সূচী

ইতিহাস তথ্য ও তর্ক

মেসোলিথিক ভারতের মানুষদের কথা

মেসোলিথিক ভারতের মানুষদের কথা

তুষার মুখার্জী

আগস্ট ১৩, ২০২২ ৭৬৯ 9

(সময়ের হিসাবে ‘এখন থেকে’ বলা থাকলে সেই সময়কে ধরতে হবে ১৯৫০ থেকে।)

এখন পর্যন্ত জানা এবং সাধারণ ভাবে স্বীকৃত, ভারতে হোমো-স্যাপিয়েন্সদের আগমন কাল ছিল এখন থেকে ৬৫-৭০ হাজার বৎসর আগে। সদ্য লাওসের ট্যাম-পা-লিং গুহায় ৬০-৬৫ হাজার বৎসর আগের স্যাপিয়েন্স খুলি পাওয়ার পরে, ৬৫ নয় বরং ৭০ হাজার বৎসর বলাটাই হয়ত ঠিক হবে। সমুদ্রতট থেকে হাজার কিলোমিটার দূরের এই ট্যাম-পা-লিং গুহায় স্যাপিয়েন্সদের অস্তিত্ব থাকার ফলে আমাদের ভাবতে হবে যে আফ্রিকা থেকে আসা স্যাপিয়েন্সরা, আগে ভাবা হতো, শুধুই সমুদ্রতটেই তাদের চলাচল ও বসবাস সীমিত রাখে নি। ৬৫ হাজার বৎসর আগেই তারা নদীর ধার ধরে মূল ভূখণ্ডের দূরদূরান্তে চলে গিয়েছিল।

মূল ভারত ভূখণ্ডে অতি প্রাচীন দেহাবশেষ খুবই কম পাওয়া যায়। নদীর পাড়ে বন্যা প্রভাবিত এলাকায়, সমতলে এমনিতেই কোন প্রাচীন দেহাবশেষ পাবার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না, বরং পার্বত্য এলাকায় পাবার সম্ভাবনা কিছুটা হলেও থাকে। কিন্তু শিবালিক পার্বত্য এলাকায় ১০-২০-৩০ হাজার বৎসর আগেকার একাধিক স্তন্যপায়ী জীব জন্তুর দেহাবশেষ পাওয়া গেলেও সমসাময়িক মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া যায় নি।

চিত্র-১ শিবাপিথেকাস

ভারতে প্রাচীনতম যে নিদর্শন পাওয়া গেছে তা হোমিনিডাই গোষ্ঠীর শিবাপিথেকাস। এছাড়া রামাপিথেকাস ব্রহ্মপিথেকাস নামেরও দুটি ভিন্ন গোষ্ঠীর অবশেষ পাওয়া গিয়েছিল। তবে বর্তমানে তাদের সামান্য প্রভেদকে সরিয়ে রেখে তিনটিকেই একত্রে শিবাপিথেকাসই বলছেন সবাই।

এর পরেই আসছে নর্মদা ম্যান। নর্মদা ম্যানকে হোমো-ইরেক্টাস গোত্রের প্রথমে ধরা হলেও এখন ভাবা হচ্ছে আদিম হোমো-স্যাপিয়েন্স গোত্রের বা হোমো-ইরেক্টাসদের থেকে উদ্ভূত কোন ভিন্ন মানব গোষ্ঠীরও হতে পারে। তার পরে উল্লেখ করা যায় হিন্দুকুশ পর্বত এলাকার দারা-ই-কুর গ্রামে পাওয়া হোমো প্রজাতির খুলির একটি টুকরোর কথা। এটি পান প্রত্নবিজ্ঞানী ডুপ্রে (১৯৭৫)। একে প্রথমে নিয়েন্ডারথালের বলে অনুমান করা হয়, আর বয়স আনুমানিক ধরা হয় ৩০ হাজার (±৯০০-১২০০) বৎসর আগেকার। এই ৩০ হাজার বৎসর দেখলে অবশ্য নিয়েন্ডারথাল ভাবতে একটু অসুবিধাই হবে হয়ত। তবে বর্তমানের একাধিক তথ্য বলছে ডেনিসোভানরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে (পাপুয়া নিউগিনি) ছিল সামান্য ১৫ হাজার বৎসর আগেও। তবে তারা হিন্দুকুশ পর্বত এলাকায় ছিলো এমন কোন তথ্য এখনও পাওয়া যায় নি। এছাড়া আছে বর্তমান ভারতের ভু-রাজনৈতিক সীমানার বাইরে শ্রীলঙ্কার বালাগোন্ডা ম্যান। বালাগোন্ডা ম্যানকে আমরা মেসোলিথিক যুগের বলতে পারি। তাই এই আলোচনায় বালাগোন্ডা ম্যানদের উল্লেখ থাকবে। আর থাকছে মেসোলিথিক যুগের শেষ আর নিওলিথিক যুগের শুরুর সীমায় থাকা মেহেরগড়ের আদি বাসিন্দারা।

মেসোলিথিক যুগ, নিওলিথিক যুগ, এসব নামকরণের ভিত্তি সেই সময়কার মানুষদের সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপ। তাই সব জায়গায় একই সময়ে মেসোলিথিক যুগ বা নিওলিথিক যুগ শুরু বা শেষ হবার কথা নয়। তেমনটা হয়নিও। এই আলোচনায় থাকবে মধ্যগঙ্গা এলাকা যা প্রধানত উত্তর প্রদেশের প্রতাপগড় জেলা আর থাকবে গুজরাতের লাংঘনাজ। এই সব এলাকায় পাওয়া গেছে মেসোলিথিক যুগের মানুষদের দেহাবশেষ।

চিত্র-২ মেসোলিথিক সরঞ্জাম

মধ্যগঙ্গা প্রত্নক্ষেত্রের কাল নির্ণয়

এই মধ্যগঙ্গা প্রত্নক্ষেত্রের যে কাল বের করা হয়েছে তা নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়ে গেছে। প্রত্নক্ষেত্রগুলোর কার্বন ডেটিং-এ বলা হয়েছে এখন থেকে সর্বোচ্চ ১৩,৫৯২±১২৫ বৎসর আগের। তবে এই সময় অনেকেই মানেন না। কারণ কার্বন ডেটিং কোন কয়লার টুকরো থেকে হয়নি, হয়েছিল পোড়া হাড়ের থেকে। তাতে সঠিক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তাছাড়াও পোড়া হাড় থেকে কার্বন ডেটিং করে পাওয়া গেছে ২৮০০ বৎসর আগেরও। অথচ মাটির নমুনা, কঙ্কালের গঠন এসব আবার বলে এগুলো হলোসিন যুগের শুরুর। ফলে কোন সঠিক বা সর্বজনগ্রাহ্য সময় বলা খুবই কঠিন। আপাতত একটা গড় হিসাব ধরা হয়েছে আট হাজার থেকে দুই হাজার বৎসর আগের কাল হল উত্তর প্রদেশের মেসোলিথিক যুগ। নীচে থাকল কিছু কার্বন ডেটিং-এর ফল।

প্রত্নক্ষেত্রকার্বন ডেটিংউল্লেখতথ্যসূত্র
মহাদহ, মানুষের হাড় থেকে৬,৩২০±৮০চট্টোপাধ্যায় ১৯৯৬জন লুকাস, জে এন পাল
স্তর-১৮,৮৬৫±৬৫জন লুকাস ১৯৯৬জন লুকাস, জে এন পাল
স্তর-৬৮,৬৪০±৬৫জন লুকাস ১৯৯৬জন লুকাস, জে এন পাল
মহাদহ, মানুষের হাড় থেকে৪,০১০±১২০রাজাগোপালন ১৯৮২জে. এন. পাণ্ডে
২,৮৮০±১২৫রাজাগোপালন ১৯৮২জে. এন. পাণ্ডে
৩৮৪০±১৩০রাজাগোপালন ১৯৮২জে. এন. পাণ্ডে
৯৮৩০±১৬০রাজাগোপালন ১৯৮২পুরাতত্ত্ব-১৫ কেনেথ কেনেডি
১১,৫৫০±১৮০রাজাগোপালন ১৯৮২পুরাতত্ত্ব-১৫ কেনেথ কেনেডি
দমদমা৯০০০-৭০০০থার্মোল্যুমিসেন্স  টেষ্টকুলভূষণ মিশ্র
দমদমা স্তর-১৮,৮৬৫±৬৫জন লুকাস ১৯৯৬জন লুকাস, জে এন পাল
দমদমা স্তর-৬৮,৬৪০±৬৫জন লুকাস ১৯৯৬জন লুকাস, জে এন পাল
মহাদহ গবাদি পশুর হাড় থেকে, ৬৩২০±৮০চট্টোপাধ্যায় ১৯৯৬কুলভূষণ মিশ্র
মহাদহ গবাদি পশুর হাড় থেকে,  স্তর-১৫৫৫০±৬০জন লুকাস ১৯৯৬জন লুকাস, জে এন পাল
স্তর-৬৫২৫০±৭০জন লুকাস ১৯৯৬জন লুকাস, জে এন পাল
স্তর-৮৫৪৩০±৭০জন লুকাস ১৯৯৬জন লুকাস, জে এন পাল
সরাই রাই নহর  (মানুষের পোড়া হাড় থেকে)১০,৩৪৫±১১০

আগরওয়াল ও কুসুমগার ১৯৭৩জে. এন. পাণ্ডে
১৩,৫৯২±১২৫আগরওয়াল ও কুসুমগার ১৯৭৫জে. এন. পাণ্ডে
৩,৩০০±১০০রাজাগোপালন ১৯৮২পুরাতত্ত্ব-১৫ কেনেথ কেনেডি
১০,৩৯৫±১১০পসহেল, রিসম্যান ১৯৯২কুলভূষণ মিশ্র
লেখাহিয়া, মির্জাপুর জেলা৮,৪২০±৭৫লুকাস ১৯৯৬কুলভূষণ মিশ্র
৮,০৫০±৭৫লুকাস ১৯৯৬কুলভূষণ মিশ্র
লাংঘনাজ১০ থেকে ২.৫ হাজার বৎসরসাঙ্কালিয়া 
উত্তর প্রদেশের মেসোলিথিক যুগের কিছু কার্বন ডেটিং-এর ফল

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে একই স্তর থেকে নেওয়া মানুষ আর গবাদি পশুর হাড় থেকে পাওয়া কার্বন ডেটিং-এর ফল অনেকটাই ভিন্ন। এই সব কারণেই এখানকার সময় নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। সরাসরি কাঠকয়লা থেকে কার্বন ডেটিং করা গেলে এই সমস্যা অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু কোন প্রত্নক্ষেত্রেই কাঠকয়লা পাওয়া যায় নি। ফলে বাধ্য হয়েই পোড়া হাড় থেকেই কার্বন ডেটিং করতে হয়েছিল। সব সময় তাও সম্ভব হয় নি। এমনি হাড় থেকেই করা হয়েছিল। সমস্যা আরও জটিল হয়ে গেছে কোন কার্বন ডেটিংই ক্যালিব্রেটেড কি না, তা বলা নেই। যেহেতু ক্যালিব্রেটেড বলা নেই তাই আমাদের পড়তে হবে ক্যালিব্রেটেড নয় হিসাবেই। অথচ ১৯৭৬ থেকে সব কার্বন ডেটিং ক্যালিব্রেটেড লেখার কথা। সাথে উল্লেখ থাকবে কোন ক্যালিব্রেশন কার্ভ অনুসরণ করা হয়েছে। এসব না করলেই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী মহলে তারিখগুলো নিয়ে হাজারও বিতর্ক তৈরি হবেই। একমাত্র ব্যতিক্রম চোখে পড়ল চট্টোপাধায় উল্লিখিত কার্বন ডেটিং এর বেলা। সেখানে অক্সফোর্ড কার্ভ ব্যবহার হয়েছে বলে উল্লেখ আছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হল সরাই নহর রাইতে ৩,৩০০±১০০ (রাজাগোপালন: ১৯৮২) এই কার্বন ডেটিংটি করা হয়েছিল সরাসরি কাঠকয়লা থেকে।

মেসোলিথিক মানুষদের কথা

কারা ছিল উত্তর প্রদেশের এই মেসোলিথিক যুগের লোকেরা? সহজ উত্তর হল ভারতীয় শিকারি-সংগ্রাহকরা। আর এই শিকারি সংগ্রাহকদের কথা জানার জন্য সেরা পদ্ধতি হল তাদের দেহাবশেষ গভীর ভাবে নিরীক্ষণ করা। আমাদের সৌভাগ্য সেটা অনেকটাই সম্ভব হয়েছে মধ্যগঙ্গা এলাকার এই প্রত্নক্ষেত্রগুলোতে।

উত্তর প্রদেশের এই প্রত্নক্ষেত্রগুলোতে অনেক কঙ্কাল পেলেও তখনও এখনকার মত উন্নত পদ্ধতিতে প্রাচীন ডি.এন.এ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ কৌশল জানা ছিল না। ফলে কোন ডি.এন.এ. সংগ্রহ হয় নি। তাছাড়া অনেক কঙ্কালই প্রায় প্রস্তরীভূত অবস্থায় ছিল। অতএব ডি.এন.এ. পরীক্ষা করে তখনকার মানুষদের বিষয়ে বিশদ তথ্য জানা সম্ভব না। তবে কঙ্কালগুলো মোটামুটি ভালো ভাবেই পরীক্ষা হয়েছে। আর তার থেকে নানা তথ্য জানা গেছে।

এই কঙ্কালগুলোর পরীক্ষা করে জানা সম্ভব হয়েছে, তারা দেখতে কেমন ছিল, তাদের জীবনযাত্রা কেমন ছিল, কেমন করে তারা এই এলাকার আবহাওয়ার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিল। তার সাথে মানুষের রোগভোগ তো থাকবেই কম বেশি। সেসব কথাও অনেকটাই জানা সম্ভব হয়েছে।

অনেক কঙ্কালের দাঁতের নমুনাও পরীক্ষা হয়েছে। তার থেকে জানা গেছে মেসোলিথিক উত্তর প্রদেশের বাসিন্দাদের সাথে সমকালীন মেহেরগড়ের (প্রথম প্রত্ন স্তরের) বাসিন্দাদের ঘণিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। আর একটা ক্ষীণ সম্পর্ক আছে মেসোলিথিক ইউরোপিয়ানদের সাথে, কিন্তু মেসোলিথিক পূর্ব-এশীয়দের সাথে সম্পর্ক নেই।

মধ্যগঙ্গা প্রত্নক্ষেত্রের মেসোলিথিক লোকেরা দেখতে কেমন ছিল

কেমন ছিল তারা দেখতে?

প্রথমেই দৈহিক কাঠামোর কথা। কঙ্কালের থেকেই তা বোঝা যায়। তারা ছিল হাল্কা ছিপছিপে লম্বা গড়নের। লম্বা কেন? শিকারি সংগ্রাহকদের প্রচুর হাঁটতে হত, ছুটতে হত, লম্বা পায়ে সুবিধা বেশি। এবং সারাদিন প্রচুর ছোটাছুটি হাঁটাহাঁটি করতে হত বলে শরীরে চর্বি জমার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। তাই তারা ছিপছিপে ছিল। তা ছাড়া বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, উত্তর ভারতের গরম আবহাওয়ায় ছিপছিপে চেহারার শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ছিল সুবিধা জনক।

প্রত্নক্ষেত্রগড় উচ্চতা-পুরুষগড় উচ্চতা-নারীতথ্যসূত্র
মহাদহ৫’ ৯.১” ± ২”৫’ ৬.৫”- ৩”জন লুকাস, জে এন পাল
সরাই নহর রাই৫’ ১০”৫’ ১০” ও একজন ৬’২”কেনেডি ১৯৮৬ ও জন লুকাস, জে এন পাল
দমদমা৬’ ১.৫”৬’ ০”জন লুকাস, জে এন পাল
লেখাহিয়া৫’ ৮.৮”±৩.২”৫’ ৬.৮” ±৩.১”জন লুকাস, জে এন পাল
মেহেরগড়৫’ ৭.৪” ±২”৫’ ২.৫” ±২”জন লুকাস হেমফিল ১৯৯১ ও জন লুকাস, জে এন পাল
বালগোন্ডা ম্যান৫’ ৮.৫”৫’ ৫” 
পশ্চিম ইউরোপ৫’ ৬”৫’ ১”জন লুকাস, জে এন পাল
পূর্ব ইউরোপ৫’ ৮”৫’ ৫”জন লুকাস, জে এন পাল
মেসোলিথিক কঙ্কালের দৈহিক কাঠামো

তবে এখানে লক্ষণীয় যে এই ভারতীয়দের কোমর থেকে নীচের অংশ ছিল ইউরোপীদের চেয়ে লম্বা। ঠিক ইউরোপীয় বা ভারতীয় বলে নয়, বিজ্ঞানীদের অনুমান এটা জীবনযাত্রার সাথে আবহাওয়ার তাপমাত্রা আর ভৌগোলিক পরিবেশের দরুনই এই পরিবর্তন ও বিভিন্নতার সৃষ্টি হয়েছিল। লক্ষণীয় মেহেরগড় আর শ্রীলঙ্কার বালাগোন্ডা ম্যানদের থেকেও এরা লম্বা ছিল। তারই সাথে বালাগোন্ডা ম্যানদের শক্তসমর্থ ভারী চেহারার বদলে এদের ছিল ছিপছিপে চেহারা।

চিত্র-৩ কবরে শায়িত কঙ্কাল

সরাই নহর রাই তে পাওয়া কঙ্কালের ভিত্তিতে পি.সি. দত্ত এদের চেহারার একটা মোটামুটি বিবরণ দিয়েছেন। চল্লিশ বৎসর বয়সের পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি লম্বা একজনের চেহারা; ছিপছিপে চেহারার লোকটি লম্বা বটে, কিন্তু তার কোমর থেকে পায়ের দিকটাই বেশি লম্বা। মজবুত ঊরুর হাড় সহ কোমর ঊরুর সংযোগ রীতিমত বলিষ্ঠ গঠনের। বড় মাথা, মাথার খুলি ১৪৪৯.২ ঘন সেন্টিমিটার আয়তনের। (লম্বা ১৯২ মিমি, চওড়া ১৪৬ মিমি, গোলাই ৫৫০ মিমি), ছোট কিন্তু চওড়া মুখমণ্ডল। বড় আর মজবুত দাঁত, সুগঠিত স্বাস্থ্যবান শরীর। তাদের গড় চেহারা ছিল উপরের দিকে একটু চাপা খুলির চওড়া মুখমণ্ডল, ছোট গজদাঁত, সামনের দাঁত তুলনায় চওড়া আর বড়, দাঁতের এনামেল খুব পুরু থাকায় দাঁতে কোন ক্ষয়রোগ প্রায় নেই, ফলে সদা স্বাস্থ্যবান দাঁতের ঝকঝকে হাসিতে ঝলমল। মজবুত হনু, ছোট ঢালু কপাল আর খাঁদা চওড়া নাকে বড় বড় চোখের বেশ লম্বা ছিপছিপে, কিন্তু স্বাস্থ্যবান মানুষ ছিল এরা।


উত্তরপ্রদেশের এই মধ্যগঙ্গা এলাকাতেই আছে আরেকটি প্রত্নক্ষেত্র, যেখানে মেসোলিথিক যুগের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। এলাকাটি মির্জাপুর জেলার লেখাহিয়া। কিন্ত এখানে কোন অজ্ঞাত কারণে কঙ্কালগুলো নিয়ে কোন রকম গবেষণার খুব সামান্যই হয়েছে।

এতো গেল উত্তর প্রদেশের। গুজরাতের লাংঘনাজের মানুষরা কেমন ছিল? বিজ্ঞানী সাঙ্কালিয়া একটা মোটামুটি বর্ণনা দিয়েছেন। একজন পুরুষ বয়স ৩০ থেকে ৪০ বৎসর। লম্বাটে মাথার খুলি, উপরের দিকে ঢালু কপাল, গোল দুই চোখের মাঝখানের দূরত্ব ২৩ মিলিমিটার, হনু উঁচু, মজবুত চোয়াল, মজবুত দাঁত বিশেষ বড় না। আদিম ধরনের চওড়া নাক গোল চোখ, খুলির আয়তন আধুনিক ইয়োরোপীদের মতই। এছাড়া সাঙ্কালিয়া ১৯৪৪ সালে পাওয়া চারটি করোটির বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর মতে এদের ছিল লম্বাটে খুলি, একটি নারীর খুলিতে বোঝা গেছে তার ছিল ছোট কপাল গোল চোখ আর লম্বাটে খুলি। ভ্রূ-এর কাছের হাড় উঁচু ছিলো না, মানে মোটামুটি আমাদের মতই ছিল। তবে খুলির সাথে তুলনা করলে চোয়াল বেশ বড়ই ছিল। কিন্তু ওখানেই পাওয়া পুরুষদের চোয়ালের তুলনায় ছোট।

আবার লাংঘনাজের মানুষদের চেহারা কিছুটা এদের সাথে মেলে, কিছুটা আলাদাও বটে। লাংঘনাজের মানুষদের বর্ণনা করেছেছেন সাঙ্কালিয়া এই বলে যে এদের ছিল লম্বাটে খুলি, আদিম ধরনের চওড়া নাক গোল চোখ, খুলির আয়তন আধুনিক ইউরোপীয়দের মতই।


একই সাথে আমরা দেখতে পারি ৩৭ হাজার বৎসর আগের শ্রীলঙ্কার বালাগোন্ডা মানুষদের বর্ণনা। চওড়া হাড়ের শক্তপোক্ত গড়নের শরীরে ছোট ঘাড়ের উপর তাদের মজবুত চোয়ালের হাড়, উঁচু ভ্রূ সহ চোখের চারদিকের উঁচু হাড়ের জন্য চোখ ভেতরে ঢোকানো মনে হত, আর নাক ছিল খাঁদা চওড়া, আর মজবুত দাঁত আকারেও বড়ই ছিল।


না, গায়ের, চুলের, চোখের রং অস্থি থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়। সম্ভব নয়, তাদের জাতি ধর্ম বা ভাষাও অনুমান করা। কঙ্কাল থেকে পাওয়া তথ্য বলে এই সরাই নহর রাই, দমদমা আর মহাগড় প্রত্নক্ষেত্রের জনগোষ্ঠী সম্ভবত একই জনগোষ্ঠীর লোক ছিল।

চিত্র-৪

মহাদহ ও দমদমার কঙ্কাল এবং দাঁতের পরীক্ষা করেছেন জন লুকাস। তাঁর মতে এই লোকেরা শিকারের জন্য বাহুমূল আর কনুইয়ের সাহায্যে কিছু ছুঁড়ে শিকার করত। তেমন ছোঁড়ার জিনিষ পাওয়া গেছে সরাই নহর রাইতে। গোলাকার মাটির বল বা ঢেলা। জন লুকাসের মতে এরা সারাদিন প্রচুর হাঁটতো, সেটা শিকারের পেছনে ছোটার জন্য হোক অথবা খাড়াই জায়গা চড়ার জন্যই হোক। জন লুকাস দাঁতের বিষয়ে নানা কথাই বলেছেন, তবে উল্লেখ করেছেন এদের মজবুত দাঁত বলে এদের শারীরিক অপুষ্টির বালাই ছিল না।

চিত্র-৫

জন লুকাস এই মেসোলিথিক মানুষদের দাঁতের বিশেষ গঠনকে ব্যবহার করে ভারতের আরো কয়েকটি জনসমষ্টির এক পারস্পরিক সম্পর্ক বের করেছেন যা আমাদের সকলেরই কৌতূহল জাগাবে।

তাঁর বলা হরপ্পা জনগোষ্ঠী বলতে কেবল হরপ্পা শহরের কবরে পাওয়া জনগোষ্ঠীর কথাই বোঝাবে। সমগ্র হরপ্পা সভ্যতার জন সমষ্টি নয়।

ফলে এখানে এক ভিন্ন চিন্তা আমাদের মধ্যে আসতে পারে। তা হল হরপ্পা শহরের কবরে শায়িত লোকেরা যে প্রকৃতপক্ষে হরপ্পা শহরের প্রতিষ্ঠাতা মূল জনগোষ্ঠীর লোক নয়, তা ইতিমধ্যে দাঁতের আইসোটোপ পরীক্ষায় প্রমাণিত। কবরে শায়িত মৃতদের আনা হয়েছিল প্রধানত পটোয়ার এলাকা থেকে। ফলে জন লুকাসের পাওয়া হরপ্পার কবরের লোকের সাথে তিমেরগড় ও সরাইখোলার লোকের সম্পর্ক থাকার সম্ভবনাই বেশি। তবে এদের সাথে তাম্রযুগের মেহেরগড়ের লোকেদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যথেষ্ট কৌতূহল জাগায়। তেমনি কৌতূহল জাগায় কেন নিওলিথিক মেহেরগড়ের লোকেদের সাথে তাম্রযুগের লোকেদের সম্পর্ক অতটাই দূর সম্পর্ক হল। তবে নিওলিথিক মেহেরগড়ের সাথে মধ্যগঙ্গা মেসোলিথিক বা অনেক পরের মহারাষ্ট্রের ইনামগাঁওয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক খুব একটা অবাক করবে না আমাদের।

মেসোলিথিক মধ্যগঙ্গা এলাকার পরিবেশ

কেমন ছিল তাদের পরিবেশ? শুকনো গরম। বড় বড় ঘাসের খোলা মাঠে দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু গাছ আর ঝোপঝাড়। পশু ছিল নানা রকমের। জেবু গরু, মোষ ভেড়া ছাগল, হরিণ, গাধা, হাতি।
মাটি ছিল নোনা আর চুনা পাথরের কাঁকরে ভরা। তবে এটাও ঠিক এই চুন বেশি থাকার জন্যই এতগুলো কঙ্কাল প্রস্তরীভুত হয়ে টিকে ছিল। না হলে ভারতে প্রাচীন কঙ্কাল তো পাওয়াই যায় না।

এই প্রত্নক্ষেত্রগুলো যত প্রাচীন সেই হিসাবে এখানে গৃহপালিত পশুর দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা কমই থাকার কথা।
দমদমা প্রত্নক্ষেত্রে পাওয়া পশুর হাড়ের একটা হিসাব দেখা যাক। দমদমায় দশটি প্রত্ন কালস্তরে প্রায় ২১ হাজার পশুর হাড় পাওয়া গেছে। প্রতিটি কালস্তরেই পশুর হাড় পাওয়া গেলেও সব হাড় চেনা সম্ভব হয় নি। দমদমায় বিভিন্ন কালস্তরেই থেকে গেছে ২০% থেকে ৩৭% অবধি অচেনা পশুর হাড়।

যে পশুগুলোর হাড় চেনা গেছে তার মধ্যে আছে, গৃহপালিত গবাদি পশু, বন্য গবাদি পশু, গর, বন্য মোষ, গৃহপালিত ছাগল, বন্য ছাগল, চিতল হরিণ, সম্বর⁄ বারসিংগা, কাকর হরিণ, কস্তুরি হরিণ, মাউস হরিণ, নীলগাই, চৌশিঙ্গা, কৃষ্ণসার, গ্যাজেল, বন্য শুয়োর, নেকড়ে, শিয়াল, ভল্লুক, নেউল, শজারু, ইঁদুর, ধাড়ি ইঁদুর, গন্ডার, হাতি, বন মোরগ, গিরগিটি, শামুক, কচ্ছপ। প্রায় ত্রিশ রকমের প্রাণী। তার মধ্যে শুধু ছয় রকমের হরিণের হাড়ই পাওয়া গিয়েছিল ২৮৭৪টি। এর মধ্যে কস্তুরি হরিণ আর মাউস হরিণ মাত্র এক দু’টি ছিল। হরিণের চেয়ে অবশ্যই শুয়োর তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে চমক লাগে, বেশ কম পরিমাণে হলেও হাতি, গন্ডার, গর আর বুনো মোষের হাড় থাকাটা। তাদের লিথিক অস্ত্রে এই সব প্রাণী হত্যা অসম্ভব ছিল। তাই সম্ভাবনা থাকছে মৃত পশুদেরই তারা নিয়ে এসেছিল, না মাংস খাবার জন্য না, সম্ভবত এগুলোর চামড়া আর হাড় কাজে লাগাবার জন্য। হাড়ের সরঞ্জাম তো পাওয়া গেছেই এই প্রত্নক্ষেত্রগুলোতে। এই বড় পশুর পাওয়া হাড়গুলোতে ছিল কাটার চিহ্ন। যা প্রমাণ করে তারা এগুলো কাজে লাগাত। তবে শুধু বড় পশুরই না ছোট পশুর হাড় দিয়েও তৈরি হত সরঞ্জাম। প্রায় প্রতি তিনটি হাড়ের টুকরোর দু’টো দিয়েই হয় সরঞ্জাম তৈরি হয়েছে বা মাঝপথে বাতিল হয়েছে। এর বড় কারণ ছিল এই এলাকায় লিথিক সরঞ্জাম বানাবার উপযুক্ত পাথর ছিল না। তাই তারা হাড়ের সরঞ্জামই বেশি ব্যবহার করত।


এখানে পাওয়া হাড় থেকে শিকারের ধরন অনুমান করা সম্ভব। যেটা প্রধানত দেখা গেছে প্রায় সব প্রাণীই সব কালস্তরেই ছিল। তবে যে বিশেষ ধরন লক্ষ্য করা গেছে তা হল প্রাচীনতম কালস্তর ১ থেকে ৪-এ বিশেষ কোন বাছবিচার ছিল না। কম বেশি সব পশুই ছিল প্রায় সমানুপাতিক। ৫ থেকে ৮ কালস্তরে দেখা গেল তারা বেশি করে শিকার করছে ২০-৫০ কেজি ওজনের পশু। আবার কালস্তর ৯-১০-এ দেখা গেল, তারা শিকার বেশি করেছে ২০০ থেকে ৫০০ কেজি ওজনের পশু। আর খাবারের জন্য তাদের ছিল মাছ, শামুক, সরীসৃপ বেশ বড় পরিমাণে (২৩%)। আরেকটা ধরন লক্ষ্য করা গেছে, তা হল শেষের দিকে, স্তন্যপায়ী পশুর মাংসই খেত বেশি। কালস্তর ১০-এ স্তন্যপায়ী পশুর হাড় ছিল ৮৬.৩% অথচ কালস্তর ১-এ এটা ছিল ৭৩%।

এই শিকারি-সংগ্রাহকরা সাধারণ ভাবে কি খেত? অবশ্যই শিকার করে পশু মাংস। না বড় পশু খাবার পাতে আসত না, শেষের দিকে সম্ভবত তাদের অস্ত্রের গুণগত মান উন্নত হবার পরেই কেবল বড় পশু শিকার করতে শুরু করেছিল। নিত্য খাবার জন্য হরিণ আর ধেড়ে ইঁদুরই বেশি জনপ্রিয় ছিল। আর ছিল শুয়োর। তবে একটি মোষের মাথা আগুনে পোড়ানো হয়েছিল। হ্রদের ধারের বাসিন্দারা কচ্ছপ আর মাছ তো খাবেই। তবে সংগ্রহ করে পাওয়া ফল বা আর কোন ঘাসের বীজ, কয়েক রকমের বুনো জংলার বীজ, খাবার মেনুতে ছিল। আর খেত নানা রকমের শক্ত বীজ। ঠিক কি সেই শক্ত বীজ বা ফল তা সঠিক অনুমান করা যায় নি। অন্যান্য শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর মধ্যে রক্তাল্পতা দেখা গেলেও এখানে তার কোন চিহ্ন ছিল না। ফলে অনুমান করা যায় খাবারের পরিমাণ বা গুণগত মানে তাদের কোন অসুবিধাই ছিল না।


পশু মাংসের পরিমাণ নিয়ে খানিক ধন্দ ছিল। যত লোক তার তুলনায় পশুর হাড় অনেক বেশি পাওয়া গেছে। এত মাংস কি করত তারা? এই ধন্দের সমাধানে কাজে লাগল আরেকটি ধন্দ। পাথরের হাতিয়ারের পাথর কোথা থেকে আনত বা পেত এই গঙ্গাধৌত এলাকার লোকেরা? একজন প্রস্তাব রেখেছিলেন বিন্ধ্য পর্বত এলাকা থেকে। সেটা পাথরের নমুনার সাথে মেলে। কিন্তু রাস্তা অনেক লম্বা। সেখানে গিয়ে পাথর এনে রাস্তা চিনে ফেরত আসা অসম্ভব। এবার মাংসের আধিক্য দেখে অনুমান করা হল, মাঝে মধ্যে বিন্ধ্য এলাকা থেকে কোন দল আসত। তাদের মাংসের ভুরিভোজ খাইয়ে পাথর চেয়ে নেওয়া হত। এই সমাধানে অনেকেই সায় দিলেন। হতে পারে, এমনটা হতেই পারে।

মাংস রান্না বলতে রান্নার বাসন কোথাও কোথাও বেশ পরে হাতে তৈরি শুরু হয়েছিল বটে, তবে মূলত আগুনে  পোড়ানো মাংসই খেত তারা। একজন বিজ্ঞানী একটি অভিনব অনুমান প্রস্তাব করেছেন, পশুর গায়ে মাটির প্রলেপ দিয়ে তারপরে সেটা পোড়ানো হত। সরাসরি আগুনে পোড়ানোর বদলে এভাবে পোড়ালে সুবিধা অনেক। আর মাটির প্রলেপ দেওয়া আর তার সাথে তাপের সম্পর্ক তাদের ভালই জানা ছিল। তারা তাদের উনুনেই মাটির প্রলেপ দিত।

শিকার করত কি দিয়ে? বল্লম, এবং খুব সম্ভব তিরও ছিল। আর প্রচুর ব্যবহার হত সহজতম অস্ত্র, ঢিল। এখানে ঢিল বলতে পাথরের টুকরো বা আধলা ইট নয়, ইট তো ছিলই না, পাথরের টুকরোও ছিল সযত্নে রেখে দেবার জিনিস। তাদের ছোঁড়ার ঢিল ছিল মাটি দিয়ে বানানো গোল বল। কঙ্কালের হাড়ের ক্ষয় ও পেশির চিহ্ন দেখে সেকথা সমর্থন করেছেন জন লুকাস। সম্ভবত ঐ ঢেলা ছোঁড়াই ছিল তাদের শিকারের প্রধান অস্ত্র।

সামাজিক

শিকারি-সংগ্রাহক হলেও এরা সেই অর্থে মোটেই যাযাবর ছিলো না। তবে ঘর পাল্টাতো মাঝে মাঝেই। দমদমা প্রত্নক্ষেত্রে তো তারা বেশ লম্বা সময় ধরেই বসবাস করত। ফলে সেখানে পাওয়া গেছে দশটি প্রত্নস্তর। বসবাস কালের দীর্ঘতা অনুমানের জন্য, সেখানে পাওয়া কবরের সংখ্যাও এই সময়ের ধারণা করতে সাহায্য করে। দীর্ঘকাল এক জায়গায় বসবাস না থাকলে অতগুলো কবর পাওয়া যেত না। সহজে বলতে গেলে কৃষিকাজ শুরু হবার আগেও তারা সংঘবদ্ধ সামাজিক বসবাস প্রথায় অভ্যস্ত ছিল।

সামাজিক হিংসা ছিল? নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ হত? তেমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও একটি কঙ্কালের পাঁজরে গেঁথে থাকা একটি তিরের ফলা একটু ভাবায় যে, তেমনটা হলেও হতে পারে। আবার ওটা নেহাতই আচমকা ভুলেও ঘটে থাকতে পারে।

গড় আয়ু ছিল চল্লিশ বৎসর। অতি সামান্য দুই একটি কঙ্কাল পঞ্চাশ বৎসরের বলে অনুমান করা হয়েছে। মোটামুটি সুস্থদেহী, এদের উল্লেখযোগ্য রোগ ব্যাধি তেমন কিছু হয়ত ছিল না। তবে বাতব্যাধি ছিল। কিন্তু অস্থিসন্ধি রোগের জন্য তাদের জীবনযাত্রা দায়ী ছিল না। ওটা সম্ভবত বংশগত। তারা কি কাপড় পরত? না। সম্ভবত পশুর চামড়া ব্যবহার করত অথবা পরের দিকে গাছের বাকল।


উত্তর প্রদেশের এই প্রত্নক্ষেত্রে পাহাড়ের গুহা নেই। তাহলে থাকত কোথায়? ঘর বানিয়ে। বাঁশের বা গাছের ডালের খুঁটির লতাপাতার বেড়ার ঘাসের ছাউনির কুটির। গোলাকার। তবে খুব কম হলেও বহুভুজ মেঝেও দেখা গেছে। এ সব অনুমান। তবে আর তো কিছু তাদের ছিল না। পাথরের গুহা বা রক শেল্টার পাওয়া গেছে মির্জাপুর জেলার লেখাহিয়াতে। যেটা মূলত বিন্ধ্য এলাকার মধ্যেই পড়বে।

চিত্র-৬

মৃতদেহ ও কবর

তিনটি প্রত্নক্ষেত্রের মোট ৯০টি কঙ্কাল। রাখা ছিল তৈরি করা কবরে। এর মধ্যে ৬৬টির মাথা পশ্চিম দিকে, আটটি পূর্বদিকে মাথা, কিছু উত্তর-দক্ষিণ কোনাকুনি করে, কিছু সরাসরি উত্তর বা দক্ষিণ দিকে মাথা করে। এ নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন কবর দেবার সময় সূর্য কোন দিকে আছে তাই দেখে সূর্যের দিক করে মাথা রাখা হত। সরাই নহর রাইতে প্রায় সব মৃতদেরই ডান হাত কোনাচে করে রাখা থাকত তলপেটের কাছে, বাম হাত পাশে টান টান। মহাদহ আর দমদমাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দুই হাতই থাকত দুই পাশে টান টান করে।

মোট ৭২টি ছিল একটি কবরে, একটি কঙ্কাল। সাতটিতে দুটো করে কঙ্কাল, একজন নারী অপরজন পুরুষ। একটা কবরে দু’জন পুরুষ দুজন মেয়ে। একটা কবরে দুইজন পুরুষ একজন মেয়ে। মেয়ে পুরুষ জোড়া কবরে মেয়ের কঙ্কাল পুরুষের বাম দিকে থাকত। তবে একেবারে ভিন্ন দিকে মাথা করে জোড়া কবরও পাওয়া গেছে। কবরে দান সামগ্রী খুবই কম, পাথরের হাতিয়ার, মাংসের টুকরো, দুই একটা মাটির ছোট্ট বাসন। মৃতদের গড়ে বয়স মোটামুটি ১৫-৩৫ বৎসর।

চিত্র-৭ সরাই নহর রাইতে পাওয়া খুলির ছবি

সরাই নহর রাই


এলাহাবাদ শহর থেকে ৩৮ কিলোমিটার উত্তরের গ্রাম সরাই নহর রাই, জেলা প্রতাপগড়, উত্তর প্রদেশ। ২৮০০ বর্গমিটারের এই প্রত্নক্ষেত্র প্রথম আবিষ্কার হয় ১৯৬৮ সালে। এখানেই প্রথম পাওয়া যায় মেসোলিথিক যুগের বসতি সহ কবর দেওয়া কঙ্কাল। ১৯৭০ সালে খনন কাজ করেন অ্যান্থ্রোপলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ড. প্রতাপ চন্দ্র দত্ত। এখানে সব মিলিয়ে পাওয়া যায় ৫০টি কবর। তবে সবগুলোতে কঙ্কালের অবশিষ্ট বলতে বিশেষ কিছু ছিল না। কঙ্কাল পাওয়া গেছে ২১টিতে। এই প্রত্নক্ষেত্রের ১৬ কিলোমিটার দুরে আছে একটি অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, যার সৃষ্টি হয়েছিল গঙ্গার পরিত্যাক্ত খাত থেকে। এখন শুকনো, অবশিষ্ট আছে ছোট্ট একটি জলাশয় হিসাবে। সাধারণ জমি বলতে ছিল চুনা পাথরের নুড়ি বা কাঁকরের স্তর। তার উপরে জমতে থাকে শুকিয়ে যাওয়া হ্রদের নোনা মাটি, আর তারও উপরে জমতে থাকে গঙ্গার পলিমাটির স্তর।

পরিবেশ ছিল শুষ্ক উষ্ণ অঞ্চলীয় বনভুমি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু গাছ আর ঝোপঝাড়ের এলাকায় গাছের চেয়ে বড় ঘাসের মাঠই বেশি ছিল। এখানকার শুষ্ক কিছুটা নীরস ভুমির জন্য শৈত্যযুগের পরে বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রাকেই দায়ী বলে ভাবছেন অনেক বিজ্ঞানী।

এখানে পশুর হাড় হিসাবে পাওয়া গেছে জেবু, গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়া, গাধা, হাতি, কচ্ছপের খোল আর মাছের কাঁটা। তবে এই এলাকায় হরিণ, শজারু, ধেড়ে ইঁদুর বা মেঠো ইঁদুরও ছিল এমনটা জানা যায় অন্যান্য এলাকার খনন থেকে।

যে সব কঙ্কাল পাওয়া গেছে তার মধ্যে কয়েকটির পুরো কঙ্কালই পাওয়া গেছে। তবে জমিতে চুনের পরিমাণ  বেশি থাকায় হাড়ে চুন ঢুকে এগুলোকে প্রায় প্রস্তরীভুত করে ফেলেছিল। এমনিতে এদের ছিল কপাল পেছন দিকে ঢালু বড় ও চওড়া, মাথা বড়, লম্বার তুলনায় চওড়ার দিকে বেশি। মাথার খুলি ১৪৪৯.২ ঘন সেন্টিমিটার আয়তনের। চোখের কোটর বড়। নাক চওড়া এবং তেমন খাড়া না। মজবুত ঊরুর হাড় সহ কোমর ঊরুর সংযোগ রীতিমত বলিষ্ঠ গঠনের। ফলে ছোটাছুটি হাঁটা ছিল এর কাছে জলভাত। 

সরাই নহর রাইতে মৃতদের কবর দেওয়া হত চিৎ করে পশ্চিমে মাথা রেখে টানটান করে শুইয়ে। কবরে দেওয়া হয়েছিল সম্ভবত কাটা পশুর মাংস, কয়েকটি পাথরের হাতিয়ার আর একটি হাতে গড়া খুব ছোট মুখের মাটির পাত্র। মাটির পাত্র বানানো হয়েছিল মাটির লম্বা লাঠির লেই মত বানিয়ে তাই পেঁচিয়ে। এটা পোড়ানোও হয়েছিল তবে ভালো ভাবে পোড়ানো না। মাটির বাসনের মধ্যে সম্ভবত রাখা ছিল ঘাস আর কিছু পতঙ্গ।
পরবর্তীকালের খননে একটি কবরে একত্রে চারটি কঙ্কালও পাওয়া গেছে।

ঘর বানাবার প্রমাণ পাওয়া গেছে, গোলাকার আর কিছুটা এলোমেলো আয়তক্ষেত্রাকার (১৮.৫ফুটX১৩ফুট)। তাতে খুঁটি পোঁতার আট ইঞ্চি গভীর গর্ত। মেঝে তৈরী হয়েছে কাঁকর বা আধ পোড়া মাটির বাসনের টুকরো ফেলে দুরমুশ করে। তবে সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য হল এই মেঝে ঢাল তৈরি করা ছিল। পাওয়া গেছে আটটি উনুন। উনুন গোল থেকে প্রায় ছয় কোনা আকারের। উনুনে কিন্তু কোন মোটা কাঠ বা ডাল জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হয় নি। বরং পাতা ঘাস এই সব জ্বালানো হত। একটা উনুন ছাইতে ভর্তি হয়ে গেলে নতুন উনুন তৈরী করে নিত।

পাথরের হাতিয়ার যা পাওয়া গেছে তার মধ্যে বেশি কোয়ার্টজ পাথরের। তবে খুবই ছোট ছোট। এগুলোকে পরে যত্ন করে জ্যামিতিক আকার দেওয়া হয়। পাথরের চটাও ও পাওয়া গেছে ছোট ছোট। সবই যেমন পাওয়া গেছে তেমন ভাবেই ব্যবহার করা হত বলে অনুমান।

পরবর্তী কালে এখান থেকে আরও ১১টি কঙ্কাল (৫ জন নারী, ৬ জন পুরুষ) উদ্ধার করা হয়েছে ১৯৭২ ও ১৯৭৩-৭৫ সালে (ড. আনন্দী পাল, অ্যান্থ্রোপলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া ও জি.আর. শর্মা, এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, ইতিহাস বিভাগ)। একটি কঙ্কাল এতটাই প্রস্তরীভুত ছিল যে তাকে মাটি থেকে আলগা করার চেষ্টা না করে মাটি সহ নিয়ে যাওয়া হয় এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে প্রাচীন ইতিহাস বিভাগে সেটি রাখা আছে। এছাড়া আরও কয়েকটি কঙ্কাল ঐ বিভাগে কাঁচের শো কেসে রাখা আছে। যতদূর জানি অন্তত একটি কঙ্কাল কলকাতার অ্যান. এস. আই-তে রাখা আছে। তবে কোন এক অজানা কারণে এই কঙ্কালগুলোর কোন সযত্ন বিশ্লেষণ কখনওই হয়নি।

মহাদহ


প্রতাপগড় শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে, সরাই নহর রাই থেকে ৫০ কিলোমিটার দুরে, অশ্বখুরাকৃতি হ্রদেরই পাশে ৮০০ বর্গ মিটারের প্রত্নক্ষেত্র। ১৯৭৭-৭৮ সালে খনন করেছেন এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাসের অধ্যাপক জি.আর. শর্মা (জি.আর. শর্মা ও অন্যান্য: ১৯৮০), আবার অ্যান্থ্রোপলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার আনন্দী পাল (জে.এন. পাল: ১৯৮৫)। এবং এখানে কাজ করেছেন জন লুকাস।

এখানে পাওয়া গেছে ২৮টি কবরে ৩৪টি কঙ্কাল। দু’টি কবরে দু’টি করে কঙ্কাল।
পাওয়া গেছে ৩৫টি উনুন। উনুনগুলো দেড় থেকে তিন ফুট, আকারে ডিমের মত আকৃতিতে বানানো। কয়েকটি গোলাকারও ছিল। অনেক উনুনেই লাল রঙের মাটির পুরো প্রলেপ দেওয়া ছিল।

পাথরের ও হাড়ের হাতিয়ার, হরিনের শিং-এর আংটি, কানের দুল আর গলার নেকলেস পাওয়া গেছে। আর ভুক্তাবশেষ পশুর হাড়তো ছিলই। পাওয়া গেছে ১৫০০টি পাথরের লিথিক হাতিয়ার।

চিত্র-৮ দমদমার কবর

দমদমা

দশটি কালস্তরে বিভক্ত তিনটি ৮৭৫০ বর্গ মিটারের প্রত্নক্ষেত্র। পাওয়া গেছে ৪১টি কঙ্কাল। কবরগুলো তেমন গভীর না। সামান্য খুঁড়েই কবর দেওয়া হয়েছিল। ৫টি কবর নারী পুরুষ যুগল কবর। পুরুষের বামে নারী। একটিতে তিনজন পুরুষ। এখানে পাওয়া গেছে একটি কঙ্কাল উপুড় করে শোয়ানো। এমনটা আর কোথাও দেখা যায় নি।

দমদমায় ১০ শতাংশ লোকের হাতে ছিল অস্টো-আর্থারাইটিসের লক্ষণ। মৃত্যুর বয়স বা আয়ু নিয়ে নারী পুরুষের মধ্যে কোন ফারাক ছিল না।

ঘরের মেঝে ছিল হলদে রঙের মাটির প্রলেপ দেওয়া। এখানে মাটির পুরো প্রলেপ দেওয়া সাতটি উনুন পাওয়া গেছে। এছাড়া কয়েকটি মাটির প্রলেপ দেওয়া গর্ত পাওয়া গেছে, সেগুলো উনুন হিসাবে ব্যবহার করা হয় নি। অনুমান এগুলো খাবার জমিয়ে রাখার জন্য ব্যবহার করত।

পাওয়া গেছে ৪১৯৭টি পাথরের লিথিক হাতিয়ার। গয়নার মধ্যে হরিণের শিং-এর আংটি, কানের দুল আর গলার নেকলেস। তবে হাড়ের গয়নাও পাওয়া গেছে। আর বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল একটি কঙ্কালে পাওয়া হাতির দাঁতের চারকোনা লকেট, যাতে ঝোলানোর জন্য দুই পাশে ফুঁটো করা ছিল। হাড়ের পুঁতি ছিল, আর ছিল চুড়ি। চুড়ি আবার খড়খড়ে ভাব কমানোর জন্য আর চকচকে করার জন্য ঘষাও হয়েছিল।

লেখাহিয়া, মির্জাপুর জেলা

লেখাহিয়াতে কাজ শুরু হয় ১৯৬৩তে জি.আর. শর্মার নেতৃত্বে। এখানে বড় গুহায় বা রক শেল্টারে বসবাস করত মেসোলিথিক যুগের মানুষরা। পরবর্তীকালে খনন কাজ এগিয়ে নেন ভি.এন. মিশ্র এখানে ১৭টি কবর ও দেহাবশেষ পাওয়া যায় (জি.আর. শর্মা: ১৯৬৫)। এছাড়া পাওয়া গেছে স্তন্যপায়ী প্রাণীর চোয়াল। এখানকার কঙ্কাল নিয়ে গবেষণামূলক কাজ বিশেষ কিছু হয়নি। তবে পরে জন লুকাস ও ভি.এন. মিশ্র যৌথভাবে কিছু কাজ করেন।

লাংঘনাজ

লাংঘনাজের বিশেষত্ব হল এই প্রত্নক্ষেত্রের লোকেরা হরপ্পা সভ্যতার সমসাময়িক কালে বসবাস করলেও, এবং তাদের সাথে কিছুটা হলেও যোগাযোগ রেখেও নিজেরা থেকে গিয়েছিল তাদের মেসোলিথিক যুগের সংস্কৃতির জগতে।

লাংঘনাজ প্রত্নক্ষেত্রের প্রথম খোঁজ পাওয়া যায় ১৮৮৩ সালে রবার্ট ব্রুস ফুটের মাধ্যমে। তিনি পেয়েছিলেন সবরমতী নদীর ধারের সাদোলিয়া আর পেধামালি গ্রামে একটি পাথরের চটা দিয়ে বানানো সরঞ্জাম আর দু’টো পাথরের কুড়াল। তিনি সেগুলো জমা দেন অক্সফোর্ডের ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের জিওলজিকাল বিভাগে।

তারপরে একেবারে ১৯৪১ সালে পুনের ডেকান কলেজের উদ্যোগে নতুন করে খনন কাজ আরম্ভ হয়। তখনকার এ.এস.আই প্রধান কে.এন. দীক্ষিতের উদ্যোগে কাজ শুরু হয়। কাজে নামেন প্রত্নবিদ এইচ.ডি সাঙ্কালিয়ার সাথে ইরাবতী কার্ভে। তখন সেই এলাকা ছিল বরোদার গাইকোয়াড় রাজার শাসনাধীন।

সাঙ্কালিয়া লাংঘনাজের গ্রামে প্রথম খনন কাজের শুরু করেন ১৯৪১ সালে। সেই কাজের নাম রাখা হয়ে ছিল ফার্স্ট গুজরাত প্রি-হিস্টোরিক এক্সপিডিশন। প্রথম কাজ শুরু করার জন্য তিনি বেছে নিলেন ৬৭ ফুট উঁচু বালির ঢিবি, নাম আন্ধারিও টিম্বো।

১৯৪১ এর পরে  আবার এখানে কাজ করেন সাঙ্কালিয়াই ১৯৪৪-৪৫ সালে। তারপরে কাজ হয় ১৯৪৭ আর ১৯৪৯ সালে। ড. বি. সুব্বা রাও কাজ করেন ১৯৫২ আর ১৯৫৪ সালে। ১৯৫৯ সালে ছিলেন কেনেথ কেনেডি আর কার্ভে। তারপরে আবার আসেন জি. কার্ভে-কোরভিনাস আর কেনেথ কেনেডি ১৯৬৩ সালে।

লাংঘনাজের পরিবেশ

উত্তরপ্রদেশের মেসোলিথিক এলাকাগুলোর পরিবেশ আর গুজরাতের লাংঘনাজের পরিবেশ অনেকটাই ভিন্ন।

১৯৪৯ সালে ড. এফ. জেউনার আসেন এখানে। তাঁর আসার উদ্দেশ্য ছিল এখানকার বালিয়াড়ি গঠনের পেছনে আবহাওয়ার গুরুত্ব বোঝা, সাথে মাটির স্তরের কাল নির্নয় করা। জেউনার বলেন প্রথমে এই এলাকায় ছিল আর্দ্র আবহাওয়া। সেই সময় তৈরি হয় লালচে বাদামি মাটির স্তর। তারপরে আসে শুখার কাল। তখন বাতাসে জলীয় বাষ্প কমে গেছে। এই শুখার কালে গোটা গুজরাতেই ছড়িয়ে পড়ে হাওয়ায় ওড়া ধুলোর স্তর। সেই ধুলোর স্তর একসময় নদীর জলে বয়ে এসে জমা হয় গ্রানাইট পাথরের স্তরের উপর। এই সময়েই গড়ে ওঠে উত্তর গুজারাতের সমভুমি এলাকা।

এরপরে আসে আবার একটি শুখার কাল। বাতাস থেকে উবে গেছে জলীয় বাষ্প। ফলে আবার ধুলো ওড়া শুরু হয়। এবার দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে, কাম্বে উপসাগরীয় এলাকা থেকে উড়ে আসতে থাকে ধুলো। সেই ধুলোর স্তরই তৈরি করে লাংঘনাজের মত এলাকায় বালিয়াড়ির পর বালিয়াড়ি। এই বালিয়াড়ির ধুলোও বাতাসে উড়ে সরে যেতে থেকে। বালিয়াড়ির সব এলাকা সমান না থেকে জমা হতে থাকে এক এক জায়াগায়। সে সব জায়গায় উঁচু হয়ে ঢিবির সৃষ্টি হয়। আর তার পাশেই তৈরি হয় অপেক্ষাকৃত নীচু জায়গা। লাংঘনাজের আন্ধারিও টিম্বো জলাশয় তৈরী হয়েছে ঐ রকম নীচু জায়গায় জল জমে জমে। এই বালিয়াড়ি তৈরির প্রক্রিয়া বোঝার জন্য তিনি খনন করান পাঁচ ফুট গভীর অবধি। দেখা গেল পাঁচ ফুট নিচে আছে চুন সমৃদ্ধ কাঁকরের স্তর যার রং ছিল ধূসর হলদে।

ড. এফ. জেউনার বলেন এই বালির ঢিবিগুলো যখন গড়ে ওঠে তখন বাতাসে কিছু জলীয় বাষ্প ছিল বলেই বালি এক এক জায়গায় স্তূপীকৃত হয়ে অত বড় বড় ঢিবি তৈরি করতে পেরেছে। ফলে এই সময়ে কিছু গাছপালা জন্মানোর সম্ভাবনাও থাকছে। কিছু গাছপালা জন্মানোর ফলে বালির ঢিবিগুলোর বালি আর উড়তে পারে নি। ফলে সেগুলো হয়ে যায় স্থায়ী ঢিবি। আর এই ঢিবির মাথা থেকে পাঁচফুট গভীর স্তরেই মানুষ আর প্রাণীদের কঙ্কাল আর হাড় পাওয়া গেছে। কারণ গাছপালা জন্মানোতে মানুষ আর বিভিন্ন প্রাণীর বসবাসের যোগ্য হয়ে উঠেছিল এইসব এলাকা।

এর পরেই আসে আবার স্বল্পকালীন শুখার কাল। আবার হাওয়ায় ওড়া ধুলো জমা হতে থাকে এই সব এলাকায়। সেই স্তর জমা হয়ে গড়ে উপরের তিন ফুট স্তর যার রং গাঢ়  বাদামি। এখন ঐ তিন ফুটের শেষ স্তরের উপরেই কিছু কিছু ঝোপঝাড়, গাছপালা আবার জন্মাতে শুরু করেছে।

ড. এফ. জেউনার বলেন উপরের তিন ফুট স্তরে আছে নব্যপ্রস্তর যুগের আর লৌহ যুগের সংস্কৃতির নমুনা। এই উপরের তিন ফুট স্তরে পাওয়া গেছে লোহার গাদের দানা। কুমোরের ঘূর্ণি চাকিতে বানানো মাটির বাসনের টুকরো। এই তিন ফুটের তলাতেই কিন্তু আছে মাইক্রোলিথ সরঞ্জাম আর কোন মতে হাতে বানানো মাটির বাসনের টুকরো। আর পাঁচ ফুট তলাতেই আছে মাইক্রোলিথ সমৃদ্ধ স্তর। যেখানে পাওয়া গেছে কঙ্কাল। সেই স্তরে কিন্তু মাটির বাসন মোটেই নেই। যদিও সুব্বারাও বলেছেন এই স্তরেও তিনি হাতে বানানো মাটির বাসনের টুকরো পেয়েছেন, সাঙ্কালিয়া ও কার্ভে (১৯৪১-৪৫) কিন্তু বলছেন কিছুই ছিল না।

তিন থেকে পাঁচ ফুট, এই মাঝখানের স্তরের সম্বন্ধে আগে বিশেষ কিছুই বলা না হলেও ১৯৬৩ সালের খননে এই মাঝখানের স্তরের উপরের ভাগে পাওয়া গেছে কিছু ডেন্টালিয়াম ঝিনুকের পুঁতি আর ক্লোরাইট পাথরের ধারালো ছুরি, এসব হল নব্য প্রস্তর যুগের। আবার ঠিক চার ফুটের নীচেই ছিল বালি পাথরে তৈরি ঘষার আর গুঁড়ো করার সরঞ্জাম। তারই সাথে হাড়ের টুকরো দিয়ে বানানো সরঞ্জাম।

সবশেষে এই পাঁচ ফুট গভীর স্তরকে প্রস্তর যুগের না বলে মধ্য প্রস্তর যুগের শেষ ভাগের মানুষদের বসবাস কাল বলেই ধরা হল। ধরা হল বটে কিন্তু প্রমাণ অধরা থেকে গেল। কারণ প্রায় অনুরূপ মাইক্রোলিথ পাওয়া গেছে বরোদাতেই। যার ঠিক উপরেই নব্য প্রস্তর যুগের সাংস্কৃতিক নমুনা পাওয়া গেছে।

সাঙ্কালিয়ার খনন কাজ

১৯৪১ সালে সাঙ্কালিয়ার সাথে কাজ শুরু করেন ড. ইরাবতী কার্ভে। এই সময়ে লাংঘনাজের বালিয়াড়ির মধ্যে তিনি পান প্রচুর প্রাণীর অস্থিখণ্ড। এর মধ্যে ছিল কুকুর, ভেড়া, ছাগল, গরু, গন্ডার আর তার সাথে মানুষেরও।

এরপর ভারত সরকারের আর বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া টাকায় খনন কাজ চলে ১৯৪৪-৪৫ সালে। সেখানে তখন খোঁজের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য প্রস্তরযুগীয় মাইক্রোলিথ সরঞ্জামের ব্যবহারকারী মানুষের। তা সেটাও পাওয়া গেল। প্রথমে ফেব্রুয়ারি মাসে পাওয়া গেল তিনটি দেহাবশেষ। তারপর ডিসেম্বরে পাওয়া গেল আরও  চারটি প্রায় সম্পূর্ণ কঙ্কাল।

বালিয়াড়ির পাঁচ ফুট নীচে কঙ্কালগুলো যে স্তরে পাওয়া গেল সেই স্তরে ছিল বহু মাইক্রোলিথ সরঞ্জাম আর ফসিল হয়ে যাওয়া প্রাণীদের হাড়। কিন্তু কোন মাটির বাসন নেই।

প্রশ্ন উঠল এমনও হতে পারে যে এই কঙ্কাল হিসাবে যাদের পাওয়া গেল সেই মানুষরা মাইক্রোলিথ সরঞ্জাম যুগেরই ছিল না। এমনও তো হতে পারে তাদের পরে, অনেক পরে, কবর দেওয়া হয়েছিল মাটি খুঁড়ে, মাইক্রোলিথ সমৃদ্ধ স্তরে। কিন্তু সাঙ্কালিয়া বলেন তেমন সম্ভাবনা মাথায় রেখেই তাঁরা ভালো করে মাটির অবস্থা দেখে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, না এই কঙ্কালগুলো পরে কবর দেওয়া মানুষের না।

সাঙ্কালিয়া বলেন তিনি কঙ্কালগুলো মাইক্রোলিথিক সরঞ্জাম সমৃদ্ধ, আগে না খোঁড়া, মাটির স্তরে পেয়েছেন, যে স্তর কেবল চুনসমৃদ্ধ বালিতেই ভরা। তবু তিনি জানেন সেটা তো প্রমাণ করাও দরকার। বালিয়াড়ি এলাকায় তেমন কিছু প্রমাণ করা সত্যি কঠিন।

তাঁর খোঁড়া স্তরগুলোর উপরের থেকে চার ফুট গভীর স্তর ছিল কালচে বাদামি বালিতে ভরা। উপরের দিকের এক ফুট নীচ পর্যন্ত স্তরে ছিল ভাঙ্গা মাটির বাসনের ছোট ছোট টুকরো, সামান্য মাইক্রোলিথিক সরঞ্জাম আর হাড়ের ছোট ছোট টুকরোতে ভরা। পরের এক ফুটে প্রায় কিছুই নেই। উপর থেকে নীচের তিন থেকে চার ফুটের স্তরে আবার দেখা গেল মাইক্রোলিথিক সরঞ্জাম, কিছু হাড়ের টুকরো, একেবারেই সামান্য পরিমাণে বিশেষ ধরনের মাটির বাসনের টুকরো, পালিশ করা চেল্ট।

দ্বিতীয় স্তরে বালির রঙ বদলে গেছে এখানে হাল্কা বাদামি বালি। উপর থেকে ৪-৬ ফুট স্তরে মাইক্রোলিথিক সরঞ্জাম, বড় সড় প্রাণীর হাড় আর তারই মাঝে মানুষের কঙ্কাল, হাঁটু মোড়া অবস্থায়।

তবু সময় নির্ধারণ নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। এই সমস্যা মেটাবার জন্য আরেকবার কাজে নামেন সাঙ্কালিয়া। এবার প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুদান আসে বোম্বের দোরাবজী টাটা ট্রাস্ট থেকে। ফলে এই পর্বের কাজের নামকরণ হল স্যার দোরাবজী টাটা এক্সপিডিশন।

এবার সাঙ্কালিয়া খনন করেন তিন কিলোমিটার দূরের আখাজ গ্রামে। আখাজ গ্রাম বালিয়াড়ির মাঝখানে একটি বড় জলাশয় নিয়ে গড়া। এখানেও মাইক্রোলিথ সমৃদ্ধ স্তরে পাওয়া গেল হাঁটু মোড়া নর কঙ্কাল। সাথে পাওয়া গেল প্রচুর প্রাণীর হাড়। কিন্তু লাংঘনাজ গ্রামের মত এখানে মাটির স্তরের বিভিন্নতা কিছুই ধরা গেল না।

এরপরের খনন কাজ একটু দূরে সবরমতী নদীর ডান পাড়ের গ্রাম ভালাসানা। এখানে উত্তর দিকে ছিল প্রাচীন নুড়ি পাথরের স্তর প্রাচীনতর গ্রানাইট পাথরের স্তরের উপরে। তার উপরে তৈরি হয়েছে বালিয়াড়ি। কোথাও কোথাও বালির ঢিবি ৩০ ফুট অবধি উঁচু। এখানে বালিয়াড়ির নীচের দিকের স্তরে বেশ কিছু কোয়ার্টজের ধারালো ফলা পাওয়া গেল। আর পাওয়া গেল প্রায় ফসিল হয়ে যাওয়া পশুর হাড়।

তারপরে আরেকটু খোঁজাখুঁজি করতেই পাওয়া গেল একটি কবরে তিনটি কঙ্কাল। একটি পুরুষ কঙ্কালের ঠিক ওপরে নারীর কঙ্কাল আর তারই উপরে একটি শিশুর কঙ্কাল। তবে প্রত্নবিদদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল এখানে তাঁরা কবরের আকারটা ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন। যা বোঝায় এগুলো সত্যিই কবরই দেওয়া হয়েছিল। এমনি ফেলে রাখা নয়।

এখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁরা আরেকবার লাংঘনাজের কবরগুলো পরখ করলেন। খুব যত্ন নিয়ে কবরের অনুমিত দেওয়াল পরিষ্কারের চেষ্টা করতেই বুঝলেন, তাঁরা আগে যেটা দু’টি বালির স্তর ভেবে ছিলেন তা আসলে পাঁচটা ভিন্ন স্তর। আর প্রতিটি স্তরের বালির রং আলাদা।

এরপরে তাঁরা যেখানে যেখানে মাইক্রোলিথ সরঞ্জাম পেয়েছিলেন সেই সব জায়গা আবার নতুন করে সযত্নে পরিস্কার করে দেখলেন। সব জায়গাতেই এবার পেলেন আগে ভাবা দুই স্তরের বদলে পাঁচটি স্তর। আর মাইক্রোলিথের স্তরের বালির রঙ ফ্যাকাসে বাদামি। ক্রমে বোঝা গেল গোটা লাংঘনাজের মাটির স্তর প্রথমে ভাবা দু’টো স্তর নয় আসলে পাঁচটা স্তর।

পরে এখানে আসেন মর্টিমার হুইলার। তাঁকে এই প্রত্নক্ষেত্রের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য ঐ ভাবে শুরু থেকে খুঁড়ে দেখানোর জন্য আগের দিন একটা জায়গা খোঁড়া হতেই সেখানে পাওয়া গেল একটি কঙ্কাল। তারপরে মর্টিমার হুইলারের উপস্থিতিতে আরও খুঁড়তেই বের হলো একটি পিঠের হাড়ের (স্ক্যাপুলা) অংশ। মর্টিমার হুইলার মেনে নিলেন এই কঙ্কালগুলো পরে কবর দেওয়া নয়। এদের কবর দেওয়া হয়েছিল মাইক্রোলিথিক স্তরেই।

এরপর এখানকার মাটি রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হল বিদেশের পরীক্ষাগারে। তাদের রিপোর্টে জানা গেল এখানকার মাটির উপরের স্তরে যতটা পচে মাটি হয়ে যাওয়া জীবদেহ রয়েছে তার পরিমাণ প্রতি স্তরে কমতে কমতে শেষের দিকে মাটি হয়ে গেছে প্রায় জীবদেহহীন চুনা মাটি।

বোঝা গেল মাইক্রোলিথিক স্তরের মানুষেরা তাদের সময়ে এখানে এখনকার চেয়েও অনেক কম গাছপালা পেয়েছিল। আবহাওয়া তখন আরো বেশি শুষ্ক ছিল এই এলাকায়। তবে তারই সাথে এটাও সত্যি এলাকায় গাছপালাও ছিল ভালোই। না হলে গন্ডার বা গরুর মত প্রাণীর এখানে থাকা অসম্ভব ছিল।

লাংঘনাজে প্রচুর মাইক্রোলিথ সরঞ্জাম পাওয়াতে আরেকবার ভালো করে খোঁজাখুঁজির পর দেখা গেল প্রচুর বাতিল করে দেওয়া পাথরের টুকরো অর্ধেক বানানো সরঞ্জাম পড়ে আছে। তাতে বোঝা গেল এখানেই এই সব সরঞ্জাম তৈরি হত।

১৯৬৩ সালের খনন কাজ

কাজ করেন কেনেথ কেনেডি, জি. কার্ভে করভিনাস। এই কাজে উল্লেখ যোগ্য ভাবে পাওয়া জিনিসের মধ্যে ছিল একটি তামার ছুরি। তিন ফুট নীচে পাওয়া এই তামার ছুরিটি তিনশ মিলিমিটার লম্বা, ২৫ মিলিমিটার চওড়া। তামার ছুরির এক দিক ভোঁতা। সম্ভবত সেদিকে কোন হাতল লাগানো ছিল। আর পাওয়া যায় একটি নর কঙ্কাল বাদেও বেশ কিছু প্রাণীর হাড়। এবারে পাওয়া কঙ্কালের কোন বিশেষত্ব নেই। শুধু আগেরগুলো ছিল হাঁটু মোড়া পূর্বে মাথা দেওয়া কাত হয়ে। এবারেরটি পশ্চিমে মাথা দেওয়া চিৎ অবস্থায় টানটান। এই খনন কালে দেখা গেছে একাধিক জায়গায় স্তূপীকৃত করে রাখা পশুর হাড় আর তা ঘিরে আছে প্রচুর নুড়ি পাথর। এর কোন ব্যাখ্যা নেই। এছাড়া কয়েকটি পশুর হাড় পাওয়া গেছে যা দেখে অনুমান করা যায় এগুলো ফাটিয়ে মজ্জা খাওয়া হয়েছিল।


লাংঘনাজের প্রাণীদের হাড়

সাঙ্কালিয়ার কাজের সময়েই তাঁর সাথী ইরাবতী কার্ভে এখানে পেয়েছিলেন প্রচুর প্রাণীর হাড়। তার মধ্যে গন্ডার, গরু, হরিণ, শুয়োর, কুকুর, কচ্ছপ, কাঠবিড়ালি, ইঁদুর, মাছ সবই পাওয়া গেছে।

১৯৬৩ সালের আগে সংগৃহীত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের হাড় পরীক্ষা করেছেন ড. জে. ক্লাটোন ব্রোক। তিনি বলেন হাড়গুলো সংগৃহীত হয়েছে উঁচু নীচু নানা এলাকা থেকেই। ফলে কোনটা ঠিক কোন স্তরে ছিল তা এখন বলা কঠিন। তেমনি বলা কঠিন যে মানুষদের কবরের স্তরে কোন কোন প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল। ফলে সেই প্রস্তর যুগের মানুষদের বসবাস কালের প্রাণীদের সঠিক পরিচয় বোঝা কঠিন। ড. জে. ক্লাটোন ব্রোক কিছু হাড়ের নমুনা লন্ডনের পাঠিয়েছেন জীবাশ্ম বিষয়ক গবেষণার জন্য।

ড. জে. ক্লাটোন ব্রোক যে প্রাণীগুলোর অস্তিত্ব চিনতে পেরেছেন তা হল ভারতীয় নেকড়ে, ভারতীয় ধুসর বেজি, এক খড়্গ গন্ডার, ভারতীয় বুনো শুয়োর, হরিণ, বারসিংগা, নীলগাই ও কৃষ্ণসার হরিণ। তিনি গবাদি পশুর পরিচয় নিয়ে স্থির নিশ্চয় কিছু করতে পারেন নি। তবে সেগুলো যে হরপ্পা সভ্যতার পরিচিত জেবু ষাঁড় গোত্রের নয় তা বলেছেন এবং বলেছেন, সব চেয়ে বেশি মিল পেয়েছেন মোষের সাথে।

চিত্র-৯

লাংঘনাজ প্রত্নক্ষেত্রের কঙ্কাল

প্রথম প্রশ্ন কবেকার? না তার সঠিক কোন উত্তর নেই। তবে সাংস্কৃতিক দিক থেকে এগুলো সম্ভবত মধ্য প্রস্তর যুগের। কিন্তু কত বৎসরের সে কথা অজানা।

মানুষের কঙ্কালগুলো খুব একটা ভালো অবস্থায় পাওয়া যায় নি। চুন সমৃদ্ধ মাটিতে থাকায় এগুলো ফসিল হয়ে গেছে। এখানে মাটির এমনি হাল যে কয়েক বৎসর আগের মৃত প্রাণীদের হাড়ও ফসিলে বদলে যেতে শুরু করেছে। কাজেই ফসিল বলেই তা সুপ্রাচীন হবে এমনটা ভাবারও সুযোগ নেই। পাওয়া কঙ্কালের বেশির ভাগেরই খুলি খুব বাজে ভাবে ভেঙে গেছে। তবু অনুমান করা হয়েছে যে এদের মধ্যে একেবারে প্রাচীন মানুষের গঠন আর কিছুটা আধুনিক কালের মানুষের গঠন, এই দুই রকমই ছিল। গড় বয়স ২৫ থেকে ৩০ বৎসর।

চিত্র-১০

সাঙ্কালিয়া ১৯৪৪ সালে পাওয়া চারটি করোটির বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর মতে এদের ছিল লম্বাটে খুলি, আদিম ধরনের চওড়া নাক গোল চোখ, খুলির আয়তন আধুনিক ইউরোপীয়দের মতই। এখানে পাওয়া মোট ১৪টি কঙ্কালের মধ্যে ১টি পাওয়া গেছে ১৯৬৩ সালে। আর সব কঙ্কালই পাওয়া গেছে দুই থেকে ছয় ফুট গভীরে।

সাঙ্কালিয়ার পাওয়া ১৩টি কঙ্কালের চারটির ছিল কপাল ফাটা। আর সেগুলো ইচ্ছাকৃত আঘাত থেকেই হয়েছে, আর সেই আঘাতেই তাদের মৃত্যুও হয়েছে। যেহেতু প্রায় অতগুলো খুলি ফাটা ভাঙা তাই ভাবা হয়েছিল হয়ত কবর দেবার পরে পাথর দিয়ে খুলি ফাটিয়ে দেওয়া তাদের অন্ত্যেষ্টির অঙ্গ ছিল। বিশেষ করে একটি মৃতদেহের পাশে বড় পাথর ছিল। কিন্তু খুলি ভাঙার ফাটার ধরন দেখে পরে সে ধরনের ভাবনা বাতিল করে দেওয়া হয়।

এখানকার কঙ্কালের দাঁতের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। দাঁতের ক্ষয় দেখে বোঝা যায় এরা শক্ত জিনিষ খেত বেশি। ফলে দাঁতের ক্ষয় খুব বেশি ছিল। তবে কয়েকটি কঙ্কালের দাঁতের ক্যাভিটির আধিক্য দেখে নিশ্চিত অনুমান করা হয় এরা কৃষিজাত খাবার গম, বার্লি এসব খেত। এবার প্রশ্ন আসে তাহলে এরা কৃষিকাজ জানত? না তেমন সম্ভাবনা একদম নেই। যাদের ক্যাভিটি পাওয়া গেছে তাদের পাওয়া গেছে উপরের স্তরে। ফলে তাদের জীবনকালে তাদের যোগাযোগ হয়েছিল হরপ্পা সভ্যতার লোকেদের সাথে এমন সম্ভাবনা থাকছে। হরপ্পা সভ্যতায় মাইক্রোলিথ সরঞ্জামের বিপুল চাহিদা ছিল। সম্ভবত তারা হরপ্পানদের মাইক্রোলিথ সরঞ্জাম জোগাত। বদলে পেত খাবার জন্য কৃষিজাত দানা শস্য। মনে রাখতে একটি তামার ছুরিও পাওয়া গেছে। যা আসবে কেবল হরপ্পানদের থেকেই।

সব কঙ্কাল দেখে যে ধারণা জন্মায় – অনেক কঙ্কালেরই মাথার খুলি ভাঙ্গা থাকায় ধারণা করা যেতে পারে যে মৃতরা সবাই কোন সংঘাতে মারা গেছে, আর মৃতদেহগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। কিন্তু সব কবর দেখার পরে বোঝা গেল তেমন কোন সম্ভাবনা নেই। মাথার খুলি সম্ভবত পরে মাটির চাপে ভেঙে গেছে। আর দেহগুলো কবরই দেওয়া হয়েছিল। আর এখানকার বাসিন্দারা একই জনগোষ্ঠীর ছিল।

১৯৪১-৪৫ সালে পাওয়া কঙ্কালগুলো নিয়ে সাঙ্কালিয়া ধারণা করেছিলেন তাঁর পাওয়া কঙ্কালগুলোর কালস্তর হবে আন্দাজ ৪.৫ হাজার বৎসর আগের। আরেক দল বিজ্ঞানী অনুমান করছেন এটির বয়স হবে হরপ্পা সভ্যাতারও কিছু আগের বা আনুমানিক ৫.৫ হাজার বৎসর।

প্রাণীর হাড়ের একটা কার্বন ডেটিং হয়েছিল সময় পাওয়া গেছে ৩৮৭৫ বৎসর আগের। কিন্তু পরীক্ষায় নমুনায় সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি থাকায় সেটা গ্রাহ্য করা হয় নি। তাছাড়া এমনিতেই হাড় থেকে কার্বন ডেটিং কখনওই ভরসা যোগ্য না।

তবে দুটি ভিন্ন পর্যায়ের বসবাস কাল নিয়ে ভাবা হয়। এক মধ্য প্রস্তর যুগ আর পরেরটি নব্য প্রস্তর যুগের শেষ ভাগ থেকে তাম্র যুগ হয়ে লৌহযুগ অবধি। কোথাও কোন বাসস্থান বানাবার চিহ্ন পাওয়া যায় নি। তবে যেহেতু কোন গাছ বা কাঠ সেখানে টিকে নেই তাই কাঠের ঘরের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আর একেবারে চরমে, একদল বিজ্ঞানী বলছেন লাংঘনাজ প্রত্নক্ষেত্রের বয়স হবে ১২ হাজার বৎসর আগের। যদি তাই হয় তাহলে এটাই হবে ভারতে পাওয়া অন্যতম প্রাচীনতম মানব বসতি। সমস্যা হল মাইক্রোলিথের উপস্থিতি দেখে সময় বের করা প্রায় অসম্ভব। আর এখানে কোন উনুন পাওয়া যায় নি যার থেকে কয়লা নিয়ে কার্বন ডেটিং করা যাবে।

তথ্যসূত্র

  1. John R. Lukacs and J.N. Pal, “Skeletal Variation among Mesolithic People of the Ganga Plains: New Evidence of Habitual Activity and Adaptations to Climate” in ‘Asian Perspective’, 42(2) 2003; University of Hawaii Press, pp. 329-351.
  • J.N. Pandey, “Mesolithic in the Middle Ganga Valley” in ‘Bulletin of the Deccan College Post-Graduate and Research Institute’, Vol. 49 (1990), pp. 311-316.
  • Kenneth A.R. Kennedy, Cristopher B. Burrow, Nancy C. Lovell: “Mesolithic Human Remains from Gangetic Plain Sarai Nahar Rai” in ‘Puratattva’ No. 15 (1984-85); Published by Indian Archaeological Society.
  • P.K. Thomas, P.P. Joglekar, V.D. Misra, J.N. Pandey and J.N. Pal, “A Preliminary Report of the Faunal Remains from DamDama”, Department of Archaeology, Deccan College Pune, and Department of Ancient History, Culture and Archaeology, University of Allahabad; Published in ‘Man & Environment’ XX(I), 1995.
  • Pratap C. Dutta, “Sarai Nahar Rai Man, The First and Oldest Fossil recorded in South Asia”; Published in ‘Anthropology’ XXII/I (1984).
  • Kulbhushan Mishra, “Mesolithic Cultural Phase in Middle Ganga Plain and Adjoining Regions of North Central-India” in ‘Heritage: Journal of Multidisciplinary Studies in Archaeology’ 4 (2016); pp. 459-471.
  • G. Karve-Corvinus and K.A.R. Kennedy, “Preliminary Report on Langhnaj: The Preliminary report of the 1963 Archaeological Expedition to Langhnaj, North Gujarat” in ‘Bulletin of the Deccan College Post-Graduate and Research Institute’, Vol. 24 (1963-64), pp. 44-57.  
  • Katherine L. Arista, “Mesolithic Health and Subsistence at Langhnaj and Mahadaha India”, Submitted to the Faculty of The Archaeological Studies Program, Department of Sociology and Archaeology in partial fulfillment of the requirements for the degree of Bachelor of Science; University of Wisconsin, 2012.
  • H.D. Sankalia and I. Karve, “Early Primitive Microlithic Culture and People of Gujarat”; published in ‘American Anthropologist’, New Series, Vol. 51, No. 1 (Jan. – Mar. 1949), pp. 28-34.
  1. Kenneth A.R. Kennedy, Cristopher B. Burrow and Nancy C. Lovell, “Mesolithic Human Remains from Gangetic Plain Sarai Nahar Rai: South Asia” Occasional Papers and Thesis No.10, South Asia program; Cornell University 1986.
  1. John R. Lukacs, Brian E. Hemphill and K.A.R Kennedy, “Biological Adaptations and Affinities of Bronze Age Harappans”; in ‘Harappan Excavations 1986-1990, A Multidisciplinary Approach to Third Millennium Urbanism’ edited by Richard H. Meadow, Monographs in World Archaeology No.3; Prehistory Press, Madison, Wisconsin. 1991, ISBN 0-9629110-1-1.
  1. Benjamin Valentine, George D. Kamenov, Jonathan Mark Kenoyer, Vasant Shinde, Veena Mushrif-Tripathy, Erik Otarola-Castillo and John Krigbaum, “Evidence for Patterns of Selective Urban Migration in the Greater Indus Valley (2600-1900 BC): A lead and Strontium Isotope Mortuary Analysis”; published in PLOS ONE on April 29, 2015.

মন্তব্য তালিকা - “মেসোলিথিক ভারতের মানুষদের কথা”

  1. Lot of inputs. A map of places location would have been better. Burying of dead, inspite of living near forest. Were the people came to place from different places. Features varies. Harappa link at some places. No creative work or work of trade. No earthen toys even. No carnivorous animal except Wolf.
    No earthen or brick wall although they were almost of same age.

    1. শ্রদ্ধেয়, আপনি যথার্থই বলেছেন সাথে ম্যাপ থাকলে ভালো হত। ম্যাপ না দেওয়াটা আমার দিক থেকে ভুল। ভবিষ্যতে এদিকে খেয়াল রাখবো।
      ১। বনের কাছে থেকেও মৃতদেহ কবর দেওয়াতে অবাক হাবার খুব বেশি কারণ নেই। বরং এটা স্বাভাবিক। মৃতদেঙ কবর বা মাটি চাপা দেওয়ার প্রথা বহু বহু প্রাচীন। সম্ভবত অন্য পশুপাখি প্রিয়জনের দেহ ছিঁড়ে খাচ্ছে সেই বিষদৃশ্য না দেখার জন্যই দেহ মাটি চাপা দেবার প্রথার শুরু । তবে পচন থেকে পোকা ইন্ফেক্শন দুর্গন্ধ এসব থেকে রেহাই পাবার জন্য মৃতদেহ মাটি চাপা দেবার প্রচলন হতেই পারে। সেই মাটি চাপা দেওয়া দেহ আবার নেকড়ে শিয়াল খুঁড়ে তুলে খাচ্ছে দেখে গভীর করে মাটি খুঁড়ে কবর দেওয়া। তারপরে আসবে সেই কবরে কাঠ বা পাথর চাপা দেওয়া এসব আসতে থাকে। মৃতদেহের অগ্নি সৎকার আসবে অনেক অনেক পরে। তার বড় কারন আগুনো পোড়াতে গেলে গাজ কাটতে হবে, কাঠ টুকরো করতে হবে, এসব ঝামেলা আছে। কাজেই ব্রোঞ্জ যুগের আগে যথাযথ মৃতদেহের অগ্নিসৎকার প্রচলন সম্ভব ছিলো না। অবশ্য বড় পাথররে কুড়াল দিয়ে গাছ কাটতে দেখা গেছে, তবে সে সব বড় পাথরের অস্ত্র। এদের কাছে অত বড় পাথরের কিছু ছিলো না।
      সরাই নহর রাই, দমদমা, মহাদহের লোকেদের চেহারায় খুব কিছু অমিল নেই। লেকাহিয়া নিয়ে কিছু বলতে পারছি না, ল্যাংঘনাজে চেহারা কিছুটা আলাদা। তবে তাদের সাথে উত্তর প্রদেশের লোকেদের কালের ব্যবধান চার পাঁচ হাজার বৎসর। এই লম্বা সময়ে লোকের চেহারা এমনিতেই বদলে যাবার কথা। জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্য পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্প্র্কিত ঘণিষ্ঠতা দেখানো আছে চিত্র (৬) এ । দেখতে পাবেন মোটামুটি দুটো ভিন্ন জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব।
      মেসোলিথিক যুগে শিলপকলার অস্তিত্ব একেবারেই ছিলো না এমন নয়। তবে উত্তর প্রদেশের বা বিন্ধ্য এলাকায় তেমন বিশেষ কিছু দেখা যায় নি সেটা ঠিক।
      সেসোলিথিক যুগে ব্যবসা কেমন হতো সেটা খুব পরিস্কার না আমার কাছে। কারন কয়েকশ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে কিছু দিয়ে কিছু নিয়ে ব্যবসা প্রায অসম্ভব বলেই আমি মনে কর। কেননা, তারা জানবে কেমন করে কারা কোথায় আছে বা কাদের কি জিনিষের চাহিদা। তার চেয়েও বড় কথা রাস্তা চিনে নিজের বসতিতে ফিরে আসা খুবই কঠিন কাজ। জন ঘণত্ব তার সাথে বসতি ঘণত্ব না বাড়লে যথাযথ বানিজ্যিক পথ প্রথার সৃষ্টি হবে না। কারন দেখা গেছে ২৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার দুরত্বেই কেবল এমন নিয়মিত বানিজ্যিক যোগসূত্র সৃষ্টি হতে পারে। আর নিয়মিত বানিজ্যের জন্য বানিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব কেবল কৃষিকাজ থেকে উদ্বৃত্ব খাদ্য উৎপাদন হলে তবেই কিছু লোক বানিজ্যিক দ্রব্য উৎপাদন করবে। বানিজ্যিক ভিত্তিতে ল্যাং ঘনাজে সম্ভবত লিথিক সরঞ্জাম উৎপাদন হত। কারন সেখানে ছিল পাশেই হরপ্পা সভ্যতা। তাদের লিথিক সরঞ্জামের চাহিদা ছিল বিপুল। তার বদলে এরা সেখান থেকে পেত কৃষি উৎপাদিত খাদ্য শষ্য।
      ইঁটের ঘরবাড়ি বানালে সেটাকে আর মেসোলিথিক সভ্যতা অভিধা দেওয়া হত না। সেটা হয়ে যেত নিউলিথিক সভ্যতা। যা মেহেরগড়ে ঘটেছিল। মেহেরগড়ে যা ঘটেছিল সব জায়গায় তা ঘটবেই এমন সম্ভব না। মেহেরগড়ে কৃষিকাজ সম্ভব হয়েছিল। কি্তু মধ্যগঙ্গায় সব জায়গায় কৃষিকাজ সম্ভব হয় নি। যেখানে হয়েছে সেই সব এলাকা এই লেখায় নেই। কারন সেসব এলাকায় কঙ্কাল পাওা য়ায় নি। এই লেখা মুলত কঙ্কাল নিয়ে। কঙ্কালের উপর ভিত্তি করে জনগোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক , সেই লোকদের দৈহিক আকার ও আনুমানিক চেহারা কেমন সেটাই ছিল এই লেখার বিষয়।

  2. আপনার প্রতিটা লেখাই নূতন নূতন কৌতুহল ও বিস্ময় জাগায়। প্রাচীন প্রস্তর যুগেও স্থায়ী বসত করত কিছু মানুষ, কিংবা pre pottery Neolithic শুরু হবার অনেক অনেক আগে কিছু মানুষ বাসন বানাতো এগুলো খুবই আশ্চর্য করল। এছাড়া দারুন লাগল দুখানা ট্রেডের কথা জেনে – ১) মধ্যভারতের পাথরের আর উত্তর ভারতের শিকারজাত খাদ্যের বিনিময়, ২) লাংঘানাজের মধ্যপ্রস্তরযুগীয় মানুষের সাথে সিন্ধু সভ্যতার ব্রোঞ্জযুগীয় মানুষের ট্রেড- শস্য ও তামার বিনিময়ে পুরোনো ধারার পাথরের সরঞ্জাম। এগুলো আমার খুব আগ্ৰহের বিষয়।

    একটা কৌতুহল জাগল- মধ্যভারত থেকে গাঙ্গেয় সমতলে মানুষ অতো অতো পাথর কিভাবে বহন করে আনত? হাতে হাতে, নাকি ভারবাহী পশু বা নৌকার ব্যবহার তারা জানত?

    1. হ্যাঁ। আমাদের পাঠ্যে লেখা থাকে সেই সিকারি-সংগ্রাহকরা যাযাবর ছিল। পাঠ্য বইতে সে কথা লেখার আগে আমাদের জ্ঞান তো সীমিত ছিল। তবে শিকারি-সমগ্রাহক জীবন যাযাবর জীবনই হবার কথা। পৃথিবীতে হাতে গোনা যে কয়টি গোষ্ঠী এখনো টিকে আছে তারা যাযাবরই। তবে সে যাযাবরদের পরিধি থাকে সীমাবদ্ধ। সাধারনত আট দশ কিলোমিটারের মধ্যেই তারা ঘোরাফেরা করে। তাও সব সময় সবাই সবাই বসতি ছেড়ে চলে যায় না। বাসা বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বিস্তর আলোচনার পরে। যারা রাজী নয় তারা থেকে যায়। যারা চলে যায় তারাও ঘুরে ফিরে সেই চেনা জায়গাতেই ফিরে আসে। এটা দেখা গেছে মালয়েসিয়ার বাটেক গোষ্ঠীর মধ্যে, টানা আট বৎসর পর্য্যবেক্ষণ করে।
      অন্যদের বেলাতেও কম বেশি এই ট্রেন্ডই দেখা গেছে। মেহেরগড়েও তো প্রি-পটারির লোকেরা ঘর বাড়ি বানিয়েই থাকতো। দাঁতের মুনা অনুযায়ী তারা আর এরা একই জনগোষ্ঠীর সদস্য়।
      ট্রেড নিয়ে আমিও খুব ইন্টারেস্টেড। মানে সত্যিই কি তারা ট্রেডিংএর জন্য ট্রেডিং করতো না ওটা ঘটে যেত সেটা ভালো করে বোঝা দরকার। কারন তখন পায়ে হেঁটে কয়েকশ মাইল গিয়ে আবার নিজের এলাকায় ফিরে আসাটা আমার কাছে অসম্ভবই মনে হত। হয়ত কিছু লোক মতবিরোধের দরুন নিজের বসতি ছেড়ে বের হয়ে যেত, তারা নিজের কাছে যা আছে তা দিয়ে অন্য কোন বসতির লোকেদের সাথে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করত।
      পাথরের অস্ত্র সরাইনহর রাই, দমদমা, মহাদহ এই তিনটি এলাকার কোথা তৈরী হত না। তারা একেবারে রেডিমেড জিনিষ নিত। এগলো খুবই ছোট আকারের । গড়ে ১৫০ মিলিমিটার। কজেই একজনের চামড়ার ঝোলায় পঞ্চাশ একশ খানা এঁটে যাবার কথা।
      ল্যাংঘনাজে প্রকৃত ট্রেডিং হত। তারা ফাথরের লিথিক সরঞ্জাম তৈরী করে হরপ্পা সভ্যতাকে সরবরাহ করত। বদলে নিত খাদ্য শষ্য তামার সরঞ্জাম। হরপ্পা সভ্যতা কিন্তু দাঁড়িয়ে ছিল উন্নত মানের লিথিক সরঞ্জামের উপর ভিত্তি করে। লিথিক মাইক্রো-ড্রিলবিট ও তৈরী হত, যা চার ইঞ্চি অবধি পাথরের বিডস্ এ থ্রু ড্রিল করে ফেলতে পারত।
      তবে সব মাইক্রোলিথি বা লিথিক টুলস ল্যাংঘনাজ থেকেই যেত এমন না। আরো অনেকগুলো এলাকা ছিল। অনেকগুলো বের হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।
      আমি সেই এলাকা গুলো নিয়ে লেখা পেপার খুঁজছি।

      1. সুদীপ্ত দুঃখিত। উপরের লেখায় প্রচুর বানা ভুল থেকে গেছে। কিন্ত সেটা এডিট করার অদিকার বোধহয় আমার নেই। তাই বাধ্য হয়ে একই কথা আরেকবার লিখতে হল। বানান ঠিক করে।
        হ্যাঁ। আমাদের পাঠ্যে লেখা থাকে সেই শিকারি-সংগ্রাহকরা যাযাবর ছিল। পাঠ্য বইতে সে কথা লেখার সময় আমাদের জ্ঞান তো সীমিত ছিল। তবে শিকারি-সংগ্রাহক জীবন যাযাবর জীবনই হবার কথা। পৃথিবীতে হাতে গোনা যে কয়টি গোষ্ঠী এখনো টিকে আছে তারা যাযাবরই। তবে সে যাযাবরদের বিচরন পরিধি থাকে সীমাবদ্ধ। সাধারনত আট দশ কিলোমিটারের মধ্যেই তারা ঘোরাফেরা করে। তাও সব সময় সবাই বসতি ছেড়ে চলে যায় না। বাসা বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বিস্তর আলোচনার পরে। যারা রাজী হয় না তারা থেকে যায়। যারা চলে যায় তারাও ঘুরে ফিরে সেই চেনা জায়গাতেই ফিরে আসে। এটা দেখা গেছে মালয়েশিয়ার বাটেক গোষ্ঠীর মধ্যে, টানা আট বৎসর পর্য্যবেক্ষণ করে।
        অন্যদের বেলাতেও কম বেশি এই ট্রেন্ডই দেখা গেছে।
        মেহেরগড়েও তো প্রি-পটারির লোকেরা ঘর বাড়ি বানিয়েই থাকতো। দাঁতের নমুনা অনুযায়ী তারা আর এরা একই জনগোষ্ঠীর সদস্য।

        ট্রেড নিয়ে আমিও খুব ইন্টারেস্টেড। মানে সত্যিই কি তারা ট্রেডিংএর জন্য ট্রেডিং করতো না ওটা স্রেফ ঘটে যেত। সেটা ভালো করে বোঝা দরকার। কারন তখন পায়ে হেঁটে কয়েকশ মাইল গিয়ে আবার নিজের এলাকায় ফিরে আসাটা আমার কাছে অসম্ভবই মনে হয়। হয়ত কিছু লোক মতবিরোধের দরুন নিজের বসতি ছেড়ে বের হয়ে যেত। তারা নিজের কাছে যা আছে তা দিয়ে অন্য কোন বসতির লোকেদের সাথে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করত।

        পাথরের সরঞ্জাম সরাই নহর রাই, দমদমা, মহাদহ এই তিনটি এলাকার কোথাও তৈরী হত না। তারা একেবারে রেডিমেড জিনিষ নিত। এগুলো খুবই ছোট আকারের। গড়ে ১৫০ মিলিমিটার। কজেই একজনের চামড়ার ঝোলায় পঞ্চাশ একশ খানা সহজেই এঁটে যাবার কথা।

        ল্যাংঘনাজে প্রকৃত ট্রেডিং হত। তারা পাথরের লিথিক সরঞ্জাম তৈরী করে হরপ্পা সভ্যতাকে সরবরাহ করত। বদলে নিত খাদ্য শষ্য তামার সরঞ্জাম। হরপ্পা সভ্যতা কিন্তু দাঁড়িয়ে ছিল উন্নত মানের লিথিক সরঞ্জামের উপর ভিত্তি করে। লিথিক মাইক্রো-ড্রিলবিট ও তৈরী হত, যা চার ইঞ্চি অবধি পাথরের বিডস্ এ থ্রু ড্রিল করে ফেলতে পারত।

        তবে সব মাইক্রোলিথিক বা লিথিক টুলস ল্যাংঘনাজ থেকেই যেত এমন না। আরো অনেকগুলো এলাকা ছিল। অনেকগুলো বের হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।
        আমি সেই সব এলাকা গুলো নিয়ে লেখা পেপার খুঁজছি।
        পেলে আলাদা করে লিখবো।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।