সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

আলাস্কার সাতরঙা ইতিহাস – পর্ব ৬

আলাস্কার সাতরঙা ইতিহাস – পর্ব ৬

ভাস্কর দাস

অক্টোবর ১৫, ২০২৩ ১৮২ 2

আমেরিকার ‘ওয়েস্ট কোস্ট’-এর উত্তর কোণের ওয়াশিংটন রাজ্যের মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়ে কলম্বিয়া নদী যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরে এসে মিশছে, সেখান থেকে উত্তর দিকে ব্রিটিশ কলম্বিয়া ছুঁয়ে কেউ যদি আলাস্কার দক্ষিণ পূর্ব উপকূল ধরে সিটকা পেড়িয়ে ইয়াকুতাত নদীর অববাহিকা অব্দি পৌঁছে যায়, তবে তার পায়ের তলায় থাকবে এমন এক ভূভাগ যার বিচিত্র চরিত্র তাকে অবাক তো করবেই, বিভ্রান্তও করবে যথেষ্ট। অশান্ত সমুদ্রের প্রায় পাড় থেকেই উঠে গেছে উঁচু পাহাড় যাদের কারোর কারোর উচ্চতা ৩ থেকে ৪ হাজার ফিট। সেই উচ্চতাতেই তাদের মাথায় বরফের টুপি। স্থলভূমির এই পাহাড়ি চরিত্র বিস্তৃত হয়েছে সংলগ্ন সমুদ্রের তলদেশে। জলের নিচে থাকা পাহাড় সমুদ্রের ওপরে বিভিন্ন উচ্চতায় মাথা বের করে তৈরি করেছে অসংখ্য ছোটো বড়ো দ্বীপ। তাই মূল উপকূল থেকে ১০০ মাইল অব্দি সমুদ্রের বুকে উঁকী মারছে অগুনতি ডাঙ্গাজমি। সবচেয়ে বড়োটির নাম ভ্যাঙ্কুবার দ্বীপ – আয়তনে সাড়ে ৩২,০০০ বর্গকিলোমিটার, আর সবচেয়ে ছোটোটি একটা ফুটবল মাঠের সমান। পরিমাণ বুঝতে একটা হিসেবই যথেষ্ট। ফিতে ফেলে এক লপ্তে ভ্যাঙ্কুবার থেকে ইয়াকুতাত নদীমুখ অব্দি দূরত্ব যেখানে কমবেশী ৮০০ কিলোমিটার, সেখানে এই অংশের মূল ভূখণ্ড আর সমস্ত দ্বীপের সম্মিলিত উপকূলের দৈর্ঘ্য ২৭,০০০ কিলোমিটার। মূল সমুদ্র থেকে পাড়ে আসাটা বিপজ্জনক – কারণ মাঝে পড়ছে দ্বীপগুলোর মধ্যবর্তী খাঁড়ির মধ্যে দিয়ে চলা জলস্রোত যার চলার কোনো নির্দিষ্ট নকশা নেই, জোয়ার ভাটায় ভর করে যেখানে জলস্তর প্রতিদিন ১৫ ফুট পর্যন্ত উঠছে আর নামছে। অশান্ত ঢেউ সশব্দে আছড়ে পড়ছে পাথরের গায়ে। প্রচলিত কথা, এখানে ‘the sea breaks its back’.

চিত্র ১ – দক্ষিণ-পূর্ব আলাস্কা ও জাপান স্রোত

এ হেন প্রতিকূল পরিবেশে কিছুটা সান্ত্বনার প্রলেপ এখানকার নাতিশীতোষ্ণ ভিজে আবহাওয়া। দ্বীপমালার সীমানার বাইরে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে দক্ষিণ থেকে উত্তরে নিয়ত বয়ে চলেছে এক তুলনামূলক গরম জলের স্রোত, যাকে সবাই চেনে ‘জাপান কারেন্ট’ বলে। সেই উষ্ণ জল থেকে উদ্ভূত বাস্প উপকূলের ওপর ঘন কুয়াশা হয়ে জন্ম দিচ্ছে আলাস্কার বিখ্যাত কুহেলিকার, আবার মেঘ হয়ে বৃষ্টি ঝরাচ্ছে সংলগ্ন পাহাড়ের গায়ে। পাহাড়ের শরীর জুড়ে জন্মাচ্ছে, বড়ো হচ্ছে বার্চ আর স্প্রুসের মতো সুবিশাল গাছেরা। তাদের পাতার ফাঁক দিয়ে খুব অল্প সূর্যের আলো ছুঁতে পারছে মাটি, যেখানে চুঁইয়ে আসা বৃষ্টিজলের লালনে জমি ভরে যাচ্ছে ওয়েসটার্ন হেমলক আর আলাস্কা ব্লুবেরির ঝোপে। অষ্টপ্রহর ভেজা সন্ধ্যার গন্ধভরা রহস্যময়তায় ইন্ধন যোগাচ্ছে বড়ো গাছের ডালের আষ্টেপৃষ্ঠে গজিয়ে ওঠা সবুজ ‘মস’-এর আস্তরণ। নিচে পড়ে থাকা বার্চের মৃত কাণ্ড, ছোটো বড়ো পাথর সবকিছুকে এক পুরু স্পঞ্জের আবরণে ঢেকে দিয়ে সর্বব্যাপী মস এক বিভ্রান্তিকর সমতলের জন্ম দিচ্ছে যাকে দেখে চোখ বলছে এর ওপর বিচরণ কতোই না সহজ। কিন্তু আলাস্কার ‘রেন ফরেস্ট’ নামে খ্যাত এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা লিঙ্গিত, শিমিয়ান আর হাইডারা জানে লুকীয়ে থাকা বিপদের ঠিকানা, জানে পায়ের চাপে যে কোনো জায়গায় বসে যাবে শেওলার আস্তরণ, আর পা, চাইকী পুরো শরীরটাই চলে যাবে অনেক নিচে।  

৮ হাজারেরও বেশী বছর আগে এখানে প্রথম আসা এদের পূর্বপুরুষেরা এই রহস্য ভেদ করে ফেলেছিল। তাই সমুদ্রের কোল ঘেঁসে দুই পাহাড়ের ফাঁকে যেখানে খানিকটা করে সমতল জায়গা তারা পেয়েছিল, বসতি স্থাপন করেছিল শুধুমাত্র সেখানেই। আর সেখানে, বাকি পৃথিবীর নজর আর নজরদারি এড়িয়ে কয়েকশ বছর ধরে গড়ে তুলেছিল এক ভিন্নতর সভ্যতা। বংশানুক্রমে গড়ে উঠেছিল নিজস্ব সংস্কৃতি আর কৃষ্টি। শহর সিটকাও এভাবেই মুখ তুলেছিল দক্ষিণ-পূর্ব আলাস্কার উপকূলে। ক্রমে ইতিহাস তাকে কীভাবে নিয়ে গেছে পাদপ্রদীপের আলোয় তা আমরা আগেই দেখেছি।

সেই সিটকার এক রেস্ট্যুরেন্টে বসে কফি খেতে খেতে শুরু করেছিলাম গল্প। এটা সিটকার ডাউনটাউন এলাকা। কাছেই সিটকা ন্যাশনাল হিস্টরিকাল পার্ক। ১১৩ একর জুড়ে তৈরি পার্ক আমেরিকার অন্যান্য সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মাপে খুবই ছোটো। ইন্ডিয়ান নদীমুখের কাছে লিঙ্গিতদের যে দুর্গ ছিল ১৮০৪-এর ঐতিহাসিক যুদ্ধের ক্ষেত্র, সেই সিটকা ‘ব্যাটেলগ্রাউণ্ড’-এই গড়ে উঠেছে পার্ক। ঘাসে পা দিতেই শিহরণ আর দুঃখমেশা এক অদ্ভুত অনুভূতি মনকে অবশ করে দিল যেন। মনে হল এই ঘাসেরই পূর্বপুরুষ একদিন বুকে ধরেছিল কোনো লিঙ্গিত যোদ্ধার ক্ষত থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তের ধারা। ব্যারানভ যেদিন ভোরে লিঙ্গিতদের পরিত্যক্ত দুর্গের দখল নিতে সদলবলে ঢুকেছিলেন, তখন এই মাটিতেই পড়ে ছিল কচি শিশুদের নিস্পন্দ দেহ। আজ সেই মাটিতে পড়ল আমার পা। ইতিহাসের পথ ধরে চলা বুঝি একেই বলে।

প্রথমেই আসতে হবে ভিসিটর’স সেন্টারে। আমেরিকায় এটা সাধারণভাবে যে কোনো পার্ক দেখার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এখানে আলাদা করে চোখে পড়ার বিষয় সেন্টারের গঠনশৈলী। লিঙ্গিতদের ‘ক্ল্যান-হাউস’–এর (অক্ষম অনুবাদ – বংশচিহ্ন বহনকারী কাঠামো) অনুকরণে তৈরি এই বাড়ি সমুদ্রের দিকে মুখ করা একচালার বাড়ি যার প্রত্যেক কোনায় কাঠের গায়ে খোদাই করা রয়েছে লিঙ্গিত-নকশা আর ঝুলছে তাদের আঁকা কাপড়ের চাদর। পার্কের ম্যাপ, কীভাবে ঘুরতে পারেন, কী কী দ্রষ্টব্য, এ সবের একটা হদিশ পেতে এখানে আসা জরুরি। আর অবশ্যকর্তব্য, পার্ক দেখা শুরুর আগে পার্কের ইতিহাস ভূগোল জেনে নিতে সেন্টারে প্রদর্শিত একটা শর্ট ফিল্ম দেখা। তার ওপর অন্য সব পার্কের তুলনায় অতিরিক্ত রয়েছে লিঙ্গিত, হাইডা আর শিমিয়ান অধিবাসীদের হাতে করা শিল্পসামগ্রীর সংগ্রহ। সিন্ধুঘোটকের দাঁত থেকে তৈরি মাছ ধরার বঁড়শিতে যে নকশা তোলা রয়েছে, তাতেই মাছ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ধরা দেবে, তাদের ধরতে লাগবে না। স্প্রুসের বাকল ভিজিয়ে তাই থেকে দড়ি দিয়ে করা ব্যাগ বা বাসন জাতীয় পাত্র দেখলে চোখের পাতা পড়বে না আপনার। আর এই সব শিল্পসামগ্রীর কারিগরদের প্রতিনিধিদের যদি দেখতে চান, তাদেরও দেখা মিলবে এখানে। কারণ পাশের ঘরেই এই অধিবাসীদের আজকের বংশধরেরা ব্যস্ত রয়েছে ‘টোটেম’ তৈরির কাজে। সেটা ঠিক কী?, টোটেম বিষয়ে কিঞ্চিত জ্ঞান আহরণ করা দরকার। কারণ এরপরই আমরা যাব ‘টোটেম ট্রেল’-এ।   

হাইডা বা লিঙ্গিত উপজাতির কাউকে নাম জিজ্ঞেস করুন – সে যে উত্তর দেবে তার মধ্যে লুকিয়ে আছে তার বংশের পরিচয়, ইংরাজিতে যাকে বলে ‘ক্ল্যান’। কারণ শুধু তাকে ডাকার জন্য নয়, তার পরিচয় বহনের দায়িত্ব তার নামের। একইভাবে সে যে বাড়িতে থাকে তাকে চিহ্নিত করে রাখাও তার কাজ। আর এই কাজে সে ব্যবহার করত সিডার গাছের কাণ্ড কেটে তার গায়ে বিভিন্ন পশুপাখির নকশা তুলে, তাকে নির্দিষ্ট রঙে রাঙ্গিয়ে একটা নির্দিষ্ট ‘মোটিফ’-এর জন্ম দিতে যা তার নিজের, পরিবারের আর কখনো কখনো তার সমাজের স্বপক্ষে কিছু অর্থবহ বার্তা দেবে। নকশা করা এই দণ্ডই ‘টোটেম পোল’। নদী বা খাঁড়ির দিকে মুখ করে বাড়ির সামনে এই দণ্ড পুঁতে রাখা হত। প্রত্যেক বাড়িতে না হলেও, সমগোত্রীয় মানুষদের কয়েকটি বাড়ির সামনে রাখা একটি ‘পোল’ সকলের সম্পর্কে একটা নির্দিষ্ট সাধারণ বার্তা বহন করত। আজকের পরিভাষায় এর নাম ‘ক্রেস্ট পোল’। ক্রমে টোটেম নির্মাণ এক অপূর্ব শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছয়। আর এর উদ্দেশ্যেরও ব্যাপ্তি ঘটে। যেমন সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কারোর মৃত্যুর পর তাঁর সমাধির সামনে প্রতিষ্ঠা করা হত ‘মেমোরিয়াল পোল’। কখনো কখনো এই পোলকেই কবর হিসেবে ব্যবহার করে তার পেছনের একটা গর্ত দিয়ে মৃতদেহ ঢুকীয়ে দেওয়া হত পোলের ভেতরে। নিজেই কবর, তাই এর নাম ‘মরচুয়ারি পোল’। ‘হিস্ট্রি পোল’ নামে আর এক ধরনের পোলে কোনো এক পরিবারের বা ‘ক্ল্যান’-এর নিজস্ব কোনো গল্প বা ইতিহাসকে ছবির ভাষায় ধরে রাখা হত, কারণ এগুলোর কোনো লিখিত নথি রাখার প্রথা ছিল না। আর একটা অদ্ভুত কারণে পোল প্রতিষ্ঠা হত— কাউকে উপহাস করতে। মূলত ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে কেউ কোনো চুক্তির খেলাপ করলে তাকে জনসমক্ষে উপহাসের পাত্রে পরিণত করতে এ কাজ করা হত। এর নাম ‘রিডিকিউল পোল’। (নামকরণ যদিও আদিবাসীদের নয়, শ্বেতকায় গবেষকদের) আর এই শ্রেণীর পোলের এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ‘লিঙ্কন পোল’। অবিশ্বাস্য হলেও এর লক্ষ্য ছিল আমেরিকার প্রবাদপ্রতিম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন। আসলে দাসপ্রথা লিঙ্গিত ও হাইডাদের মধ্যে এক স্বীকৃত প্রথা ছিল। পরাজিত যুদ্ধবন্দীদের দাস হিসেবে ব্যবহার করায় কোনো অন্যায় দেখত না তারা। ফলে আব্রাহাম লিঙ্কনের দাসপ্রথা নিষিদ্ধকরণের নির্দেশে ১৮৬৫তে (১৮৬২-তে ‘ডিক্লারেসন অফ ইমানসিপেসন’ সংবিধানে সংযুক্ত হলেও তা আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে প্রযুক্ত হয়। পড়ে ১৮৬৫-তে তা সমগ্র আমেরিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়) তাদেরও যখন তা মেনে নিতে হল তখন তারা যুগপৎ বিরক্ত ও অবাক হল। প্রতিবাদের পথ হিসেবে লিঙ্কনকে উদ্দেশ্য করে তৈরি করল এই রিডিকিউল পোল।

চিত্র-২ টোটেম পোল

গাছের কাণ্ড থেকে তৈরি পোল রোদে জলে দীর্ঘদিন দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক ক্ষয়ের নিয়মেই একদিন  মিশে যেত মাটিতে। আলাস্কার বাইরে এক সময়ে এর পরিচিতি বলতে কিছুই ছিল না। ব্যাপারটা মনঃপুত হয়নি আলাস্কার আমেরিকান গভর্নর  জন গ্রিন ব্র্যাডির। আদিবাসী শিল্পের অনুরাগী এই মানুষটি স্থির করেন টোটেমের সঙ্গে পৃথিবীর আলাপ পরিচয়ের কাজটা তিনিই করবেন। আর এর জন্য ১৯০৪-এ মিসৌরির সেন্ট লুই-তে হতে চলা ‘ওয়ার্ল্ড ফেয়ার’কে টোটেম পোলের প্রথম প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে নির্বাচন করেন। এর জন্য ১ বছর ধরে বিভিন্ন হাইডা আর লিঙ্গিত গ্রাম ঘুরে তিনি ২০-টি টোটেম সংগ্রহ করে নিয়ে যান মেলায়। মেলায় আসা প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষ স্বচক্ষে প্রথমবারের জন্য দেখেন এই অনবদ্য শিল্পকর্ম, আর বাকি পৃথিবী পরিচিত হয় তার অবয়বের সঙ্গে। ১৯০৬-এ রেলপথে আর জাহাজে প্রায় ৬০০০ মাইল পথ অতিক্রম করে তিনি আবার তাদের আলাস্কায় ফিরিয়ে নিয়ে সিটকা উদ্যানে প্রতিষ্ঠিত করেন। রোদবৃষ্টিজনিত ক্ষয় থেকে বাঁচাতে তাদের আজ বিশেষভাবে সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে— তার বদলে উদ্যানে রাখা হয়েছে তাদের ‘রেপ্লিকা’। আর তাদের দেখা, তাদের গল্প জানতেই আমরা এবার হাঁটা শুরু করেছি টোটেম ট্রেল-এ।  

ট্রেল-এর শুরুতে গাইড যখন বললেন, When you wander the Totem Trail, also known as Lover’s Lane, and explore the park’s 20 totem poles, you’re joining a procession of admirers that started over 100 years ago at the 1904 World’s Fair in St. Louis, Missouri. There, Alaska’s first governor, John Green Brady, used them to promote Alaska to the fair’s 19 million visitors, তখন অনুভব করলাম ইতিহাস কীভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের সঙ্গে। তবে চলার শুরুতেই যে পোলটির সামনে আমরা দাঁড়ালাম সেটি আসলে ইতিহাসকে স্মরণ করার পোল। ২০১০-এর মার্চে এই পার্কের শতবর্ষ উদযাপন করতে এই পোলটি স্থাপন করা হয় ২০১১-য়। এর নাম ‘হোল্ডিং হ্যাণ্ডস’ টোটেম পোল। টোটেমের সঙ্গে সম্পর্কিত সকলকে একসঙ্গে এখানে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। লিঙ্গিত সম্প্রদায়ের দুই প্রধান গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে সবার ওপরে রয়েছে কাক ও ঈগলের মুখ। আমেরিকার বনাঞ্চল সংরক্ষণের প্রয়াসকে বোঝাতে তার নিচে বাইসনের মুখ। আলাস্কায় রাশিয়ার ঐতিহাসিক উপস্থিতিকে মনে রেখে জারের প্রতীক চৌকোনা ‘প্লাক’ আর রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চে ব্যবহৃত গোলাকার ক্যালেন্ডারের নকশা। তার নিচে ব্র্যাডি সাহেবের সংগ্রহের প্রথম পোলের এক প্রতিরূপ। আর সবার নিচে এক নারীমুখ— মাতৃরূপী আলাস্কার প্রতিভূ হয়ে যিনি সন্তানস্নেহে পালন করছেন সকলকে। তাঁর চোখ দুটি মাছের আদলে তৈরি। সমুদ্রের সম্পদেই যে তিনি প্রতিপালন করেছেন তাঁর সন্তানদের, সে কথা মনে করতে এই মায়াবী উপস্থাপনা শিল্পীর। দেশ, কাল, প্রকৃতি সবাই এখানে হাত ধরাধরি করে উপস্থিত।

ট্রেল-এর বাকিটা দীর্ঘকায় স্প্রুসের ছায়ায় ছায়ায় চলতে চলতে বাকি পোলদের দেখে নেওয়া। গাছের ফাঁক দিয়ে নজরে আসছে নুড়িভরা সমুদ্রসৈকত। কিন্তু সময় কোথা সময় নষ্ট করবার। এখন তালিকায় অন্তত দুটো জায়গা পড়ে আছে। অতএব পা চালিয়ে চল হে।  

রাস্তা দিয়ে আপনি হেঁটে যাচ্ছেন। উল্টোদিক থেকে আর একজন হেঁটে আসছেন। আপনার অপরিচিত। আপনার সঙ্গী কানে মুখ লাগিয়ে বলল ‘জানিস উনি কে? উনি অমুক’। আপনি সচকিত হলেন, মুখ ঘুরিয়ে অনেক সময় ধরে দেখতে লাগলেন তাঁকে। কেন? তাঁর মুখ কি পাল্টে গেল? না, তিনি অমুক এই তথ্যটা তাঁর সঙ্গে বয়ে আনল অনেকগুলো পরিচিত ছবি, কিছু ভালোলাগা গল্প। মানুষটার সঙ্গে এই ইতিহাসটাও আপনি দেখতে লাগলেন। আসলে ইতিহাস একটা ইন্দ্রজাল বিশেষ, একমাত্রিক বিষয়কে বহুবর্ণে রাঙিয়ে তাকে বহুতলবিশিষ্ট হীরকখণ্ডে পরিণত করতে তার জুড়ি নেই।

পার্কের কাছেই ‘বিসপ’স হাউস’ বলে যে বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়ালাম তাকে দেখতে দেখতেও এর পেছনের গল্পগুলোই মনে ভিড় করতে লাগল। আলাস্কার পরিপ্রেক্ষিতে এর গুরুত্ব বুঝতে আমাদের একটু ঘোরাফেরা করতে হবে ব্যারানভ পরবর্তী আলাস্কায়। আর জানতে হবে রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের ভূমিকা।

ষোড়শ বা সপ্তদশ শতকে সব দেশের মতো রাশিয়াতেও ধর্ম ছিল এক নিয়ামক শক্তি। আর ক্রিশ্চিয়ানিটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে অর্থোডক্স চার্চের ভূমিকা ছিল বিরাট। পিটার দ্য গ্রেট প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তার প্রভাবকে খর্ব করলেও সামাজিক ও দৈনন্দিন জীবনযাপনে তার ভূমিকার গুরুত্ব কমেনি। এর ফলে আলাস্কা আবিষ্কারের পর যারা রাশিয়া থেকে আসতে লাগল তারা খ্রিস্টধর্মের আচার অনুষ্ঠানকে নিয়ে এল আলাস্কার বুকে। তাদের প্রভাবে অ্যালিউট সমাজেরও একটা অংশ তা পালন করতে শুরু করল, কার্যত তারা হয়ে গেল খ্রিষ্টান। এই স্বতঃপ্রণোদিত আলিউট খ্রিস্টানরা তাদের ধর্মের পরিচয় হিসেবে আজীবন বহন করত কাঠের তৈরি ক্রুশ। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে উত্তর রাশিয়ায় তৈরি এরকম অনেক ‘আইকন’ পাওয়া গেছে তাদের কবরে বা মৃতদেহের অবশিষ্টাংশের সঙ্গে। ফলে চার্চের পাদ্রীদের কর্মতৎপরতা ছাড়াই খ্রিস্টধর্মের চারাগাছটি ডালপালা মেলতে শুরু করে আলাস্কার বুকে। বস্তুত আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়া থেকে ১৭৯০তে যখন প্রথম একজন পাদ্রী ভ্যাসিলি সিতসভ উনালাস্কাতে আসেন তখন তিনি অবাক হয়ে যান দেখে যে অ্যালিউট মানুষদের অনেকেই খ্রিস্টধর্মের প্রতি অনুরক্ত।   

খ্রিস্টধর্মের অর্থোডক্স মতামত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল অন্য মতামতের প্রতি অর্থোডক্স চার্চের সহিষ্ণুতার মনোভাব। অ্যালিউট মানুষ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও বংশপরম্পরায় চলে আসা কোনো ধর্মাচরণ অনুশীলন করতে পারত নির্দ্বিধায়। অ্যালিউট সমাজের মাথা জানগুরু বা শাম্যানকে সম্মান করত রাশিয়ানরা। পূর্বদিকে মুখ করে প্রার্থনা করা ছিল দুই ধর্মেরই বিশেষত্ব। আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়ায় যাজকের কাছে স্বীকারোক্তি করা খ্রিস্টানদের বহুল প্রচলিত রীতি। এস্কিমো আর অ্যালিউটিক মানুষেরা প্রকাশ্যে উচ্চকণ্ঠে তাদের দোষ স্বীকার করত ব্যক্তিগত ও দলগত চিত্তশুদ্ধির আশায়। অর্থোডক্স মতের সঙ্গে আলাস্কার আদিবাসী মানুষদের ধর্মাচরণের এই ব্যবহারিক সাদৃশ্য এই মতকে গ্রহণে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল। 

সেখানে উপস্থিত রাশিয়ান শেলিকভ বা ব্যারানভ দুজনেই আলাস্কার অধিবাসীদের মধ্যে প্রভাব বাড়াতে ধর্মের গুরুত্ব অনুধাবন করেন ও তাতে সহযোগী ভূমিকা পালনের কথা ভাবেন। তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন চার্চের। রাজশক্তির কাছে আবেদন জানান উপযুক্ত পাদ্রী নিয়োগ করতে যাতে দৈনন্দিন ধর্মাচরণ আর আদিবাসীদের ধর্মান্তরিত করার কাজ সুষ্ঠভাবে হতে পারে। তাঁদের প্রস্তাব মনপুতঃ হয় সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ক্যাথারিনের। সরকারি উদ্যোগে ১০ জনের এক যাজকদল পাঠান আলাস্কার উদ্দেশ্যে। তাঁরা ধর্মপ্রচার ও ধর্মান্তরকরণের পাশাপাশি আন্তরিক ভাবেই আর একটা কাজ করেন। সেটা তাদের শিক্ষিত করতে স্কুলের পত্তন করা আর তাদের ওপর কোম্পানির সবরকম অত্যাচার বন্ধ করা। স্বভাবতই তাতে ব্যারানভদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। কখনো কখনো তা শারীরিক নিগ্রহের পর্যায়ও পৌঁছেছে। কিন্তু ধর্মভীরুতার কারণে আর সরকারি অনুমোদন থাকায় তাঁরা কোম্পানি থেকে কিছু পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছেন। ব্যারানভের চলে যাওয়া তাঁদের কাজের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা কাটিয়েছিল বটে, কিন্তু অর্থের প্রশ্নে সরকার আর স্থানীয় মানুষদের সাহায্যের ওপর তাঁদের নির্ভরশীল করে দিয়েছিল। মূল ১০ জনের দলের অনেকেই অসুস্থ হয়েছিলেন, কেউ কেউ দুর্ঘটনায় মারাও গেছিলেন। এদের মধ্যে একজন নিরলসভাবে কাজ করে গেছিলেন আলাস্কার জন্য – তাঁর নাম ফাদার হেরম্যান। ১৮৩৬-এ মৃত্যুর আগে অব্দি তিনি আলস্কায় আদিবাসীদের মাসিহার কাজ করে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন।   

চিত্র ৩- বিশপ ইনোসেন্ট

ইতিমধ্যে আরও দুজন যাজক এসে গেছেন আলাস্কায় যাঁরা অর্থোডক্স মত প্রচারে আর আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার বিকাশে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছেন। এদের প্রথম জন আইওয়ান ভেনিয়ামিনভ, পরে যিনি অধিক পরিচিত হন বিশপ ইনোসেন্ট (স্থানীয় ভাষায় ইনোকেন্তি) নামে। প্রথম যখন অ্যালুসিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দায়িত্ব নিয়ে ১৮২৪এ তিনি আসেন তখন তিনি যাজকমাত্র। স্ত্রী (সেই সময়ে ‘হোয়াইট রোব’ যাজকদের গৃহস্থ জীবনযাপনের অনুমতি ছিল। সন্ন্যাসীর জীবন নির্দিষ্ট ছিল ‘ব্ল্যাক রোব’ যাজকদের জন্য।) ভাই, মা আর এক পুত্রসহ তিনি আসেন এবং কালক্রমে আরও ছয় সন্তানের পিতা হন। ১৮৩৯-এ রাশিয়ায় গিয়ে তাঁর স্ত্রী বিয়োগ হয়। এরপর ধর্মকে একান্তভাবে আঁকড়ে ধরেন, হয়ে যান সন্ন্যাসী, নাম হয় ইনোসেন্ট। সেই পরিচয়ে সমগ্র আলাস্কার অর্থোডক্স চার্চের প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে আবার আসেন ১৮৪৩-এ। তখন বিশপ’স হাউস হয় তাঁর বাসস্থান আর কার্যালয়। ১৮৪১ থেকে ১৮৪৩— এই সময়ের মধ্যে রাশিয়ানদের সঙ্গে আসা ফিনল্যাণ্ডের কারিগররা এই বাড়ি তৈরি করে ফেলেন। ভেনিয়ামিনভ আলস্কার বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য নতুন চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন। তৈরি করেন স্কুল যেখানে আদিবাসী ছেলেমেয়েরা পড়বে। আলাস্কায় জলবসন্ত রোগের প্রতিষেধকের প্রচলন করে এই রোগকে নির্মূল করেন। আর রীতিমতো গবেষণা ও অনুশীলন করে তিনি অ্যালিউট, লিঙ্গিত, অ্যালিউটিক ও ইউপিক ভাষাতত্ত্বের ভিত্তি প্রস্তুত করেন। অ্যালিউট ভাষার বর্ণমালা তাঁরই তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়— তার আগে এর কোনো লিখিত রূপ ছিল না। যদিও এ কাজের চালিকাশক্তি ছিল হয়ত আদিবাসীদের খ্রিস্টধর্মগ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত করা, তবে সে প্রয়াসের ফল হিসেবে আদিবাসী ভাষা একলাফে এগিয়ে যায় অনেকটা। ইতিহাস বিশপ ইনোসেন্টকে মনে রাখে মূলত এই অবদানের জন্য।

দ্বিতীয় জনের নাম আইয়াকভ নেশভেতভ। নিজে অ্যালিউট সন্তান, তাই বিশেষ দুর্বলতা ছিল আলাস্কার মানুষদের জন্য। বিশপ ইনোসেন্টের নির্দেশে য়ুকুন নদীপথ ধরে আর্কটিক আলাস্কার বিস্তীর্ণ অঞ্চল পরিক্রমণ করেন, আর সেখানকার এস্কিমো আর আথাবাসকানদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন খ্রিষ্টধর্মের প্রভাব। তাঁরই অনুপ্রেরণায় মধ্য আলাস্কার ‘আটকান’ অধিবাসীদের ভাষা নিয়ে তিনি কাজ করেন। এতাবৎ সবচেয়ে বিস্তারিত অ্যালিউট-আটকান অভিধান তাঁর হাতে তৈরি। ইয়ুপিক এস্কিমো ভাষার বর্ণমালার জন্ম হয় তাঁরই হাতে। ১৮৬৪-তে মৃত্যু হয় তাঁর। তাঁর সঙ্গেই শেষ হয় আলাস্কার আদিবাসীদের সত্যিকার উন্নতির কাজ। ১৮৬৭-তে আলাস্কা অধিগ্রহণ পর্যন্ত সাধারণ ধর্মীয় আচরণেই আবদ্ধ থাকে অর্থোডক্স চার্চের কাজকর্ম। এই পর্বে খ্রিস্টধর্মের অন্যান্য গোষ্ঠী যেমন প্রেসবিটেরিয়ান, মেথডিস্ট, রোমান ক্যাথলিক, এপিস্কোপাল ইত্যাদিরা তাদের প্রভাব বিস্তার করতে সচেষ্ট হয়। এরা সকলে আলাস্কাকে আপসে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে নিয়ে এক এক জন এক এক জায়গায় বিরাজ করতে থাকে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উৎসাহী ছিলেন প্রেসবিটেরিয়ান চার্চের সেলডন জ্যাকসন। এদের সকলের সাধারণ শত্রু হয়ে দাঁড়ায় অর্থোডক্স চার্চ। তাকে ধ্বংস করতে চেষ্টার অন্ত ছিল না সকলের।

কিন্তু এ কথা ভুললে চলবে না যে খ্রিস্টধর্মের বাকি সব গোষ্ঠীর মতামত প্রচার শুরু হয়েছিল ধর্মগুরুর হাত ধরে। আর অর্থোডক্স চার্চের কচি চারাটিকে আলাস্কার বুকে রোপণ করেছিল রাশিয়ার সাধারণ মানুষ, যারা নিজেদের মানসিক তাগিদে শুরু করেছিল ধর্মাচরণ। কোনো পাদ্রীর আনুষ্ঠানিক সাহায্য ছাড়াই অ্যালিউটদের প্রভাবিত ও অনুরক্ত করেছিল তার প্রতি। ফলে অর্থোডক্স মতের প্রতি আলাস্কার মানুষের প্রাণের টান। বংশপরম্পরায় গৃহীত এই মতের অনুশীলনে সাময়িক কিছু বাধার সৃষ্টি নিশ্চয় করতে পেরেছিল অন্যরা, কিন্তু তাকে উৎপাটন করতে পারেনি আলাস্কার অন্তর থেকে। তাই আজও সপ্তাহে দুদিন প্রার্থনা সভা বসে বিসপ’স হাউসে, সেন্ট মাইকেলের গির্জার রবিবারের প্রার্থনায় যাঁরা আসেন, তাঁদের একটা বড়ো অংশই লিঙ্গিত গোষ্ঠীজাত।  

চিত্র-৪ বিশপ’স হাউস

এতসব কথা মাথায় রেখে ছুটলাম বিশপ’স হাউস দেখতে। রাস্তার ধারেই হলুদ রঙের বাড়ি, ছাদের রং লাল। গঠনশৈলী সাদামাটা। খানিকটা যেন কলকাতার গঙ্গার পাড়ে ব্রিটিশ আমলে জাহাজের মাল খালাসের জন্য যে বাড়িগুলো দেখা যায় তাদের আদল। তবে ওই কিনা ইতিহাস। ওরই আকর্ষণে হাঁ করে দেখা, ভেতরে যাওয়া। আলাস্কার বুকে এখন যে ৪-টি মাত্র রাশিয়ান আমলের সৌধ তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছে তার মধ্যে এটা প্রাচীনতম। এর ৭০ শতাংশই পুরোনো দিনের, তবে ১৯৭৩-এ ১৬ বছরব্যাপী সংস্কারের জন্য ৩০ শতাংশ জিনিস পাল্টাতে হয়েছে। এর এক তলায় মিউজিয়াম। সেই সময়ের রাশিয়ার রাজন্যবর্গ তথা রাশিয়ান চার্চের দেওয়া অনেক মূল্যবান সম্পদ দেখে নেওয়ার জন্য রয়েছে বিনা পয়সার প্রদর্শনী। বিনা পয়সার কথাটা আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয় কারণ ইউরোপ আমেরিকায় কোনো প্রদর্শনী বিনা পয়সায় দেখার সৌভাগ্য এতাবৎ আমার হয়নি। প্রদর্শনীর ঘরের একটা দেওয়ালে রয়েছে একটা নির্দিষ্ট দরজা যার ওপারে যাওয়া বারণ, কারণ ওপারে চার্চের ‘অলটার’। সেই দরজার মাথায় আঁকা রয়েছে একটি ক্রশ যা নিজের হাতে এঁকেছিলেন বিপ ইনোসেন্ট। প্রার্থনার সময় দরজার ওপারে থাকেন পাদ্রী আর এপারে ভক্তরা। পাদ্রীসাহেব মাঝে মাঝে ওপার থেকে এসে এপারে ভক্তদের আশীর্বাদ করে যান; ওপারে স্বর্গের থেকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ তিনি পৌঁছে দিচ্ছেন মর্তের মানুষদের কাছে। যে দেওয়ালে এই দরজা সেখানে অনেক ধর্মসম্পর্কিত আঁকা ও লেখা; ধর্মীয় পরিভাষায় এ দেওয়ালের নাম ‘আইকনস্টেসিস’। একতলার অন্যান্য ঘর ইস্কুল, অনাথাশ্রম, এমন কী ১৯২০-র দশকে ছাপাখানা যেখান থেকে চার্চের ধর্মীয় পত্রপত্রিকার বাইরে নিয়মিত ছাপা হয়েছে সংবাদপত্র ‘সিটকা সান’ আর ‘সিটকা ট্রিবিউন’। দ্বিতীয় তলায় বিশপ ইনোসেন্টের থাকার জায়গা। ৪ ডলারের বিনিময়ে দেখতে পাবেন তাঁর শোবার ঘর, খাবার ও পড়াশোনা করার ঘর। শোবার খাটও দেখলাম। সেটা দেখিয়ে রসিক গাইড বললেন দেখতেই পাচ্ছেন কী ছোট্ট খাট— আসলে ইনোসেন্ট ছিলেন ৫ ফুট ৩ ইঞ্চির মানুষ। শুনে আহ্লাদ জাগলো মনে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ৬ ফুটি আমেরিকান ট্যুরিস্টদের দিকে একটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিপাত করে রওনা দিলাম নিচের দিকে। এবার যাব সেন্ট মাইকেল’স চার্চ।  

১৮০৮এ সিটকায় ব্যারানভ যখন তাঁর প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন, তখন তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ভেনিয়ামিনভ প্রথম চার্চটি তৈরি করেন এখানে। রাশিয়া থেকে আসা যাজক শকোলভ ১৮১৬-এ এখানে নিয়ে আসেন সেন্ট মাইকেলের প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি এখানে প্রতিষ্ঠা করেন। চার্চটি পরিচিত হয় সেন্ট মাইকেল’স চার্চ নামে। ১৮৩৪-এ এর পুনর্নির্মাণ হয়। শেষে ভেনিয়ামিনভের পরিকল্পনায় রাশিয়ান নির্মাণশৈলীতে নতুন করে তৈরি হয় দুটি চুড়াওলা এক গির্জা। ১৮৪৪-এ তৈরি শুরু হয়ে ১৮৪৮-এ শেষ হয় এর নির্মাণ। সেন্ট মাইকেলের আইকন প্রতিষ্ঠা করা হয় এখানে। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আওয়ার লেডি অফ কাজান’ এর আইকন। কুশলী ফিনিশ কারিগররা একে গড়ে তোলে স্থাপত্যের এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে। এর বিশাল ঘন্টা আলাস্কাতেই তৈরি করা হয় আর তার ওপরের ঘড়িটি নিজের হাতে তৈরি করেন ভেনিয়ামিনভ। রাশিয়ার চার্চ আর রাজশক্তির উপহারে উৎকৃষ্টমানের শিল্পসামগ্রীতে ভোরে ওঠে চার্চ। শেষে ১৯৬৬-র জানুয়ারিতে এক বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে যায় চার্চের অনেকটা। তবে স্থানীয় লোকজনের তৎপরতায় ৯০ শতাংশ সম্পদই উদ্ধার হয়। শুধু হারিয়ে যায় হাতে তৈরি ঘন্টা, ‘লাস্ট সাপার’ নামে এক বিশাল ছবি আর লাইব্রেরিতে সংগৃহীত রাশিয়ান, লিঙ্গিত আর অ্যালিউটিক ভাষায় লেখা বেশ কিছু বই। এবার আধুনিক অগ্নি প্রতিরোধী জিনিস দিয়ে তাকে নতুন করে বানানো হয় – যদিও  আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যার  কুশলতার  গুণে দেখে আগের সঙ্গে কোনো তফাৎ পাওয়া সম্ভব নয়। সেন্ট মাইকেল আর লেডি অফ কাজানের নামে উৎসর্গীকৃত দুটি চ্যাপেলের ওপর এখন আর একটি চ্যাপেল যোগ করা হয়েছে, সেটি ভেনিয়ামিনভ বা সেন্ট ইনোসেন্টের উদ্দেশ্যে।উপযুক্ত মানুষের সঠিক স্বীকৃতি।

OLYMPUS DIGITAL CAMERA

চিত্র-৫ সেন্ট মাইকেল’স চার্চ  

রাস্তা পেড়িয়ে এসে দাঁড়ালাম ক্রেসেন্ট হারবারে। প্রধানত মাছ ধারার বন্দর। কিন্তু আমার লক্ষ্য আর একটু পেছনের দিকে যেখানে আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে সিটকার ইতিহাসের এক প্রধান সাক্ষী। তার নাম মাউন্ট এজকুম্বে। সেখানে দাঁড়িয়ে অস্তগামী সূর্যের আলোয় আর একটা দিন শেষ হওয়া দেখলাম আমি। আর একটা দিন শেষ হওয়া দেখল ক্রেসেন্ট হারবারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মাউন্ট এজকুম্বে। এমনি করে কয়েক হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে সে দেখেছে কতো দিনের শুরু আর শেষ। তার কাছে আজকের দিনটা সাধারণ, ফ্যাকাশে। তবে রং ছিল সেই দিনটায় যেদিন প্রথম একদল মানুষ না জানি কোন দেশ থেকে এসে বাস করতে শুরু করেছিল এখানকার মাটিতে। সে রং ছিল আনন্দের। আবার একদিন তাদের রক্তে লাল হয়েছিল ইন্ডিয়ান নদীর জল, বারুদগন্ধে ভরেছিল বাতাস। এজকুম্বের মন সেদিন বিষাদের রঙে ভরে গিয়েছিল। সিটকার সম্রাট ব্যারানভ যেদিন দেখছিলেন তাঁর মুক্তির দূতকে নিয়ে নেভা ডুবে গেল সমুদ্রগর্ভে, যেদিন হতাশায় আত্মধিক্কারে ঈশ্বরের প্রতি তাঁর অটুট বিশ্বাসে চিড় ধরেছিল, সেদিন সহানুভূতির রঙে ব্যারানভকে রাঙিয়ে দিতে চেয়েছিল এজকুম্বে। আর আজ দিগন্তের আড়াল থেকে দিনমণির রাঙিয়ে দেওয়া গোলাপি আকাশের ক্যানভাসে বরফের টুপি মাথায় ছবির মতো দাঁড়িয়ে থাকা মাউন্ট এজকুম্বে আমার মনকে ভরে দিল এক অতীন্দ্রিয় পূর্ণতার অনুভূতিতে। কিছু সময় নিস্পলক তাকিয়ে থেকে মনে মনে বললাম – বিদায়।

টীকা ও চিত্র-পরিচিতিঃ

১. জাপান স্রোত – কুরসিও কারেন্ট নামে পরিচিত এই স্রোত শুরু হয় ফিলিপিনস সমুদ্র থেকে। জাপানের দক্ষিণ পূর্ব উপকূল বেয়ে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর ধরে উত্তরমেরুর দিকে বয়ে যায় এই স্রোত। তাপমাত্রা কমবেশি ৭৫ফাঃ হওয়ার কারণে বাকি জলের তাপমাত্রা থেকে অনেকটাই গরম এই স্রোত। ফলে জাপান,তাইওয়ান দক্ষিণ পূর্ব আলাস্কার আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে।

২.  জন ব্র্যাডি – ১৮৪৭এ জন্ম হওয়া জন ৮ বছর বয়সে মাকে হারায় মৃত্যুর কাছে আর বাবাকে সৎমায়ের কাছে নিউ ইয়র্কের রাস্তায় পথশিশুর জীবন যাপন করতে করতে আমেরিকার ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্টের বাবার নজরে পড়েন। তাঁর দয়ায় ছাত্রজীবন শুরু হয় তার যা শেষ হয় ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে। কালক্রমে ‘ডিস্ত্রিক্ট অফ আলাস্কা’র গভর্নর নিযুক্ত হন উপর্যুপরি ৩ বার। আলাস্কার জনজাতির শিল্প ও সংস্কৃতি রক্ষায় উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন তিনি। ১৯১৮তে মৃত তাঁর কবরের ফলকে লেখা আছে ”A life ruled by faith in God and Man”.  

৩. সেন্ট মাইকেল – খ্রিস্টান ধর্মের আদিতে যে ৩ স্বর্গীয় দূতকে ঈশ্বরের প্রতিভূ হিসেবে গণ্য করা হয় তাঁরা হলেন মাইকেল, গ্যাব্রিয়েল আর রাফায়েল। শয়তানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করে মানুষকে রক্ষা করা ও ঈশ্বরের পথে চালিত করার দায়িত্ব মাইকেলের ওপর। আবার কোরানে বর্ণিত শুরা ২.৯৮ তে যে ৩ দূত আব্রাহামকে দর্শন করতে গিয়েছিলেন তাদের একজন মিখাইল আদতে মাইকেল, এটা কোনো কোনো মুসলিমের মত।

চিত্র- ১ জাপান স্রোতের মানচিত্র, সূত্র – Wikimedia Commons

চিত্র- ২ সূত্র – Norman Bancroft-Hunt & Werner Forman. People of the Totem; The Indians of the Pacific Northwest: University of Oklahoma Press. 1988

চিত্র-৩, ৪, ৫ সূত্র – Wikimedia Commons

জন্ম ১৯৫৯। কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা। পেশায় অস্থিশল্য চিকিৎসক। লেখার জগতে বিলম্বিত প্রবেশ। লেখা প্রকাশিত 'দেশ', হরপ্পা, ভ্রমি ভ্রমণআড্ডা সহ নানা পত্রিকায় ও সংকলনে। প্রকাশিত বই 'টাইমলাইন আলাস্কা', 'এক চামচ বিদেশ', 'কোভিড-১৯, এক বিভ্রান্তির সন্ত্রাস'। ভ্রমণআড্ডা প্রদত্ত 'কলম' সম্মান লাভ ২০২২এ। ভ্রমণ, ইতিহাস অনুসন্ধান নিয়ে বিশেষভাবে অনুরাগী। ছবি তোলার নেশায় দেশে বিদেশে পাড়ি, তাতে কিছু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানপ্রাপ্তি। দেশে ও বিদেশে একক ও দলগত প্রদর্শনী।

মন্তব্য তালিকা - “আলাস্কার সাতরঙা ইতিহাস – পর্ব ৬”

  1. এক হারিয়ে যাওয়া জগতের ধর্ম ও সংস্কৃতির
    পুংখানপূঙ্খ বিবরণ যা জানা ছিল না আদৌ।
    ঋদ্ধ হলাম ও খুব ভালো লাগলো।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।