সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

ইতিহাসে উপেক্ষিত অমরকাহিনি: ফকির এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অনন্য বীরগাথা – দ্বিতীয় পর্ব

ইতিহাসে উপেক্ষিত অমরকাহিনি: ফকির এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অনন্য বীরগাথা – দ্বিতীয় পর্ব

অভিজিৎ সেনগুপ্ত

জুন ২২, ২০২২ ৫৬

পরিবর্তিত সামাজিক সমীকরণ ও বিদ্রোহের সূত্রপাত

আগের আলোচনায় আমরা দেখেছি বাংলার শাসককুলের ভাগ্য-পরিবর্তনে বিশেষ করে পলাশীর যুদ্ধের পর একদিকে অর্থলিপ্সু ব্রিটিশ কোম্পানি আর অন্যদিকে ক্ষমতাহীন নবাবী শাসন, এই দ্বৈত শাসনব্যবস্থার মাঝখানে পড়ে সাধারণ গ্রামীণ প্রজাকুলের শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবন নানাধরনের সমস্যায় একেবারে জর্জরিত হয়ে গিয়েছিল। আগেকার বাংলা আর বাঙালির জীবনের ধারা ছিল শান্ত, নিশ্চল। গৃহীপরিবারগুলি ধনী না হলেও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে সচ্ছলতার অভাব সেখানে ছিল না কোনদিনই। যাযাবর ফকির আর সন্ন্যাসীদের মানুষ আনন্দের সঙ্গেই মুক্তহস্তে দান করত। সন্ন্যাসী আর ফকিরদেরও কখনও এই দানের ওপর ভিত্তি করে চলতে সেভাবে কোনো সমস্যা হত না। সাধারণভাবে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হস্তান্তর কখনও গ্রামীণ জীবনযাত্রাকে খুব একটা প্রভাবিত করত না। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের পর অতি দ্রুত অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করল। কারণ সিরাজদৌল্লাই ছিলেন বাংলার শেষ ‘প্রায়-স্বাধীন’ নবাব, যিনি তাঁর সিদ্ধান্ত স্বাধীন ভাবে নেবার ক্ষমতা রাখতেন। এরপর মীরজাফর বাংলার মসনদে আসীন হলেও তার সেভাবে কোন ক্ষমতা ছিল না। মীরজাফর বা পরবর্তী বাংলার শাসকরা ছিল বিভিন্নভাবে ব্রিটিশ কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। তার ফলে নবাবের নীতি পুরোপুরিভাবে কোম্পানির অঙ্গুলিহেলনে চলত। আর আমরা ভুলে যেতে পারি না যে কোম্পানির উদ্দেশ্য কখনওই সুশাসন ছিল না। তারা এদেশে মুনাফা করতে এসেছিল মাত্র। সিরাজ-পরবর্তী বাংলার নবাবদের কাছ থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি প্রশাসনিক এবং সামরিক সাহায্যের বিনিময়ে বিশাল পরিমাণ অর্থ আদায় করত। এছাড়াও ছিল কোম্পানির কর্মচারীদের প্রাপ্ত উৎকোচ বা ঘুষের বিপুল অর্থ। প্রতিবার বাংলার নবাব-বদল ছিল কোম্পানির কর্মচারীদের কাছে অনেকটা টাকার গাছে ঝাড়া দেবার মতো। আগের পর্বে কিছুটা এই আলোচনাটা করেছি মীরজাফর আর মীর কাসিমকে সিংহাসনে বসানোয় প্রাপ্ত সরাসরি ঘুষের মোটামুটি প্রাপ্ত অঙ্ক নিয়ে তারপরের চোখধাঁধানো অঙ্কটা এখন বলছি – নাজিম-উদ-দৌল্লাকে নবাবের গদিতে বসাবার সময় ক্লাইভ দক্ষিণা পেয়েছিল ৫৮,৩৩৩ পাউণ্ড, কার্নাক ৩২,৬৬৬ পাউণ্ড, জনস্টোন ২৭,৬৫০ পাউণ্ড, স্পেনসার ২৩,৩৩৩ পাউণ্ড, সিনিয়র ২০,১১৫ পাউণ্ড, মিডলটন ১৪,২৯১ পাউণ্ড, লেসেস্টার ১৩,১২৫ পাউণ্ড, প্লেডেল, বার্ডেট ও গ্ৰে প্ৰত্যেকে ১১,৬৬৭ পাউণ্ড করে, ও জি, জনস্টোন ৫,৮৩৩ পাউণ্ড। এছাড়া মেজর মুনরো ও তার সহকারীরা সকলে মিলে ১৬,০০০ পাউণ্ড পেয়েছিল। (সূত্র – আঠারো শতকের বাঙলা ও বাঙালি – অতুল সুর)

এই কোম্পানির আর তার কর্মচারীদের ঘুষের বিপুল অর্থের উৎস ছিল বাংলার সাধারণ গ্রামীণ প্রজাকুল। এর ওপর ছিল কোম্পানির চুক্তি অনুসারে প্রাপ্য বিশাল অঙ্কের অর্থের জোগান দেবার বিপুল চাপ আর উৎস ছিল একটাই, বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি। ফলত নানা ধরনের অর্থনৈতিক চাপে তারা আর আগের মত ফকির আর সন্ন্যাসীদের দানধ্যান করতে পারছিল না। এর মধ্যে আবার ব্রিটিশ কোম্পানিও এইসব ফকির আর সন্ন্যাসীদের ওপর ক্রুদ্ধ ছিল। তারা ভারতীয় রীতিনীতির বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে ভেবে বসেছিল এই অর্থ তাদের প্রাপ্য, যা এইসব যাযাবর লুঠেরারা নিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিও এইসব ফকির আর সন্ন্যাসীদের উপর দমনমূলক নীতি প্রয়োগ করা শুরু করে। ১৭৫৭ সালের পরবর্তী সময় এইসব কারণেই সূত্রপাত হয় ফকির আর সন্ন্যাসী বিদ্রোহের। কিন্তু গ্রামীণ প্রজাকুলের দুর্দশা এই অদ্ভুত শাসন ব্যবস্থায় শুধুমাত্র দান না দেওয়া বা নেওয়াতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের ওপরেও নেমে আসে চরম অত্যাচার। দলে দলে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়ে ক্রমশ ফকির আর সন্ন্যাসীদের সঙ্গে যোগদান করে আর যা ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় থেকে এক গণবিদ্রোহ বা কৃষক বিদ্রোহের রূপ নেয়।

শুরু হল এক অসম কিন্তু বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম

কোম্পানি ও মীরজাফরের বাহিনীর সঙ্গে ১৭৬০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তারিখে মাসিমপুরে ইতিহাসখ্যাত সন্ন্যাসী-নেতা ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর ফকির সন্ন্যাসী বাহিনীর সঙ্গে প্রথম এই বিদ্রোহের ঐতিহাসিক যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ ইতিহাসে মাসিমপুরের যুদ্ধ বা ‘ব্যাটল অফ মাসিমপুর’ নামে বিখ্যাত। কোম্পানির আর মীরজাফরের বাহিনী এইসময় দুইদিক থেকে অভিযান চালায়। কিন্তু বিদ্রোহী ফকির এবং সন্ন্যাসীরা প্রচণ্ড সাহসিকতা আর বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে কোম্পানি ও মীরজাফরের মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে। ইংরেজ ক্যাপ্টেন ক্রকেন-সহ বেশ কিছু সৈন্য নিহত হয় মাসিমপুরের এই যুদ্ধে। অন্যদিকে ফকির-সন্ন্যাসীদের পক্ষে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে দলিব খাঁ ও আসালত খাঁ সহ অনেকেই নিহত হন। এখান থেকেই পীরগাছা মন্থনার ছোট জমিদার হওয়া সত্ত্বেও দেবী চৌধুরানী তাঁর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কারণে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে ‘জয় দূর্গাদেবী’ বা ‘চন্ডী মা’ নামে পরিচিত হন, যা পরবর্তী কালে একটা মিথে পরিণত হয়।

পরবর্তীকালে আরো অনেক নারী নেত্রী ইংরেজ বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন। পাঙ্গার রানী লক্ষ্মীপ্রিয়াও এই ধরণের একজন যোদ্ধা ছিলেন বলে জানা যায়। পাঙ্গার রাজা/রানীদের বীরত্বের প্রতীক হিসেবে কুড়িগ্রাম শহরে বি. ডি. আর. ব্যাটালিয়নের গেটের সামনে ‘কালু খাঁ’ ও ‘ফতে খাঁ’ নামক দুটো কামান আছে।

১৭৬৩ সাল থেকেই ক্রমশ ফকির আর সন্ন্যাসীদের এই  বিদ্রোহ পূর্ণাঙ্গ বিদ্রোহের রূপ নেয়। বিদ্রোহীদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ ছিল কোম্পানির কুঠি, ইংরেজ শাসকের অনুগত জমিদারদের কাছারি এবং জমিদারি আমলাদের আবাসস্থল। বিদ্রোহীরা যুদ্ধে তরবারি, বর্শা, বল্লম, বন্দুক, অগ্নি নিক্ষেপক যন্ত্র, হাওয়াই ও ঘূর্ণায়মান কামান অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করত। ফকিরদের মধ্যে শুধু মজনু শাহ ও তার কয়েকজন খলিফা ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করতেন। যুদ্ধের সময় খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে যাওয়ার জন্য উট ব্যবহার করা হতো।

সেই সময় বিদ্রোহীদের গেরিলা রণ-পদ্ধতি কোম্পানির কর্মকর্তাদের অত্যন্ত চিন্তিত করে তোলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিদ্রোহীরা কোম্পানির লোকজন এবং তাঁদের দপ্তর আর বাসস্থানের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালাত। সুপরিকল্পিত আক্রমণ পরিচালনা ও নির্ধারিত যুদ্ধে কখনও কখনও পাঁচ থেকে ছয় হাজার ফকির-সন্ন্যাসীর জমায়েত হত। আঠারো শতকের সত্তরের দশকে ফকির ও সন্ন্যাসীদের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজারে উপনীত হয়। গ্রামের সাধারণ লোকেরা বিদ্রোহীদের গুপ্তচররূপে কাজ করত এবং তাঁরা কোম্পানির সেনাবাহিনীর গতিবিধি আগে থেকেই বিদ্রোহীদের জানিয়ে দিত।

বিদ্রোহীরা ১৭৬৩ সালে বর্তমান বাংলাদেশের বাকেরগঞ্জে কোম্পানির বাণিজ্য কুঠি আক্রমণ করে। তাঁরা সেখানকার কুঠিয়াল মি. ক্যালীকে কয়েকদিন আটক রাখে এবং কুঠি লুণ্ঠন করে। ওই বছর অতর্কিত আক্রমণ করে তাঁরা ঢাকা কুঠি দখল করে নেয়। কুঠির ইংরেজ সুপারভাইজার লেস্টার পালিয়ে যান। অবশ্য পরে ক্যাপ্টেন গ্র্যান্ট কুঠি পুনরুদ্ধার করেন। ওই একই বছর বিদ্রোহীরা রাজশাহীর রামপুর বোয়ালিয়ায় কোম্পানির কুঠি আক্রমণ করে কুঠিয়াল বেনেটকে আটক করে। বন্দি অবস্থায় বেনেটকে পাটনায় পাঠানো হয় এবং সেখানে তাঁকে হত্যা করা হয়। ১৭৬৭ সালের দিকে রংপুর, রাজশাহী, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি ও কুমিল্লা জেলায় বিদ্রোহীদের আক্রমণ তীব্রতর হয়ে ওঠে। উত্তরবঙ্গে বিদ্রোহীদের তৎপরতা প্রতিহত করার জন্য ১৭৬৭ সালে ক্যাপ্টেন ডি. ম্যাকেঞ্জির অধীনে রংপুরে ইংরেজ বাহিনী প্রেরিত হয়। এই সময় একদিকে সাধারণ মানুষের দুর্দশা চরমে ওঠে। বক্সারের যুদ্ধের জয় ব্রিটিশ কোম্পানির নিরঙ্কুশ আধিপত্য কায়েমে সহায়ক হয়। অন্যদিকে গ্রাম বাংলার অনাহারক্লিষ্ট, খাজনার ভারে বিপদগ্রস্ত পরিবারগুলো ফকির আর সন্ন্যাসীদের এই লড়াইয়ে নিজেদের বাঁচার আশা খুঁজে পায়।

মজনু শাহ – এক মহানায়কের উত্থান

লর্ড ক্লাইভ যাদের বলেছিলেন যাযাবর লুঠেরা সেই যাযাবর ফকির আর সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ সেই কুখ্যাত দুর্ভিক্ষের ১৭৭০ সাল যত এগিয়ে আসতে থাকে ততই যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠতে লাগল আর ভবানী পাঠকের পাশাপাশি সক্রিয় হয়ে উঠতে লাগল ইতিহাসের মহানায়ক মজনু শাহের ক্ষুরধার নেতৃত্ব। ফকির আর সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ক্রমশ রূপ নিতে শুরু করল এক বিশাল এবং ব্যাপক গণবিদ্রোহের। এদিকে ‘Divide and rule’  নীতির প্রয়োগও শুরু হয়েছিল সেই সময় থেকেই। কোম্পানি আর তার বশংবদ মোসাহেবরা ফকির আর সন্ন্যাসীদের নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্বের বিশেষ করে ধর্মীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের কথার প্রচার শুরু করে দিয়েছিল কিন্তু ব্রিটিশ কোম্পানির কর্মকর্তারা নিজেরাই সে বিষয়ে যে খুব একটা বিশ্বাস করত না সেই প্রমাণও ইতিহাসেই আছে। মজনু শাহ ক্রমশ ১৭৭০ এর পর থেকে এই বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিদ্রোহের রাশ নিজের হাতে নিয়ে নেন। তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বগুণের কারণে ব্রিটিশ কর্মকর্তারাও তাঁকে কখনও কখনও প্রশংসিত করেছেন।

ইতিহাসের কিছু প্রশ্ন ও ব্যাখ্যা

কিছু শ্রদ্ধাভাজন ঐতিহাসিক এই বিদ্রোহকে ওয়ারেন হেস্টিংসর মতোই কিছু যাযাবর লুঠেরা ফকির আর সন্ন্যাসীদের তাণ্ডব বলেছেন। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আসুন, দেখে নিই স্বয়ং হেস্টিংসের জীবনীকার প্যাট্রিক টার্নবুলের এই বিদ্রোহের বিষয়ে মতামত – ওয়ারেন হেস্টিংস-এর জীবনীকার প্যাট্রিক টার্নবুল লিখেছেন, “…but holy men proved far more troublesome, playing as they did on local superstition and fears. For a time in 1773, it almost as if a state of civil war existed as groups of sepoys combed the countryside, and both Sannyasis and Fakirs gave ample proof that they were prepared to fight back. On several occassions isolated army units were ambushed, their officer killed.” অর্থাৎ হেস্টিংসের জীবনীকার স্বয়ং এই বিদ্রোহের ১৭৭৩ সাল থেকে ‘civil war’ বা গণবিদ্রোহের/ গণযুদ্ধের রূপ নেবার কথা স্বীকার করেছেন।

এবার যে প্রশ্নটা সহজেই মনে আসে তা হল – জনগণের বিপুল সমর্থন ছাড়া কি কোনও বিদ্রোহ এভাবে গণ বিদ্রোহের রূপ নিতে পারে?

দাবানলের মত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল বিদ্রোহের আগুন

একদিকে যেমন ফকির আর সন্ন্যাসী বিদ্ৰোহ চলছিল, অপরদিকে তেমনই ইংরেজ শাসক ও ইংরেজ বশংবদ অত্যাচারী জমিদারগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশের মধ্যে গণ-আন্দোলনও চলছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘চুয়াড় ও বাগড়ী নায়েক বিদ্রোহ’, ‘চাকমা বিদ্রোহ’, ‘ঘরুই বিদ্রোহ’, ‘হাতিখেদা বিদ্রোহ’, ‘বাখরগঞ্জের সুবান্দিয়া গ্রামের বিদ্রোহ ও শতাব্দীর শেষের দিকে তন্তুবায়দের ওপর ইংরেজ বণিকদের উৎপীড়নের বিরুদ্ধে ‘তন্তুবায়দের বিদ্রোহ’।

সেই শতাব্দীর শেষের তিন দশক জুড়ে যখনই কোম্পানির সৈন্যরা সন্ন্যাসী এবং ফকিরদের বাধা দিয়েছে তখনই ভয়ানক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। ১৭৭১ সালে, ১৫০ জন ফকিরকে হত্যা করা হয় কোনও কারণ ছাড়াই। এটি ছিল অনেকগুলো কারণের একটি, যা ভয়ানক ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং এই ক্ষোভ পরবর্তীকালে রূপ নেয় এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের, বিশেষত নাটোরের বিস্তীর্ণ এলাকায় ও রংপুরে, যা এখন আধুনিক বাংলাদেশের অন্তর্গত। ব্রিটিশদের কাছে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সন্ন্যাসীরা ছিল লুটেরা। এঁদেরকে কোম্পানির প্রাপ্য অর্থে ভাগ বসানো এবং এমনকি সম্ভব হলে বাংলায় প্রবেশ ঠেকাতে কোম্পানি সবরকমের ব্যবস্থা নিতে কখনওই কসুর করত না। স্বয়ং রমেশচন্দ্র মজুমদার সন্ন্যাসী-ফকিরদের সামরিক সামর্থ্য প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে লিখেছেন, “…their fighting qualities were not negligible…they threatened to sweep away the English power completely”.

কিন্তু সমস্যা ছিল যে ব্রিটিশ কোম্পানি নিজেই তো গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের সম্পদ ব্যাপক হারে লুঠ করছিল রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে। আর ফকির আর সন্ন্যাসীরা সেই লুঠের জিনিসপত্রই বাংলার গ্রামবাসীদের সহায়তা নিয়ে পাল্টা লুঠ করছিল। তাই গণহারে ফকির আর সন্ন্যাসীদের লুঠেরা বলার আগে ভাবা দরকার যে সম্পদ তারা লুঠ করতেন তাকি সত্যিই ব্রিটিশ কোম্পানির প্রাপ্য ছিল?

যুদ্ধের ইতিহাস

যাইহোক ১৭৬৭ সালে ক্যাপ্টেন ডি. ম্যাকেঞ্জির নেতৃত্বে রংপুরে ব্রিটিশ বাহিনী প্রেরিত হয়। এই সময় মালদহের ইংরেজ রেসিডেন্ট বারওয়েল কর্তৃক মার্টলের নেতৃত্বে প্রেরিত একটি ইংরেজ বাহিনী বিদ্রোহীদের নিকট পরাজিত হয় এবং সেনাপতি মার্টল নিহত হন। ম্যাকেঞ্জির বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে বিদ্রোহীরা নেপালের দিকে পিছিয়ে যায়। ১৭৬৮ থেকে ১৭৭০ সালে প্রধানত শরণ (বিহার), বেনারস, পুর্নিয়া, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের আক্রমণ অব্যাহত ছিল। ফেলথামের অধীনে ইংরেজ বাহিনী ১৭৭১ সালে ঘোড়াঘাট ও রংপুরের গোবিন্দগঞ্জের পথে ফকির-সন্ন্যাসীদের উপর আক্রমণ চালায়। বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে পালিয়ে যায়। মজনু শাহ শতাধিক আহত অনুসারী নিয়ে মহাস্থানে ফিরে যান।

১৭৭১ সালে নাটোরে সম্পূর্ণ বিনাকারণে ১৫০ জন ফকিরকে হত্যার প্রতিবাদে মজনু শাহ নাটোরের রানী ভবানীর সহায়তা প্রার্থনা করেন কিন্তু রানী তাঁকে সেসময় সহায়তা করতে অসমর্থ ছিলেন। এরপর সম্ভবত মজনু শাহ নিজেই নাটোরে প্রবেশ করেন দলবল নিয়ে।

সেইসময় নাটোরের সুপারভাইজার রেভেনিউ কাউন্সিলে প্রদত্ত তার এক পত্রে লেখেন, “আমার হরকরা সংবাদ নিয়ে এল, গতকাল ফকিরদের এক বিরাট দল সিলবেরির (বগুড়া জেলার) একটি গ্রামে এসে সমবেত হয়েছে। তাদের নায়ক মজনু তার অনুচরদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে যে, তারা যেন জনসাধারণের ওপর কোনরূপ অত্যাচার বা বলপ্রয়োগ না করে এবং জনসাধারণের স্বেচ্ছায় দান ব্যতীত কোনকিছুই গ্রহণ না করে।” এই পত্রপ্রেরক সুপারভাইজারই আর এক পত্রে জানিয়েছিলেন যে, গ্রামবাসী নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে বিদ্রোহীদের আহারের ব্যবস্থা করেছে এবং বিদ্রোহীরা গ্রামবাসীদের ওপর কোন অত্যাচার করেনি। এ ছাড়া বহু কৃষক বিদ্রোহীদের দলে যোগ দিয়েছে এবং কৃষকগণ ইংরেজ সরকারকে কর দেওয়া বন্ধ করে সেই কর বিদ্রোহীদের হাতে দিয়েছে।

১৭৭২ সালে মজনু শাহ রংপুর, রাজশাহী ও বগুড়া জেলায় কোম্পানির বাণিজ্যকেন্দ্র ও আবাসন আক্রমণ ও লুণ্ঠন করেন। এক সময় তিনি কয়েকশ’ সশস্ত্র অনুসারী নিয়ে রাজশাহীতে কোম্পানির রাজস্ব-অফিস কিছুকাল দখল করে রাখেন। সেখানকার সংগৃহীত সবরকমের সম্পদ, অর্থ তাঁর হস্তগত হয়। ১৭৭৩ সালে বিদ্রোহীরা পূর্ণিয়া, বর্ধমান, কুমারখালি, যশোর, ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা, মেদিনীপুর, বীরভূম, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও জলপাইগুড়ি এলাকায় ব্যাপক আক্রমণ পরিচালনা করে। ১৭৭৬ সালে বগুড়া, রাজশাহী, দিনাজপুর ও চট্টগ্রাম জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের আক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করে। ১৭৭৭ থেকে ১৭৮১ সালের মধ্যে ফকির-সন্ন্যাসীদের আক্রমণ প্রধানত বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ এলাকায় পরিচালিত হয়। ১৭৮২ সালে ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিদ্রোহীদের তৎপরতা ব্যাপক আকার ধারণ করে।

ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া কিছু কথা

ইতিহাসে আপনারা কোথাও এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে যারা ছিলেন সেই মজনু শাহ, ভবানী পাঠক, দেবী জয়দূর্গা চৌধুরাণী, দলিব খাঁ, মুসা শাহ, চেরাগ আলি, শোভান আলি, বীর জয়রাম, সাধক কৃপানাথ, মোহন গিরি, কৃষক নেতা নুরুলউদ্দিন, দয়ারাম শীল এঁদের সেভাবে পাবেন না। এঁরা অত্যাচারী ব্রিটিশ কোম্পানি, জমিদার বা পুতুল নবাবদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছেন জীবনভোর। কেউই নিজের নামে নতুন কোনও জমিদারি বা তাঁদের বংশধরদের সুবিধার্থে কিছু করে যাননি। ফকির আর সন্ন্যাসী নেতাদের অধিকাংশের তো কোনো উত্তরাধিকারীও পরবর্তীকালে পাওয়া যায়নি। তাঁরা কখনও সংঘবদ্ধ ভাবে আবার কখনও বিচ্ছিন্ন ভাবে মানুষের জন্যে, মানুষের প্রতি অন্যায়ের প্রতিবাদে লড়াই চালিয়ে গেছেন। কখনও জিতেছেন আবার কখনও হেরেছেন। কিন্তু লড়াইয়ের ময়দান না ছাড়ার মূল্য চুকিয়েছেন প্রাণ দিয়ে। এঁরা কেউই বড় রাজা বা নবাবও ছিলেন না। তাই এই লড়াইকে রাজ্য রক্ষার লড়াইও বলা যায় না। ব্রিটিশরা পর্যন্ত এঁদের দস্যু বললেও সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ করেননি কখনও, যা অদ্ভুতভাবে দেশীয় গুণীজনেরা অনেকেই করেছেন বা এখনও কেউ কেউ করে থাকেন।

আপনারা এই বিদ্রোহকে স্বাধীনতা সংগ্রাম বলবেন কিনা তা আপনাদের ওপরই ছেড়ে দিলাম। আসুন আমরা এই বিদ্রোহের অন্যতম গৌরবময় অধ্যায় রংপুর বিদ্রোহ নিয়ে আলোচনা করি। স্থানীয় ভাবে হলেও রংপুর বিদ্রোহ সে যুগে অসহায় বাংলার কৃষককুলের বুকে এমন এক আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছিল যা যুগ যুগ ধরে লোককথায় আর লোকগানে অমর হয়ে গেছে সাধারণ মানুষের মনে।

রংপুর বিদ্রোহের গৌরবময় ইতিহাস

কোম্পানীর আমলেতে রাজা দেবীসিং।

সে সময় মুল্লুকেতে হইল বারো ঢিং।।

যেমন যে দেবতার মরতি গঠন।

তেমনি হইল তার ভষণ বাহন।।

রাজার পাপেতে হইল মুলুকে অকাল।

শিয়রে রাখিয়া টাকা গৃহী মারা গেল।।

মানীর সমান নাই মানী জমীদার।

ছোট বড় নাই সবে করে হাহাকার।।

সোয়ারীতে চড়িয়া যায় পাইকে মারে গোতা।

দেবীসিংহের কাছে আজ সব হইল ভোতা ॥

পারেনা ঘাটায় চলতে ঝিউরি বউরি।

দেবীসিংহের লোকে নেয় তারে জোর করি ।।

পূর্ণ কলি অবতার দেবীসিং রাজা।

দেবীসিংহের উপদ্রবে প্রজা ভাজা ভাজা।।

আকালে দুনিয়া গেল দেবী চায় টাকা।

মারি ধরি বুট করে বদমাইস পাকা।।

শিব চন্দ্রের হৃদে এই সব দুকে বাজে।

জয়দুর্গার আজ্ঞায় শিব চন্দ্র সাজে ।।”

এই অংশটি দেবী সিংহের উৎপীড়ন সংক্রান্ত রতিরাম রায়ের (দাস) কাব্যটির থেকে নেওয়া। এখানে বর্ণিত দেবী সিংই হলেন ইতিহাসের কুখ্যাত বাংলার দেওয়ান দেবী সিংহ। ব্রিটিশ কোম্পানির শাসনের প্রথম পর্বে ইতিহাসের অন্যতম খলনায়ক এই দেবী সিংহ।

ব্রিটিশ কোম্পানি ক্রমশ বাংলায় রেজা খাঁ আর বিহারে সিতাব রায়কে খাজনা আদায়ের দায়িত্ব দেয়। এরা দুজনেই এমনই অর্থপিশাচ ছিল যে তার জন্যে এরা যেকোনো ধরনের অত্যাচার করতেই দুবার ভাবত না। এই রেজা খাঁ-ই পূর্ণিয়ার দায়িত্ব দেন দেবী সিংহকে তদবির আর ঘুষের বিনিময়ে। একেবারে যাকে বলে রতনে রতন চিনেছিল। দেবী সিংহ আবার রেজা খাঁর থেকেও এককাঠি ওপরে ছিল। পরবর্তী কালে অত্যাচারের মাপদণ্ডে তিনি হেস্টিংসের মদতে সব সীমা অতিক্রম করে যান। ১৭৮১ সালে এই দেবী সিংহ বেনামীতে রংপুর, দিনাজপুর আর এন্দরাকপুরের ইজারা নিয়ে এমন অত্যাচার নামিয়ে আনে যে ঐতিহাসিক রংপুর বিদ্রোহের সূত্রপাত হয় মাত্র দুইবছরের মধ্যে অর্থাৎ ১৭৮৩ সালে।

নিখিলনাথ রায় তার মুর্শিদাবাদ কাহিনীতে দেবী সিংহের অত্যাচারের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন –

“যদি কেহ অত্যাচারের বিভীষিকাময়ী মূর্ত্তি দেখিতে ইচ্ছা করেন, যদি কেহ মানবপ্রকৃতির মধ্যে সয়তানবৃত্তির পাপ অভিনয় দেখিতে চাহেন, তাহা হইলে একবার দেবী সিংহের বিবরণ অনুশীলন করিবেন। দেখিবেন, সেই ভীষণ অত্যাচারে কত কত জনপদ অরণ্যে পরিণত হইয়াছে। কত কত দরিদ্র প্রজা অন্নাভাবে জীবন বিসর্জ্জন  দিয়াছে। কত কত জমীদার ভিখারীরও অধম হইয়া দিন কাটাইয়াছে। …দেবী সিংহের নাম শুনিলে, আজিও উত্তরবঙ্গ প্রদেশের অধিবাসিগণ শিহরিয়া উঠে! আজিও অনেক কোমলহৃদয়া মহিলা মূর্চ্ছিতা হইয়া পড়েন। শিশুসন্তানগণ ভীত হইয়া, জননীর ক্রোড়ে আশ্রয় লয়!”

উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা, দিনাজপুর, রংপুর প্রভৃতি অঞ্চল তখন দেবী সিংহের অত্যাচারে জর্জরিত। অতিরিক্ত খাজনা দিকে দিকে নামিয়ে এনেছিল অসহনীয় দারিদ্র্য আর খাজনা অনাদায়ে অবর্ণনীয় শাস্তির ব্যবস্থা তৈরি করেছিল এক অদ্ভুত আতঙ্কের পরিবেশ। দেবী সিংহের সাথে ছিল হেস্টিংসের মদত। আর সেই মদতের মুলে ছিল হেস্টিংস এবং অন্যান্য কোম্পানির কর্মকর্তাদের অতুলনীয় অর্থলিপ্সা।

রতিরামের কাব্যের প্রতিটি চরিত্রই এখানে ইতিহাসে জীবন্ত। তাই কবির কথায়ই বলি-

“রাজারায়ের পুত্র হয় শিবচন্দ্র রায়।

শিবের সমান বলি সর্বলোকে গায়।।”

এই ইটাকুমারীর জমিদার শিবচন্দ্র রায় এই বিদ্রোহের অন্যতম নেতা ছিলেন। আর ছিলেন ইতিহাসখ্যাত মহানায়িকা মন্থনার জমিদার দেবী জয়দূর্গা চৌধুরাণী। কবির ভাষায় –

দেবী চৌধুরাণী

“মন্থনার  কর্ত্রী জয়দুর্গা দেবী চৌধুরাণী।

বড় বুদ্ধি বড় তেজ জগতে বাখানি।।”

আসুন একটু দেখে নিই জমিদার শিবচন্দ্র আর জয়দূর্গা চৌধুরাণীর পরিচয়, আর দেখি কিভাবে শুরু হল এই বিদ্রোহ –

ইটাকুমারীর জমিদার শিবচন্দ্রের কথা

২০১৫ সালের ১৩ই আগস্ট পীরগাছা উপজেলা পরিষদের জেলা পরিক্রমা থেকে জানা যায়, ফতেহপুর চাকলা সরকার কোচবিহারের এক বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল। মোগল অভিযানের প্রাক্কালে এ চাকলায় ছয় আনা অংশের অধিকারী নরোত্তম নামক বৈদ্যবংশীয় ব্যক্তি। কোচবিহার মহারাজা দফতরে একজন কানুনগো ছিলেন। তার পুত্র রঘুনাথ, রঘুনাথের পুত্র সুকদেব নন্দী এবং সুকদেব নন্দীর পুত্র রাজা রায় উক্ত পরগনার জমিদার হন। রাজা রায়ের সাত সন্তানের মধ্যে দুইজন ছাড়া কারও কোন পুত্র সন্তান না থাকায় ছয় আনা অংশের চাকলা ফতেহপুর উক্ত দুই পুত্রের মধ্যে বিভাজন করে দেয়া হয়। প্রথম ভাগ তিন আনা ফতেহপুর (যা ইটাকুমারী নামে খ্যাত) লাভ করেন রাজা রায়ের জ্যৈষ্ঠ পুত্র শিবচন্দ্র। অপর অংশ পরগনা যা উদাসী নামে খ্যাত যা রাজারায়ের অপর পুত্রের মাধ্যমে জনৈক বারেন্দ্রীয় ব্রাহ্মণের কাছে হস্তান্তরিত হয়।

আরও জানা যায়, রাজস্ব সময়মত পরিশোধ না করার কারণে ইজারাদার দেবী সিংহের দ্বারা রংপুরের যে সমস্ত জমিদার নিগৃহীত ও অত্যাচারিত হয়েছিলেন তার মধ্যে রাজা শিবচন্দ্র অন্যতম। দেবী সিংহ ও তার সহকারী হররাম সেনের লাঠিয়াল বাহিনী শিবচন্দ্রকে গ্রেফতার করে রংপুর মীরগঞ্জে দেবী সিংহের কুটিবাড়ীতে অন্ধকার ঘরে আবদ্ধ করে রাখে। তার স্ত্রী অন্যান্য বন্দী জমিদারের স্ত্রীদের নিয়ে নিজ নিজ স্বামীর মুক্তির জন্য সাবিত্রীব্রত পালন করেন। বহু টাকার বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত রাজা শিবচন্দ ছাড়া পান। একদিকে প্রজাদের ওপর অত্যাচার, অন্যদিকে ব্যক্তিগত আক্রোশ – দুয়ে মিলে শিবচন্দ্র একেবারে আগুনের মতো জ্বলে উঠলেন। তাঁর সাহায্যে এগিয়ে এলান ঐতিহ্যবাহী রংপুরের আরেক মহানায়িকা দেবী জয়দূর্গা চৌধুরাণী।

মন্থনার জমিদারী ও দেবী চৌধরাণীর কথা

রংপুরের ফতেহপুর চাকলার মন্থনা জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা অনন্তরাম কোচবিহার মহারাজার একজন কর্মচারী ছিলেন। তিনি একজন বারেন্দ্রীয় ব্রাহ্মণ। ১৭০৩-১৭০৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে কোচবিহার মহারাজা রূপনারায়ণের শাসনকালে রংপুরের পীরগাছা এলাকায় একটি ছোট্ট তালুক লাভ করেন। তার নামানুসারে উক্ত তালুক (গ্রাম) খানির নামও অনন্তরাম হয়। আরেক সূত্রে জানা যায়, অনন্তরাম-এ বংশের ষষ্ঠ পুরুষ ছিলেন এবং বৈষ্ণব মিশ্র নামে একজন মৈথিলী ব্রাহ্মণ। কোচবিহার মহারাজার রাজপুরোহিত এই জমিদারির আদি পুরুষ ছিলেন। তারই বংশের চতুর্থ পুরুষ জিতুমিশ্র এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। অনন্তরামের পূর্বপুরুষ সম্পর্কেও বিশেষ কিছু জানা যায় না। ১৭১১ সালের দিকে যখন মোগল বাহিনী ‘কাছওয়ারা’ (কোচবিহার) দখলে তৎপর হয়ে ওঠে তখন অন্যান্য কোচ কর্মচারীদের মতো অনন্তরামও মোগল পক্ষে যোগদান করে মন্থনা জমিদারিতে তার পূর্বপদ বহাল রাখেন। তার প্রতিষ্ঠিত জমিদারি পরবর্তীকালে মন্থনা অথবা দু’আনা ফতেহপুর বলে পরিচিতি লাভ করে। তাঁর পুত্র যাদবেন্দ্র নারায়ণ একজন খ্যাতনামা বৈষ্ণব অনুসারী ছিলেন এবং যাদব রায় ও গোপাল নামে দুটি পারিবারিক বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা করে এক দেবোত্তর এস্টেট প্রতিষ্ঠা করেন। যার বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ছিল কম করে ৩০,০০০ টাকা। এছাড়াও তিনি ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণদের জন্য বহু সম্পত্তি দান করেন বলে জনশ্রুতি আছে। যাদবেন্দ্র রায়ের পুত্র রাঘবেন্দ্র নারায়ণ সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে রাঘবেন্দ্রের পুত্র নরেন্দ্র নারায়ণ মতান্তরে নারায়ণ চন্দ্র ১৭৬৫ সালে উত্তরাধিকারবিহীন অবস্থায় মারা গেলে মৃত জমিদারের স্ত্রী জয়দুর্গা দেবী প্রায় তিন দশকের মত মন্থনা জমিদারি পরিচালনা করেন। এই জয়দুর্গা দেবীই ইতিহাস আর লোককথায় দেবী চৌধুরাণী নামে পরিচিত। যিনি তার জীবদ্দশার অধিকাংশ সময় রংপুরের বিদ্রোহী প্রজাদের সাথে জড়িত ছিলেন সেই ১৭৬০ সালের মাসিমপুরের যুদ্ধের সময় থেকেই।

সরকারি এক সূত্রে জানা যায় ১৭৯১ খ্রি: ১৯ অক্টোবর রংপুর জেলার বাতিলকৃত জমিদারবৃন্দের যে তালিকা প্রকাশিত হয় তার মধ্যে জয়দুর্গা দেবীর নাম পাওয়া যায়। তাতে মনে হয় ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের আগুন প্রশমিত হলে ১৭৯০ খ্রি: আগে আগেই তিনি নিরুদ্দেশ জীবন কাটিয়ে নিজ জমিদারিতে পূর্ণ মর্যাদায় ফেরত আসেন। এ কারণেই বাতিলকৃত জমিদারের তালিকায় তার নাম প্রকাশ হয়েছিল। অপরদিকে ১১৭৬ বঙ্গাব্দ (১৭৬৯-৭০ খ্রি:) থেকে ১১৯৭ বঙ্গাব্দ (১৭৯০-৯১খ্রি:) পর্যন্ত সময় কমপক্ষে তিনি যে মন্থনার জমিদার ছিলেন তা তার প্রদত্ত দুই খানি সনদ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। উক্ত সনদের একখানি পীরপাল (১১৭৬ বঙ্গাব্দের ৫ মাঘ) এবং অপরটি মুশকালী চুকানী পাট্টা (১১৯৭ বঙ্গাব্দ, ২৫ কার্তিক), এই পাট্টা দু’খানিতে যদিও তার জমিদারির শুরু বা শেষের সময়টুকু সঠিক ভাবে জানা যায় না, তবে একথা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে তিনি সুদীর্ঘকাল মন্থনা পরগনার জমিদার ছিলেন এবং দেবী চৌধুরাণী নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি যে মন্থনার জমিদার এ কথা ঐতিহাসিক সত্য।

ইটাকুমারীর জমিদার বাড়ির কথা

ফতেহপুর চাকলা সরকার কোচবিহারের এক বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল। মোগল অভিযানের প্রাক্কালে এ চাকলায় ছয় আনা অংশের অধিকারী নরোত্তম নামক বৈদ্যবংশীয় ব্যক্তি। কোচবিহার মহারাজা দফতরে একজন কানুনগো ছিলেন। তার পুত্র রঘুনাথ, রঘুনাথের পুত্র সুকদেব নন্দী এবং সুকদেব নন্দীর পুত্র রাজা রায় উক্ত পরগনার জমিদার হন। আগেই বলা হয়েছে, রাজা রায়ের সাত সন্তানের মধ্যে দুইজন ছাড়া কারও কোন পুত্র সন্তান না থাকায় ছয় আনা অংশের চাকলা ফতেহপুর উক্ত দুই পুত্রের মধ্যে বিভাজন করে দেয়া হয়। প্রথম ভাগ তিন আনা ফতেহপুর (যা ইটাকুমারী নামে খ্যাত) লাভ করেন রাজা রায়ের জ্যৈষ্ঠ পুত্র শিবচন্দ্র। অপর অংশ পরগনা যা উদাসী নামে খ্যাত যা রাজারায়ের অপর পুত্রের মাধ্যমে জনৈক বারেন্দ্রীয় ব্রাহ্মণের কাছে হস্তান্তরিত হয়। বাকি তিন আনা ফতেহপুরের অধিকারী শিবচন্দ্র ইটাকুমারীতে তার রাজবাড়ী নির্মাণ করেন। ইটাকুমারী ফতেহপুর পরগনার ৪১৩.৮৮ একর বিশিষ্ট একটি গ্রাম যা পীরগাছা থানা হেড কোয়ার্টার থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।

বুকাননের বিবরণ ছাড়া এই জমিদার বংশ সম্পর্কে বিশেষ কোন ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে বলে জানা যায় না। ইটাকুমারীর ঊনবিংশ শতাব্দীর কবি রথিরাম দাসের জাগের গান কবিতায় জানা যায় যে, শিবচন্দ্র যখন ইটাকুমারীর জমিদার তখন রংপুর-দিনাজপুরসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গে প্রজা বিদ্রোহের সময়কাল। রাজস্ব সময়মত পরিশোধ না করার কারণে ইজারাদার দেবী সিংহের দ্বারা রংপুরের যে সমস্ত জমিদার নিগৃহীত ও অত্যাচারিত হয়েছিলেন তার মধ্যে রাজা শিবচন্দ্র অন্যতম। দেবী সিংহ ও তার সহকারী হররাম সেনের লাঠিয়াল বাহিনী শিবচন্দ্রকে গ্রেফতার করে রংপুর মীরগঞ্জে দেবী সিংহের কুটিবাড়ীতে অন্ধকার ঘরে আবদ্ধ করে রাখে। তখন জমিদার শিবচন্দ্রের সহধর্মিণী অন্যতম বন্দী জমিদারদের স্ত্রীদের সাথে সাবিত্রীব্রত পালন করেন বলে কথিত আছে।

বিদ্রোহের সূত্রপাত

ইতিহাস বলে দেবী জয়দূর্গা চৌধুরাণীর উদ্যোগে জমিদার শিবচন্দ্র বাকি সব জমিদারদের নিয়ে সভা করে ইটাকুমারীর দেবী সিংহের ভবন আক্রমণের পরিকল্পনা করেন কিন্তু অন্য ক্ষুদ্র জমিদারগন দেবী জয়দূর্গা চৌধুরাণীর মতো সাহসিনী আর দুর্দান্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্না ছিলেন না। তাদের মনে ভয়মিশ্রিত দ্বন্দ্ব ছিল। যদিও তারাও কোম্পানি আর দেবী সিংহের দাপটে যথেষ্ট মাত্রায় অতিষ্ঠই ছিলেন। যখন কিছুতেই সবাই একমত হতে পারছিল না তখন আসরে নামেন চিরবিদ্রোহী দেবী চৌধুরানী –

“জ্বলিয়া উঠিল তবে জয়দুর্গা মাই।

তোমরা পুরুষ নও শকতি কি নাই।

মাইয়া হইয়া জনমিয়া ধরিয়া উহারে।

খণ্ড খণ্ড কাটিবারে পারো তলোয়ারে ।।”

এরপর মোটামুটি সবাই জয়দূর্গার ধমকে প্রায় নাচার হয়ে প্রতিবাদী লড়াইয়ে শামিল হতে রাজি হল। যদি অনেকেই নিমরাজি ছিল এই ধরণের মুখোমুখি লড়াইয়ে সরাসরি অংশগ্রহণে। এরাই কবি রতিরামের ভাষায় “ভদ্রগুলা”। প্রজারা মানে যাদের জন্যে মূলত এই লড়াই তাদের মনে কিন্তু কোনোরকম দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব ছিল না।

সেই ঘটনাটিও উঠে এসেছে কবির ভাষায় –

“শিবচন্দ্রের হুকুমেতে সব প্রজা ক্ষেয়াপে।

 হাজার হাজার প্রজা ধায় এক ক্ষা‍য়াপে ।।

লাঠি নিল খন্তি নিল নিল কাঁচি দাও ।

আপত্যন করিতে আর না থাকিলে কাঁও।।

ঘাড়েতে বাঁকুয়া নিল হালের জোয়াল ।

জাঙ্গলা বলিয়া সব চলিল কাঙ্গাল ।।

চারি ভিত্তি হতে আইল রংপুরে প্রজা ।

ভদ্রগুলা আইলা কেবল দেখিবারে মজা ।।

ইঁটা দিয়া পাইটক দিয়া পাটকেলায় খুব ।

চারি ভিতি হাতে পড়ে করিয়া ঝুপ ঝুপ ।।

ইঁটায় চেলের চোটে ভাঙ্গিল কার হাড় ।

দেবী সিংহের বাড়ী হ‌ইল ইঁটার পাহাড় ।।

খিড়িকিয়া দুয়ার দিয়া পলাইল দেবী সিং।

সাথে সাথে পালেয়া গেল সেই বারঢিং।।”

দেবী সিংহ সহযাত্রী পালিয়ে মুর্শিদাবাদে চলে গেলেও এইভাবে সূত্রপাত হল ঐতিহাসিক রংপুর বিদ্রোহের। এই বিদ্রোহের সূত্রপাত ইটাকুমারী গ্রামে হলেও তা ক্রমশ মন্থনা, বামনডাঙ্গা,  টেপা, ফতেপুর, কাজীহাটা, চন্ডীপুর হয়ে সমগ্র রংপুর এবং সংলগ্ন এলাকায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। চন্ডীপূরকে ঘিরে জড়িয়ে পড়ে বাংলার বিদ্রোহী ফকির আর সন্ন্যাসী নেতৃত্বও। দেবী জয়দুর্গা চৌধুরানীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসে পুরো বৃহত্তম রংপুরের কৃষক, ফকির আর সন্ন্যাসীরা। ফকির আর সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ইতিহাস মিশে যায় কৃষক বিদ্রোহের সঙ্গে। এই বিদ্রোহ সে যুগের ব্রিটিশ কোম্পানি আর তার বশংবদ মোসাহেবদের শাসনের ভিত পর্যন্ত হেলিয়ে দিয়েছিল।

এই রংপুর বিদ্রোহের সূত্রপাতকে ঘিরে ইতিহাস যেন মিশে গেছে জাগেরগান আর লোককথার সঙ্গে। এরপর আমরা এই বিদ্রোহের আরেক মহানায়ক, প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর তরুণ নুরুলউদ্দিনের কথা, তাঁর অভিন্ন হৃদয় বন্ধু দয়ারাম শীলের কথা, প্রবীণ দিরজু নারায়ণ আর ইজরায়েল খাঁ অমর আত্মত্যাগের কথা, আর নাপাইচন্ডির সেই ঐতিহাসিক ট্যাজেডির কথা আলোচনা করব। ইতিহাস আর লোককথা ওখানে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। দেবী চৌধুরানীর মতোই রচিত হয়েছে অমর শহীদ নুরুলউদ্দিনের আত্মত্যাগ কথা নিয়ে নুরুল দীনের গান। আসুন আমরা ফিরে যাই রংপুরের সেই রক্তাক্ত গ্রাম্য ধুলোমাখা পথে নুরুল দীনের হাত ধরে।

রংপুরের মাটিতে ঐতিহাসিক কৃষকবিদ্রোহ

রংপুরের ইটাকুমারীতে যে গণবিদ্রোহের সূচনা হয় তা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। কাঁকিনাড়া, টেপাগ্রামে, চন্ডীপুরের সীমানা পেরিয়ে বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর আর কোচবিহারের বিভিন্ন অংশে এই বিদ্রোহ এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে এই ঘটনাকে অনেক ঐতিহাসিক ঝড়ের তাণ্ডবে বন্য দাবানলের ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। নিখিলনাথ রায় তাঁর ‘মুর্শিদাবাদ কাহিনী’তে এই বিদ্রোহের দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ার বিবরণ দিয়েছেন – “যখন চাষীদের উপর এই কর বৃদ্ধি ও তাহাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যার উপর পাশবিক অত্যাচার অবাধে চলিতে লাগিল, যখন তাহারা বন্য পশুর মত দলে দলে বনে বনে ভ্রমণ করিয়াও অত্যাচারের হস্ত হইতে নিষ্কৃতি পাইল না, চক্ষুর সম্মুখে নিজেদের কুটির ও যথাসর্বস্ব অগ্নিমুখে ভস্মীভূত হইতে লাগিল, তখন আর তাহারা স্থির থাকিতে পারিল না। কাজেই এই সমস্ত ভীষণ অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া উত্তরবঙ্গের প্রজাগণ দলবদ্ধ হইয়া ব্যাপক বিদ্রোহ আরম্ভ করিল।”

কৃষকদের দুর্দশার করুণ ইতিহাস

একটু ফিরে দেখা যাক দেবী সিংহ এবং ব্রিটিশ কোম্পানির শোষণের চিত্রটা – ১৭৭২ -১৭৭৭ পঞ্চবার্ষিকী ভূমিরাজস্ব বন্দোবস্ত এবং সর্বোচ্চ নিলামে কৃষিজমি ইজারা দেবার বন্দোবস্ত সাধারণ কৃষকদের স্বার্থের ওপর ছিল চরম এক অর্থনৈতিক আঘাত। যারা এই রাজস্ব সংগ্রহ এবং প্রদানের দায়িত্বে ছিল তাদের মুল লক্ষই ছিল আরও বেশি মাত্রায় মুনাফা। আর দেবী সিংহ ১৭৮০ সালের পর এই রাজস্বহার আরও বৃদ্ধি করে এবং সাধারণ কৃষকদের বর্ধিতহারে রাজস্ব দিতে বাধ্য করে। উপরন্তু দেবী সিংহ কৃষকদের দেরিনউইলা (Derinwilla) নামে আরও একটি নতুন কর (abwab) দিতে বাধ্য করে। এছাড়াও দেবী সিংহের গোমস্তারা হুন্দিয়ান (Hundian ) নামে আর একটি অর্থ বিনিময় ও প্রেরণ সংক্রান্ত কর বা Abwab প্রজাদের ওপর আরোপ করেন। দেবী সিংহ দেওয়ানী লাভ করার পরের বছরই দিনাজপুর, রংপুর ও এদ্রাকপুর পরগণার ইজারা নিজের নামে করিয়ে নেন, যদিও কোনো দেওয়ান সেসময় ইজারা নিতে পারবে না, এমনই নিয়ম চালু ছিল। কিন্তু টাকা বড় বালাই। ইংরেজ কালেক্টর গুডল্যান্ডের সঙ্গে তার বেশ একটা দহরম-মহরমের সম্পর্ক থাকায় এসব বিধি বিধান পাত্তাই পায়নি। যাই হোক, নিত্যনতুন করারোপ আর তা আদায়ে অবর্ণনীয় নির্যাতনে দেবী সিংহের জুড়ি ছিল না। হরেরাম নামক আরেকজন নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক ছিল তার সহযোগী। এদের মাধ্যমে রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলে কৃষকদের সামনে নেমে এল এক অভূতপূর্ব অন্ধকার। এসব অত্যাচারের বিবরণ দিতে গিয়ে নিখিলনাথ রায় এডমন্ড বার্কের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, “শত বৎসরের পর সেই সমস্ত অত্যাচার পড়িতে গেলে, উপন্যাস বলিয়া বোধ হয় …মনুষ্য প্রকৃতিতে এরূপ পিশাচপ্রকৃতির সমাবেশ আর কোথাও আছে কি না জানি না। দেবী সিংহের পাইকবর্গ সেই নিরীহ প্রজাগণের অঙ্গুলিতে রজ্জু বন্ধন করিয়া, ক্রমাগত পাক দিতে দিতে অঙ্গুলিগুলির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিত এবং তাহারা যখন যন্ত্রণায় কাতর হইয়া, আর্তনাদ করিয়া উঠিত, সেই সময়ে হাতুড়ির দ্বারা তাহা চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া, একেবারে অকর্মণ্য করিয়া দিত। …স্ত্রীলোকদিগকে সাধারণের সমক্ষে উলঙ্গিনী করিয়া, অবিরত বেত্রাঘাত করা হইত! লজ্জায়, যন্ত্রণায়, তাহারা ক্রমাগত বসুন্ধরাকে দ্বিধা হইয়া স্থানদানের জন্য অনুনয় করিত! …পরে তাহাদের সেই সমস্ত ক্ষতস্থান গুল ও মশালের আগুনে দগ্ধ করিয়া, যন্ত্রণার সীমা ক্রমেই বৃদ্ধি করা হইত।”

এক অসম প্রতিরোধের সূত্রপাত

যখন মানুষের ওপর অত্যাচারীর অত্যাচার চরমসীমায় পৌঁছয় তখনই কোনও না কোনও প্রতিবাদী চরিত্র জনসাধারণের মধ্যে থেকে উঠে আসে, প্রতিবাদের আর প্রতিরোধের মশালটা জ্বালিয়ে রাখতে। প্রবীণ ক্ষুদে ভূস্বামী দিরজি নারায়ণ আর ইজরায়েল খাঁ এভাবেই শিবচন্দ্র আর দেবী চৌধুরানীর জ্বালানো আগুনকে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। ক্রমশ সাধারণ কৃষকদের মধ্যেকার অসন্তোষ সংগঠিত আকার নিতে শুরু করে। আর ঠিক তখনই রংপুরের অশান্ত আকাশে উদয় হয় আর এক মহানায়কের। কৃষকনেতা, জনসাধারণের হৃদয়ের নবাব নুরুলউদ্দিন।

কে এই নুরুলউদ্দিন? কি তার পরিচয়? না, ইনি কোনো রাজা বা নবাবের বংশধর নন, নিদেনপক্ষে একজন ছোটখাটো জমিদারও নন। তাই ইতিহাসবিদরা বহু চেষ্টা করেও নুরুলউদ্দিনের পূর্ব পরিচয় সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাননি। একেবারে সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই উঠে এসেছিলেন রংপুর বিদ্রোহের এই অচেনা মহানায়ক। লোককথা বলে, কৃষকদের দুর্দশা আর দেবী জয়দুর্গা চৌধুরানীর দৃপ্ত লড়াই সবার অজান্তে রংপুরের ঐতিহ্যশালী মাটিতে জন্ম দিয়েছিল আর এক বিদ্রোহী নায়কের। খুব অল্প দিনের মধ্যেই নুরুলউদ্দিন রংপুর ও সংলগ্ন অঞ্চলের বিক্ষিপ্ত ছোট ছোট বিদ্রোহগুলিকে এক সূত্রে বাঁধতে সমর্থ হন। একদিকে শিবচন্দ্র আর দেবী চৌধুরানীর লড়াই আর অন্যদিকে কৃষকনেতা নুরুলউদ্দিনের অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ক্রমশ দেবী সিংহ, তার অনুচর হররাম এবং অন্যান্য মধ্যস্বত্বভোগীদের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ কোম্পানির প্রতিনিধিদেরও আতঙ্কিত করে তোলে।

কাজিরহাট, কাকিনা, টেপা ও ফতেহপুর চাকলা অঞ্চলে কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ শুরু করলে কোচবিহার ও দিনাজপুর অঞ্চলের কৃষকরাও এই বিদ্রোহে শামিল হন। কৃষকগণ নুরুলউদ্দীনকে তাদের ‘নবাব’ হিসেবে ঘোষণা করে দেন। নুরুলউদ্দিন আবার তাঁর অভিন্ন হৃদয় বন্ধু দয়ারাম শীলকে হিসাব নিকাশের কাজে নিযুক্ত করেন তার দেওয়ান হিসেবে। ক্রমশ জনসাধারণের কাছে নুরুলউদ্দিন, নুরুলদীন বা নবাব নুরুলদীন নামে পরিচিতি লাভ করেন। নুরলদীন কৃষকদের মুক্তির স্বপ্নে বিভোর করে তোলেন। কৃষকরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় নুরলদীনকে স্বতঃফূর্তভাবে সহায়তা করতে থাকেন। প্রথমদিকে নূরলদীন ও উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের প্রতিবাদ ছিল শান্তিপূর্ণ। তারা ভেবেছিলেন, ইংরেজ সরকার হয়তো দেবী সিংহের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। সেই লক্ষ্যে তারা কৃষকদের উপর অত্যাচারের বিবরণ তাদেরই সই সহ গুডল্যান্ডের নিকট পাঠিয়ে দেন আর ব্যবস্থা নিতে নির্দিষ্ট সময়ও সেখানে বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু গুডল্যান্ড নিজেই দেবী সিংহের কাছ থেকে সুবিধাভোগী ছিলেন। দেবী সিংহের লুটের টাকার বড় অংশ আসতো তার পকেটে। কাজেই তিনি এদিকে ভ্রূক্ষেপও করলেন না। এ বিষয়ে সুপ্রকাশ রায় তাঁর ‘ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ বইয়ে লিখেছেন –

“কিন্তু কালেক্টর দাবি পূরণের জন্য কোন চেষ্টাই করিলেন না, ইহার পর কৃষকগণ সশস্ত্র বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল। তাহারা কালেক্টরকে জানাইয়া দিল, তাহারা আর খাজনা দিবে না এবং এই শাসন মানিয়া চলিতেও প্রস্তুত নহে।’

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে ব্যর্থ হয়ে কৃষকগণ এবার প্রতিরোধের ডাক দিলেন। ১৭৮৩ সালের জানুয়ারি মাসেই নুরলদীনের নেতৃত্বে কৃষকরা নেমে যান চূড়ান্ত বিদ্রোহে। এবার তাদের বিদ্রোহের লক্ষ্য শুধু দেবী সিংহের উৎখাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলো না, বরং তারা ঘোষণা করে দিলেন যে তারা আর ইংরেজদের শাসনও মেনে চলবেন না। নুরলদীনের নির্দেশে কৃষকরা সকল প্রকার খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেন। বিদ্রোহের খরচ মেটানোর জন্য ‘ডিং খরচা’ নামে তারা অর্থ বা চাঁদা সংগ্রহ করতে থাকেন। কৃষকরা আগে থেকেই তাদের উপর অত্যাচারের প্রতিশোধের জন্য মুখিয়ে ছিলেন। নুরলদীনের আহ্বানে রংপুর, দিনাজপুর, কোচবিহার বিভিন্ন জায়গা থেকে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বিদ্রোহী কৃষকরা আন্দোলনে যোগ দিতে লাগল। বিদ্রোহের ব্যয় সংকুলানের জন্য কৃষকদের উপর ডিং খরচা নামে বিদ্রোহের এই চাঁদা বিষয়ে – ১৯১১ সালে প্রকাশিত Gazetteer of Rangpur District-এ এই সম্পর্কে লেখা হয়েছে –

“The exactions of a notorious farmer Raja Deboi Singh of Dinajpur, caused an insurrection of the cultivators in 1783. The revenue officers were driven out.  A petition of grievances was submitted to the collector, who offered various concessions, which did not serve to quell the disturbance. The insurgents committed several murders, and issued a proclamation that they would pay no more revenue. They forced the cultivators of Cooch Behar to join them, and sent parties into Dinajpur to raise the people there. One of the leaders assumed the title of Nawab; and a tax called dingkharacha, or sedition tax, was levied for the expenses of the insurrection.”

দেবী সিংহের লুটের টাকার ভাগ গুডল্যান্ড সাহেবও পেতেন বলে তাঁদের মধ্যে বেশ ভালই বন্ধুত্ব ছিল। এছাড়া বিদ্রোহীদের প্রতি তিনি আদৌ সন্তুষ্ট ছিলেন না। তারপরেও  বিদ্রোহীরা তখন পর্যন্ত ইংরেজদের কোনো ক্ষতি করেনি বলে আগ বাড়িয়ে তাদের সঙ্গে ঝামেলা করার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না। টাকা কামাতে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে এই দেশে এসে যতখানি ঝামেলামুক্তভাবে টাকা কামানো যায়, ততটুকুই ভাল। দেবী সিংহের সঙ্গে তার বন্ধুত্বও কোনো হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ না যে, তার বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। দেবী সিংহও এটা জানত। কাজেই, রংপুরে এসেই দেবী সিংহ গুডল্যান্ড সাহেবকে প্রচুর অর্থ উপঢৌকন হিসাবে দিল। এবার টাকার গন্ধে গুডল্যান্ড সাহেব যথারীতি নড়ে চড়ে বসল। কর্তৃপক্ষের কাছে আর্জি জানাল যে, নুরলদীন নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে সমগ্র রংপুর ও দিনাজপুরে সশস্ত্র বিপ্লব ঘটেছে। বিদ্রোহীরা ইংরেজদেরও প্রভূত ক্ষতি করছে এবং জমিদারদেরও অব্যাহতি দিচ্ছে না। অবিলম্বে এই বিদ্রোহ দমন করার জন্য সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করা হোক। ব্রিটিশ কোম্পানির তরফে তখন এলো ম্যাকডোনাল্ড সাহেব বেশ কিছু সংখ্যক সৈন্য আর কামান নিয়ে। ম্যাকডোন্যাল্ড তার বিরাট বাহিনী নিয়ে রংপুরে প্রবেশ করেই সেটাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন দিকে পাঠিয়ে দিল। এরা বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করার আগে পোড়ামাটি নীতি নিয়ে অগ্রসর হলো। সৈন্যরা যে পথ দিয়ে গেল, সেই পথে যাকে দেখতে পেলো, তাকেই হত্যা করলো। শিশু হত্যা এবং নারী নির্যাতন করতেও কোনো দ্বিধা তারা করলো না। জ্বালিয়ে দিতে লাগলো গ্রামের পর গ্রাম। এদিকে নুরুলদীনের নেতৃত্বে বিদ্রোহী কৃষকরাও তাদের সীমিত সামর্থ্য নিয়ে প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে লাগলেন। কোথাও বিদ্রোহীরা, আবার কোথাও ইংরেজরা জয় পেলেও চূড়ান্ত লড়াই তখনও বাকি ছিল।

মোগলাহাটের লড়াই

নুরলদীনের অনুগামী বিদ্রোহী কৃষকরা লাঠি-সোঁটা আর দা-কাস্তে নিয়ে একত্র হলেন পাটগ্রামে। উদ্দেশ্য  ইংরেজদের শক্ত ঘাঁটি মোগলহাট আক্রমণ করে তাদের পরাস্ত করা। যদিও কৃষকদের লাঠি কিংবা দা-কাস্তে ব্যতীত অন্য কোনো অস্ত্র ছিল না, তারপরেও অত্যাচারীকে প্রতিরোধ করার দুর্বার প্রতিজ্ঞা কিন্তু তাদের ছিল।

অপরদিকে, লেফটেন্যান্ট ম্যাকডোনাল্ড অবশ্য নূরলদীনের সঙ্গে সম্মুখ সমরের দিকে গেলই না। ম্যাকডোনাল্ড আশ্রয় নিল কূটকৌশলের। ছদ্মবেশ নিয়ে এগিয়ে গিয়ে কৌশলে রাতের আঁধারে ঘিরে ফেলল বিদ্রোহীদের ঘাঁটি পাটগ্রাম। দিনটি ১৭৮৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। অতি ভোরে ঘুমন্ত মুক্তিকামী কৃষকদের উপর ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলে পড়ল লেফটেন্যান্ট ম্যাকডোনাল্ড ও তার বাহিনী।

১৭৮৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির অতি ভোরে ম্যাকডোন্যাল্ড বাহিনী বিদ্রোহীদের উপর গুলি চালনা শুরু করে। অতর্কিত এই আক্রমণে হকচকিয়ে যায় বিদ্রোহীরা। ইংরেজদের মতো আধুনিক সমরাস্ত্র তাদের ছিল না, ছিল না যুদ্ধের সুশিক্ষিত প্রশিক্ষণ পদ্ধতি। এই আক্রমণে দিশেহারা হয়ে যায় তারা। ফলে, দলে দলে নিহত হয় তারা, আহত হয় অসংখ্য আর বাকিরা প্রাণভয়ে পলায়ন করে। এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যু হয় নুরুলদীনের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু দয়ারাম শীলের, মৃত্যু হয় দিরজি নারায়ণ আর সাজু আলির। গোলার আঘাতে আহত গুরুতরভাবে আহত হন নুরলউদ্দিন স্বয়ং। ইংরেজরা তাঁকে আহত অবস্থায়ই বন্দি করে। আঘাত এতোই গুরুতর ছিল যে, মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। গুডল্যান্ড তাঁর রিপোর্টে লিখেছিলেন-

“In an attempt to burn Mughalhat, the self-styled Nawab’s forces were defeated, and the Nawab himself wounded and taken prisoner. A party of sepoys under Lieutenant Macdonald marched to the north against the principal body of insurgents and a decisive engagement was fought near Patgram on the 22nd February 1783. The sepoys disguised themselves by wearing white clothes over their uniform and by that means got close to the rebels, who were utterly defeated; sixty were left dead on the field, and many others were wounded and taken prisoners.”

এই বিদ্রোহে হয়তো বিদ্রোহী কৃষকরা পরাজিত হন আধুনিক সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত ইংরেজ বাহিনীর কাছে, কিন্তু আজও ফেব্রুয়ারি মাসে যখন রংপুরের মাঠে ঘাটে শীতের শেষের উদাত্ত হাওয়া নিজের মনে বয়ে যায় তখন যেন আজকের সমাজকে মনে করিয়ে দেয় সেই অসম কিন্তু দুর্দান্ত লড়াইয়ের বীরগাথা, মনে করিয়ে দেয় বিদ্রোহীদের রক্তে সেদিন রংপুরের মাটি কালচে আর চ্যাটচ্যাটে হয়ে উঠলেও তাতে কোনো বিশ্বাসঘাতকতার দুর্গন্ধ নেই, তাতে মিশে আছে দরিদ্র কৃষকদের ঘাম আর রক্তের গন্ধ, মিশে আছে নুরুলউদ্দিন আর দয়ারাম শীলের রক্তস্নাত বন্ধুত্বের অমলিন স্বপ্নের কথা, মিশে আছে প্রবীণ দিরজি নারায়ণ, সাজু আলি আর আরও অসংখ্য নাম না জানা কৃষকের লড়াইয়ের কাহিনী।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সৈয়দ শামসুল হক স্মরণ করেছিলেন রংপুরের সেই যুগের আরেক মুক্তিযোদ্ধা নুরুলদীনকে। যুদ্ধই মনে করায় যোদ্ধাকে। একজন সংগ্রামীই বোঝে আরেক সংগ্রামী যোদ্ধার ঘাম আর রক্তের মূল্য। তাই পরিশেষে তাঁর লেখা কটি লাইন তুলে দিলাম –

নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়

যখন শকুনি নেমে আসে এই সোনার বাংলায়,

নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়

যখন এ দেশ ছেয়ে যায় দালালের আলখাল্লায়,

নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়

যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়,

নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়

যখন আমার কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়,

নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়

যখন আমারই দেশে আমারই দেহ থেকে

রক্ত ঝরে যায় ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায়,

আসুন, আসুন তবে আজ এই প্রশস্ত প্রান্তরে

যেখানে স্মৃতির দৃধ জ্যোৎস্নার সাথে খেলা করে

তখন কে থাকে ঘুমে, কে থাকে ভেতরে

কে একা নিঃসঙ্গে বসে অশ্রুপাত করে?

সমস্ত নদীর অশ্রু অবশেষে ব্রহ্মপুত্রে মেশে..

নূরলদীনের কথা সারাদেশে পাহাড়ী নদীর মত নেমে আসে সমস্ত ভাষায়

অভাগা মানুষ যেন আবার জেগে উঠে এই আশায় যে-

আবার নূরলদীন একদিন আসিবে বাংলায়

আবার নূরলদীন একদিন কাল-পূর্ণিমায় দিবে ডাক–

জাগো বাহে, কোনঠে সবাই…..

– সৈয়দ শামসুল হক (নূরলদীনের সারাজীবন)

তথ্যসূত্র:

১)সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ: ইতিহাসের পূণর্বিবেচনা: আনন্দ ভট্টাচার্য

২) বাংলার ইতিহাস: ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো – অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম

৩) ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম – সুপ্রকাশ রায়

৪) পীরগাছা উন্নয়ন পরিষদ – উপজেলা পরিক্রমা (১৩ই আগস্ট, ২০১৫)

৫) Historical Presence of Debi Chowdhurani and the then Societal Structures of Rangpur, Bangladesh: Goutam kumar Das

৬)  কুচবিহারের ইতিহাস – খাঁন চৌধুরী আমানাতুল্লা আহমেদ

৭) আঠারো শতকের বাঙলা ও বাঙালি : অতুল সুর

৮) কিংবদন্তির দূর্গাপুর : কমল মিত্র

৯) তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ : পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

১০) নোয়াখালি ডিস্ট্রিক্ট গেজেট

১১) R C Majumder, History of Freedom Movement in India, Vol-1, Farma K L M, Kol., 1971

১২) দ্য সন্ন্যাসী রিবেলিয়ন, অসিতনাথ চন্দ্র, কলকাতা, ১৯৭৭

১৩)Edward Thompson & G.T. Garratt, Rise and Fulfilment of British rule in India, Central Book Dep.Allahabad, 1973,

১৪) Capt. Rennel’s letter to the collector 30th October, 1766, Long’s Selection, সুপ্রকাশ রায়, ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, বুক ওয়ার্ল্ড, কলকাতা, ১৯৯৬

১৫) Gazetteer of Rangpur District -1911

১৬) বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন – রংপুর অংশ

১৭) স্বাধীনতার সংগ্রামে বাঙলা : ডঃ নরহরি কবিরাজ

১৮) মুর্শিদাবাদ – কাহিনী – নিখিলনাথ রায়

লেখক কর্মসূত্রে স্প্যানিশ ও ফরাসি ভাষা চর্চা করেন। ইতিহাস আর সাহিত্য, বিশেষত বাংলা ও ফরাসি সাহিত্য আর আধুনিক যুগের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী, আর ভালোবাসেন খেলাধুলো বা জমাটি আড্ডা। সাহিত্যের প্রিয় বিষয় জাদুবাস্তবতা।