সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ইতিহাসে উপেক্ষিত অমরকাহিনি: ফকির এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অনন্য বীরগাথা – প্রথম পর্ব

ইতিহাসে উপেক্ষিত অমরকাহিনি: ফকির এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অনন্য বীরগাথা – প্রথম পর্ব

অভিজিৎ সেনগুপ্ত

জুন ৮, ২০২২ ১৪৯

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কি? 

আধুনিক সামাজিক রাজনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষতা হলো সর্বপ্রকার ধর্মীয় প্রবণতা ও প্রভাব মুক্ত শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে ধর্ম এবং রাষ্ট্রকে পৃথক করা এবং সমস্তরকম ধর্মীয় ভেদাভেদ মুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। ধর্মনিরপেক্ষতার বা ‘secularism’-এর কথা পড়তে গেলে আধুনিক ইতিহাস এমনকি গুগলেও জর্জ জ্যাকব ইলিয়কের (১৮১৭ – ১৯০৬) নাম পাবেন আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার প্রবর্তক হিসাবে।

জর্জ ইলিয়ক সাহেবের জন্ম ১৮১৭ সালে। আজকে ক’জন জানে যে তাঁর জন্মের অনেক আগে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতা অর্থাৎ কূপমণ্ডূক ধর্মীয় চেতনার ঊর্ধ্বে উঠে কিভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করতে হয়, কিভাবে জনসাধারণের প্রয়োজনকে সর্বোত্তম স্বীকৃতি দিতে হয়, তার প্রয়োগ এই বাংলার বুকেই হয়েছিল। হ্যাঁ, একে আপনারা মার্ক্সের আগেই গণবিদ্রোহের প্রয়োগও বলতে পারেন।

শুরু করছি বাংলা তথা ভারতের  ইতিহাসের অত্যন্ত  গৌরবময় কিন্তু অজানা কারণে উপেক্ষিত ফকির আর সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অমর গাথা। এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিল মাদারিয়া সম্প্রদায়ের ফকির  মজনু শাহ আর তাঁর সর্বোত্তম সহযোগী আরেক অনবদ্য নেতা সন্ন্যাসী ভবানী পাঠক। সঙ্গে ছিলেন লোকগাথায় অমর দেবী চৌধুরানী, নুরুলউদ্দিন, রামানন্দ গোঁসাই এবং আরও অনেকে। 

না, এ গাথা সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠের বা দেবী চৌধুরানী উপন্যাসের গল্প নয়, তাই এখানে প্রফুল্লও দেবী চৌধুরানী নয়। ফকির বিদ্রোহ বা মজনু শাহকে বাদ দিয়ে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের গল্পও এটা নয়।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর

১১৭৬ বঙ্গাব্দে, ইংরেজি ১৭৭০ সালে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তা ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে বিখ্যাত। অনাবৃষ্টি এদেশে আগেও হয়েছে, কিন্তু সদ্য পলাশীর যুদ্ধে জয়ী ব্রিটিশ কোম্পানির মতো আগের দেশীয় শাসক এই হারে অনাবৃষ্টির সময় অতিমাত্রায় (বা অতিরিক্ত) খাজনা বসিয়ে জনসাধারণের জীবনে দুর্ভোগ নামিয়ে আনেননি। দেশের সম্পদ এভাবে কখনও বিদেশীদের হাতে চলে যায়নি। ১৭৬৮ থেকে যে অনাবৃষ্টি আর দুর্ভিক্ষের শুরু হয়েছিল, তা কোম্পানির কুশাসনে তথা সীমাহীন শোষণে ভয়ঙ্কর এক রূপ নেয় ১৭৭০ সালে। গ্রামে গ্রামে এত পরিমাণে কৃষক আর সাধারণ মানুষের অনাহারে মৃত্যু হয় যে, সেই ভয়ানক ইতিহাস লোকমুখে অমর হয়ে আছে আতঙ্কের, মড়কের ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে।

ফকির এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহ

মুঘলদের পতনের সময়কাল থেকেই সে যুগের সমাজে মাদারি তরিকার ফকির আর দশনামী নাগা বা গিরি সন্ন্যাসীদের প্রভাব বাড়ছিল। এঁরা মূলত ছিলেন ভিক্ষাজীবী। কিন্তু তখন ভিক্ষা কোনোভাবেই নিন্দনীয় ছিল না। সাধারণ মানুষ সেই যুগে ফকির বা সন্ন্যাসীদের আনন্দের সঙ্গেই মুক্তহস্তে দান করতেন। কিন্তু ব্রিটিশ কোম্পানি এইসব স্বতন্ত্র ভারতীয় রীতিনীতির সাথে একেবারেই অপরিচিত ছিল। ব্রিটিশরা নিষেধাজ্ঞা এবং দমননীতি প্রয়োগ করে ফকির এবং সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে। লর্ড হেস্টিংসের ভাষায় এরা যাযাবর লুঠেরাগোত্রীয়। এদিকে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে হেস্টিংসের চাপানো অতিরিক্ত খাজনার চাপে সাধারণ মানুষ ক্রমশ দান দিতে অপারগ হয়ে ওঠেন। আর তার চরমতম অবস্থা হয় ইতিহাসের সবচাইতে কুখ্যাত মন্বন্তরের সময়। গ্রামকে গ্রাম খাদ্যের অভাবে শামিল হয়েছিল এক ভয়াবহ মৃত্যুমিছিলে। ফলত গৃহস্থের আর অবস্থা ছিল না দান করার। দান তখন বিলাসিতা।

১৭৬০ সাল থেকেই ক্রমশ মানুষের ক্ষোভ আর সন্ন্যাসী ও মাদারিয়া ফকিরদের ক্রোধ মিলে মিশে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে খণ্ড খণ্ড বিদ্রোহের আকারে জ্বলতে শুরু করে। কিন্তু তা পূর্নাঙ্গ ব্রিটিশ বিরোধীতা বলা যায় না। অর্থ আর  উপাধি পাওয়ার লোভে ব্রিটিশদের নেকনজরে থাকতে তাদের  মোসাহেবি করা অত্যাচারী জমিদার শ্রেণির বিরোধীতা প্রকৃত বিদ্রোহের রূপ পায় মাদারিয়া তরিকার ফকির মজনু শাহ আর তাঁর প্রধান সহযোগী ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে। সঙ্গে ছিল রামানন্দ গোঁসাই, কৃষকনেতা নুরুলউদ্দিনের মতো সুযোগ্য সহযোগীরা। কিছু সময় পরে এই বিদ্রোহে যোগদান করেন গ্রাম বাংলার লোকগাথার আর এক মহানায়িকা দেবী চৌধুরানী। 

মজনু শাহ

মজনু শাহ কোন দার-উল-ইসলামের স্বপ্নবিলাসী নেতা বা তিতুমীরের মত বিতর্কিত কোন চরিত্র নন। বরং আধুনিক রাজনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার অন্যতম প্রধান দিশারী ছিলেন।  যদিও দুঃখজনকভাবে চলতি ইতিহাস তাকে কখনই যোগ্য সম্মান দেয়নি।

মজনু শাহের বুরহান (কথিত আছে পরে তিনি বুরহান তরিকার ফকিরীকেও আপন করে নেন) পরিচয় নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে প্রচুর বিতর্ক আছে। সম্ভবত ১৭৩৬ বা ৩৭ সাল নাগাদ এর জন্ম হয় গোয়ালিয়রের কাছে কিংবা বিহার সংলগ্ন মাখনপুরে। আরেকটা মত হল, রংপুরের ভূস্বামী বাকের আলিরই ছদ্মনাম মজনু শাহ। তবে নগেন্দ্রনাথ বসু বা আমানাতুল্লা আহমদ ছাড়া কেউই এই মতটি সমর্থন করেন না। 

জানা যায়, অল্প বয়সে মজনু শাহর সাধ জাগে ফকির হবার এবং তিনি স্বপ্নাদেশ পেয়ে বাংলার বীরভূমে পৌঁছন। কেউ কেউ বলেন মীর কাশিমের ব্রিটিশ বিরোধী যুদ্ধেও মজনু শাহ অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু যতদূর জানা যায় বাংলায় এসে মূলত ১৭৭০ সালের মন্বন্তরের সময় তিনি খণ্ড বিখণ্ড সন্ন্যাসী এবং ফকির বিদ্রোহের রাশ হাতে নেন। প্রথমেই তিনি ধর্মীয় ভেদাভেদকে দুরে সরিয়ে সন্ন্যাসী আর ফকিরদের এক ছাতার তলায় নিয়ে আসেন। তারপর দুর্ভিক্ষপীড়িত কৃষকদের সঙ্গে বোঝাপড়া করেন। কৃষকদের মধ্যে থেকে উঠে আসেন কৃষক নেতা নুরুলউদ্দিন। সন্ন্যাসীদের নেতা ভবানী পাঠক আর রামানন্দ গোঁসাইয়ের সঙ্গে তৈরি করেন এমন এক বোঝাপড়া আর বিশ্বাসের সম্পর্ক যা আমৃত্যু অটুট ছিল। এইভাবে মজনু শাহ খণ্ড বিখণ্ড ছোটো ছোটো ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহকে ঐক্যবদ্ধ করে এক বৃহত্তর গণবিদ্রোহের পথে চালিত করেন। 

ভবানী পাঠক

ইতিহাসের ভবানী পাঠকের স্থান অনন্য। শোনা যায় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর কাছেও অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন তিনি। দূর্গাপুর সংলগ্ন এলাকায় আজও ভবানী পাঠকের মন্দির এবং সুরঙ্গের দেখা পাওয়া যায়। এছাড়াও ১৭৭০ থেকে ৭৩ এর মধ্যে এই বাংলার বিভিন্ন জায়গায় নির্মিত শিবমন্দিরগুলিতে আজও ভবানী পাঠক নামক মানুষটি ইতিহাসে এক অজানা মহানায়কের সরব উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে। লোককথায় জানা যায় এই মন্দিরগুলি আর কিছু মাদারিয়া সম্প্রদায়ের আখড়া থেকে মজনু শাহ আর ভবানী পাঠকরা দুর্ভিক্ষপীড়িত অসহায় কৃষকদের সংগঠিত করতেন। 

ভবানী পাঠক ছিলেন ঠিক মজনু শাহের মতোই হিন্দু – মুসলিম নির্বিশেষে সমস্ত দরিদ্র কৃষকসমাজ এবং ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহের এক অবিসংবাদিত নেতা। যতদূর জানা যায়, তিনি বর্তমান ভোজপুর অঞ্চলের আরা জেলা থেকে এসেছিলেন। কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে তিনি দেবী চৌধুরানীর সহচর বা নায়েব ছিলেন। কিন্তু সন্ন্যাসী বিদ্রোহে ভবানী পাঠকের উপস্থিতি দেবী চৌধুরানীর আগে থেকেই ছিল। পরবর্তী কালের দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনকারী ডাকাতদের কল্পনার মুল উৎসই ছিলেন এই ভবানী পাঠক। 

দেবী চৌধুরানী

ইনি কোন উপন্যাসে বর্ণিত ঘরোয়া মেয়ে প্রফুল্ল নন আর উপন্যাসের মতো শেষ পর্যন্ত ঘরেও ফিরে যাননি।  অধুনা বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের পীরগাছা মন্থনা এস্টেটের জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ/নারায়ণ চন্দ্র চৌধুরীর সহধর্মিণী দেবী জয়দূর্গা চৌধুরানীই আসল দেবী চৌধুরানী। ইনিই বাংলার হতদরিদ্র, দুর্ভিক্ষপীড়িত কৃষককুলের অন্যতম পরিত্রাতা তথা সন্ন্যাসী এবং ফকির বিদ্রোহের বিখ্যাত মহানায়িকা দেবী চৌধুরানী। 

আজও বাংলাদেশের রংপুরে দেবী চৌধুরানীর নামে স্টেশন আছে, আছে চৌধুরানী কলেজ। পীরগাছা অঞ্চলে বা জলপাইগুড়ি অঞ্চলে আজও পাওয়া যায় দেবী চৌধুরানীর অসংখ্য নিশান। ব্রিটিশদের সাথে কৃষক এবং জনসাধারণের সম্মুখ সংঘর্ষে এই মহিয়সী নারী নিজে জমিদার হয়েও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন ভবানী পাঠক, মজনু শাহ, রামানন্দ গোঁসাই বা নুরুলউদ্দিনের সঙ্গে। বারবার বিপন্ন হয়েছে তাঁর প্রাণ। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের সেই প্রাণটুকুও যুদ্ধে বিসর্জন  দিয়ে শহীদ হয়েছিলেন সাধারণ নিরন্ন মানুষগুলোর জন্যে। 

আমরা তাঁকে কতটা মনে রেখেছি? 

কজন জানি লোকগাথায় অমর দেবী চৌধুরানী আসলে কে ছিলেন? কি তাঁর পরিচয়?

মনে রাখবেন, উপন্যাসের প্রফুল্লর মতো তাঁর কিন্তু সম্ভবত আর ঘরে ফেরা হয়নি। 

দেবী চৌধুরানীর উৎস সন্ধানে

দেবী চৌধুরানী বাংলা আর বাঙালির অন্তঃকরণে আজও শিহরণ জাগানো এক নাম। গহীন অরণ্যে বা নদীমাতৃক বাংলার নদীনালা দিয়ে রাতের অন্ধকারে জলযুদ্ধে পারদর্শিনী এই অদ্ভুত নারীর রূপকথা যেন বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসকে অতিক্রম করে। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে অত্যাচারী, শোষক ব্রিটিশ কোম্পানি বা তার বশংবদ্ জমিদার বা দেওয়ান দেবী সিংহদের বিরুদ্ধে এমন এক প্রতিবাদী গাথা যা দুই বাংলার মানুষের রক্তে মিশে নানা লোকগান, লোকগাথা আর জাগের গানে আজও অমর হয়ে আছে। 

আসুন একটু দেখে নিই কেন মন্থনার জমিদার নারায়ণচন্দ্র চৌধুরী বা মতান্তরে নরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর পত্নী দেবী জয়দূর্গা চৌধুরানীকেই ইতিহাসবিদরা বাংলার  লোকগাথার মহানায়িকা দেবী চৌধুরানী বলে চিহ্নিত করছেন। প্রথমত, এখানে উল্লেখযোগ্য রংপুর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পাক্ষিক পত্রিকার সম্পাদক পঞ্চানন সরকার মহাশয়ের উদ্যোগ। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে পঞ্চানন সরকার মহাশয়ের সম্পাদনায় এই পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের জাগো গানগুলি পণ্ডিত যাদবেশ্বর তর্করত্নের সহায়তায় সম্পাদিত হয়। দ্বিতীয়ত, এর মধ্যে চারণকবি রতিরাম রায়ের (দাশ) দেবীসিংহের উৎপীড়ন সংক্রান্ত কাব্য থেকেও বিশেষভাবে ১৭৮৩ সালের রংপুর বিদ্রোহের সময় দেবী জয়দূর্গা চৌধুরানীর বিশেষ ভূমিকার কথা জানা যায় –

‘মন্থনার কর্ত্রী জয়দূর্গা দেবী চৌধুরাণী 

বড় বুদ্ধি বড় তেজ জগতে বাখানি’

এছাড়াও নথি থেকে বৃহত্তর রংপুরে আরও প্রায় ৭৫ জন পুরুষ এবং ১১ জন মহিলা জমিদারের খোঁজ পাওয়া যায়। এর মধ্যে রংপুর বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী জমিদার শিবচন্দ্র অন্যতম।  রংপুর বিদ্রোহে দেবী জগদীশ্বরী চৌধুরানী বলে আরও এক বীরাঙ্গনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এরপরেও পাঙ্গার রানী লক্ষ্মীপ্রিয়া ছিলেন আর এক বীরাঙ্গনা। 

দেবী চৌধুরানী আর ভবানী পাঠকের নানা নিদর্শন আপনারা দূর্গাপুর থেকে রংপুর, এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে পাবেন। পাবেন অসংখ্য জাগোগান তথা জাগের গান বা লোকগাথা। এইসব লোককথাকে সত্যি বলে ধরে নেবার কোন কারণ নেই। কিন্তু হারানো ইতিহাসের খোঁজে উপাদান হিসাবে এগুলির গুরুত্ব পুরোপুরি অস্বীকারও করা যায় না। আর স্থাপত্যগুলোকে অস্বীকার করার কোন যৌক্তিকতাও নেই। তাই আপাতত ধরা যেতে পারে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দাপিয়ে বেড়াতেন একের অধিক বীরাঙ্গনা। অত্যাচারী ব্রিটিশ কোম্পানি আর তার অনুচরদের লুঠপাটের বিরুদ্ধে ভবানী পাঠক, মজনু শাহদের সঙ্গে এইসব বীরাঙ্গনারাও সাধারণ নিরন্ন কৃষককুলের জন্যে বারবার অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। যাদের মধ্যে প্রধানা অবশ্যই দেবী জয়দূর্গা চৌধুরানী (১৭৬০/৬৫ থেকে ১৭৮৩, মতান্তরে ১৮০১)।

দেবী চৌধুরানী – ভবানী পাঠকের কিছু কথা

১৭৬৫ সাল নাগাদ সম্ভবত স্বামী নারায়ণচন্দ্র চৌধুরীর অকাল মৃত্যুর পর মন্থনার দায়িত্বভার হাতে নেন অসাধারণ মেধাসম্পন্না তেজস্বিনী তরুণী জয়দূর্গা চৌধুরানী। তারও আগে মাসিমপুরের যুদ্ধে, যা ইতিহাসে ‘ব্যাটল অফ্ মাসিমপুর’ নামে খ্যাত, সম্ভবত সেখানেও তিনি ভবানী পাঠক, বাকের আলিদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ‘সম্ভবত’ শব্দটা ব্যবহারের কারণ এই পর্যায়ের ইতিহাস কিছুটা ধোঁয়াশাময়ই বলা চলে।  যাই হোক তাঁর এই অসাধারণ মেধা আর তেজকে দেশের দুর্ভিক্ষপীড়িত, হতাশাগ্রস্ত অসহায় সাধারণ মানুষের কাজে লাগাতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন ব্রিটিশ বর্ণিত ডাকাত আর জনসাধারণের হৃদয়ের নায়ক ভবানী পাঠক। ১৭৭১ সালের ১৯ অক্টোবর  বাজেয়াপ্ত জমিদারির তালিকায় মন্থনার নামও ছিল। কিন্তু তিনি নিজবুদ্ধি আর তেজের মাধ্যমে এবং ভবানী পাঠক ও মজনু শাহর ঐকান্তিক সহায়তায় আবার ফিরে পেয়েছিলেন নিজের জমিদারী। সেই সময়ের মন্থনার বেশকিছু লেনদেনের মধ্যে দেবী জয়দূর্গা চৌধুরানীর জমি কেনাবেচা সংক্রান্ত তথ্য মেলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৭৭৩ সালের পীরপাল পাট্টা এবং ১৭৯১ সালের মুশকালি চুকানিপাট্টা। কথিত আছে ভবানী পাঠক এবং তাঁর আত্মীয়রা পরবর্তী কালে রংপুরের কাছে পাঠকপাড়া অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। এই তথ্য কতটা সত্যি বলা মুশকিল কিন্তু পাঠকপাড়া অঞ্চলটি আজও বর্তমান, এটুকু জানা যায়।

রামানন্দ গোঁসাই, বীর জয়রাম, দলীব খাঁ, আসলাদ খাঁ

১৭৬০ থেকে জ্বলে ওঠা এই বিদ্রোহের আগুন ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক লড়াই হয় সন্ন্যাসী, ফকির আর দুই বাংলা ও সংলগ্ন বিহারের কিছু জেলার অসহায় কৃষকদের সাথে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত , অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত ব্রিটিশ কোম্পানির আর দেওয়ান দেবী সিংহদের বিরুদ্ধে।  ১৭৬০ সালের সম্ভবত ইংরেজি ৯ ফেব্রুয়ারি তারিখে মাসিমপুরের যুদ্ধের সময় আরও কিছু খণ্ডযুদ্ধ হয় বাংলার নবাব আর ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে সন্ন্যাসী আর ফকিরদের। এই সময় ভবানী পাঠকের দল জয়লাভ করলেও দলীব খাঁ আর আসলাদ খাঁ অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে শহিদ হন। 

বীর জয়রামের কথা পাওয়া যায় ১৭৭৩-এর যুদ্ধ, যেখানে বীর জয়রাম কয়েকজন সিপাহীসহ সন্ন্যাসীদের সহায়তা করেছিলেন। তবে তিনি ধরা পড়ে যান, আর তাঁকে কামানের সামনে বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া যায়। 

কোচবিহার দিনহাটার রামানন্দ গোঁসাইের বীরত্ব বিভিন্ন লোকগানে গোঁসাইের কথা বলে পরিচিত। ১৭৭৬ সালে দিনহাটার যুদ্ধে তিনি ক্যাপ্টেন মরিসনের বাহিনীকে পরাজিত করেন। শোনা যায়, রামানন্দ গোঁসাই যখন দেখেন তাঁর কাছে অস্ত্র-শস্ত্রের পরিমাণ সীমিত ও সাধারণ, তখন তিনি গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে কোম্পানির বাহিনীর ওপর আক্রমণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত মরিসনের বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করতে সক্ষম হন। 

নুরুলউদ্দিন, দয়ারাম শীল আর দিরজি নারায়ণ

রংপুর বিদ্রোহের সময় থেকে কৃষকনেতা নুরুলউদ্দিনের কথা জানা যায়। সঙ্গে ছিলেন দিরজি নারায়ণ আর দয়ারাম শীল। ১৭৮৩ সালে রংপুর বিদ্রোহের ক্ষেত্রে এঁদের অবদান অস্বীকার্য। নুরুলউদ্দিন প্রথমে জমিদার শিবচন্দ্রের ডাকে এলেও পরে নিজেই কৃষক বিদ্রোহের রাশ হাতে নেন। লোককথা অনুসারে, এদের সঙ্গে দেবী জয়দূর্গা চৌধুরানীর যোগাযোগ হয় এবং প্রায় একই সঙ্গে লড়াইয়ের কথাও শোনা যায়। সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষের অভাবের প্রতি বিন্দুমাত্র নজর না দিয়ে ব্রিটিশ কোম্পানির মদতে খাজনা আদায়ের বাড়বাড়ন্তে অতিষ্ঠ জনসাধারণের শেষ আবেদনগুলিও অস্বীকৃত হলে নুরুলউদ্দিন নিজেই গরিব কৃষকদের খাজনা দিতে মানা করেন আর নিজেকে তাদের নবাব ব’লে ঘোষণা করে দেন। দয়ারাম শীলকে নিযুক্ত করেন নায়েব হিসাবে। 

পরবর্তীকালে যুদ্ধে শহীদ হলেও সামান্য কৃষককুলের  নবাব নুরুলউদ্দিন প্রকৃত অর্থেই ছিলেন সাধারণ মানুষের মনের নবাব। যিনি লোকগানে ‘নুরল দীন’ নামেও পরিচিত। ঠিক যেভাবে দেবী জয়দূর্গা চৌধুরানী ছিলেন হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সবার শ্রদ্ধেয়া দেবী রাণী বা চন্ডি মা। 

এছাড়াও এই বিদ্রোহে মুসা শাহ, মোহন গিরি, চেরাগ আলি, শোভান আলি, পীতাম্বর, বৈকুন্ঠপুর লড়াইয়ের সাধক কৃপানাথ, অনুপ নারায়ণ, শ্রীনিবাস এবং আরও অসংখ্য বিদ্রোহী সন্ন্যাসী, ফকির আর কৃষকদের নাম দুই বাংলার  মানুষের মুখে মুখে অমর হয়ে আছে।

ফকির এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কারণসমূহ আলোচনা করতে গেলে ইতিহাসের প্রশ্নোত্তরের ধাঁচে এক, দুই করে কারণগুলো বলা যেতে পারে। কিন্তু তাহলে সেটা অনেকটাই ছোটবেলার পরীক্ষায় প্রশ্নোত্তরের মতো দেখাবে।  তাই এই পর্বে আমরা এই বিদ্রোহের কারণসমূহকে শুধুমাত্র তিনটি ভাগে বিভক্ত করে আলোচনা করব –

১) সামাজিক বিশ্লেষণ 

২) ধর্মনিরপেক্ষ শোষক না স্বার্থের অপার মহিমা 

৩) দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার

এই কারণগুলি কিভাবে সামাজিক সমীকরণে বদল ঘটিয়েছিল এবং কিভাবে গ্রামীণ প্রজাকুলও ফকির আর সন্ন্যাসীদের সঙ্গে এই বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়ে তার বিশ্লেষণমূলক আলোচনা আমরা পরের পর্বে করব। 

সামাজিক বিশ্লেষণ

বাংলা এবং বাংলার সমকালীন সমাজ

প্রকৃতির অসীম দান চিরদিনই এই বাংলায় যথেষ্ট পরিমাণে ছিল। বাংলা আর সাধারণ বাঙালির ঘরে তাই অন্নাভাব খুব একটা কখনওই ছিল না। এদেশের জলহাওয়ায় বোধহয় কোনও এক অন্যরকম মায়াচ্ছন্নতা সেই সুদূর অতীত থেকেই ছিল। তাই এই বাংলায় এসে এক প্রজন্মেই বহিরাগত শাসকদের চরিত্রে পর্যন্ত নানান পরিবর্তন দেখা যেত। তাই তাঁদের বৈষ্ণব সাহিত্য বা কবি কৃত্তিবাসের মত মহান সাহিত্যস্রষ্টাদের সহায়তা করতে কখনই অসুবিধা হয়নি। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে সত্যনারায়ণ আর সত্যপীর বা বনবিবি আর দক্ষিণরায় করে নিয়েছিল নিজেদের জায়গা। সাধারণ গ্রামীণ জীবনে শাসকদের সিংহাসনের লড়াই সেভাবে কখনওই প্রভাব ফেলেনি, কারণ সব শাসকই প্রায় এখানে বসবাস করতে চেয়েছিলেন। তারা প্রজাকুলের কাছে অবশ্যই খাজনা আদায় করতেন। বিচ্ছিন্ন অত্যাচার বা নিপীড়নের ঘটনাও যথেষ্টই ছিল, কিন্তু সামগ্রিকভাবে তারা একটা কথা খুব ভাল করে বুঝতেন – সেটা হল খাজনা পেতে হলে গ্রামীণ প্রজাকুলকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কৃষক সুরক্ষিত থাকলেই সব ঠিক চলবে। বিভিন্ন কারণে সমালোচিত হলেও শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলাও কিন্তু এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। অবশ্যই এটা মানতে হবে সিরাজউদৌল্লার বেশ কিছু কর্মকাণ্ড যথেষ্ট সমালোচনার যোগ্য।

কিন্তু সিরাজও তাঁর পূর্বসূরিদের পথ ধরেই এই বাংলার গ্রামীণ শান্ত, নিশ্চল সমাজকে কখনোই সামগ্রিক বিপদের দিকে ঠেলে দিতে চাননি। অবশ্যই এতে তাঁর নিজস্ব স্বার্থও নিহিত ছিল। কিন্তু শেষবিচারে সত্যিটা হল নবাব সিরাজউদৌল্লা বা পরবর্তীকালে মীর কাশিম কখনওই চাননি বাংলার সম্পদ লুঠেরাদের হাতে পড়ুক, বাংলার সাধারণ মানুষ অনাহারে, দারিদ্রে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক।

কিন্তু যে দায় বাংলার শাসককুলের ছিল, তা কোনোভাবেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছিল না। তাই পলাশীর যুদ্ধে মীরজাফরের ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতার কারণে পরাজয়ের মাত্র ১৩টা বছরের মধ্যে ১৭৭০ সালে এই বাংলার ভাগ্যাকাশে নেমে এসেছিল এমন এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ যা ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দকে বা ১১৭৬ বঙ্গাব্দকে আজও ইতিহাসে অমর করে রেখেছে কুখ্যাত ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে। এই মন্বন্তর গ্রামবাংলার সমাজকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। সুফি সাধক, বৈষ্ণব সমাজ, সত্যনারায়ণ আর সত্যপীরে মজে থাকা গ্রামীণ সমাজে সেই সময় নেমে আসে এক অভূতপূর্ব দুর্যোগ। কত মানুষ মারা গেলেন,  কত মা তার সন্তানকে পর্যন্ত বেচে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু খরিদ্দার পাননি। কে গৃহী, কে ডাকাত সব একেবারে তছনছ হয়ে সমাজের ভিত পর্যন্ত নড়ে গেল কিন্তু ব্রিটিশ কোম্পানি ব্যস্ত রইল তার খাজনা আদায়ে আর মুনাফা বৃদ্ধিতে।

সেই অদ্ভুত ভয়ঙ্কর এক সময়ে একজন ফকির আর এক সন্ন্যাসীর মিলিত প্রয়াসে যে ফকির আর সন্ন্যাসী বিদ্রোহ সর্বাত্মক রূপ নিল তা ধর্মের সব সীমানা অতিক্রম করে পেল এক সত্যিকারের সামাজিক বিদ্রোহের রূপ। ব্রিটিশ কোম্পানির কুঠি লুঠ করা শুরু হল সর্বাত্মক ভাবে। কিন্তু মজনু শাহ, ভবানী পাঠক, রামানন্দ গোঁসাই, চেরাগ আলি বা জনগণের হৃদয়ের মহানায়িকা দেবী চৌধুরানী কোন সাধারণ লুঠেরা ছিলেন না। তাঁরা সেইসব জোর করে আদায়করা খাজনা লুঠ করতেন, অনাহারক্লিষ্ট নিরন্ন হতাশাগ্রস্ত কৃষককুলের জন্যে।

ব্রিটিশ কোম্পানির নথিতেও কখনও তাঁদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়নি। এইটুকু সম্মান শত্রু হয়েও তাঁরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছিলেন।  এইভাবে কৃষকেরা হয়ে উঠেছিল তাদের সহযোগী, খুঁজে পেয়েছিল বাঁচার আর লড়াইয়ের শক্তি, আর ক্রমশ ফকির আর সন্ন্যাসী বিদ্রোহ পরিণত হয়েছিল আধুনিক কালের প্রথম কৃষক বিদ্রোহে।

ধর্মনিরপেক্ষ শোষক না স্বার্থের অপার মহিমা

১৭৬৩ সালে  তৎকালীন ব্রিটিশ কোম্পানির পুতুল নবাব মীরজাফর বাংলার নায়েব নাজিম হিসাবে নিযুক্ত করেন এক ভাগ্যান্বেষী মহম্মদ রেজা খাঁকে। সূচনা হয় এক অদ্ভুত শোষণের চক্রজাল যা আগামী কয়েক দশক ধরে এই বাংলার সাধারণ গ্রামীণ প্রজাকুলকে করেছিল  খাজনা আদায়ের নামে অপরিসীম নির্যাতনের শিকার। রেজা খাঁ, দেবী সিংহ আর ব্রিটিশ কোম্পানি, বিশেষত ওয়ারেন হেস্টিংসের এই স্বার্থান্বেষী আঁতাতকে কিন্তু জর্জ ইলিয়ক সাহেবের প্রবর্তিত এবং পরবর্তীকালে প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা দিয়ে দেখলে  মনে হতেই পারে, এ যেন  মজনু শাহ, ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী, রামানন্দ গোঁসাই বা নুরুলউদ্দিনের থেকেও বড় ধর্মনিরপেক্ষতার উদাহরণ। স্বার্থের আর লোভের কি অপার মহিমা যে তিনটি আলাদা ধর্মের মানুষজন, আবার তারা ভিন্ন ভাষাভাষীও বটে, লোভ আর নোংরা ব্যক্তিস্বার্থকে সামনে রেখে নিজেদের সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলার মাটিতে নামিয়ে এনেছিলেন চরম অত্যাচার আর শোষণের এক ভয়াবহ চক্রজাল। ব্রিটিশ কোম্পানি পরবর্তী কালে বাংলায় রেজা খাঁ আর বিহারে সিতাব রায়কে খাজনা আদায়ের দায়িত্ব দেয়। এরা দুজনেই এমনই অর্থপিশাচ ছিল যে তার জন্যে এরা যেকোনও ধরনের অত্যাচার করতেই দু’বার ভাবত না। এই রেজা খাঁ-ই তদ্বির আর ঘুষের বিনিময়ে পূর্ণিয়ার দায়িত্ব দেন দেবী সিংহকে। একেবারে যাকে বলে রতনে রতন চিনেছিল। দেবী সিংহ আবার রেজা খাঁর থেকেও এককাঠি ওপরে ছিল। পরবর্তীকালে অত্যাচারের মানদণ্ডে তিনি হেস্টিংসের মদতে  সব সীমা অতিক্রম করে যান। ১৭৮১ সালে এই দেবী সিংহ বেনামীতে রংপুর, দিনাজপুর আর এন্দরাকপুরের ইজারা নিয়ে এমন অত্যাচার নামিয়ে আনেন যে ঐতিহাসিক রংপুর বিদ্রোহের সূত্রপাত হয় এর মাত্র দুইবছরের মধ্যে অর্থাৎ ১৭৮৩ (?) সালে। সে ইতিহাস আমরা রংপুর পর্বে আলোচনা করব।

দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার

একটা আস্ত দেশের সমস্তরকম সম্পদের ওপর যদি সম্পূর্ণ আলাদা একটা দেশের ব্যবসায়ী কোম্পানির অধিকার জন্মায় তবে সেই অভাগা দেশের কতটা দৈনদশা হতে পারে তা ১৭৫৭ পলাশীর যুদ্ধের পর এদেশের জনগণ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। পলাশীর যুদ্ধের পর মীরজাফরের কাছ থেকে কোম্পানি ও তার কর্মকর্তারা প্রায় ১২ লক্ষ পাউন্ড পেয়েছিলেন আর স্বয়ং ক্লাইভ নিজেই পেয়েছিলেন প্রচুর অর্থ।  এরপর যতবার বাংলায় নবাব বদল হয়েছে ততবার আরও বেশি পরিমাণে কোম্পানি আর তার কর্মকর্তারা লাভবান হয়েছে। আর মাত্র ১৩টা বছরে সোনার বাংলাকে শ্মশানে পরিণত করে বাংলার ভাগ্যে নেমে এসেছিল কুখ্যাত ছিয়াত্তরের মন্বন্তর।

নিচে শুধুমাত্র কোম্পানির কর্মচারীদের বাংলার নবাব পরিবর্তনের সাথে জড়িত সরাসরি আর্থিক লাভের কিছু নমুনা ‘আঠারো শতকের বাঙলা ও বাঙালি’ বইটির সূত্র ধরে নিচ্ছি – 

সিরাজউদ্দৌলার বদলে মীরজাফরকে নবাব করবার সময় ক্লাইভ ঘুষ পেয়েছিল ২১১,৫০০ পাউণ্ড, ওয়াটস ১১৭,০০০ পাউণ্ড, কিলপ্যাট্রিক ৬০,৭৫০ পাউণ্ড, ওয়ালিশ ৫৬,২৫০ পাউণ্ড, রেক ৩১,৫০০ পাউণ্ড, ম্যানিংহাম ও বেশীর প্রত্যেকে ২৭,০০০ পাউণ্ড, ফ্ৰাফটন ২২,৫০০ পাউণ্ড, বোডোম, ফ্রাঙ্কল্যাণ্ড, ম্যাকেট, কোলেট, অমিয়ট ও মেজর গ্ৰাণ্ট প্ৰত্যেকে ১১,০০০ পাউণ্ড করে। লুশিংটন পেয়েছিল ৫,৬২৫ পাউণ্ড। আর মীরজাফরের বদলে মীরকাশিমকে নবাব করবার সময় ভ্যানসিটার্ট নিয়েছিল ৫৮,৩৩৩ পাউণ্ড, হলওয়েল ৩০,৯৩৭ পাউণ্ড, ম্যাকগুইয়ার ২৯,৩৭৫ পাউণ্ড, সামনার ২৮,০০০ পাউণ্ড, কেল্যান্ড ২২,৯১৬ পাউণ্ড এবং স্মিথ ও ইয়র্ক প্ৰত্যেকে ১৫,৩৫৪ পাউণ্ড।

পরিবর্তিত সামাজিক সমীকরণ ও বিদ্রোহের সূত্রপাত

আমরা দেখেছি বাংলার শাসককুলের ভাগ্যপরিবর্তনে বিশেষ করে পলাশীর যুদ্ধের পর একদিকে অর্থলিপ্সু ব্রিটিশ কোম্পানি আর অন্যদিকে ক্ষমতাহীন নবাবী শাসন, এই দ্বৈত শাসনব্যবস্থার মাঝখানে পড়ে সাধারণ গ্রামীণ প্রজাকুলের শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবন নানা ধরনের সমস্যায় একেবারে জর্জরিত হয়ে গেছিল। আগেকার বাংলা আর বাঙালির জীবনের ধারা ছিল শান্ত, নিশ্চল। গৃহীপরিবারগুলি ধনী না হলেও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে সচ্ছলতার অভাব ছিল না কোনদিনই। যাযাবর ফকির আর সন্ন্যাসীদের মানুষ আনন্দের সঙ্গেই মুক্তহস্তে দান করত। সন্ন্যাসী আর ফকিরদেরও কখনও এই দানের ওপর ভিত্তি করে চলতে সেভাবে কোনো সমস্যা হত না। সাধারণভাবে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হস্তান্তর কখনও গ্রামীণ জীবনযাত্রাকে খুব একটা প্রভাবিত করত না। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের পর অতি দ্রুত অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করল। কারণ সিরাজউদ্দৌল্লাই ছিলেন বাংলার শেষ ‘প্রায় স্বাধীন’ নবাব যিনি তাঁর সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নেবার ক্ষমতা রাখতেন। এরপর মীরজাফর বাংলার মসনদে আসীন হলেও তার সেভাবে কোন ক্ষমতা ছিল না। মীরজাফর বা পরবর্তী বাংলার শাসকরা ছিল বিভিন্নভাবে ব্রিটিশ কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। তার ফলে নবাবের নীতি পুরোপুরি ভাবে কোম্পানির অঙ্গুলিহেলনে চলত। আর আমরা ভুলে যেতে পারি না যে, কোম্পানির উদ্দেশ্য কখনই সুশাসন ছিল না। তারা এদেশে মুনাফা করতে এসেছিল মাত্র। সিরাজ পরবর্তী বাংলার নবাবদের কাছ থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি প্রশাসনিক এবং সামরিক সাহায্যের বিনিময়ে  বিশাল পরিমাণ অর্থ আদায় করত। এছাড়াও ছিল কোম্পানির কর্মচারীদের প্রাপ্ত উৎকোচ বা ঘুষের বিপুল অর্থ। প্রতিবার বাংলার নবাববদল ছিল কোম্পানির কর্মচারীদের কাছে অনেকটা টাকার গাছে ঝাড়া দেবার মতো। আগে কিছুটা এই আলোচনা করেছি মীরজাফর আর মীর কাশিমকে সিংহাসনে বসানোয় প্রাপ্ত সরাসরি ঘুষের মোটামুটি প্রাপ্ত অঙ্ক নিয়ে। তারপরের চোখধাঁধানো অঙ্কটা এখন  বলছি –  নজম-উদ-দৌল্লাকে নবাবের গদিতে বসাবার সময় ক্লাইভ দক্ষিণা পেয়েছিল ৫৮,৩৩৩ পাউণ্ড, কার্নাক ৩২,৬৬৬ পাউণ্ড, জনস্টোন ২৭,৬৫০ পাউণ্ড, স্পেনসার ২৩,৩৩৩ পাউণ্ড, সিনিয়র ২০,১১৫ পাউণ্ড, মিডলটন ১৪,২৯১ পাউণ্ড, লেসেস্টার ১৩,১২৫ পাউণ্ড, প্লেডেল, বার্ডেট ও গ্ৰে প্ৰত্যেকে ১১,৬৬৭ পাউণ্ড করে ও জি. জনস্টোন ৫,৮৩৩ পাউণ্ড। এছাড়া মেজর মুনরো ও তার সহকারীরা সকলে মিলে ১৬,০০০ পাউণ্ড পেয়েছিল। (সূত্র – আঠারো শতকের বাঙলা ও বাঙালি – অতুল সুর) 

এই কোম্পানির আর তার কর্মচারীদের ঘুষের বিপুল অর্থের উৎস ছিল বাংলার সাধারণ গ্রামীণ প্রজাকুল। এর ওপর ছিল কোম্পানির চুক্তি অনুসারে প্রাপ্য বিশাল অঙ্কের অর্থের জোগান দেবার বিপুল চাপ আর উৎস ছিল একটাই, বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি। ফলত, নানাধরনের অর্থনৈতিক চাপে তারা আর আগের মত ফকির আর সন্ন্যাসীদের দানধ্যান করতে পারছিল না। এর মধ্যে আবার ব্রিটিশ কোম্পানিও এইসব ফকির আর সন্ন্যাসীদের ওপর ক্রুদ্ধ ছিল। তারা ভারতীয় রীতিনীতির বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে ভাবত এই অর্থ তাদের প্রাপ্য যা এইসব যাযাবর লুঠেরারা নিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিও এইসব ফকির আর সন্ন্যাসীদের উপর দমনমূলক নীতি প্রয়োগ করা শুরু করে। ১৭৫৭ পরবর্তী সময় এইসব কারণেই সূত্রপাত হয় ফকির আর সন্ন্যাসী বিদ্রোহের। কিন্তু গ্রামীণ প্রজাকুলের দুর্দশা এই অদ্ভুত শাসন ব্যবস্থায় শুধুমাত্র দান না দেওয়া বা নেওয়াতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের ওপরেও নেমে আসে চরম অত্যাচার। দলে দলে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়ে ক্রমশ ফকির আর সন্ন্যাসীদের সঙ্গে যোগদান করে আর যা ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় থেকে এক গণবিদ্রোহ বা কৃষক বিদ্রোহের রূপ নেয়।

কিছু না বলা ইতিহাস

১৭৭০ এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বিষয়ে স্যার W. W. Hunter তাঁর Annals of rural Bengal বইতে এর এক বিশ্বস্ত বিবরণ দিয়েছেন-

‘১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে গ্রীষ্মকালে রৌদ্রের প্রবল উত্তাপে মানুষ মরিতে লাগিল। কৃষক গরু বেচিল, লাঙ্গল-জোয়াল বেচিল, বীজধান খাইয়া ফেলিল, তারপর ছেলেমেয়ে বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর ক্রেতা নাই, সকলেই বেচিতে চায়। খাদ্যাভাবে গাছের পাতা খাইতে লাগিল। ঘাস খাইতে আরম্ভ করিল। তারপর মৃতের মাংস খাইতে লাগিল। সারাদিন সারারাত্র অভুক্ত ও ব্যাধিগ্রন্ত মানুষ বড় বড় শহরের দিকে ছুটিল। তারপর মহামারী দেখা দিল। লোকে বসন্তে মরিতে লাগিল। মুর্শিদাবাদের নবাবপ্রাসাদও বাদ গেল না।’

১৭৬০ থেকে ১৭৮০ কে মোটামুটি ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের প্রারম্ভিক সময় ধরা হয়। আরও ভালো করে বললে ১৭৬৯ সালকে বলা যেতে পারে। 

কি ভাবছেন?  কারও পৌষ মাস আর কারও সর্বনাশ?

না, এদেশের সর্বনাশেই, মানে যে পরিমাণ সম্পদ পাচারের কারণে মাত্র দুই বছরের অনাবৃষ্টিকে পরিণত করেছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে তাই ছিল ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের সবথেকে বড় সম্ভাব্য অনুঘটক।

বিখ্যাত লেখক এবং সমাজ পর্যবেক্ষক Brooks Adams তাঁর ১৮৯৫ -৯৬ সালে রচিত The Law Of Civilization and Decay নামক বইতে এবং ব্রিটিশ সাংবাদিক ও প্রখ্যাত মানবদরদী রাজনীতিবিদ Sir Willium Digby তাঁর  ‘Prosperous India: A Revelation’, বইতে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ভারতের লুণ্ঠিত অপরিসীম সম্পদের লন্ডনে প্রবাহকেই সমস্তদিক পর্যালোচনা করে তাদের শিল্পবিপ্লবের প্রধান কারণ হিসাবে বর্ণনা করেছেন।

এছাড়াও আরও অনেক লেখক, বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট  রাজনীতিবিদ প্রতিধ্বনি করেছেন এই একই কথার। শুধু আমরাই হয়তো সব জেনে, সব বুঝেও আজও সত্যিগুলোকে কোনো এক অজানা কারণে মেনে নিতে পারি না।

তথ্যসূত্র :

১) সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ: ইতিহাসের পূণর্বিবেচনা, আনন্দ ভট্টাচার্য 

২) বাংলার ইতিহাস: ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম

৩) উত্তরবঙ্গের ইতিহাস, সুকুমার দাস

৪)  Historical Presence of Debi Chowdhurani and the then Societal Structures of Rangpur, Bangladesh, Goutam kumar Das

৫) আঠারো শতকের বাঙলা ও বাঙালি, অতুল সুর

৬) কিংবদন্তির দূর্গাপুর, কমল মিত্র

৭) Gazetteer of Rangpur District – 1911

৮) বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন, রংপুর অংশ 

৯)স্বাধীনতার সংগ্রামে বাঙলা, ডঃ নরহরি কবিরাজ 

১০) বিশ্বকোষ, নগেন্দ্রনাথ বসু 

১১) Annals of Rural Bengal, W. W. Hunte

১৩) ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, সুপ্রকাশ রায় 

১৪) The Sannyasy Rebellion, Asit Nath Chandra – 1977

লেখক কর্মসূত্রে স্প্যানিশ ও ফরাসি ভাষা চর্চা করেন। ইতিহাস আর সাহিত্য, বিশেষত বাংলা ও ফরাসি সাহিত্য আর আধুনিক যুগের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী, আর ভালোবাসেন খেলাধুলো বা জমাটি আড্ডা। সাহিত্যের প্রিয় বিষয় জাদুবাস্তবতা।

মন্তব্য তালিকা - “ইতিহাসে উপেক্ষিত অমরকাহিনি: ফকির এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অনন্য বীরগাথা – প্রথম পর্ব”

  1. সুন্দর প্রতিবেদন।
    দুর্গাপুর এলাকায় সন্ন্যাসী বা ফকির দের
    বিদ্রোহী কার্যক্রম পরিচালনা কি ঐতিহাসিক ভাবে সত্য? কিছু স্থাপনা আছে সত্য। ভবানী পাঠকের নামে এক মন্দির আছে বটে তবে তার প্রাচীণত্ব নিয়ে সন্দেহ আছে। সম্ভবত এই বর্ধমানের দুর্গাপুর নয়। বাংলাদেশের দুর্গাপুর।
    বিদ্রোহী দের কর্মকাণ্ড উত্তর বঙ্গেই সীমাবদ্ধ ছিল।

    1. দূর্গাপুরের ইতিহাস একটু অন্যরকমের। কিছু চলতি লোককথা থেকে জায়গার ভূপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে মনে করা হয় সত্যিই কিছুটা হলেও এখানে তাঁদের প্রভাব ছিল।

      তবে মন্দির নিয়ে সত্যিই কিছুটা প্রশ্ন আছে।