সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

আলাস্কার সাতরঙা ইতিহাস – পর্ব ৫

আলাস্কার সাতরঙা ইতিহাস – পর্ব ৫

ভাস্কর দাস

সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৩ ২১৬ 2

আঁধারে, একলা ঘরে ব্যারানভ

আলেকজান্ডার ব্যারানভ

লং শট – ভিউ ফাইন্ডারে কোডিয়াক দ্বীপের থ্রি-সেন্টস বে-র সমুদ্র, পাথরভরা তটভূমি। এই কোডিয়াকে শেলিকভের রাশিয়ান-আমেরিকান কোম্পানি পত্তন করেছে তাদের প্রথম স্থায়ী আস্তানা, আর তার প্রধান পরিচালকের পদে নিয়োগ করেছে ব্যারনভকে। জাহাজে করে এর বন্দরে এসে পৌঁছনর কথা তাঁর। কিন্তু দেখা গেল সমুদ্রের জলে ভাসছে একটা পলকা নৌকো। সীলমাছের চামড়ায় মোড়া নৌকোর ভগ্নপ্রায় দশা। শেষবারের মতো তাকে সৈকতে ভেড়ানোর চেষ্টা করছে দু’জন দাড়িওয়ালা লোক। দাঁড় চলছে কিছুটা যেন এলোমেলো হয়ে। পাকা মাঝির ছন্দোবদ্ধ চলন তাতে অনুপস্থিত।

মিড লং শট – মাঝিদের শরীরের জ্বলে যাওয়া রঙ, দাড়িতে আটকে থাকা সাদা নুনের কুচি সাক্ষ্য দিচ্ছে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার। নৌকোর চামড়ার আস্তরণ ছিঁড়ে বেড়িয়ে আসছে ভেঙে যাওয়া কাঠের খুঁটি আর পাটাতন। সমুদ্রের পারে এক কোডিয়াক আদিবাসী মানুষ একদৃষ্টে দেখে যাচ্ছে নৌকোর গতিবিধি। তার মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। নৌকো যদিও আস্তে আস্তে কাছেই আসছে।     

ক্লোজ শট – নৌকোর মেঝেতে দেখা যাচ্ছে এক শায়িত দেহ। জীবিত না মৃত বোঝা ভার। দাঁড়বাওয়া মাঝিদের মুখে আর দাঁড় চালানোর ভঙ্গিতে ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত।

এ পর্যন্ত দেখে আদিবাসী মানুষটি একবার উচ্চকন্ঠে ডাক ছাড়ল ‘আঘাই আঘাই’ – অর্থাৎ এসো এসো। তারপর তাদের সাহায্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে দৌড় লাগাল সঙ্গীদের ডাকতে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই মিলে দৌড়ে নামল জলে। টানতে টানতে ভাঙা নৌকোর সঙ্গে ভেঙে পড়া মানুষগুলোকে তুলে আনল তটভূমিতে। ততক্ষণে তাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন কালো আলখাল্লা পড়া স্থানীয় গির্জার যাজক মশাই। বছর দুয়েক আগে এঁকে রাশিয়া থেকে পাঠানো হয়েছে কোডিয়াকের অসভ্য(?) ‘অ্যালিউটিক’দের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করে মুক্তির সন্ধান দিতে।

সকলে নৌকোর মানুষদের উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে উঠল। মৃতপ্রায় মানুষটিকে পাড়ে এনে শোয়ানো হয়েছে। বাকিদের একে একে নামাতে নামাতে মানুষটি প্রথমে উঠে বসলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। ছোটখাট চেহারার মোটাসোটা মানুষটি এরপর হাত দিয়ে ঝেড়ে ফেললেন কোটে লেগে থাকা বালি, তারপর চকচকে টাকের ওপর হাত বুলিয়ে অবশিষ্ট কয়েকগাছি চুলকে পেতে আঁচড়াতে আঁচড়াতে যাজক মশাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। শেষে প্রায় ঘোষণার ভঙ্গিতে উচ্চারণ করলেন – ‘This is Aleksandr Baranov, chief manager Shelikhov–Golikhov Company, reporting for duty.’ দিনটা ২৭ জুন, ১৭৯১। উনালাস্কার কাসেগা বে থেকে শুরু হওয়া এক ভয়ঙ্কর সমুদ্রযাত্রার শেষ দিন। শুরুর দিনটা ছিল ২৫ এপ্রিল ১৭৯১ ।   

ভুল বললাম। শুরুটা ১৭৪৭-র রাশিয়ায় কারগোপল নামে ছোট্ট শহরতলির এক ছোট্ট বাড়িতে। বাড়ির মালিক এক নিতান্তই অসচ্ছল ব্যবসায়ী আঁদ্রে ব্যারানভ, সামাজিক কাঠামোয় যার স্থান বেশ নীচের দিকে। এপ্রিলের ১৬ তারিখে সেখানে জন্ম নিল পরিবারের প্রথম সন্তান, নাম রাখা হল আলেকজান্ডার আঁদ্রেয়াভিচ ব্যারানভ। দরিদ্র পরিবারে কোন প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ মিলল না। অন্যের দয়ায় দিনাতিপাত চলল ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত। শেষে কারগোপল থেকে মস্কো পলায়ন – এক জার্মান প্রতিষ্ঠানে হিসেবের খাতা লেখার কাজ আর জার্মান ভাষা দুটোই শেখা হল। আবার ফিরলেন নিজের শহরে। বিয়ে করলেন। এক কন্যাসন্তানের পিতা হলেন। যদিও এই কন্যাসন্তান তাঁর ঔরসজাত না দত্তক নেওয়া সে বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে। 

১৭৮০ (বা তার অল্প কিছুদিন আগে) – ভাগ্যান্বেষণে তিনি চলে গেলেন ইরখুস্ক শহরে। পূর্ব সাইবেরিয়ার এই শহরে বিচিত্র বিপরীতধর্মী পেশায় যুক্ত হয়ে পড়লেন। জার্মান ভাষায় লেখা এক বইয়ে তিনি কাচ তৈরির কলাকৌশল জানতে পেরেছিলেন। অধীত বিদ্যার সঙ্গে নিজের বুদ্ধি প্রয়োগ করে তৈরি করে ফেললেন এক কাচ তৈরির কারখানা। আবার নিজের সীমায়িত ক্ষমতা সম্পর্কে নিজের ধারণা ছিল স্বচ্ছ, যার জোরে খুব সহজেই বুঝে গেলেন যে ইউরোপ বা রাশিয়ার খানদানি কাটলারি শিল্পের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই নিজের উৎপাদনকে সীমায়িত করলেন কাচের পুঁতি তৈরিতে। স্থানীয় চুকচি সম্প্রদায়ের আদিবাসী মানুষদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করল এই পুঁতি। ব্যবসায় সাফল্য মিলল বিস্তর। লাভের টাকায় তৈরি করলেন মদ তৈরির কারখানা। তাতেও সফল হলেন। পাশাপাশি চালালেন সরকারের হয়ে কর আদায়কারীর কাজ। এতে প্রশাসনিক স্তরে যোগাযোগ তৈরি হল।

জীবনে স্থিতি এল কিন্তু বৈচিত্র গেল ঘুচে। তার খোঁজে সমস্ত কিছু ভাই পিটারের হাতে সঁপে দিয়ে চললেন নতুন পেশার সন্ধানে। ‘আনাদির’ নদীর ধারে এক ফাঁড়ি তৈরি করলেন আর শুরু করলেন ‘ফার’ সম্বলিত চামড়ার ব্যবসা। স্থানীয় চুকচি সম্প্রদায়ের থেকে কাঠবিড়ালি, লাল ও কালো শেয়াল, বিভার প্রভৃতি লোমওয়ালা প্রাণীর চামড়া কম দামে কিনে রাশিয়ার ও ইউরোপের বিভিন্ন বড় শহরে বিক্রি করতে লাগলেন বেশি দামে। শহরের খানদানি মানুষেরা তখন যে কোন মূল্যে ‘ফার’ এর পোশাক পড়তে রাজি। ফলে উত্তরোত্তর বাড়তে লাগল ব্যবসা, কেটে গেল ১০ বছর সময়। কিন্তু ব্যবসা, অর্থ আর সাইবেরিয়ার প্রতিকূল আবহাওয়ায় আদিবাসীদের সাহচর্যে দিনযাপনের ক্লান্তিকর ঘূর্ণাবর্তে ঘুরতে থাকা ব্যারানভের মনে একদিন বেজে উঠল ঘরে ফেরার বাঁশির সুর। ততদিনে স্ত্রী মাত্রনার সঙ্গও ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে তাঁর কাছে। এই ১০ বছরে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেড়েছে বটে; আজ দুই কন্যা আর এক পুত্রের পিতা তিনি – তবে কিনা সবই দত্তক গ্রহণের কল্যাণে।  

এই সময়ে কারগোপলে ফিরে যাওয়ায় ইন্ধন যোগালো এক দুর্ঘটনা। ১৭৯০ এর মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় চুকচি অধিবাসীরা অজ্ঞাত কারণে আগুন লাগিয়ে দিল আনাদির-এর ফাঁড়িতে। পুড়ে ছাই হয়ে গেল ফাঁড়িতে গুদামজাত করে রাখা অমূল্য ফার-এর সংগ্রহ। বিপুল আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে পুড়ে ছাই হয়ে গেল ব্যারানভের বর্তমান, ভবিষ্যৎ। আগের সমস্ত ব্যবসার সত্ত্ব দান করে দিয়েছেন ভাই পিটারকে। তাই নিজের বলতে পড়ে রইল পাঁচটি প্রাণীর হা-মুখ, সাইবেরিয়ার ঘন কুয়াশায় ঢাকা অনিশ্চিত আগামিকাল, আর বুকের মধ্যে সেই অনিশ্চিতকে জয় করার স্বপ্ন আর দুর্বার সঙ্কল্প। তাতে ভর করে নিম্নবিত্ত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান জীবনের শেষদিনে হয়ে উঠেছিলেন ‘গভর্নর অফ আলাস্কা’। আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের থেকে তাঁকে আলাদা করে চেনানোর ভার ইতিহাস যেন নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল সেদিন। কোন বাধাই তাঁকে পরাস্ত করতে পারেনি।   

সম্ভাবনার অঙ্ক সবসময়ে প্রত্যাশিত ফল দেয় না, যদি না তাতে থাকে বিধাতা পুরুষের অনুমোদন। আর তার সঙ্গে যদি যোগ হয় তাঁর আশীর্বাদের অনুদান, তবে যা ফল হয় তার হাতে গরম প্রমাণ ব্যারানভের সঙ্গে শেলিকভের সাক্ষাতের গল্প। ঠিক কী সূত্রে দুজনের সাক্ষাৎ হয়েছিল তার কোন ইতিহাসগ্রাহ্য বর্ণনা নেই। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে শেলিকভ সেই প্রথম সাক্ষাতেই খুঁজে পেয়েছিলেন তার নির্ভরতার মানুষটিকে। তাই প্রথম দিনেই ব্যারানভকে অনুরোধ করেছিলেন আলাস্কার বুকে রাজ করা তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রধান পরিচালকের দায়িত্ব নিতে। কপর্দকহীন ব্যারানভ দ্বিধা করেননি। ১৭৯০-র ১৫ অগাস্ট পরবর্তী ১০ বছর আলাস্কায় থেকে কাজ করার শর্তে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন শেলিকভের সঙ্গে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ব্যবসার এলাকার সীমানা বাড়াতে হবে। লভ্যাংশ নিশ্চিত করতে স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে বিনিময়ের শর্তাদি ঠিক করা ও তাদের সেগুলো মেনে চলা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তাবে ব্যারানভের ওপর। সেই অঞ্চলে ব্যবসা করা বিদেশি শক্তির সঙ্গে বিনিময় ও তা নিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকবে ব্যারানভেরই। চুক্তিমত ১৯২ জন রাশিয়ান শ্রমিক সঙ্গে পাবেন তিনি যাদের ব্যয়ভার থাকবে কোম্পানির। বাকি কাজের জন্য শ্রমিক সংগ্রহ করতে হবে নিজের উদ্যোগে ও ক্ষমতায়। তাদের খরচ আসবে ব্যবসার লভ্যাংশ থেকে (এই শর্তের কারণে ব্যারনভকে প্রচুর আ্যলিউট [আলুসিয়ান দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসী] আর আ্যলুটিক [কোডিয়াকের অধিবাসী] মানুষকে নিজেদের বাসস্থান থেকে উৎখাত করে নিয়ে যেতে হয়েছিল অন্য জায়গায় যার ফলশ্রুতিতে এক নৃতাত্ত্বিক বিপর্যয়ের জন্ম হয় – এ প্রসঙ্গে পরে আসছি)। বিনিময়ে নির্দিষ্ট মাসোহারা ছাড়াও কোম্পানির ২১০তি শেয়ার, স্ত্রী সন্তানদের কারগোপল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা ও আমরণ ভরণপোষণের প্রতিশ্রুতি, আর নিজের পছন্দমত দুজন সঙ্গী নির্বাচনের অধিকার পান ব্যারানভ। এদের একজন ইভান কুশকভ প্রথম থেকে শেষদিন পর্যন্ত পাশে ছিলেন ব্যারানভের। আর একটা জিনিস নিশ্চিত করেন ব্যরানভ। তাঁর আগের বিভিন্ন বাণিজ্যিক উদ্যোগ আর সাফল্যের স্বীকৃতিতে মস্কোর ‘Free Economic Society’র সদস্যপদ প্রাপ্তির যে সম্মানলাভ তাঁর হয়েছে, তাকে টিঁকিয়ে রাখার বাৎসরিক চাঁদার সংস্থান করবে কোম্পানি। আসলে চূড়ান্ত অবহেলায় কাটা শৈশব, কৈশোর আর প্রথম যৌবন তাঁর মধ্যে একটাই আকাঙ্খার জন্ম দিয়েছিল – তার নাম স্বীকৃতির আকাঙ্খা, যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল তাঁকে।

চুক্তি স্বাক্ষরের ২ দিন পর ১৭ অগাস্ট, স্ত্রী সন্তান রওনা হল কারগোপলের পথে। অপসৃয়মান শকটের চাকার সমান্তরাল দাগের দিকে তাকিয়ে একবার ভারি হয়ে এল নিঃশ্বাস। সেই শেষ স্পর্শের পর আর কখনও দেখা হয়নি দুজনের।

ব্যারানভ যখন দায়িত্ব নিচ্ছেন, তখন আলাস্কা সংলগ্ন উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর ও বেরিং প্রণালী অঞ্চলের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠেছে। ‘ফার ট্রেড’ আর আটকে নেই শুধুমাত্র রাশিয়ান ব্যবসায়ীদের মধ্যে। মঞ্চে প্রবেশ করেছে গ্রেট ব্রিটেন, আমেরিকা, স্পেন, ফ্রান্স। প্রবাদপ্রতিম ইংরেজ অভিযাত্রী ক্যাপ্টেন জেমস কুক-এর বিখ্যাত তৃতীয় অভিযান হয়ে গেছে ১৭৭৮-৭৯-এ সংলগ্ন সমুদ্র অঞ্চলের বিস্তারিত মানচিত্র পৌঁছে গেছে সবার কাছে। আর তার ভিত্তিতে সবাই কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। ১৭৮৬ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া  কোম্পানির জেমস স্ট্রেঞ্জ-এর  নেতৃত্বে বম্বে থেকে আসা জাহাজ ‘ক্যাপ্টেন কুক’ আর ‘এক্সপেরিমেন্ট’ তোলপাড় করছে সমুদ্রের বুক। এদের সঙ্গে জোড়ায় জোড়ায় এসেছে ‘কিং জর্জ’ আর ‘কুইন শারলট’ এবং ‘নুটকা’ আর ‘সি অটার’। শেষ দুই  জাহাজ আবারও এসেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৌজন্যে ভারতবর্ষের মাদ্রাজ থেকে। ৩ বছর পর যোগ দিয়েছে ইংরেজ ‘ব্রিগ’ শ্রেণীর জাহাজ ‘মাসকোভি’ যা একাধারে কাজ করতে পারে বাণিজ্যপোত আর রণতরী হিসেবে। স্পেন ১৭৮০ অবধি প্রচুর তৎপরতা দেখিয়েছে। বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় আস্তানা গেড়েছে। সেখান থেকে আরও উত্তরে এগিয়ে গিয়ে সমুদ্রসংলগ্ন আলাস্কার অধিবাসীদের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরি করেছে। যদিও ১৭৯০ থেকে তাদের গতিবিধি অনেকটা স্তিমিত। আমেরিকার বস্টন থেকে এসেছে অনেক বাণিজ্যপোত। এসেছে সিয়াটল থেকেও। তারা সশস্ত্র – কেউ কেউ কামানেও সজ্জিত। তুলনায় রাশিয়ার কোন বাণিজ্যতরীর কামান নিয়ে যাওয়া সরকারিভাবে সম্পূর্ণ নিষেধ। অর্থাৎ শত্রু পরিবেষ্টিত সমুদ্রপথে জাহাজ নিয়ে যেতে গিয়ে ঘোর বিপদে পরতেই পারেন ব্যারানভ। সে ক্ষেত্রে যুদ্ধও করতে পারেন ব্যারানভ, তবে ‘to open fire with muskets and rifles, if distance permits.’ (P. A. Tikhmenev. A History.) – এমনটাই সরকারের অভিপ্রায়। মন দিয়ে পড়লে বোঝা যাবে এ নির্দেশের তাৎপর্য। ব্যারানভকে অনুশাসনে বেঁধে রাজশক্তি বাকিদের এই বার্তা দিল যে রাশিয়ানদের যথেচ্ছাচার বরদাস্ত হবে না। তেমনি প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ভারী অস্ত্রের ব্যবহার করতে না দিয়ে জানান হল যে সমুদ্র বাণিজ্যে আপত্তি না থাকলেও উপনিবেশ তৈরিতে অন্তত এই মুহূর্তে উৎসাহী নয় রাশিয়া। আর প্রকারান্তরে নির্দেশ বজায় রাখার দায়িত্ব নিয়ে ব্যারানভ হয়ে উঠলেন রাশিয়ার সরকারি প্রতিনিধি।

আর একটা বিষয়ে রাশিয়া তার স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করল অন্যদের তুলনায়। আলাস্কায় সে সময়ে কোন বিনিময় মুদ্রা ছিল না। অ্যালিউটদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা সীল, সমুদ্রঘোটক বা ভোঁদড়ের ছাল কিনত তাদের খাদ্য ও জীবনধারণের অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বিনিময়ে। ক্রমে ইংরেজ ও আমেরিকানদের ক্ষেত্রে তার জায়গায় এল মদ আর বন্দুক ও গুলি। বন্দুকের ব্যবহার শিখিয়ে অ্যালিউটদের দিয়ে যেমন সমুদ্র ও স্থলভাগের প্রাণী শিকার করানো হল, তেমনি তাদের সমাজ জীবনেও ঢুকে পড়ল সশস্ত্র হিংসার ঘটনা। পাশাপাশি মদের নেশায় চূড় হয়ে অ্যালিউট পুরুষেরা ভুলে গেল সংসার প্রতিপালনের দায়িত্ব। ভুলে গেল যে প্রতিদিন শিকার না করলে অনাহারে মরবে তাদের স্ত্রী পুত্র, বৃদ্ধ বৃদ্ধার দল। গ্রীষ্মের দিনগুলোয় যথেষ্ট শিকার সংগ্রহ ও সংরক্ষণ না করে রাখলে শীতের ৮ মাস সময় অভুক্ত থাকতে হবে এই কঠিন সত্যিটা ভুলে গিয়ে মাতাল হয়ে তারা গড়াগড়ি খেল সমুদ্রের বেলাভূমিতে। ফলে আক্ষরিক অর্থে না খেতে পেয়ে সপরিবারে মারা পড়ল তারা। উজাড় হতে লাগল গ্রামের পর গ্রাম। না, সভ্য ইংরেজ বা সদ্য আলোকিত আমেরিকানদের বিবেকের কোনও দংশন দেখা দিল না তাতে। নির্বিচারে তারা চালিয়ে গেল এই মারণযজ্ঞ। আর এইখানেই রাশিয়া আলাদা হয়ে গেল অন্যদের থেকে। রাশিয়ান জাহাজে থেকে মদ বা বন্দুকের উপঢৌকন কখনও পৌঁছয়নি আদিবাসী মানুষদের হাতে। এমনকি অন্য দেশের জাহাজে দখলদারি কায়েম করতে পারলে তাদের মদ আর বন্দুকের সংগ্রহ সবার আগে ফেলতে হবে সমুদ্রগর্ভে – এমনই ছিল জারের নির্দেশ। তবে আদিবাসীদের ওপর বলপ্রয়োগে বাধা দেয়নি সেও। আর তার জোরেই ব্যারানভের হাত ধরে নেমে এসেছে অভূতপূর্ব নৃতাত্ত্বিক বিপর্যয়।  

তবে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমরা বরং সঙ্গী হই ব্যারানভের আলাস্কা যাত্রার। শেলিকভের নির্ভরযোগ্য জাহাজ ‘থ্রি সেন্টস’-এ ব্যারানভের যাত্রা নির্দিষ্ট হল। জাহাজের ক্যাপ্টেন বোখারভ যদিও বয়সের ভারে ক্লান্ত এবং চূড়ান্ত মদ্যপ, তবু তার হাতেই পড়ল জাহাজের ভার। ওখস্ক বন্দর থেকে জাহাজ ছাড়ার সময় সাইবেরিয়া অঞ্চলের গভরনর-জেনারেলের তরফ থেকে ব্যারানভকে দেওয়া হল ৫টি করে ধাতব প্লেট আর ক্রেস্ট (জারের চিহ্ন সম্বলিত ধাতব দন্ড)। নির্দেশ গেল যে ব্যবসার প্রয়োজনে যেখানে যেখানে ব্যারানভ পা দেবেন সেইরকম ১০টি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সেগুলি পুঁতে দিতে হবে। এরা অন্যদের কাছে সেই জায়গায় রাশিয়ার উপস্থিতির চিহ্ন ও বার্তা বহন করবে। অর্থাৎ সরাসরি সরকারি দখলদারি না করেও রাজশক্তির উপস্থিতি ঘোষণার দায় বর্তাল ব্যারানভের ওপরে। ‘থ্রি সেন্টস’ কিন্তু তার লক্ষ্যে পৌঁছল না। মদ্যপ ক্যাপ্টেনের অকর্মণ্যতায় ভেসে গেল তার নির্দিষ্ট যাত্রাপথ থেকে ৭০০ মাইল দূরে, তারপর ডুবে গেল উনালাসকা দ্বীপের কাসেগা বে অঞ্চলে। ডাঙায় ওঠা আর জাহাজডুবির প্রাথমিক ধকল কাটিয়ে উঠতে উঠতে এসে গেল শীত। বরফে ঢেকে গেল ডাঙাজমি, বরফ হয়ে গেল সমুদ্রের জল। নড়াচড়ার পথ বন্ধ। শুরু হল স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে জীবনযাপন। সেই সুযোগে অ্যালিউটদের ভাষা অনেকটাই আয়ত্ব করলেন ব্যারানভ। গ্রীষ্ম এল। বরফ গলে সমুদ্র চলাচলের উপযোগী হল। কিন্তু চলার জন্য কোন জাহাজ তো নেই। দমে যাওয়ার পাত্র নন ব্যারানভ। অ্যালিউটদের বাইদারকা চেপেই সমুদ্রযাত্রার পরিকল্পনা করলেন। সাড়ে তিনশো মাইল পথ – মাঝে ঝড় ঝঞ্ঝায় সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা, কিছুই দমাতে পারল না ব্যারানভকে। কয়েকজন বিশ্বস্ত সঙ্গী নিয়ে তুলনায় শক্তপোক্ত এক বাইদারকায় চেপে রওনা দিলেন থ্রি-সেন্টস বে-র উদ্দেশে – দিনটা ২৫ এপ্রিল ১৭৯১। তারপর দু’মাসের সমুদ্রযাত্রা শেষে কিভাবে পৌঁছলেন তাঁর গন্তব্যে তার গল্প আগেই বলেছি।

ব্যারানভ আদতে এক বাণিজ্যিক কোম্পানির বেতনভুক কর্মচারি। মূল কাজ ব্যবসাবৃদ্ধি। থ্রি-সেন্টস বে-তে এসে কোম্পানির কাজকর্ম পরিচালনা করতে গিয়ে প্রথমেই অনুভব করলেন লোকবলের অভাব। কুঠিবাড়ি তৈরি করা, সমুদ্রে গিয়ে প্রাণী শিকার করা, তাদের চামড়া প্রক্রিয়াকরণের কাজ করা এসবের জন্য অসংখ্য লোকের প্রয়োজন। থ্রি-সেন্টসকে এক বাসযোগ্য  শহরে পরিণত করার স্বপ্ন তাঁর চোখে। তাতেও শ্রমদানের মানুষ প্রয়োজন। আর একটা কাজ বাকি থাকল। সংলগ্ন দ্বীপে প্রতিযোগী লেবেদফ-ল্যাসোকিন কোম্পানি তখন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে পুরোদমে। ব্যবসা চালানোর প্রয়োজনে ব্যারানভের কোম্পানির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চালাতেও তারা পিছপা নয় এটা ব্যারানভ বুঝলেন খুব অল্পদিনের মধ্যে। ফলে প্রয়োজন পড়ল একদল রক্ষীর। সেই কাজেও প্রয়োজন বিশ্বস্ত লোকের। হাতে মাত্র দুশোর মতো রাশিয়ান মানুষ নিয়ে শ্রমিকের ঘাটতির হিসেব কষে তাঁর মাথায় বজ্রাঘাত হল। একমাত্র উপায় হিসেবে তাঁর কাছে পড়ে রইল স্থানীয় অ্যালিউট অধিবাসীরা।      

বাসভূমির মাটি তার অধিবাসীর কাছে শুধু প্রিয় নয়, তা তার অস্তিত্বের অংশ। বংশ পরম্পরায় বাস করা মাটির গন্ধে মিশে থাকে তার পূর্বপুরুষের আশীর্বাদ। তার জলে হাওয়ায় খেলা করে বেড়ে ওঠে তার সন্তানসন্ততি। তাকে ঘিরে থাকা সমুদ্র করে তার গ্রাসাচ্ছাদনের সংস্থান। অবসরে তার বনভূমির মাটিতে চিত হয়ে শুয়ে আকাশের বুকে তারা খোঁজে জীবনের রহস্যের সন্ধান। মনে পড়ে উত্তরের সেই ‘মহান দেশ’ থেকে তাদের পূর্বপুরুষদের সেই অলৌকিক অভিপ্রয়াণ যার ফলশ্রুতিতে তার আজ আশ্রয় পেয়েছে এই মাটির বুকে। জীবন থাকতে এ মাটি তারা ছাড়ার কথা ভাবে না।  

সেটা জানেন ব্যারানভও। জানেন যে শুধু অনুরোধে কাজ হবে না। স্ত্রী পরিবার ছেড়ে কোনও সমর্থ পুরুষ তার নিজের দ্বীপ থেকে দূরে থ্রি-সেন্টস বে (বা পরবর্তীকালে কোডিয়াকে) দীর্ঘদিনের জন্য যাবে না। ফলে বলপ্রয়োগের পথ নিলেন তিনি। ইতিমধ্যেই শেলিকভ বিভিন্ন অ্যালুসিয়ান দ্বীপ থেকে ৭০ জনকে তুলে নিয়ে এসেছেন কোডিয়াকে। ১৭৮৯-৯০ তে প্রিবিলফ দ্বীপপুঞ্জ যা এর আগে জনশূন্য ছিল, সেখানে ৫০ জন পুরুষ আর ৩০ জন মহিলাকে স্থানান্তরিত করে নতুন বসতি স্থাপনে বাধ্য করেছেন তাদের। দ্বিতীয়বারের জন্যে পরবাসী হতে শুরু করেছে তারা। ব্যারানভ এর মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন। আর ৩০ বা ৪০ জন নয়, বড় বড় বাইদারকা করে একসাথে ৪০০ থেকে ৭০০ জন পর্যন্ত অ্যালিউটকে স্থানান্তরিত করলেন নয়া ঠিকানায়। অনেক ক্ষেত্রেই পুরনো ঠিকানায় পড়ে রইল শুধুমাত্র মহিলা ও শিশুরা। পুরুষশূন্য দ্বীপে অন্ন সংস্থানের অভাবে আক্ষরিক অর্থেই অনাহারে মারা পড়ল অনেক মানুষ। সমর্থ পুরুষের অভাবে কমে গেল জন্ম হার সাঙ্ঘাতিকভাবে। ধরে আনা মানুষদের অধিকাংশই নিযুক্ত হল সমুদ্রে শিকারের কাজে। প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তন করে একসঙ্গে অনেক বাইদারকায় গভীরতর সমুদ্রে পাঠানো হল তাদের একবারে বেশি পরিমাণ শিকারের আশায়। এতে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ল, মারা গেল আরও কিছু আদিবাসী মানুষ। অ্যালিউটদের জীবনে নেমে আসতে লাগল বিপর্যয়।

থ্রি সেন্টস বে, যেখানে ব্যারানভ প্রথম শুরু করলেন কাজ, সেটা খুব পছন্দের জায়গা ছিল না তাঁর। এখানকার সমুদ্রের বেলাভূমি পাথুরে। কোনদিনই বন্দর তৈরির উপযুক্ত হবে না। কোনও পাহাড়ের আড়াল না থাকায় শত্রুপক্ষের জাহাজের কামানের গোলা চাইলেই গুঁড়িয়ে দেবে পারসংলগ্ন বাড়িঘর। তাই অন্য এক উপযুক্ত জায়গায় স্থায়ী আস্তানা তৈরির পরিকল্পনা ছিল মাথায়। যদিও কিছু দ্বিধা যে ছিল না তা নয়। কিন্তু এবার সে পরিকল্পনায় যেন সায় দিলেন প্রকৃতিও। ১৭৯২-র এক রাত্রে থ্রি-সেন্টসের সমুদ্রের ১৮ মাইল গভীরে জন্ম নিল এক শক্তিশালী ভূমিকম্প। কয়েক মিনিটে তার কম্পন ছড়িয়ে পড়ল ওপরে, যার প্রভাবে এক বড় পাহাড়ের এক তৃতীয়াংশ সমুদ্রের গর্ভে ঢুকে গেল আর সমুদ্রের জলের গভীরে তৈরি হল এক সুনামি। ঘন্টায় ৪৫০ মাইল গতিতে ছুটে চলা সেই সুনামি সমুদ্রের উপরিভাগে মাত্র দু’ফুট উঁচু ঢেউয়ের জন্ম দিলেও তা যখন পাড়ে গিয়ে পৌঁছল তখন তিন চারটি দমকে পাড়ের জলস্তর উঠে গেল ৫৫ ফুটেরও বেশী। ৯ মিনিট সময় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল জলস্তর, তারপর বিকট গর্জন করে তীব্র গতিতে ফিরে গেল সমুদ্রের বুকে। যেন এক বিশালাকায় দৈত্য হুউশ করে শুষে নিল সমস্ত জল। আর ফিরে যাবার পথে যা পেল তাকেই ভাসিয়ে নিয়ে গেল সে। শেলিকভের তৈরি বাড়িঘরের অনেকটাই ভেসে চলে গেল। আর এরসঙ্গেই ভেসে গেল ব্যারানভের সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব।  

১৭৯২-র মে মাসে ব্যরানভ তাঁর নবনির্বাচিত জায়গায় শুরু করলেন নতুন আস্তানা তৈরির কাজ। জায়গাটা কোডিয়াকের চিনিয়াক বে সংলগ্ন অঞ্চল। নতুন শহর পত্তনে তাঁর সঙ্গী অল্পসংখ্যক রাশিয়ান আর অনেক অ্যালিউট। পরে তাদের সঙ্গে যোগ হল কোডিয়াকের অ্যালুটিকরাও – স্বেচ্ছায় নয়, ভীতি প্রদর্শন আর বল প্রয়োগের কারণেই। তবে বিনা প্রতিবাদে সবাই মেনে নেয় নি এই অত্যাচার। আদিবাসীদের একটা অংশ বার বার ছোট বড় আঘাত হেনেছে তাদের। আর আশ্চর্য, তার প্রতিরোধেও ব্যারানভ ব্যবহার করেছেন অধীনস্ত আদিবাসীদের। অ্যালিউট আর অ্যালিউটিক মানুষেরা ভাড়াটে সৈন্যের কাজ করেছে বা করতে বাধ্য হয়েছে তাদের জ্ঞাতিভাইদের বিরূদ্ধে। আর এরই চরম প্রকাশ দেখা গেল ব্যারানভের পরবর্তী পদক্ষেপে।

কোডিয়াক আলাস্কার মূল ভুখন্ডের থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন; বেড়িয়ে থাকা এক জিভের ডগায় তার অবস্থান। সেখান থেকে আলাস্কার অন্তর্দেশে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা সমস্যা, সমস্যা ‘ইন্টিরিয়র’-এর মানুষজনদের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য করা। কোডিয়াকের নাড়ির যোগ যেন সাইবেরিয়ার সঙ্গেই বেশি। স্থির করলেন আর এক নতুন শহরের পত্তন করবেন এমন জায়গায় যেখান থেকে উত্তরে আলাস্কা আর দক্ষিণে আমেরিকার দিকে যাওয়া সহজ হবে। পছন্দ হল আজ যা সিটকা নামে পরিচিত সেই জায়গা। সামান্য অনুসন্ধানেই জানলেন যে সিটকা লিঙ্গিত অধিবাসীদের শক্ত ঘাঁটি। কয়েক শতাব্দী ধরে লিঙ্গিতরা সিটকার পাহাড়ে জঙ্গলে বাস করে এসেছে। সমুদ্র থেকেই পাহাড়ের কোলে তাদের বাড়িঘর দেখা যায়। আর দেখা যায় পাহাড়ের ওপরে তৈরি করা তাদের দুর্গ। উঁচু পাঁচিলটুকুই দূর থেকে দেখতে পাওয়া যায়। আর দেখা যায় মূল ফটকের সামনে আকাশ চিরে দাঁড়িয়ে থাকা ‘টোটেম পোল’। লিঙ্গিতদের বিশ্বাস, ওই পোল ধরে রেখেছে পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ, রক্ষা করছে সমস্ত আপদ বিপদ থেকে।

১৭৯৯-র ৮ জুলাই ব্যারানভ এসে পৌঁছলেন সিটকায়। কোডিয়াক থেকে সিটকা – এই সমুদ্রযাত্রাও যথেষ্ট বেগ দিল ব্যারানভকে। নিজে আসার আগে প্রায় সাড়ে পাঁচশো বাইদারকা ভর্তি অ্যালিউট মানুষকে রওনা করে দিয়েছিলেন সিটকার পথে। মাঝ রাস্তায় সামুদ্রিক মাছ ও গুগলির বিষক্রিয়ায় মারা গেছে প্রায় একশ অ্যালিউট। আরও ক’জনের সলিল সমাধি হয়েছে বাইদারকা ডুবে গিয়ে। বাকিরা অপেক্ষা করছে দুর্গ তৈরির জন্য চিহ্নিত জায়গায়। হ্যাঁ, ব্যারানভ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দুর্গ তৈরির। কারণ চর মারফৎ প্রাপ্ত সংবাদ এই যে লড়াকু লিঙ্গিতরা বিনা যুদ্ধে নাহি দিবে সুচ্যগ্র মেদিনী। ব্যারানভের একটি রাশিয়ান জাহাজ ও কয়েকটি বাইদারকা সম্বলিত নৌবহর আজ লিঙ্গিতদুর্গ অতিক্রম করে উত্তরে আরও ৮ মাইল এগিয়ে গেল, তারপর তিনদিক পাহাড়ে ঘেরা এক খাঁড়ির তটভূমিতে এসে সঙ্গে আনা দুর্গ তৈরির সরঞ্জাম নামাতে লাগল। চিহ্নিত তটভূমির নাম হল রিডাউট সেন্ট মাইকেল। নতুন শতাব্দীর আগমনের প্রাক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে গর্বিত ব্যারানভ শিটকার বুকে ঘোষণা করলেন রাশিয়ান আমেরিকান সাম্রাজ্যের সম্ভাব্য রাজধানীর পত্তনের সংবাদ। পাহাড়ের ওপরে নিজেদের দুর্গে দাঁড়িয়ে কয়েকদিন ধরেই আদিবাসী লিঙ্গিতরা শ্যেন দৃষ্টিতে নজর রাখছিল আগত বাইদারকা আর তাদের আরোহীদের ওপর। আজ ব্যারানভের বহরের দিকে তাকিয়ে আর জাহাজ থেকে দুর্গ তৈরির কাঠ, লোহার সরঞ্জাম আর অ্যালিউট শ্রমিকদের দেখে তারা নিশ্চিত হল রাশিয়ানরা এসেছে স্থায়ী আস্তানা তৈরি করতে; বাণিজ্য শেষ করে চলে যেতে নয়। জন্মভূমির স্বত্ব হারানোর আশঙ্কায় আতঙ্কের সঞ্চার হল লিঙ্গিতদের মধ্যে, আর তাই থেকে জন্ম নিল প্রতিরোধের মরিয়া আকাঙ্খা। মধ্য তিরিশের নেতা কোত-লে-আনের নেতৃত্বে পুরুষেরা শপথ নিল – যে কোন মূল্যে জন্মভূমির লুন্ঠন তারা রুখবে। সুযোগের অপেক্ষায় দিন কাটতে লাগল তাদের।

এক বছরের মধ্যে দুর্গ তৈরির প্রাথমিক উৎসাহে যেন কিছুটা ভাটা পড়ল। এই এক বছরে ব্যারানভ লিঙ্গিতদের সঙ্গে শাসক তথা বন্ধুর সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। নিজেদের দুর্গে লিঙ্গিতদের প্রবেশ নিষেধ হলেও নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বেচাকেনা করতে তাদের আসার অনুমতি দিয়েছেন ভেতরে। আসলে বিনিময় ছাড়া বিদেশের মাটিতে ব্যবসা  চালানো অসম্ভব সেটা বুঝতে অসুবিধে  হয়নি ব্যারানভের। লিঙ্গিতরাও ওপরে ওপরে সখ্যতার আড়ালে প্রস্তুতি চালিয়ে গেছে প্রতিশোধের। ১৮০০-র ২২ এপ্রিল সিটকা ছেড়ে কোডিয়াকের পথে রওনা দিয়েছেন ব্যারানভ। সেখানে অনেক কাজ বাকি পড়ে গেছে। ক্রমশ সিটকার নির্মীয়মাণ দুর্গে কাজ কমে এল, কমে এল মানুষের সংখ্যা। শেষে ১৮০২-র গ্রীষ্মে, যখন পড়ে আছে ৩৫ থেকে ৪০ জন রাশিয়ান, ৫৫ জন অ্যালিউটিক, আর সপরিবারে বাস করা প্রায় ২০০ অ্যালিউট, তখন এক দিন লিঙ্গিতরা আক্রমণ করল দুর্গ। কোত-লে-আন আর তার সেনার দল বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের ওপরে; সেই মুহূর্তে নিতান্তই সৌভাগ্যবশত সমুদ্রে শিকার করতে যাওয়া মানুষ বাদে বাকি সকলে নিহত হল। সিটকার দুর্গ – যাকে আদর করে ব্যারানভ নাম দিয়েছিলেন নোভ আরকাঞ্জেল – তা চলে গেল লিঙ্গিতদের নিয়ন্ত্রণে।  

ইংরেজ জাহাজ ‘ইউনিকর্ন’এর ক্যাপ্টেন বার্বার এই সংবাদ পৌঁছে দিল বিস্মিত ব্যারনভের কানে। এ ঘটনা তাঁর হিসেবের বাইরে ছিল। বাণিজ্য সাম্রাজ্য বিস্তারে অযাচিত বাধা উপস্থিত হল তাঁর সামনে। সেই মুহূর্তেই পরিকল্পনা করতে শুরু করলেন পরবর্তী পদক্ষেপের। পরবর্তী পদক্ষেপে কালক্ষেপ করল না লিঙ্গিতরাও। প্রচলিত গল্পকথা এই যে স্বপ্নাদেশের ভিত্তিতে জানগুরু স্টুনুক তাদের নির্দেশ দিলেন নতুন এক দুর্গ বানাতে, যা হবে কিছুটা উঁচুতে ‘ইন্ডিয়ান’ নদীর মুখে। সামনের পাথরভর্তি দীর্ঘ অগভীর সৈকত বেশি কাছে আসতে দেবে না রাশিয়ান জাহাজ, ফলে সাধারণ কামানের গোলার নাগালের বাইরে থাকবে তার ১৪ টি কুঠিবাড়ি (বারাবারা )। ১০০০ স্প্রুস গাছের স্বাস্থ্যবান গুঁড়ি দিয়ে বানান হবে কামানের গোলার পক্ষেও দুর্ভেদ্য এক পাঁচিল। পরিকল্পনা এরকম যে নোভ আরকাঞ্জেলের দুর্গে প্রথম মুখোমুখি সাক্ষাৎ হবে রাশিয়ানদের সঙ্গে। সেখানে তাদের যথাসম্ভব শক্তিক্ষয় করে তাদের আনা হবে নতুন দুর্গের এলাকায়। তার নিরাপদ আশ্রয় থেকে আক্রমণ চালিয়ে পর্যুদস্ত করা হবে রাশিয়ানদের। জয় তাহলে অনিবার্য।  

শিটকার নতুন লিঙ্গিত দুর্গ

প্রস্তুতির ঘাটতি রাখেননি ব্যারানভও। ১৮০৪-র সেপ্টেম্বরে যুদ্ধের প্রস্তুতির ইঙ্গিত মিলল সিটকার সমুদ্রে। নোভ আরকাঞ্জেলের সৈকতে  পিটার্সবার্গ থেকে এসে পৌঁছল যুদ্ধজাহাজ ‘নেভা’। নেতৃত্বে লেফটেন্যান্ট কম্যান্ডার লিসিয়ান্সকি, প্রধান আরোহী ব্যারানভ। সঙ্গে আর এক যুদ্ধজাহাজ ‘এরম্যাক’ আর ছোট দুটো জাহাজ ‘ক্যাথারিনা’ আর ‘আলেকজান্ডার’। আর সঙ্গী ২৫০টি বাইদারকায় ৫০০র বেশি অ্যালিউট যোদ্ধা। ৩০ সেপ্টেম্বরের সকালে ব্যারানভের নেতৃত্বে রাশিয়ানদের এক দল ঢুকে এল পুরনো দুর্গের ভেতরে। এবং আবিষ্কার করল যে দুর্গটি সম্পূর্ণ জনহীন। রাশিয়ানদের ভয়ে লিঙ্গিতরা পালিয়ে গেছে এমনি মনে করল তারা। ছদ্ম আত্মপ্রসাদে রাশিয়ানদের সতর্কতায় কিছুটা যেন ঘাটতি দেখা দিল। আর এখানেই লিঙ্গিতদের ফাঁদে পা দিল তারা। পূর্ব পরিকল্পনা পালটে তারা ঠিক করেছিল জনশূন্য দুর্গ দখল করতে দিয়ে লিঙ্গিতদের শক্তির ভ্রান্ত ধারণা দিয়ে কিছুটা অসতর্ক করে দেবে রাশিয়ানদের। ফলে দ্বিতীয় দুর্গের দখল নেবার সময় পরিকল্পনায় ঘাটতি থাকবে রাশিয়ানদের। সে অবস্থায় তাদের পরাস্ত করবে সহজেই। শুরুটা চলল তাদের পরিকল্পনা মতই।

১ অক্টোবর সকালে ‘নেভা’ এসে দাঁড়াল নতুন দুর্গের সামনের সমুদ্রে। তার শক্তিশালী কামানের নিশানায় দুর্গের সমস্তটাই। কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ব্যরানভ লিসিয়ান্সিকে গোলাবর্ষণ তো করতে দিলেনই না, দুর্গ আক্রমণের সেনাদলের নেতৃত্ব নিজেই দেবেন বলে স্থির করলেন। ২০০ আলিউটের দল নিয়ে এগোলেন ফটকের দিকে। মনে মনে যখন আগের নাটকের পুনরাবৃত্তি আশা করছেন তখন দুর্গের নিরাপদ আশ্রয় থেকে ছুটে এল ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। বন্দুক তোলার আগেই মাটিতে গড়িয়ে পড়ল অনেক অ্যালিউটের মৃতদেহ। ব্যরানভ নিজে আহত হলেন গুরুতরভাবে, তাকে টানতে টানতে সমুদ্রের দিকে আনতে লাগল দুজন সৈন্য। এবার বিনা অনুমতিতেই ‘নেভা’ থেকে গোলা ছুঁড়তে লাগলেন লিসিয়ান্সকি। লিঙ্গিতদের গুলিবর্ষণে ছেদ পড়ল। ১২ জন রাশিয়ান, বেশ কয়েকজন অ্যালিউট সেনার প্রাণ আর ব্যারানভের আঘাতের বিনিময়ে বাকিরা প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারল। জাহাজের হাসপাতালের বিছানায় ঠাঁই হল ব্যারানভের। আর লিঙ্গিতরা তাদের দুর্গের ভেতরে প্রথম দিনের যুদ্ধজয়ের উদযাপনে মাতল।  

২ অক্টোবর যুদ্ধের দায়িত্ব হাতে তুলে নিলেন অভিজ্ঞ সেনানায়ক লিসিয়ান্সকি। লিঙ্গিতদের দুর্গের পাঁচিলে গোলাবর্ষণ করে বুঝলেন তা সত্যি দুর্ভেদ্য। পরিকল্পনা পালটে কামানের মুখ উঁচুতে তুললেন। গোলা আরও দূরে পড়তে লাগল – পাঁচিল টপকে তা পড়তে শুরু করল ভেতরের বাড়িঘরে। এতটা আশা করেনি লিঙ্গিতরা। এক একটা গোলার আঘাতে যখন শক্তপোক্ত দেওয়ালের এক একটা অংশ গুঁড়িয়ে যেতে লাগল, ছিন্নভিন্ন মানুষের রক্তাক্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধুলো মেখে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগল, তখন লিঙ্গিতদের আত্মবিশ্বাসে আঁচর লাগল যেন। উদ্ভ্রান্ত সেনারা যখন তাদের নেতা কোত-লে-আন কে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমরা জিতব তো ? জানগুরু তো আমাদের বিজয় নিশ্চিত বলেছিল’, তখন তার আশ্বাসে সেই আত্মবিশ্বাসের উচ্চারণ পাওয়া গেল না।

দু’দিন লাগাতার গোলাবর্ষণ চলল। আর এই সত্য ক্রমশ প্রকট হল যে রাশিয়ানদের জয় নিশ্চিত। মন্ত্রণাসভা বসল দুর্গের ভেতরে। বয়োজ্যেষ্ঠদের পরামর্শে এক পা এগিয়ে দু পা পিছিয়ে যাবার কৌশলে সায় দিল সবাই। স্থির হল আত্মসমর্পণের অছিলায় যুদ্ধ বন্ধ করা হবে, তারপর সবাই দুর্গ ছেড়ে চলে যাবে পেছনের জঙ্গল পেড়িয়ে নতুন আস্তানার সন্ধানে। সেখানে আবার প্রস্তুতি চলবে, চলবে অনুশীলন। উপযুক্ত সময়ে তারা হানবে প্রত্যাঘাত। অতএব আর শক্তিক্ষয় নয়। এতদিনের প্রস্তুতি, এত মানুষের প্রাণদান সত্ত্বেও যে জয় করায়ত্ত হচ্ছে না এই চিন্তায় বুক ফেটে যেতে লাগল কোত-লে-আনের আর তার বিশ্বস্ত সহযোগীদের। কিন্তু আদিবাসী সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের মান্য করার নীতিকে কেউ অমান্য করেনা। তারা ছেড়ে যাবে তাদের মাটিকে, তাদের মাকে। ছেড়ে যাবে তাদের অধিকার।

চতুর্থ দিনের ভোর থেকে গোলাবর্ষণ শুরু হল। কিন্তু প্রত্যুত্তরে গুলির আওয়াজ পাওয়া গেল না। জয় সম্বন্ধে নিশ্চিত লিসিয়ান্সকি এবার পাঠাল আত্মসমর্পণের বার্তা। কথার মারপ্যাঁচে কালক্ষেপ করে বিকেলে দুর্গ থেকে এল সমর্পণের বার্তা। নিশ্চিন্ত লিসিয়ান্সকি গোলাবর্ষণ বন্ধ করে পঞ্চম দিন সকালে আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া সমাপ্ত করবে এই বার্তা দিয়ে ব্যারানভের সাথে এক পাত্র ভদকা নিয়ে খোসগল্পে মাতল। আর সন্ধ্যের অন্ধকারে দুর্গের চার দেওয়ালের আড়ালে শুরু হল এক মহাযাত্রার আয়োজন। নারীকন্ঠের সমবেত কান্নার আওয়াজ বাতাসে ভেসে ছড়িয়ে পড়ল আকাশের কোণায় কোণায়। জাহাজের ডেকে বসে তা শুনতে শুনতে তাকে সব হারানোর হাহাকার বলে ভুল করল লিসিয়ান্সকি, কারণ আদতে তা ছিল আবার ফিরে এসে আঘাত করার শপথ। নিহত মানুষদের শবদেহের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কাজ শেষ হল। আহত মানুষদের আঘাতে লাগান হল ওষুধ আর পুলটিশ। তাদের বহন করে নিয়ে যাবার জন্য তৈরি হল কাঠের পাটাতন। প্রিয় স্মৃতিচিহ্ন গোপনে সংগ্রহ করে কাপড়ের ভাঁজে তুলে রাখল মেয়েরা। এবার আর দুটো কাজ বাকি। যত কুকুর আছে, যারা প্রশ্নহীন আনুগত্যে সঙ্গ দিয়েছে এতদিন, তাদের প্রত্যেককে হত্যা করবে পুরুষেরা। আর যত সদ্যোজাত বা কচিবয়সের শিশুরা আছে তাদের হত্যা করবে নারীরা। নীরব নিঃশব্দ প্রস্থানে এদের কন্ঠস্বর ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। কিছু সময়ের মধ্যেই দুটো কাজ সমাধা হয়ে গেল। ইতিহাসের চাকা এগিয়ে নিয়ে যেতে ইতিহাসের দেবতার পায়ে এই সমর্পণ কঠিন মুখে মেনে নিল লিঙ্গিতরা। তারপর রাতের অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মতো প্রকৃতির সন্তান মিলিয়ে গেল প্রকৃতির কোলে।

কথা তারা রেখেছিল। শিটকার উত্তরপ্রান্তে পেরিল প্রণালী পেরিয়ে চিকাগফ দ্বীপে তারা নতুন বসতি স্থাপন করেছিল। তারপর ১৪ বছর পর ফিরে এসে সিটকার বুকে নিজেদের জনপদ নিজেরা তৈরি করে রাশিয়ানদের সঙ্গে সমানাধিকারের শর্তে বসবাস শুরু করেছিল লিঙ্গিতরা। তবে সে অন্য গল্প।

আর সিটকা অধিকার করে ৫৭ বছরের ব্যারানভ ২৭ বছরের যুবকের উৎসাহে শুরু করলেন রাশিয়ান আমেরিকার রাজধানীর পত্তনের কাজ। লিঙ্গিত দুর্গের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে সাফ করে পাহাড়ের ওপরে এক মাঝারি মাপের কুঠি তৈরি করলেন যেখানে থেকে কাজ করবেন তিনি। পরবর্তীকালে বার বার তার সংস্কার হয়েছে, মৃত্যুর পর তা পরিণত হয়েছে এক প্রাসাদোপম অট্টালিকায়। বাহুল্যে রুচি ছিলনা ব্যারানভের – তাই প্রাসাদে বসবাস নিশ্চয়ই পছন্দ করতেন না তিনি। তবুও তাঁর নাম যুক্ত হয়ে গেল প্রাসাদের সঙ্গে। একে আজও সকলে ব্যারানভের প্রাসাদ বলেই জানে। রাজধানী গড়ার লক্ষ্যে পাহাড়ের নীচে সমতল এলাকা চিহ্নিত করে তাকে প্রথমে পাঁচিল দিয়ে ঘিরলেন, তারপর তার ভেতরে

তৈরি করলেন এক শহর, যেখানে আছে বসবাসের বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল, এমন কি একটি গ্রন্থাগারও। আর সেই সময়ের যে কোন রাশিয়ান শহরের যা প্রাণ, সেই গির্জা গড়লেন পরম যত্নে। সেই সময়ের আলাস্কার সবচেয়ে উঁচু স্থাপত্য হিসেবে স্বীকৃত হল সেন্ট মাইকেল চার্চ।

সেন্ট মাইকেল চার্চ

আমেরিকার এক জাহাজির সঙ্গে আলাপ হল তার। তার সাহচর্যে এক জাহাজ তৈরির কারখানা গড়ে ফেললেন তিনি। জার্মান ভাষায় লেখা জাহাজ তৈরির পদ্ধতির একটি বইয়ের সাহায্য নিয়ে সিটকা, ওক্রেইতি, চিরিকভ আর লাপাক নামের ৪ টে জাহাজ তৈরি করে ফেললেন। স্থির করলেন ওই জাহাজে করে ক্যালিফোর্নিয়া অব্দি পাঠাবেন প্রতিনিধি যারা সেখানে বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেবে, করবে স্পেনের প্রভাব থেকে মুক্ত করে তাকে রাশিয়ার বাণিজ্যিক সীমানায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা। স্বপ্ন দেখলেন হনুলুলুর রাজা কামেহামেহা-র সঙ্গে সখ্য স্থাপন করে সেখানকার বণিকদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার। আর মজার কথা এই যে এইসব পরিকল্পনা চলছে আলাস্কার শিটকা নামে এক ব্যস্ত জনপদে বসে এমন একটা সময়ে যখন আমেরিকার বুকে শিকাগো বা ডেনভার নামে কোন শহরের নাম কেউ শোনেনি, আর সানফ্রানসিসকো নামের গ্রামে বাস করছে হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার। সমস্ত সিটকা তথা কোডিয়াক অঞ্চল জুড়ে তাঁর অবিসংবাদী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। তাই কোনওরকম সরকারি স্বীকৃতি না থাকলেও মানুষ তাকে আলাস্কার ‘গভর্নর’ বলে জানল, মানল।

সিটকা যখন শহর

দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসার পাশাপাশি উন্নয়নের কাজ করতে গিয়ে অর্থের অভাব হতে লাগল। দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তার ওপরে খরচের অনেকটাই তাঁর নিজের বেতন থেকে দিয়ে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু আর চলছে না। পিটার্সবার্গের কাছে বার বার চেয়েও অর্থসাহায্য পান নি আগে। এখনও তার পুনরাবৃত্তিই হতে থাকল। শুধু তাই নয়, আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগও তারা তুলে ফেলল তার বিরুদ্ধে। কাহিনিটা এরকম যে সিটকা শহরে এক নাট্যশালা নির্মাণ করেন তিনি। সেখানে একঘেয়ে জীবনে কিছুটা বৈচিত্রের প্রয়োজনে অধিবাসীদের বল-পার্টির আয়োজন হত। খরচের সিংহভাগই আসত ব্যরানভের বেতন থেকে। সেই আসরে একদা উপস্থিত এক নৌ-অফিসার পিটার্সবার্গে ফিরে গিয়ে প্রশ্ন তুলল খরচের উৎস নিয়ে, সন্দেহ প্রকাশ করল যে উন্নয়নের জন্য যে টাকা গেছে তার থেকে ব্যরানভ অনেকটাই ব্যবহার করেছেন বিনোদন ও ব্যক্তিগত কাজে, অর্থাৎ আত্মসাৎ করেছেন। আর আশ্চর্য এই যে, প্রশাসনের একাংশও তাতে সায় দিয়ে বলল ঠিক, ঠিক। চূড়ান্ত মানসিক আঘাত পেলেন ব্যরানভ। শরীরও বয়সের কারণে ভেঙে আসছে। দুয়ে মিলে ব্যারানভ হারিয়ে ফেললেন কাজের উৎসাহ। ততদিনে সামান্য স্বীকৃতি মিলেছে সরকারের তরফে – চিঠি এসেছে যাতে লেখা রয়েছে :  

 “Know Ye All. We do confer upon said Aleksandr Andreevich the rank in the civil Service of Collegiate Councilor, with social standing equal in rank to a Colonel in the Infantry, a Lieutenant Captain in the Navy, an Abbot in the Church, and entitled to be addressed by all as Your Excellency.”

একইসঙ্গে এসেছে তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়ে চিঠি ও তদন্তকারি সরকারি প্রতিনিধি। ভাগ্য পরিহাস তো করে, কিন্তু এতটাই সীমাহীন পরিহাস প্রাপ্য ছিল কি তাঁর? খুব নীচের ধাপ থেকে যাত্রা শুরু করে নিজের পরিশ্রমে, যোগ্যতায় আর জেদের ওপর ভর করে আজ এই জায়গায় নিজে পৌঁছেছেন, আলাস্কায় রাশিয়াকে নিয়ে গেছেন শাসকের আসনে। বিনিময়ে চেয়েছেন শুধু স্বীকৃতি। কিন্তু এই ভাবে? তবে প্রত্যাখ্যান করে রাজশক্তিকে অপমান করলেন না তিনি। শুধু স্বীকৃতির মেডেল গলায় ঝুলিয়ে শূন্য চোখে জানলার বাইরে চোখ রাখলেন, তারপর কাগজ টেনে নিয়ে লিখে পাঠালেন তাঁর পরিবর্ত পাঠাবার আবেদন। আবেদনের উত্তরে ইভান কখ নামের একজনকে পাঠাল পিটার্সবার্গ। মুক্তির আশায় যখন দিন গুনছেন ব্যারানভ, তখন খবর এল পেত্রপোভলস্ক থেকে আসার পথে হঠাৎ মৃত্যু হয়েছে কখের। আবার আবেদন। আবেদন মঞ্জুর। এবার নির্ভরযোগ্য জাহাজ ‘নেভা’-য় চেপে তাঁকে অব্যহতি দিতে আসছে বরনভলোকভ নামে আর এক তরুণ । ৮ জানুয়ারি, ১৮১৩ ব্যারানভ প্রাসাদের জানলা দিয়ে দেখলেন জাহাজ পারের দিকে আসছে, এবার নোঙর করবে বন্দরে। হঠাৎ তার মধ্যেই আকাশ কালো করে উঠল প্রচণ্ড ঝড়, জাহাজ ভেসে চলে গেল উত্তরে এজকুম্বে আগ্নেয়গিরির গায়ে আর সেখানেই ডুবে গেল সাগরজলে। সলিলসমাধি হল সব আরোহীর, সমাধি হল ব্যারানভের অবসর জীবন উপভোগের অভিপ্রায়ের।  

ইতিমধ্যে কেটেছে আরও ৫ বছর সময়। অবশেষে ১৮১৮-র ১১ জানুয়ারি লুডউইগ ভন হেজিমিস্টার আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যারানভের হাত থেকে নিয়েছেন আলাস্কার ভার। তারপরও এক বছরেরও বেশি সময় লেগে গেল কার্যভার হস্তান্তর করতে। শেষে ১৮১৮-র ২৭ নভেম্বর তিনি রওনা দিলেন রাশিয়ার পথে। ২৮ বছরের নিরবিচ্ছিন্ন সেবার প্রতিদান দিয়েছিল আলাস্কা। ৭২ বছরের বৃদ্ধ মানুষটির বিদায়বেলায় আকাশ ফাটিয়ে কেঁদেছিল আলাস্কার মানুষ। শত্রুপক্ষের প্রধান সেনাপতি বর্ষীয়ান কোত-লে-আন চিকাগফ থেকে এসে আলিঙ্গন করেছিলেন ব্যরানভকে। উপযুক্ত প্রতিপক্ষকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিতে ভোলেন নি লিঙ্গিতনেতা। দুহাতে বুকে জড়িয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছিলেন ব্যারানভও। সেই দিনের এক প্রত্যক্ষদর্শীর দিনলিপি বলছে “Old, grey haired men, his comrades in glorious deeds and voyages, sobbed like children at parting with their beloved leader. Many in his entourage grew up during his tenure, others were born while he was boss….Even the Tlingit who trembled before him, but who respected his brave and decisive spirit, took leave of him with ambivalent feelings in which fear and joy were mingled.”

কিন্তু আলাস্কার আদিম কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে রাশিয়ার রাজশক্তির নজর চলেনি। তার কাছে অজ্ঞতার আবরণে আড়ালে থেকে গেছে ব্যারানভের অবদান। আলাস্কার চালু প্রবাদ – ‘ওপরে আছেন ঈশ্বর আর রাশিয়ায় আছেন জারসম্রাট’ – দুজনেই সমান দূরত্ব থেকে বিচার করেন মানুষের। ব্যারানভ যেন জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন প্রবাদের মর্মার্থ। তাঁর কাজের মূল্যায়ন করতে কোনও আগ্রহ দেখায়নি রাশিয়া। বরং তাদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে নৌ-সেনাপতির ঈর্ষাজাত অভিযোগ। সেই অভিযোগকে আইনি মান্যতা দিয়ে ব্যারানভকে আনতে বলা হয়েছে বিচারাধীন বন্দির পরিচয়ে। রাশিয়ার পথে তাঁর ফিরতি যাত্রায় মিশে গেছে অমর্যাদার গ্লানি। যে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে তাঁর সুদীর্ঘ সপ্রেম আদানপ্রদান, তার জলে ভেসে চলেছেন অভিযুক্ত অপরাধী ব্যারানভ। একের পর এক বন্দরে থামতে থামতে জাভার বাটাভিয়াতে পৌঁছেছে জাহাজ। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় অসুস্থ ক্লান্ত ব্যরানভ শেষ লড়াইটুকু লড়ার চেষ্টা করেছেন। তারপর সুন্দ্রা প্রণালীর বুকে ভেসে চলা জাহাজের ডেকে নিষ্প্রাণ মাথাটি একদিকে কাত হয়ে পড়েছে। দিনটা ১৮১৯-র ১৬ এপ্রিল। ঘটনাচক্রে সেটা তাঁর ৭৩তম জন্মদিন।

মহাপুরুষের তকমা প্রাপ্য হয় না ব্যারানভের। আলাস্কার আদি বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁর আচরণ অনেক ক্ষেত্রে তাঁর মনুষ্যত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলে। আবার এটাও সত্যি যে আলাস্কার ইতিহাসের রথের চাকাকে সঠিক রাস্তায় রাখতে চাবুক চালানোর অপ্রিয় কাজটা করে যাওয়া ছিল তাঁর নিয়তিমাত্র। ইতিহাসের দেবতার এই চক্রান্তকে চিহ্নিত না করার ভুল আমরা করব না। আলাস্কাকে সর্ব অর্থে বদলে দেওয়া এই মানুষটিকে আমরা বলব ‘যুগপুরুষ’। খুব বেশি মানুষ  হয়ত এর সঙ্গে দ্বিমত হবেন না।  

টীকা ও চিত্র-পরিচিতিঃ

ব্যারানভের সফর মানচিত্র

১. শেলিকভ-গোলিকভ কোম্পানি – সাইবেরিয়ার ইরখুস্ক অঞ্চলের স্বাধীন ব্যবসায়ী গ্রেগরি শেলিকভ আর ইভান ল্যারিয়ানোভিচ গোলিকভ, এই দুজন মিলে ১৭৮৩তে ‘ফার’-এর ব্যবসার লক্ষ্যে তৈরি করেন এই কোম্পানি। আলাস্কার কুরিল দ্বীপপুঞ্জ থেকে ব্যবসা শুরু করে কোডিয়াকে এই কোম্পানি তাদের স্থায়ী আস্তানা স্থাপন করে। ভোঁদড় ধরার উদ্দেশ্যে আলিউটদের গ্রাম দখল করে তাদের পুরুষদের বলপ্রয়োগে শিকারে বাধ্য করা এদের স্বাভাবিক রীতি ছিল। কোডিয়াক দখলের সময় এইরকম এক আক্রমণে ৫০০-ও (মতান্তরে ২০০০) বেশী অ্যালিউটকে একদিনে হত্যা করে এরা। ইতিহাসে ১৭৮৪র এই হত্যাকান্ড ‘আওয়ায়ুক ম্যাসাকার’ (অ্যালিউট ভাষায় আওয়াউক মনে যেখানে বোবা হয়ে যেতে হয়) নামে পরিচিত।

২. ক্যাপ্টেন জেমস কুক (১৭২৮ – ১৭৭৯) – এই ইংরেজ অভিযাত্রী নিঃসন্দেহে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ৫ জন অভিযাত্রীর একজন হবার যোগ্য। সারা জীবনে তিনটি বড় অভিযান, যার প্রত্যেকটিই প্রায় পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছিল, তাতে নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, তাহিতি, ইস্টার আইল্যান্ড থকে শুরু করে আলাস্কা ও হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে অভিযান চালানোর কৃতিত্ব এই মানুষটার। তৃতীয় ও শেষ অভিযানে হাওয়াই দ্বীপের আদিবাসিদের হাতে নিহত হন তিনি।

৩. জার সম্রাজ্ঞী ক্যাথারিনের রাজত্বকালের শেষভাগে যে ৪টি কোম্পানি ‘ফার’ ব্যবসায়ে নিয়োজিত ছিল তার একটি লেবেদফ-ল্যাসোকিন কোম্পানি। সাইবেরিয়ার ইরখুস্ক-এর বাসিন্দা পাভেল সের্গেভিচ লেবেদফ ল্যাসোকিন-এর কোম্পানির সঙ্গে শেলিকভ-গোলিকভ কোম্পানির ছিল চূড়ান্ত বৈরিতার সম্পর্ক। এতটাই যে একে অপরকে সশস্ত্র আক্রমণ ও খুন-জখমে লিপ্ত হয়েছে বহুবার। শেষে ১৭৯৯তে জারিনা যখন এই ব্যবসার একচ্ছত্র অধিকার শেলিকভ-গোলিকভ কোম্পানিকে প্রদান করেন তখন স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কারণেই এর অবলুপ্তি ঘটে। ১৮০০তে মৃত্যু হয় লেবেদফের।

৪. ইউরি ফিউদোরভিচ লিসিয়ান্সকি রাশিয়ান নৌসেনাপতি হিসেবে রেজানভের নেতৃত্বে হওয়া ভুপ্রদক্ষিণ অভিযানে অংশ নেন। জাহাজের নাম ছিল ‘নেভা’। আলস্কায় লিঙ্গিতদের সঙ্গে যুদ্ধে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছাড়াও হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে ‘মঙ্ক সীল’ আবিষ্কার করার কৃতিত্ব তাঁর। এই প্রজাতির সীলকে লিসিয়ান্সকির নামে চিহ্নিত করা হয়।

৫. Michener, James A. Alaska a Novel. Dial Press Trade Paperbacks. New York. 2014. p – 337 জার প্রথম আলেকজান্ডারের নামসম্বলিত এই নির্দেশাবলীর বয়ানটি গল্পকারের কল্পনাপ্রসূত, যদিও বক্তব্য ইতিহাস অনুমোদিত।

৬. Black, Lydia.T. Russians in Alaska 1732 – 1767. p – 184

চিত্র-১ Alexander Baranov. Biographical File, Prints and Photographs Division (8) http://www.loc.gov/exhibits/russian/images/baranov.jpg

চিত্র-২, ৩ সংগ্রহ – Black, Lydia.T. Russians in Alaska 1732 – 1767. pp -160, 242

চিত্র ৪ Sitka Alaska circa 1843 -cropped.jpg / Wikimedia commons.

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জিঃ

পর্ব ১ এর অনুরূপ।

পর্ব ৬ লিংক
https://www.itihasadda.in/alaska-vi/

জন্ম ১৯৫৯। কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা। পেশায় অস্থিশল্য চিকিৎসক। লেখার জগতে বিলম্বিত প্রবেশ। লেখা প্রকাশিত 'দেশ', হরপ্পা, ভ্রমি ভ্রমণআড্ডা সহ নানা পত্রিকায় ও সংকলনে। প্রকাশিত বই 'টাইমলাইন আলাস্কা', 'এক চামচ বিদেশ', 'কোভিড-১৯, এক বিভ্রান্তির সন্ত্রাস'। ভ্রমণআড্ডা প্রদত্ত 'কলম' সম্মান লাভ ২০২২এ। ভ্রমণ, ইতিহাস অনুসন্ধান নিয়ে বিশেষভাবে অনুরাগী। ছবি তোলার নেশায় দেশে বিদেশে পাড়ি, তাতে কিছু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানপ্রাপ্তি। দেশে ও বিদেশে একক ও দলগত প্রদর্শনী।

মন্তব্য তালিকা - “আলাস্কার সাতরঙা ইতিহাস – পর্ব ৫”

  1. পড়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে অভিভূত হতে হতে ভাবছি
    আরব্য রজনীর কোন উপাখ্যান বা তার ও বেশি কিছু!
    অবশ্য ধারণা ইউরোপিয়ান দের এক্সপ্লোরেশন এর নামে বিভিন্ন প্রান্তের আদি অধিবাসীবাসীদের নির্বিকার ও নৃশংস ভাবে হত্যা ও নির্যাতনের আজ সর্বজন গোচরে আছে।
    আরো লিখুন অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোয় আসা যাক।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।