কিন্তু সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে না। এই মহাবিশ্ব এক কন্টিনুয়াম, আগে ছিল, এখনও আছে। কোন স্বর্গীয় মধ্যস্থতাকারী নেই। ঈশ্বর আছে কি নেই এই দ্বন্দ্ব কোনভাবেই ইহকালের কষ্ট দূর করতে পারবেনা।

ঈশ্বরো জগতো হেতুঃ বদ কস্তাবদীশ্বরঃ।

ভূতানি চেদ্ভবত্বেবং নামমাত্রেঽপি কিং শ্রমঃ।।

বল সেই ঈশ্বর কে?  পৃথিবীব্যাপী সমস্ত ভূত(পদার্থ)ই তো সমস্ত কিছুর কারণ বলে দেখা যায়। (হেতু ব্যতীত কার্য্য হয় না তা সত্যি, সেই হেতুই নাকি ঈশ্বর, ইশ্বরবাদীদের এই মত) সেই পদার্থই তো ঈশ্বর বলে মনে হয়, তা হলে ভিন্ন নাম নিয়ে অনর্থক শ্রম করছ কেন?- প্রজ্ঞাপারমিতা ১১৫।

জৈনরাও বেদ বা ঈশ্বর মানেন না। তাদের দর্শন জিন শব্দের মধ্যে আবর্তিত। যে রাগ, হিংসা জয় করেছে সে জিন। ওই ধর্মে চব্বিশ জন জিন আছেন ও শেষ জিন হলেন মহাবীর। সব প্রাণী জিনদের পন্থা অবলম্বন করে বন্ধন মুক্ত হতে পারেন। এই দর্শনের মূল কথা সাধারণ অবস্থায় আমরা যে ভাবে জগৎকে জানি, তাই সত্য। এই জগত বস্তু দিয়ে গঠিত, কোন পরমসত্তার কথা ভাবা নিরর্থক। জগৎ শাশ্বত। তবে জীবিত বস্তুতে আত্মা থাকে।

অহিংসা হল ধর্মের মূল কথা, তারা বিরোধী মতের ক্ষেত্রেও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন। তাদের তর্ক বিদ্যা সম্ভাবনায় শেষ হয়, কারণ কেউ পূর্ণ জ্ঞানী নন। প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশ মনে করেছেন, এই দর্শনেই প্রথম স্টাটিস্টিক্সের মূল সূত্রের আভাস পাওয়া যায়।

একই সাথে স্মরণ করুন ১০০ সাধারণ অব্দে অশ্বঘোষ রচিত বুদ্ধের জীবনী থেকে উদ্ধৃতি –

“The idea of God is proved false by rational argument, and all such contradictory assertions should be exposed.”

খুব সংক্ষিপ্তাকারে আমি ভারতীয় দর্শনের তিন মূল নাস্তিক ধারার – ১) লোকায়ত বা চার্বাক ও আজীবিক, ২) বৌদ্ধ ও ৩) জৈন দর্শনের পরিচয় দিলাম। এছাড়া আরও অনেক নাস্তিক দার্শনিক ছিলেন, তাদের লেখা আর পাওয়া যায় না, চার্বাক বা কেশকম্বলীর মতোই।

আস্তিক দার্শনিক কাশ্যপের লেখায় ৬০০ সাধারণ পূর্বাব্দের নাস্তিক পায়াসী সুতান্তর উদ্ধৃতি দিচ্ছেন নিজের বিশেষণ বসিয়ে; Now at that time there came over Payasi an ‘evil’ view of things, to this effect: “Neither is there any other world, nor are there beings reborn otherwise than from parents, nor is there fruit or results of deeds, well done or ill done.”

প্রথমেই এই মতবাদকে তিনি ‘ইভিল’ অর্থাৎ অশুভ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন। তবু একথা স্বীকার করতে হবে যে মধ্যযুগের আব্রাহামিক ধর্মমতের মত তখন এই দেশে নাস্তিকদের পুড়িয়ে মারা হত না।

দেখলাম, প্রাচীন ভারতে আস্তিক দর্শন বিকশিত হলেও সেখানে ন-আস্তিক (অর্থাৎ যারা না বলেছে ঈশ্বর, পরলোক ও বেদে) দর্শন কিছুটা প্রসারিত হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চীনে এই অষ্টাদশ শতকে জেসুইট ধর্ম প্রচারকরা আসার আগে সেভাবে ঈশ্বর ও পরলোকের ধারণা কোন দর্শনেই সুদৃঢ় ছিল না। বিভিন্ন দার্শনিকরা সেখানে অনৈসর্গিক অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেননি।

সেই সময়ে মানুষ তার জন্মগত ধর্ম নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে পরিবর্তন করতে পারত। এমনকি সে নাস্তিকও হতে পারত। যেহেতু পিতৃপুরুষ কোন নির্দিষ্ট কারণে বিশেষ এক ধর্ম অনুসারী হয়েছেন, উত্তরপুরুষকেও সেই ধর্ম বিনা প্রশ্নে মানতে হত না।

ভারতের প্রথম সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (৩২১ – ২৯৭ সাধারণ পূর্বাব্দ) ছিলেন ব্রাহ্মণ্য মতাবলম্বী। কিন্তু শেষ জীবনে সম্ভবত জৈন ধর্মে দীক্ষা নিয়ে সিংহাসন ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দাক্ষিণাত্যে। সেখানে, শ্রবণবেলগোলাতে আমৃত্যু কাটিয়েছেন জৈন তপস্বীর মত কঠোর সংযমে।

তার পুত্র বিন্দুসার (২৯৭ – ২৭৩ সাধারণ পূর্বাব্দ) প্রথম জীবনে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম অনুশীলন করতেন। পরবর্তীকালে তিনি আজীবিক অনুশাসন মেনে চলেছেন। আর তার পুত্র অশোক প্রথমে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম মতাবলম্বী ছিলেন, পরে বৌদ্ধ ধর্মে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

বিশেষ ভাবে দ্রষ্টব্য, এমনকি রাজাও গ্রহণ করতে পারতেন আজীবিকদের মতো বস্তুবাদী নাস্তিক্য ধর্ম। তাতে প্রজারা রাজদ্রোহী হত না। তার মানে এই নয় যে এই ধর্মমত ও দর্শনগুলির মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ ছিল না। যথেষ্ট ছিল, কিন্তু সাথে ছিল এই দর্শনগুলির বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক আন্দোলন। এই গতিশীলতার প্রভাব তাই শুধু ধর্মবিশ্বাসে নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরে পড়ত।

অশোকের বিভিন্ন শিলালিপিতে দেখা গেছে সংবেদনশীলতা। তিনি তখন বৌদ্ধ, কিন্তু বারে বারে সমস্ত ধর্মের প্রজাদের প্রতি তার দায়বদ্ধতা উল্লিখিত হয়েছে। তিনি তার ব্যক্তিগত ধর্মমত ও রাজকর্তব্যকে বিযুক্ত করেছিলেন।

এই সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং যৌক্তিক, দার্শনিক উপলব্ধি সমাজে এক অকপট পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়। আর এই পরিবেশে অজ্ঞেয়বাদ এমনকি নিরীশ্বরবাদও চর্চায় আসে।

অজিত কেশকম্বলীর ডকট্রিন অফ আনহিলিয়েশন বিশেষ ভাবে স্মর্তব্য:

Man is formed of the four elements. When he dies the earth returns and relapses to the earth, the fluid to the water, the heat to the fire, the air to the air, and his senses pass into space. The four bearers, on the bier as a fifth, take his dead body away; till they reach the burning ground, men utter forth eulogies, but there his bones are bleached….. When the body dies, both fool and wise alike, are cut off and perish. They do not survive after death.

মৌর্য শাসনের শেষের দিক থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রত্যাবর্তন করে, সমাজের এই গতিশীলতা কিছুটা হারিয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, মনুস্মৃতির সময় হলো ১০০ সাধারণ পূর্বাব্দ থেকে ২০০ সাধারণ অব্দের মধ্যে। এই সময়ে সামাজিক অনুশাসনগুলি হয়ে উঠল অনমনীয়। যে গতিশীল, ফ্লুইড সামাজিক বিন্যাস আগে ছিল, পরবর্তীকালে তীব্রতর পিতৃতান্ত্রিক মনুবাদ হয়ত তার প্রবল ও একতরফা উত্তর দিয়েছে। এই সময়েই বিভিন্ন বর্ণগুলির মধ্যে বিবাহও নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

পরে নতুন ভাবে নাস্তিক্যবাদী দর্শন ও তার সাথে যুক্ত আন্দোলন ভারতে সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি। মাত্র ঊনবিংশ শতকে আবার বিভিন্ন ইউরোপীয় দর্শনের হাত ধরে ভারতে নাস্তিক্যবাদ চর্চা শুরু হয়।

উল্লেখ করছি নবম শতকের জৈন দার্শনিক জীনসেনের উক্তি, কার্ল সেগান তার গ্রন্থ কসমসে এই উক্তিটি উল্লেখ করেছেন, –

“Some foolish men declare that a creator made the world. The doctrine that the world was created is ill-advised, and should be rejected. If god created the world, where was he before creation? If you say he was transcendent then, and needed no support, where is he now? ”

এই উক্তি প্রমাণ করে, পরবর্তীকালেও মানুষের মনে নিশ্চিত ভাবে সংশয় এসেছে, এমনকি নিরীশ্বরবাদের ভাবনাও এসেছে। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে সে ভাবনা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি ।

তথ্যসূত্র-

১) সুকুমারী ভট্টাচার্য, “বেদে সংশয় ও নাস্তিক্য, প্রবন্ধ সংগ্রহ,” ১ – ৪ খণ্ড, গাঙচিল, প্রথম সংস্করণ, (২০১২ – ২০১৪)

২) রামশরণ শর্মা, “প্রাচীন ভারতে শূদ্র,” কে পি বাগচী এন্ড কোম্পানি, প্রথম সংস্করণ (১৯৮৯)ভারতীয় দর্শন -দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

৩).দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, “লোকায়ত দর্শন,” নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ২০১৯

৪) দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, “ভারতীয়  দর্শন,” ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, ২০১২

৫) রোমিলা থাপার, “অশোক ও মৌর্যদের পতন,” কে পি বাগচী এন্ড কোম্পানি, ২০০০

৬) গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পাদক), নিরন্তর প্রকাশন ২০২০

৭) Amartya Sen, “The Argumentative India : Writings on Indian Culture, History and Identity, Penguin Books, 2005

৮) Nayanjot Lahiri, “Ashoka in Ancient India,” Permanent Black in association with Asoka University, 2019

৯) The Global Religious Landscape, Pew Research Centre, 18 December, 2012

লেখিকা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনীয়ারিং বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপিকা। প্রাবন্ধিক।

মন্তব্য তালিকা - “প্রাচীন যুগে ভারতে নাস্তিক্যবাদের চর্চা”

  1. এত জটিল ও বিস্তৃত বিষয়কে মধুশ্রী কি অনায়াসে দক্ষতায় আমাদের মত আগ্রহী সাধারণ পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন !! ধন্যবাদ।

    1. আমার অনেক কৌতূহল মিটে গেল । এই যে আপনি লিখেছেন মৌর্য্য সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদ আবার শক্তিশালী হল , মনুবাদ বাধ্যতামূলক হোল , অন্য বর্ণের মধ্যে বিবাহ বন্ধ করে দেওয়া হোল এগুলো আমার কাছে বিস্তৃত জ্ঞানের অভাবে শুধুমাত্র ধারণা ছিল , আপনার তত্ত্বমূলক লেখা তা বিশ্বাসে পরিণত করল । অনেক ধন্যবাদ । আরও আরও আরও চাই ।

  2. এত জটিল বিষয় এত সহজ করেও লেখা সম্ভব। ভীষণ ভালো ও মূল্যবান লেখাটি। পড়ে সমৃদ্ধ হলাম

  3. আপনার লেখায় বারবার সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ থাকে। বর্তমান লেখাটিও তেমনই একটি অসাধারণ লেখা। নাস্তিক শব্দটির অর্থ, চরিত্র, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ইত্যাদি নিয়ে সমৃদ্ধ হওয়ার মত একটি অনন্য রচনা এটি।

    এ বিষয় নিয়ে আমার মতকে ব্যক্ত করতে চাই। প্রথমত বলি, যেকোনো বহুল প্রচলিত শব্দ নানাভাবে ব্যবহার হয়। নাস্তিক শব্দটি তেমনই একটি শব্দ। দর্শনে ব্যবহৃত নাস্তিক এবং ধর্মে ব্যবহৃত নাস্তিক – এর মধ্যে পার্থক্য আছে বলেই মনে করি। আমরা এখানে ধর্মের নাস্তিকতা নিয়ে আলোচনা করবো না। করব দর্শনের নাস্তিক-আস্তিক পার্থক্য নিয়ে। আপনি যথার্থ বলেছেন আস্তিকদের তিনটি বৈশিষ্ট্য, ১) বেদে বিশ্বাস, আরো নির্দিষ্টভাবে বললে বেদের যাগ-যজ্ঞ এর ফলাফলের ওপর বিশ্বাস এবং এখানে উল্লেখিত দেবতাদের অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস অথবা ঈশ্বরে বিশ্বাস অথবা পরলোকে বিশ্বাস।

    এবং ঠিক এর বিপরীত হল নাস্তিক্যবাদ। স্বভাবতই বোঝা যাচ্ছে এটি একান্ত গোজামিল দেওয়া একটি সংজ্ঞা। কেন তা বলছি সে আলোচনায় পরে আসবো। তার আগে সুকুমারী ভট্টাচার্য এর গ্রন্থের কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা অত্যন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছি। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন সংশয়বাদ মাত্রেই নাস্তিকতা নয়। এর মাঝে তিনি একটি পর্যায় রেখেছেন, তা হল নিরীশ্বরবাদ। সংশয় থেকেই জন্ম নেয় নিরীশ্বরবাদের। এবং এরপর তর্ক ও আম্বীক্ষিরী ( যুক্তিবাদ) যুক্ত হলে তবেই তা নাস্তিকতায় পর্যবসিত হয়।

    এই অর্থে, ভারতবর্ষের যে 6t দর্শন কে আস্তিক বলে উল্লেখ করা হয়, বেদান্ত ছাড়া কোন দর্শনই সঠিক অর্থে আস্তিক নয়। তাই আমরা ভারতীয় দর্শন কে খুব মোটা দাগে আস্তিক এবং নাস্তিক এর যে বিভাজন করি তা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। আমার মতে এর ভাগ হওয়া উচিত ছিল ধর্মীয় দর্শন ( মনুসংহিতা), আত্মব্রহ্মদর্শন ( বেদান্ত) এবং আত্মদর্শন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে দর্শনের বিভাগ গুলি কে স্থূলভাবে নাস্তিক এবং আস্তিকএ বিভাজন খুব বেশি পুরোনো নয়। বরং আমরা যদি এর ঐতিহাসিক তাকে লক্ষ্য করি তবে একটি ভিন্ন চিত্র দেখতে পাবো।

    জৈন পণ্ডিত হরিভদ্র সূরি (আনু পঞ্চম শতক) তার ষড়দর্শন সমুচ্চয়ে যে ৬টি দর্শনের উল্লেখ করেন আস্তিক দর্শন হিসেবে সেগুলি হল – ১) বৌদ্ধ ২) ন্যায় ৩) সাংখ্য ৪) জৈন ৫) বৈশেষিক ও ৬) মীমাংসা।

    বৌদ্ধং নৈয়ায়িকং সাংখ্যং জৈনং বৈশেষিকং তথা।
    জৈমিনীয়ঞ্চ নামানি দর্শনানামূন্যহো।।
    এবমাস্তিকবাদানাং কৃতং সংক্ষেপকীর্ত্নম্‌।
    নৈয়ায়িকমতাদন্যে ভেদং বৈশাষিকৈঃ সহ।
    ন মন্যতে মতে তেষাং পঞ্চৈবাস্তিকবাদিনঃ।।

    হয়শীর্ষপঞ্চরাত্রে গৌতম, কণাদ, কপিল, পতঞ্জলি, জৈমিনি ও ব্যাসের দর্শনকে আস্তিক ষড়দর্শন বলা হয়েছে।

    গৌতমস্য কণাদস্য কপিলস্য পতঞ্জলেঃ।
    ব্যাসস্য জৈমিনেশ্চাপি দর্শনানি ষড়েব হি।।

    এমনকি আমরা যখন মাধবাচার্যের লেখা সর্বদর্শন সংগ্রহ দেখি, সেখানে মোট ১৬টি ভাগে তিনি লিখেছেন। এগুলি হল – ১) চার্বাক ২)বৌদ্ধ ৩) জৈন ৪) রামানুজ ৫) মাধ্ব ৬) পাশুপত ৭) শৈব 8) প্রত্যভিজ্ঞা ৯) রসেশ্বর ১০) বৈশেষিক ১১) ন্যায় ১২) পূর্বমীমাংসা ১৩) পাণিনীয় ১৪) সাংখ্য ১৫) যোগ ১৬) শাঙ্কর।

    উপরের আলোচনার মূল লক্ষ্য হল এটা বলা যে দর্শনের আজকের যে নাস্তিক আস্তিক বিভাজন, তা মেনে নিয়ে অতীত আলোচনায় যাওয়া কঠিন। কারণ কাকে নাস্তিক দর্শন বলব, এটাই সময়ে সময়ে পরিবর্তীত হয়েছে।

    স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনকে আস্তিক বলা হচ্ছে কেন? আর নাস্তিক কথাটির দর্শনগত অর্থ কী? পাণিনিসূত্র থেকে আমরা জানতে পারি, ‘অস্তি নাস্তি দিষ্টং মতিঃ’। অর্থাত এখানে প্রত্যক্ষকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

    পরলোকঃ অস্তীতি যস্য মতিরস্তি স আস্তিকঃ, তদ্‌বিপরিতৌ নাস্তিকঃ।

    এই সূত্র থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, প্রথম পর্যায়ে পরলোকে বিশ্বাস না করাকেই নাস্তিকতা বলা হত। তাহলে এই ক্ষেত্রে দার্শনিক বিশ্বাসের তুলনায় সাধারণের আবিশ্বাসকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মনে রাখা দরকার, বৌদ্ধ বা জৈন বা আজিবিকরা গৃহী ছিলেন না। ফলে তাদের পরলোক নিয়ে বিশেষ চিন্তা থাকার কথা নয়। গৃহীদের এই সংজ্ঞায় নির্দেশ করা হচ্ছে। কারণ সম্প্রদায় বহির্ভূত সন্ন্যাসীর তুলনায় একটি সম্প্রদায়ের সকলের পরলোকের অবিশ্বাস অনেকবেশি সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

    এই ধরণের উদাহরণ আরো কিছু দেওয়া যায়। সিদ্ধান্ত কৌমুদিতে বলা হয়েছে ‘অস্তি পরলোক ইত্যেবং মতির্যস্য স আস্তিকঃ। নাস্তিতী মতির্যস্য স নাস্তিকঃ।

    বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে কেবল নয় দর্শনেও পুনর্জন্ম, কর্ম ও কর্মফল মেনে নেওয়া হোয়েছে। নিশ্চিতভাবে এই সংজ্ঞাকে মান্যতা দিয়ে হরিভদ্র বৌদ্ধ ও জৈনকে আস্তিক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। হরিভদ্রের ব্যাখ্যা করেছেন গুণরত্ন সূরি – –

    আস্তিকবাদানাং জীবপরলোকপুণ্যপাপ্পাদ্যস্তিত্ববাদিনাং।
    বৌদ্ধ-নৈয়ায়িক-সাংখ্য-জৈন-বৈশেষিক-জৈমিনীয়ানাম্‌।।

    এখন কথা হল, যেমন কপিলের সাংখ্যতে ঈশ্বর স্বীকার করা হয়নি তেমনই জৈমিনির মীমাংসা দর্শনেও তাই। তাহলে এদের নাস্তিক দর্শন বলতে হয়। কিন্তু এদের কোনভাবে ধর্মে আত্তিকরণ সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বৌদ্ধ ও জৈনদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। তাই এদেরকে পৃথক করার চেষ্টা হয়। আমার বক্তব্যের প্রমাণ হিসেবে মনু সংহিতার উল্লেখ করতে চাই। এখানে নাস্তিক হিসেবে বেদনিন্দকদের বলা হচ্ছে। (নাস্তিক্যং বেদনিন্দাঞ্চ দেবতানাঞ্চ কুৎসন্‌ম। ৪/১৬৩ বা, ‘নাস্তিক্যে বেদনিন্দক’ ২/১১)

    এখন কথা হল বেদকে যদি শব্দ প্রমাণ হিসেবে ধরা হয় তাহলে বৈশেষিক মতে তা প্রামাণ্য নয়। এবার বৈশেষিকদের সীদ্ধান্তের বিবর্তন ও শব্দ প্রমাণের ঘুরিয়ে ব্যাখ্যা নিয়ে এখানে আলোচনার করা কঠিন। বরং ‘ভারতীয় ধর্মের ইতিহাস’ গ্রন্থে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য যে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন তা তুলে ধরছি।

    ‘১৮। নিরীশ্বরবাদ ও নাস্তিক

    আমরা আগেই দেখেছি ভারতীয় দর্শনিক চিন্তাধারা মূলত নিরীশ্বরবাদী। মীমাংসকদের নিরীশ্বরবাদ এবং তার স্বপক্ষে কুমারিলের যুক্তিসমূহের উল্লেখ আমরা পূর্বেই করেছি। সাংখ্য দর্শনও নিরীশ্বরবাদী যার মতে প্রমাণাভাবে ঈশ্বরের ধারণা অসিদ্ধ। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম ও দর্শনে ঈশ্বরের কোন স্থান নেই। বৌদ্ধ ও জৈন তাত্ত্বিকেরা অসংখ্য যুক্তি প্রমাণের দ্বারা ঈশ্বরের ধারণা খণ্ডন করেছেন। একমাত্র গৌম ও কণাদোত্তর ন্যায়-বৈশেষিকরাই ঈশ্বরকে যুক্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস পেয়েছিলেন।
    ভারতীয় ঐতিহ্যে নাস্তিক্য বলতে নিরীশ্বরবাদ বোঝায় না। একমাত্র বেদ বিরােধীদেরই নাস্তিক বলা হয়। মীমাংলা ও সাংখ্য ঈশ্বর মানে না, কিন্তু বেদ মানে, কাজেই তারা নাস্তিক নয়। বৌদ্ধ ও জৈনেরা বেদ মানেন না, কাজেই তাঁরা নাস্তিক। চার্বাক দর্শনের প্রবক্তারাও বেদ মানেন না, তাই তারাও নাস্তিক। মনু, বলেছেন, নাস্তিকে বদনিক ২ পাণিনির মতে ‘আছে এই মত যার সেই আস্তিক, ‘নেই’ এই মতি যার সে নাস্তিক- অস্তিনাস্তিদিষ্টং মতিঃ। পরবতীকালে বলা হয়েছে যে ওই অস্তিনাস্তি বােধটা পরলােক প্রভৃতি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়ােগ করতে হবে। ভট্টোজির মতে অস্তি পরলোক ইত্যেবং মতির্যস্য স আস্তিকঃ। নাস্তীতি মতির্যস্য স নাস্তিকঃ। আরও পরবর্তী কালে নাস্তিক শব্দটি পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন শৈবদের সম্পর্কে বলা হয়েছে লিঙ্গার্চন পরাঃ শৈবা নাস্তিকাঃ পরিকীর্তিতাঃ, অর্থাৎ লিঙ্গপূজক শৈবরা নাস্তিক।

    বেদ বিরােধীরা নাস্তিক ছাড়াও পাষণ্ড বা পাখণ্ড নামেও পরিচিত। পালনাচ্চ এয়ীধর্মঃ পা শব্দেন নিগদ্যতে। তং ষন্ডন্তি তে যস্মাৎ পাষণ্ডাস্তেন হেতুনা। অর্থাৎ পা বলতে বােঝায় বেদধর্ম, তাকে যে খণ্ড করে সেই পাষণ্ড। চার্বাক বা লােকায়তগণ পরলােকগামী আত্মার অস্তিত্ব, ঈশ্বরের অস্তিত্ব, বেদের প্রামাণ্য কিছুই স্বীকার করে না, তাই তারা পাষণ্ড। বেদ বিরােধিতার জন্য বৌদ্ধ ও জৈনগণও পাষণ্ড। বৌদ্ধ এবং জৈনরা আবার তাঁদের বিরুদ্ধবাদীদের পাষণ্ড বলেছেন। অর্থাৎ কালক্রমে পাষণ্ড শব্দটি দ্বারা বিধর্মী বুঝিয়েছে।’

    এই আলোচনা শেষ করবো এন্ড্রু নিকলসনের ‘ইউনিফাইং হিন্ধুইজম’ গ্রন্থটির কথা উল্লেখ করে। এই গ্রন্থে লেখক নবম অধ্যায়ে আলাদা করে আলোচনা করেছেন ভারতের আস্তিক ও নাস্তিক দর্শনের বিবর্তনকে নিয়ে। ষোড়শ শতক থেকে এর গুরুত্ব কি ছিল তার উপর আলোচনার একটি ক্ষুদ্র অংশ এখানে তুলে ধরছি আমার বক্তব্যের স্বপক্ষে। (পৃঃ ১০৮-১০৯)

    stika and nstika in the late medieval period

    Unlike Mādhava and Madhusūdana Sarasvatī, Vijñānabhiks˙u never attempted to write a doxography. Yet his systematic attempt to unify all āstika systems contains strategies for limiting and ranking the truths of various systems of philosophy that exhibit what might be called “doxographic concern.” The late medieval doxographies of the Advaita Vedāntins, structured
    in hierarchical fashion from the Cārvākas at the bottom to the Advaita Vedānta at the top, display an unresolved tension. The gradualist, hierarchical format of these texts conflicts with the binary āstika/nāstika distinction. In these texts, we see two diff erent strata of ordering principles.

    The hierarchical progression of schools appears in the sixth- century Man˙ imēkalai of Cāttanār and likely has its origins in earlier doxographical models. Although the āstika/nāstika distinction is probably even older, its origins are not in doxography but in Vedic ritualists’ concerns about normative behavior. Even though they heap scorn on the nāstikas (even
    associating them in the Prasthānabheda with foreign barbarians), the late medieval doxographies ultimately cannot justify the qualitative break between the highest of the nāstika schools (typically the Jainas) and the

    lowest of the āstikas. Attempts at justification for this break are sometimes based on the āstikas being “external to the Vedas” ( vedabāhya ). More typically, no explanation is given. By the sixteenth century, the term nāstika had become a frozen category denoting materialists, Buddhists, and Jainas. Authors avoid exploring the logic behind this distinction. But as Mādhava
    suggests, the Buddhist and Jaina doctrines are superior to the materialists and can be understood as the beginning of a dialectical process in which each lower doctrine is sublated by the next. Contrary to Madhusūdana’s assertion in the Prasthānabheda, then, some of the nāstika doctrines do serve a human end, as they act as preliminary stages on the way to the ultimate truth.

    Vijñānabhiks˙u’s project of the unification of āstika doctrinal systems holds out the possibility of resolving this conflict if it can illustrate why nāstika doctrines have no place in the human effort to reach ultimate truth and liberation. Vijñānabhiks˙u frequently deploys the terms āstika and nāstika in his writings, often at critical moments when he must distinguish between insiders and outsiders in his general scheme. The nāstikas he is most concerned with refuting are the Buddhists, especially the schools he calls Śūnyavāda (Madhyamaka, also known as the school of emptiness) and Vijñānavāda (Yogācāra, also known as Mind- only). His interest in the Vijñānavāda is especially interesting, since he associates the Buddhist school’s position of the illusory nature of the world ( māyāvāda ) with the school of the Advaita. Refuting one, he says, refutes the other. It is thisidentification between the Advaita Vedānta and a Buddhist school that allows him to vilify the Advaitins so thoroughly. If the Advaitins were real āstikas, logic would force Vijñānabhiks˙u to admit that their teachings possess some kind of preliminary value, like the Naiyāyikas. Advaita Vedānta is the only school that Vijñānabhiks˙u singles out as nāstikas masquerading as āstikas, an indication of his extreme antipathy toward that school. Vijñānabhiks˙u does not use the word āstika as often as nāstika, and he uses it mainly when acknowledging that despite appearances, all the āstika schools’ views can be reconciled and none lack authority when understood as limited to their proper scope of inquiry. In this way, Vijñānabhiks˙u tries to make sense of a very troubling passage from the Padma Purān˙ a that lumps numerous āstika systems in with the nāstikas, labeling them all as teachings of “darkness” ( tāmasa ), which by merely hearing this can destroy the wise. It makes sense that the Buddhists, Jainas, and Cārvākas are included in this list. But the inclusion of Sām˙ khya, Nyāya- Vaiśes˙ika, and Pūrva Mīmām˙ sā creates difficulties for Vijñānabhiks˙u’s project of unifying the āstika schools. In this regard, the Padma Purān˙ a ’ s presentation of schools is more reminiscent of the Vedāntins’ Śan˙kara and Bhāskara’s take- no- prisoners approach to the refutation of Sām˙ khya in the eighth century. In order to frame this quotation from the Padma Purān˙ a properly, Vijñānabhiks˙u declares,

    Or it may be that in order to impede the knowledge of those who are wicked, in certain parts of the believers’ systems ( āstikadarśana ), teachings have been set down that are contrary to scripture. These systems lack authority just in those parts. But on their main topics, which are not opposed to revealed scripture or traditional texts, they are authoritative. Only on this ground is the Padma Purāna justified in its criticism of all schools other than Vedānta and Yoga. (পৃঃ ১৭৯- ১৮১)

  4. খুব ভালো লাগল। অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার জন্য লেখককে ধন্যবাদ।

  5. গুরুতর জটিল বিষয়টিকে নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা বেশ ভালই, তবে একটু বিস্তৃত ও আরো তথ্য সমৃদ্ধ হলে খুব ভালো হতো।

    1. আরেকটু বিস্তৃত করতে ভরসা পাইনি। পরে আলাদা করে লিখবো। ধন্যবাদ নেবেন।

  6. আমি একজন দর্শন শিক্ষক, মধুশ্রী দেবীর লেখা পড়ে ভালো লাগলো। মনুবাদ প্রসারের পরও বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ভারতে ছিলো এমনকি বাংলাতেও ছিলো। পরবর্তীকালে বিদেশী শাসনের চাপে ভারতীয়রা ঈশ্বর নির্ভর হয়ে পড়ে।

    1. ধন্যবাদ নেবেন।
      মনুসংহিতা ও তারপর গুপ্ত যুগেই অবশ্য ভারতে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের দাপট শুরু হশ।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।