সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

মৃচ্ছকটিক

মৃচ্ছকটিক

সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়

ফেব্রুয়ারী ১৩, ২০২১ ৫৭২

প্রাচীন ভারতের যে ক’টি সাহিত্য কীর্তির নাম আমরা এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করি তার মধ্যে একটি হলো শূদ্রক বিরচিত মৃচ্ছকটিক। কোনো সাহিত্যকীর্তি যখন ইতিহাসের আলোকে বিচার্য হয় তখন যে যে ক্ষেত্রগুলির আলোচনা অপরিহার্য হয়ে পড়ে সেগুলি হল— নাম পরিচিতি, লেখকপরিচিতি, ভাষা ও স্থান পরিচিতি, রচনার মধ্যে যদি কোন ঐতিহাসিক চরিত্র/ঘটনা থাকে তবে তার সনাক্তকরণ ইত্যাদি। এসবের পরে আসে রচনাটি সাহিত্যের কোন আঙ্গিকের অন্তর্ভুক্ত, সেটি পূর্বের কোন রচনার ছায়াবলম্বনে রচিত কিনা, প্রক্ষিপ্ত অংশ আছে কিনা এবং সর্বোপরি যা থাকে তা হল বর্ণিত কাহিনীর অনুসরণ। একে-একে বিষয় গুলি আলোচনা করা যায়।

নামপরিচিতি— মৃচ্ছকটিক কথাটির অর্থ  মাটির তৈরি ছোট খেলনাগাড়ি অর্থাৎ মৃৎ-শকট। এই সামান্য জিনিসটি পুরো নাটকে একটি রূপক-চুম্বক হিসেবে কাজ করেছে, যা যথাস্থানে আলোচ্য।

লেখকপরিচিতি ও সময়কাল — এই দুটি বিষয় অঙ্গাঙ্গী জড়িত তাই একই সাথে আলোচ্য। শূদ্রকের প্রকৃত পরিচয় বিতর্কিত।  শূদ্রক নামটিতেই বৈশিষ্ট্য আছে। অশূদ্র পিতা-মাতা সন্তানের এমন নাম দেবেন না।শূদ্র পিতা-মাতাই কি দেবেন?! তাই এক্ষেত্রে দুটি সম্ভাবনা থাকে। এটি লেখকের ছদ্মনাম বা উপাধি। অথবা কোন শূদ্র রাজা বা/এবং নাট্যকার, যথেষ্ট খ্যাতিমান হয়ে নিজের শূদ্র পরিচয় সার্থকবোধে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তা যদি হয় তবে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সাহসী ও প্রশংসনীয়।

সুক্তিমুক্তাবলীতে একটি শ্লোক আছে যাতে শূদ্রক কথাকার রামিল ও সোমিলের উল্লেখ আছে। এর অর্থ এমন হতে পারে যে দুজন মিলে একখানি শূদ্রককথা নামক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। (যদিও সেটি পাওয়া যায়নি।) শূদ্রক কে অনেকে সাতবাহন বংশের শিমুকের সাথে সনাক্ত করেন। কিন্তু সাতবাহন বংশ ব্রাহ্মণ্যগর্বিত ছিল। বানভট্টের কাদম্বরীতে এক শূদ্রকের উল্লেখ আছে। এছাড়া যেসব বিখ্যাত রচনায় আমরা শূদ্রক নামটি  পাই সেগুলি, হলো বেতালপঞ্চবিংশতি, বামনের কাব্যালংকার সূত্রবৃত্তি, রাজতরঙ্গিনী, দন্ডীর অবন্তীসুন্দরীকথা ইত্যাদি। এইসব রচনার কোনোটিতে রাজার শতবর্ষ পরমায়ু উল্লেখ, কোনোটিতে রাজা হস্তি শিক্ষা বিশারদ,ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে। যেগুলি আবার  মৃচ্ছকটিকেও পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে মনে হয় মৃচ্ছকটিকের শূদ্রকপরিচিতি শ্লোকগুলিতে বহু প্রখ্যাত রাজার গুণাবলী একত্র করে রচনাকার শূদ্রকের প্রতি আরোপিত হয়েছে।

এই নাটক রচনার সময়কাল সম্পর্কে সুকুমারী ভট্টাচার্য লিখেছেন “মৃচ্ছকটিক নাটক আজ থেকে অন্যূন দেড় হাজার বছরেরও বেশি দূরত্বে অবস্থিত।” লক্ষণীয় যে কাদম্বরীর রচনাকাল সপ্তম শতক আর কাব্যালংকার সূত্রবৃত্তির, অষ্টম শতক। তাই এই নাটকটির জন্য খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের কোন এক সময়কে নির্দিষ্ট করা অযৌক্তিক নয়।

ভাষা ও স্থান পরিচিতি—  এই নাটকে বর্ণিত ঘটনার সংঘটনস্থল উজ্জয়িনী। কিন্তু ভাষায় ও নানা আচার সংস্কারে, শব্দে, বাক্যে দাক্ষিণাত্যের ছাপ রয়েছে। যেমন কর্ণাটকলহ, দেবী সহ্যবাসিনী ইত্যাদি শব্দ। তাছাড়া বীরক নামক একটি চরিত্র নিজের পরিচয় বলেছে ‘বয়ং দাক্ষিণাত্যাঃ’। তাই দাক্ষিণাত্যের সঙ্গে নাটকটির যোগাযোগ ছিল অনুমিত হয়। আর নাটকের সংলাপে বিশুদ্ধ সংস্কৃত যেমন আছে তেমনি শৌরসেনী, মাগধী, এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিকৃষ্ট শাকারী প্রাকৃতের ব্যবহারও দেখা যায়।

ঐতিহাসিক ঘটনা— মৃচ্ছকটিক নাটক একটি রাষ্ট্রবিপ্লবের সাক্ষ্য দেয়। নাটকে উল্লেখিত সিংহাসীন রাজার নাম পালক। তাকে সরিয়ে দিয়ে যিনি সিংহাসনে বসেন তার নাম আর্যক। এদের সনাক্তকরণ প্রয়োজন। এবং এজন্য আমাদের চলে যেতে হবে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতকে। পালক ছিলেন অবন্তীর রাজা। ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম অবন্তীর অবস্থিতি ছিল মালব, নিমার ও মধ্যপ্রদেশ সংলগ্ন অঞ্চল। একে দুভাগ করেছিল বেত্রবতী বা বেতোয়া নদী। উত্তর ভাগের রাজধানী উজ্জয়িনী (ডক্টর ভান্ডারকরের মতে)। এখানকার রাজা প্রদ্যোত।তার দুই পুত্র ছিলেন গোপাল ও পালক। আবার গোপালের পুত্র ছিলেন আর্যক। সম্ভবত পালকের অপশাসনের জন্য অন্তর্দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। তাকে সরিয়ে দিয়ে রাজা হন ভ্রাতুষ্পুত্র আর্যক। পরবর্তীতে, মগধের রাজা শিশুনাগ অবন্তী জয় করে নেন। নাটকের নানা সংলাপে পালক গোপাল ও আর্যকের নামের উল্লেখ আছে। তাই মৃচ্ছকটিক বর্ণিত রাষ্ট্রবিপ্লব এবং এইসব চরিত্ররা অবশ্যই ঐতিহাসিক।

প্রক্ষিপ্ত অংশ– সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতে নাটকটির বেশ কিছু অংশ ও সংলাপ প্রক্ষিপ্ত। যেমন বসন্তসেনার গৃহের বিস্তৃত বর্ণনা, দারিদ্র ও বর্ষার বর্ণনা ইত্যাদি অংশ।

রচনার আঙ্গিক — মৃচ্ছকটিক একটি নাটক। প্রকারভেদ অনুযায়ী এটি হলো প্রকরণ। প্রকরণের কিছু নির্দিষ্ট রীতি থাকে, যেমন কবিতায় থাকে ছন্দের রীতি। ভরতের নাট্যশাস্ত্র ও বিশ্বনাথের সাহিত্যদর্পণ থেকে আমরা এই রীতিগুলি সম্পর্কে ধারণা পাই। সেই অনুযায়ী প্রকরণের অংক সংখ্যা হতে হবে পাঁচের কম নয়, দশের বেশি নয়। ঘটনা হবে লৌকিক।মূল রস শৃঙ্গার। গণিকা বা কূলবধূ অথবা উভয়েই এর নায়িকা হতে পারেন।নায়ক হবেন ব্রাহ্মণ, অমাত্য বা বণিক। উভয়েই হবেন উন্নতচরিত্র ও ন্যায়পরায়ণ।

মৃচ্ছকটিকে অংক সংখ্যা দশ। যথাক্রমে অলংকারন্যাস, দূত্যকর-সংবাহক, সন্ধিচ্ছেদ, মদনিকা-শর্বিলক, দুর্দিন (সংস্কৃতে বজ্র-বিদ্যুৎ-ঘনঘটা সহকারে অকাল বর্ষণ হলে, তার পারিভাষিক নাম দুর্দিন।), প্রবহন, আর্যকাপহরণ,বসন্তসেনামোটন,ব্যবহার,ও সংহার। নায়ক চারুদত্ত বণিক।আর নায়িকা বসন্তসেনা গণিকা। যদিও অন্তরালে চারুদত্তের স্ত্রী কূলবধূ ধূতা রয়েছেন। এই নাটকের কাহিনী ভাস রচিত ‘চারুদত্ত’ নাটকের অনুসারী। তবে তা পঞ্চম অংক পর্যন্তই। বাকি পাঁচটি অংক শূদ্রকের নিজস্ব রচনা এবং সেই পর্যায়েই নাটক তার নিজস্ব গতিতে অনবদ্য!

মৃচ্ছকটিক নাটকের অন্যতম চরিত্রলক্ষণ হলো অবাস্তব ও অতিলৌকিক বিষয়ের অনুপস্থিতি,প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে যা বিরল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই নাটক বিভিন্ন ভারতীয় ভাষাতে তো বটেই; ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, ইতালিয়ান, সুইডিস ইত্যাদি নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। অর্থাৎ এর খ্যাতি বিশ্বজোড়া।

কাহিনী সূত্র— কাহিনীর নায়িকা উজ্জয়িনীর বিখ্যাত গণিকা সুন্দরী বসন্তসেনা, যে স্বভাবতই প্রভূত সম্পদ শালিনী। এই বসন্তসেনা একদা-ধনবান কিন্তু বর্তমানে দানধ্যানের কারণে দরিদ্র অথচ ন্যায়পরায়ণ বণিক চারুদত্তের প্রতি আসক্ত হয়,মদনমন্দিরে নৃত্যের সময় তাকে দেখে। এদিকে রাজা পালকের মূর্খ-দাম্ভিক-নিষ্ঠুর-অত্যাচারী শ্যালক সংস্থানক বসন্তসেনা কে নিজ আয়ত্তে আনতে মরীয়া হয়ে ওঠে।মদনপূজার ঐ রাতেই সে এবং তার সাঙ্গপাঙ্গ বসন্তসেনাকে তাড়া করে। এদের হাত এড়াতে বসন্তসেনা আশ্রয় নেয় চারুদত্তের বাড়িতে। পুনরায় সাক্ষাতের অজুহাত তৈরীর জন্য সে নিজের গায়ের গহনাগুলি চারুদত্তের কাছে গচ্ছিত রেখে যায়। নাটকের বিশিষ্ট চরিত্র শর্বিলক ওই গহনা চুরি করে। দরিদ্র শর্বিলকের উদ্দেশ্য ছিল নিস্ক্রয়মূল্য দিয়ে তার প্রিয়া,গণিকা মদনিকাকে মুক্ত করা। এই মদনিকা যেহেতু ছিল বসন্তসেনার সখী, তাই গহনা শেষপর্যন্ত বসন্তসেনার হাতেই পৌঁছায়। মদনিকা মুক্ত হয়।যদিও চারুদত্তের স্ত্রী ধূতা,স্বামীর সম্মানরক্ষার্থে নিজের বহুমূল্য কন্ঠহার চারুদত্ত-সখা মৈত্রেয় মারফৎ বসন্তসেনাকে পাঠায়। বসন্তসেনা পুনরায় গহনা ও ওই হার নিয়ে চারুদত্তর বাড়িতে আসে যেন অভিসারিকার মতোই। এইবার সকল ভ্রান্তি অপনোদিত হয়।

এর পরেই আছে নামকরণের বিষয়টি। চারুদত্তপুত্র রোহসেন, প্রতিবেশীর পুত্রের সোনার খেলনা গাড়ি দেখে বায়না করায় দাসী রোদনিকা তাকে অনুরূপ একটি মাটির গাড়ি দেয়। কিন্তু তাতে বালকটির কান্না থামে না।চারুদত্তের বাড়িতে, বসন্তসেনার সামনেই এই ঘটনা ঘটে। তাই কারণ জেনে নিয়ে বসন্তসেনা নিজের গহনাগুলি দিয়ে ওই মৃৎ-শকট ভরে দেন। বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর ঠিক আগেই রোহসেন রোদনিকার কাছে অপরিচিতা বসন্তসেনার পরিচয় জানতে চেয়েছিল। রোদনিকা বলেছিল যে বসন্তসেনা তার (রোহসেনের) মা হন।বালকটি তা মানতে অস্বীকৃত হয়েছিল এই বলে যে, তার মা অত গহনা পরেন না। তাই বসন্ত সোনার গহনা ত্যাগ যেন তাকে মাতৃ- মর্যাদা দান করে। অন্যদিকে চারুদত্তের সাথে তার বিত্তপার্থক্য ঘুচে যায়। স্বেচ্ছায় আভরনহীনা বসন্তসেনা ও দানের কারণে দরিদ্র চারুদত্তের প্রকৃত মিলন ঘটে মানবিকতার সমধর্মে। তাছাড়া মানুষের বহিরঙ্গ আর অন্তরঙ্গের প্রতীক হয়ে ওঠে, ভিতরে সোনা ভরা অথচ বাইরে মাটির আবরণ যুক্ত ছোট গাড়িটি।

অন্তরালে রাষ্ট্রবিপ্লবের প্রেক্ষাপট প্রস্তুত হচ্ছিল। গনৎকারের ভবিষ্যৎ বাণী শুনে ভীত রাজা পালক বন্দি করে আর্যক কে।আর্যক শর্বিলক ও  আরো কিছু বন্ধুর সহায়তায় কারাগার থেকে পালাতে সক্ষম হয়।অন্যদিকে চারুদত্তের বাড়িতে রাত কাটিয়ে সকালবেলা বসন্তসেনা, চারুদত্তর বাগানবাড়িতে যাবার প্রস্তুতি নিতে থাকে। সেখানে সে যাবে দুয়ারে প্রস্তুত রাখা বলদের গাড়িতে চেপে। আবার পায়ে ছিন্ন শিকলসহ পলায়নরত আর্যক, রাজপ্রহরীদের ভয়ে চারুদত্তর বাড়ির দরজা খোলা দেখে সেখানে ঢুকে পড়ে। ইতিমধ্যে বসন্তসেনার জন্য প্রস্তুত গাড়িটির গাড়োয়ান, গাড়িতে পাতার পাতনি আনতে চলে যায় অল্পক্ষণের জন্য, গাড়ি সহ। আর ঠিক সেই সময় সংস্থানকের খালি গাড়ি আসে ওই পথেই। যার গাড়োয়ানকে নির্দেশ দেওয়া ছিল সংস্থানকের পুরনো বাগানবাড়ি পুষ্পকরন্ডকে যাবার জন্য। সে যুগেও ট্রাফিক জ্যাম হত। তাতেই প্রমাদ ঘটে। বসন্তসেনা, দাঁড়িয়ে থাকা সংস্থানের গাড়িতে ভুল করে উঠে পড়ে ও যাত্রা করে। তার নিজের গাড়ি ফিরে আসে এর ঠিক পরেই। প্রাণের ভয়ে নিজেকে লুকোতে, তাইতে চেপে বসে আর্যক। এইভাবে গহনাবদলের মতোই গাড়িবদলের ভ্রান্তিতে,চারুদত্ত-অভিমুখী বসন্তসেনা পৌঁছে যায় সংস্থানকের নির্জন বাগানে।আর আর্যককে বহনকারী গাড়িটি এসে পরে চারুদত্তের কাছে।

নাটক তীব্র উত্তেজনাকর মোড় নেয়…

নাটকের বাকি অংশ,পাঠক পড়বেন, মূল বা অনুবাদগ্ৰন্থ থেকে।

এ নাটক সম্পর্কিত আরো বেশ কিছু সংশ্লিষ্ট প্রাসঙ্গিক বিষয় আলোচনার দাবী রাখে।

যেমন,বহু চরিত্রবিশিষ্ট এই নাটকটির একটি চরিত্রের কথা আলাদা করে না উল্লেখ করলে যুগপৎ কাহিনীর ও নারীর মর্যাদা রক্ষিত হয় না। তিনি হলেন চারুদত্তগৃহিণী ধূতা।চারুদত্তের মতো যুবক স্বামী ও রোহসেনের মতো বালক পুত্র যাঁর, তিনি নিশ্চিত ভাবেই তরুণী। আর বসন্তসেনা-চারুদত্ত প্রণয় তাঁর অজানা থাকাও সম্ভব নয় কারণ বসন্তসেনা চারুদত্তের বাসগৃহে রাত্রিযাপন করেছে। অথচ কোন উক্তিতে বা আচরণে কোনো প্রকার ঈর্ষার প্রকাশ আমরা তাঁর মধ্যে দেখিনা। বরং গহনা চুরি গেলে, নিরাভরনা এই নারী নিজের শেষ অলঙ্কার, বহুমূল্য কণ্ঠহারখানি দিয়ে স্বামীর মন রক্ষা করেন। আবার সেটাও দেন ব্রতপালনের অজুহাতে যাতে স্বামী তাঁর কাছেও না ছোট হয়ে যান।শেষদৃশ্যে এই পতি সোহাগিনী নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতেও দ্বিধাহীনচিত্ত। তবু পুরো নাটকে তার উল্লেখ অকিঞ্চিৎকর। একেই কি তবে বলে কাব্যে উপেক্ষিতা?!

মৃচ্ছকটিক নাটক আমাদের সমকালীন অনেক বিষয়ে ধারণা দেয়। যেমন সমাজস্থিত অভিজাতশ্রেণীর জীবন যাপন। এদের বেশভূষা, দিনপঞ্জি ইত্যাদির যেটুকু বর্ণনা এখানে আছে,তাতে কামসুত্রে উল্লেখিত ‘নাগরক’দের লক্ষণগুলি স্পষ্ট।আর দ্বিতীয়টি হলো বাগানবাড়ি। রাজা ও অভিজাতদের জীবনচর্চায় এর গুরুত্ব ছিল অনেকটাই। কারণ দেখা যাচ্ছে চারুদত্ত দরিদ্র হয়ে গেছেন, তার বাসগৃহের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়, কিন্তু তা সত্বেও তাঁর একটি সাজানো বাগান বাড়ি রয়েছে। আবার রাজার শ্যালক সংস্থানকও, নিজের বাগানবাড়ির গর্বে নিজেই মোহিত। এইরকম আরো একটি বিষয় হলো,গণিকামুক্তি।একটি পদ্ধতি ছিল নিষ্ক্রয়মূল্য দান। এইভাবে শর্বিলক মদনিকাকে মুক্ত করে।অন্যটি হতো রাজার বিশেষ ক্ষমতাবলে। গণিকাদের অনবগুণ্ঠিতা থাকতে হতো। রাজা তাকে অবগুণ্ঠন দেবার অধিকার দান করতে পারতেন, যার অর্থ ছিল গণিকাবৃত্তি থেকে মুক্তি। শেষদৃশ্যে, নতুন রাজা আর্যক বসন্তসেনাকে এই মর্যাদা দান করেছিলেন।

এই নাটক বিধৃত করে মাত্র চার দিনের ঘটনা। তাই এর গতি দুর্বার। মূল কাহিনীর পাশাপাশি এখানে রয়েছে— জুয়াখেলার নানা রীতি পদ্ধতি, সিঁধকাটা ও চুরিকে যে একটা আর্টের পর্যায়ে উন্নীত করা যায় সেই পরিচয়, বদমেজাজী হাতির কান্ডকারখানা, সমৃদ্ধ নগরী উজ্জয়িনীর কিছু কিছু বর্ণনা, বিলাসবহুল ইন্দ্রপ্রাসাদ তুল্য গণিকালয়ের অনুপুঙ্খ বিবরণ, সুখে-দুঃখে রাষ্ট্রবিপ্লবে এমনকি শ্মশানেও অনুসারী বন্ধুত্বের উজ্জ্বল উপস্থিতি (চারুদত্তসখা মৈত্রেয়), সতী নারীর মাহাত্ম্য, নৈতিকতার মান, শ্মশানের বর্ণনা, দন্ডবিধি, বিচারের বাণী সেকালেও কিভাবে নীরবে-নিভৃতে কাঁদত তার প্রাঞ্জল ছবি, ইত্যাদি। রয়েছে সেই যুগের বিভিন্ন বৃত্তির উল্লেখ যেমন গণিকা, বণিক, বিট,চেট, অধিকরণিক, শ্রেষ্ঠীকায়স্থ, দাস-দাসী, সংবাহক,হাতির মাহুত, গাড়োয়ান, জুয়াড়ি, চন্ডাল ইত্যাদি।

রয়েছে প্রভূত হাস্যরস,যা এই নাটকের একটি সম্পদ। [দু-একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সংস্থানক আদতে মূর্খ, কিন্তু কথায় কথায় রামায়ণ-মহাভারতের তুলনা দেওয়া চাই-ই তার।যেমন সে বলে,”বসন্তসেনা, আমি তোমাকে তাড়া করেছি। আমার হাত থেকে কে তোমাকে বাঁচাবে?জমদগ্নির ছেলে ভীমসেন না কুন্তির ছেলে রাবণ?!” চারুদত্তের বন্ধু মৈত্রেয় যখন বসন্তসেনার  আটমহলা বাড়িতে যায় তখন সপ্তমমহলে তার স্থূলাঙ্গিনী মা কে দেখে জিজ্ঞাসা করে,”..তা আগে শিবপ্রতিষ্ঠা করে যেমন শিব মন্দির গড়ে, তেমনি এঁকে আগে ঢুকিয়ে তবে কি এ বাড়ির এত বাহারি দরজাখানা তৈরি হয়েছিল?!]…

আর সমস্ত কিছু ছাপিয়ে মৃচ্ছকটিক নাটক ধারণ করে, এক অসাধারণ antique smell, যা আমোদিত করবেই পাঠকের মনকে।

নাটকটি পড়ার শেষে কিছু প্রশ্ন, ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সামনে উঠে আসে। যেমন চারুদত্ত বনিক হয়েও দরিদ্র– তা সে যে কারণেই হোক। এটা কি আদিমধ্যযুগের কৃষিঅর্থনীতির বিকাশ ও (ভারতীয় মাপকাঠিতে) সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় কৃষিনির্ভর জমিদার শ্রেণীর, এলিট স্তরে উন্নীত হবার কোন সংকেত?? আবার গণিকাদের অবস্থান এবং তার বিবর্তনের পথই বা কেমন ছিল?? সমকালীন আরো সাহিত্যকীর্তি ও লেখগুলি হয়তো আমাদের এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করবে।

তথ্যসূত্র—

১. শূদ্রক বিরচিত মৃচ্ছকটিক নাটকের, সুকুমারী ভট্টাচার্য কৃত অনুবাদ।

২. Political History of Ancient India—Hemchandra Raychaudhuri.

৩. Gardens in Early Indian Court Life.— Daud Ali.

মন্তব্য তালিকা - “মৃচ্ছকটিক”

  1. বহুল আলোচিত ও চর্চিত নাটকটি মনোজ্ঞ ভঙ্গিতে পরিবেশন করা হয়েছে। মোটামুটি সব কিছু উল্লেখ করেছেন। নতুন কিছু জানতে পারলাম। ভালো লাগলো।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।