সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

গণনাট্য সংঘ ৭৫ – গোর্কি : গণনাট্য সংঘ উদ্ভাস থেকে উদ্ভ্রম

গণনাট্য সংঘ ৭৫ – গোর্কি : গণনাট্য সংঘ উদ্ভাস থেকে উদ্ভ্রম

চন্দন সেন

অক্টোবর ৩১, ২০২১ ১১৯

এদেশে স্বাধীনতার বহু আগে থেকেই ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ এর নাট্যরূপ অভিনয়, একাধিক দলের একাধিক অভিনয়, আর স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে ১৯৬৭-তে সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন ও মোহম্মদ সোলেয়মান হোসেনের অনুবাদে ‘মা’এর সফল মঞ্চায়নের নির্দেশ দিলেন আতায়ুর রহমান ও হাসান ইমাম। মা-এর চলচ্চিত্ররূপটিও উৎপল দত্তর পরিচালনায় যথেষ্ট আদৃত হয়েছিল। মা-এর ভূমিকায় ছিলেন শোভা সেন। দার্জিলিং চা বাগানের পটভূমিতে নেপালী ভাষায় নির্মিত ‘মা’ চলচ্চিত্র।

এইভাবে গোর্কির ‘মা’ বাংলার ঘরের নিজস্ব সম্পদ হয়ে উঠেছে মুক্তি সংগ্রামে আর স্বাধীনতা-উত্তরকালেও। গোপাল হালদার তাই সঠিক আবেগেই অনুভব করেছিলেন, ‘অনুবাদের ব্যবধান কাটিয়ে যদি কোনো বই আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য হতে পেরে থাকে তবে তা গোর্কির ‘মা’। বাংলায় বিপ্লবী ছেলেমেয়েরা তাকে আপন করেছে, … লাভ করেছে পুলিশের নির্যাতন ও বন্দীদশা, ‘মা’ শ্রমিক আন্দোলনের এক প্রাণময় চিত্র। সরোজ আচার্য লিখেছেন, বাংলা দেশের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের গুপ্ত বৈপ্লবিক কাজকর্মে আত্মনিয়োগ করেছিলেন বহু মধ্যবিত্ত তরুণ। গোর্কির ‘মা’ বলতে গেলে তাঁদেরই আবিষ্কার, শরৎচন্দ্র ‘পথের দাবী’ লেখার আগে একটি চিঠিতে গোর্কির মতো জীবনের গভীরে ঢোকার ডাক দেন। ১৯৩০ সেপ্টেম্বরে বিপ্লব-পরবর্তী রাশিয়ায় যাওয়ার আগে থেকেই রবীন্দ্রনাথ ‘মা’ উপন্যাস সম্পর্কে অবহিত। ১৯২৮-এ ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে প্রথম গোর্কির অসাধারণ রচনাটির উল্লেখ পাওয়া যায়। “বাড়ি গিয়েই চোখে পড়লো লাবণ্য তার ঘরের সোফায় হেলান দিয়ে পায়ের উপর শাল ফেলে গোর্কির ‘মা’ বলে গল্পের বই পড়ছে।” স্বাধীনতা উত্তরকালে জ্ঞানেশ মুখার্জী’র নির্দেশনায় ‘মা’ উপন্যাস থেকে সৃজিত উৎপল দত্তের ‘মে দিবস’ দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে। ম্যাক্সিম গোর্কির গল্প থেকে শশাংক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সামান্য অসামান্য’ গোর্কির নাটক, ‘এনিমিস’ অবলম্বনে চিত্তরঞ্জন দাসের নাটক ‘জানোয়ার’, চিররঞ্জন দাসের নাট্যরূপে ম্যাক্সিম গোর্কির গল্পাশ্রিত ‘নীতিবাগীশ’ কিংবা গোর্কির কাহিনি থেকে নেওয়া অরুণেশ মুখোপাধ্যায়ের নাটক ‘একা নয়’ প্রভৃতি নাটক বহু বছর ধরে বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সীমাবদ্ধ রসদ জুগিয়ে গেছে। সিদ্ধেশ্বর সেন, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদে বা মৌলিক কবিতা রচনায় বারবার ম্যাক্সিম গোর্কি হাজির হয়েছেন। তাঁর ১৫০ বছর পূর্তিকালে তাই বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক আর সাহিত্য আন্দোলনের পাশাপাশি একটু নতুনভাবে মূল্যায়নও দরকার।

সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যুদ্ধ বিরোধী সামাজিক মুক্তি আন্দোলনঃ গোর্কির ভূমিকা

লেনিনের প্রতি অটলভক্তি, সোভিয়েত বিপ্লবের প্রতি সার্বিক সমর্থন এবং দুনিয়া জুড়ে তাঁর বন্ধু সহযাত্রী লেখক চিন্তাবিদদের রুশ বিপ্লবের পাশে থাকার আবেগতপ্ত ও সফল আবেদনের পরও গোর্কির কিছু লেখা আর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বলশেভিক পার্টির অভ্যন্তরে বারবার প্রশ্ন উঠছে। গোর্কি পার্টির সদস্যপদ নিয়েছেন কিনা তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু মুক্তচিন্তার, নতুন ধরনের ভাবনার সন্ধিক্ষণে গোর্কির মধ্যে যে লেখার জগতে, নিজস্ব অনুভবের জগতে বারবার পার্টির অবস্থান, এমনকি … সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন উঠেছে। তাতে দ্বান্দ্বিক রক্তক্ষরণ হয়েছে গোর্কির মনের জগতে সবচেয়ে বেশি। হয়তো জাঁ পল সার্ত্র থেকে অনেকেরই এমন মানসিক রক্তক্ষরণ হয়েছে বারবার। ১৯০৫ এর প্রথম বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর যখন ডেমোক্রেটিক সোসালিসট পার্টি বা লেনিনের পার্টির উপর, দেশের খেটে খাওয়া মানুষের উপর জার-প্রশাসন অবর্ণনীয় নিপীড়ন নামিয়ে আনল তখন প্রথম ‘ডুমা’ বা পার্লামেন্ট বয়কট করলেন লেনিন আর তার সংগীরা। অমন প্রবল সন্ত্রাসের মুখে দাঁড়িয়ে পার্লামেন্টকে প্রতিবাদের মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার না করার কৌশলকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন গোর্কি। পরে গোর্কি ও লুনাচারস্কি সহ অনেকেই প্রতিবাদে লেনিনের সঙ্গ ত্যাগ করলেও, লেনিন বিশ্বাস করতেন, গোর্কি ও লুনাচারস্কিকে সবটা বুঝিয়ে বললে অবশ্যই ফিরে আসবেন। লেনিনের ডাকে আর তৎপরতায় দুজনেই ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু ১৯১৭-এর পরও কোন সিদ্ধান্তই প্রশ্নহীন আনুগত্যে মানতে পারেননি গোর্কি। গল্প নয়, উপন্যাস নয়, নাটককে নিয়েই বারবার অন্তপ্রশ্ন তুলে গেছে। দ্বিধাদ্বন্দ্ব সংক্ষুব্ধ গোর্কি বিপ্লবের সমর্থক রাশিয়ার শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী আর লেখকদের অভিভাবক নিজেই একবার বিপ্লব পরবর্তী রাশিয়ায় প্রতিবাদের-অনধিকারের প্রতিবাদে শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। পরে স্ট্যালিনের ডাকে ফিরে এলেও স্টালিন-জমানায় পারজিং আবহে মুক্তচিন্তার লেখক গোর্কির যন্ত্রণা বাড়ছিল দিনদিন। এই সময়টায় নাটক লিখেছেন, অবরুদ্ধ আবেগ আর ক্ষোভকে মুক্ত করবার জন্য (“…নাটক আমায় লিখতেই হবে, সব ভালো মন্দর খুতখুতানি ত্যাগ করেই’)। আর অন্যদিকে পার্টির দায়িত্বপ্রাপ্ত বহু প্রভাবশালী নির্বোধের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন গোর্কি খ্যাতনামা সাহিত্যিকসহ অনেককেই, বাইরের আক্রমণ আর চক্রান্তের হাত থেকে নবগঠিত সোভিয়েত রাষ্ট্রকে বাঁচাতে তখন রুশ কমিউনিস্ট পার্টির আর রুশ প্রশাসনের ভীষণ কঠোর লড়াই চালু। এই জরুরি খুঁতখুঁতানির অনুষঙ্গেও বাড়াবাড়িতে অনেক লেখক ও ভাবুককে খুন হতে হয়েছিল। প্রখ্যাত লেখক, ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিক (সোভিয়েত বন্ধু) পিলানিয়ের স্নো তার স্মৃতিচারণায় সেই সময় স্ট্যালিনের সঙ্গে গোর্কি, লিওনভসহ বেশ কিছু সাহিত্যিকদের একটা কথাবার্তার হুবহু বিবরণ দিয়েছেন। মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক সুকোমল সেনের Socialist Revolution of Russia গ্রন্থের ৯২৫-৯২৭ পৃষ্ঠায় স্নো কথিত সাক্ষাৎকারটি হুবহু দেওয়া আছে।

লিওনভ পরে স্বীকার করেছেন বেশ কিছু লেখক ও চিন্তাবিদকে লেনিন স্ট্যালিনের সন্দেহের রোষ থেকে বা মৃত্যুদন্ড থেকে বাঁচিয়েছিলেন গোর্কির দৃপ্ত অবস্থান। এমন অনেককেই বাঁচিয়েছেন গোর্কি, অনেককে পরেননি। নির্বিচার ব্যাতিক্রমহীন এমন সংশয় ও দ্বন্দ্ব, স্ট্যালিন আমলের ভারপ্রাপ্ত পার্জিং। অধিকর্তাদের নির্বোধ গন্ধবিচারে সমালোচনাযোগ্য মনে হয়েছিল গোর্কির। আগে ১৯১০-এ লেখা ‘ভাসা ঝিলেকলোভা’ নাটকটিকে মঞ্চায়নের জন্য ২৬ বছর অপেক্ষা করতে গোর্কিকে বাধ্য করা হয়। নির্বোধ পার্জিং-এর অধিকর্তারা গোর্কিকে দিয়ে ততদিনে নাটকটির পুনর্লিখনে বাধ্য করেছেন। অনেকদিন ধরে উপেক্ষায় অনাদরে যন্ত্রণাকে নিয়ে বার্ধক্য কাটছিল গোর্কির। তার তখন প্রয়োজন ফুরিয়েছে। ধনবাদী শক্তিগুলির সম্মিলিত আক্রমণের পাশাপাশি আভ্যন্তরীণ শত্রুদের মোকাবিলা করে নবগঠিত সোভিয়েত রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হবে — স্ট্যালিনের এই বজ্রকঠিন অনুভবের আর প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জীবনদানের বিনিময়ে সোভিয়েতকে বাঁচানোর কৃতিত্বকে একটুও ছোট না করেও বলা যায়, গোর্কির মত লেখকদের প্রতি শেষজীবনে যে আচরণ দেখানো হয়েছে, তাকে যেভাবে প্রতিমুহূর্তে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে নির্বোধ পাজিং-এর চাটুকরি না হবার কারণেই তিনি সন্দেহের তালিকায় তা নিয়ে উত্তরকালে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সৃজনশিল্পীদের প্রতি রাষ্ট্রের এই মনোভাবের সামনে দাঁড়িয়ে রমা রলাঁর মতো এক সময়ের মানব-বান্ধব বিপ্লব-বান্ধব মনীষী শেষে গান্ধিবাদী দর্শনে, প্রাচ্যের ভক্তিবাদী দর্শনে, রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক চেতনায় মুক্তির সন্ধান করেছেন। সোভিয়েত বিপ্লবের সূচনাপর্ব থেকে ঝড়ে ঝঞায় অবিচল। অভিভাবকত্বের অহংকারটুকু গোর্কি শেষজীবনে অঁলার মতো ছাড়তে চাননি বলে। হয়তো গোর্কির পরিণতি আরো করুণ। তবু গোর্কি নিজের জন্য কোন অনুযোগ বা অভিযোগ জানাননি কখনো।

ঢেউ উঠছে কারা টুটছে – আমাদের দেশ

আমাদের দেশে অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাবে সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা আর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, ফ্যাসিবাদ-বিরোধী বাংলা নাট্যচর্চার ইতিহাস প্রায় সমার্থক। রুদ্রচন্ড’, ‘বিসর্জন’, ‘বৌঠাকুরানির হাট’-এর চেনা ইউরোপীয় ধাঁচা ভেঙে দিয়ে নতুন রাশিয়ার নতুন কর্মযজ্ঞ দেখে মুগ্ধ হওয়া রবীন্দ্রনাথ অনুভব করলেন নবদলের পালা এসে গেছে। রক্তকরবী’তে তার আগমনী, পরাধীন যুগে পূর্ব গোলার্ধের এই সৃজনভূমিতে তখন রথের রশি’, ‘অচলায়তন’ লেখার অন্তরের ডাক অনুভব করছেন রবীন্দ্রনাথ।

প্রায় সমসময়েই কলকাতার মিশন রো-র কাছে কেন্ট হাউজের তিনতলার এক অপ্রশস্ত ঘরে গড়ে উঠল ওয়াই. সি. আই. (ইয়ং কালচারাল ইন্সটিটিউট)। অক্টোবর বিপ্লব, বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত, দুনিয়াব্যাপী নতুন করে বাঁচার নতুন করে অধিকার আদায়ের সত্যিকারের অসম্ভবকে সম্ভব করার রূপকথাকে ভেঙে চুরমার করতে হিটলার বাহিনীর সঙ্গে দুনিয়ার তেরটি ধন্যবাদী দেশের হিংস্র আক্রমণ আর সেই আক্রমণকে ঠেকিয়ে মাতৃভূমি সোভিয়েতকে রক্ষার জন্য আড়াই কোটি রুশবাসীর প্রাণ বিসর্জনে ফ্যাসিবাদের পরাজয়-এইসব ঘটনার অভিঘাতে দেশে দেশে তখন ভোরের রঙ। কলকাতার ওয়াইসিআই-এর ঘরে বসে নতুন দিনের নতুন নাটকের স্বপ্ন দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল একঝাক ছাত্রছাত্রী, যাঁদের অনেকেই পরবর্তীকালে আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির অন্যতম সেরা মণীষা। জলি কাউল, দেবব্রত বিশ্বাস, দিলীপ রায়, কমল বসু, সুব্রত ব্যানার্জী, প্রশান্ত সান্যাল, দিলীপ বসু, চিন্মোহন সেহানবিস, সরোজ দত্ত, উমা সেহানবিশ, দেবব্রত বসু প্রমুখ সৃজনশীল তরতাজা যৌবনের উদ্যোগে জলি কাউলের সঞ্চালনায় ফানি পলিটিসিয়ান টেক টু রোয়িং দ্য বয়েজ গ্রো আপ তখন নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করছে। চিন্মোহন সেহানবিশ লিখছেন যে ওই সময়ই দেবব্রত বসুর লেখা ইন দ্য হার্ট অব চায়না’ অভিনীত হচ্ছে ‘অঞ্জনগড়’ নাটকের সঙ্গে। জাপানি আক্রমণের বিরুদ্ধে চীনা জনগণের স্মরণীয় প্রতিরোধ ওই নাটকের বিষয়বস্তু। দেবব্রত বসুব সপকিপার্স হিটলারশাহির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নাটক। ওয়াই. সি. আই. দেশপ্রেমিক সংগীতের এবং গণসংগীতের স্কোয়াড তৈরি করে ফেলেছিল। এমনই এক স্কোয়াডের গান শুনে আশুতোষ মেমোরিয়াল হলের দর্শকাসন থেকে পাহাড়ি সান্যালের মতো বিখ্যাত তাভিনেতা মঞ্চে উঠে গলা মিলিয়েছিলেন। ‘মজদুর, মজদুর, হ্যায় হাম’ গানের কথা শুনলেই বোঝা যায় অক্টোবর বিপ্লবের শ্রমিক কৃষকের গণঅভ্যুত্থানের আহ্বান তখন আন্দোলিত করছে কলকাতার সারস্বত যৌবনকে। ওয়াই. সি. আই. সুবোধ ঘোষের গল্প থেকে ‘ফসিল’ নাট্য প্রযোজনা করেছিল। সুনীল চ্যাটার্জির লেখা ‘কেরানী’ নাটকটিও তখনকার স্থিতাবস্থা নাট্যচর্চায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল।

আসলে অক্টোবর বিপ্লব প্রভাবিত বিংশ শতকের প্রথম পর্বে আমাদের নাট্য আন্দোলনের দোলাচলবৃত্তিতে প্রগতি বনাম পরাগতির লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৭ সাল সোভিয়েত রাশিয়ার বিপ্লব এবং এদেশে প্রায় সমান্তরাল যুদ্ধ। মন্বন্তর আর পরাধীনতার যন্ত্রণা সমেতভাবেই নতুন নাট্যদর্শন নতুন নাট্যআন্দোলনের আগমনী ঘোষণা করে দিল। বিজন ভট্টাচার্যের নাটকে এই নবীন যুগের নবীন আত্মপ্রত্যয়ের স্পষ্ট ঘোষণাঃ ‘একথাও জানা প্রধান যে গতবারের মত এবার আর আকাল আচম্বিতে এসে আমার চোখের ওপর থেকে আমারই পরিজন, আর বন্ধুবান্ধব (জনতার দিকে হাত তুলে দেখিয়ে) এই এরাই তো আত্মীয় পরিজন, ছিনিয়ে নিতে পারবে না, এদের কিছুতেই না।” ১৯১৭ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার বিপ্লব এবং বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার প্রভাব আন্দোলিত করল সারা দুনিয়াকে। বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত প্রেক্ষাপটেই লক্ষ লক্ষ মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে পরাধীন ভারতবাসীও নতুন বিশ্বাস আর স্বপ্ন নিয়ে ব্রিটিশ শোষণের মুখোমুখি দাড়ালেন। মস্কোতে ১৯২১ সালে ভারতের প্রবাসী কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হবার পর ১৯২৫ সালে ভারতেই এ দেশীয় কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হল। চারদিকে ব্যাপক ধরপাকড়, লাঠি, গুলি চালিয়ে ব্রিটিশ রাজশক্তি এ দেশের কমিউনিস্ট পাটিকে দমনের জন্য ঝাপিয়ে পড়ল। কংগ্রেসও পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিল। বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, হরতালে উত্তাল পরিবেশে নাট্যকাররা এগিয়ে এলেন অনেকটাই প্রচ্ছন্ন আর খানিকটা প্রত্যক্ষ প্রতিবাদের নাটক নিয়ে। যদিও গল্প, কাহিনি বা কবিতার মতো নাট্যমঞ্চে কিন্তু রুশবিপ্লবের প্রভাব ততটা প্রত্যক্ষ ছিল না। তবুও স্বীকার করতেই হয়, মন্মথ রায়, শচীন সেনগুপ্তের নাটকগুলোতে ঐতিহাসিক কাহিনি নির্ভর স্বাদেশিকতার হাওয়া বয়ে আনছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ইচ্ছাইঙ্গিত। সমকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার উপর লেখা ‘দশের দাবী’ (১৯৩৪) কিংবা কষি আর শিল্পের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরার সূত্রে সামন্ততন্ত্র বিরোধের ভিত্তিতে লেখা ‘সংগাম ও শান্তি’ (১৯৩৯) নাট্যকার শচীন সেনগুপ্তের সমাজ সচেতন বলিষ্ঠতার পরিচয় দেয়। মনোজ বসুর লেখা ‘নতুন প্রভাত’ নাটকেও অর্থনৈতিক শোষণের চিত্রটি দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা হল। ‘সিরাজদ্দৌলা’-র নাট্যকার শচীন সেনগুপ্ত যখন গভীর দেশপ্রেমকে সাম্যবাদী চেতনার আন্তর্জাতিক দিগন্তে পৌঁছে দেন ‘নরদেবতা’ নাটকে তখন ব্রিটিশ সরকার নাট্যনিয়ন্ত্রণ আইন আরও একবার প্রয়োগ করল ‘নরদেবতা’-র অভিনয় নিষিদ্ধ করার জন্য। চল্লিশের দশক দেশজুড়ে উত্তাল হাওয়ার দশক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যুদ্ধের রসদ সংগ্রহে এই উপনিবেশকে চরম লুণ্ঠনের জন্য ব্যবহার, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, লুণ্ঠিত দেশে দূর্ভিক্ষ আর মন্বন্তরের করাল ছায়া, পুরোনো মূল্যবোধগুলোর ধ্বস্ত অবস্থা – সব মিলিয়ে দেশের সামাজিক আর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার-আর সেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বোবাকান্নায় গুমরে ওঠা মানুষের বিবেকের প্রতিস্বর সমসাময়িক লেখক নাট্যকাররা ক্ষোভ প্রকাশের তথা প্রতিরোধের পথ হাতড়চ্ছেন। ধনবাদী ব্যবস্থার বিষদাঁতটির হদিশ পেয়ে যিনি এই অমাবস্যার আগেই রূপক আর সংকেতের সাহায্যে মানুষকে সাবধান করতে এগিয়ে এসেছিলেন তার নাম রবীন্দ্রনাথ আর সাংকেতিক রচনাটির নাম ‘রক্তকরবী’। শম্ভু মিত্রের মতো প্রতিভাবান নাট্যনিয়ন্ত্রকের প্রয়াসে ‘রক্তকরবী’-কে বাঙালী থিয়েটার যখন মুগ্ধ বিস্ময়ে গ্রহণ করল তখন ধনতন্ত্রের বিষদাঁত এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বিস্তীর্ণ মৃগয়াক্ষেত্রে তীক্ষ্ণভাবে গেড়ে বসেছে। যক্ষপুরীতে সহস্র রঞ্জনদের লাশ আঁকড়ে শৃঙ্খলিত পাগল ভাইয়ের কান্নার গান শুনতে শুনতে অসংখ্য নন্দিনী হাহাকার করছে। ধনতন্ত্রের এই দানবীয় সন্ত্রাসের চেহারাটি যে রবীন্দ্রনাথ সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, তার অজস্র প্রমাণ তার প্রবন্ধ, কবিতা।

তবে চল্লিশের দশকে দুনিয়া জুড়ে উপনিবেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের জালবিস্তার, বিশ্বযুদ্ধের দামামা, নির্বিচার লুণ্ঠন আর অত্যাচারের ফলশ্রুতিতে দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া, অবাধ কালোবাজারি যে হতাশা আর অন্ধকার বয়ে এনেছিল, তা দূর করার জন্য সাংকেতিক নাটক বুদ্ধিদীপ্ত রূপকের চাইতেও প্রয়োজন অনুভূত হল, সহজভাবে, অব্যর্থ সাবলীলতায় আর সরল বাস্তববোধে দুঃসহনীয় বর্তমানকে তুলে ধরা নাটক, গান আর শিল্পকলার। এই প্রতিকূল পরিবেশেই গণনাট্য সংঘের আবির্ভাব। এই আবির্ভাব ঐতিহাসিক হলেও আকস্মিক ছিল না। বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদী ড্রাগন তখন আগুনে ক্ষুধা মেটাবার প্রতিযোগিতায় উন্মত্তভাবে ঝাপিয়ে পড়েছে লুণ্ঠিত, অনুন্নত, অবদমিত উপনিবেশগুলোর উপর। মরিয়া মানুষগুলো তখন প্রতিবাদের পথ খুঁজছে। লেনিনের নেতৃত্বে দুনিয়া কাঁপানো দশদিনের বিপ্লব সারা পৃথিবীর অবদমিত মানুষের মনে তখন নতুন করে বেঁচে থাকার দুর্গম স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এ দেশেও তাই নিস্তেজ নিরামিষ সাংস্কৃতিক চর্চার বিপ্রতীপে গড়ে উঠল বিকল্প সাহিত্য আর সংস্কৃতির আন্দোলন। সাম্রাজ্যবাদ আর বেপরোয়া ধ্বংসলীলায় অতৃপ্ত জাপানি ফ্যাসিবাদ যখন পূর্ব গোলার্ধের এই লুণ্ঠিত স্বর্ণভূমে প্রলয়-আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তখন ফ্যাসিবাদ বিরোধিতার ডাকে সাড়া দিতে এগিয়ে এলেন বাংলার জাগ্রত বিবেক, রবীন্দ্রনাথ অকুণ্ঠ আবেগে পশুপতির বিরুদ্ধে মানবিকতার উত্থানকে আহ্বান করলেন। ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক সংঘ আর তার শাখা গণনাট্য সংঘের পতাকার তলায় তখন, একঙ্গে অনেক প্রতিবাদী প্রতিভা। নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা থেকে নৃত্যশিল্পী, চিত্রশিল্পী – চারপাশে ঘোর অন্ধকারে চল্লিশের দশকের বাংলায় তখন একসঙ্গে অনেক তিমিরবিনাশী সংগ্রামী ব্যক্তিত্বের আশ্চর্য মিছিল। বিনয় রায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, নিবারণ পণ্ডিত, সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস প্রমুখের গান, কবিতা, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমুখের মধুর উদার কণ্ঠ, চিত্রপ্রসাদ, জয়নুল আবেদিনের ছবি, রবিশংকর, তিমিরবরণের বাজনার সুর, উদয়শঙ্কর অমলাশঙ্কর-এর নৃত্যশৈলী – বাংলা থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে জোরাল এক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের তরঙ্গ। নাট্যক্ষেত্রেও তখন শ্রমিক কৃষকের শোষণবিরোধী, ফ্যাসিবাদ বিরোধী, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সৃজনী বৈভব। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মার্কসীয় চিন্তাধারা যে নাটকেও সম্যকভাবে প্রতিফলিত হতে পারে তার প্রমাণ হিসেব রচিত হয় জলি কাউরের ‘দ্যা পলিটিশিয়ান’ জ্যোতিরিন্দ্র সেনগুপ্ত ‘মহাযুদ্ধের ফলে’ প্রমুখ নাটকগুলো। যদিও এই নাটকগুলোর অভিনয়ের কোনো প্রামাণ্য দলিল এখনও মেলেনি, তবু বাংলার বুদ্ধিজীবী মহল যে রাজাবাদশার কাহিনি, পুরাণের আখ্যান, কিংবা পারিবারিক মেলোড্রামা আর প্রহসনের গড্ডালিকা স্রোত এড়িয়ে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে সমাজ আর দেশের জাতীয় আর আন্তর্জাতিক শত্রুকে অভ্রান্তভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টায় ব্রতী হলেন চল্লিশের দশকে গণনাট্য আন্দোলন তারই উজ্জ্বল অভিজ্ঞান। আর এই অভিযানের পিছনে অনুভবের কাজ করে গেছে ম্যাক্সিম গোর্কি, রঁল্যা প্রমুখের সৃজনবৈভব, আন্দোলন আহ্বান ও তৎপরতা। ১৯৪৩-এর মে মাসে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ মঞ্চস্থ করে বিজন ভট্টাচার্যের বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে লেখা অসাধারণ নাটিকা ‘হোমিওপ্যাথি’ আর বিজন ভট্টাচার্যের ‘জবানবন্দী’ একই মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় স্টার থিয়েটারে ১৯৪৪-এর ৩ জানুয়ারি। বাংলা মঞ্চে এই প্রথম সমকালীন রূঢ় বাস্তবকে নির্মোহ বলিষ্ঠতায় প্রতিফলিত করার উল্লেখযোগ্য প্রয়াস লক্ষিত হয়। ১৯৪৪-এর ২৪ অক্টোবর বাংলার প্রগতি নাট্য আন্দোলনের যুগান্তকারী সৃষ্টি বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন’ নাটকের অভিনয় হল শ্রীরঙ্গমে, এই নাটকটি ফ্যাসিবাদ বা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের অনিবার্য অনুষঙ্গ দুর্ভিক্ষ আর মন্বন্তরের অবিস্মরণীয় দলিল। উনিশ শতকের প্রতিবাদী নাটকের মাইলস্টোন যদি হয় নীলদর্পণ’ তবে বিশ শতকের চাশের ঝোড়ো দশকে ‘নবান্ন’ হচ্ছে বাস্তববাদী চেতনা আর শোষণ বিরোধী এতবাদের নয়া বাঁকের দিকে মুখ ফেরানো সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি বা টার্নিং পয়েন্ট। বিজন ভট্টাচার্যের পরবর্তী নাটকগুলিতে বিশেষ করে ‘কলকে’ (১৯৪৬) আর ‘মরা চাঁদ’ (১৯৪৩) রচনায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা আর যুদ্ধের বিরুদ্ধে গভীর প্রতিবাদ চিত্রিত। ১৩৫০-এর বাংলায় মন্বন্তরের পটভমিতে তুলসী লাহিড়ীর ‘দুঃখীর ইমান’ নাটকেও প্রচ্ছন্ন গোর্কির শোষণবিরোধী কলমের প্রভাব।

পূর্ণ নাট্যের দিন, উজ্জ্বল দিন, তাতে স্বপ্ন রঙীন, চল্লিশের দশকের মধ্য পর্বেই তার সূচনা। রবিশঙ্কর, উদয়শঙ্কর, হেমন্ত মখার্জী, সলিল চৌধুরী, দেবব্রত বিশ্বাস, বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র, গঙ্গাপদ বসু, চিত্তপ্রসাদ জয়নুল আবেদিন, খালেদ চৌধুরী প্রমুখের সৃজন বৈভবে আই. পি. টি. এ. সারা দেশে এক নির্বিকল্প সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছিল। নাটকে, গণসংগীতে, নৃত্যে, চিত্রকলায় সাধারণ মানুষের সুখদুঃখ, উল্লাসযন্ত্রণা, শোষণমুক্তির এষণা – সবকিছু বিধৃত হচ্ছিল আই. পি. টি. এ.-র বহুবাণী তৎপরতায়। এই সেদিন ৯৩ বছরে পৌঁছে তার শেষ স্মৃতিচারণে খালেদ চৌধুরী বলছিলেন — সমস্ত লেখক শিল্পীদের সংঘবদ্ধ করে আই. পি. টি. এ.-কে ওইভাবে সমৃদ্ধ করার পেছনে সব চাইতে বেশি অবদান পি. সি. যোশীর। তিনি বিশ্বাস করতেন, “শিল্পটাকে শিল্পের মত থাকতে দেওয়া উচিত। সেটাকে প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হিসেবে দেখা উচিত নয়।”

শুদ্ধ বিপ্লবী কথাঃ স্তালিন-জমানার উপান্তকাল

আশাহত গোর্কির মৃত্যুর ১০ বছরে মধ্যে গোর্কির শেষ জীবন ও আশাহত পরিণতির সংঘে গণনাট্য সংঘের একটা বড় অংশেই কী আশ্চর্য মিল। সোভিয়েত রাশিয়ায় ১৯৪৬-এর আগস্টে কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কমিটি সাহিত্য ও শিল্প সম্পর্কে যে ইস্তাহার প্রকাশ করেছিল তাতে সেই সময়ের পরিচিত নাট্যকারদের সম্পর্কিত বক্তব্য ছিল “These playwrights forget that the Soviet Theatre can discharge it important function of educating the working people only if it becomes an active propagandist of the policy of the Soviet State which constitutes the vital foundation of the Soviet system.”

এই উপদেশের অনুষঙ্গে এ রাজ্যের গণনাট্য সংঘের অন্যতম প্রধান সংগঠক সুধী প্রধান লিখেছেন – “চল্লিশের দশকে ভারতবর্ষে শিল্পকলার ক্ষেত্রে সবকিছুকে আমরা জনমুখী করতে চেয়েছিলাম। আমার কাছে নিসর্গের কোন মূল্য নেই। আমি মনে করি Man is the matter of all things. সুতরাং আমরা চেষ্টা করেছিলাম মানুষের সৃষ্টিকান্ডকে প্রোমোট করতে।”

সাধারণ মানুষের সৃষ্টিকাণ্ডকে প্রোমোটের কয়েকটি দৃষ্টান্ত প্রসঙ্গক্রমে তিনি রেখেছেন যেমন – ‘তারা চিত্তপ্রসাদকেও তুলেছেন, খালেদ চৌধুরী কলকাতায় এসে গোয়াবাগানের কমিউনে থাকতেন বলেই, খালেদ তার প্রতিভাকে বিকশিত করতে পেরেছে। এবং রবিশংকর। রবিশঙ্করকে পনেরো মিনিট বাজাতে দিতাম, তখন তাঁকে কেউ চিনত না, এইভাবে শম্ভ মিত্র, উৎপল দত্ত সম্পকেও অবিশ্বাস্য মতামত অক্লেশে উচ্চারণ করেছেন তিনি, যা হয়তো পার্টির অনেক আত্মজয়ী মানুষের (দায়িত্বপ্রাপ্ত সংগঠকের) হাস্যকর মূল্যায়নের সমন্বয়।

যাঁরা বলেন সোভিয়েত রাষ্ট্রের নীতিগুলিকে জনপ্রিয় করার প্রোপাগান্ডা করাই নাট্যকারদের কাজ সেই হাস্যকর সিদ্ধান্তের সমান্তরাল, গণনাট্য সংঘের নেতৃত্বের এইসব মন্তব্যকে স্বচ্ছন্দ রাখা যায়।

১) “রবিশঙ্কর কি এসেছেন কৃষককে মাঠে ঘামে সেতার বাজানো শেখানোর জন্য? এঁরা কী জন্য এসেছিলেন? অন্য কোন পার্টি তখন শিল্পের জন্য কিছু করছে না। শিল্পের জন্য তখন মড়াকান্না, সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির মতো একটা পার্টি অলরেডি শিল্প নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছে। তারা একটা অল ইন্ডিয়া প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে ফেলেছে। ন্যাচারালি তখন তাঁরা ছুটলেন। তখন দুটো বিখ্যাত লোক – হরেন ঘোষ আর সতু সেন – এঁরা এসেছিল বিপ্লব করতে নাকি? এঁরা এসেছিল They wanted to have a platform. এঁরা এসেছিল বলেই যে আমরা গদগদ হলাম তা নয়। শিশির ভাদুরী বা উদয়শঙ্করের দিকে তাকিয়ে থাকলে আই. পি. টি. এ. তৈরি হত নাকি? আমাদের সংগঠন ইন্ডিপেডেন্টলি মুভ নিচ্ছিল বলেই তাঁরা এসেছিলেন। রবিশঙ্কর তখন যা আরম্ভ করেছিলেন সেকথা পাবলিকলি বলা যাবে না। রবিশঙ্করকে পনেরো মিনিট বাজাতে দিতাম, তখন তাকে কেউ চিনত না। এঁরা এসেছিল নিজের নিজের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে নিতে।” (সংস্কৃতি প্রগতি’, সুধী প্রধান)

২) “প্রথম প্রথম স্কোয়াডে এসে কাজের স্বাধীনতা। পার্টির ততখানি উপস্থিতি বোধ করিনি। ক্রমে ক্রমে পার্টির অফিস থেকে নানারকম ফরমায়েস আসতে শুরু করল। যেখানটায় অসুবিধা দেখা দিল তা হল ওদের পার্টির হুকুম, অর্ডার নিয়ে। …একটা সময় বুঝতে পারছিলাম, বড়ো বেশি মাপজোকের মধ্যে প্রবেশ করছি …ক্রমে পার্টি অফিসের প্রস্তাবগুলি একটু যেন বেশি আসতে লাগল – নিশ্চয়ই খুব ভালো উদ্দেশ্য, এবং ওদের জোরটা ক্রমশ বেড়ে গেল, শিল্পের দিকটায় আগ্রহ যেন কমতে থাকল। কোনও অ্যাবস্ট্রাকশন, কোনও পিওর আটিস্টিক কিছু ওদের সূচি বহির্ভূত ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পটভূমিতেও যতখানি করা যেত, আমার মনে হল, ঠিক ততটাতেও ওদের নজর নেই। …বুঝলাম, ওদের মূল দৃষ্টি কোনো টিপিক্যাল ইস্যু নিয়ে কাজ করা। স্থায়ী সাহিত্যের সঙ্গে সাংবাদিকতার যে দূরত্ব, এদের কাজ কারবারের সঙ্গে দেখলাম স্থায়ী কোনো শৈল্পিক কাজের সেই দূরত্ব থেকে গেছে। …এটা করো, এটা বাদ দাও – প্রায়ই এই নির্দেশ আমার কাছে পীড়াদায়ক হয়ে উঠল। কীরকম যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ঠেকতে লাগল।” (রাগ অনুরাগ)

৩) ‘…তখন গান এত বেশি ডিরেক্ট করতে হল, কিছু লোক বলল, যে আপনার সমস্ত কিছু সোজাসুজি বলবেন, সোজাসুজি করতে গিয়ে প্রচণ্ড ক্রুড ব্যাপার হতে শুরু করল, যেমন একটা গান গাওয়া হল, গানের মধ্যে ‘শালা বিধান রায়’, ‘শালা নলিনী সরকার’ এইসব ঢোকানো হল… সেই সময় অনেকেই আইপিটিএ-র বাঁধন ছিড়ে বেরিয়ে আসছেন। শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর মতন শিল্পীদের সঙ্গে সূধী প্রধান ও অন্যান্য সংগঠকদের মতান্তর কাজ করার পরিবেশকে নষ্ট করে দিচ্ছে। সেই কারণে ওই সময় এক ঝাক শিল্পী বেরিয়ে এলেন আই. পি. টি. এ. থেকে। প্রগতি লেখক শিল্পী সংঘের আদর্শ ও কর্মসূচিতে অনুপ্রাণিত হয়ে যেসব নবীন প্রতিভা এককাট্টা হয়েছিল তারা আশাহত হয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল।

শিল্পী ও শিল্পীদের ওপর পার্টির খবরদারি সত্ত্বেও অনেকেই ওই সময় আই. পি. টি. এ.-তে থেকে গিয়েছিলেন সংগঠনের স্বার্থে। কিন্তু পরবর্তীকালে শিল্পবোধহীন নেতৃত্বের হাতে তাদের কীভাবে হেনস্তা হতে হয়েছিল তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ঋত্বিক ঘটক ও চিত্তপ্রসাদ…।’ (খালেদ চৌধুরীর সঙ্গে কথোপকথন)

আজ এ রাজ্যে গণনাট্য সংঘের ৭৫ বছর পূর্তি উত্তর কঠিন সময়ে দক্ষিণপন্থী নয়া ফ্যাসিস্তদের সমবেত কিংবা ভিন্ন ভিন্ন প্রবল ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে (বামপন্থীদের দীর্ঘদিনের আত্মতৃপ্তি ও সংগঠিক দুর্বলতার) প্রায়শ্চিত্তের আবহে নতুন বোধ আর ভাবনায় সন্দীপিত ভারতীয় গণনাট্য সংঘ যদি এই প্রতিবেদনের মতো লেখাগুলিকে বা বক্তব্যগুলিকে যুক্তি নির্ভর সহনশীলতা আর উদার কালচেতনা দিয়ে গ্রহণ করে তবেই নতুন প্রজন্মের নতুন নেতৃত্বের নতুন লড়াকু দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নতুন দিনের সংস্কৃতি-আন্দোলনের অপরাজেয় সখ্য বা বৃন্দগান রচিত হতে পারে। উদ্ভম থেকে উদ্ভাসের কালোচিত পথে পা বাড়াতে পারে ৭৫ বছরের গণনাট্য সংঘের জরাজয়ী যৌবন।

তথ্যসূত্রঃ

১. স্মৃতিকথা, শিল্পকথা প্রদোষ দাশগুপ্ত, পৃ. ২৭

২. সংস্কৃতি প্রগতি, সুধী প্রধান, পস্তক বিপণি, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ – বৈশাখ, ১৩৬৯।

৩. রাগ অনুরাগ’, রবিশঙ্কর।

৪. খালেদ চৌধুরীর সঙ্গে কথোপকথন – প্রদীপ দত্ত (একুশ শতক, আগস্ট সংখ্যা)।

প্রায় চল্লিশ বছর ধরে ইংরেজি সাহিত্যে শিক্ষকতা করেছেন। তবে মূল পরিচিতি বাংলার অন্যতম সেরা নাট্যকার হিসেবে। পরিচিত হয়েছেন মৌলিক নাটক, উপন্যাসের নাট্যায়ন, বিদেশী নাটকের রূপান্তর ইত্যাদির মধ্য দিয়ে।

মন্তব্য তালিকা - “গণনাট্য সংঘ ৭৫ – গোর্কি : গণনাট্য সংঘ উদ্ভাস থেকে উদ্ভ্রম”

  1. সব দেশের সব পার্টিতেই আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাবের ফলে দলদাসত্ব কায়েম হয়ে পার্টি এবং গণসংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার রিসার্চ ফেলো হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়ে দেখেছি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব কিছু পাওয়া সত্বেও ।সাধারণ মানুষের একটি বড় পরেঅংশ সরকার বিরোধী। ১৯৭৭ সালের পরব‍র্তী ৩৪ বছরে দেখেছি পার্টির আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র বিলুপ্ত করে দলদাসত্ব নির্ভর পার্টির প্রশাসন দ্রুত নিজেদের জনবিচ্ছিন্ন করছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।